০৪৩. ভীষ্মবধপর্ব্বাধ্যায়–রণবাদ্য

৪৩তম অধ্যায়

ভীষ্মবধপর্ব্বাধ্যায়–রণবাদ্য

সঞ্জয় কহিলেন, “হে মহারাজ! মহারথীগণ ধনঞ্জয়কে বাণ ও গাণ্ডীবধারী দেখিয়া পুনরায় ঘোরতর নিনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ এবং তাঁহাদের অনুযায়ী বীরসমুদয় সাগরসস্তুত শঙ্খবাদ্য করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভেরী [বৃহৎ ঢাক], পেশী [বড় ঢোল], ক্রাকচ [জয়মঙ্গল—করাত দিয়া কাঠ। ফাড়ার শব্দের ন্যায় শব্দকারী], গোবিষাণিত [গোশৃঙ্গের বাঁশী—শিঙা] প্রভৃতি বিবিধ বাদ্য বাদিত হওয়াতে তুমুল শব্দ সমুখিত হইল। দেব, গন্ধর্ব্ব, পিতৃলোক, সিদ্ধ, চারণ ও মহর্ষিগণ সুররাজকে অগ্ৰে লইয়া সেই সংগ্রামসন্দর্শনার্থ আগমন করিলেন।

যুধিষ্ঠিরের ভীষ্মাভিগমনে অর্জ্জুনাদির বিস্ময়

“তখন ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই সাগরোপম উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণকে সংগ্রামে সমুদ্যত দেখিয়া কবচ ও আয়ুধ পরিত্যাগপূর্ব্বক রথ হইতে অবরোহণ করিলেন এবং কৃতাঞ্জলি, যতবাক্ ও পূর্ব্বমুখীন হইয়া রিপুসৈন্যমধ্যস্থ পিতামহ ভীষ্মের সমীপে পদব্রজে গমন করিতে লাগিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় যুধিষ্ঠিরকে রথ হইতে অবতরণপূর্ব্বক গমন করিতে দেখিয়া সত্বর রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে তাঁহার অনুগমনে প্ৰবৃত্ত হইলেন। মহাত্মা বাসুদেব অৰ্জ্জুনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন এবং অন্যান্য ভূপতিগণও কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া প্রাধান্যানুসারে কৃষ্ণের অনুগমন করিতে আরম্ভ করিলেন। “মহাবীর অর্জ্জুন ধর্ম্মরাজের অনুগমন করিয়া কহিতে লাগিলেন, ‘হে ধর্ম্মরাজ! আপনি কি নিমিত্ত আমাদিগকে পরিত্যাগ করিযা রিপুসৈন্যাভিমুখে পদাচারে [পায়ে হাঁটিয়া] গমন করিতেছেন?’

“ভীমসেন কহিলেন, ‘হে রাজন্! শত্রুসৈন্যগণ সুসজ্জিত হইয়াছে; এ সময়ে আপনি কবচ ও অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপ করিয়া ভ্ৰাতৃবর্গকে পরিত্যাগপূর্ব্বক কোথায় চলিয়াছেন?’

“নকুল কহিলেন, “আপনি জ্যেষ্ঠভ্রাতা হইয়া এইরূপ ব্যবহার করাতে আমার হৃদয় নিতান্ত ব্যথিত হইতেছে; অতএব বলুন, কোথায় গমন করিতেছেন?’

“সহদেব কহিলেন, ‘হে মহারাজ! এক্ষণে এই ভয়ঙ্কর সংগ্রামসময় সমুপস্থিত হইয়াছে; এ সময় আপনার যুদ্ধ করাই কর্ত্তব্য; আপনি তাহা না করিয়া শত্ৰুগণের অভিমুখে কোথায় যাইতেছেন?”

