১৭৪. মোক্ষধৰ্ম্মপর্ব্বাধ্যায়

১৭৪তম অধ্যায়

মোক্ষধৰ্ম্মপর্ব্বাধ্যায়

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি পরমপবিত্র রাজধৰ্ম্মাশ্রিত আপদ্ধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিলেন, এক্ষণে যে ধৰ্ম্মসমুদয় আশ্রমবাসীর পক্ষে শ্রেষ্ঠ, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ধর্ম্মের অসংখ্য দ্বার। যে-কোন প্রকারে হউক, ধর্ম্মের অনুষ্ঠান করিলে উহা কদাপি নিষ্ফল হয় না। আশ্রমসমুদয়ে যাগযজ্ঞানুষ্ঠান প্রভৃতি যেসমুদয় ধর্ম্ম নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, তৎসমুদয়ের ফল অপ্রত্যক্ষ। পরলোকেই ঐ সমুদয়ের ফল লব্ধ হইয়া থাকে; কিন্তু তপস্যার ফল প্রত্যক্ষ। তপস্যাদ্বারা আত্মজ্ঞান জন্মিলে ইহলোকেই ব্রহ্মের সহিত সাক্ষাৎকার ও অনির্ব্বচনীয় পরমানন্দ লাভ করিয়া থাকে। যে, যে বিষয়ের প্রতি নিতান্ত অনুরক্ত হয়, তাহাই তাহার শ্রেয়স্কর বলিয়া বোধ হয়। ধৰ্ম্মানুশীলনদ্বারা চিত্তশুদ্ধি লাভ করিতে পারিলেই সংসার তৃণাদির ন্যায় তুচ্ছ বোধ হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি কলেবর পরিগ্রহ করিয়া জনসমাজে বদ্ধ থাকে, তাহাকে নিশ্চয়ই অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করিতে হয়। অতএব ইহলোকে মোক্ষলাভার্থ যত্নবান হওয়া বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির অবশ্য কর্ত্তব্য।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ধনক্ষয় অথবা স্ত্রী, পুত্র ও পিতার মৃত্যু হইলে কোন্ বুদ্ধি অবলম্বনপূৰ্ব্বক শোক হইতে পরিত্রাণ লাভ করা যায়, তাই কীৰ্ত্তন করুন।”

শোকনাশের উপায়—বিপ্র-শ্যেনজিৎসংবাদ

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! অর্থনাশ, পিতৃবিয়োগ ও পুত্রকত্রের মৃত্যু হইলে যে ব্যক্তি নিতান্ত কাতর হয়, শমগুণাদি [ইন্দ্রিয়াদির সংযম] অবলম্বনদ্বারা শোক নিবারণ করা তাহার কর্ত্তব্য। আমি এই উপলক্ষে একটি পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে এক ব্রাহ্মণ পুত্রশোকসন্তপ্ত মহারাজ শ্যেনজিতের নিকট সমুপস্থিত হইয়া কহিয়াছিলেন, ‘মহারাজ! তুমি অজ্ঞানের ন্যায় কি নিমিত্ত অনুতাপ করিতেছ? কিয়দ্দিন পরে তোমার নিমিত্তও লোকে শোক ও যাহারা তোমার নিমিত্ত শোক করিবে, তাহাদিগকে শোচনীয় দশা প্রাপ্ত হইতে হইবে। ফলতঃ কি তুমি, কি আমি, কি তোমার অনুচরগণ সকলেই যে পুরুষ হইতে ইহলোকে আগমন করিয়াছে, পরিশেষে তাহাতেই লয় প্রাপ্ত হইবে।’

“শ্যেনজিৎ কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি কিরূপ বুদ্ধি, তপস্যা, সমাধিজ্ঞান ও শাস্ত্রবল আশ্রয় করিয়া বিষাদ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়াছেন, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।

