রিস্তেদারের কাঁটা – ৫

পাঁচ

‘হোম দে ব্রট হার ওরিয়র ডে!’

টেনিসান-এর বিখ্যাত কবিতাটির কথাই বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল ওঁর। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিহত বীর সেনানায়কের মরদেহ নিয়ে আসা হল তাঁর বাড়িতে। সমস্ত পাড়ার লোক ভিড় করে এসেছে তরুণ শহীদকে শেষ দর্শনের বাসনায়। তারা অবাক হয়ে দেখল, মৃত সেনানায়কের তরুণী পত্নী স্বামীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে পাথরের মূর্তির মতো। তার চোখে জল নেই। কান্নায় ভেঙে পড়ছে না সে, অথবা মূর্ছিত হয়ে লুটিয়ে পড়ছে না স্বামীর বুকের উপর। কথাও বলছে না। কেন? কেন? ওরা বুঝতে পারেনি, হতভাগিনী মনে মনে তখন শুধু ভাবছে – আগুন, ফাঁসির দড়ি, না বিষ? সেটা বুঝে নিল বুড়ী ধাই-মা। মনে মনে বললে, ‘শী মাস্ট সুন অর আটার ক্রাই! ‘ ওকে কাঁদানো দরকার! নিঃশব্দচরণে উঠে গেল ঘরের ভেতর। ফিরে এল পরমুহূর্তেই। সদ্যোবিধবার ক্রোড়ে ফেলে দিল তার বাচ্চাটাকে। অবোধ শিশু ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল চিৎকার করে। যেন রেজনেন্স জাগল এবার মাতৃবক্ষে। বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সদ্যোবিধবা হু-হু করে কেঁদে উঠল: ‘সুইট চাইল্ড! আই লিভ্ ফর দী!’

গাড়ি চলেছে ডায়মন্ডহারবার রোড দিয়ে দক্ষিণ-মুখো। মধ্যম গতিতে। পিছনের গাড়ি কাছাকাছি আসলেই ভিয়ু-ফাইন্ডারে নজরে পড়ছে। অমনি ডান হাতখানা বাড়িয়ে ইঙ্গিত করছেন তাকে। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে বলছেন। বাসু-সাহেব স্পিডোমিটারের কাঁটাটাকে পঞ্চাশোর্ধে যেতে দেন না। তাই বাঁ-দিকের কিনার ঘেঁষে চলেছেন। উপায় নেই। গাড়ি চালাতে চালাতেই তিনি চিন্তা করছিলেন। সমস্ত ঘটনা পরপর সাজিয়ে বিশ্লেষণ করছিলেন। এ সময় স্প্রিন্ডোমিটারের কাঁটার কোন উচ্ছ্বাস বরদাস্ত করেন না ঐ ভুক্তভোগী ড্রাইভার। এ জাতীয় ভুলেই জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাতটা পেয়েছেন যে! এক ভুল জীবনে দুবার করবার মতো মানুষ নন উনি।

ড্রাইভারের পাশের সীটে নিশ্চুপ বসে আছে টুকু।

আদালতে যখন ধনঞ্জয় চৌবে *****ন্তের ইতিকথা শোনাচ্ছিল তখন বাসু-সাহেব বার-বার আড়চোখে ওকে লক্ষ্য করেছিলেন। আশ্চর্য! কোনও অভিব্যক্তি ফুটে ওঠেনি ওর মুখে। না বিস্ময়, না লজ্জা, না দুঃখ, না হতাশা! একটি বিশ-বাইশ বছরের অনূঢ়া তরুণী যদি হঠাৎ হারিয়ে ফেলে তার পিতৃপরিচয়, তাহলে তার কী জাতের প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক? বাসু-সাহেবের মনে পড়ে গেছিল অতিবৃদ্ধা ধাই-মার নিদান– ‘শী মাস্ট সূন অর আটার ক্রাই’। আদালত ভাঙার পর ওঁরা সকলে গিয়ে বসেছিলেন ওঁর সেই চেম্বারে। তখনো স্মরণিকা ভাবলেশহীন। সুজাতা প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা মামু, ওরা বানিয়ে বানিয়ে একটা গপ্পো ফাঁদছে না তো? সম্পত্তিটার দখল নিতে?