“যতবাক ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণকর্ত্তৃক উক্ত প্রকার অভিহিত হইয়াও কিছুমাত্র উত্তর করিলেন না; কেবল তাঁহাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাতই করিতে লাগিলেন। তখন মনস্বী জনাৰ্দন হাসিতে হাসিতে ভীমসেন প্রভৃতিকে কহিতে লাগিলেন, ‘হে পাণ্ডবগণ! আমি যুধিষ্ঠিরের অভিপ্ৰায় অবগত হইয়াছি। উনি ভীষ্ম, দ্ৰোণ, কৃপ ও শল্যপ্রভৃতি গুরুজনদিগকে সম্মানিত করিয়া শত্ৰুগণের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইবেন। পূর্ব্বপুরুষপরম্পরায় শ্রবণ করিয়াছি, যে ব্যক্তি বৃদ্ধ, গুরু ও বান্ধবগণের সম্মান করিয়া শাস্ত্রানুসারে বলবান শক্রবর্গের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়, অবশ্যই তাহার জয়লাভ হইয়া থাকে।”

পাণ্ডবদৌর্ব্বল্য-ধারণায় কৌরবগণের হর্ষ

“মহাত্মা মধুসূদন কৌরবসৈন্যগণের প্রতি লক্ষ্য করিয়া এই কথা কহিবামাত্ৰ মহান হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল এবং অনেকে নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। দুৰ্য্যোধনের সৈন্যমধ্যস্থ বীরপুরুষগণ যুধিষ্ঠিরকে তৎবস্থ দেখিয়া পরস্পর কথোপকথন করিতে লাগিলেন, “এই ক্ষত্ৰিয়কুলকলঙ্ক কাপুরুষ যুধিষ্ঠির নিশ্চয়ই ভীত হইয়া সহোদরগণসমভিব্যাহারে শরণাগ্ৰহণাৰ্থ [আশ্ৰয় লইবার জন্য।] ভীষ্মের সমীপে গমন করিতেছে। আহা! মহাবীর ধনঞ্জয়, বৃকোদর, নকুল ও সহদেব সহায় থাকিতে নির্লজ্জ যুধিষ্ঠির কি প্রকারে ভীতের ন্যায় গমন করিতেছে? নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, ঐ কাপুরুষ ক্ষত্ৰিয়কুলে জন্মগ্রহণ করে নাই; নচেৎ কি নিমিত্ত সংগ্রামসময় সমুপস্থিত হওয়াতে উহার মনে ভয়ের সঞ্চার হইল?’

“বীরপুরুষগণের এই বাক্যশ্রবণে কৌরবপক্ষীয় সমুদয় সৈন্যগণ হৃষ্টচিত্তে কৌরবগণের প্রশংসা করিতে লাগিল এবং যুধিষ্ঠির, তাঁহার ভ্রাতৃবর্গ ও কেশবের নিন্দা করিয়া পতাকা কম্পিত করিতে লাগিল। কৌরবসৈন্যগণ এইরূপে যুধিষ্ঠিরকে ধিক্কার প্রদানপূর্ব্বক পুনরায় তূষ্ণীস্তাব অবলম্বন করিল। ঐ সময়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির কি বলেন, ভীষ্ম বা কি প্রত্যুত্তর প্রদান করেন এবং সমরশ্লাঘী ভীমসেন, ধনঞ্জয় ও বাসুদেবই বা কি কহেন, উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণের মনে এই আশঙ্কা উপস্থিত হইল।

যুধিষ্ঠিরের ভীষ্মাভিবাদন

“তখন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণের সহিত শরশক্তিসঙ্কুল শত্রুসৈন্যমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক সংগ্রামার্থ সমুপস্থিত শান্তনুতনয়ের সমীপে গমন করিলেন এবং তাহার চরণদ্বয় গ্রহণপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, “হে দুৰ্দ্ধর্ষ! আমি আপনাকে আমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছি; আপনার সহিত সংগ্রাম করিব; অনুগ্রহ করিয়া অনুমতি প্ৰদান ও আশীর্ব্বাদ করুন।’