“ব্রাহ্মণ কহিলেন, ‘মহারাজ! কি দেবতা, কি মনুষ্য, কি পশুপক্ষী সমুদয় প্রাণীই স্ব স্ব কৰ্ম্মনিবন্ধন দুঃখভোগ করিতেছে। আমি আপনার আত্মাকেও আপনার বলিয়া জ্ঞান করি না; আবার সমুদয় জগৎকেও আপনার বলিয়া বিবেচনা করিয়া থাকি। আর পৃথিবীস্থ সমুদয় বস্তুতেই যে আমার ন্যায় অন্যান্য ব্যক্তিগণের অধিকার আছে, ইহাও আমি বিলক্ষণ অবগত হইয়াছি। এই নিমিত্তই আমার অন্তঃকরণে হর্ষ বা বিষাদের সঞ্চার হয় না। যেমন মহাসমুদ্রমধ্যে দুই খণ্ড কাষ্ঠ একবার পরস্পর মিলিত ও পুনরায় পৃথগ্‌ভূত হইয়া যায়, তদ্রূপ লোকের পুত্র, পৌত্র, জ্ঞাতি, বান্ধব প্রভৃতি আত্মীয়গণ একবার তাহার সহিত মিলিত হইয়া কিয়দ্দিন পরে নিশ্চয়ই বিয়োগপ্রাপ্ত হয়। এইরূপে যখন সংসারমধ্যে আত্মীয়বর্গের বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী বলিয়া নির্দ্ধারিত হইয়াছে, তখন তাহাদিগের স্নেহে অভিভূত হওয়া কদাপি বিধেয় নহে। তোমার পুত্র চক্ষুর অগোচর চিন্ময় মহাপুরুষ হইতে উৎপন্ন হইয়াছিল, পুনৰ্ব্বার তাহাতেই বিলীন হইয়াছে। তোমার সেই পুত্র তোমার যথার্থ স্বরূপ জানিতে পারে নাই এবং তুমিও তাহাকে সবিশেষ অবগত হইতে পার নাই; তবে তুমি কি নিমিত্ত অনুতাপ করিতেছ?

