আঠার
মামলা অ্যাডজন হবার পর বাড়িতে ফিরে এসে বাসু-সাহেবের প্রথম কাজ হচ্ছে রানুকে একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া-অর্থাৎ আদালতে যা যা ঘটেছে তার চুম্বকসার দাখিল করা। আজ তার বাতিক্রম হল। উনি বাড়িতে ঢুকতেই রানু তাঁর ইনভ্যালিড চেয়ারে পাক মেরে এগিয়ে এলেন। বললেন, এদিকে একটু শোন?
সিঁড়ি বেয়ে পথের সমতল থেকে উপরে উঠে এলেন বাসু। কৌশিক ছিল ড্রাইভারের সীটে। তাকেও হাতছানি দিয়ে ডাকলেন রানু।
বাসু বলেন, কী ব্যাপার? গুরুতর কিছু ঘটেছে মনে হচ্ছে।
– হ্যাঁ, গুরুতর বৈকি। কাকলি এসেছে। তোমার চেম্বারে বসে আছে। বেচারি একেবারে ভেঙে পড়েছে। কেঁদে কেঁদে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে।
বাসু বলেন, বুঝলাম। তার মানে, জয়া সেন ধরা পড়েছে। কোথায়? কখন?
– ঠিক জানি না। তবে কাকলির আন্দাজ জয়া তোমার নির্দেশ মানেনি। এখানে-ওখানে ফোন করেছিল ‘পান্থজনসখা’ হোটেল থেকে। যেমন করেই হোক, যাদুগোপাল খবর পায়। সে এসে তার স্ত্রীকে…
বাসু বাধা দিয়ে বলেন, এসব তো বাসি খবর। ধরাটা পড়ল কখন? কোথায়?
– ওরা দু’জনে একটা ট্যাক্সিতে হাওড়া স্টেশনে যায়। সেখানেই জয়া আবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। যাদুগোপাল স্টেশনের এমার্জেন্সি মেডিকেল য়ুনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পুলিশ সজাগই ছিল। দু’জনেই ধরা পড়ে। জয়া আছে পুলিশ হসপিটালে আর যাদুগোপাল লক-আপে।
বাসু বলেন, চল, কাকলির কাছে যাই।
রানু বলেন, তুমি বরং মুখ-হাত ধুয়ে একটু বিশ্রাম…
আবার বাধা দিয়ে বাসু বলেন, বিশ্রাম নেবার সুযোগ কি দেবে ওরা? যাদুগোপাল একের পর একটা রঙ্গ দেখিয়ে চলেছে যে। এস এ ঘরে।
চেম্বারে এসে দেখলেন কাকলি ততক্ষণে একটু সামলেছে। বাসু সাহেবকে দেখে উঠে দাঁড়াল। বলল, দুটোর সময় আদালতে থাকব ভেবেছিলাম, কিন্তু হল না। কী হল কেস-এর?
বাসু নিজে বসলেন, ওকেও পাশে বসালেন। বললেন, কেস-এরকথা পরে বলছি। আগে বল, তুমি কী করে জানতে পারলে যে ওরা দু’জন ধরা পড়েছে? কখন জানতে পারলে?
– আমাকে লালবাজার থেকে জানায়। দোকানে টেলিফোন করে। কারণ রোগিণী বারে বারে তার ছোট বোনকে দেখতে চাইছিল। ডাক্তারের মতে, ছোট বোনের দেখা পেলে রোগিণী কিছুটা সুস্থ হতে পারে। মানসিক শান্তি পাবে। অবশ্য ডাক্তারবাবু কাকলিকে বারে বারে সাবধান করে দিয়েছিলেন, সে যেন মামলার কথা একেবারই আলোচনা না করে। খুন-পিস্তল ইত্যাদির কোনও প্রসঙ্গ নয়।
– দিদির সঙ্গে দেখা হল?