“ভীষ্ম কহিলেন, “হে রাজন্! যদি তুমি অনুজ্ঞা গ্ৰহণাৰ্থ আমার নিকট আগমন না করিতে, তাহা হইলে আমি ‘পরাভব হউক’ বলিয়া তোমাকে শাপ প্ৰদান করিতাম, কিন্তু এক্ষণে আমি তোমার তোমার প্রতি সাতিশয় প্রীত হইয়াছি; আশীর্ব্বাদ করি, যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ কর। সংগ্রামে তোমার অন্যান্য যেসমুদয় অভিলাষ আছে, তাহাও সিদ্ধ হউক, তোমার কখনই পরাজয় হইবে না, এক্ষণে আমার নিকট স্বীয় অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। হে রাজন! পুরুষ অর্থের দাস, অর্থ কাহারও দাস নহে; এ কথা যথার্থ। কৌরবগণ অর্থদ্বারা আমাকে বদ্ধ করিয়াছে অতএব আমি এক্ষণে নিতান্ত কাপুরুষের ন্যায় তোমাকে কহিতেছি যে, কৌরবগণ আমাকে অর্থপ্রদান করিয়া বশীভূত করিয়াছে; সুতরাং তাহাদের পক্ষ হইয়াই সংগ্রাম করিতে হইবে, তোমার পক্ষ হইয়া সংগ্ৰাম করিতে পারিব না; অতএব ইহা ব্যতীত আমার নিকট তুমি কি প্রার্থনা করা?”

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘পিতামহ! আপনি আমার হিতার্থী হইয়া মন্ত্রণা ও কৌরবগণের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করুন, আমি এই বর প্রার্থনা করি।”

“ভীষ্ম কহিলেন, ‘হে রাজন্! তোমার বিপক্ষগণের পক্ষ হইয়া আমাকে অবশ্যই যুদ্ধ করিতে হইবে। যাহা হউক, এ বিষয়ে তোমার যাহা অভিলাষ থাকে, ব্যক্ত কর; আমি তাহা সম্পাদনে পরাঙ্মুখ হইব না।’

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘হে পিতামহ! আমি আপনাকে প্ৰণিপাতপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিতেছি, আপনি অপরাজেয়, অতএব আমি কিরূপে আপনাকে সংগ্রামে পরাজয় করিব? হে মহাত্মন! যদি আপনি আমার মঙ্গলাকাঙক্ষী হয়েন, তবে উক্ত বিষয়ে সৎপরামর্শ প্ৰদান করুন।’

“ভীষ্ম কহিলেন, ‘হে রাজন্! আমাকে সংগ্রামে পরাজয় করিতে পারে, এমন ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হয় না। অন্যের কথা দূরে থাকুক, সাক্ষাৎ পুরন্দরও আমাকে যুদ্ধে পরাজিত করিতে পারেন না।’

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘হে পিতামহ! আমি আপনাকে প্ৰণতিপূর্ব্বক কহিতেছি, আপনি সংগ্রামে আপনার বধোপায় বলুন।”

“ভীষ্ম কহিলেন, ‘বৎস! আমাকে সমরে পরাজয় করিতে পারে, এমন কেহই নাই; এক্ষণে আমার মৃত্যুকালও উপস্থিত হয় নাই, অতএব তুমি পুনরায় আমার নিকট আগমন করিও।”

দ্ৰোণাভিবাদন

“তখন ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পিতামহের বাক্য মস্তকে ধারণ ও কে অভিবাদনপূর্ব্বক সর্ব্বসৈন্যসমক্ষে ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে আচাৰ্য্য দ্রোণের রথাভিমুখে গমন করিলেন। তথায় সমুপস্থিত হইয়া দ্রোণাচাৰ্য্যকে প্ৰণাম ও প্রদক্ষিণপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, “হে দুৰ্দ্ধর্ষ! আমি আপনাকে আমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছি, ন্যায়ানুসারে যুদ্ধে প্ৰবৃত্ত হইব; আপনার অনুজ্ঞাগ্রহণ ব্যতীত কিরূপে শক্রিসমুদয় পরাজিত করিব?”

“দ্রোণ কহিলেন, হে রাজন্! তুমি যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া যদি আমার অনুমতি গ্রহণ করিবার নিমিত্ত আগমন না করিতে, তাহা হইলে আমি ‘পরাজয় হউক’ বলিয়া তোমাকে শাপ প্ৰদান করিতাম। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি আমার পূজা করাতে তোমার প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি; নিৰ্ভয়ে যুদ্ধ করা। আশীর্ব্বাদ করিতেছি, তোমার জয়লাভ হইবে। তুমি স্বীয় অভিলাষ ব্যক্ত কর, আমি তাহা সম্পাদন করিতে সম্মত আছি। হে রাজন! পুরুষ অর্থের দাস, অর্থ কাহারও দাস নয়; এ কথা যথার্থ। কৌরবগণ অর্থদ্বারা আমাকে বদ্ধ করিয়াছে; সুতরাং নিতান্ত কাপুরুষের ন্যায় তোমাকে কহিতেছি যে, আমি কৌরবগণের পক্ষ হইয়াই যুদ্ধ করিব, তোমার পক্ষ হইয়া সংগ্রাম করিতে পারিব না; অতএব ইহা ব্যতীত তুমি আমার নিকট কি প্রার্থনা করা?”