সুখই দুঃখের কারণ—সহিষ্ণুতায় দুঃখনিবৃত্তি

‘বিষয়লাভে তৃপ্ত না হওয়াই দুঃখের ও দুঃখনাশই সুখের কারণ। সুখ হইতে দুঃখ ও দুঃখ হইতে সুখ উৎপন্ন হইয়া থাকে। এই জগতে সুখ ও দুঃখ চক্রের ন্যায় পরিভ্রমণ করিতেছে; সকলেই সুখের পর দুঃখ ও দুঃখ-অবসানে সুখলাভ করিয়া থাকে। কেহই চিরকাল দুঃখ বা সুখ ভোগ করে না। তুমি পূৰ্ব্বে সুখভোগ করিয়াছিলে, এক্ষণে দুঃখভোগ করিতেছ, কিয়দ্দিন পরে আবার সুখভোগ করিতে পারিবে। শরীরই সুখ ও দুঃখের আশ্রয়স্বরূপ; অতএব দেহিগণ শরীরদ্বারা যেরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহাদিগকে নিশ্চয়ই তদনুরূপ ফলভোগ করিতে হয়। জীব শরীরের সহিতই উৎপন্ন হয়, শরীরের সহিতই বৰ্ত্তমান থাকে এবং শরীরের সহিতই বিনষ্ট হইয়া যায়। বিষয়াসক্ত অকৃতার্থ মানবগণ বিবিধ স্নেহপাশে বদ্ধ হইয়া সলিলস্থ সিকতাময়[বালুকা] সেতুর ন্যায় অচিরাৎ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তৈলকারগণের[তৈলকারী কলুরা যেমন তিল বা সরিষা ঘানিতে ফেলিয়া পেষণ করে, তদ্রূপ অজ্ঞানরাশি প্রাণীগণকে আক্রমণ করিয়া সংসারচক্রে নিরন্তর নিপীড়িত করে] ন্যায় অজ্ঞানসম্ভূত ক্লেশসমুদয় তিলরাশির ন্যায় প্রাণীগণকে আক্রমণ করিয়া সংসারচক্রে অনবরত নিপীড়িত করিতেছে। নির্ব্বোধ মনুষ্যগণ ভাৰ্য্যাদির পোষণার্থ চৌর্য্য প্রভৃতি বিবিধ কুকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া স্বয়ং একাকী উভয় লোকে যৎপরোনাস্তি ক্লেশ ভোগ করিয়া থাকে। যাহারা স্ত্রী-পুত্র-কুটুম্বাদির প্রতি নিতান্ত অনুরক্ত হয়, তাহাদিগকে নিশ্চয়ই মহাপঙ্কে নিপতিত জীর্ণ বন্যহস্তীর ন্যায় শোকসাগরে নিমগ্ন হইতে হয়। অর্থনাশ, পুত্ৰবিয়োগ ও জ্ঞাতিবন্ধু প্রভৃতি আত্মীয়গণের মৃত্যু হইলে লোকে দাবানল তুল্য বিষম দুঃখে দগ্ধ হইয়া থাকে। এই সংসারমধ্যে সুখ, দুঃখ এবং ঐশ্বৰ্য্য, অনৈশ্বৰ্য্য সমুদয়ই দৈবায়ত্ত। কি বন্ধুহীন, কি বন্ধুসম্পন্ন, কি শত্রুসমাক্রান্ত, কি মিত্রগণের সমাদৃত, কি বুদ্ধিমান, কি নির্ব্বোধ সমুদয় ব্যক্তিই দৈবপ্রভাবে সুখলাভ করিয়া থাকে। সুহৃদ্বর্গ সুখের ও শত্রুগণ দুঃখের কারণ নহে। প্রজ্ঞাপ্রভাবে অর্থ ও অর্থ হইতে সুখলাভ হয় না। বুদ্ধি ধনলাভের ও মূঢ়তা অর্থলাভের হেতু নহে। কি বুদ্ধিমান, কি নির্ব্বোধ, কি বীর, কি ভীরু, কি অলস, কি দীর্ঘদর্শী, কি দুৰ্ব্বল, কি বলবান, সুখ সকলকেই আশ্রয় করিয়া থাকে। ফলতঃ দৈব যাহাকে সুখ প্রদান করে, সেই ব্যক্তি সুখভোগ করিতে সমর্থ হয়। দৈব অনুকূল না হইলে সুখভোগের চেষ্টা নিতান্ত নিরর্থক। বৎস, গোপ, স্বামী ও তস্কর ইহাদের মধ্যে যে ধেনুর দুগ্ধ পান করে, সেই তাহার যথার্থ অধিকারী; অন্যের তাহার উপর মমতাপ্রকাশ বিড়ম্বনামাত্র। ইহলোকে যাঁহারা সুষুপ্তিলাভ করিতে পারেন অথবা যাঁহারা নিরন্তর নিৰ্ব্বিকল্প সমাধি [নিরবচ্ছিন্ন সমাধি—যে সমাধির ছেদ নাই। সুষুপ্তির মত যে সমাধি সুষুপ্তিভঙ্গে তাহার যে ব্যুত্থান দশা অর্থাৎ জাগরণ অবস্থা হয় এবং সেই সময় যে পুৰ্ব্ববৎ কাৰ্য্য-কল্পনা হইতে থাকে, তাহা সবিকল্প; আর যে সমাধির ভঙ্গ নাই—উত্থান নাই—সমাধির সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মভাব, তাহার নাম নির্ব্বিকল্প সমাধি] অবলম্বন করিয়া থাকেন, তাঁহারাই ব্ৰহ্মপদার্থলাভে সমর্থ হয়েন। ভেদদর্শীদিগকে অবশ্যই ক্লেশভোগ করিতে