তেরো
বাসু-সাহেবের মেজাজ খারাপ। সঙ্গত হেতুতে। প্রসিকিউশনের তরফে আদালতে আবেদন করা হয়েছিল যেন কমলেশ-হত্যা মামলার শুনানির দিন একপক্ষকাল পিছিয়ে দেওয়া হয়। হেতু? বাদীপক্ষ এখনও নানান তদন্ত করছে– সময় লাগবে’কেস টা সাজাতে।বিচারক প্রতিবাদীপক্ষের মতামত জানতে চান। বাসু বলেন, প্রতিবাদীপক্ষ ডিফেন্সের জন্য তৈয়ার। বাদীপক্ষের আবেদন-মোতাবেক মামলার দিন শুধু পনেরো দিন কেন – ছয় মাস পিছিয়ে দিলেও তাঁর আপত্তি নেই – কিন্তু শর্তসাপেক্ষ : আসামিকে জামিন দিতে হবে। জীবিকায় আসামি একজন নার্স– বিনা বিচারে হাজতে রেখে দেওয়ায় তার দৈনিক উপার্জন বন্ধ।
বিচারক প্রতিবাদীর আবেদন গ্রাহ্য করেননি। তবে বাদীপক্ষের আবেদনও পুরোপুরি মেনে নেননি।
মামলার তারিখ সাতদিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র। জামিন দেওয়া হয়নি। জামিন না-মঞ্জুর হওয়ার একটা সম্ভাব্য হেতু: পুলিস-কর্তৃপক্ষ ত্রিদিবনারায়ণের বিবৃতির অংশবিশেষ সাংবাদিকদের মধ্যে বিতরণ করেছে। কাগজে ছাপা হয়েছে ত্রিদিবের অভিযোগ। একটি সদ্যোবিবাহিতা বিয়ের কনে স্বামীকে জোরালো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অভিসারে গিয়েছিল – এমন একটা মুখরোচক কিস্সা খবরের কাগজ লুফে নিল। বিচারক সেজন্যই প্রভাবিত হলেন কিনা বোঝা গেল না। মোটকথা, সে জামিন পায়নি।
ওই দিন সন্ধ্যায় আদালত থেকে ফিরে আসার পরেই রানুদেবী খবর দিলেন, দু-টো কথা বলার আছে। তুমি আদালত বেরিয়ে যাবার পর কোর্ট-পেয়াদা নোটিস সার্ভ করে গেছে। তোমার মক্কেল ছন্দা রাওয়ের বিরুদ্ধে। বিবাহ-নাকচের আবেদন। শুনানীর দিন: শুক্রবার, বেলা সাড়ে দশটা, আলিপুর কোর্ট-এ তিন নম্বর এজলাসে। তোমার ডায়েরিতে লিখে রেখেছি।
বাসু বললেন, এটা তো প্রত্যাশিত সংবাদ। ছন্দার বিবাহটা নাকচ না হওয়া পর্যন্ত কমলেশ-হত্যা মামলা শুরু হতে পারছে না যে!
– জানি। ত্রিদিব যতক্ষণ আইনত ছন্দার স্বামী, ততক্ষণ বাদীপক্ষ ত্রিদিবকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলতে পারবে না। সেজন্যই ওরা মামলার দিন পিছিয়ে নিচ্ছে, যাতে তার আগেই বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলাটার ফয়সালা হয়ে যায়।
বাসুসাহেব কোটটা গা থেকে খুলতে ব্যস্ত ছিলেন। ওই অবস্থাতেই বললেন, ব্যারিস্টারের বউ হয়ে এমন একটা বে-আইনি কথা বলতে পারলে তুমি?
সুজাতা ছিল পাশেই। উপরপড়া হয়ে বলে, কেন? মামিমা কী ভুল বললেন?
বাসু কোটের আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে বসেছেন। পাইপ-পাউচ বার করতে করতে বললেন, ওদের বিবাহ-বিচ্ছেদমঞ্জুর হয়ে গেলেও ত্রিদিব আদালতে উঠে সাক্ষী দিতে পারবে না, যদি তার ভূতপূর্ব স্ত্রী আপত্তি জানায়।
– কেন?
– কারণ ঘটনার রাতে ওরা স্বামী-স্ত্রী ছিল। আজ এখন বিবাহ-বিচ্ছেদ মঞ্জুর হলে ওদের অতীতকালের দাম্পত্য জীবনটা কপূরের মতো তো উপে যায় না।
সুজাতা জানতে চায়, তাহলে ওদের উদ্দেশ্যে কী? কমলেশ-হত্যা মামলার তারিখ পিছিয়ে ওরা এত তাড়াহুড়ো করে বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলাটা আদালতে আনছে কেন?
– আরে বাপু, নোটিসটা পড়ে দেখ। এটা কি ডিভোর্স পিটিশন? আদৌ নয়! এটা ‘অ্যানালমেন্টের’ মামলা। ওরা বলতে চায় যে, ছন্দা বিশ্বাস আর ত্রিদিব রায় এক বিছানায় সাত রাত শুয়েছে, এই মাত্র। ওদের বিবাহটাই অসিদ্ধ। কারণ পনেরোই জুন তারিখে যখন ছন্দা বিশ্বাস আর ত্রিদিব রাও ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে উপস্থিত হয় তখন ওদের একজন – ছন্দা ছিল অন্যপূর্বা, বিবাহিতা। তার প্রথম পক্ষের স্বামী কমলেশ বিশ্বাস ওই তারিখে জীবিত ছিল! সুতরাং ওই ‘ছন্দা-ত্রিদিব’ শুভবিবাহ গোড়া থেকেই অসিদ্ধ– ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’।
– এটা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে ত্রিদিব তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারবে।
– আবার বে-আইনি কথা! ‘স্ত্রী’-র বিরুদ্ধে হচ্ছে কোথায়? বিয়েটা যদি শুরু থেকেই অসিদ্ধ প্রমাণিত হয়, তখন ত্রিদিবের চোখে ছন্দা তো একজন ভারতীয় নাগরিক মাত্র, যে ওর বিছানায় সাতরাত শুয়েছে – স্ত্রী নয়। ফলে ছন্দার বিরুদ্ধে সে সাক্ষী দিতে পারবে না কেন? সে যাই হোক, তোমার দ্বিতীয় দুঃসংবাদটা কী? দুটো খবর দেবার আছে বলেছিলে না?
