এগারো
– ইন্সপেক্টার বরাট যখন মৃতের মুখের কাপড়টা সরিয়ে দিচ্ছিল তখন তুমি খুব নার্ভাস ফীল করছিলে, না টুকু?
– ঠিক নার্ভাস নয় সুজাতাদি, একটা মিশ্রিত অনুভূতি। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল কোথাও একটা কিছু ভুল হয়েছে। মৃত লোকটা জেঠু নয়, হতে পারে না।
– কেন? কেন এমন মনে হল?
ওরা কথা বলছিল গাড়ির পিছনের সীটে। ফেরার পথে। ড্রাইভারের আসনে বাসু-সাহেব ব্যাক-ভিয়ু-মিররটা একটু সরিয়ে-নড়িয়ে দিলেন, যাতে স্মরণিকার মুখখানা দেখা যায়। কৌশিক তার গাড়ি নিয়ে ঐ জি. জি. সি. এল.ক্যাম্পাসে রয়ে গেছে। পুলিশ তদন্তের পরে পরিস্থিতিটা সমঝে নিতে। সম্ভব হলে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে। টুকু বলল, আমার প্রথম খটকা লাগে ঐ ব্রীফ-কেস-এর কথাটায়। তারপর জেঠুর লেটার-হেডের খবরটায়।
বাসু অস্ফুটে আপন মনে একটা স্বগতোক্তি করেন: এক্সলেন্ট!
পিছনের আসনে কথোপকথনরত ওদের তা কানে যায় না।
সুজাতা জানতে চায়, কেন?
– আমি জেঠুকে হাসপাতাল থেকে সরাসরি ঐ মোটেলে অপসারণ করি। তখন তাঁর কাছে কিছু ছিল না – স্রেফ খালি-হাত। ওঁকে ঘরে রেখে পই-পই করে বারণ করে দিয়ে যাই, যাতে উনি ঘরের বাইরে না আসেন। খাবার আর পানীয় জল ওঁর নাগালের মধ্যে রেখে দিয়ে আসি। আদালতে আসার পথে গ্রিন্ডলেজ-ব্যাঙ্ক থেকে ঐ ব্যাঙ্ক-ড্রাফটগুলো ক্যাশ করে নিই। আবার আদালত থেকে ফেরার পথে এই লোকাল মার্কেট থেকেই ওঁর জন্য কিছু সওদা করি: শেভিং সেট, মাথার তেল, টুথব্রাশ, পেস্ট, একটা গেঞ্জি, পাজামা-টি-শার্ট। আর কিনে আনি চীনে-খাবার। চাও মিঙ আর চিলি-চিকেন জেঠুর প্রিয় খাবার। উনি চাইছিলেন আমরা দুজনে খাবারটা ভাগ করে খাই। আমি রাজি হইনি। বেশি রাত্রে একা ডায়মন্ড-হারবার রোডে ড্রাইভ করতে সাহস হচ্ছিল না। তাই একটা কার্টনে অর্ধেকটা খাবার তুলে নিয়ে আমি যদু কলোনিতে ফিরে আসি। সুতরাং ওঁর ঘরে ব্রীফ-কেস কেমন করে আসবে? আর আমার অজ্ঞাতসারে সারাদিনে কেউ যদি এসে থাকে, ভুলে একটা ব্রীফ-কেস ফেলে গিয়ে থাকে, তাহলে তার ভিতর জেঠুর লেটার-হেড প্যাড আসবে কেমন করে?
বাসু-সাহেব গাড়িটাকে রাস্তার বাঁ-দিক ঘেঁষে দাঁড় করালেন।
সুজাতা জানতে চায়, কী হল? ইঞ্জিনে কিছু ট্রাব্ল দিচ্ছে?
