চৌদ্দ
মধ্যাহ্ন আহারের পূর্বেই সুজাতা তার ডিউটি সেরে ফিরে এসে রিপোর্ট করল। এয়ার-কন্ডিশান মার্কেটের একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে হৈচৈ ফেলে সে পালিয়ে এসেছে। আহারাদি সেরে কৌশিক গেল ‘পান্থজনসখা’ হোটেলে। জয়া সেনের তত্ত্বতালাশ নিতে। রাণু ওর হাতে খান-দুই-তিন গল্পের বই ধরিয়ে দিলেন। বললেন, দেখ, জয়া যদি কোনোটা পড়তে চায়।
বেলা তিনটের সময় এসে হাজির হল ইন্সপেক্টর দাশ।
– কী ব্যাপার? তুমি হঠাৎ?
– আপনি স্যার কাল রাত্রে আমার নাকের ডগা থেকে হাত সাফাই করলেন, আর আমি ধরতে পারলাম না।
– কী বলছ হে? কীসের হাত সাফাই?
– তখন রিভলভারটা আবিষ্কার করে আমি এতই উত্তেজিত ছিলাম যে, খেয়াল করিনি ব্যাপারটা।
– কোন ব্যাপারটা?
– আমি যখন মিস দত্তের বাড়িতে যাই তখন ওঁর বাড়ির সামনে কোনও গাড়ি পার্ক করা ছিল না। অথচ আপনি নেমে আসার পরেই একটি গাড়ি স্টার্ট নিল। কী করে হয়? আপনি কি জয়া সেনের গাড়ির আওয়াজ পেয়ে নেমে এসেছিলেন? না হলে বাড়িফিরলেন কী করে? অত রাতে ট্যাক্সি পেলেন? বাসু বললেন, তুমি খেয়াল করনি নিখিল। আমাকে নিয়ে গিয়েছিল কৌশিক। রাত্রে সচরাচর সেই ড্রাইভ করে। একটু দূরে গাড়িটা পার্ক করেছিল, তাই তোমার নজরে পড়েনি।
– আপনি জয়া সেনকে কোথাও নামিয়ে দেননি?
আরে না রে বাপু। আমার নিজের গাড়ি নিয়ে কৌশিক অপেক্ষা করছিল, সেই গাড়িতেই ফিরেছি।
সত্য কথা সন্দেহ নেই। এমনকি ‘আদ্যন্ত সত্যও’ বলে চলে। কিন্তু ‘নাথিং বাট দ্য ট্রুথ’ একে বলতে কেমন যেন সঙ্কোচ হয়।
ইন্সপেক্টর দাশ অধোবদনে নীরবে কী ভাবছিল। বাসু বললেন, কাকলি দত্ত আমার মক্কেল নয় তা কালই বলেছি, তুমি ওকে অ্যারেস্ট করলে না কেন?
নিখিল বললে, তার একাধিক হেতু। কাল যে কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করিনি সে প্রসঙ্গ থাক। আজ আমি জানি, অপরাধটা তিনি করেননি। অন্তত এটাই আমার ধারণা।
– কোন অপরাধটা? নবনীতাকে বিষ দেওয়া, না মার্ডার?
– বিষপ্রয়োগটা তো নয়ই। কারণ কেমিক্যাল অ্যানালিসিসে দেখা গেছে চকোলেট বাক্সের উপর নবনীতা দেবীর নাম লেখা কাগজটা ‘সোনালি স্বপন’ রেস্তোরাঁর স্টেশনারির। আঠা অন্তত আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে ‘সেট’ করে শক্ত হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, নবনীতা দেবীর নামটা টাইপ করা হয়েছে ঐ রেস্তোরার টাইপ-রাইটারে।
– তার মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে?
– এক নম্বর: কাজটা ঐ ‘সোনালি স্বপন’-এর কোনও স্টাফের। দু নম্বর: কাকলি দত্ত হতে পারে না, তার সঙ্গে নবনীতার আলাপ মাত্র কয়েক ঘণ্টার….