– হ্যাঁ, দ্বিতীয়টা দুঃসংবাদ নয়। ড ব্যানার্জি ফোন করেছিলেন। বলেছেন, তুমি এলেই যেন ওঁর চেম্বারে একটা ফোন কর।
– ড. ব্যানার্জি! সে এখনও কলকাতায়?
– কেন? তাঁর কি বাইরে যাবার কথা ছিল?
– ধরত ডাক্তারকে। লোকটা এভাবে আত্মহত্যা করতে চাইছে কেন?
একটু পরেই ডাক্তার-সাহেবকে ফোনে ধরা গেল। ব্যানার্জি বললেন, আরে মশাই, ডাক্তার মানুষ কি রাতারাতি বেড়াতে যেতে পারে? যাব পরশু। টিকিট কেটেছি, হোটেলেও রিজার্ভেশন করেছি। দু-একটি রুগী মরতে বাকি আছে। সেগুলো সেরেই…
– আমাকে ফোন করতে বলেছিলেন কেন?
– আমার নার্সিং হোমের একটি পেশেন্ট আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। দিন-চারেক আগে তার গল-ব্লাডারটি কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই শয্যাগত। না হলে তিনি নিজেই আপনার সঙ্গে গিয়ে দেখা করতেন।
– কী নাম ভদ্রলোকের?
– ভদ্রলোক নয়। ভদ্রমহিলা। বেহালা অঞ্চলে একটা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস্ শকুন্তলা দত্ত।
– অ! তা কী বিষয়ে তিনি আমার পরামর্শ চান সে কথার কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ। প্রথম কথা, তিনি আপনার পরামর্শের জন্য সাক্ষাৎটা চাইছেন না– ওই কমলেশ বিশ্বাসের মার্ডার কেসের কিছু তথ্য আপনাকে জানাতে চান।
– রিয়ালি? আমি এখনি আসছি। আধঘণ্টার ভিতর।
রানী দেবী জানতে চান, চা-টা খেয়ে যাবে না?
– টী ক্যান ওয়েট, টাইম কান্ট!
কোটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে আবার গিয়ে উঠলেন গাড়িতে।
ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়নি। শকুন্তলা দত্তের কেবিনে তিন-চারজন দর্শনার্থী। ডাক্তার ব্যানার্জি বাসু-সাবকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই অন্যান্য দর্শনার্থীরা উঠে দাঁড়াল। ব্যানার্জী পরিচয় করিয়ে দিলেন। শকুন্তলা বললেন, আপনি আমার খুবই পরিচিত, যদিও আজই আপনাকে চাক্ষুষ দেখলাম।
বাসু বলেন, ভা-রি নতুন কথা বললেন! ও-কথা তো আমিও বলতে পারি!
– কোন কথা?
– আপনি আমার খুবই পরিচিত, যদিও আজই আপনাকে চাক্ষুষ দেখলাম!
– আমি আপনার পরিচিত?
– আলবৎ। আপনি বড়িষা বেহালার মেয়েদের স্কুলে হেডমিস্ট্রেস্। আপনারা দুই বোন, আপনার ছোটোবোনের নাম অনসূয়া কর…
ওঁদের কেবিনে প্রবেশের পর যারা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে একটি মেয়ে হঠাৎ কথার মধ্যেই নিচু হয়ে বাসু-সাহেবকে প্রণাম করল। বাসু জানতে চান, কী হল? তোমার আবার হঠাৎ ভক্তি উথলে উঠল কেন?
শকুন্তলা বলেন, ওই আমার ছোটোবোন অনু।
– অ! আর যে ছেলেটি আপনাকে সেই তেরোই আগস্ট, মানে সেই চুরাশি সালের কথা বলছি – আপনাকে বেলেঘাটার বস্তিতে নিয়ে গেছিল।
– আশ্চর্য! তারিখটাও মনে আছে আপনার? আমি তো ডায়েরি না দেখে…
এবার অনসূয়ার পাশে দাঁড়ানো যুবকটি নিচু হয়ে বাসু-সাহেবকে প্রণাম করে।
বাসু দু-হাত ওর দুই কাঁধে ফেলে বললেন, থাক, থাক। তা হ্যাঁ গো, বিয়েটা সেরে ফেলেছ তো? এখন তো আর কোনো বাধা নেই।
অনসূয়া মাথা নিচু করে। ছেলেটিও অপ্রস্তুত। জবাব দিলেন শকুন্তলা। বললেন, আমি বাড়ি ফিরে একটু সুস্থ হলেই সে আয়োজন করব। আপনাকে আসতে হবে কিন্তু।
– চেষ্টা করব। ভালোমন্দ খেতে পেলে ছাড়ি না, বামুন না হলেও! তা ডেকে পাঠিয়েছিলেন কেন? – কমলাক্ষর পূর্ব-ইতিহাস সম্বন্ধে কোনো সাক্ষ্যের প্রয়োজন হলে আমি রাজি আছি। প্রয়োজনে অনসূয়াও আদালতে উঠে সাক্ষী দেবে।
বাসু বলেন, কমলাক্ষ ওরফে কমলেশ ওরফে কমলেন্দু যে ধোয়া তুলসী পাতা ছিল, এমন দাবী পুলিস করেনি। ফলে আমরা সদলবলে মৃত মানুষটার চরিত্রহনন করে কোনোভাবেই লাভবান হব না। তবু তোমাদের নাম-ঠিকানাগুলো লিখে দাও।
অনসূয়া নাম-ঠিকানা লিখে দিল। অস্ফুটে বললে, আপনি যদি সময় করে সেদিন আসতে পারেন দারুণ – দারুণ খুশি হব।
– তাই বুঝি। কিন্তু কোন্ দিনটার কথা বলছো, বল তো? সাল তারিখ আমার ঠিক মনে থাকে না।
অনসূয়া গোলাপি হাসি হাসে!
– ডাক্তার ব্যানার্জি ওঁকে নিজের কোয়ার্টার্সে নিয়ে এলেন। বললেন, কী খাবেন বলুন? চা, কফি, না ড্রিংক্স?
– ড্রিংক্স! তারও আয়োজনও আছে না কি? তা তোমার গার্জেনটিকে দেখছি না যে?
– গার্জেন?
– তোমার সেই কনফিডেনশিয়াল নার্স?
– ও, সে তো নার্সিংহোমে। কেন? দরকার আছে?
– আছে বৈ কি। গদাধরকে তো দেখছি না, তাহলে কফিটা বানাবে কে?
ডাক্তার ব্যানার্জি নার্সটিকে ডেকে পাঠালেন। বাসু তাকে বললেন, তোমার নামটা জানি না, তুমি বলছি। তা, আমার উপর আর রাগ নেই তো, মা?