– দিচ্ছে। গাড়ির এঞ্জিনে নয়, আমার মাথার ভিতর। এই মওকায় টুকুকে কয়েকটা প্রশ্ন করে নিতে চাই। তুমি এক কাজ কর তো সুজাতা: সামনের ঐ পাঞ্জাবী হোটেলে বলে এস, তিন-পেয়ালা চা এই গাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। ‘স্পেশাল চায়ে’।
সুজাতা বুঝতে পারে, চা-তৃষ্ণা জেগেছে বলে নয়, উনি টুকুকে এমন কিছু প্রশ্ন করতে চান, যা ‘প্রিভিলেজড কার্সেশন’, যা তৃতীয় ব্যক্তির শোনা বারণ। বিনা বাক্যব্যয়ে সে এগিয়ে যায় হোটেলটার দিকে।
– এবার সংক্ষেপে বল তো টুকু, হাসপাতাল থেকে রওনা হবার পর ঠিক কী কী ঘটেছে? আমি বুঝে নিতে চাই, ঐ বিলাসসিং যাদব কেমন করে তোমার পাত্তা পেল। তোমাকে কি ঐ হাসপাতাল থেকে কেউ ফলো করছিল?
– করে থাকলে তা আমি টের পাইনি। আমি যখন হাসপাতাল থেকে বের হই তখন সবে সূর্য উঠছে। লোকজনের চলা-ফেরা শুরু হয়নি। দারোয়ান গেট এ ছিল না। হাসপাতাল থেকে গাড়িটা বেশ কিছুটা দূরে পার্ক করেছিলাম – ধরুন একশ গজ। এটুকু পথ জেঠু আমার হাত ধরে হেঁটেই চলে এলেন। ত্রিসীমানায় অন্য গাড়ি পার্ক করা ছিল না। মোটেলটার অবস্থান আমার জানা ছিল। সেখানে এসে যখন পৌঁছলাম তখনো বেশ সকাল। তিন-নম্বর ঘরখানা নিজের নামে বুক করি। জেঠুকে নিয়ে ঘরে উঠে যাই। ওদের মোটেল-ঘরে রান্নাবান্নার কোনও আয়োজন নেই। মানে ‘কিচেনেট’ নেই। এক কেটলি জলও গরম করে নেবার ব্যবস্থা নেই। একটা প্লাগ-পয়েন্ট অবশ্য আছে। তাই ঐ রেস্তোরাঁতে চা আর খাবারের অর্ডার দিয়ে আসি। ওরা মোটেলে সার্ভ করে, সাভিস চার্জ নিয়ে। বাথরুমে সাবান, তোয়ালে, গীজার আছে। আমি জেঠুকে স্নান করিয়ে দিই। স্নানান্তে আবার সেই একই পোশাক পরতে হয় তাঁকে। আমি নিজেও স্নান করে নিই গরমজলে। ততক্ষণে জেঠু বেশ স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন। ওঁকে ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে যাওয়াটা অমানুষিকতা। কিন্তু আগের দিন সন্ধ্যায় টি.ভি.-তে ওঁকে ‘নিরুদ্দিষ্ট মানুষ’ হিসাবে দেখানো হয়েছে। তাই জেঠুকে ব্যাপারটা বোঝাবার চেষ্টা করি। তিনি বুঝতে পারেন এবং আমাকে কথা দেন সারাটা দিন উনি ঘরের বাইরে আসবেন না। রেস্তোরাঁ থেকে কিছু চিকেন-স্যান্ড্রুইচ, সিদ্ধ ডিম আর এক গ্লাস দুধ এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম। বললাম, দুপুরে তাই খেতে। আমার ভ্যানিটি-ব্যাগে একটা পেপার-ব্যাক থ্রিলার ছিল, সেটা ওঁকে পড়তে দিয়ে গেলাম। আর ওঁর কোটের ইনসাইড পকেটে আপনার দেওয়া টাকাও ভরে দিলাম…
– এটা কেন করলে টুকু? ওঁর শারীরিক আর মানসিক যা অবস্থা…
– দুটো কারণে করলাম, মেসোমশাই। একটা সাইকলজিকাল, একটা প্রাকটিকাল। জেঠুকে তো জন্ম থেকে চিনি। ‘রেডি ক্যাশ’ না থাকলে তিনি কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করেন। আমাদের স্টিল-আলমারিতে সব সময় পাঁচ-সাত হাজার টাকা নগদে থাকত। এমনকি দশ-বারো বছর আগে, যখন দেড়-দু-হাজারে গোটা সংসারযাত্রা নির্বাহ হত। তাছাড়া ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে সব সময় থাকে লাখ টাকার