– হ্যাঁ, হল। অনেকক্ষণ ছিলাম তার কাছে।দিদি ঘুমিয়ে পড়ার পর বুঝলাম এত দেরিতে আদালতে গিয়ে কোনও লাভ হবে না। আপনাকে তো ওকালতনামা দেওয়াই আছে। আমি সশরীরে উপস্থিত না হতে পারলে হয়তো ক্ষতি হবে না।
– তা হয়নি। তোমার ডাকই পড়েনি। জয়ার সঙ্গে তাহলে এই কেস নিয়ে কোনও কথা বলনি?
– আজ্ঞে না, বলেছি। মানে শুনেছি। ও কিছু একটা কথা বলবার জন্য আকুলি-বিকুলি করছিল। মনে হল হয়তো কথাটা বলতে পারলে ওর বুকের বোঝাটা হালকা হয়ে যাবে। তাই ঘর নির্জন হতেই জিজ্ঞেস করলাম, দিদি, তুই কিছু বলতে চাস ও মাথা নেড়ে জানালো: হ্যাঁ। আমি জানতে চাইলুম: কী? দিদি বলল: ও খুনটা করেনি, বিশ্বাস কর।
বাসু গম্ভীর হয়ে বললেন, সে কথা তোমার দিদি কী করে জেনেছে তা বলেনি?
– হ্যাঁ, তাও বলেছে। বলেছে, ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির এই অভ্রান্ত সত্যটা ওকে কানে কানে বলে গেছেন: স্বয়ং যাদুগোপাল।
কাকলি সারাটা দুপুর পুলিস হস্পিটালেই ছিল। জয়াকে একজন মহিলা পুলিসের প্রহরায় একটি কেবিনে রাখা হয়েছে। একঘুম দিয়ে জয়া একটু সুস্থ বোধ করে। ক্রমে ক্রমে সে অনেক কথাই কাকলিকে জানায়। তার কিছ কিছু বাসু-সাহেব জয়ার মুখ থেকে আগেই শুনেছিলেন পান্থজনসখা হোটেলে। কাকলিকে জয়া বলেছিল কী ভাবে মৃত জীবন হালদারের মুঠি থেকে সে শেয়ারের গোছাটা উদ্ধার করে। এবং কী ভাবে তা বাসু-সাহেবের হাতে তুলে দেয়।
বাসু জানতে চান, সে কথা জয়া কি পুলিসকে জানিয়েছে।
– নিজে থেকে জানায়নি। ওরা কায়দা করে কথাটা ওর কাছ থেকে বার করে নিয়েছে। শুধু কি তাই? পুলিস দিদিকে বলেছে, আপনি নিজে দায়মুক্ত হতে ওই শেয়ারের গোছা আবার পুলিসকেই জমা দেবেন। কী নিষ্ঠুর ওরা হতে পারে!
বাসু বলেন, পুলিসকে কিছুটা নিষ্ঠুর হতেই হয়। ওদের চোখে তোমার দিদি অপরাধী।
– কিন্তু এখনই তা কেন হবে? দিদির তো কক্সিশন হয়নি। পুলিস তাকে সন্দেহ করে – এইমাত্র। ওরা যেভাবে তাকে জেরা করছে তাতে আশঙ্কা হয় মামলার ফলাফল যাই হোক, তার আগেই…
কথাটা বেচারি শেষ করতে পারে না। তার ঠোঁট দুটি কাঁপতে থাকে। চোখে জল ভরে আসে। বাসু বলেন, ও কথা থাক, কাকলি। তোমাকে বরং এদিককার খবরটা শোনাই। ভৈরব দাশের অবস্থা এখন সাপের ছুঁচো গেলার মতো। না পারছে গিলতে, না পারছে উগরাতে।
– মানে? ওর দাবী টিকবে না?
