০৮৫. পুরুর রাজ্যাভিষেক

পুরুর রাজ্যাভিষেক

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে নহুষতনয় রাজা যযাতি যৌবন-সম্পন্ন হইয়া প্ৰসন্নমনে অভিলাষানুরূপ বিষয়ভোগে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি ধর্ম্মের অব্যাঘাতে বাসনা ও উৎসাহের অনুরূপ বিষয়-ভোগ করিতে আরম্ভ করিলেন। অনুগ্রহ দ্বারা দীন ব্যক্তিদিগকে, অভিলাষসম্পাদন দ্বারা দ্বিজগণকে, অন্ন-পান দ্বারা অতিথিগণকে, ধর্ম্মতঃ পরিপালন দ্বারা প্ৰজাগণকে অনুরঞ্জন করিয়া এবং নিগ্রহ দ্বারা দস্যুদিগকে শাসন করিয়া সাক্ষাৎ সুরেন্দ্রের ন্যায় রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। সেই সিংহবিক্ৰান্ত ভূপতি ধর্ম্মের অবিরোধে বিষয়বাসনা চরিতার্থ করিতেন। তিনি স্বৰ্গবিদ্যাধরী বিশ্বাচীর সহিত কখন নন্দনবনে, কখন অলকায়, কখন বা উত্তর-মেরুশৃঙ্গে বিহার করিয়া পরিতৃপ্ত ও নিস্পৃহ হইলেন। পরে প্রতিজ্ঞাত সহস্ৰ বৎসর স্মরণ করিলেন। যখন দেখিলেন, যৌবনসুখে সহস্ৰ বৎসর অতিবাহিত হইয়াছে, তখন আপন পুত্র পুরুকে কহিলেন, “বৎস পুরো! আমি তোমার যৌবন লইয়া ইচ্ছানুরূপ ও উৎসাহানুরূপ বিষয়-ভোগ করিয়া দেখিলাম, কাম্যবস্তুর উপভোগে কামের উপশম না হইয়া প্ৰত্যুত ঘূতদানে বহ্নির ন্যায় ক্রমশঃ পরিবৰ্দ্ধিত হইতে থাকে। এই পৃথিবীতে যে কিছু ধন, ধান্য, পশু ও রমণী প্রভৃতি উপভোগের দ্রব্য আছে, এক ব্যক্তি তৎসমুদয় পাইলেও তাহার পরিতৃপ্তি হয় না; অতএব ভোগ তৃষ্ণা পরিত্যাগ করাই কর্তব্য। দুৰ্মতি ব্যক্তিরা যে আশপাশ হইতে মুক্ত হইতে পারে না এবং শরীর জীর্ণ হইলেও যে আশা জীর্ণ হয় না, সেই প্ৰাণান্তিক রোগাস্বরূপ আশাকে পরিত্যাগ করাই সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। আমি ইচ্ছানুরূপ বিষয়সম্ভোগ করিয়া সহস্ৰ বৎসর অতিবাহিত করিলাম, তথাপি আমার ভোগ তৃষ্ণা উত্তরোত্তর উত্তেজিত হইতেছে। এক্ষণে আমি আশা-পিশাচীকে পরিত্যাগ করিয়া তপোবনে প্রবেশপূর্ব্বক পরব্রহ্মে মনােনিবেশ করিব। বৎস! তােমার সুশীলতা দর্শনে আমি সাতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছি, আশীৰ্বাদ করি, তোমার মঙ্গল হউক। এক্ষণে আপনি যৌবন ও মদীয় রাজ্যভার গ্রহণ কর। বৎস! তুমিই আমার প্রিয়কারী পুত্র। আমি তোমা হইতে যথেষ্ট সুখভোগ করিলাম।”