উপর। অকারণে। স্বল্পমেয়াদী আমানত করাতেও ওঁর মত হত না। তাই আমার মনে হল, পকেটে টাকা থাকলে সারাটা দিনে উনি মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবেন। দ্বিতীয় কথা, আমার আশঙ্কা ছিল যে-কোন সময় আমাকে পুলিশে ধরতে পারে– কল্যাণী দাসীর ছদ্মবেশে জেঠুকে অপহরণ করার অপরাধে। সেক্ষেত্রে ওঁর কাছে টাকা না থাকলে উনি কেমন করে আত্মরক্ষা করবেন? তাই আদালতে যাবার আগেই ওঁকে টাকাটা দিয়ে গেলাম…
– বুঝলাম। যা হোক, এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বিলাস সিং যাদব তোমার গতিবিধির উপর নজর রেখেছিল। ঠিক কোন স্টেজ থেকে জানি না, কিন্তু সে আন্দাজ করেছিল– যেটা আমিও করিনি– তুমি ওঁকে অপহরণ করবে। ফলে তোমার অজ্ঞাতসারে সে তোমাকে অনুসরণ করে। তুমি তিন-নম্বর কামরা বুক করার পর সে দুই-নম্বর ঘরখানা বুক করে।
– সেক্ষেত্রে ওরা পুলিসে খবর দিয়ে জেঠুকে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করল না কেন?
– ‘ওরা’ মানে?
– ঐ বিলাসসিং আর চৌবে-কাকু?
– তুমি ধরে নিচ্ছ কেন যে, বিলাসসিং ঐ চৌবে-কাকুর জ্ঞাতসারে এখানে এসেছিল? মোটেল-ম্যানেজার প্রাথমিক এজাহারে বলেছে, বিলাসসিং যাদব যে গাড়িখানা নিয়ে এসেছিল সেটা অ্যাম্বাসাডার। অর্থাৎ চৌবের ‘স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড’ নয়। সে স্বনামে ঘরটা বুক করেনি; কিন্তু অ্যাম্বাসাডার গাড়িটার নম্বর গোপন করতে পারেনি: WBC 0732। কৌশিককে বলেছি, রেজিস্ট্রেশন কার নামে তার পাত্তা নিতে। সে যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে বিলাসসিং তার ব্রীফ কেস-এ সেন-মশায়ের লেটারহেড প্যাডটা নিয়ে এসেছিল। সম্ভবত তাঁকে দিয়ে জোর করে কিছু লিখিয়ে নিতে। ভয় দেখিয়ে। সেই লেটার-হেড প্যাডের সূত্র ধরেই পুলিস ধরে নিয়েছিল মৃতের নাম সত্যানন্দ সেন। আর বিলাসসিং যাদবের নামটা ইন্সপেক্টর বরাট আগে কখনো শোনেনি; কারণ ব্ল্যাকমেলার বিলাসসিং ঘরটা ‘বুক’ করে ছদ্মনামে। এ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে। এখন আমাদের দুটি বিকল্প সম্ভাবনার কথা চিন্তা করতে হবে। প্রথম সম্ভাবনা: ধনঞ্জয় চৌবে কোনক্রমে চোরের উপর বাটপাড়ি করতে পেরেছে। তা যদি করে থাকে, অর্থাৎ চৌবে যদি সত্যানন্দকে এখান থেকে অপহরণ করে থাকে, তাহলে আমাদের সমূহ সর্বনাশ। কারণ আবার তাহলে ঐ বিষৌষধ আর ইনজেকশন চলতে থাকবে, যতদিন না সত্যানন্দ একেবারে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যান। তখন ওরা তাঁকে পথে ছেড়ে দেবে। পুলিসে তাঁকে উদ্ধার করলেও আর জানা যাবে না, কী-ভাবে তিনি বদ্ধ উন্মাদ…
কথার মাঝপথেই থেমে পড়েন বাসু সাহেব। দেখেন, আঁচলে মুখ লুকিয়ে টুকু নিঃশব্দে কাঁদছে। শব্দ হচ্ছে না, কিন্তু ওর পিঠটা ফুলে ফুলে উঠছে। বাসু ড্রাইভারের সীট থেকে একটা হাত ওর পিঠে রাখলেন। বললেন, মনকে শক্ত কর, টুকু। উই মাস্ট ফাইট ব্যাক্। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাস্তবে তা ঘটেনি। ঘটতে পারে না…
অশ্রুআর্দ্র মুখখানা তুলে টুকু প্রশ্ন করে, কেন?
