সাত
পরদিন। শনিবার। বাইশে জুন, সূর্যোদয়ের পূর্বেই প্রতিদিনের মতো বাসু-সাহেব প্রাতঃভ্রমণে গিয়েছিলেন। সচরাচর উনি মর্নিং-ওয়াক সেরে ফিরে এলে সবাই জমায়েত হয় প্রাতরাশের টেবিলে। আজও ফিরে এসে দেখলেন বাড়িশুদ্ধ ডাইনিং-টেবিলে উপস্থিত। কিন্তু কেউই মুখ তুলে তাকাল না। সবাই হুমড়ি খেয়ে ইংরেজি-বাংলা খবরের কাগজগুলো ভাগাভাগি করে পড়ছে। বাসু বলেন, কী ব্যাপার? কাগজে জব্বর খবর কিছু ছাপা হয়েছে মনে হচ্ছে?
রানু মুখ তুলে তাকালেন। বলেন, হ্যাঁ, কাল মাঝ রাতে কমল খুন হয়ে গেছে!
– কে? কমল? মানে…
– হ্যাঁ তাই। ছন্দার প্রথম পক্ষের স্বামী।
বাসু ধীরে ধীরে বসে পড়েন একখানা চেয়ারে। অস্ফুটে বলেন, এমন একটা আশঙ্কা অবশ্য ছিলই…কিন্তু এত তাড়াতাড়িই যে…
অন্যমনস্কভাবে হাতটা পকেটে চলে যায় পাইপ-পাউচের সন্ধানে।
সচরাচর প্রাতরাশান্তে কফির কাপে চুমুক দেবার আগে উনি পাইপ ধরান না। আজ তার ব্যতিক্রম হল।
ভিতরের দরজা দিয়ে বিশে উঁকি মারল। রানু আর সুজাতার মাঝে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে ছুঁড়ে দিল তার প্রশ্নটা: টেবিল লাগার? টোস্ট হয়ে গেছে।
সুজাতা বলল, একটু পরে।
– না, একটু পরে কেন? লাগা! – বললেন বাসু। সুজাতার দিকে ফিরে বললেন, কমলেশ, কমলাক্ষ, কমলেন্দু-নাম যাই হোক, হতভাগাটা তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে গেছে। আর তার অভাবে দুনিয়ায় কেউ এখন কাঁদছে বলেও তো মনে হচ্ছে না। অহেতুক গরম টোস্ট ঠাণ্ডা করব কেন? দাও কাগজটা দাও –
প্রথম পাতায় নিচের দিকে খবরটা ফলাও করে লেখা হয়েছে: ‘রাতের অতিথির ডান্ডায় সমাজবিরোধী ঠাণ্ডা’।
“তারাতলার অসমাপ্ত প্রাসাদ মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্ট-এর মেজানাইন ফ্লোরে গতকাল মধ্য রাতে এক নৃশংস নাটক সংঘটিত হয়ে যায়, যার ফলে প্রকাণ্ড প্রাসাদের একমাত্র বাসিন্দা কমলেশ বিশ্বাস নিজ গৃহে খুন হয়েছেন। কর্পোরেশন আপত্তি করায় আদালতের আদেশে এই বহুতল-বিশিষ্ট প্রাসাদটি দীর্ঘদিন অসমাপ্ত হয়ে পড়ে ছিল। কমলেশবাবু ছিলেন সেই নির্জন প্রাসাদ-কঙ্কালের রক্ষক। তার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়েছে তাঁরই ঘরে। পুলিশ মৃতদেহ শনাক্ত করেছে। কমলেশ একজন বিবাহ-বিশারদ সমাজবিরোধী। বস্তুত সে চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র মসিয়ে ভার্দুর প্রেরণায় তার জীবিকা বেছে নিয়েছিল কি না বলা কঠিন; তবে তার উপার্জনের কাঠামোটা ছিল প্রায় একই রকম। কমলেশ বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন পরিচয়ে একাধিক বিবাহ করেছে। কখনো কুমারী, কখনো বিধবা, কিন্তু তারা একেবারে নিঃস্ব নয়। দু-একটি বধূহত্যার দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু প্রমাণাভাবে মুক্তিও পেয়েছে। দু-চারটি ক্ষেত্রে নবপরিণীতা বধূর অলঙ্কার ও নগদ অর্থ আত্মসাৎ করে উধাও হয়েছে। ফলে প্রত্যাশিত ভাবেই কমলেশবাবুর শত্রু সংখ্যা যথেষ্ট। পুলিশের অনুমান তাদেরই ভিতর কেউ এসে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে গেছে।
রাত প্রায় একটা সাতাশ মিনিট স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে একটি টেলিফোন আসে। থানা থেকে রেডিও মেসেজে ভ্রাম্যমাণ একটি পুলিস-পেট্রল-কারকে তৎক্ষণাৎ জানানো হয়। অকুস্থলে উপনীত হতে পুলিশ আন্দাজ সাত মিনিট সময় নেয়। সদর দরজা বন্ধ ছিল, যদিও নিহতের মেজানাইন-ফ্লোরের দরজাছিল খোলা।ভুলুষ্ঠিত কমলেশ তখন জীবিত, কিন্তু জ্ঞানহীন। আহতের ঘরে গাদা করে রাখা ছিল গৃহ-নির্মাণের নানান সাজ সরঞ্জাম। তার ভিতর একটি পৌনে এক মিটার দীর্ঘ গ্যালভানাইজড্ লোহার বিশ মি.মি. ব্যাসের পাইপ পড়ে ছিল আহত ব্যক্তির পাশেই। তাতে রক্তের দাগ। পুলিশ প্রায় নিঃসন্দেহ– সেটাই অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত।আততায়ী আচমকা সেটাই তুলে নিয়ে গৃহস্বামীর মাথায় সজোরে বসিয়ে দিয়েছিল।
অত্যন্ত আশ্চর্যের কথা, নিহত ব্যক্তির হিপ্-পকেটে ছিল একটি লোডেড রিভলভার। যে কোনো কারণেই হোক কমলেশ সেটা পকেট থেকে বার করার সুযোগ পায়নি। অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পথে কমলেশ মারা যায়। [এরপর পাঁচের পাতায়]।”
বাসু পাতা উলটে পঞ্চম পৃষ্ঠায় উপনীত হলেন। সেখানে নিজস্ব সংবাদদাতার সরেজমিন-তদন্তের কিছু তথ্য। মধ্যরাত্রে পুলিশের উপস্থিতিতে সংবাদদাতা অকুস্থলে উপনীত হয়ে কয়েকটি বিচিত্র সংবাদ সংগ্রহ করেন! প্রথম কথা, পুলিশকে টেলিফোনটা করেছিলেন প্রতিবেশী বটুকনাথ মণ্ডল। মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টের পাশেই, বিশ ফুট গলি-পথের ও-প্রান্তে একটি ত্রিতল বাড়ির মেজানাইন-ফ্লোরে সস্ত্রীক বাস করেন বটুকনাথ। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন যে, মাঝ রাত্রে টেলিফোন বাজার শব্দে ওঁর ঘুম ভেঙে যায়। দেখেন, তাঁর স্ত্রীর নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে পূর্বেই। ওঁরা বুঝতে পারেন, টেলিফোন বাজছে ঠিক পাশের বাড়ির মেজানাইন-ফ্লোরে। অর্থাৎ ওঁদের শয়নকক্ষ থেকে সাত-আট মিটার তফাতে। ভ্যাপ্সা গরম ছিল। দু-বাড়ির রুজু-রুজু জানলা খোলাই ছিল। ওঁদের জানলায় পর্দা আছে, সামনের বাড়িতে পর্দার বালাই নেই। ওঁরা দেখতে পেলেন প্রতিবেশী কমলেশ-বাবু রিসিভার থেকে টেলিফোনটা উঠিয়ে কথাবার্তা শুরু করলেন। তখন রাত কত তা ওঁরা বলতে পারেন না। কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল না, তবে দু জনের মনে হয় কমলেশ টেলিফোনে বলেছিলেন, ‘বলছি তো, টাকাটা আমি এক সপ্তাহের মধ্যে মিটিয়ে দেব! ..কী? চন্দ্রা কাল সকালেই দু-হাজার দেবে.., এই কথাগুলি বটুকের স্ত্রীও শুনেছেন, তবে তাঁর বিশ্বাস কমলেশ ‘চন্দ্রার’ কথা বলেননি, বলেছিলেন, ‘সন্ধ্যা’! সে যাই হোক, তারপর ওঁরা দু-জনেই আবার ঘুমোবার চেষ্টা করেন এবং ঘুমিয়েও পড়েন। কতক্ষণ ঝিমিয়েছেন বা ঘুমিয়েছেন তা বলতে পারবেন না, তবে হঠাৎ তন্দ্রা ভাবটা ছুটে যায় কিছু উচ্চকণ্ঠস্বরে। এবারও মনে হল শব্দটা আসছে প্রতিবেশী কমলেশবাবুর ঘর থেকে।