অনন্তর নহুষতনয় যযাতি পুনর্ব্বার আপনি জরা গ্ৰহণ করিলেন এবং তৎপুত্র পুরু যৌবনসম্পন্ন হইলেন। মহারাজ যযাতি কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিবেন, এই কথা প্রচার করিয়া দিলেন। ব্রাহ্মণ প্রভৃতি চারিবর্ণ তথায় উপস্থিত হইয়া তাহাকে নিবেদন করিলেন, “মহারাজ! দেবযানী-গর্ভসম্ভূত শুক্রের দৌহিত্র যদু বিদ্যমান থাকিতে পুরু কি প্রকারে রাজ্য পাইতে পারেন। যদু আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র, তৎপর তুর্ব্বসু জন্মেন। শৰ্মিষ্ঠার দ্রুহ্যু, অনু ও পুরু নামে তিন পুত্র যথাক্রমে উৎপন্ন হয়েন। অতএব হে মহারাজা! আমরা জিজ্ঞাসা করি, জ্যেষ্ঠকে অতিক্রম করিয়া কানীয়ান (কনিষ্ঠ) কিরূপে রাজ্যভোগী হইতে পারেন? এক্ষণে যাহা উচিত হয়, আপনি করুন।” রাজা কহিলেন, “হে বর্ণচতুষ্টয় (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রজাতীয় জনগণ)! আমি যে-কারণে জ্যেষ্ঠকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিব না, তাহা সবিশেষে কহিতেছি, শ্রবণ কর। জ্যেষ্ঠ পুত্র যদু আমার নির্দেশ পালন করে নাই, সুতরাং যে পুত্র পিতার প্রতিকূল, সে সাধুসমাজে পুত্ৰ বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে না। যে পুত্ৰ পিতামাতার আজ্ঞাবহ এবং কায়মনোবাক্যে তাঁহাদিগের হিতসাধন করে, তাহাকেই যথার্থ পুত্র বলা যায়। যদু, তুর্ব্বসু, দ্রুহ্যু ও অনু ইহারা আমার আজ্ঞাপালন না করিয়া অতিশয় অপ্রিয়কাৰ্য্য করিয়াছে; কিন্তু পুরু আমার বাক্যরক্ষা ও সম্মানরক্ষা করিয়াছে। পুরু আমার জরা-গ্রহণ করিয়া স্বকীয় যৌবন আমাকে সম্প্রদান করিয়াছিল এবং পুরু আমার মিত্ররূপ সমুদয় অভিলাষ সম্পাদনা করিয়াছিল, এই কারণে সে কনিষ্ঠ হইয়াও রাজ্যের অধিকারী হইয়াছে। আর শুক্র আমাকে এই বর প্রদান করেন, ‘যে পুত্র তোমার আজ্ঞাবহ হইবে, সে রাজ্যভাগী হইবে।”; অতএব তোমাদিগকে অনুনয় করিতেছি, তোমরা পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করা।” রাজার এই কথা শুনিয়া প্ৰজারা কহিল, “মহারাজ! যে পুত্র সর্ব্বগুণসম্পন্ন এবং পিতামাতার হিতকারী, সে সর্ব্বকনিষ্ঠ হইলেও সমস্ত কল্যাণের পাত্ৰ হইতে পারে। পুরু আপনার প্রিয়কাৰ্য্য সম্পাদনা করিয়াছেন, বিশেষতঃ শুক্রের ঐরূপ বর আছে, অতএব এ বিষয়ে আমাদিগের কোন বক্তব্য নাই, সুতরাং পুরুই রাজা হইবেন।” পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকেরা সন্তুষ্টমনে এই কথা কহিলে রাজা কনিষ্ঠ পুত্রকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। তিনি পুরুকে রাজ্যভার অর্পণ করিয়া বিষয়বাসনায় জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক বনবাসের মানসে তপস্বী ব্রাহ্মণগণের সহিত রাজধানী হইতে নিৰ্গত হইলেন। তৎপরে যদু হইতে যাদব, তুর্ব্বসু হইতে যবন, দ্রুহ্যু হইতে বৈভোজী, অনু হইতে ম্লেচ্ছজাতি এবং পুরু হইতে পৌরববংশ উৎপন্ন হইল। হে মহারাজ! আপনি সেই বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।