নার্সটি সলজ্জে ওঁকে প্রণাম করে বলল, তখন তো আপনার সঠিক পরিচয় পাইনি। আমার নাম জবা দে।
– তিন কাপ কফি বানাও তো মা, জবা। মানে, তুমিও এককাপ খাবে, ধরে নিয়ে বলছি। আমারটা ‘র’।
জবা হেসে সম্মতি জানিয়ে কিচেনেটের দিকে চলে গেল।
ডাক্তার বলেন, ছন্দার কেসটা কেমন বুঝছেন, বলুন?
বাসু বললেন, ডাক্তার আমাকে যা অ্যাডভাইস্ করে আমি তা কিন্তু শুনে থাকি–
– হঠাৎ এ কথা?
– তাহলে কনভার্স থিওরেমটা ট্রুহবে না কেন? তুমিই বা ব্যারিস্টারের অ্যাডভাইস মেনে নেবে না কেন?
– আরে মশাই, ছুটিতে যাব বললেই কি যাওয়া যায়?
– যায়, ডক্টর ব্যানার্জি। তোমার হাতে যে-কটা জরুরি কেস আছে তা তোমার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দাও। তোমার পক্ষে এখন কলকাতায় পড়ে থাকা অত্যন্ত বিপদজনক। আমি যেভাবে জানতে পেরেছি যে, সাতাশে মার্চ অষ্টআশি সালে তোমার নার্সিং-হোমে একটি ক্যানসার রুগি মারা যায় – তোমার রেজিস্টার খাতার অনুযায়ী সে রুগির নাম…
– বুঝেছি, বুঝেছি। সেভাবে পুলিসেও তথ্যটা আবিষ্কার করতে পারে…তাহলেই আমার সমূহ বিপদ, নয়? আচ্ছা, আপনি ও খবরটা জানলেন কী করে?
– সে প্রশ্ন বান্তর, ড. ব্যানার্জি! তোমাকে বরং আর একটা খবর দিয়ে রাখি, যা অত্যন্ত জরুরি…
– কী সেটা?
– ছন্দা পুলিসের কাছে একটা জবানবন্দি দিয়েছে। আমার নির্দেশ না মেনে। সে স্বীকার করেছে যে, শনিবার রাত একটা নাগাদ সে ওই কমলেশের বাড়িতে গেছিল। তার জবানবন্দি অনুসারে সে ওই বাড়ির সামনে যখন যায় তখন দোতলার ঘরে আলো জ্বলছিল। একটা বচসা চলছিল। হঠাৎ কাচের কিছু একটা ভেঙে যাওয়ার শব্দ হয়। আর তৎক্ষণাৎ আলোটা নিবে যায়। ছন্দা নাকি তখন কলবেলটা টিপে ধরে। একটু পরে ওর মনে হয় দরজা খুলে কে যেন ছুটে বেরিয়ে গেল। তখন ও ভয় পেয়ে ফিরে আসে!
– আশ্চর্য! এ ঘটনা – মানে প্রায় ওই রকম– ঘটনা তো বাস্তবে ঘটেছে আমার ক্ষেত্রে।
– আমি জানি। একটা কথা খেয়াল করে দেখ। পুলিস জানে, কমলেশ যখন খুন হয় তখন বাড়ির বাইরে কেউ একজন কলবেল বাজাচ্ছিল। এ তথ্যটার দু-দুটো সূত্র! পানওয়ালা বটুক এবং তার স্ত্রী। পুলিস এও জানে যে, যে লোকটা কলবেল বাজাচ্ছিল সে বাড়ির বাইরে ছিল। ফলে সে হত্যাকারী হতে পারে না। তোমাকে যদি পুলিস ট্রেস করতে পারে, তাহলে তোমার জবানবন্দি নেবে। তখন দেখা যাবে তোমরা দু-জনেই ওই দাবিটা করছ– তুমি ও ছন্দা! দু-জনেই নিজ নিজ স্টেটমেন্ট অনুযায়ী ঘটনার সময় ফুটপাথে। কলবেল বাজাচ্ছ! এর মধ্যে একজন নিশ্চয় মিথ্যে কথা বলছে! পুলিস বিশ্বাস করবে যে, মিথ্যা কথাটা বলেছে ছন্দা। সহজবোধ্য হেতুতে। যেহেতু ছন্দা হচ্ছে অ্যাকিউজড্! এজন্য তোমার পক্ষে কলকাতায় থাকাটা…
মাঝপথেই থেমে গেলেন বাসু-সাহেব। কারণ ঠিক তখনই পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করল জবা। তার হাতে একটা ট্রে-তে তিন কাপ কফি, বিস্কিট। একটা কাপে র-কফি।
কফি পরিবেশন করতে করতে জবা বললে, আপনারা নিশ্চয় এতক্ষণ আমার নিন্দে-মন্দ করছিলেন, তাই নয়?
ডাক্তার ব্যানার্জি বলেন, এ-কথা কেন?
– আমি আসা মাত্র আপনাদের আলোচনাটা বন্ধ হয়ে গেল।
বাসু কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, নিন্দে-মন্দ নয় গো, ডাক্তার এতক্ষণ তোমার প্রশংসা করছিল। তা তোমার সামনেই তোমার প্রশংসা করলে তোমার পায়া-ভারী হয়ে যাবে, তাই ও মাঝপথে থেমে পড়েছে।
– প্রশংসা! ফুঃ! স্যার শুধু একটি নার্স-এরই প্রশংসা করতেন, কিন্তু সে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। আপনার মক্কেল!
বাসু কথাটা ঘোরাবার জন্য বলেন, তুমি কোথায় থাকো গো, জবা?
– বেলঘরিয়ায়।
– ডেলি-প্যাসেঞ্জারি কর?
– উপায় কী?
– তোমার বাড়িতে আর কে আছে?
– মুন্না– আমার পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে– ননদ আর শাশুড়ি।
ওঁকে ইতস্তত করতে দেখে জবা আরও বলে, মুন্নার বাবা এখন দিল্লিতে পোস্টেড।
ঠিক ওই সময় বাইরে থেকে কে যেন কলবেল বাজালো
জবা তার কাপটা নামিয়ে রেখে পর্দা সরিয়ে কক্ষান্তরে চলে গেল, সদর খুলতে। ঠিক বোঝা গেল না, মনে হল সদর দরজার কাছে একটা চেঁচামেচি গোলমাল। জবার কণ্ঠস্বর শোনা গেল:কী পেয়েছেন আপনারা? জোর করে ভিতরে ঢুকছেন কোন্ সাহসে?