– তাহলে বিষপ্রয়োগের উদ্দেশ্যটা কী?
– নবনীতার প্রতি কোনও কারণে ঈর্ষা। অথবা হয়তো নবনীতা এমন কোনও তথ্য জানে যাতে জীবন হালদারের হত্যাকারী ধরা পড়ে যেত। তাই একসঙ্গেই জোড়া খুনের চেষ্টা হয়েছে। নবনীতা আপনার কাছে কী বিষয়ে জবানবন্দি দিতে আসছিল তা আপনি জানেন, আমি জানি না।
– আমিও তা জানি না, নিখিল। তবে কাকলির তরফে সে সাক্ষী দিতে আসছিল। খুব সম্ভব ঐ শেয়ারগুলোর বিষয়েই – তার মানে, জীবন হালদারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওর জবানবন্দির সম্পর্ক থাকার সমূহ সম্ভাবনা। কিন্তু তুমি যে কথাটা বলছিলে আজ কেন তোমার ধারণা হয়েছে যে, অপরাধটা কাকলি করেনি?
– অনেকগুলি হেতুতে। প্রথমত শ্রীমতী জয়া সেন এবং শ্রীমান যাদুগোপাল সেন গতকাল রাত্রি থেকে নিরুদ্দেশ। কাল রাত্রে ওঁরা বাড়িতে ছিলেন না। আজও ফেরেননি এটা আজ জেনেছি।
– গ্যারেজে গাড়িটা আছে?
– না নেই।
– তার মানে যাদুগোপাল সস্ত্রীক কোথাও গেছে। কোথায় গেছে?
– সমস্যাটা তার চেয়েও জটিল, স্যার।কারণ গ্যারেজে যাদুগোপালের মোটর সাইকেলটাও নেই।
– তার মানে তুমি বলতে চাইছ, জয়া নিজে ড্রাইভ করে – অসম্ভব মনে হচ্ছে না? সে তো হার্ট পেশেন্ট।
– তথ্যটা কতদূর বিশ্বাসযোগ্য সেটাই চিন্তার। কারণ এটা ইতিমধ্যে জানা গেছে যে, গতকাল রাত নটা নাগাদ মিসেস সেন ড্রাইভ করে মোমিনপুরের দিকে গিয়েছিলেন। একটি স্টেশনারি দোকানে গিয়ে জীবন হালদারের বাড়ির পথনির্দেশ নিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে ঐ দোকানে তখন একটা বার্থ-ডে পার্টির খানাপিনা চলছিল। অনেকেই স্বীকার করেছে– এক অসুস্থা ভদ্রমহিলা এসে পথনির্দেশ চেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন জয়া সেনের ফোটো দেখে তাঁকে সনাক্ত করেছে।
বাসু বলেন, এটা কী বলছ, নিখিল? কেউ যদি খুন করার উদ্দেশ্য নিয়ে কারও বাড়ি যায় তাহলে একটা বার্থ-ডে পার্টিতে গিয়ে পথনির্দেশ চাইবে, যাতে দশ-পনের জন মানুষ তাকে চিনে রাখে?
– কথাটা আমারও মনে হয়েছিল। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে এই যে, মিসেস সেন সরাসরি জিজ্ঞেস করেননি ‘জীবন হালদারের বাড়িটা আপনারা কেউ চেনেন’? তিনি জানতে চেয়েছিলেন ‘রবি বসুর বাড়ি কোনটা?’
– রবি বসু। সে কে?
– ওপাড়ায় রবি বসু বলে কেউ থাকেই না।
– তাহলে ওভাবে প্রশ্ন করার মানে?
– সেটা তো সন্দেহ জাগাচ্ছে, কারণ রবি বসুর বাড়িটা কেউ চিনতে না পারায় মিসেস সেন বলেছিলেন, ‘রবি থাকে জীবন হালদারের ঠিক পাশের বাড়ি। রবি বলেছিল জীবন হালদারের বাড়িটা সবাই চিনবে।’ এরপর বার্থ-ডে পার্টির দু-তিনজন ওকে চিনিয়ে দেয় জীবন হালদারের বাড়ি কোনটা।
– আই সী! তুমি কি অনুমান করছ জয়া সেনই খুনটা করেছে?
