১৬. কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অশ্বত্থামার নিগ্রহ-ব্যবস্থা

১৬শ অধ্যায়

কৃষ্ণ কর্ত্তৃক অশ্বত্থামার নিগ্রহ-ব্যবস্থা

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর মহামতি বাসুদেব পাপাত্মা অশ্বথামা পাণ্ডবকামিনীগণের গর্ভে ঈষীকাস্ত্র পরিত্যাগ করিয়াছেন অবগত হইয়া হৃষ্টান্তঃকরণে তাঁহাকে কহিলেন, “দ্রোণতনয়! পূর্বে এক ব্রতপরায়ণ বিপ্র বিরাটনগরে বিরাটদুহিতা অর্জুনের পুত্রবধূ উত্তরাকে কহিয়াছিলেন যে, ‘রাজকুমারি! কৌরববংশ উৎসন্নপ্রায় হইলে তোমার গর্ভে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করিবে। কৌরববংশের পরিক্ষীণাবস্থায় ঐ পুত্রের জন্ম হইবে বলিয়া উহার নাম পরীক্ষিৎ হইবে।’ হে আচাৰ্য্যতনয়! সেই সাধু ব্রাহ্মণ যাহা কহিয়া গিয়াছেন, তাহা কদাচ মিথ্যা হইবার নহে, অতএব নিশ্চয়ই পাণ্ডবগণের পরীক্ষিৎ নামে এক বংশধর পুত্র উৎপন্ন হইবে।” তখন মহাবীর অশ্বত্থামা কৃষ্ণের মুখে সেই কথা শ্রবণ করিয়া ক্রোধাবিষ্টচিত্তে কহিলেন, “কেশব! তুমি পাণ্ডবগণের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শনপূর্ব্বক যাহা কহিলে, তাহা কদাচ সফল হইবে না। আমি যাহা কহিয়াছি, তাহাই ঘটিবে। দেখ, তুমি বিরাটদুহিতার গর্ভ রক্ষা করিবার বাসনা করিতেছ, কিন্তু আমার এই অস্ত্র অচিরাৎ তাহাতে নিপতিত হইবে।” বাসুদেব কহিলেন, “দ্রোণতনয়! তোমার দিব্যাস্ত্র কদাচ ব্যর্থ হইবে না। কিন্তু সেই গর্ভস্থ বালক মৃত ও পুনরায় জীবিত হইয়া সুদীর্ঘকাল বসুন্ধরা অধিকার করিবে। হে দ্রোণাত্মজ! মনীষিগণ তোমাকে পাপ পরায়ণ কাপুরুষ বলিয়া অবগত আছেন। তুমি বালকঘাতী, অতএব তোমাকে এক্ষণে অবশ্যই এই পাপকর্ম্মের ফল ভোগ করিতে হইবে। তুমি অসহায় হইয়া মৌনভাবে তিন সহস্র বৎসর নির্জন প্রদেশে পর্যটন করিবে; কদাচ লোকালয়ে অবস্থান করিতে পারিবে না। তোমাকে সর্ব্বপ্রকার ব্যাধিগ্রস্ত ও পূযশোণিতগন্ধসম্পন্ন [পূযরক্তের দুর্গন্ধে পরিব্যাপ্ত] হইয়া নিরন্তর দুর্গম অরণ্যে পরিভ্রমণ করিতে হইবে। আর পাণ্ডবকুলতিলক পরীক্ষিৎ ক্রমশঃ পরিবর্ধিত হইয়া বেদাধ্যয়ন ও কৃপাচার্য্য হইতে অস্ত্রশস্ত্র সমুদয় শিক্ষা করিয়া ক্ষত্রিয়-ধর্ম্মানুসারে যষ্টি বৎসর পৃথিবী পালন করিবে। হে 
নি
র্বোধ! তোমার সমক্ষেই পরীক্ষিৎ কুরুকুলে রাজপদবী প্রাপ্ত হইবে। এক্ষণে তুমি তাহাকে অস্ত্রানলে দগ্ধ করিলেও আমি পুনরায় তাহার জীবন প্রদান করিব। আজ তুমি আমার তপস্যা ও সত্যের পরাক্রম অবলোকন কর।”