এই পর্যায়ে ওঁরা শুনতে পান, পাশের বাড়ির মেজানাইন ঘরে কিছু কথা কাটাকাটি হচ্ছে। তার একটি পুরুষকণ্ঠ, অন্যটি স্ত্রীলোকের।দু-জনেই জোর গলায় কথা বলছিলেন; কিন্তু কী কথোপকথন হচ্ছিল তা বোঝা যাচ্ছিল না; কারণ ঠিক একই সময়ে ওই কমলেশেরই কলবেলটা একটানা বেজে চলেছিল। অর্থাৎ সদরের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ কল-বেল-এর পুশ-বাটন টিপে ধরেছিল। সেটা একটানা বেজেই চলছিল। ওঁরা জানতেন ও বাড়িতে ওই ঘরে কমলেশ একাই থাকেন। ফলে মধ্য রাত্রে সে-ঘরে নারীকণ্ঠ শুনে প্রতিবেশী হিসাবে কৌতূহলী হয়ে পড়েন বটুকনাথ। বিছানা থেকে উঠে জানলা পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই মনে হল ও-ঘরে কী একটা শব্দ হল। কেউ আহত হয়ে অথবা ধাক্কা খেয়ে ধরাশায়ী হল। বটুকনাথ দ্রুত পদক্ষেপে জানলার কাছে সরে যান; কিন্তু উনি দূকপাত করার পূর্বেই ও ঘরের বাতিটা নিবে যায়। লোডশেডিং নয়, কারণ তখনো কল-বেলটা একটানা বেজে চলেছে। ইতিমধ্যে বটুকবাবুর স্ত্রীও এসে ঘোর অন্ধকারে জানলার ধারেদাঁড়িয়েছেন। আন্দাজ মিনিটখানেক পরে কলবেল বাজানো বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ যে লোকটা ভিতরে আসতে চাইছিল সে ওই প্রয়াসে ক্ষান্ত দেয়। তারও মিনিটতিনেক পরে দূরে বড়ো রাস্তায় একটা গাড়ির স্টার্ট নেবার শব্দ হয়। অবশ্য মিসেস্ মণ্ডলের ধারণা ওটা মোটরগাড়ি নয়, মোটরসাইকেল। তারপর সব শুনশান।
বটুক মিনিট-পাঁচেক অপেক্ষা করেন। কিন্তু পাশের বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দ জাগে না। বাতিও জ্বলে না। উনি কমলেশবাবুর নাম ধরে বার কতক ডাকাডাকি করেন। কেউ সাড়া দেয় না। বটুকনাথের একটি বড়ো পাঁচসেল এভারেডি টর্চ আছে। এবার তিনি সেটার সাহায্যে পাশের বাড়ির গবাক্ষপথে
আলোকপাত করেন। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মেঝেতে কোনো মানুষ পড়ে আছে। পুরুষমানুষ।তার একটা অনড় পা শুধু দেখা যাচ্ছিল। এবার উনি ঘড়ি দেখেন। রাত তখন ঠিক একটা পঁচিশ।বটুকনাথ তাঁর প্রতিবেশী ডাক্তার নবীন দত্তকে ঘুম থেকে টেনে তোলেন। ডাক্তার দত্ত দ্বিতলে বাস করেন। তাঁর বাড়িতে টেলিফোন আছে। ডাক্তার দত্ত নিচের মেজানাইন ঘরে এসে টর্চের আলোয় ভূশয্যালীন ব্যক্তির অনড় একটি পা দেখে মনে করেন ঘটনাটা পুলিশে জানানো উচিত। ওঁরা থানায় ফোন করেন।
অচিরেই পুলিশ অকুস্থলে পৌঁছোয়। ইন্সপেক্টার মুখার্জি ঘড়িতে তখন একটা বিয়াল্লিশ। সামনের দরজাটিতে গোদরেজের ‘ইয়েল-লক’ লাগানো। অর্থাৎ আততায়ী পালাবার সময় দরজার পাল্লাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে গেছে। তা আর বাইরে থেকে চাবি ছাড়া খোলা যাবে না।
পুলিশ বহুক্ষণ ‘কলবেল’ বাজায়। ভিতরে কোনো সাড়াশব্দ শোনা যায় না। তখন একজন পুলিশ ভারা বেয়ে দ্বিতলে উঠে গ্রিলহীন জানলার ফোকর দিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সদর দরজা খুলে দেয়। টর্চের সাহায্যে ওঁরা সিঁড়ি দিয়ে দেড়-তলার মেজানাইন-ঘরে উপনীত হন। সুইচটা খুঁজে পেয়ে বাতি জ্বেলে দেন। দেখেন, কমলেশ অজ্ঞান অবস্থায় মেজেতে পড়ে আছে। ডাক্তার দত্ত তাকে পরীক্ষা করে বলেন যে, বেঁচে আছে। আহতের ঘরে টেলিফোন ছিল। রুমাল জড়ানো-হাতে পুলিশ-সার্জেন্ট অসীম মুখার্জি তখন টেলিফোনটা তুলে নেয়, একটা আম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছোনোর পূর্বেই কমলেশ মারা যায়। তার পরে তল্লাসির সময় পুলিশ মেজেতে একটা ছোটো চামড়ার কেস-এ চাবির রিং আবিষ্কার করে। তাতে তিন-তিনটি চাবি। পুলিশের ধারণা আততায়ী মহিলা, বড়ো ঘরের মহিলা। কারণ চাবির রিঙে আছে তিনটি চাবি। একটা নবতাল তালার।বাকি দুটি মোটরগাড়ির ‘ডোর-কী’। মেক ও মডেল দেখে পুলিশের ধারণা একটি চাবি ‘মারুতি-সুজুকি’র অপরটি ‘অ্যাম্বাসাডার’-এর। তাহলে, নবতাল তালাটি সম্ভবত গ্যারেজের। নিহত কমলেশ বিশ্বাসের কোনো গাড়ি নেই। ফলে পুলিশের ধারণা, মধ্য রাত্রের অতিথিই অসাবধানে ওই চাবির গোছা ফেলে গেছে। এখানে তিনটি চাবির ফটো দেওয়া হল। দুটি দামি গাড়ির চাবি যাঁর রিং-কেস-এ থাকে (যে রিং-কেস-এ দামি ফরাসি সুগন্ধীর সুবাস) তাঁকে খুঁজে বার করা হয়তো কঠিন হবে না। পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। এক দিকে নিহত বিবাহ-বিশারদের পরিত্যক্ত পত্নীদের পরিচয়; অপরদিকে ‘মোটর-ভেহিক্’-এ এমন দম্পতির সন্ধান, যাঁরা ওই দুই মেক এর গাড়ির মালিক-মালকিন…
প্রাতরাশ শেষ হতে-না-হতেই বাইরের বারান্দায় ‘কল-বেল’ বেজে উঠল। বাসু ঘড়ি দেখলেন। সকাল সাতটা। সচরাচর উনি চেম্বারে এসে বসেন বেলা আটটায়। কম্বাইন্ড-হ্যান্ড বিশ্বনাথ বাইরের দরজা খুলে দেখে এল। ফিরে এসে নিঃশব্দে একটি আইভরি-ফিনিশড্ দামি ভিজিটিং কার্ড টেবিলে নামিয়ে রাখল: ত্রিদিবনারায়ণ রায়।
রানু প্রশ্ন করেন, কী? দেখা করবে? নাকি, ঘন্টাখানেক পরে ঘুরে আসতে বলব?