কথাটা তার শেষ হল না। পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল শার্ট-প্যান্ট পরা দু-জন লোক। তার পিছন-পিছন জবা। দর্শনমাত্র বাসুসাহেব চিনতে পারেন ওদের – যাকে বলে ‘শাদা-পোশাকী পুলিশ গোয়েন্দা’। দু-জনেই মুখচেনা।
তৎক্ষণাৎ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান বাসু। জবাকে বলেন, ওঁদের বাধাদিও না, জবা। শাদা পোশাকে আছেন বটে, তবে ওঁরা পুলিস। লালবাজার হোমিসাইড সেকশনের।
লোক দুটি বিরক্ত হয়। বোধকরি তারা এত শীঘ্র নিজেদের পরিচয় দিতে চাইছিল না। দর্শনার্থীদের ভেক ধরে কিছু জেনে নেবার ইচ্ছে ছিল ওদের।
বাসু ডাক্তারের দিকে ফিরে বললেন, ঠিক আছে ডাক্তার! ব্লাড-টেস্ট করিয়ে রিপোর্টটা নিয়ে আসব কাল-পরশুর মধ্যেই। তুমি ফি নিলে না – আমি পীড়াপীড়ি করব না, বরং বলব ওকালতি পরামর্শের প্রয়োজন হলে অসংকোচে ফোন কর। একটা কথা এখনই বরং বলে যাই – এই দুজন লালবাজারি ভদ্রলোকের কোনো প্রশ্নের জবাব না দেবার সাংবিধানিক অধিকার তোমার আছে…
– ব্যস! ব্যস! ব্যস! যথেষ্ট হয়েছে। এবার আপনি আসুন বাসু-সাহেব!
দু-জন এসে দাঁড়ায় বাসু-সাহেবের দু-পাশে।
বাসু-সাহেবের চোখ দুটো ধ্বক করে একবার জ্বলে উঠল। তিনি পকেট থেকে নামাঙ্কিত একটি কার্ড বার করে টেবিলের উপর রেখে বললেন, এঁরা দু-জন কেন এসেছেন তা আমি জানি না। আন্দাজ করতে পারি। সম্ভবত তোমাকে লালবাজারে নিমন্ত্রণ জানাতে। আমার টেলিফোন নাম্বারটা তোমার মানিব্যাগে ভরে রাখ। প্রয়োজনে আমাকে ফোন কর।
একজন বলে ওঠে, আপনাকে উনি ফোন করবেন কেমন করে, স্যার? যে কেঁস-এ ওঁকে নিমন্ত্রণ জানাতে এসেছি সে কেস-এ আপনি তো আপনার ঘোড়া আগেই ধরে বসে আছেন! এক মার্ডার কেস-এ তো দু-জন নেওয়া চলে না। দু-জনের ইন্টারেস্ট ক্ল্যাশ করেতে পারে। পারে না?
বাসু ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম ডাক্তার, তাহলে ওদের একটা প্রশ্নেরও জবাব দিতাম না! আচ্ছা চলি! গুড লাক টু এভরি-বডি!
আলিপুর আদালতে ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড সেশনস জাজ প্রণব মুখার্জি তাঁর চেম্বার থেকে আদালতে ঢুকে নিজের আসনে বসতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেলেন। চশমার উপর দিয়ে আদালত-কক্ষের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে কোর্ট-পেশকারকে প্রশ্ন করেন, কী ব্যাপার? এখন তো সেই ‘অ্যানালমেন্ট’ কেসটা হবার কথা?
পেশকার সসন্ত্রমে বলে, আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর। ‘দ্যা কেস অব্ রাও ভার্সেস রাও’ অর্থাৎ ছন্দা দেবী বনাম ত্রিদিবনারায়ণ।
– হুঁ। কিন্তু আদালতে এত লোক কেন তাহলে?
বিচারকের ডানদিকে দর্শকের আসনে বসেছিলেন পাব্লিক প্রসিকিউটার নিরঞ্জন মাইতি। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এঁদের কিছু লোক বাদী অথবা প্রতিবাদীর আত্মীয়-বন্ধু, কিছু আলিপুর আদালতের উকিল এবং কিছু সাংবাদিক। বাদী বা প্রতিবাদীর তরফে কোনো আপত্তি না থাকায় এঁরা কেসটা শুনতে এসেছেন। সবাই আশা করছেন, এটা একটা উল্লেখযোগ্য মামলা হিসাবে রেকর্ডেড হয়ে থাকবে। তাই সকলে উৎসাহী।
জজসাহেব জানতে চান, আপনি কি বাদীপক্ষের অ্যাটর্নি?
– আজ্ঞে না, হুজুর। বাদীপক্ষের অ্যাটর্নি অ্যাডভোকেট গোপালচন্দ্র রায় – এই ইনি। আমি দর্শকমাত্র। বাদী একটি হত্যা-মামলার সাক্ষী এবং প্রতিবাদী ওই মামলারই আসামি। তাই স্টেটের স্বার্থ দেখতে আমি উপস্থিত আছি।
বিচারক এবার তাঁর টেবিলে দাখিল করা ফাইলটা তুলে নিয়ে পড়লেন, ‘দ্য কেস অব রাও ভার্সেস রাও।’ বাদী শ্রীত্রিদিবনারায়ণ রাও, সান অব ত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও অব নাসিক। তাঁর পক্ষে আছেন অ্যাডভোকেট শ্রীগোপালচন্দ্র রায়।
বাদীপক্ষের গাউনপরা একজন উকিল উঠে দাঁড়ালেন। মুখেও বললেন, ইয়েস, য়োর অনার।
প্রতিবাদী শ্রীমতী ছন্দা রাও, ‘নে’ বিশ্বাস – এঁর তরফে কাউন্সেল আছেন শ্রী পি. কে. বাসু বারঅ্যাট-ল।
প্রতিবাদীর তরফে বাসু-সাহেব হাত তুলে আত্মঘোষণা করলেন।
বিচারক জানতে চাইলেন, আপনাদের দু-জনের মধ্যে কারও দাবী নেই যে, আদালত-কক্ষে দর্শক বা প্রেসের লোক থাকবে না?