– প্রথমটা তাই ভেবেছিলাম। না হলে বাড়ি থেকে রিভলভার নিয়ে যাবে কেন?
– রিভলভার? জয়ারও রিভলভার আছে না কি?
– না নেই। কাল যেটা কাকলি দেবীর বাড়ি থেকে আবিষ্কার করেছি সেটার কথাই বলছি। আমার সন্দেহ ওটা ছিল জয়া দেবীর হেপাজতে। ইতিমধ্যে টেস্ট-বুলেট পরীক্ষা করা হয়েছে। ঐ রিভলভারের গুলিতেই যে জীবন হালদার ফৌত হয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আর নেই। কিন্তু রাতারাতি যন্ত্রটা কাকলির কাছে চলে গেল কী করে?
– কাকলির অ্যালেবাইটা যাচাই করে দেখেছ?
– দেখিনি। কিন্তু ইতিমধ্যে আরও দু-দুটো ক্লু আবিষ্কৃত হয়েছে। সে জন্যই আপনার কাছে আসা।
– দুটো কু?
– দেখুন স্যার -– আমরা যদি জয়া সেনকে সন্দেহ করতাম, তাহলে নিশ্চয় আপনার কাছে পরামর্শ চাইতে আসতাম না। কারণ আমরা জানি, জয়া দেবী আপনার ক্লায়েন্ট। জয়া দেবীকে আসামী করলে আপনি আর আমি থাকতাম বিপক্ষ শিবিরে। কিন্তু ঘটনাচক্রে এখন আমাদের লক্ষ্যস্থলটা বদলে গেছে। আমরা এখন খুঁজছি যাদুগোপালকে।
– কেন? যাদুগোপাল আবার কী করল?
– প্রথম কথা, যাদুগোপালই শেয়ার সার্টিফিকেটগুলো গচ্ছিত রেখে টাকাটা ধার নিয়েছিল– ব্যাপারটা স্ত্রীর কাছে, শালীর কাছে গোপন রেখেছিল। ক্রমে সে মরিয়া হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় কথা, জয়ার গাড়িখানা পুলিশে উদ্ধার করেছে। এই নিউ আলিপুর এলাকা থেকেই। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, সে গাড়িতে কারও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। বুঝুন কাণ্ড। স্টিয়ারিং হুইল, ডোর হ্যান্ডেল, সারা পলিশড গাড়িতে কারও আঙুলের ছাপ নেই।
– এটা কেমন করে হয়? মিসেস সেন বা যাদুগোপালের আঙুলের ছাপ তো থাকবেই। তারাই ওটা ব্যবহার করে।
– সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু শেষ রাত্রে কেউ যদি মিসেস সেনের মৃতদেহটা এই পর্যন্ত নিয়ে এসে গাড়ি বদল করে লাশ পাচার করে এবং যাবার আগে যদি সব আঙুলের ছাপ মুছে দিয়ে যায়….
জাস্ট এ মিনিট। গাড়ির পাল্লা কি খোলা ছিল না লক করা?
– দ্যাটস দ্য ভাইটাল পয়েন্ট। গাড়িটা লক করা ছিল। সব কাচ ওঠানো। অর্থাৎ যে লোকটা গাড়ি চালিয়ে এসেছিল তার কাছে শুধু ইগনিশন চাবিটাই নয়, দরজার চাবিটাও ছিল। তাই খুব সম্ভব সে যাদুগোপাল।
– তুমি দুটো ক্লুর কথা বলেছিলে। এটাই কি দ্বিতীয় ক্লু?