হয়। পণ্ডিতেরা সমাধি বা সুষুপ্তি আশ্রয় করিয়া থাকেন, অন্য পথে পদার্পণ করিতে কদাচ তাঁহাদিগের প্রবৃত্তি হয় না। ফলতঃ সুষুপ্তি ও সমাধিদ্বারাই লোকের যথার্থ সুখভোগ হইয়া থাকে। যাঁহারা উৎকৃষ্ট বুদ্ধিদ্বারা সুখলাভ করিয়া সুখদুঃখশূন্য ও মাৎস্যবিহীন হইয়াছেন, অর্থ বা অনর্থ তাঁহাদিগকে কখনই বিচলিত করিতে পারে না। যাহারা তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিতে পারে নাই, অথচ শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন হইয়াছে, তাঁহাদিগকে অবশ্যই নিরন্তর সুখ-দুঃখ ভোগ করিতে হয়। সদসদ্বিবেকবিহীন [নিত্য-অনিত্য বস্তু বুঝিতে অক্ষম] গর্ব্বিত মূর্খেরাই শত্ৰুজয় ও পরের অবমাননা করিয়া স্বর্গস্থ দেবগণের ন্যায় পরমানন্দে নিয়ত কাল হরণ করিয়া থাকে। সুখের পরিণামেই দুঃখ উপস্থিত হয়। আলস্যই দুঃখের প্রধান কারণ। দক্ষতাদ্বারাই সুখোৎপত্তি হইয়া থাকে। ঐশ্বৰ্য্য ও বিদ্যা দক্ষ ব্যক্তিকেই আশ্রয় করে, অলস ব্যক্তি কখনই ঐ দুই পদার্থ লাভ করিতে সমর্থ হয় না। কি সুখ, কি দুঃখ, কি প্রিয়, কি অপ্রিয়, যাহা উপস্থিত হউক না, সুস্থচিত্তে তাহা অনুভব করাই বুদ্ধিমানের কর্ত্তব্য। এই সংসারে শোক ও ভয়ের বিষয় সহস্র সহস্র রহিয়াছে। ঐ সমুদয় মূঢ় ব্যক্তিদিগকে অভিভূত করে, পণ্ডিতদিগকে কখনই বিচলিত করিতে পারে না। যে ব্যক্তি বুদ্ধিমান, কৌশলজ্ঞ, শাস্ত্রাভ্যাসনিরত, অসূয়াবিহীন, দান্ত ও জিতেন্দ্রিয় এবং যিনি স্থিরচিত্ত হইয়া সমাধিদ্বারা ব্রহ্মভূত [স্বয়ং ব্রহ্ম] হইতে পারেন, শোক তাঁহাকে কখনই স্পর্শ করিতে সমর্থ হয় না। শরীরের কোন অঙ্গও যদি শোক, ত্রাস, দুঃখ বা আয়াসের কারণ হয়, তাহা পরিত্যাগ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। বিষয়সমুদয়ের মধ্যে যাহাতে মমতা জন্মে, তাহাই পরিতাপের কারণ হইয়া উঠে; আর যাহা যাহা পরিত্যাগ করিতে পারা যায়, সেই সকল হইতেই সুখ উৎপন্ন হইয়া থাকে। বিষয়সুখানুরাগী পুরুষকে বিষয়সুখের অনুসন্ধান করিতে করিতে বিনষ্ট হইতে হয়। ঐহিক বিষয়সুখ বা স্বর্গীয় সুখ বৈরাগ্যজনিত সুখের ষোড়শাংশের একাংশও নহে। কি পণ্ডিত, কি মূর্খ, কি বলবান্‌, কি দুর্ব্বল সকলকেই পূর্ব্বৰ্জন্মকৃত শুভাশুভ কার্য্যের ফলভোগ করিতে হইবে। এইরূপে সুখদুঃখ এবং প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয় জীবমণ্ডলে পরিভ্রমণ করিতেছে। পণ্ডিতেরাই ঐ বিষয় বিশেষরূপে অবগত হইয়া কিছুতেই অভিভূত হয়েন না। তাঁহারা সতত বিষয়সমুদয়ের কামনাকে নিন্দা ও ক্রোধ পরিত্যাগ করিয়া থাকেন এবং ক্রোধের হেতু ও লোকের মৃত্যুর কারণ বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। যৎকালে পুরুষের বিষয়সমুদয় কুৰ্ম্মের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ন্যায় সম্পূর্ণরূপে সঙ্কুচিত হইয়া যায়, তখন তিনিই আত্মজ্যোতিঃপ্রভাবে স্বয়ং আত্মাকে দর্শন করিতে সমর্থ হয়েন। যখন তিনি ভয়, বিষয়ানুরাগ ও বিদ্বেষবুদ্ধি পরিত্যাগ করিতে পারেন, যখন কায়মনোবাক্যে কাহারও অনিষ্টচেষ্টা না করেন এবং যখন তাহা হইতে কেহই ভীত না হয়, সেই সময়েই তাহার পরমপদার্থ ব্ৰহ্মপদার্থলাভ হইয়া থাকে। আর যখন তিনি সত্য, মিথ্যা, শোক, হর্ষ, ভয়, অভয় এবং প্রিয় ও অপ্রিয় পরিত্যাগ করিতে অসমর্থ হয়েন, সেই সময়েই তাহার চিত্ত প্রশান্ত হইয়া উঠে।