গোপালচন্দ্র একটি ‘বাও’ করে বললেন, বাদীর তরফে নেই হুজুর। আমরা মনে করি, হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্টে কী কী প্রভিশন্স আছে, কীভাবে তার প্রয়োগ হয়, তা জনসাধারণের জানা বাঞ্ছনীয়। ঘটনাচক্রে এক্ষেত্রে বাদী একজন ধনকুবেরের একমাত্র ওয়ারিশ এবং প্রতিবাদী একটি হত্যা মামলার বিচারাধীন আসামি। তাই এ বিষয়ে সাধারণের যথেষ্ট কৌতূহল জাগ্রত হয়েছে। আমরা তা প্রশমিত করতে চাই না।
পি. কে. বাসুর দিকে ফিরে বিচারক বললেন, আপনার কী অভিমত?
বাসু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি সহযোগীর সঙ্গে একমত। ঘটনাচক্রে বাদীর পিতা ধনকুবের শ্রীত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও স্বয়ং পুত্র ও পুত্রবধূর বিবাহ নাকচের মামলায় উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর প্রাসাদ থেকে পুত্রবধূকে বিতাড়ন করতে! প্রতিবাদী আইনসঙ্গত অধিকার বলে তাঁর শ্বশুরমশাইকে সে-অপরাধে আদালতকক্ষ থেকে বিতাড়ন করতে চান না।
ত্রিবিক্রমের কর্ণমূল রক্তাক্ত হয়ে উঠল। তিনি পাথরের মূর্তির মতো বসেই রইলেন।
বিচারক বললেন, অল রাইট। কিন্তু প্রেসের তরফে যাঁরা এসেছেন তাঁদের আমি আগেভাগেই জানিয়ে রাখছি, আদালতের ভিতর তাঁরা যেন কোনো ফটো না তোলেন।
বিচারকের নির্দেশে আদালতকক্ষের দু-পাশের দু-টি দরজা খুলে গেল। বাদী ও প্রতিবাদী প্রহরাধীন অবস্থায় আদালতে প্রবেশ করলেন। ঘটনার রাত্রিপ্রভাতে ছন্দা ঘুম ভেঙে উঠে দেখেছিল তার শয্যার বাকি আধখানা খালি। তারপর থেকে দু-জনের আর সাক্ষাৎ হয়নি। ছন্দা তাই নিজের অজান্তেই অস্ফুট একটা শব্দ উচ্চারণ করে দ্রুত পায়ে ত্রিদিবের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। আদালত-কক্ষে একজন মহিলা-আরক্ষা কর্মী তার গমনপথে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে তাকে রুখল।
ত্রিদিব স্ত্রীর দিকে দৃষ্টিপাত মাত্র করেনি। মাথা সোজা রেখে সে ধীরপদে এগিয়ে গেল তার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটার দিকে। বোধকরি ঘটনাচক্রেই সেই চেয়ারটি খালি রাখা ছিল তার স্বনামধন্য পিতৃদেবের পাশেই।
ছন্দা শুধু হতাশ নয়, কিছুটা অপমানিত বোধ করল। ধীরপদে সে এসে বসল বাসু-সাহেবের পাশে খালি চেয়ারে।
বিচারক আদালতের নীরবতা ভঙ্গ করে ঘোষণা করলেন, বাদী এবং প্রতিবাদী দু-জনেই এতক্ষণ ছিলেন পুলিশের হেপাজতে। প্রতিবাদী একটি হত্যা মামলার জামিন-প্রত্যাখ্যাত আসামি হিসাবে এবং বাদী ওই মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসাবে। আদালতের সম্মুখে যে বিচার্য মামলাটি রয়েছে দেখা যাচ্ছে বাদীর সেই আবেদনপত্রটি পাবলিক প্রসিকিউটারের দপ্তর ঘুরে এসেছে। তাতে একটি নোটও আছে। বিচার্য মামলাটি একটি রেজিস্ট্রি করা বিবাহ ‘আনাল’ বা নাকচ করা সংক্রান্ত। আবেদনপত্রে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিবাহকালে প্রতিবাদীর স্বামী জীবিত ছিলেন এবং সে কারণে ত্রিদিবনারায়ণ ও ছন্দাদেবীর বিবাহটা অসিদ্ধ। আমরা বর্তমানে এই তথ্যটি শুধু যাচাই করে রায় দেব। তার বাইরে কোনো কিছু আলোচনা করা চলবে না। আমি আরও স্পষ্ট ভাষায় পূর্বে দু-পক্ষকে জানিয়ে রাখতে চাই যে, দুই পক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষীদের জেরা করতে গিয়ে ওই হত্যা মামলা সংক্রান্ত কোনো তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা আদালত অনুমোদন কররে না। আশা করি আমার বক্তব্যটা দু-পক্ষই প্রণিধান করেছেন।
ত্রিবিক্রম পাথরের মূর্তির মতো নিস্পন্দ বসে রইলেন; কিন্তু নিরঞ্জন মাইতি স্পষ্টতই খুশি হয়ে বলে বসলেন, হ্যাঁ, হুজুর!
বাসু কোনো জবাব দিলেন না। নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
আদালতে উপস্থিত প্রতিটি আইনজীবী বুঝতে পারলেন যে, মামলা শুরু হবার আগেই প্রতিবাদীপক্ষ হারতে শুরু করেছে। বিচারক ক্রস এগজামিনেশন করার অধিকার কেড়ে নিয়ে শুধু বাসু-সাহেবকেই বঞ্চিত করলেন:কারণ ছন্দাকে বাদীপক্ষের উকিল কোনো মারাত্মক প্রশ্ন করলে বাসু-সাহেব অনায়াসে বলতে পারেন যে, সে জবাব দেবে না; কারণ জবাব দিলে সে নিজেকেই ‘ইন্ক্রিমিনেট’ করবে – হত্যা-মামলায় স্বীকৃতি হিসাবে সে জবাব গৃহীত হবার আশঙ্কা আছে। অপরপক্ষে বাদী পক্ষের উকিলের সে সুযোগ ছিল না। সেই সুযোগটুকুই বিচারকের নির্দেশে এখন লাভ করলেন গোপালবাবু।
অ্যাডভোকেট গোপালচন্দ্র রায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বাদীপক্ষের প্রথম সাক্ষী: শ্রীত্রিদিবনারায়ণ রাও।
ত্রিদিব তার বাবার দিকে তাকাল। ত্রিবিক্রম ওর পিঠে একটা হাত রাখলেন। ত্রিদিব উঠে দাঁড়াল। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে এল। শপথবাক্য পাঠ করার সময় তার অশান্ত চুলের গোছাটা নেমে এল বাঁ-চোখের উপর। ত্রিদিব হাত দিয়ে সেটা সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
– আপনার নাম শ্রীত্রিদিবনারায়ণ রাও?
– ইয়েস।
– আপনি আলিপুরের বাসিন্দা? কলকাতায় থাকেন?
