২৩৫. ঘোষযাত্ৰাপর্ব্বাধ্যায়

২৩৫তম অধ্যায়

ঘোষযাত্ৰাপর্ব্বাধ্যায়

জনমেজয় কহিলেন, হে তপোধন! শীতোষ্ণবাতাতপে একান্ত কৰ্শিতাঙ্গ পাণ্ডবগণ অরণ্যে বাস করিয়া সেই রমণীয় সরোবর ও পুণ্য বন প্রাপ্ত হইয়া কি করিয়াছিলেন, আপনি আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! পাণ্ডবগণ সেই সরোবর সন্নিধানে উপনীত হইয়া এক গৃহ নির্ম্মাণপূর্ব্বক তথায় বাস করিতে লাগলেন; সময়ক্রমে তাঁহারা কমনয়ি কানন, উন্নত অচল ও সমস্ত নদীপ্রদেশে সঞ্চরণ করিতেন। কখন কখন তাহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত বেদবেদাঙ্গপারগ স্বাধ্যায়সম্পন্ন প্রাচীন মহর্ষিগণ সমুপস্থিত হইলে পাণ্ডবেরাও তাঁহাদিগকে বিবিধ উপচারে অর্চনা করিতেন।

বিপ্রমুখে পাণ্ডব-দুঃখবার্ত্তা-শ্রবণে ধৃতরাষ্ট্রের খেদ

অনন্তর একদা কথাকুশল [বাক্যরচনানিপুণ] এক ব্ৰাহ্মণ হস্তিনায় আগমনপূর্ব্বক কৌরবগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া যদৃচ্ছাক্রমে রাজা ধৃতরাষ্ট্রসন্নিধানে উপনীত হইলেন। ব্রাহ্মণ তথায় উপবিষ্ট ও পূজিত হইয়া রাজার নিকট পাণ্ডবদিগের বনবাসক্লেশবার্ত্তা বর্ণন করিলে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন, “হে পাণ্ডবগণ! তোমরা এক্ষণে দুর্ব্বিষহ দুঃখে নিপতিত হইয়া দিন দিন ক্ষীণ হইতেছ এবং অরণ্যবাসক্লেশে নিতান্ত ক্লিষ্ট দ্রুপদনন্দিনী বীরসনাথ হইয়াও অনাথার ন্যায় রহিয়াছ।”

রাজা ধৃতরাষ্ট্র এই কথা কহিবামাত্র একান্ত কৃপাপরতন্ত্র হইয়া ঘন ঘন দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন; পরে কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বনপূর্ব্বক পাণ্ডবগণকে আত্মপ্রভাব [স্বীয় বা বংশসম্ভব পুত্ৰতুল্য] বোধ করিয়া তদুদ্দেশে কহিলেন, “হে বৎসগণ! যে সত্যবাদী সচ্চরিত্র যুধিষ্ঠির রঙ্কুরোমময় [কোমল হরিণলোম] আস্তরণসংস্তীর্ণ শয্যায় শয়ন করিত এবং নিশাবসানে মাগধ-সমূহের স্তুতিবাদশব্দে প্ৰবোধিত হইত, এক্ষণে সে ধরাশায়ী হইয়া প্রভাতকালে পক্ষিকুলের কলরবে জাগরিত হয়। কোপপরীতচেতাঃ [রোষদগ্ধহৃদয়], বাতাতপকার্শিত ও বন্য উপচারের নিতান্ত অযোগ্য বৃকোদর কিরূপে দ্রৌপদীসমক্ষে ক্ষিতিতলে শয়ন করিতেছে? এক্ষণে আমার নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, ধর্ম্মরাজের একান্ত বশংবদ সুকুমার অর্জ্জুন, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী, ভীম ও যুধিষ্ঠিরকে সুখপরিভ্রষ্ট দেখিয়া ক্রোধাবিষ্ট-মনে সর্ব্বাঙ্গীন বেদনায় পরিদূন [তাপিত] ব্যক্তির ন্যায় যামিনীযোগে কদাচ নিদ্রিত হয় না; প্রত্যুত উগ্ৰতেজা অজগরের ন্যায় মুহুর্মুহুঃ দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে থাকে।

“যমজ নকুল-সহদেব দেবতুল্য রূপসম্পন্ন এবং সুখোপচারসমুচিত হইয়াও ধর্ম্ম ও সত্যের অনুরোধে অপ্ৰশান্ত-মনে নিতান্ত দুঃখে রজনী জাগরণ করিয়া থাকে। এক্ষণে অনিলতুল্য বলশালী অপ্রতিহত-প্রভাব ভীমসেন জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠিরকর্ত্তৃক ধর্ম্মপাশে সংযত হইয়া দীর্ঘ-নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ক্ৰোধসংবরণ করিয়া আছে এবং স্বয়ং সত্য ও ধর্ম্মদ্বারা নিবারিত হইয়া আমার আত্মজদিগকে সংহার করিবার নিমিত্ত কাল প্রতীক্ষা করিতেছে।