বিষয়তৃষ্ণাত্যাগে শান্তিপিঙ্গলার উপাখ্যান

‘দুৰ্ম্মতিরা যাহা কখনই পরিত্যাগ করিতে পারে না, মনুষ্য জীর্ণ হইলেও যাহা জীর্ণ হইবার নহে এবং যাহাকে প্রাণান্তকর রোগ বলিয়া বিবেচনা করিতে হয়, সেই বিষয়তৃষ্ণাকে যিনি পরিত্যাগ করিতে পারেন, তিনিই যথার্থ সুখী।

‘পূৰ্ব্বে পিঙ্গলানামে এক বেশ্যা যাহা কহিয়াছিল এবং ক্লেশের সময় যেরূপ সনাতন ধর্ম্ম লাভ করিয়াছিল, আমি এই উপলক্ষে তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা ঐ বেশ্যা সঙ্কেতস্থানে [নায়ক-নায়িকার মিলনের নির্দ্দিষ্ট স্থানে] স্বীয় প্রিয়তমকর্ত্তৃক বঞ্চিত হইয়া নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছিল। সেই ক্লেশের সময় দৈবপ্রভাবে তাহার শান্তবুদ্ধি উপস্থিত হইল। তখন সে ক্ষোভ করিয়া কহিতে লাগিল, “হায়! যে সর্ব্বান্তৰ্য্যামী নির্ব্বিকার পুরুষ আমার হৃদয়ে বাস করিতেছেন, আমি এতকাল কামাদিদ্বারা তাঁহাকে সমাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছি। একদিনও হৃদয়ানন্দকর পরমাত্মার শরণাপন্ন হই নাই। আজ আমি আত্মজ্ঞানবলে অজ্ঞানস্তম্ভযুক্ত [অজ্ঞানরূপ খুঁটির উপর] নবদ্বারসম্পন্ন [৯টি ছিদ্রযুক্ত দেহরূপ গৃহ—চক্ষুর ২, কর্ণের ২, নাসিকার ২, মুখের ১, গুহ্যের ১, লিঙ্গের ১] গৃহ সমাচ্ছন্ন করিব। পূৰ্ব্বে যে ব্যক্তির প্রতি নিতান্ত অনুরক্ত হইয়াছিলাম, সেই ব্যক্তি সমাগত হইলে কখনই তাহাকে কান্ত [পতিতুল্য প্রিয়] বলিয়া বোধ করিব না। এক্ষণে আমার তত্ত্বজ্ঞান উপস্থিত হইয়াছে, সুতরাং সেই নরকরূপী ধূৰ্ত্তেরা পুনরায় আমাকে বঞ্চনা করিতে সমর্থ হইবে । দৈববল ও জন্মান্তরীণ পুণ্যফলে অনর্থও অর্থরূপে পরিণত হইয়া থাকে। আজ আমি জ্ঞানবলে বিষয়বাসনা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক জিতেন্দ্রিয়তা লাভ করিয়াছি। আশাবিহীন মহাত্মারাই স্বচ্ছন্দে নিদ্রাসুখ অনুভব করিয়া থাকেন। আশা-পরিত্যাগ অপেক্ষা পরম সুখের কারণ আর কিছুই নাই।” পিঙ্গলা এইরূপে আশার উচ্ছেদ করিয়া পরমসুখে নিদ্রাগত হইল।

“হে বৎস! মহারাজ শ্যেনজিৎ ব্রাহ্মণের এই সমুদয় ও অন্যান্য যুক্তিযুক্ত উপদেশশ্রবণে শোকপরিত্যাগপূৰ্ব্বক প্রকৃতিস্থ হইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন।”