রিস্তেদারের কাঁটা – ৯

নয়

– তুমি কি সত্যিই তাই বিশ্বাস কর?

– কী?

– শ্রীসেনের খুন হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে? আর টুকুর হেপাজতে পাওয়া যাবে ঐরকম একটা উইল?

কথা হচ্ছিল রাত্রে ডিনার টেবিলে। কৌশিক আর সুজাতা এখনো ফেরেনি। টেলিফোন করে জানিয়েছে ওদের ফিরতে রাত হতে পারে। তাইী নিয়মমতো ঠিক সাড়ে আটটায় কম্বাইন্ড-হ্যান্ড শ্রীমান বিশে ওঁদের দুজনের নৈশাহার টেবিলে সাজ্যিরে দিয়েছে। এক-পায়ে-খাড়া দাঁড়িয়ে আছে প্যান্ট্রির দোরের কাছে। বাসু-সাহেব আজ হাত দিয়ে খাচ্ছেন। রাতে প্রায়ই কাঁটা-চামচ ব্যবহার করেন না। রাতে ওঁদের ভাত রান্না করা হয় না, হাতে-গড়া রুটি। ছুরি-কাঁটায় তাতে জুৎ হয় না।

বাসু-সাহেব দু-হাতে রুটিটাকে জরাসন্ধ-বধ করতে করতে বললেন, আমি দৈবজ্ঞ নই, রানু। তবে ঐ জাতের আশঙ্কা আছে বই কি। আর বাস্তবে যদি তা ঘটে যায়, তবে বার-অ্যাসোসিয়েশনে সবাই দারুণ খুশি হবে। কারণ তোমার কর্তার আনব্রোকন-রেকর্ডটার গঙ্গালাভ ঘটবে!

– কেন? – বিস্তারিত জানতে চাইলেন রানী।

বাসু-সাহেব তাঁর অভ্যস্ত কায়দায় বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিলেন:

বড়িশা-বেহালার স্যানিটেরিয়াম থেকে সত্যানন্দ সেনকে অপহরণ যে স্মরণিকা ছাড়া আর কেউ করতে পারে না এটা পুলিসে সহজেই প্রমাণ করবে। প্রথম দিন যখন বাসু-সাহেব ঐ স্যানিটেরিয়ামের নোটিস-বোর্ডে কর্মখালির বিজ্ঞাপনটা পড়ছিলেন তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানো টুকুও তা নিশ্চয় পড়েছে। নিত্যানন্দ রথ আর তাঁর দারোয়ান ছাড়াও ঐ প্রতিষ্ঠানের অনেকে সনাক্ত করতে পারবে যে, স্মরণিকাই কল্যাণী দাসী সেজে চাকরিটা নিয়েছিল। আর পরদিন থেকেই সে নিরুদ্দেশ। ঠিক যে সময় বৃদ্ধ সত্যানন্দও নিরুদ্দেশ হয়েছেন। হয়তো সিংজীর গ্যারেজ থেকে ডেলিভারী নেওয়া অ্যাম্বাসাডারে পাওয়া যাবে ওঁদের দুজনের টিপছাপ – ঐ বৃদ্ধের এবং স্মরণিকার। আর সেটাই কনক্লুসিভ প্রুফ!

– কেন? কনক্লুসিভ প্রুফ কেন?

– যেহেতু গাড়িটা রিপেয়ার করার পর স্প্রে-পেন্টিং করা হয়েছে। সে-কাজ যখন সম্পন্ন হয় তখন মিস্টার সেন হয় ছিলেন তাঁর বাড়িতে রোগশয্যায় অথবা স্যানিটেরিয়ামে। ফলে তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ঐ গাড়িতে পড়তে পারে না, যদি না ঐ গাড়িতেই স্মরণিকা তাঁকে অপসারিত করে থাকে। তাই নয়?