– নিশ্চয় না। পরিস্থিতি এমন ঘোরালো হয়ে উঠেছে যে ভৈরবের অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। তোমার দিদির শেয়ারের উপর তার দাবী কোনভাবেই দাঁড়াবে না। বরং ভৈরব যে স্ট্যান্ড নিয়েছে তাতে জীবন হালদারের অপরাধে তাকে ভোগান্তি ভুগতে হতে পারে।
কাকলি সখেদে বলে, যাদুগোপালের যদি বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব থাকত তাহলে ও দিদিকে বাঁচাতে পারত – শুধু সত্যি কথাটা স্বীকার করে। ও যদি পুলিসকে বলে যে, সে নিজেই জীবন হালদারের বাড়িতে আগে গেছিল আর দিদি তার পিছন পিছন…কিন্তু না, সে কথা ও বলবে কী করে? ও যে নিজেই জীবনকে গুলিটা করেছে। ফলে সে এমন কোন কথা বলবে না যাতে ফাঁসির দড়িটা ওর গলার দিকে এগিয়ে আসে।
বাসু বলেন, যাদুগোপাল হয়তো জানে না যে, জয়া তাকে অনুসরণ করেছিল–
– কী বলছেন! ও সব জানে! ও তো কাল দুপুরের দিকে দিদিকে ‘পান্থজনসখা’ থেকে বের করে আনে। আর ওরা ধরা পড়েছে আজ সকালে হাওড়া স্টেশনে। তার মানে বাড়িতে না ফিরলেও রাতটা ওরা এই কলকাতা শহরেই কাটিয়েছে। অন্য কোনও হোটেলে। দিদিকে তো চিনি। সে সব কথা আগেভাগে বক্কক্ করে বলেছে। আর তাতেই যাদুগোপাল নিজের ইচ্ছেমতো মিথ্যেটা সাজিয়েছে। সে নাকি মোমিনপুরের বাড়িতে আদৌ যায়নি। ওই পাড়ায় গেছিল বটে, তবে জীবন হালদারের বাসায় নয়।
– তোমার দিদি তা বিশ্বাস করল?
– করল। যাদুগোপাল যদি রঙ্গ করে দিদিকে বলে, সুর্যটা রোজ পশ্চিমে ওঠে আর পূর্বে অস্ত যায়, দিদি সেক্ষেত্রে বলবে, হয়তো তাই যায় রে কাকলি, আমরা খেয়াল করি না। ও যখন বলছে।
হঠাৎ ইন্টারকমটা বেজে উঠল। রানু দেবী বললেন, তোমার একজন দর্শনার্থী এসেছে। বসতে বলব, না পরে আসতে বলব?
– দর্শনার্থীটি তে? রাকেশ বাজোরিয়া না ভৈরব দাঁশ?
– ওঁদের দুজনের একজনও নয়। ইন্সপেক্টর নিখিল দাশ।
– – ও আচ্ছা। পাঠিয়ে দাও তাকে।
– কাকলিকে এ ঘরে ডেকে নের?
– কী দরকার? নিখিল যা বলতে চায় তা কাকলির সামনেই বলতে পারে। যদি না সে জনান্তিক সাক্ষাৎ চায়।
একটু পরেই নিখিল এল এ ঘরে। কাকলি উল্টেটাদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। নিখিল সেটা লক্ষ্য করল। লক্ষ্য না করার ভান করে এসে বসল একটা চেয়ারে। বাসুসাহেবের দিকে ফিরে বললে, দুঃসংবাদটা পেয়েছেন নিশ্চয়। আপনার মক্কেল এবং তাঁর স্বামী দু’জনেই ধরা পড়েছেন।
– হ্যাঁ, কাকলির কাছে এইমাত্র শুনলাম। জয়া এখন কেমন আছে?
– ডাক্তারবাবু বলছেন, অবস্থা এখনো ক্রিটিকাল। আমাদের জেরা করতে অনুমতি দিচ্ছেন না এখনো।
– কী দুঃখের কথা! – কাকলি স্বগতোক্তি করে।
নিখিল এবার তার দিকে ফিরে বলে, আমরা কী করতে পারি বলুন? আপনার দিদিকে আপনি যদি পুলিস প্রহরায় অন্য কোনও নার্সিং হোমে, কোনও বিশেষ ডাক্তারের চিকিৎসাধীনে রাখতে চান তাতেও আমরা আপত্তি করব না।
কাকলি বলে, পুলিস কী মহানুভব!