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, “হে ব্ৰহ্মন! আমাকে জয়লাভের আশীর্ব্বাদ ও আমার হিতমন্ত্রণা এবং কৌরবগণের পক্ষ হইয়া সংগ্রাম করুন।”

“দ্রোণ কহিলেন, “হে রাজন্! যখন মহাত্মা মধুসূদন তোমার মন্ত্রী, তখন তোমার জয়লাভের সংশয় কি? আমি বিলক্ষণ অবগত আছি, তুমি সংগ্রামে শত্ৰুগণকে পরাজিত করিবে। হে ধর্ম্মরাজ! যেখানে ধর্ম্ম, সেইখানেই কৃষ্ণ এবং যেখানে কৃষ্ণ, সেইখানেই জয়; অতএব তুমি স্বচ্ছন্দে গমন করিয়া সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও। এক্ষণে আমাকে আর কি বলিতে হইবে বল? “যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘আৰ্য্য! আপনাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছি, তাহা শ্রবণ করুন। আপনি নিতান্ত অপরাজেয়, আমি আপনাকে কিরূপে সংগ্রামে পরাজিত করিতে সমর্থ হইব?” দ্রোণ কহিলেন, ‘হে কৌন্তেয়! আমি যতক্ষণ রণক্ষেত্রে সমুপস্থিত থাকিয়া যুদ্ধ করিব, ততক্ষণ তোমার জয়লাভের কিছুমাত্র সম্ভাবনা নাই; অতএব ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে শীঘ্র আমাকে সংহার করিতে যত্নবান হও।”

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, “হে আচাৰ্য্য! আমি আপনাকে প্ৰণাম করিয়া কহিতেছি, আপনি অনুগ্রহ করিয়া আপনার বধোপায় বলুন।”

“দ্রোণ কহিলেন, “বৎস! আমি সমরক্ষেত্রে ক্রুদ্ধচিত্তে শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে আমাকে বধ করিতে পারে, এরূপ লোক দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু আমি সমরে অস্ত্রশস্ত্ৰ পরিত্যাগপূর্ব্বক যখন অচেতনের ন্যায় অবস্থান করিব, সেই সময় আমাকে সংহার করিতে পারিলেই আমি নিহত হইব। সত্যবাদী ব্যক্তির মুখে মহৎ অপ্রিয় বাক্য শ্রবণ করিলেই আমি অস্ত্ৰ পরিত্যাগ করিব, যথার্থ কহিলাম।”

কৃপাচাৰ্য্য-অভিবাদন

“মহারাজ যুধিষ্ঠির দ্রোণের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহাকে সম্মানিত করিয়া কৃপের নিকট গমন কহিলেন এবং তাঁহার চরণবন্দন ও তাঁহাকে প্ৰদক্ষিণ করিয়া করিলেন, ‘আৰ্য্য! আমি আপনাকে আমন্ত্রণপূর্ব্বক সমরে প্রবৃত্ত হইতেছি, আজ্ঞা করুন, শত্ৰুগণকে পরাজয় করি।’

“কৃপ কহিলেন, ‘হে রাজন্! যদি তুমি সংগ্রামে কৃতনিশ্চয় হইয়া অনুজ্ঞা গ্ৰহণার্থ আমার নিকট আগমন না করিতে, তাহা হইলে আমি ‘পরাজয় হউক’ বলিয়া তোমাকে শাপ প্ৰদান করিতাম। হে মহারাজ! পুরুষ অর্থের দাস, অর্থ কাহারও দাস নয়, এ কথা যথার্থ। কৌরবগণ অর্থদ্বারা আমাকে বদ্ধ করিয়াছে, সুতরাং তাহাদের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করিব, তোমার পক্ষ হইয়া সংগ্ৰাম করিতে সমর্থ হইব না; অতএব বল, ইহা ব্যতীত আমার নিকট তোমার আর কি প্রার্থনা আছে?’