– না, আজ বরং একঘন্টা আগেই দপ্তর খোলা যাক। তুমি আগে যাও। রেজিস্টারে নাম-ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার আর ওর স্বাক্ষর…
বাধা দিয়ে রানু বলেন, আমার কাজ আর নতুন করে আমাকে শেখাতে হবে না। এস তুমি –
একটু পরে বাসু গিয়ে বসলেন নিজের ঘরে, রানুদেবী বাইরের রিসেপশন কাউন্টার পাক মেরে এসে উপস্থিত হলেন তাঁর হুইল-চেয়ারে।
বাসু নিম্নকণ্ঠে জানতে চাইলেন, ছন্দার দু-নম্বর তো?
– হ্যাঁ। খুবই উত্তেজিত মনে হচ্ছে।
– হঠাৎ ‘পর্বতোবহ্নিমান’ কেন? ‘খুনাৎ’? এক নম্বর খুন হয়েছে বলে? ও কী জানে?
– কী জানি! ঘরময় পায়চারী করছে, আর একটার পর একটা ইন্ডিয়া কিং ধরাচ্ছে। দু-টান দিয়েই অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিচ্ছে। বেশিক্ষণ ওভাবে চালালে আমার কার্পেট পুড়িয়ে ফেলবে!
– কী চায় তা কিছু বলেছে?
– না। তোমার সাক্ষাৎ চায় শুধু। ব্যাপারটা নাকি ‘জীবন-মৃত্যু’ নিয়ে
– ঠিক আছে। ডেকে দাও। দাঁড়াও…এবারও রিটেইনার নাওনি তো?
রানু হাসলেন। বললেন, আবার? তোমাকে না জিজ্ঞেস করে?
রানু বাইরের দিকে দরজাটা খুলে দ্বারপথে ও-কক্ষে কাকে যেন সম্বোধন করে বললেন, আসুন মিস্টার রাও, মিস্টার বাসু আপনার সঙ্গে দেখা করবেন।
একটি সুসজ্জিত এবং সুদর্শন যুবক প্রবেশ করল চেম্বারে। সুদর্শন, কিন্তু পৌরুষ বা ব্যক্তিত্বের কোনো ব্যঞ্জনা নেই তার দেহাকৃতিতে। উজ্জ্বল গৌর বর্ণ, মাঝারি উচ্চতা, কৃশকায়। কথা যখন বলতে শুরু করল তখন মনে হল আপার-প্রেপ্ এর কোনো ছাত্র ‘মিস্ত্র’কে পড়া মুখস্ত হয়েছে কি না প্রমাণ দিচ্ছে:
আমার নাম শ্রীত্রিদিবনারায়ণ রাও। আমরা শক্তাবৎ। আমার পিতৃদেব হচ্ছেন স্বনামধন্য ধনকুবের শ্রীত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও অফ নাসিক। আপনি তাঁর নাম শুনে থাকবেন।
বাসু মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
– আপনি আজ সকালে কাগজ দেখেছেন, স্যার? আই মিন সংবাদপত্র?
– মোটামুটি। এ কথা কেন?
ত্রিদিব বসেছিল ডান পায়ের উপর বাঁ পা-টা তুলে। এবার সে ভঙ্গিটা বদলাল। বাম-চরণের উপর উঠল দক্ষিণ ঠ্যাঙ। নড়াচড়ায় তার কপালের সামনের দিকে একগুচ্ছ চুল চোখের উপর এসে পড়ল। ত্রিদিব বাঁ-হাতে অশান্ত চুলের গোছা কপালের উপর দিয়ে ঠেলে দিয়ে বললে: খুনের খবরটা দেখেছেন? তারাতলায়? মা সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্ট-এ?
বাসু যেন একটু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, হ্যাঁ, প্রথম পাতায় নিচের দিকে ওই রকম কী নিউজ আছে বটে। ডিটেইল্স পড়িনি। কিন্তু সে-কথাই বা কেন?
হঠাৎ ত্রিদিব ঘনিয়ে এল ওঁর দিকে। ফিস্ িকরে বলল, ওই খুনের মামলায় আমার ‘ওয়াইফ’-এর জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা! আই মিন, অচিরেই ওই খুনের দায়ে সে গ্রেপ্তার হতে চলেছে।
বাসুও ওর দিকে ঝুঁকে পড়ে জানতে চান, আপনার স্ত্রীই কি খুনটা করেছেন?
– না! নিশ্চয় না! সে এ কাজ করতেই পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বিশ্রীভাবে কেসটায় জড়িয়ে পড়েছে! কিছুটা নির্বুদ্ধিতা, কিছুটা অসাবধানতা, বাকিটা ওর চরিত্রদোষে। আমি অস্বীকার করব না-– মানে, ও হয়তো জানে খুনটা আসলে কে করেছে। আমার অবশ্য ধারণা সে নিশ্চিত জানে। আই মিন, তার চোখের সামনেই খুনটা হয়েছে। আর দুর্ভাগ্যবশত আমার ওয়াইফ জেনেশুনে হত্যাকারীকে আড়াল করতে চাইছে। লোকটাও অদ্ভুত। কাপুরুষের অধম। একজন অবলা মহিলার আঁচলের তলায় কিয়ে ওকেই বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেখুন স্যার, আপনি না বাঁচালে…
বাধা দিয়ে বাসু বলে ওঠেন, দাঁড়াও, দাঁড়ও। খুনটা হয়েছে রাত দেড়টা নাগাদ। তখন কি তোমার স্ত্রী বাড়িতে ছিল না?