অশ্বত্থামার মস্তকণিলাভে দ্রৌপদীর শোকশান্তি

তখন ব্যাসদেব কহিলেন, “হে দ্রোণাত্মজ! তুমি যখন আমাদিগকে অনাদর করিয়া এই নিদারুণ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে এবং যখন তুমি ব্রাহ্মণ হইয়াও ক্ষত্রিয়ধর্ম্ম অবলম্বনপূর্ব্বক কুকর্ম্মে প্রবৃত্ত হইলে, তখন বাসুদেব যাহা কহিলেন, তাহা তোমাকে অবশ্যই ভোগ করিতে হইবে।” তখন মহাবীর অশ্বত্থামা ব্যাসদেবের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “হে তপোধন! আমি এই জীবলোকে আপনারই সহিত বাস করিব, তাহা হইলেই আপনার ও বাসুদেবের বাক্য সত্য হইবে।” অশ্বত্থামা এই বলিয়া পাণ্ডবগণকে সেই মণি প্রদানপূর্ব্বক বিষন্নমনে সর্ব্বসমক্ষে বনে প্রস্থান করিলেন; পাণ্ডবেরাও সেই মণি গ্রহণপূর্ব্বক ব্যাস ও নারদকে সম্মান করিয়া সত্বর কৃষ্ণের সহিত বায়ুবেগগামী অশ্বসংযোজিত রথে আরোহণপূর্ব্বক প্রায়োপবিষ্টা কৃষ্ণার নিকট ধাবমান হইলেন।

তাহারা কিয়ৎক্ষণমধ্যে শিবিরে গমনপূর্ব্বক সত্বর রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া দেখিলেন, দ্রৌপদী শোকাকুলিতচিত্তে নিরানন্দে অবস্থান করিতেছেন। তখন পাণ্ডবগণ বাসুদেবের সহিত নিতান্ত দুঃখিতমনে দ্রৌপদী সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক উপবিষ্ট হইলেন। অনন্তর মহাবীর বৃকোদর রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে দ্রৌপদীকে অশ্বত্থামার শিরোমণি প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, “প্রিয়ে! তুমি যাহা প্রার্থনা করিয়াছিলে, তোমার পুত্রহন্তাকে পরাজিত করিয়া এই তাহা আনয়ন করিয়াছি; এক্ষণে তুমি উত্থিত হইয়া ইহা গ্রহণ এবং ক্ষত্রিয়ধর্ম্ম স্মরণপূর্ব্বক শোক পরিত্যাগ কর।’ ধর্ম্মরাজ সন্ধিস্থাপনের বাসনা করিলে বাসুদেব যখন দুৰ্য্যোধন-সন্নিধানে গমন করেন, তৎকালে তুমি তাহাকে কহিয়াছিলে, ‘মধুসূদন! ধর্ম্মরাজ শান্তিস্থাপনের ইচ্ছা করিতেছেন, অতএব বোধ হয়, আমার পতি, পুত্র ও ভ্রাতৃগণ কেহই নাই এবং তুমিও বিনষ্ট হইয়া গিয়াছ। হে দ্রৌপদী! তুমি, তৎকালে যে সকল ক্ষত্রিয়ধর্ম্মানুরূপ অতি কঠোর বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলে, এক্ষণে তৎসমুদয় স্মরণ কর। আমি আমাদিগের রাজ্যলাভের কণ্টকস্বরূপ দুরাত্মা দুর্য্যোধনের বিনাশসাধন এবং জীবিতাবস্থায় দুঃশাসনের শোণিত পান করিয়াছি। এক্ষণে আমাদিগের বৈরানল এককালে নিৰ্ব্বাণ হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে আমাদিগকে আর কেহ কোন অংশেই নিন্দা করিতে সমর্থ হইবে না। আমি অশ্বত্থামাকে পরাজয়পূর্ব্বক ব্রাহ্মণ ও গুরু বলিয়া পরিত্যাগ করিয়াছি। তাঁহার সমগ্র যশ অপহৃত হইয়াছে; এক্ষণে কেবল কলেবরমাত্র অবশিষ্ট আছে এবং সে মণিবিয়োজিত ও আয়ুধভ্রষ্ট হইয়া দীনহীনের ন্যায় বিচরণ করিতেছে।”

হে মহারাজ! মনস্বিনী দ্রৌপদী বৃকোদরের মুখে এই সমস্ত বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “নাথ! আমার মনোরথ সফল হইল। দেখ, গুরুপুত্রও আমার গুরু; অতএব তিনি যে মণি ধারণ করিতেন, এক্ষণে ধর্ম্মরাজ উহা স্বীয় মস্তকে ধারণ করুন।” অনন্তর ধর্ম্মরাজ দ্রৌপদীর অনুরোধে সেই মণি গ্রহণপূর্ব্বক গুরুর উচ্ছিষ্ট জ্ঞান করিয়া মস্তকে ধারণ করিলেন। মণি ধর্ম্মরাজের মস্তকে সন্নিহিত হইলে চন্দ্রমণ্ডলমণ্ডিত পর্ব্বতের ন্যায় তাহার অপুর্ব্ব শোভা হইল। তদ্দর্শনে পুত্রশোকাতুরা দ্রৌপদী অবিলম্বে গাত্রোত্থান করিলেন।