“তখন ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির ‘হে আচাৰ্য্য! আমি আপনাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছি, শ্রবণ করুন, এইমাত্র বলিয়া ব্যথিত ও গতচেতন হইলেন।

“কৃপাচাৰ্য্য যুধিষ্ঠিরের অভিপ্রায় বুঝিয়া তাঁহাকে কহিলেন, ‘হে মহারাজ! আমি অবধ্য; যাহা হউক, তুমি যুদ্ধ করা, তোমার জয়লাভ হইবে। আমি তোমার আগমনে পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি; সত্য কহিতেছি, সতত জয়াশীর্ব্বাদ করিব।”

শল্য-অভিবাদন

“মহারাজ যুধিষ্ঠির আচাৰ্য্য কৃপের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহাকে সম্মানিত করিয়া মদ্ররাজ শল্যের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার চরণবন্দন ও তাঁহাকে প্ৰদক্ষিণ করিয়া কহিলেন, ‘মাতুল! আমি আপনাকে আমন্ত্রণপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইতেছি; আজ্ঞা করুন, শক্রগণকে পরাজয় করি।’

“শল্য কহিলেন, ‘হে মহারাজ! যদি তুমি যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া আমার অনুমতি গ্রহণ করিতে না আসিতে, তাহা হইলে আমি ‘পরাভব হউক’ বলিয়া তোমাকে অভিসম্পাত করিতাম। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি আমাকে পূজা করাতে আমি পরম পরিতুষ্ট হইলাম; তোমার অভিলাষ সিদ্ধ হউক। আমি তোমাকে যুদ্ধ করিতে অনুজ্ঞা করিতেছি, তুমি যুদ্ধ কর; জয়লাভ হইবে। এক্ষণে তোমার কি ইচ্ছা বল; আমি তোমাকে কি প্ৰদান করিব? হে রাজন্! পুরুষ অর্থের দাস, অর্থ কাহারও দাস নহে; এ কথা যথার্থ।একৗরবগণ অর্থদ্বারা আমাকে বশীভূত করিয়াছে; সুতরাং আমি তাহাদের পক্ষ হইয়াই যুদ্ধ করিব; তোমার পক্ষ হইয়া। সংগ্রাম করিতে পারিব না; অতএব আমি তোমাকে ক্লীবের ন্যায় কহিতেছি, তুমি ইহা ব্যতীত যাহা প্রার্থনা করিবে, আমি তাহাই করিব।’

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, “হে মহারাজ! আপনি আমার হিতার্থী হইয়া মন্ত্রণা ও কৌরবগণের পক্ষ হইয়া সংগ্রাম করুন, আমার এই প্রার্থনা।”

‘শল্য কহিলেন, ‘ভাগিনেয়! কৌরবগণ অর্থদ্বারা আমাকে বদ্ধ করিয়াছে; সুতরাং তাহাদের পক্ষ হইয়া যথাশক্তি যুদ্ধ করিব। সেই সংগ্রামে তোমার কি হিতসাধন করিতে হইবে বল?’

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘হে মাতুল! আমার এই প্রার্থনা যে, আপনি সংগ্রামসময়ে সূতপুত্র কর্ণের তেজ হ্রাস করিবেন।’

‘শল্য কহিলেন, ‘হে কুন্তীনন্দন! তোমার এই অভিলাষ পূর্ণ হইবে। এক্ষণে স্বচ্ছন্দে গমনপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও, আমি কহিতেছি, তোমার জয়লাভ হইবে।’

কৰ্ণ কৃষ্ণ কথোপকথন-কর্ণের কর্ত্তব্যনিষ্ঠা

“মহারাজ যুধিষ্ঠির এইরূপে স্বীয় মাতুল মদ্ররাজ শল্যকে সম্মানিত করিয়া ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে সেই মহাসৈন্য হইতে বিনির্গত হইলেন। ঐ সময় মহাত্মা বাসুদেব কর্ণের সমীপে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘হে কর্ণ। শ্রুত হইলাম, তুমি ভীষ্মদ্বেষী, সংগ্রামস্থলে ভীষ্ম বর্ত্তমান থাকিতে তুমি যুদ্ধ করিবে না। অতএব যে পৰ্য্যন্ত ভীষ্ম নিহত না হয়েন, সেই পৰ্য্যন্ত আমাদের পক্ষ হইয়া সংগ্রাম কর। ভীষ্ম নিহত হইলে পুনরায় দুৰ্য্যোধনের পক্ষ হইবে।’ “কৰ্ণ কহিলেন, ‘হে কেশব! আমি কদাপি দুৰ্য্যোধনের বিপ্রিয়াচরণ করিতে পারিব না। নিশ্চয় জানিও, আমি দুৰ্য্যোধনের হিতার্থ প্ৰাণ পৰ্য্যন্ত পরিত্যাগ করিব।’ মহাত্মা বাসুদেব কর্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর তথা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া যুধিষ্ঠির প্রমুখ পাণ্ডবগণের সহিত মিলিত হইলেন।