– না! ছিল না!
– তুমি কেমন করে জানলে?
– সে এক দীর্ঘ কাহিনী। আমাকে তাহলে প্রথম থেকে বলতে হয়।
– বল না! তাই বল। প্রথম থেকেই। না হলে আমি বুঝব কী করে?
ত্রিদিব আবার আরাম করে গুছিয়ে বসল। দক্ষিণ ও বাম ঠ্যাঙ তাদের অবস্থান বদলালো। চোখের উপর ঝুলে-পড়া চুলের গোছা অশান্ত হাতে সরিয়ে দিয়ে বলল, আমার নাম শ্রীত্রিদিবনারায়ণ রাও। আমার বাবা হচ্ছেন নাসিকের ধনকুবের শ্রীত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও। আমরা…
– জানি, শক্তাবৎ। এ কথা তুমি আগেই বলেছ। তারপরের কথাটা কী?
– আমি কলকাতাতেই পড়াশুনা করেছি। আলিপুরে আমাদের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট আছে। জাস্ট একটা গ্যারেজ আর একটু দূরে এক কামরার একটা রেসিডেন্সিয়াল য়ুনিট। ওখানে ভবিষ্যতে একটা মালটিস্টোরিড অ্যাপার্টমেন্ট হাউস হবে। আপাতত ওই এক কামরার ঘরে থেকেই আমি কলকাতায় ল’ পড়ছিলাম। গত বছর পাশ করেছি। বছরখানেক আমি য়ুরোপ-আমেরিকা ঘুরতে গেছিলাম। মাস-তিনের আগে ফিরে আসি। তারপর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি। বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে একটি নার্সিং হোমে ভর্তি হই। আমার বাবা তখন বিদেশে। আমেরিকায়। ওই নার্সিং হোমে যে নাইট-নার্স ছিল তার নাম ছন্দা বিশ্বাস।
এই পর্যন্ত বলে ত্রিদিব মৌন হল। তাকিয়ে রইল ঘূর্ণ্যমান সিলিং ফ্যানটার দিকে।
বাসু বলেন, শুনলাম। তারপর?
– আমি ছন্দা বিশ্বাসকে বিয়ে করে ফেললাম!
আবার থামল সে। যেন, একটা জঘন্য অপরাধের স্বীকারোক্তি করেছে! এখন তাই একটু দম নিচ্ছে।
বাসু বললেন, ও!
যেন, নার্সিং হোমে রুগীরা সচরাচর নাইট-নার্সকে বিয়ে করে যুগলে বাড়ি ফেরে। এটাই প্রথা!
ত্রিদিব সোজা হয়ে উঠে বসে। বলে, আপনি ব্যাপারটার গুরু বুঝতে পারছেন না, স্যার। আমরা ‘রাও’, মানে চিতোরের শক্তাবৎ রাও! আমি আমার স্বনামধন্য পিতা শ্রীত্রিবিক্রমনারায়ণ রাওয়ের একমাত্র পুত্র – আর আমি কিনা খানদানের কথা ভুলে গিয়ে, বংশমর্যাদার কোনো তোয়াক্কা না রেখে, বেমক্কা বিয়ে করে বসলাম একজন নার্সকে! আমার স্থনামধন্য পিতৃদেব এটাকে কী ভাবে নেবেন…
– তা নিয়ে তোমার কেন মাথাব্যথা? দেখ ত্রিদিব, জীবনটা তোমার। জীবনসঙ্গিনীও তুমি নিজে নির্বাচন করেছ…
– আপনাকে আমি কেমন করে বোঝাই? বাবামশাই আমেরিকা থেকে ফিরে এসে দেখলেন আমার টেলিগ্রাম তাঁর অপেক্ষায় রাখা আছে! আমি বিবাহিত! আমি একটি সামান্য নার্সকে বিবাহ করেছি। যে মেয়েটি অন্যপূর্বা এবং বয়সে আমার চেয়ে বড়ো।
– ‘অন্যপূর্বা’ মানে?
– ছন্দা বিশ্বাস বিধবা!
– তাতে কী হল? বিদ্যাসাগর মশায়ের আমল থেকে বিধবা-বিবাহ তো সিদ্ধ।
– আপনাকে আমি কেমন করে বোঝাই?
– ও প্রসঙ্গ থাক। তুমি কী একটা খুনের কথা বলতে চাইছিলে না?
– হ্যাঁ খুন। এই দেখুন…
– কোটের পকেট থেকে সে একটি দৈনিক পত্রিকার কর্তিত অংশ বার করে আনল। ভাঁজ খুলে সেটি পেতে দিল ওঁর গ্লাস-টপ টেবিলে। কাগজটার মাঝখানে একটা চাবির আলোকচিত্র-বস্তুত তিন-তিনটি চাবি।
ত্রিদিব তার হিপ-পকেট থেকে একটা চামড়ার ‘কী-কনার’ বার করে টেবিলে রাখল! তাতে তিন-তিনটি চাবি। বললে, মিলিয়ে নিন, স্যার?
কাগজে অবশ্য ‘রিডিউস্ড-স্কেলে’ ছাপা হয়েছে, তবু শনাক্ত করতে কোনো অসুবিধা হল না। বাসু বললেন, এটা কেমন করে হল? আমার ধারণা এ চাবির গোছাটা তো আছে পুলিসের হেপাজতে!
ত্রিদিব মাথা নাড়ল। বলল, আজ্ঞে না! এ থোকাটা আমার। পুলিশের কাছে যেটা আছে সেটা আমার ওয়াইফ-এর। যেটা সে কাল রাত্রে অকুস্থলে অসাবধানে ফেলে এসেছে। যখন ওই লোকটা খুন হয়-তা সে যেই করুক!
– তোমার স্ত্রী যে সে সময় অকুস্থলে ছিল তা তুমি কেমন করে জানলে?
ত্রিদিব কপাল থেকে চুলের গোছাটা সরিয়ে বলল, তাহলে আপনাকে গল্পটা গোড়া থেকে বলতে হয়।
বাসু বিরক্ত হয়ে বললেন, না! গোড়ার দিকটা আমার জানা। তোমার নাম, তোমার বাবার এবং স্ত্রীর নাম এবং তোমার শক্তাবৎ। এখন শুধু বল তুমি কেমন করে জানলে যে, তোমার স্ত্রী কাল গভীর রাত্রে তারাতলায় ছিল?
ত্রিদিব চাবির থোকাটা তুলে নিয়ে বলল, এই চাবিটা মারুতির ফ্রন্ট-ডোর কী, যেটা আমার ওয়াইফ চালায়, এটা আমার অ্যাম্বাসাডারের। আর এই নবতালটা হচ্ছে গ্যারেজের চাবি। ডবল গ্যারেজ। ইগনিশন কী সচরাচর গাড়িতেই লাগানো থাকে। পাশাপাশি দুটি গাড়ি থাকে। সামনে স্লাইডিংডোর। একই তালায় দুটো গাড়ি লক করা থাকে। তাই সুবিধার জন্য আমরা তিন সেট চাবি বানিয়েছি। একটা থাকে আমার কাছে। একটা ছন্দার কাছে, তৃতীয়টা আমাদের ড্রয়ারে। আমি আপনার কাছে আসার আগে দেখে এসেছি, ড্রয়ারের চাবি স্বস্থানে আছে। আমার চাবি তো আমার পকেটে! দেয়ারফোর, পুলিশ যেটা খুঁজে পেয়েছে সেটা আমার ওয়াইফের চাবির থোকা।
– আই সি। তা তুমি যে এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছ সে কথা কি তোমার স্ত্রীকে জানিয়ে এসেছ?