বাসু বাধা দিয়ে বললেন, সে সব কথা পরে হবে। আপাতত তুমি আমার কাছে এসেছ কী উদ্দেশ্য নিয়ে?
নিখিল বললে, আমি দুঃখিত স্যার, কিন্তু এ কাজটা আমাকে করতেই হচ্ছে। আপনি আজ প্রকাশ্য আদালতে স্বীকার করেছেন যে, জীবন হালদারের ঘর থেকে অপহৃত শেয়ারের গোছাটা বর্তমানে আপনার জিম্মায় আছে…
– ওমা! ও কথা কখন স্বীকার করলাম আমি? আমি তো শুধু বলেছি যে, জয়া সেনের নামে এন্ডোর্স করা শেয়ারের গোছাটা আমার কাছে আছে। সেটা যে জীবন হালদারের ঘর থেকে অপহৃত হয়েছে এমন দাবী তো কেউ করেনি। এমন প্রমাণও কেউ দেয়নি।
– কিন্তু আপনিও জানেন, আমিও জানি– ওই শেয়ারের গোছাটাই হচ্ছেজীবন হালদারের মৃত্যুর মূল হেতু।
– তুমি তা কী করে জেনেছ তা তুমিই জান। আমি তা জানি না। এবং মানি না।
– ঠিক আছে স্যার। এ নিয়ে আপনার সঙ্গে আমি তর্ক করব না। আমাকে বড়কর্তা যে আদেশ করেছেন চাকরির খাতিরে তুমি সেটুকুই পালন করব।
– কর। কিন্তু কী আদেশ করেছেন তোমার বড়কর্তা?
– ওই শেয়ারের গোছাটা আপনার কাছ থেকে গ্রহণ করে আপনাকে একটা রসিদ দেওয়া। ওগুলো জীবন হালদার মার্ডার-এর এজিবিট্ হিসাবে আমাদের দরকার হবে। পুলিস কাস্টডিতে থাকবে।
বাসু মাথা নেড়ে বললেন, আয়াম সরি ইন্সপেক্টর দাশ। আমি ওগুলো তোমাকে দেব না। দিতে পারি না।
– এটা কিন্তু ভাল করছেন না স্যার। ওগুলো মার্ডার কেস-এর এভিডেন্স। ওগুলো যে আপনার হেফাজতে আছে তা আপনি প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন। আপনি এভাবে পুলিসের কাজে সজ্ঞানে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন না, স্যার। আয়াম সরি, আই ওয়ার্ন য়ু।
– তোমার বক্তব্য শেষ হয়েছে? এবার তাহলে তুমি যেতে পার।
– বড়কর্তাকে গিয়ে কি বলব?
– ট্রুথ, হোল ট্রুথ, অ্যান্ড নাথিং বাট দ্য ট্রুথ-বলবে, আমি মিস্টার বাসুকে ‘ওয়ার্ন’ পর্যন্তকরেছিল। তিনি জবাবে বলেছেন: গো টু হেল। যু অ্যান্ড য়োর বস্।
নিখিল একটু ইতস্তত করে বলল, বড়কর্তা যদি জিজ্ঞাসা করেন, কী কারণে আপনি পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন না? তাহলে কী বলব?
– বলবে যে, আমার উপর আদালতের আদেশ আছে ওই শেয়ারগুলো নিয়ে আদালতে উপস্থিত থাকতে। আমি আজ বেলা দুটোয় তাই গিয়েছিলাম। তারপর কোর্ট অ্যাডজর্নড হয়েছে মাত্র – কেস ডিসমিস্ হয়নি-কাল সকালে আমাকে আবার ওই শেয়ারের বান্ডিল সমেত আদালতে উপস্থিত হতে হবে। তোমার বড়কর্তা যদি চান তাহলে আদালত থেকে অর্ডার করিয়ে আনুন। না হলে কাল সকালে খালি হাতে আদালতে গেলে আমার প েআদালত অবমাননা করা হয়ে যাবে।
– এটাই আপনার শেষ কথা।
– না নিখিল। এটাই আমার শেষ কথা নয়। আমি একটা ডীল করতে রাজি আছি, যদি তোমার বড়কর্তা রাজী থাকেন।
‘ডীল’ মানে?