– ইয়েস।
– প্রতিবাদী ওই শ্রীমতী ছন্দা রাওকে আপনি চেনেন?
– চিনি।
– ওঁকে প্রথম কোথায় দেখেন?
– বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে সানি-সাইড নার্সিং-হোমে। ওঁকে আমি নাইট-নার্স হিসাবে নিয়োগ করেছিলাম।
– পরে, মানে নার্সিং-হোম থেকে বাড়ি ফেরার পরে, ওই ছন্দাদেবীকে আপনি রেজিস্ট্রি-মতে বিয়ে করেন, এ কথা সত্যি?
– সত্যি।
– তারিখটা মনে আছে আপনার?
– আছে। পনেরোই জুন।
– বর্তমান বছরে? এই একানব্বই সালে?
– ইয়েস।
গোপালচন্দ্র বিচারকের দিকে ফিরে বললেন, আমার সওয়াল শেষ হয়ে গেছে হুজুর!
নাটকীয়ভাবে বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললেন, য়োর উইটনেস্।
বাসু হাসি হাসি মুখে বললেন: নো কোশ্চেনস্।
গোপালচন্দ্র বসে পড়েছিলেন। পুনরায় উঠে দাঁড়ালেন। সবিস্ময়ে বললেন, মানে? আপনি ক্রস করতে চান না?
বিচারক ত্রিদিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি নেমে আসুন।
গোপালচন্দ্র এবং ত্রিদিব দু-জনেই বিস্মিত। ওঁরা কেউই এটা প্রত্যাশা করেননি। বাসু-সাহেবের জোরালো সওয়ালের জবাব কীভাবে দিতে হবে তার অনেক তালিম নিতে হয়েছিল ত্রিদিবকে। দেখা গেল, বৃথাই। দর্শকদের মধ্যেও বিস্ময়ের অনুভূতিটা সংক্রামিত হয়েছে মনে হল। কিছুটা হতাশাও। ফিস্-ফিস্ গুজ-গুজ শুরু হতেই বিচারক তাঁর কাঠের হাতুড়িটা ঠুকলেন। আদালতে নিস্তব্ধতা ফিরে এল।
গোপালচন্দ্র বললেন, য়োর অনার! এবার আমি প্রতিবাদীকে সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়াতে অনুরোধ করব। কিন্তু তার পূর্বে আমি নিবেদন করতে চাই যে, ‘আন্ডার দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিওর’ আমি প্রতিবাদীকে ‘অ্যাডভার্স পার্টি’ হিসাবে ধরে নিয়ে সওয়াল করব। এবং সেটা করব, প্রতিবাদীপক্ষের কাউন্সেল তাঁকে সাক্ষী হিসাবে কাঠগড়ায় তোলার পূর্বেই।
বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে তাকিয়ে দেখলেন।
বাসু গোপালচন্দ্রকেই প্রশ্ন করলেন, প্রতিবাদীকে জেরা করে আপনি কী তথ্য প্রতিষ্ঠা করতে চান?
গোপালচন্দ্রের ভ্রূকুটি হল। বললেন, সে-কথা আমি আগেভাগে জানাতে বাধ্য নই। আমার স্ট্র্যাটেজি আমি সহযোগীকে আগেই জানিয়ে দেব কেন?
বাসু বললেন, আদালত যে নির্দেশ দিয়েছেন সেই অনুসারে আমি জানতে চাইছি- আপনি প্রতিবাদীকে জেরা করে কী তথ্য প্রতিষ্ঠা করতে চান? সেটা জানলে, আমরা হয়তো তা ‘স্টিপুলেট’ করতে পারি।
– পারেন। আবার নাও পারেন? আমি কী প্রতিষ্ঠা করতে চাই তা আগেভাগে জেনে নিয়ে আপনিএ-কথাও বলতে পারেন যে, আপনি তা ‘স্টিপুলেট’ করছেন না, মেনে নিচ্ছেন না। তখন? ‘আন্ডার দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিওর’ আমি আমার অধিকার সম্বন্ধে রুলিং চাইছি।
বিচারক বাসু সাহেবের দিকে তাকিয়ো প্রশ্ন করেন, প্রতিবাদীকে সাক্ষীর মঞ্চে ওঠানোতে আপনার আপত্তি আছে, কাউন্সেল?
বাসু বলেন, নো, ইয়োর অনার! আমি শুধু আদালতের সময় বাঁচাতে চাইছি। সহযোগী তাঁর অধিকারের প্রশ্ন তুলেছেন- ‘আন্ডার দ্য কোড অব্ সিভিল প্রসিডিওর’।আমি জানতে চাই: প্রতিবাদীর কাউন্সেল হিসাবে আমার অধিকার আছে কিনা আমার মক্কেলকে নির্দেশ দেবার যে, সহযোগীর প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে সে বলবে: ‘এ প্রশ্নের জবাব আমি দেব না,কারণ তাহলে পরবর্তী হত্যা-মামলায় আমি নিজেকেই ‘ইনক্রিমিনেট’ করব’! এমনকি সহযোগী যদি তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করেন,তার হাতঘড়িতে কটা বাজে তা জানতে চান? তাহলেও? সো হোয়াট? আমিও আদালতের রুলিং চাইছি। ‘আন্ডার দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিওর’ আমার কি সে অধিকার নেই?
বিচারক চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লেন।
গোপালচন্দ্র নিরুপায় ভাবে বললেন, অল রাইট! আমি বলছি, প্রতিবাদীকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলে কী তথ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি। একনম্বর: আপনি কি মেনে নেবেন যে, এবছর পুনেরোই জুন বিবাহের পূর্বে যখন প্রতিবাদী ছন্দা বিশ্বাস ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের খাতায় সই করেন তখন তাঁর পূর্বতন স্বামী জীবিত ছিল? সেই পূর্বতন স্বামীর নাম কমলেশ বিশ্বাস, ওরফে কমলাক্ষ কর, ওরফে কমলচন্দ্র ঘোষ? যে লোকটি এ বছর বাইশে জুন তারাতলায় মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্ট-এ মধ্যরাতে হত হয়েছে?
– হ্যাঁ, আমরা মেনে নিচ্ছি।
গোপালচন্দ্র যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। বিচারকের কপালে একটা ভ্রূকুটি- চিহ্ন ফুটে উঠল। তিনি উভয়ের দিকে একবার করে দেখে নিয়ে নীরবে রুমাল দিয়ে চশমার কাঁচটা মুছতে শুরু করলেন।
হঠাৎ গোপালচন্দ্র আবার বাত্ময় হয়ে ওঠেন:
– আমি প্রতিবাদীকে আরও একটি বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাই: পাম অ্যাভেন্যু যেখানে বন্ডেল রোডে পড়েছে তারই কাছাকাছি সানি-সাইড নার্সিং-হোমে উনি নার্স হিসাবে চাকরি করতেন কি না?