রানীদেবী যুক্তিটা মেনে নিতে বাধ্য হলেন।

– দ্বিতীয়ত লক্ষ্য করে দেখ, স্মরণিকার চরিত্রে একটা দারুণ কন্ট্রাডিকশন – অপ্রত্যাশিত বৈপরীত্য। মেয়েটির প্রকৃত স্বরূপ আদৌ বোঝা যাচ্ছে না। প্রথম সাক্ষাতে মনে হয়েছিল সে সরলা সংসার-অনভিজ্ঞা। কিন্তু পরে নানান ঘটনার দেখা যাচ্ছে ঐ ‘অবলা কামিনী রে’ একটা ভেক মাত্র। মেয়েটির বুদ্ধি ক্ষুরধার, উদ্ভাবনী প্রতিভাও যথেষ্ট। আমার চোখেও ধুলো দিয়ে চুপিসাড়ে তার জেঠুকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। আরও একটা আশঙ্কার কথা, চৌবে আর বিলাসসিং-এর শিরে সংক্রান্তি। প্রচণ্ড একটা বিপদেরসম্মুখীন হয়েছে তারা। ডাক্তার দাশগুপ্ত যদি সেনকে পরীক্ষা করবার সুযোগ পান তাহলে শতকরা শতভাগ সম্ভাবনা: প্রমাণিত হবে ওরা দুজন একটা ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি করেছিল – অভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্র। একটি সুস্থ সবল বৃদ্ধকে পাগল প্রতিপন্ন করে তার সম্পত্তি গ্রাসের চেষ্টা। ঐ সঙ্গে নিত্যানন্দ রথ এবং তার চ্যালা-চামুণ্ডার দলও ধরা পড়ে যাবে। এরা সবাই – অন্তত আমার ধারণায় – ক্রিমিনাল টাইপের। ফলে এদের মধ্যে যে কেউ অথবা যে কোন দু’তিনজন যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করে বৃদ্ধকে খুন করে ফেলতে চাইবে। যদি অবশ্য আমি বা পুলিসের আগে তারা বৃদ্ধের সন্ধান পায়। এবং তারা খুনটা এমন কায়দায় করতে চাইবে যাতে সন্দেহটা বর্তায় স্মরণিকার উপর। তাহলে এক ঢিলে তিন-তিনটে পাখি! এক নম্বর: ওদের ক্রিমিনাল কন্সপিরেসিটা আর প্রমাণ করা যাবে না। দু-নম্বর: সত্যানন্দ সেনের সম্পত্তি চৌবেতে বর্তাবে…

– কিন্তু মিস্টার সেন যদি মুক্তি পাবার পর স্বহস্ত-লিখিত একটি উইল তৈরী করে তাঁর সব কিছু টুকুকে দিয়ে যান?

– সেটাই হবে তিন নম্বর পাখি! সেক্ষেত্রে ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচালেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডর হাত থেকে মক্কেলকে বাঁচাতে পারব না। উইলটা কিছুতেই কার্যকরী করা যাবে না, যদি সত্যানন্দ সেন খুন হয়ে যান। প্রথমত, তিনি যে সুস্থ-মস্তিষ্কের এটা প্রমাণিত হয়নি; দ্বিতীয়ত উইলের বেনিফিশিয়ারি যাবজ্জীবন জেল খাটছে। ঐ উইলটাই হবে টুকুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ! খুন করার মোটিভ!

রানী বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি ক্রমাগত আ-ডাক কু-ডাক ডাকছ!

– সেটাই যে আমার স্বভাব রানু। জাজ ভাদুড়ীও ঐ অভিযোগ করেছিলেন– জানতে চেয়েছিলেন, কেন আমি তাঁর মতো খুশিয়াল হয়ে উঠতে পারছি না।

ঠিক তখনই একটা গাড়ি এসে থামল বাইরের গেট-এ।

বিশে বললে, ওঁয়ারা এসে পড়লেন, মনে লাগে!