– কিছু দেওয়া, কিছু নেওয়া।
– আই সী। আপনি পরিবর্তে কী চান?
– তুমি টেলিফোনে তোমার বড়কর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পার। তোমার বড়কর্তা যদি এক ঘণ্টার মধ্যে আমার মক্কেলকে জামিনে মুক্তি দিতে রাজি থাকেন তাহলে আমি ওই শেয়ারের বান্ডিল এখনি তোমাকে হস্তান্তরিত করতে রাজি।
– তা হবে না স্যার। উনি রাজি হবেন না। কেসের বর্তমান পরিস্থিতিতে মিসেস জয়া সেনকে জামিন দেওয়া চলবে না।
– তার মানে যাদুগোপাল নয়, তার স্ত্রীকেই তোমরা আসামীর কাঠগড়ায় তুলতে চাও। ‘সব বেটাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁড়ে বেটাকে ধর’। যেহেতু হার্টের অসুখে সে হতভাগিনী এমনিতেই আধমরা!
– আমাদের কোন গত্যন্তর নেই স্যার। ওঁর স্বামী ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন…
– বাঃ। চমৎকার। – হঠাৎ বলে ওঠে কাকলি।
– নিখিল তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে; না, মিস দত্ত। এটা মোটেই আনন্দদায়ক খবর নয়। অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে…
বাসু বলেন, কেন…কেন? তোমর ব্যক্তিগত আপত্তি করার কী হেতু হল?
– লোকটাকে আমার একেবারেই বরদাস্ত হচ্ছিল না। ওই যাদুগোপালকে। টিপিকাল শয়তান। ওর একটা কথাও বিশ্বাস হয়নি আমার।
– আগে শুনি, সে কী বলেছে। অবশ্য সেটা যদি পুলিসের গোপন তথ্য না হয়।
– টু হেল উইথ গোপন তথ্য। লোকটা পাক্কা শয়তান আর একসেলেন্ট অভিনেতা। স্ত্রীর অবস্থা দেখা মাত্রই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। প্রথমে দু-হাত আকাশে তুলে বললে, আমাকে মেরে ফেল, কেটে ফেল, আমি ওর বিরুদ্ধে একটি কথাও বলব না। আর তার দশ মিনিটের মধ্যে হড়বড় করে সব কথাই স্বীকার করে বসল। ওর স্ত্রী মনে করেছিল ও মোটরবাইক নিয়ে মোমিনপুরে জীবন হালদারের বাসায় যাচ্ছে। তাই মিসেস সেন গাড়িটা নিয়ে ওকে অনুসরণ করেন। তারপর ও নিজে যখন উল্টোদিকে চলে যায় তখন মিসেস সেন টের পান না। ভিড়ের মধ্যে স্বামীর বাইকটা হারিয়ে ফেলেন। তাই কাছাকাছি একটা বাড়িতে গিয়ে জীবন হালদারের বাড়ি কোনটা তা কায়দা করে চিনে নেন। তারপর জীবন হালদারের বাড়িতে যান।
– যাদুগোপাল এত কথা জানল কি করে?
– মিসেস সেনই তাকে বলেছেন।
– কিন্তু স্ত্রী স্বামীকে কী বলেছে তা তোমরা কোন অধিকারে জানতে চাইলে? এতো ‘প্রিভিলেজড’ অ্যান্ড ‘কনফিডেন্সিয়াল’ কথাবার্তা।
– আমরা কেন জানতে চাইব? ওতো নিজে থেকেই হড়বড় করে একনিঃশ্বাসে সব কথা বলে গেল।
কাকলি বলে ওঠে; তাই তো বলবে ও। না হলে অপরাধটা কী করে সহধর্মিণীর স্কন্ধে চাপিয়ে দেওয়া যায়?