– না, স্যার। দ্বিতীয় ক্লু আরও রহস্যজনক। এয়ারকন্ডিশনড মার্কেটে আজ সকালে একটি মহিলা গোটা পঞ্চাশ টাকার মাল কিনে একটা হাজার টাকার ট্রাভেলার্স চেক ভাঙাতে চেয়েছিলেন। ক্যাশিয়ারের সন্দেহ হয়, সইটা মিলছে না। ক্যাশিয়ার মহিলাটিকে বলে, আপনার কাছে পঞ্চাশ বা একশ টাকার নোট নেই? বলতেই মেয়েটি একেবারে লাফিয়ে ওঠে। বলে, তার হাতব্যাগে নগদে তিন হাজার টাকা আছে। সেটা সে ট্যাক্সিতে ফেলে এসেছে। বলেই পড়ি তো মরি ছুটে যায় ট্যাক্সির সন্ধানে।
– বুঝলাম। তার সঙ্গে যাদুগোপালের কী সম্পর্ক?
– আপনাকে বলা হয় নি, ট্রাভেলার্স চেকটা ছিল মিসেস জয়া সেনের নামে।
– বল কী! জয়া আজ এয়ারকন্ডিশনড মার্কেট গিয়েছিল
বাধা দিয়ে নিখিল বলে, আজ্ঞে না। এ মেয়েটির বয়স বাইশ-চব্বিশ। রোগা, চটপটে, ফর্সা, প্রয়োজনে হরিণের মতো ছুটতে পারে। আর মিসেস সেন পঁয়ত্রিশের কম নয়, রং কালো, স্থূলকায়া, অসুস্থা। তাছাড়া আমরা পরীক্ষা করে বুঝেছি সইটা জাল।
– কে এই মেয়েটা?
– তা জানা যায়নি। তবে আমার আশঙ্কা সে মেয়েটি যাদুগোপালের প্রণয়িনী। স্ত্রীকে খুন করে যাদুগোপাল বাড়িতে ফিরতে পারছে না। স্ত্রীর হাতব্যাগে সে কিছু ট্রাভেলার্স চেক পেয়েছে। আপাতত তাই ভাঙাবার চেষ্টা করছে।
– আমার বাপু বিশ্বাস হচ্ছে না। যাদুগোপাল তার স্ত্রীকে খুন করবে কেন? বিশেষ করে এভাবে? সম্পত্তির লোভে সে তো অসুস্থ স্ত্রীকে ধীরে ধীরে…
– না স্যার। এমনও হতে পারে যে, জীবন হালদারকে খুনটা করেছে যাদুগোপাল, কিন্তু ঘটনাচক্রে জয়া সেন সেটা দেখে ফেলেছে, তাই রাতারাতি…
হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোনটা। বাসু তুলে নিয়ে আত্মঘোষণা করতেই ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল কাকলির আর্তকণ্ঠ, স্যার, আমি কাকলি বলছি। আপনি এক্ষুণি একবার আমার দোকানে আসতে পারবেন? ভীষণ জরুরি ব্যাপার।
– কী হল আবার?
– এইমাত্র দিদি আমাকে টেলিফোন করেছিল। আপনি, স্যার, এক্ষুনি চলে আসুন। অনেক কথা বলার আছে। টেলিফোনে বলা যাবে না। দিদির গলা শুনেই….
– তুমি ভুল করছ না তো? মানে…
– আমি নিশ্চিত। এ-বিষয়ে আমার ভুল হবে না। কথা বলতে বলতেই দিদির গলার আওয়াজ কেমন যেন হয়ে গেল। ঠিক তখনি স্পষ্ট শুনতে পেলাম যাদুগোপালের কণ্ঠ। ও বললে, কী হল? তুমি অমন করছ কেন? ব্যাস। তারপরেই লাইনটা ডেড।
– ঠিক আছে। হাতের কাজটা সেরেই আমি আসছি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে।
ইন্সপেক্টর দাশ উঠে দাঁড়ায়। বলে, জরুরি ডাক মনে হল?
বাসু মাথা নেড়ে বললেন, বস, বস। ওদের ওসব ফালতু কথা বাদ দাও। আমার এক ধনী মক্কেল। শেষ সময়ে উইলটা পালটাতে চাইছেন। তাঁর ছেলে ফোন করছিল। বুড়ো এ যাত্রা মরবে না। বস তুমি। হ্যাঁ, ভাল কথা, সেই মেয়েটির কী যেন নাম? হ্যাঁ নবনীতা, তার জ্ঞান হয়েছে?