– না।
– কেন?
– সে অনেক কথা! শি ট্রায়েড টু ড্রাগ মি!
– সে কী করতে চেয়েছিল?
– কাল রাত দশটা নাগাদ আমাকে জোরালো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রাতে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চেয়েছিল!
– কেন?
– না হলে তার নৈশ-অভিসারে ব্যাঘাত হত যে!
– নৈশ-অভিসার! তার মানে?
– সে কথাই তো বলতে চাইছি।
– তাহলে বল। সবটা গুছিয়ে নিয়ে বল?
ত্রিদিবের সে ক্ষমতা নেই। তার কথাবার্তা আর চিন্তার ঠিক পারম্পর্য নেই। অনেক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বাসু-সাহেব তার কাছে থেকে যে ঘটনাপরম্পরা আবিষ্কার করলেন তা এই রকম :
গতকাল রাত্রি দশটা নাগাদ ওরা টি.ভি. বন্ধ করে দ্বৈতশয্যায় শয়ন করতে যায়। ছন্দা এই সময় ত্রিদিবের কাছে জানতে চায়, শোবার আগে সে একটু হট চকলেট খাবে কি-না।ত্রিদিব রাজি হয়। সে প্রায়ই শয়নের পূর্বে গরম চকলেট পান করে। এক-কামরার ফ্ল্যাট। সংলগ্ন বাথরুম এবং এক প্রান্তে কিচেনেট। ত্রিদিব শোবার ঘরে, প্যান্ট বদলে পা-জামা পরছিল, আর ছন্দা সংলগ্ন কিচেনেটে গরম চকলেট বানাচ্ছিল। ছন্দা ছিল ত্রিদিবের দৃষ্টিসীমার বাইরে, কিন্তু দরজাটা এমনভাবে আধখোলা অবস্থায় ছিল যে, দ্বারের সংলগ্ন আয়নায় অন্ধকার শয়নকক্ষ থেকে আলোকিত কিচেনেটে ছন্দাকে দেখা যাচ্ছিল। ত্রিদিবি লক্ষ্য করে, ছন্দা তার ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা ছোট্ট শিশি বার করে। শিশিটা পরিচিত। ওতে থাকে একটা ঘুমের ওযুধ: ‘ইপ্রাল’! হাসপাতালে থাকতে প্রতি রাত্রে ওই ওষুধ খেতে হত। এখন খায় না! ত্রিদিব অবাক হয়ে দেখল, ছন্দা বেশ কয়েকটা ট্যাবলেট ওর চকলেটে মিশিয়ে দিল! তারপর এ ঘরে এসে ত্রিদিবের হাতে গ্লাসটা ধরিয়ে দিল।
– তারপর? তুমি ওকে জিজ্ঞাসা করলে নাঃ কেন সে তোমাকে না জানিয়ে তোমার চকলেটে ঘুমের ওষুধ মেশালো! অথবা কটা ট্যাবলেট সে মিশিয়েছে?
– আজ্ঞে না, আমি জিনিসটা খতিয়ে দেখতে চাইছিলাম।
– তাহলে ঠিক কী করলে তুমি?
ত্রিদিব চকলেটটা হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে চলে যায়। ভাবখানা সে ইউরিনাল ব্যবহার করতে যাচ্ছে। দরজাটা বন্ধ করে সে চকলেটটা কমোডে ঢেলে দিয়ে ফ্লাশ টেনে দেয়। তারপর গরম জলের ট্যাপটা খুলে গ্লাসে গরম জল ভরে নেয়। এ ঘরে চলে আসে। ধীরে ধীরে সিপ্ করে গরম জলটা এমনভাবে পান করতে থাকে যাতে মনে হয় সে গরম চকলেটই খাচ্ছে।
– তারপর?
– তারপর আমি নিজেই গ্লাসটা বেসিনে ধুয়ে আনলাম, যাতে ও দেখতে না পায় তলানিটা কী জাতের। একটু পরে ওকে বললাম, আমার দারুণ ঘুম পাচ্ছে। ও একটা বই পড়ছিল। বলল, তাহলে শুয়ে পড়। আমি শুয়ে পড়লাম। আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ার ভান করলাম। তার একটু পরে ছন্দাও শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমোলো না। রাত সওয়া বারোটায় ও নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। অন্ধকারেই সে নাইটি পাল্টে শাড়ি পড়ল। সাজ-পোশাক বদলালো। তারপর নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
– দরজা খোলাই পড়ে রইল?
– আজ্ঞে না। আমাদের দরজায় ‘ইয়েল-লক’ লাগানো। ছন্দা যাবার সময়ে অতি সাবধানে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল, যাতে শব্দ না হয়।
– তারপর কী হল?
ত্রিদিব আবার উল্টোপালটা ভাবে ঘটনা পরম্পরার বর্ণনা দিতে থাকে। পর্যায়ক্রমে সাজালে সেটা এই রকম দাঁড়ায়:
বিছানায় শুয়ে শুয়েই ত্রিদিব শুনতে পায় গ্যারেজের স্লাইডিং দরজাটা খোলা হল। মধ্যরাত্রে ওটা নিঃশব্দে খোলা যায় না। পাশাপাশি সমান্তরাল লোহার চ্যানেলে দুটি লোহার পাল্লা। গ্যারেজটায় দুটি গাড়িই পাশাপাশি থাকে। সচরাচর অ্যাম্বাসাডারটা ডাইনে, মারুতি বাঁয়ে। ফলে, ছন্দা নবতাল প্যাডলক খুলে খুব ধীরে ধীরে – যাতে শব্দ কম হয় বাঁ-দিকের পাল্লাটা ডানদিকে নিয়ে আসে। ওই সময় ত্রিদিব বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। জানলার কাছে সরে এসে পর্দা সরিয়ে দেখতে থাকে। দেখে, ওর স্ত্রী মারুতি গাড়িখানা বার করে আনল। আবার মারুতির দিকের লোহার পাল্লাটা ঠেলে ঠেলে স্ব-স্থানে টেনে আনল। তারপর স্টার্ট দিল গাড়িতে। কম্পাউন্ডের গেট খুলে বাইরে গেল। গেট বন্ধ করে রাস্তায় নামল। বাঁকের মুখে মিলিয়ে গেল। রাত তখন বারোটা পঁয়ত্রিশ…
এই পর্যায়ে বাসু-সাহেব বাধা দিয়ে বললেন, একটা কথা। তোমার স্ত্রী কি রওনা হবার আগে গ্যারেজের ‘নবতাল’ প্যাডলকটা বন্ধ করে দেয়নি?
ত্রিদিব বলল, নিশ্চয় দিয়েছিল।
– তুমি অতদূর থেকে সেই ব্যাপারটা দেখতে পেলে?