বাসু বললেন, কারেক্ট! আমারও তাই ‘মনে লাগে’। তুই বরং ‘ওয়াদের’ জন্যে আর দুটো প্লেট দিয়ে যা।

একটু পরেই ডাইনিং হলে এল ওরা দুজন। বেসিনে হাত ধুয়ে বসে গেল ডাইনিং টেবিলে। বিশে তার আগেই প্লেট সাজিয়ে দিয়েছে।

বাসু জানতে চাইলেন, গাড়িটা এল কোত্থেকে? কিনলে নাকি?

– আজ্ঞে না। ‘রেন্ট-আ-কার সার্ভিস’-এর। জবাব দিল কৌশিক, প্লেটে খাবার তুলে নেবার অবকাশে।

– চালায় কে? বেটার-হাফ না ওয়ার্স-হার্ফ?

কৌশিকের চট্-জলদি জবাব, দুজনেই। এ যুগের দাম্পত্য-জীবনে ডিভিশন অব্ লেবার নেই।

– জানি। এ যুগে সন্তান হবার সময় ‘লেবার-পেইন’-এর আধাআধি কর্তা সহ্য করে। তাহলে সুজাতা কলকাতার রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারে আজকাল?

– ভিড়ের রাস্তা হলে আমিই স্টিয়ারিঙে বসি। টানা ফাঁকা রাস্তা হলে ও।

– সুজাতা বুঝি এখনো গুরুমারা-চেলা হয়ে উঠতে পারেনি?

এটা ঠেশ দিয়ে বলা কথা। প্রাকবিবাহ-জীবনে সুজাতা কৌশকের কাছেই ড্রাইভিং শিখেছিল। সেই অতীত বার্তার একটা তির্যক ইঙ্গিত।

সুজাতা বললে, আজ মামুর সব কথাই বাঁকা-বাঁকা ঠেকছে। হলটা কী? মেজাজ শরিফ নয়?

রানী বললেন, ক্লায়েন্ট যখন কাউন্সেলারের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যায়, তখন কি মেজাজ ঠিক থাকে?

বাসু সে প্রসঙ্গটা চাপা দিয়ে প্রশ্ন করেন, তা ‘রেন্ট-আ-কার’-এর খরচটা মেটায় কে?

কৌশিকের সপ্রতিভ জবাব: আপনি!

অর্থাৎ বাসু-সাহেব যে কমিশন দেবেন তা থেকেই ‘সুকৌশলী’ ভাড়া মেটাবে।

বাসু বলেন, অ! তার মানে গাড়িটা তোমাদের প্রমোদভ্রমণের জন্য নয়? তা কী কী খবর ইতিমধ্যে সংগৃহীত হল, একটু নমুনা শুনি?

কৌশিক সবিস্তারে তা দাখিল করে। বাসু-সাহেবকে স্বীকার করতে হল এতটা সাফল্য তিনি নিজেও প্রত্যাশা করেননি।