বাসু বলেন, নিখিল, তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ কেন যাদুগোপাল স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এত কথা বলে গেছে?
– নিজের অপরাধটা গোপন করতে?
– সেটা ঠিক কিনা জানি না। আরও একটা জোরালো কারণ আছে– সেটা নজরে পড়ল না?
– কী জোরালো হেতু?
– হিসেব কষে দেখ। ওর স্ত্রী হাইপারটেনশনে ভুগছে দীর্ঘদিন। উত্তেজনা তার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। নার্ভাস স্ট্রেন আর দুশ্চিন্তা আরও খারাপ।
– কী বলতে চাইছেন আপনি?
– জয়া সেনের ওয়ারিশ কে? যোধপুর পার্কের বাড়ির আধখানা, গাড়িটা গোটা, দোকানের অর্ধেক মালিকানা, হয়তো জয়েন্ট ইন্শওরেন্সও আছে? স্থাবর-অস্থাবর সব কিছুরই তো সেই ওয়ারিশ।
– আপনি কি বলতে চান, সজ্ঞানে পিশাচটা স্ত্রীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
– সজ্ঞানে বধূহত্যা করতে কাউকে দেখনি বুঝি এর আগে? ক’দ্দিনের চাকরি তোমার?
– কিন্তু এই পদ্ধতিতে?
– কেন পদ্ধতিটা খারাপ কিসের? আর্সেনিক-ছুরি-পিস্তল-গলা টিপে ধরা-গায়ে আগুন লাগানোর চেয়ে এটা অনেক বেশি নিরাপদ, অথচ ফল একই।
– কিন্তু আমরা কী করতে পারি?
– তোমরা কোন্আক্কেলে শেষ পর্যন্ত জয়া সেনকে আসামীর কাঠগড়ায় তুলতে চাইছ সেটা আগে বোঝাও? তার কী স্বার্থ থাকতে পারে?
– কেন? ওই শেয়ারের গোছা?
– কী পাগলের মতো বকছ নিখিল? শেয়ারের গোছা উদ্ধার করতে গিয়ে যাদুগোপাল জীবন হালদারকে খুন করলেও করতে পারে। কারণ সে যে ওই শেয়ারের গোছা বন্ধক রেখে রেস খেলে টাকা উড়িয়েছে। তার সেই লজ্জার কথাটা সে স্ত্রীর কাছ থেকে, শালীর কাছ থেকে গোপন রেখে এসেছে।কিন্তু জয়া সেন? ওই উদ্দেশ্যে এমন দুর্বল শরীরে রিভলভার নিয়ে নিজে ড্রাইভ করে সিংহের বিবরে সে মাথা গলাতে পারে?
– তিনি যে নিজে ড্রাইভ করে গেছিলেন, রিভলভারটাতে তাঁর আঙুলের ছাপ আছে এসব তো প্রতিষ্ঠিত তথ্য। আদালতে আপনি তা অপ্রমাণ করবার চেষ্টা করলেও…..
– থামো, নিখিল। জয়া সেনের চরিত্রটা তুমি বিচার করে দেখবে না? সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সগুলোই বড় হল? জয়া সেন যদি টের পেত যে, তার স্বামী শেয়ারের গোছা বন্ধক রেখে জুয়া খেলে ফতুর হয়েছে, তাহলে তার কর্তাকেই বলত: ছি ছি, অমন দুষ্টুমি আর কখনো কর না। যাও লক্ষ্মীটি। ওগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে এস। এই নাও নগদ টাকা। আর কখনো অমন জুয়ো খেল না, কেমন? সোনাছেলে!
নিখিল একমিনিট স্থিরদৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, আপনিই জিতেছেন। কিন্তু খুনটা তাহলে করল কে? যাদুগোপাল? অঙ্কটা মেলাবেন কেমন করে?
বাসু বললেন, অঙ্ক তুমি কষতে পারছ না কেন জান? কারণ তুমি ভুলে গেছ আমাদের অঙ্কটাতে দু-দুটো অজানা ফ্যাক্টর আছে। শুধু ‘এক্স’ নয়। ‘এক্স অ্যান্ড ওয়াই’।
– তার মানে?