– আজ্ঞে না, স্বচক্ষে দেখিনি। এটা আমার আন্দাজ। দারোয়ানজি ছুটিতে ছিল তো? গ্যারেজটা লক্না-করে গেলে অ্যামবাসাডার গাড়িটা অরক্ষিত হয়ে থাকত। তাই আন্দাজ করছি…আর তা ছাড়া আমরা দু-জনেই সব সময় গাড়ি নিয়ে বার হলেই গ্যারেজ-দরজা তালা বন্ধ করে যাই…ছন্দাও নিশ্চয় তা করেছিল…
বাসু বলেন, সে-ক্ষেত্রে ফিরে এসে সে গ্যারেজ খুলল কী করে? তোমার ধারণায় তো চাবিটা তার আগেই খোয়া গেছে তারাতলায়?
– তার কারণ ট্রিপলিকেট চাবিটাও ওর কাছে ছিল!
– ট্রিপলিকেট চাবি! মানে?
– আপনাকে আগেই বলেছি, স্যার, আমাদের তিন-সেট চাবি আছে। একটা থাকে আমার কাছে, একটা আমার ওয়াইফের কাছে, তৃতীয় সেটটা থাকে ওর ড্রেসিং টেবিলের টানা-ড্রয়ারে। ছন্দা রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গে আমি তৈরি হয়ে নিই। ওকে ‘ফলো’ করব বলে। পাজামা ছেড়ে প্যান্ট পরি, আর হাওয়াই শার্ট। কিন্তু আমার চাবির থোকাটা খুঁজে পাই না। সচরাচর যেখানে থাকে সেখানে নেই। খুঁজতে খুঁজতে মিনিটতিনেক দেরি হয়ে যায়। তখন মরিয়া হয়ে আমি টানা ড্রয়ার খুলে ট্রিপলিকেট চাবিটা নেবার চেষ্টা করি। কিন্তু ড্রয়ার খুলে দেখি নির্দিষ্ট স্থানে চাবির থোকাটা নেই…
বাসু জানাতে চান, তার মানে?
– তার মানে ছন্দারও হয়েছিল ঠিক আমার অবস্থা। আমাকে নিথর হয়ে ঘুমাতে দেখে সে নিঃশব্দে উঠে পড়ে। অন্ধকারেই নাইটি ছেড়ে শাড়ি পরে; কিন্তু তার চাবির থোকাটা খুঁজে পায় না। বাধ্য হয়ে নিশ্চয় সে ওই ড্রয়ারের তৃতীয় চাবির থোকাটাই নিয়ে যায়। আসলে ওর নিজের চাবি-সেটটা ছিল ওর লেডিজ ব্যাগেই। যেটা সে তারাতলায় ফেলে এসেছে; কিন্তু তাতে বাড়ি ফিরতে তার অসুবিধা হয়নি।
– তারপর? বলে যাও…
ত্রিদিব আবার বলতে থাকে।
ড্রয়ারের থার্ড-স্টে চাবিটা না পেলেও মিনিট পাঁচেক পরে সে তার নিজের থোকাটা খুঁজে পায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্ত্রীকে ফলো করা আর সম্ভবপর নয়। তবে ত্রিদিব আন্দাজে বুঝতে পেরেছিল তার স্ত্রী কোথায় নৈশ-অভিসারে গেছে। অর্থাৎ কোন্ ভাগ্যবান তার সদ্যপরিণীতা সহধর্মিণীর প্রাকবিবাহযুগের প্রণয়ী। ও সেখানেই ফোন করে…
আবার বাধা দিয়ে বাসু বলেন, সে লোকটা কে?
– যে কমলেশকে খুনটা করেছে, এখন দোষটা আমার ওয়াইফের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে…
বাসু বিরক্ত হয়ে বললেন, আঃ! সে লোকটার পরিচয় কী? তার পিতৃদত্ত নাম?
ত্রিদিব মুখটা নিচু করল। রুমাল বার করে মুখটা মুছল। তারপর বলল, ডক্টর প্রতুলচন্দ্র ব্যানার্জি, এম. আর. সি. পি.!
– ডক্টর ব্যানার্জি? তোমার স্ত্রীর প্রাকবিবাহযুগের প্রণয়ী?
– শুধু প্রাকবিবাহ নয় স্যার, আমার অনুমান বিবাহোত্তর জীবনেও!
– তুমি বলতে চাও তোমার স্ত্রী মধ্যরাত্রে ডক্টর ব্যানার্জির বাড়িতে গেছিল?
ত্রিদিব গম্ভীরভাবে বলল, হ্যাঁ এবং না।
– তার মানে?
– ছন্দা ওই ডাক্তার বাঁডুজ্জের কাছেই গেছিল। তবে তাঁর বাড়িতে নয়!
– তুমি কেমন করে জানলে?
– তাহলে আপনাকে সবটা গুছিয়ে বলতে হয়।
বাসু এবার আর বিরক্ত হলেন না। বুঝতে পারছেন, এটাই ওর কথা বলার ধরন। বললেন, তাই বল?
– ওকে ফলো করা যখন অসম্ভব হয়ে গেল তখন আমি ডাক্তার ব্যানার্জির বাড়িতে একটা ফোন করি। রাত তখন পৌনে একটা।
– বাড়িতে না নার্সিং হোমে?
– আজ্ঞে না। বাড়িতে। ওঁর নার্সিং হোম-এরই তিন-তলায়। উনি ব্যাচিলার। একটি ওড়িয়া কম্বাইন্ড-হ্যান্ডকে নিয়ে ওই নার্সিং-হোমেরই তিন-তলায় দু-কামরার ফ্ল্যাটে থাকেন।
– ঠিক আছে। তারপর?
– বেশ অনেকক্ষণ রিঙিং টোনের পর টেলিফোনটা তুলল ওঁর কম্বাইন্ড হ্যান্ড। জানাল যে, ডাক্তারবাবু বাড়ি নেই। তাকে আমি বলেছিলাম, একটা জরুরী কেসে ডাক্তারবাবুকে খুঁজছি। তাঁকে কি নার্সিং-হোমের নাম্বারে পাওয়া যাবে? লোকটা জানাল – না। ডাক্তারবাবু গাড়ি নিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেছেন!
– তুমি কি তোমার নাম জানিয়েছিলে?
– না! আমি গোটা ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করছিলাম, আড়াল থেকে।
– অল রাইট! আড়ালে থেকে তুমি গোটা ব্যাপারের কী বুঝলে শেষ পর্যন্ত?
– সবটা বুঝিনি। যেটুকু বুঝেছি তা এই: আমার ওয়াইফ আমাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ডাক্তার ব্যানার্জির কাছে যায়। তারপর দু-জনে একসঙ্গে যায় তারাতলায়। খুন ঐ ব্যানার্জিই করেছে আর ছন্দা বোকামি করে তার চাবিটা ফেলে এসে ভীষণ বিপদে পড়ে গেছে।
বাসু বললেন, একটা কথা বুঝিয়ে বল তো! তুমি সরাসরি তোমার স্ত্রীকে এসব প্রশ্ন করছনা কেন? কেন সে তোমাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়েছিল? কেন মধ্যরাত্রে তোমাকে না-জানিয়ে শয্যাত্যাগ করে গাড়ি নিয়ে বার হয়েছিল এবং কীভাবে খবরের কাগজে তার চাবির ফটোটা ছাপা হয়েছে?