কৌশিক অল্প কদিনের ভিতর ধানবাদ থেকে জেনে এসেছি চৌবে আর বিলাসসিং যাদব আদৌ বন্ধু নয়। যদিও তারা একসঙ্গে একই গাড়িতে – না, ট্রেনে নয়, মটোরগাড়িতে – ধানবাদ থেকে এসেছে। গাড়িটা ধনঞ্জয় চৌবের –স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড। বিলাস ছিল এক ইউনিয়ানের পাণ্ডা। ইলেকশন, পার্টিবাজি আর রাজনীতি করে বেড়াতো। আর চৌবে ছিল একটি কারখানার দক্ষ ফিটার-প্লাম্বার। কী অপরাধে তার চাকরি যায়। শ্রমিক ইউনিয়ন চৌবের কেসটা নিয়ে লড়েনি। কারণ ধনঞ্জয় চৌবেকে শ্রমিক ইউনিয়ন সুনজরে দেখতো না। তারও কারণ: বেমক্কা কিছু ক্যাশ টাকা খোয়া যায়। কারখানার নয়, ইউনিয়নের টাকা এবং রাজনৈতিক দলের টাকা-সবটাই কালো টাকা, সাদা নয়। অধিকাংশের ধারণা, যে-সময় তহবিল তছরুপ হয়, তখন ধনঞ্জয় ছিল ইউনিয়নের এক পাণ্ডা। কিন্তু সে ধরা-ছোঁওয়ার মধ্যে নেই।কী ভাবে আশি হাজার টাকার ঘাটতি হল এটা কিছুতেই বোঝা গেল না। ঐ সময়েই চৌবে সেকেন্ড-হ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড গাড়িটা কেনায় সন্দেহটা তার উপরে বর্তায়। নাহলে চাকরি খুইয়ে সে গাড়িটা কিনবে কেন? তবে অনেকের ধারণা, টাকাটা যে কে, কী ভাবে হাতিয়েছে তা বিলাসসিং যাদব জানে। তার হেপাজতে নাকি কিছু অকাট্য এভিডেন্সও আছে। শ্রমিক ইউনিয়ন থানা-পুলিশ করেনি। কালোটাকা গচ্চা গেলে চোরের-মায়ের কান্না ছাড়া উপায়ই বা কী। ক্রমশ ধানবাদে চৌবের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে উঠছিল। বৈমাত্রেয় দাদার জনডিস্ হয়েছে শুনে সে হাতে স্বর্গ পেল। চাটি-বাটি গুটিয়ে সস্ত্রীক চলে এল কলকাতায়; কিন্তু ছিনে-জোঁকটিকে তাড়াতে পারল না। বিলাসসিং আঠার মতো সেঁটে থাকল। ধানবাদ থেকে অনেকটা রাস্তা ড্রাইভ করতে হবে, তাই ধনঞ্জয় ওকে প্রায় বাধ্য হয়ে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় এসেছে! তারপর থেকে দেখা যাচ্ছে বিলাসসিং মহানন্দে চৌবের অ্যাকাউন্টে খায়-দায় মদ্যপান করে। খোদায় মালুম: নগদ ব্ল্যাকমেইলিং করে কিনা।

কলকাতায় এসে ধনঞ্জয় এক নূতন সুযোগের সন্ধান পেল। স্মরণিকা যে সেন-পরিবারভুক্ত নয় এটা জানা ছিল। ওরা স্বামী-স্ত্রী একটা নতুন পরিকল্পনা করল। উদ্যোগী হয়ে স্মরণিকাকে পাঠিয়ে দিল বিলেতে। চৌবে কলকাতায় এসেছিল এই বিশ্বাসে যে, তার মতো দক্ষ মিস্ত্রি একটা কাজ নিশ্চয় জুটিয়ে নিতে পারবে। এখন দেখল, মাঝে-মাঝে ঠ্যাঙের উপর তোলা ডান ঠ্যাঙটা বদলে বাঁ ঠ্যাঙ করা ছাড়া বাকি জীবনে তাকে আর কোন কাজ করতে হবে না।

অবশ্য এ-সবই শোনা কথা। গুজব। কৌশিকের চাক্ষুষ যেটুকু তা এই–

আজ ভোরবেলা সে ধানবাদ থেকে ফিরেছে। নিউ আলিপুরে পৌঁছে শুনল মামু আর সুজাতা আদালতে বেরিয়ে গেছেন। ও ‘রেন্ট-আ-কার সার্ভিস’-এর একটা গাড়ি ভাড়া করে-এটা সে প্রায়ই নেয়-সোজা চলে আসে আদালতের দিকে। কথা ছিল আদালত বসার আগেই সে বাসু-সাহেবকে ধানবাদে সংগৃহীত তথ্যগুলি পেশ করবে। কিন্তু সেটা সম্ভবপর হল না। আদালত-প্রাসাদের প্রায় একশ মিটার দূরে এমন একটা ঘটনা ঘটল যাতে ওর সমস্ত কর্মসূচী বদলে গেল।