কৌরববীর যুযুৎসুর পাণ্ডবপক্ষে যোগদান

“অনন্তর পাণ্ডবাগ্রজ ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির সৈন্যগণমধ্যে উচ্চঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, ‘য়িনি আমার হিতসাধন করিতে বাসনা করেন, আগমন করুন; আমি তাঁহাকে বরণ করিব।” তখন ধৃতরাষ্ট্রতনয় যুযুৎসু সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া প্রীতমানসে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, ‘মহারাজ! আমি তোমার পক্ষ হইয়া কৌরবগণের সহিত সংগ্রাম করিব।”

“যুধিষ্ঠির কহিলেন, ‘ভ্ৰাতঃ! চল, সকলে একত্রিত হইয়া তোমার মূঢ় সহোদরগণের সহিত সংগ্রাম করি। এ বিষয়ে বাসুদেব, আমি ও আমার ভ্রাতৃগণ আমরা সকলে তোমাকে অনুরোধ করিতেছি। আমি তোমাকে যুদ্ধাৰ্থ বরণ করিলাম। তুমি আমার নিমিত্ত যুদ্ধ কর। স্পষ্টই দৃষ্ট হইতেছে, তুমি একাকী ধৃতরাষ্ট্রের বংশ ও পিণ্ড [জলপিণ্ডদানের যোগ্য ব্যক্তি] রক্ষা করিবে। আমরা তোমাকে অনুরোধ করিতেছি, তুমি আমাদের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করা। অমর্ষপরায়ণ দুর্বুদ্ধি দুৰ্য্যোধন অচিরাৎ নিহত হইবে।’

“হে মহারাজ! অনন্তর যুযুৎসু সহোদরগণকে পরিত্যাগপূর্ব্বক পাণ্ডবসেনাগণকে দুন্দুভি শ্রবণ করাইয়া পাণ্ডবপক্ষে গমন করিলেন। তখন মহাভুজ যুধিষ্ঠির সন্তুষ্টচিত্তে কনকোজ্জল দেদীপ্যমান কবচ ধারণ করিলেন; যোদ্ধৃগণ সকলে স্ব স্ব রথে অধিরোহণ ও বৃহ নির্ম্মাণ করিতে লাগিলেন; শত শত দুন্দুভি ধ্বনিত হইতে লাগিল এবং বীরপুরুষগণ বিবিধ সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। খৃষ্টদ্যুন্নপ্রভৃতি পার্থিবগণ পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবগণকে রথস্থ দেখিয়া পুনরায় সাতিশয় আনন্দিত হইলেন। পাণ্ডবগণ মান্য ব্যক্তিদিগের মান রক্ষা করিতেছেন দেখিয়া ভূপতিগণ আনন্দিতচিত্তে তাঁহাদিগকে পূজা ও তাঁহাদের সৌহার্দ্দ, দয়া ও জ্ঞাতিগণের প্রতি অনুগ্রহের বিষয় কথোপকথন করিতে লাগিলেন। চতুর্দ্দিকে পাণ্ডবগণের প্রতি সাধুবাদ ও স্তুতিবাদ হইতে লাগিল। কি স্লেচ্ছ, কি আৰ্য্য, তত্রস্থ সমস্ত লোকই হৃষ্টচিত্তে সমুদয় দর্শন, শ্রবণ ও গদগদম্বরে পাণ্ডবগণের চরিত্ৰকীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। মনস্বিগণ মহাভেরী ও গোক্ষীরসদৃশ [দুগ্ধধবল—দুধের মত সাদা] শঙ্খের ধ্বনি করিতে লাগিলেন।”