নিখিল আবার বসে পড়ে। বলে না। হলেই আমি খবর পাব। তার জবানবন্দিটা পেলে সমস্যাটা কিছু স্পষ্ট হতে পারে। কারণ জীবন হালদারের সঙ্গে মেয়েটির ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল।
– তাই নাকি? কী ব্যাপার?
নিখিল তার তদন্তেব চুম্বকসার দাখিল করে। ইতিমধ্যে সে জানতে পেরেছে জীবন হালদার পাঁচ-ছয় বছর আগে কোনও এক গ্রাম থেকে নবনীতাকে ভাগিয়ে আনে। মেয়েটির বাবা-মা নেই। মামার বাড়িতে অনাদরে মানুষ হচ্ছিল। ওরা কালীঘাটে গিয়ে বিয়ে করে, যদিও সে বিবাহ আইনত সিদ্ধ নয়, কারণ জীবনের স্ত্রী তখন জীবিত ছিল। জীবন ইলিয়ট রোডে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে নবনীতাকে স্ত্রীর পরিচয়ে রেখেছিল। তারপর ইদানীং দু’জনের মন কষাকষি, ঝগড়াঝাঁটি চলছিল। তাই জীবন ইলিয়ট রোডের বাসা ছেড়ে দিয়ে একাই মোমিনপুরের বাড়িতে চলে যায়। মোমিনপুরে সে নাকি সম্পূর্ণ একা থাকত। কোন চাকর পর্যন্ত থাকত না। এখানে দিনের বেলা তার সঙ্গে দেখা করতে আসত বিভিন্ন পার্টি-মস্তান। আর রাতের বেলা শয্যাসঙ্গিনী। নিখিল আরও খোঁজ নিয়ে জেনেছে, ‘সোনালি-স্বপন’– এর একতলায় পানাহারের আয়োজন আছেবটে, কিন্তু দোতলায় কিছু নিষিদ্ধ কাজ-কারবার হয়। সম্ভবত সাট্টার আড্ডা। ঠিক তাই কিনা নিখিল এখনো জানতে পারেনি। বে-আইনি জুয়া তো বটেই, তবে তেতাস না, সম্ভবত সাট্টা; তথ্যটা জানা যায়নি। হেতুটা বেদনাদায়ক। ও-পাড়ার কিছু পার্টি-ইন-পাওয়ার রাজনৈতিক ‘দাদা’ এবং উচ্চপদস্থ ‘আরক্ষাচূড়ামণি’ জীবনের ঐ গরিবখানায় মাঝে মাঝে পদধূলি দিয়ে থাকে। ফলে নিখিল বেমক্কা’ ঠেকটা রেইড করতে সাহস পায়নি। কিন্তু নবনীতার জবানবন্দি পেলেই সন্দেহজনক মনে হলে সে সার্চ-ওয়ারেন্ট নিয়ে ঐ ‘সোনালি স্বপন’কে দুঃস্বপ্ন করে ছাড়বে।
বাসু জানতে চান, নবনীতার কাছে কী জাতীয় জবানবন্দি আশা করছ তুমি?