কৌশিকের নজরে পড়ল, ট্রামরাস্তার ধারে একটা ফাঁকা জায়গায় একখানা ঝক্কঝকে অ্যাম্বাসাডার পার্ক করা আছে। ঝক্ককে বলতে– সদ্য স্প্রে পেন্টিং করা। গাড়িতে দ্বিতীয় যাত্রী নেই। ড্রাইভারের সীট থেকে নেমে দাঁড়াচ্ছে স্মরণিকা।

কৌশিকের পক্ষে অবাক হওয়া স্বাভাবিক। মাত্র দিন কয়েক আগে অর্থাৎ ধানবাদ রওনা হওয়ার পূর্বে সে জেনে গেছে স্মরণিকা কপর্দকহীনা। ট্যাক্সির ভাড়া মেটানোর মতো আর্থিক সংস্থানও তখন তার ছিল না। সেই অবস্থায় মামুর নির্দেশে সে মেয়েটিকে তার বান্ধবীর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে। পরদিন ভোরের ট্রেনে সে ধানবাদ চলে যায়। ফলে বাসু-সাহেব কী কায়দায় সওয়া লক্ষ টাকার চেকটা ভাঙাতে সক্ষম হন তা ও জানতো না। তাই অমন একখানা গাড়ি থেকে স্মরণিকাকে নামতে দেখে কৌশিকের অবাক হওয়া স্বাভাবিক। তবে নাকি কোন কিছুতেই গোয়েন্দাদের অবাক হতে নেই, তাই কৌশিকও কিছুমাত্র বিচলিত হল না। কিছু দূরে গাড়িটা পার্ক করে লক্ষ্য করতে থাকে। দেখে, ঐখানে গাড়ি থেকে নেমে স্মরণিকা দ্রুতপদে আদালতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ধীর গতিতে ড্রাইভ করে কৌশিকও তার পিছন-পিছন চলতে থাকে। আদালতের সামনে পার্কিং জোনে গাড়ি রেখে নামতেই সুজাতা এগিয়ে আসে। সে দূর থেকে কৌশিককে দেখতে পেয়েছিল। সুজাতাই সংক্ষেপে সব খবর ওকে জানায়। এক নম্বর: সওয়া লক্ষ টাকার চেক ভাঙানোর কথা। দু নম্বর: সেন মশায়ের আজব অন্তর্ধান। তিন নম্বর: স্মরণিকা রিপেয়ার-গ্যারেজ থেকে সেন মশায়ের একটি অ্যাম্বাসাডার গাড়ি ডেলিভারি নিয়েছে। এবং চার নম্বর বাসু-সাহেবের সন্দেহ, বড়িশা: বেহালার স্যানিটেরিয়াম থেকে সেন-মশায়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে অজ্ঞাতকুলশীলা কল্যাণী দাসীর যোগাযোগ আছে।

কৌশিক তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে, বাস্তবে কী ঘটেছে! এটাকে তোমরা গুরুমারা-চেলার কেরামতি বলতে পার না। একথা ঠিক, বাসু-সাহেব এ পর্যায়ে তা আন্দাজ, করতে পারেননি। কিন্তু কৌশিক দু-দুটো বাড়তি ক্লু পেয়েছিল। স্মরণিকা ঐ অ্যাম্বাসাডার চড়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত সে ড্রাইভিং জানে।

মোটকথা, কৌশিক বুঝতে পারে, স্মরণিকাই বৃদ্ধ সত্যানন্দ সেনকে ঐ ‘শান্তিধাম’ থেকে সরিয়ে ফেলেছে। এবং ঐ গাড়ি করে তাঁকে কোনও নিরাপদ স্থানেনামিয়ে দিয়ে এখন আদালতে এসেছে কেসটা শুনতে। তা যদি হয়, তাহলে মেয়েটির গতিবিধির ওপর হয়তো পুলিশে নজর রেখেছে। তখনো না হলেও অনতিবিলম্বে পুলিশ ঐ মেয়েটিকে পাকড়াও করবে। তাই সে আদালত-সংলগ্ন একটি পাবলিক বুথ থেকে মামুকে ফোন করে। তাঁকে অনুরোধ করে টুকুকে ছেড়ে দিতে।