– কারণ ব্যাপারটা চৌবের কাছে এত সহজ হত না। প্রথমবার চৌবে আর যাদব যৌথভাবে ওঁকে পাকড়াও করে নিয়ে গিয়েছিল। এবার তা নয়। ওরা দুজন দু-পক্ষে। সত্যানন্দও এবার দৃঢ় প্রতিবাদ করতেন। দৈহিক ক্ষমতায় না হলেও চিৎকার-চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করার ক্ষমতা তাঁর নিশ্চয় ছিল। ছিল না?
– তা ছিল। আর দ্বিতীয় সম্ভাবনা?
– দ্বিতীয় সম্ভাবনা, তোমার জেঠু স্বেচ্ছায় মোটেল ছেড়ে চলে গেছেন।
– কিন্তু কেন? তিনি তো জানতেন, আমি ফিরে আসব?
টুকুর চোখে চোখ রেখে উনি বলেন, তার একমাত্র সম্ভাব্য হেতু: সত্যানন্দ সেনই বিলাস সিং যাদবকে হত্যা করেছেন…
– তা কেমন করে সম্ভব? জেঠু বৃদ্ধ, বিলাস…
– লুক হিয়ার! বাস্তবে কী ঘটেছে তা তুমিও জান না, আমিও জানি না। ধর, ঘটনা যদি এইখাতে বয়ে থাকে? বিলাসসিং আন্দাজ করেছিল যে তুমি জেঠুকে অপহরণ করবে। ধরা যাক, তুমি যখন কল্যাণী দাসী সেজে ওখানে চাকরির সন্ধানে যাও তখন বিলাস ছিল ঐ সতের নম্বর কেবিনে। সে সেখান থেকে তোমাকে দেখতে পায়। বুঝতে পারে তোমার উদ্দেশ্য। বস্তুত সেও চাইছিল সত্যানন্দকে অপহরণ করতে। চৌবের স্বার্থে, নিজেরও – যাতে ডক্টর কৈলাশনাথ তোমার জেঠুকে পরীক্ষা করতে না পারেন। যখন সে দেখল যে, তাদের কাম্য কাজটুকু তুমিই করে দিতে প্রস্তুত তখন সে খুশিই হল। ষাঁড়ের শত্রু বাঘে খেলে তার আপত্তি নেই। বিলাস মনস্থ করল খবরটা চৌবের কাছে গোপন রাখবে। সত্যানন্দের কাছ থেকে মোটা হারে ব্ল্যাকমেলিং-এর টাকা নিতে থাকবে। ধরা যাক, শান্তিনীড়ের দারোয়ানকে সে টাকা দিয়ে রাজি করালো। তাই তুমি যখন তোমার জেঠুকে নিয়ে পালিয়ে আস তখন দারোয়ান গেট-এ ছিল না। বিলাস সিং ছিল তোমার অপহরণ প্রতীক্ষায়, তোমার অলক্ষ্যে! হল? এ পর্যন্ত কোনও অসঙ্গতি কি তোমার নজরে পড়েছে?