– আমি জানি না, স্যার। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস ঐ মেয়েটাকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টা যে করেছে সে ‘সোনালি স্বপন’-এর লোক। বিষের চকলেট প্যাকেটটা বানিয়ে সে প্রতীক্ষায় ছিল। নবনীতার কাছে বোধহয় প্রায়ই উপহার টুপহার আসে। কারণ বিধায়ক আর আরক্ষাপুঙ্গবই নয়, দোতলার ঠেক-এ ঘোড়দৌড় মাঠের মস্তান এবং বুকিরাও নিয়মিত আসে। রেস্তোরাঁর এইসব গ্ল্যামার-গার্ল-এর মাধ্যমে ‘টিপস’-এর লেনদেন হয়ে থাকে। ফলে নবনীতার একাধিক ‘নাগর’ থাকার কথা। ভালবাসার ‘নাগর’ না হলেও ‘টিপস’-এর ‘টিপসি’ নাগর। হত্যাকারী প্রতীক্ষায় ছিল, সুযোগ মতো নবনীতাকে উপহারের সঙ্গে ঐ চকলেট-প্যাকেটটাও মিশিয়ে দিয়েছে। কাকলি দেবী একটা পলিথিন-ব্যাগে না-লেখা ডায়েরিটা পাঠিয়েছিলেন। তার সঙ্গে পৃথক কাগজে শুভেচ্ছাবাণী, কাকলির স্বহস্তে লেখা। হত্যাকারী এ-সুযোগটা হাতছাড়া হতে দেয়নি। পলিথিন ব্যাগের ভিতর চকলেট প্যাকেটটাও ভরে দেয়।
বাসু বললেন, তুমি যা বলছ তা যুক্তিপূর্ণ। না হলে চকলেট প্যাকেটের উপর নবনীতার নাম লেখা যে কাগজটা আঠা দিয়ে সাঁটা আছে তার উপর ঐ টাইপ-রাইটারে লেখা নবনীতার নাম থাকবে কী করে? ‘সোনালি স্বপন’-এ সন্দেহজনক কারও পাত্তা পেয়েছো?
নিখিল একটু চিন্তা করে বলল, না। যে কেউই করতে পারে, কিন্তু ‘মোটিভ’টা কী? আমাদের সঙ্গে যে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলাটি কথা বলেছিলেন– ইর্মা জনসন– তাঁর যথেষ্ট বয়স। নবনীতার প্রতি ঈর্যান্বিতা হবার কোনও হেতু নেই। আরও গোটা-তিনেক গ্ল্যামার-গার্ল ওখানে আসে; কিন্তু তারাই বা নবনীতার প্রতি এতটা ঈর্ষান্বিত হবে কেন? সে তো এখন মালিকের নেক-নজরে নেই। তাই মার্ডার-ব্যাপারে আন্দাজে কোনও থিওরি খাড়া করা গেলেও চকলেটের ব্যাপারটার কোনও কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। অবশ্য যাদুগোপালের সঙ্গে নবনীতার অন্তরঙ্গতা ছিল। এটা অনেকেই বলেছে। তবু হিসাবটা মিলছে না।
এই সময় ইন্টারকমে রাণু দেবী জানালেন, বাসু-সাহেবের কাছে একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসেছেন। নিখিল উঠে দাঁড়ায়। বলে, আপনার অনেকটা সময় নষ্ট করে দিয়ে গেলাম।
বাসু সবিনয়ে বলেন, বিলক্ষণ। অনেক সংবাদও তো দিয়ে গেলে। ঠিক আছে, আবার দেখা হবে। তুমি এই দরজা দিয়ে চলে যাও, নিখিল।
এটা ব্যারিস্টার সাহেবের একটা ওকালতি-স্থাপত্য প্যাঁচ। ওঁর চেম্বারে প্রবেশপথ আর প্রস্থানপথ ভিন্ন। যাতে প্রস্থানকামী না জানতে পারে পরবর্তী সাক্ষাৎপ্রার্থী কোনজন, অথবা প্রবেশকালে কেউ না জানতে পারে পূর্ববর্তী সাক্ষাৎধন্য ব্যক্তিটি কে।
বাসুর অনুমতি পেয়ে পরবর্তী ব্যক্তিটি এসে হাত দুটি জোড় করে নমস্কার করলেন। মেদবহুল মধ্যপঞ্চাশ অবাঙালি। মাথায় কাজ-করা টুপি, কপালে তিলক।
বাসু প্রতিনমস্কার করে বললেন, বৈঠিয়ে বাজোরিয়া-সাব।
আপনি হামাকে চিনেন?
– না, প্রত্যক্ষ চিনতাম না, নামটা শোনা ছিল।
– তব কৈসে মালুম হল কি হামিই আসিয়েছে?