বাসু-সাহেব ইতিমধ্যে হাত ধুয়ে ন্যাপকিনে মুছে নিয়েছেন। পাশপকেট থেকে পাইপ-পাউচ বার করতে করতে বলেন, গুড-ওয়ার্ক! ‘রেন্ট-আ-কার’-এর এক্সপেন্সেস্ স্যাংশনড।

– না, মামু, আমি তো রঙের টেক্কাখানা এখনো নামাইনি!

– তাই নাকি! রঙের টেক্কার পিঠ এখনো তোলনি?

– না। আজ সন্ধ্যার রিপোর্টটা শুনুন। কেন এত রাত হল ফিরতে।

পাইপটা ধরাতে ধরাতে বাসু বলেন, শোনাও।

আদালতে বাসু-সাহেব যখন কৌশিকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন, তখনই স্মরণিকা সরে পড়ে। নিঃশব্দে আদালত-প্রাঙ্গণ ছেড়ে বার হয়ে যায়। কৌশিকের মিনিটতিনেক দেরি হয়ে যায় টেলিফোনে কথা শেষ করতে। লাইন কেটে দিয়ে আদালতের বাইরে এসে দেখে সুজাতা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে কৌশিক ট্রামরাস্তার ধারে পার্ক করা গাড়িটার দিকে এগিয়ে যায়। ঐ শতখানেক মিটার হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠতে স্মরণিকার যেটুকু সময় লাগল তার আগেই কৌশিক সেখানে পৌঁছে যায়। বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ওকে ফলো করতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। বহু দূর থেকেও নতুন রঙ করা গাড়িটাকে চেনা যাচ্ছিল।

স্মরণিকা চিড়িয়াখানার দিকে মোড় নেয়। মাঝেরহাট ফ্লাইওভার পার হয়ে বেহালার দিকে চলতে থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। ও এখন আছে গীতা করের বাড়িতে। যদু কলোনিতে। কিন্তু ম্যান্টন রোডের মোড়ে সেবাঁয়ে বাঁক নিল না। ডায়মন্ড-হারবারের দিকেই চলতে থাকে। ও কিবড়িশা-বেহালায় যাচ্ছে? শান্তিধামে? কেন? না, তাও না! সে রাস্তাটাও পার হয়ে ও আরও উজানে চলতে থাকে। দক্ষিণে। আরও মাইল আট-দশ এগিয়ে অ্যাম্বাসাড়ার গাড়িটা বাঁদিকে মোড় নিল। এখানে একটা নতুন কারখানা কমপ্লেক্স গড়ে উঠছে। বেশ জমকালো ব্যাপার। জি. জি. সি. এল। অর্থাৎ গ্লোবাল গ্যাস অ্যান্ড কেমিকাল্স লিমিটেড। কারখানা, স্টাফ কোয়াটার্স, বেশ কিছু দোকানপাটও। চওড়া পিচের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে বাতি। লোডশেডিং হলেও সেবাতি নেবে না। কারণ তা বিজলি-বাতি আদৌ নয়, গ্যাস-বাতি। কারখানায় প্রস্তুত গ্যাসে জ্বলে। যেমন জ্বলত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে শহর কলকাতাতেও – এসপ্লানেড, রেড রোড আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছেপিঠে।

সামনের গাড়িটা একটা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সের সামনে দাঁড়ালো। টুকু নেমে এল। কৌশিক প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে গাড়িটা পার্ক করল। টুকু কী সব বাজার করে একটা বড় ব্যাগ হতে বের হয়ে এল প্রায় আধঘণ্টা পরে। স্টার্ট দিলে গাড়িতে। এখানে ডায়মন্ড-হারবার রোডের মতো গাড়ির ভিড় নেই। কৌশিক দূরত্বটা বাড়িয়ে দিল। টুকু দু-একটা বাঁক ঘুরে এসে থামল একটা মোটেলের সামনে। এখানে যে একটা মোটেল গড়ে উঠছে তা জানাই ছিল না কৌশিক অথবা সুজাতার।

রানু জানতে চান: ‘মোটেল’ কী?