– হ্যাঁ, আমরা মেনে নিচ্ছি। করতেন।
– এবং ওই নার্সিং-হোমে, তিন বছর আগে সাতাশে মার্চ উনিশশো অষ্টআশি সালে একজন রুগি লাং ক্যানসারে ভুগে মারা যায়, যার নাম কমলেশ বিশ্বাস- আমি প্রতিবাদীকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, তিনি ওই কমলেশ বিশ্বাসকে চেনেন কি না?
বাসু বললেন, আপনার পূর্ববর্তী প্রশ্নের উত্তরে আমরা স্টিপুলেট করেছি যে, এ বছর পনেরোই জুন প্রতিবাদী ছন্দা বিশ্বাস যখন ত্রিদিব রাওকে বিবাহ করে তখন ছন্দার পূর্ববর্তী স্বামী কমলেশ বিশ্বাস জীবিত ছিল। সেই ‘স্টিপুলেশন’ মোতাবেক তিন বছর আগে অন্য কোথাও ওই একই নামের আর একজন লোক লাং ক্যানসারে মারা গিয়েছিল কী না, সেটা বর্তমান মামলার পক্ষে ইমেটিরিয়াল, ইরেলিভেন্ট! আই অবজেক্ট!
বিচারক রায় দিলেন : অবজেকশন ইজ সাসটেইন্ড। প্রসিড্!
গোপালচন্দ্র বললেন, তাহলে আমার আর কোনো বক্তব্য নেই।
বাসু উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, প্রতিবাদী পক্ষের প্রথম সাক্ষী শ্রীমতী অনসূয়া কর।
নকিবের ব্যবস্থাপনায় নামটা ঘোষিত হল। পাশের ঘর থেকে একটি মেয়ে – বছর ত্রিশ-বত্রিশ বয়স তার-সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়িয়ে শপথ নিল।
– তোমার নাম অনসূয়া কর?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– তুমি কুমারী, বিবাহিতা না বিধবা?
– আমি বিধবা।
– তোমার স্বামী কত তারিখে মারা গেছেন?
– এ বছর বাইশে জুন।
– কোথায়?
– তারাতলায়। মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টের মেজানাইন ঘরে।
– তার নাম কমলেশ বিশ্বাস?
– আমি জানতাম তাঁর নাম কমলাক্ষ কর। খবরের কাগজে তাঁর মৃত্যুর খবর পড়ে আমার দিদির সঙ্গে কমলেশ বিশ্বাসের ‘ইনকোয়েস্ট’-এর সময় আমি দেখতে গিয়েছিলাম। তাঁকে তখন চিনতে পারি। তাই আমি জানি, কমলেশ বিশ্বাস আর কমলাক্ষ কর একই ব্যক্তি।
– তুমি নিঃসন্দেহ যে, তোমার স্বামী কমলাক্ষ কর এবং মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টে নিহত কমলেশ বিশ্বাস একই ব্যক্তি?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ।
– তুমি তাঁকে কি হিন্দু-মতে বিবাহ করেছিলে, না রেজিস্ট্রি ম্যারেজ?
– রেজিস্ট্রি ম্যারেজ।
– কত তারিখে?
– পাঁচ সেপ্টেম্বর উনআশি সালে।
– তুমি কি তোমার রেজিস্ট্রি-বিবাহের সার্টিফিকেটের একটি জেরক্স কপি এবং তোমাদের যুগলে তোলা ছবি নিয়ে এসেছ। এনে থাকলে আমাকে দাও।
মেয়েটি একটি সার্টিফিকেট এবং একটি ফটো বাসু-সাহেবকে দেয়।
বাসু সে-দুটি গোপালচন্দ্রকে দেখতে দিলেন। বললেন, প্রতিবাদী তরফের এব্জিবিট হিসাবে এ দুটি আদালত দাখিল করতে চাই।
গোপালচন্দ্র তড়াক করে উঠে দাঁড়ান। বলেন, ইয়োর অনার! আমি এই সাক্ষীর জবানবন্দী আদ্যোপান্ত নাকচ করার আর্জি জানাচ্ছি। প্রশ্নোত্তরের সবটাই ‘ইনকম্পিটেন্ট, ইররেলিভেন্ট অ্যান্ড ইমেমটিরিয়াল’ – অপ্রাসঙ্গিক এবং প্রক্ষিপ্ত। কমলাক্ষ কর আর কমলেশ বিশ্বাস একই লোক কী না প্রমাণ হয়নি। আর হলেই বা কী? লোকটা বিবাহ-বিশারদ ছিল-এমন কথা সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। হয়তো এমন বিয়ে সে আরও পাঁচটা করেছে। তাতে কী? প্রতিবাদী তাঁর প্রথম পক্ষের স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারতেন। তা তিনি করেননি।
বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বলেন, আপনি কি কিছু বলবেন?
বাসু একটি বাও করে বলেলেন, ইয়োর অনার! ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘হংস যা ভক্ষণ করে তা হংসীও খেতে পারে।’ আমার মনে হয় ওর কন্ভার্সটাও ট্রু! অর্থাৎ ‘হংসী যা ভক্ষণ করতে পারে, হংসও তা পারে! ‘ অর্থাৎ যে কারণে বিচক্ষণ সহযোগী ছন্দার সঙ্গে ত্রিদিবের বিবাহটা নাকচ করতে চাইছেন সেই হেতুটাই ওঁরই যুক্তি-মোতবেক নাকচ হয়ে যাচ্ছে। সহজ ভাষায়: কমলেশ বিশ্বাস যখন ছন্দাকে বিবাহ করে তখন কমলেশের পূর্বতন পত্নী অনসূয়া দেবী জীবিতা। সুতরাং আন্ডার দ্য স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট নং ফর্টি-থ্রি অব নাইন্টিন সিক্সটি-ফোর, আন্ডার সেকশন ফোর, ছন্দার সঙ্গে কমলেশের রেজিস্ট্রি বিবাহ অসিদ্ধ। তার ফলে, ছন্দা যখন ত্রিদিবকে বিবাহ করে তখন আইন মোতাবেক ছন্দার কোনো পূর্বতন স্বামী ছিল না। সে ছিল অবিবাহিতা। অর্থাৎ ত্রিদিব এবং ছন্দার বিবাহ সে-কারণে নাকচ করা যায় না।
নিরঞ্জন মাইতি এই সময় বলে ওঠেন, কিন্তু কমলাক্ষ কর আর কমলেশ বিশ্বাস যে একই লোক তা-তো প্রমাণ হয়নি।
বাসু বলেন, অ-প্রমাণ করার দায় বাদীপক্ষের। যতদিন তা অ-প্রমাণ করতে না পারছেন ততদিন ওই অজুহাতে ছন্দা ও ত্রিদিবের রেজিস্ট্রি-বিবাহ নাকচ করা যায় না। অন্তত ততদিন ওরা বৈধ স্বামী-স্ত্রী!