ত্রিদিব সোজা হয়ে বসল। কপালের চুলটা সরিয়ে দিয়ে গম্ভীরভাবে বলল, তা আমি জানতে চাইতে পারি না!
– কিন্তু কেন?
– যেহেতু আমার ধমনীতে বইছে শক্তাবৎ রাজরক্ত। আমরা এভাবে কারও ব্যক্তিস্বাধীনতায়হস্তক্ষেপ করতে পারি না।
বাসু বিরক্ত হয়ে বলেন, লুক হিয়ার, ইয়াং ম্যান! তুমি অহেতুক, ঈর্ষান্বিত হয়ে এসব আজগুবি কথা ভাবছ। রাত দেড়টার সময় ডাক্তার ব্যানার্জি বাড়িতে না-থাকায় এটা মোটেই প্রমাণিত হয় না যে, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোথাও রাদেভুঁ ছিল। তোমার স্ত্রী যদি অভিসারে যেতে চায় তাহলে ডাক্তার ব্যানার্জির ফ্ল্যাটেই যেতে পারত। আসলে ব্যানার্জি হয়তো কোনো রুগি দেখতে গেছিলেন। আবার তোমার স্ত্রীর চাবির থোকা ওই বাড়িতে আবিষ্কৃত হওয়ার অর্থ ও এ নয় যে, খুনের সময় সে সেখানে ছিল। হয়তো কমলেশকে সে চিনত, দিনের বেলা তোমার স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে গেছিল।
– ফর য়োর ইন্রমেশন, স্যার, কমলেশ আমার ওয়াইফের প্রথম পক্ষের স্বামী!
– আই সী! আর একটা কথা বুঝিয়ে বল তো! তুমি তখন একজন দারোয়ানের ছুটি নেবার কথা বললে। ওই দারোয়ান কতদিন ও বাড়িতে চাকরি করছে আর কবে থেকে ছুটিতে আছে?
– মহাদেব প্রসাদ আমার পিতাজির একজন বিশ্বস্ত কর্মী। আমি যখন কলকাতার কলেজে পড়তে আসি তখন সে নাসিক থেকে চলে আসে। সে ঠিক দারোয়ান নয়, অল্প বয়সে সে বস্তুত আমার লোকাল গার্জেনও ছিল। আমার রান্নাবান্নাও সে করে দিত। আমি বিয়ে করার পর সে ছুটি নিয়ে দেশে চলে যায়–
– ছুটি সে চেয়েছিল, না তুমিই তাকে তাড়ালে? নাকি তোমার স্ত্রী…
– ইন ফ্যাক্ট, পিতাজি আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পরেই তাকে তলব করেন। ও নাসিকে যায়। সেখান থেকে দেশে চলে যায়।
– তার মানে কাল গভীর রাত্রে তোমার স্ত্রী যে গাড়ি নিয়ে বাইরে গেছিল এ কথা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না– তাই তো?
– সম্ভবত তাই। অন্তত আমি এখনও কাউকে বলিনি।
– সেক্ষেত্রে তোমার প্রথম কাজ হচ্ছে: তোমাদের গ্যারেজের ওই ‘নবতাল’ তালার পরিবর্তে অন্য একটি বড়ো তালা ওখানে ঝোলানো। তাহলে হয়তো পুলিশের নজর তোমাদের দিকে আদৌ পড়বে না।
– এ-কথা কেন বলছেন?
– সেটাই স্বাভাবিক। পুলিস মোটর-ভেহিক্লস-এ গিয়ে খবর নেবে একই পরিবারভুক্ত কয়টি ক্ষেত্রে ডব্ল-লাইসেন্স আছে– একটি মারুতি এবং একটি অ্যামবাসাডার। কলকাতা শহরে এমন পাঁচ দশটা কেস তারা হয়তো পাবে– কিন্তু প্রত্যেকটি সম্ভ্রান্ত পরিবার। দু-দুটো গাড়ি বড়োলোক ছাড়া কেউ পোষে না।
ফলে পুলিস গোয়েন্দা নিয়োগ করবে। যে সব পরিবারের নামে জোড়া লাইসেন্স আছে সেখানে গিয়ে খবর নেবে কার গ্যারেজে ‘নবতাল’ তালা আছে। তারপর যে নবতাল-তালার চাবিটা পুলিসের হেপাজতে আছে…
ত্রিদিব বাধা বলল, আপনি কি আমাকে এভিডেন্স ট্যাম্পার করতে পরামর্শ দিচ্ছেন?
বাসু ওর চোখের দিকে পুরো দশ-সেকেন্ড নির্বাক তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, তুমি কি চাও পুলিস খুঁজতে খুঁজতে ওই ‘নবতাল’ তালাটা আবিষ্কার করুক? সাত দিনের ভিতর?
ত্রিদিব দৃঢ়স্বরে বলল, সাত দিন কেন? আজই পুলিশ তা জানবে।
– মানে?
– কারণ আপনার এখান থেকে আমি সরাসরি পুলিস-স্টেশনে যাব। আমি যা দেখেছি, যা জানি, যা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত তা অপকটে এজাহারে জানাব।
বাসু চমকে ওঠেন: গুড গড! কেন? কেন এ কাজ করবে তুমি?
– যেহেতু এটাই আমার শিক্ষা। এটাই আমার খানদান। আমার ধমনীতে বইছে শক্তাবৎ রাজপুত রাজরক্ত।
বাসু অসহায়ভাবে মাথা নাড়েন। বলেন, কিন্তু তোমার স্ত্রী তো খুনী নাও হতে পারে?
– অফ কোর্স শি ইজ ইনোসেন্ট! খুন সে করেনি। করেছে ডাক্তার ব্যানার্জি। এখন সে পরস্ত্রীর পেটিকোটের আড়ালে লুকাতে চাইছে। আপনি কেন এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না, স্যার? রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশে ডাক্ততার ব্যানার্জি বাড়িতে অনুপস্থিত। ছন্দা তার নৈশ অভিসারে বার হল তার ঠিক দশ মিনিট আগে, বারোটা পঁয়ত্রিশে। রাত একটা কুড়িতে তাঁরাতলায় খুন হল কমলেশ। আর তারাতলা থেকে গাড়িতে মাঝ রাত্রে আসতে যে পনেরো মিনিট লাগে, সেই সময়ের ব্যবধানে ছন্দা ফিরে এল কাঁটায় কাঁটায় একটা পাঁয়ত্রিশে। হিসাবটা তো জলের মতো পরিষ্কার। খুনটা করেছে ব্যানার্জি, কিন্তু ছন্দার উপস্থিতিতে। আর এখন চাবিটা ফেলে আসায় সবটা দোষ চাপছে আমার ওয়াইফের ঘাড়ে। ওকে বাঁচাতেই হবে, স্যার…
বাসু বললেন, তোমার স্ত্রী যে ঠিক একটা পঁয়ত্রিশে ফিরে এসেছে তা তুমি জানলে কী করে?