বাসু শাঙ্কর-ভাষ্য দাখিল করেন: মোটরিস্টদের হোটেল। ইয়োরোপে, আমেরিকা বা জাপানের সর্বত্র তা পথের দুধারে ছড়ানো। নিচে গ্যারেজ, উপরে শয়নের ব্যবস্থা। সচরাচর এক-কামরা য়ুনিট, সিঙ্গল অথবা ডব্ল-বেড। সংলগ্ন টয়লেট আবশ্যিক। রান্না বা খাওয়া-দাওয়ার জন্য গ্যাস বা ইলেকট্রিক স্টোভ, ফ্রিজ, হট-কেস কোথাও থাকে, কোথাও নয়।

কৌশিক জানায়, এখানে ঐ মোটেলে রান্না-খাওয়ার ব্যবস্থা বোধহয় নেই। অবশ্য তাতে অসুবিধাও কিছু নেই। মোটেলের বিপরীতেই একটা রেস্তোরাঁ আর ‘বার’।

স্মরণিকা মোটেলের সামনে গাড়িটা পার্ক করল। তিন-নম্বর গ্যারেজটা খুলে গাড়িটাকে ঢুকিয়ে দিল। তারপর গাড়ি লক্করে বেরিয়ে এল। বাজার করা ব্যাগটা হাতে নিয়ে নয় কিন্তু। গ্যারেজের তালা খোলাই রইল। এবার ও এগিয়ে গেল রেস্তোরাঁর দিকে। তার দুটি অংশ। পাশাপাশি নিয়নবাতির সাইনবোর্ডে: ‘চাইনীজ ফুড’ আর ‘তন্দুরী অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ফুড’।

টুকু প্রথমটিতে ঢুকল। প্রায় দশ মিনিট পরে যখন বার হয়ে তখন তার হাতের কার্টন-প্যাকেটে ফিতে বাঁধা চাইনীজ ফুড। এগিয়ে এল গাড়ির কাছে। নামিয়ে নিল বাজারের থলিটা। এক হাতে ঐ ব্যাগ অপর হাতে খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে দিব্যি খোশমেজাজে হিন্দি পপ মিউজিক গাইতে গাইতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল দ্বিতলে। বেশ বোঝা যায়, তার গতিবিধির উপর কেউ নজর রাখতে পারে এটা তার মনেই আসেনি।

সুজাতা ড্যাশ-বোর্ড-এর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে। রাত সাড়ে আটটা। কৌশিককে বলে, ও এখানেই রাতটা কাটাবে মনে হচ্ছে। হয়তো দুখানা ঘর নিয়েছে। অথঝ ডব্লড রুমে জেঠুর সঙ্গে।

কৌশিক বলে, সেক্ষেত্রে ও গ্যারেজ বন্ধ করে উপরে উঠত না কি?

– নাও হতে পারে। সচরাচর রোলিং-শাটারগুলো সহজে নামতে চায় না। হয়তো এদের অ্যাটেন্ডেন্ট গ্যারেজ বন্ধ করে দেবে এটাই ও প্রত্যাশা করছে। ও রাতে কোথায় থাকল সে খবরে আমাদের কী আগ্রহ? আমরা মোটমাট জানতে চাই, সত্যানন্দ সেন কোথায় আছেন। তা যখন জানা হয়ে গেছে তখন তড়িঘড়ি ফিরে চল।

কৌশিক বুঝতে পারে। সত্যিই আর কিছু করণীয় নেই। ওরা ফিরে আসে।

বাসু বলেন, জায়গাটা নিউ আলিপুর থেকে কত মাইল দূরে

– তা ধরুন মাইল পনের-কুড়ি।

– এত রাতে ফাঁকা রাস্তায় কুড়ি মাইল পথ আসতে তোমাদের পৌনে দু-ঘণ্টা লাগল? কে চালাচ্ছিল? বেটার-হাফ না ওয়ার্স?