বিচারক দু-পক্ষের উকিলকে প্রশ্ন করলেন, তাঁদের আর কারও বক্তব্য আছে কি না। দু-জনেই জানালেন, না, নেই।
এবার বিচারক স্বয়ং সাক্ষীকে প্রশ্ন করেন, তোমাকে এবার আমিই দু-একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি, মা। প্রথমে বলতো, তুমি ওই কমলেশ বিশ্বাসের ইন্কোয়েস্টে কেন গেছিলে? তুমি তো কমলেশ বিশ্বাসের নামও জানতে না।
অনসূয়া বলল, না হুজুর, জানতাম। ওই ছন্দা দেবী যখন কমলেশ বিশ্বাসের সঙ্গে বেলেঘাটার বস্তিতে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে বাস করতেন, তখন আমার দিদি সেখানে খোঁজ নিতে গেছিলেন। তিনি আমার স্বামী কমলাক্ষ করের ফটো ওই প্রতিবাদী বিশ্বাসকে দেখান এবং ছন্দা দেবী চিনতে পারেন। বুঝতে পারেন যে, আমরা দু-জন একই লোকের স্ত্রী। তাই হুজুর, আমি খবরের কাগজে কমলেশ বিশ্বাসের নাম দেখে তাঁকে চিনতে পারি।
কিন্তু স্বচক্ষে মৃতদেহ দেখতে যাবার মূল প্রেরণাটা কী?
অনসূয়া বিচারকের চোখে-চোখে রেখে অকপটে বলল, আমি জানতে গেছিলাম যে, দ্বিতীয়বার বিবাহ করার অধিকার আমার এতদিনে বর্তেছে কি না। আমার স্বামী আমার গহনা চুরি করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল।
– তুমি তাহলে নিঃসন্দেহ যে, ওই মৃত ব্যক্তি আর তোমার স্বামী একই লোক?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, য়োর অনার।
– এবার তুমি মঞ্চ থেকে নেমে এস, মা। হয়তো বর্তমান মামলার পক্ষে এটা অপ্রাসঙ্গিক হচ্ছে, তবু আমি খুশি মনে তোমাকে আশীর্বাদ করছি– তোমার এই দ্বিতীয়বারের বিবাহ সুখের হোক।
অনুসূয়া সাক্ষীর মঞ্চের রেলিঙে মাথাটা ঠেকালো প্রণামের ভঙ্গিতে।
বিচারক কোর্ট-পেশকারের দিকে ফিরে বললেন, লিখে নাও: জাজমেন্ট! বাদীর দাবি নাকচ করা হল। কোর্ট ইজ্ অ্যাডজর্নড।
বিচারক উঠে দাঁড়ালেন। সবাই উঠে দাঁড়ায়। বিচারক কক্ষ ত্যাগ করেন। ছন্দা হঠাৎ এগিয়ে যায় ত্রিদিবের দিকে। মহিলা-পুলিশ ওর বাহুমূল ধরে ফেলে। ছন্দা তাকে ধমকে ওঠে, আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। ছাড়ুন! শুনলেন না– ওই ভদ্রলোক আমার স্বামী?
ত্রিবিক্রমনারায়ণ দৃঢ়মুষ্টিতে পুত্রের বাহুমূল ধরেছিলেন। তাকে আকর্ষণ করে বললেন, চলে এস।
ছন্দা তাঁকেও ধমকে উঠল: ওয়েট! আপনি কী রকম ভদ্রলোক মিস্টার রাও? এটিকেট জানেন না? পুত্র ও পুত্রবধূর মধ্যে যখন জনান্তিক আলাপ হয় তখন সেখানে শ্বশুরকে থাকতে নেই – এটা আপনাদের ‘শক্তাবৎ খানদানে’ কেউ শেখায়নি?
ত্রিবিক্রমনারায়ণ বজ্রাহত হয়ে গেলেন। একটি পালিক প্লেসে কোনো একজন মরমানুষ যে তাঁকে এভাবে প্রকাশ্যে অপমান করতে পারে তা ছিল তাঁরদুঃস্বপ্নেরবাইরে। তবু ধুরন্ধর ব্যবসায়ী মুহূর্তে সামলে নিলেন নিজেকে। বললেন, তুমি যে এখনও খুনের মামলায় জামিন-না-পাওয়া আসামী, বউমা! এই সময় সর্বসমক্ষে স্বামী-সম্ভাষণের অধিকার থাকে না। যাও মা, হাজতে যাও!
জবাবে ছন্দা কী-যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার পূর্বেই ত্রিদিব বলে উঠল, তাছাড়া শক্তাবৎ রাজবংশে কেউ কখনও দ্বিচারিণী স্ত্রীর সঙ্গে বাক্যালাপ করে না। চল, ড্যাডি!
এবার বজ্রাহত হবার পালা ছন্দার।
সে শুধু অস্ফুটে বললে: কী বললে? দ্বিচারিণী?
ত্রিদিব জবাব দিল না। এবার সেই আকর্ষণ করল তার বাবাকে। ওরা সবাই ততক্ষণে আদালত কক্ষ থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। আর তৎক্ষণাৎ দু-তিনটে ক্যামেরা বিদ্যুৎচমকে এই দাম্পত্য-কলহের ক্ষণিক উন্মাদনাকে শাশ্বত করে ধরে রাখল।
মহিলা-পুলিশ ছন্দার বাহুমূল ধরে এগিয়ে চলল পুলিশ-ভ্যানটার দিকে। গাড়িতে উঠতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো ছন্দা। বলল, কই, উনি কোথায়?
– কে?
– আমার কাউন্সেলার? মিস্টার পি. কে. বাসু?
বাসু-সাহেব এগিয়ে এসে বললেন, এখানে কোনো কথা নয়, ছন্দা। আমি হাজতে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করব।