– ঘড়ি দেখে! আমি জেগেই ছিলাম। গাড়ির শব্দ পেয়ে জানলার ধারে এগিয়ে এলাম। দেখলাম স্বচক্ষে। ছন্দা তালা খুলল। পাল্লাটা ঠেলে দিয়ে গাড়ি গ্যারেজ করল। তারপর এগিয়ে এল বাড়ির দিকে। আমি তৎক্ষণাৎ বিছানায় শুয়ে পড়লাম…
– জাস্ট এ মিনিট! ছন্দা গাড়ি গ্যারেজ করার পর আবার পাল্লাটা ঠেলে বন্ধ করল না? ‘নবতাল’ তালাটা লাগাল না?
ত্রিদিব একটু চিন্তা করে বলল, না! যদ্দুর মনে পড়ছে-না!
– কেন?
– কারণ আজ সকালে যখন আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে আসি, তখন গ্যারেজের পাল্লাটা খোলাই ছিল।
– তা নয়। আমি জানতে চাইছি, ছন্দা কী কারণে গ্যারেজ বন্ধ করে তালা লাগাল না?
– গ্যারেজটা মাপে একটু ছোটো। অ্যামবাসাডারটার সই-সই। কখনও কখনও রাস্তায় ভারি ট্রাক গেলে গ্যারেজটা কাঁপে। তখন অ্যামবাসাডার গাড়িটা একটু সড়ে-নড়ে যায়। সেক্ষেত্রে পাল্লাটা বন্ধ হয় না। তখন অ্যামবাসাডারটাকে সামনের দিকে একটু এগিয়ে নিতে হয়। ছন্দা সে রিস্ক নেয়নি। কারণ অ্যামবাসাডারটা স্টার্ট নেবার সময় বেশ শব্দ হয়। ওর আশংকা হয়েছিল হয়তো আমার ঘুম ভেঙে যাবে।
– আজ সকালে তুমি যখন আমার কাছে চলে আস তখন তোমার স্ত্রী কী করছিল?
– অঘোরে ঘুমোচ্ছিল।
– ও জানে না, তুমি উঠে চলে এসেছ?
– নাঃ!
– আশ্চর্য! কেন? ওকে না জানিয়ে এভাবে চলে এলে কেন?
– কেন নয়? আমার ওয়াইফ যদি আমাকে না জানিয়ে মধ্যরাত্রে শয্যাত্যাগ করতে পারে, তাহলে সূর্যোদয়ের পর…
– তা বটে। তা এত সকালে কোথায় যাচ্ছিলে তুমি?
– তা বলতে পারব না। তবে ওর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে থাকতেও পারছিলাম না। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই দেখি কাগজওলা বারান্দায় ছুঁড়ে কাগজ ফেলে গেছে। সেটা খুলে পড়তেই দেখি প্রথম পাতায় বার হয়েছে কমলেশ বিশ্বাস খুন হয়েছে। আমি জানতাম, ছন্দার প্রথম পক্ষের স্বামীর নাম ‘কমলেশ বিশ্বাস’; কিন্তু আমার ধারণা ছিল সে মৃত। কাগজের পঞ্চম পৃষ্ঠাটা খুলেই বুঝতে পারলাম, বাস্তবে কী ঘটেছে। ব্যানার্জি আর ছন্দা কাল রাত্রে কমলেশকে খুন করতে গেছিল। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে ড্রয়ারটা টেনে দেখি তাতে এক সেট চাবি রয়েছে; দ্বিতীয় সেট আমার পকেটে। ফলে বুঝতে অসুবিধা হল না, কাগজে যে ছবিটা ছেপেছে তা ছন্দার চাবির গোছা। তখনই গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বার করে আপনার কাছে চলে এলাম…
– তুমি আমার বাড়ি চিনতে?
ত্রিদিব একটু ভেবে নিয়ে বলল, হ্যাঁ চিনতাম।
– কীভাবে?
আবার একটু ভেবে নিয়ে বলল, সরি স্যার! ঠিক বলতে পারব না। স্বীকারই করি – আমি ডাঃ ব্যানার্জীর নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিলাম মানসিক রোগী হিসাবে। সব কথা আমি সব সময় মনে করতে পারি না।
– অল রাইট! তুমি আমার কাছে কেন এসেছিলে? ঠিক কী চাও?
– আমার ওয়াইফকে বাঁচাতে। আমার খানদানকে বাঁচাতে!
– তা যদি বাঁচাতে চাও ত্রিদিব, তাহলে তুমি নিজে থেকে কিছুতেই পুলিসে যেতে পার না!
– দ্যাটস্ ইম্পসিবল, স্যার! আমি রাঠোর রাজপুত! শক্তাবৎ!
– আইসি! কিন্তু তুমি যে আমাকে নিয়োগ করতে চাও তাতে আমার জানা দরকার আমার ক্লায়েন্ট কে? তুমি না তোমার স্ত্রী?
– অফ কোর্স আমার ওয়াইফ! আর যদি সম্ভবপর হয় তাহলে এই খুনের মামলায় যেন আমাদের খানদান ‘টা জড়িয়ে না পড়ে। আমার বাবার নামটা…
– তোমার বাবার নামটা তো তুমি নিজেই জড়াচ্ছো। পুলিসে গিয়ে এজাহার দিতে গেলে প্রথম পংক্তিতেই তো তোমার বাবার নামটা বলতে হবে।
ত্রিদিব গুম মেরে বসে থাকল।
– দ্বিতীয়ত, তোমার বাবাকে আমার দরকার ‘ফি’টা মেটানোর জন্য। আমার এটাই তো পেশা…
– আই নো, আই নো, কিন্তু সে প্রয়োজনে আমার পিতৃদেবের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা বৃথা। তিনি আমার ওয়াইফকে বাঁচানোর জন্য একটা পয়সাও খরচ করবেন না!
– কেন? সে তাঁর পুত্রবধূ! ‘খানদান’-এর ঐতিহ্যটা বাঁচাতে হলে তাঁর পক্ষে পুত্রবধূকে রক্ষা করাই তো স্বাভাবিক।
– আজ্ঞে না। তাহলে আপনাকে ব্যাপারটা গোড়া থেকে বুঝিয়ে বলতে হয়।
– থাক্ ত্রিদিব। আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে না। শুধু একটা কথা বল: তোমার বাবার সুনাম, তোমাদের ‘খানদান’ ইত্যাদির খাতিরে তুমি কি পুলিস-স্টেশনে যাবার ইচ্ছাটা আপাতত মুলতুবি রাখবে? আর ‘নবতাল’ তালাটা বদলে দেবে?
ত্রিদিব উঠে দাঁড়াল। বলল, সরি স্যার। আপনি আমাকে ঠিক চিনতে পারেননি। এভিডেন্স নষ্ট করা অথবা সত্য গোপন করা সাত শতাব্দী ধরে কোনো শক্তাবৎ রাজপুত করেনি। আমিও করতে পারব না।
মাথা খাড়া রেখেই গটগট করে বেরিয়ে গেল সে। শুধু দরজার কাছে একবার থমকে দাঁড়াল। পিছন ফিরে বলল, আপনার বিলটা আমাকে পাঠিয়ে দেবেন, স্যার। দরকার হয় ঘড়ি-আংটি বেচে আমি আপনার ফি-টা মেটাব। আর তাছাড়া জানেন নিশ্চয় – আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রটা বাঙালীদের মতো দায়ভাগের নয়। মিতাক্ষরা সূত্রে।
বাসু বললেন, মনে আছে। তুমি বলেছিলে যে, তুমি ল-পাশ।