– আজ্ঞে না। এমন হওয়া অসম্ভব নয়।
তুমি সকাল সাতটায় মোটেলের তিন নম্বর ঘরটা ‘বুক’ করলে। ধরা যাক, ঠিক তার পরেই বিলাসসিং ছদ্মনামে ‘বুক’ করল ঠিক পাশের ঘরখানা। দিনের বেলা বহু লোকজনের যাতায়াত। সে সুযোগের অপেক্ষায় সারাটা দিনমান নিজের ঘরেই স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে থাকল। এমনকি রেস্তোরাঁয় খেতে পর্যন্ত গেল না। পাছে তোমার বা তোমার জেঠুর মুখোমুখি পড়ে যায়। তারপর তুমি রাত আটটা নাগাদ চাইনীজ ফুড রেখে যদু কলোনিতে ফিরে যাবার পর বিলাস এ-ঘরে এসে ‘নক্’ করল। তুমিই ফিরে এসেছ মনে করে সত্যানন্দ দরজা খুললেন। ঘরের ভিতরে এল বিলাস…বল, ঘটনা যদি এই খাতে বয়ে থাকে তাহলে কী হতে পারে?
আপনিই আন্দাজ করুন।
– বিলাস আদৌ চৌবের বন্ধু নয়। সে ধানবাদ থেকে কলকাতা এসেছে টাকার লোভে। ধনঞ্জয়কে শোষণ করতে। ধরা যাক, সে তোমার জেঠুকে বলল, নগদ এক লক্ষ টাকা পেলে সে ধনঞ্জয়কে খবরটা জানাবে না। নাহলে সে পুলিসে খবরটা জানিয়ে দেবে। পুলিস আবার ওঁকে ধরে নিয়ে যাবে সেই শান্তিনীড়ে। ধরা যাক, সত্যানন্দ বললেন, তাঁর কাছে নগদ টাকা নেই, চেকও তিনি কাটতে পারছেন না আদালতের আদেশে। তাহলে কীভাবে তিনি টাকাটা দেবেন? এইসব কথাবার্তার সময় হঠাৎ বিলাস এর নজর পড়ল খাবারের প্যাকেটটার দিকে। অথবা সে হয়তো লুকিয়ে দেখেছিল তোমাকে দোকান থেকে চাইনীজ খাবারের প্যাকেটটা আনতে। সে অভুক্ত, ঘরের ভিতর সারাটা দিনমান আত্মগোপন করে আছে। এখন সে বৃদ্ধের নৈশাহারটা গোগ্রাসে গিলতে থাকে। ধরা যাক, সুযোগমতো সত্যানন্দ ঐ ঘুমের ট্যাবলেটগুলো ওর খাবারে মিশিয়ে দিলেন। তাহলে কী হবে? একটু পরে বিলাসের প্রচণ্ড ঘুম পাবে। সে চেয়ার ছেড়ে বিছানায় গিয়ে বসবে। ধরা যাক, সত্যানন্দ ওর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দেন – কীভাবে তিনি মুক্তিপণটা দিতে সক্ষম হবেন। বিলাস হয়তো একটু পরে পা দুটি লম্বা করে দেবে। শেষমেষ ঘুমিয়ে পড়বে…আমার ধারণা তাই যদি ঘটে থাকে, তাহলে তোমার জেঠু ঘুমের ওষুধটা ওর খাবারে মিশিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তির বাসনায়, হত্যার ইচ্ছা নিয়ে নয়। কিন্তু প্রত্যাঘাতের ক্ষমতাহীন শয়তানটাকে দেখে হয়তো উনি লোভ সামলাতে পারেননি। হয়তো তীব্র প্রতিশোধ-স্পৃহা…অথবা হয়তো বুঝেছিলেন – ঐ শনিগ্রহ চিরটা জীবন ওঁর পিছন পিছন ঘুরবে..ইন ফ্যাক্ট, আমরা তো জানি না – অসহায় পেয়ে ইতিপূর্বে ঐ বৃদ্ধের উপর বিলাসসিং কী জাতের পৈশাচিক অত্যাচার করেছে। তাই সত্যানন্দ ঘর ছেড়ে যাবার আগে গ্যাস-পাইপের চাবিটা খুলে দিয়ে যান।
স্মরণিকা ধীরে-ধীরে দু-দিকে মাথা নাড়ল – ‘না’-য়ের ভঙ্গিতে।
– কেন নয়? কী অসঙ্গতি দেখলে?– জানতে চাইলেন বাসু।
– এ সলুশন জেঠুর চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। গায়ে মশা বসলে জেঠু চাপড় মারতেন না, হাত নেড়ে মশাটাকে উড়িয়ে দিতেন।
– সে ক্ষেত্রে হত্যাপরাধ আর একটিমাত্র লোকের উপর বর্তায়।
– সে কে?