“দুঃশাসন ছলদ্বারা অজাতশত্রু রাজা যুধিষ্ঠিরকে দ্যূতে পরাজিত করিয়া যে সকল পরুষবাক্য প্রয়োগ করিয়াছিল, তাহা বৃকোদরের শরীরে প্রবিষ্ট হইয়া অনলের ন্যায় নরন্তর তাহাকে দগ্ধ করিতেছে। যে ধর্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির কদাচ মনোমধ্যে পাপচিন্তার উদয় হইতে দেয় না, মহাবীর অর্জ্জুন সেই যুধিষ্ঠিরের অনুসরণ করিয়া থাকে, কিন্তু অরণ্যবাসক্লেশে কেবল ভীমেরই ক্রোধহুতাশন অনিলোদ্দীপিত [বায়ুসংসর্গে প্ৰদীপ্ত] অনলের ন্যায় নিরবচ্ছিন্ন পরিবর্দ্ধিত হইতেছে। সেই ভীম ক্ৰোধে দগ্ধপ্ৰায় হইয়া করে কর নিষ্পেষণপূর্ব্বক মদীয় পুত্র-পৌত্রগণকে ভস্মাবশিষ্ট করিয়াই যেন অত্যুষ্ণ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতেছে। কালকল্প ভীম অর্জ্জুনের সহিত মিলিত হইয়া অশনিসঙ্কাশ নিশিত শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক বিপক্ষ সেনাদিগকে নিঃশেষিত করিবে।

“দুৰ্য্যোধন, দুঃশাসন ও শকুনি ইহারা যখন কপট দ্যূত অবলম্বনপূর্ব্বক রাজ্য হরণ করিয়াছে, তখন তাহারা কেবল মঙ্গলের প্রতিই দৃষ্টিপাত করিয়া ভাবী অমঙ্গলের বিষয় এককালে বিস্মৃত হইয়াছে। মনুষ্য শুভাশুভ কর্ম্মসম্পাদনপূর্ব্বক তাঁহার ফল প্রতীক্ষা করিয়া থাকে। পরে সেই ফললাভ করিয়া তাহারা একান্ত বিমোহিত হয়; অতএব লোকের মোক্ষাপ্ৰাপ্তি হওয়া অতি দুরূহ। ইহা প্রসিদ্ধ আছে যে, ক্ষেত্ৰ সুপ্ৰণালীক্ৰমে কৰ্ষিত, বীজ রোপিত এবং বর্ষাকালে দেবতা বারিবর্ষণ করিলে কৃষকের প্রচুর পরিমাণে ফললাভ হয় বটে, কিন্তু দৈববিড়ম্বনাবশতঃ ইহার অন্যথা ঘটিয়া থাকে।

“অক্ষপ্রিয় শকুনি দ্যূতে প্ৰবৃত্ত হইয়া অতিশয় অশুভকাৰ্য্য করিয়াছে, পাণ্ডবেরা তৎকালে দুৰ্য্যোধন প্রভৃতিকে বিনাশ না করায়, নিতান্ত অপ্রিয়ানুষ্ঠান হইয়াছে এবং আমিও কুপুত্রের বশবর্ত্তী হইয়া অতিশয় কুকর্ম্ম করিয়াছি; অতএব এক্ষণে বোধ হয়, কুরুকুলের বিনাশকাল সমুপস্থিত হইয়াছে, সন্দেহ নাই। দেখ, সমীরণ প্রেরিত না হইলেও প্রবাহিত হইয়া থাকে, গর্ভবতী অবশ্যই সস্তান প্রসব করে; দিনপ্রারম্ভে রজনীর নাশ ও রজনীপ্রারম্ভে দিনের নাশ হয়, অতএব পাপকর্ম্মের ফল অবশ্যই ফলিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু বিপৎকাল উপস্থিত হইলে বুদ্ধির বৈপরীত্য জন্মে, সুতরাং তখন হিতাহিত বিবেচনা থাকে না, এই নিমিত্তই মনুষ্যেরা অন্যায়াচরণ দ্বারা বিত্তোপার্জ্জন করে, উহা কদাচ ধর্ম্মকর্ম্মে নিয়োজিত না করিয়া কেবল অসদুপায় দ্বারা তাহার রক্ষণাবেক্ষণে স্বভাবতঃ প্ৰবৃত্ত হয়; সুতরাং ঐ অর্থ অনার্থের মূল হইয়া উঠে।

“ধনঞ্জয় অরণ্য হইতে ইন্দ্ৰলোকে গমন করিয়া চতুর্ব্বিধ দিব্য অস্ত্ৰ সংগ্রহপূর্ব্বক পুনরায় ভূলোকে আগমন করিয়াছে; অতএব তাহার বলবীৰ্য্য অলোকসামান্য, কাহার সাধ্য তাহা সহ্য করে? দেখ, কোন ব্যক্তি স্বর্গে সশরীরে গমন করিয়া পুনর্ব্বার পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইবার অভিলাষ করে? ইহাতে বোধ হয়, অর্জ্জুন হইতেই কালোপহত কুরুকুল সমূলে নির্মূল হইবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। অর্জ্জুন অদ্বিতীয় ধনুৰ্দ্ধর, তাহার গান্তীবের বেগ অতি ভয়ঙ্কর এবং সমস্ত অস্ত্ৰও দিব্য অস্ত্ৰ; এক্ষণে কাহার সাধ্য ইহাদিগের দুর্ব্বিষহ তেজ সহ্য করে?” অনন্তর শকুনি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া দুৰ্য্যোধন ও কর্ণকে নির্জ্জনে আনয়নপূর্ব্বক সমস্ত নিবেদন করিল। তখন হীনমতি দুৰ্য্যোধন তাহা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত দুঃখিত হইল।