কৌশিক কৈফিয়ৎ দেয়, ফেরার পথে তারাতলা রোডের কাছাকাছি একটা চাকা পাংচার হয়ে গেল যে!

– অ! তাহলে এক কাজ কব্র। এখন রাত দশটা চল্লিশ। টুকুর যদু কলোনির ফ্ল্যাটে ফোন কর তো একবার। আমি জানতে চাই, রাতটা টুকু কোথায় কাটাচ্ছে।

সুজাতার খাওয়া শেষ হয়েছিল। উঠে গিয়ে ফোন করল। একবার মাত্র রিঙিং টোন হতেই ও-প্রান্তে কেউ রিসিভারটা তুলে বললে, হ্যালো?

নিঃশব্দে সুজাতা এ-প্রান্তের যন্ত্রটা হস্তান্তরিত করল। বাসু বললেন, কে? গীতা?

– আজ্ঞে না, মেসোমশাই। আমি টুকু।

– বটে! আমার কণ্ঠস্বর শুনেই চিনতে পারলে?

– না তো! কণ্ঠস্বর শুনে নয়। আমি যে সারাটা দিন আপনার টেলিফোনের প্রত্যাশায় আছি!

– সারাটা দিন! মানে?

– আয়াম রীয়ালি সরি, মেসোমশাই। আদালতে আপনি বলে গেলেন চুপটি করে বসে থাকতে। অথচ ঠিক তখনি আমার মনে পড়ল, গাড়িটা বে-জায়গায় পার্ক করে এসেছি। একজনের গ্যারেজের সামনে। সে ভদ্রলোক যদি গাড়ি বার করতে বা ঢোকাতে চান তা হলে পারবেন না। তাই আপনাকে না জানিয়েই…মানে, আমি কী বলব? রীয়ালি ভেরি ভেরি সরি।

– আদালত থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছিলে?

– কোথায় আবার? এখানেই সোজা ফিরে এলাম।

– রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ ফোন করলাম, কেউ তো ধরল না?

– সাড়ে সাতটায় তো? তা তো হবেই। গীতা নেই। দিল্লী গেছে। তাই আমি রান্নাবান্নার মধ্যে যাইনি। সামনের হোটেলে খেতে গেলাম।

– কী খেলে? চাইনীজ ফুড?

– আজ্ঞে? মনে হল ও-প্রান্ত এ-প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে গেছে।

– টেলিফোনে সয়াসস্আর ভিনিগার-এর গন্ধ এখনো পাওয়া যাচ্ছে কিনা, তাই জিজ্ঞাসা করছি: কী খেলে রাতে? চাও মিঙ্, চিলি-চিকেন, ফ্রায়েড প্রন জাতীয় কিছু?

– দারুণ গেস্ করেছেন তো! আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই খেয়েছি।

– শোন। কাল সকাল আটটায় আমি তোমার ওখানে যাব। তার আগে কোথাও বেরিও না। নাকি ভোরবেলা কারও সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে?

– কী যে বলেন, মেসোমশাই! আমি কি আপনার মতো ‘বিজি’? তা আপনি কেন কষ্ট করে এখানে আসবেন? আমিই আপনার বাড়িতে যেতে পারি। দশটা নাগাদ গ্রীন্ডলেজ ব্যাঙ্কে একবার যেতে হবে।

– দশটা নাগাদ যে-কোন চুলোয় যেও। সকাল আটটায় তোমাকে যেন যদু কলোনির ফ্ল্যাটে পাই। ও.কে.?

– ঠিক আছে, ঠিক আছে। তাই হবে। এত রাগ করছেন কেন?