– তুমি।
– আমি? না মেসো! সুযোগ পেলে আমি হয়তো তা করতাম। কিন্তু তারও অনেক আগেই আমি যদু কলোনিতে ফিরে গেছি।
– জাস্ট আ মিনিট! এইমাত্র তুমি বললে, ‘সুযোগ পেলে আমি হয়তো তা করতাম’! তার মানে কী? ধর সুযোগ পেলে; ঘরে তুমি আর যাদব – জেঠু তার অনেক আগেই পালিয়ে গেছেন। আর যাদব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে ক্ষেত্রে তুমি ওকে ওইভাবে হত্যা করতে পারতে?
স্মরণিকা ম্লান হাসে। বলে, ও একটা কথার কথা বলে ফেলেছি, মেসো। মানুষ খুন করা কি অত সহজ?
– দ্যাট্স নট্ দ্য পয়েন্ট। আমি অ্যাকাডেমিকাল ডিস্কাশন করছি এখন। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে, তোমার ঐরকম ইচ্ছে হল, তাহলে তুমি কি বিলাসকে ঐভাবে হত্যা করতে পারতে? ফিজিকালি?
– কেন পারব না?
– তোমার মনে হচ্ছে না, কাজটা করা অসম্ভব হত তোমার পক্ষে?
– হতই তো! যেহেতু মানুষ খুন করার মানসিকতা…
– আহ্! আবার উল্টো-পাল্টা কথা! ফিজিকালি, বাস্তবে, ঐভাবে বিলাসকে খুন করার ক্ষমতা তোমার ঐ মুহূর্তে ছিল কি?
স্মরণিকা প্রতি-প্রশ্ন করে, কেন থাকবে না? ঠিক কী জানতে চাইছেন…
তুমি ইতিপূর্বেই বলেছ, ঘরে ‘কিচেনেট’ নেই। বলেছ এক কেটলি জল গরম করবার ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। তার মানে গ্যাস-স্টোভ বা গ্যাস-বার্নার ঐ ঘরের ত্রিসীমানায় ছিল না…
– বাই জোভ! তাই তো! তাহলে কী ভাবে…
– মনে আছে নিশ্চয়, বরাট বলেছিল: ঘরের দরজা জানলা খুলে দেওয়া হয়। ইউনিটটা এয়ার-কন্ডিশন করা, জানলা সহজে খোলা যায় না। ধরাট আরও বলেছিল, প্রবীর ঘোষালের জবানবন্দী অনুসারে একটা পোর্টেবল ফ্যান বসিয়ে দূষিত গ্যাস বিদূরণ করা হয়!
– ইয়েস! বাট্ দ্যাট ইম্পসিবুল্। তা তো ঘটতে পারে না। গ্যাস-স্টোভ তো ঘরে ছিল না! গ্যাসের পাইপ তো ত্রিসীমানায় ছিল না?
ঠিক তখনই ফিরে এল সুজাতা।
তার পিছন-পিছন ট্রে-তে করে তিন গ্লাস স্পেশাল-চা হাতে একটি ছোকরা।