– ও-ঘর থেকে আমার সেক্রেটারি আপনার নামটা ইন্টারকমে জানিয়েছেন বলে। যা হোক, আমাকে এখনি একটা জরুরি কাজে বের হতে হবে। আপনার যা বক্তব্য তা অতি সংক্ষেপে বললে আমার সুবিধা হয়।
বাজোরিয়া অতি সংক্ষেপে নিবেদন করলেন, তিনি রাসু-সাহেবকে তাঁর অ্যাটর্নি হিসাবে নিয়োগ করতে চান – প্রথমত তাঁর পার্টনারের হত্যা-মামলায়, দ্বিতীয়ত, নবনীতার বিষপ্রয়োগ কেস-এ।
বাসু জানালেন, হত্যা-মামলায় তিনি একজনের তরফে কেসটা গ্রহণ করেছেন, ফলে দ্বিতীয় ক্লায়েন্ট নিতে পারছেন না। নবনীতার কেসটা সম্বন্ধে এখনি তিনি কিছু সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম। নবনীতার জ্ঞান ফিরে আসুক। তার জবানবন্দি শোনার পর উনি মনস্থির করবেন।
বাজোরিয়া বললেন, তব এক ইনকার কিজিয়ে। হমাকে জবান দিজিয়ে কি ‘সোনালি স্বপন’ রেস্তোরাঁর প্রেস্টিজ আপনি পাঞ্চার করিয়ে দিবেন না।
– রেস্তোরাঁর প্রেস্টিজ?
– মতলব, ঐ দুকানের নামে কোই কুছ বদনাম না করে। আপনি হমার অ্যাটর্নি না হতে পারেন, লেকিন দুকানের কৌন্সিলর হোতে পারেন। হামি আপনার ফিজ দিব।
বাসু বললেন, আপনি উল্টোপাল্টা কথা বলছেন, মিস্টার বাজোরিয়া – দোকানের কাউন্সিলার আবার কী? দোকান কি আসামীর কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়াতে পারে?
বাজোরিয়া জোড় হস্তে তাঁর বিচিত্র ভাষায় নিবেদন করেন যে, বাসুসাহেব অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তিনি বিলক্ষণ প্রণিধান করেছেন কী উদ্দেশ্য নিয়ে বাজোরিয়া ওঁর দ্বারস্থ হয়েছেন। ইতিমধ্যে পুলিশে একবার দোকান রেইড করেছে। যদি সার্চ-ওয়ারেন্ট নিয়ে তল্লাসী করে তাহলে দোকানের বিলক্ষণ বদনাম হয়ে যাবে। জীবন ফৌত হয়েছে। এখন বাজোরিয়াই একক মালিক। জীবনের বিধবাকে– হ্যাঁ, দেশঘরে তার স্ত্রী আর নাবালকেরা আছে – বেশ কিছু অর্থদান করে বাজোরিয়া ‘সোনালি স্বপন’-এর একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসতে চান। এর সঙ্গে হত্যা বা বিষ-প্রয়োগের কোনও সম্বন্ধ নেই। উনি ব্যারিস্টার বাসুকে সে কাজে নিয়োগ করতে চান।
বাসু বললেন, এসব হচ্ছে দেওয়ানী ব্যাপার। উনি এ জাতীয় কাজ করেন না, এজন্য অন্য একজাতের আইনজীবী…
বাধা দিয়ে বাজোরিয়া বলেন, হামি জানি বাসু-সাহেব। আপনি শুধু জবান দিন, হালদার হত্যা মামলায় ‘সোনালি স্বপন’কে আপনি বেইজ্জৎ করবেন না। কী ‘ফিজ’ দেব হুকুম করেন।
বাসু বলেন, ওটাকে ‘ফিজ’ বলে না, মিস্টার বাজোরিয়া, বলে ‘ঘুষ’! আপনি উঠুন, আমার কাছে কোনও সুবিধা হবে না।
– আপনি পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রিফিউজ করছেন?
– এই সহজ কথাটা বুঝতে এত সময় লাগছে আপনার?