– নবনীতাকে বিষ মেশানো চকলেট কে পাঠিয়েছিল সেই প্রশ্নটার জবাব নিয়ে তোমার কোন মাথাব্যথা নেই। না তোমার, না তোমার বড়কর্তার। তোমাকে প্রথমে বলতে হবে নবনীতা অজ্ঞান হয়ে যাবার পর এবং আমরা তাকে উদ্ধার করার আগে ওর রুদ্ধদ্বার কক্ষে কে ঢুকেছিল? কী করে ঢুকেছিল?
– সেটা কী রকম? কেউ যে আদৌ ঢুকেছিল তার প্রমাণ কী?
বাসু বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন সব কথা।নবনীতার সঙ্গে কথা বলতে বলতে উনি চেয়ার উল্টে পড়ার একটা শব্দ শুনতে পান। বেশ বুঝতে পারেন নবনীতা হাতে টেলিফোনটা ধরেই মাটিতে পড়ে যায়। উনি ফোনটা কানে ধরেই থাকেন। আশপাশের কোনও শব্দ শুনতে পান কিনা পরখ করতে।কিন্তু ফোনটা পুরো পঞ্চাশ সেকেন্ড থেকে এক মিনিট ডেড হয়ে রইল। তারপর ও প্রান্তের টেলিফোনটা ক্র্যাডলে ফিরে গেল। আবার ডায়াল টোন শুনতে পেলেন।
নিখিল বলে, কারেক্ট। আমরা যখন ডুপলিকেট চাবি দিয়ে ওর ঘরের তালা খুলে ঢুকি তখন টেলিফোনটা ছিল মাটিতে। দুটো অংশই।
– তোমার মনে আছে?
– আছে। কারণ আমি ওই বাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে বলেছিলাম, ওই টেলিফোনটা ব্যবহার করা যাবে না। আমরা টেলিফোনে ফিঙ্গার-প্রিন্টও নিয়েছিলাম। নবনীতা ছাড়া আর কারও আঙুলের ছাপ পাইনি।
– নবনীতারটা পেয়েছ?
– ন্যাচারালি। ওটা তো ওর নিজেরই ফোন।
বাসু সাহেব হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, তাহলে বোধহয় সমাধান হয়ে গেছে। ইন্টারকমটা তুলে সুজাতা আর কৌশিককে চাইলেন। বললেন, একটু বেরুব। এক্ষুণি। তোমরা দুজনও এস।
নিখিলের দিকে ফিরে বললেন, তুমি কী করবে? আসবে আমাদের গাড়িতে ?
– না, স্যার। তবে আপনার সঙ্গ ছাড়ছি না। আমি নিজের জীপ নিয়ে এসেছি। তাতেই যাব। কোথায় যাচ্ছি আমরা?
বাসু সে কথার জবাব না দিয়ে কাকলিকে বললেন, তুমিও কি আসছ?
– আসব না? আপনি বলছেন সমাধানের পথে চলেছেন। মূল সমস্যাটা তো আমারই।
– না কাকলি। শুধু তোমার নয়, তোমার, জয়ার, নবনীতার-নিখিল আর আমার তো বটেই। মোটামুটি সমাধানের একটা ছক তৈরি করেই ফেলেছিলাম। এইমাত্র নিখিল এমন একটা জব্বর ক্লু দিল যাতে মনে হচ্ছে আমার অনুমানটাই ঠিক।
– ক্লু! কীকু দিলাম আমি?
– ওই যে তুমি বললে, ‘ন্যাচারালি! ওটা তো ওর নিজেরই ফোন’।
– এর মধ্যে ক্লু কোথায়? আপনার টেলিফোনে আপনার নিজের আঙুলের ছাপ থাকবে এটা কী এমন আশ্চর্যের ব্যাপার?
– দ্যাটস্ দ্য ফাইনাল ক্লু। উটের পিঠের শেষ কুটো। চল। অভিযানে বেরিয়ে পড়া যাক।