জবাবে বাসু-সাহেব বলেছিলেন, খুব সম্ভবত নয়। অকাট্য প্রমাণ আস্তিনের তলায় লুকানো না থাকলে এতবড় ডিফামেশানের ঝুঁকি সলিল দত্ত চৌবেকে নিতে দিত না। ধনঞ্জয় চৌবে একটি বাস্তুঘুঘু। সম্পত্তিটার দখল নেবার পরিকল্পনা তার আজকের নয়। তাই বিশ-বাইশ বছর ধরে চিঠিগুলি সযত্নে সঞ্চয় করে রেখেছে ফাইলে।

বলে আবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখেছিলেন মেয়েটির দিকে। কোনও ভাবান্তর লক্ষ্য হয়নি। মেয়েটি কি জানত? সম্ভবত নয়। ওর এই নির্বিকার অনাসক্তির পিছনে অন্য জাতের কার্যকরণ। সেই বৃদ্ধা ধাই-মার সাবধান-বাণীটাআবার মনে পড়ে গেছিল বাসু-সাহেবের: ‘শী মাস্ট সূন অর আটার ক্রাই!’

কৌশিক এই পর্যায়ে জানতে চায়, একটা কথা, মামু। সত্যানন্দ সেন যদি ঐ কোর্ট-অর্ডারের আগে কোনও উইল রেখে গিয়ে থাকেন, স্মরণিকা দেবীকে তাঁর ওয়ারিশ করে, তাহলে আইনের চোখে তা কি সিদ্ধ হবে?

বাসু-সাহেব জবাব দেবার আগেই সুজাতা বলে ওঠে, প্রশ্নটা অবান্তর। তাঁর চিঠিখানাই বলে দিচ্ছে তেমন কোন উইল বানানো হয়নি। কারণ চিঠিতে তিনি স্মরণিকাকে নির্দেশ দিচ্ছেন মামুর সাহায্যে একটি উইল বানাতে; তাই নয়? আর ঐ চিঠি লেখার পর তিনি যে কোনও সুযোগ পাননি এ তো বলাই বাহুল্য। কারণ চিঠিখানা ডাকে দেবার আগেই ওঁর রিস্তেদারেরা জেনে ফেলেছে তাঁর মনোবাসনা। ফলে তাঁকে সর্বক্ষণ নজরবন্দী রেখেছে। অন্য কোনও উকিলও বাড়িতে মাথা গলাতে পারেনি নিশ্চয়।

বাসু বললেন, তোমার যুক্তি কারেক্ট, কিন্তু হান্ডেড পার্সেন্ট কারেক্ট নয়!

– কেন নয়?– জানতে চায় সুজাতা।

– সেন-মশাই একা ঘরে শুতেন। রাত্রে। কেউ পাহারা দিত না নিশ্চয়। উনি যদি মধ্যরাত্রে উঠে একখানি স্বহস্ত-রচিত উইল তৈরী করে যেতেন তবে তা আইনত সিদ্ধ হত। তার তলায় কোনও সাক্ষীর স্বাক্ষর থাক-না-থাক।

– তাই নাকি?

– হ্যাঁ, তাই। তবে কতকগুলি শর্ত-সাপেক্ষে অমন উইল সিদ্ধ হবে।

– কী শর্ত?

– প্রথম কথা, একখানি সাদা কাগজে আদ্যন্ত উইলনির্মাণকারীর স্বহস্তে লিখিত হওয়া চাই। ‘লেটার-হেড’-এ যদি তারিখের আধখানা ছাপা থাকে তাহলে চলবে না, উইল-প্রণয়নকারীর স্বহস্তে লেখা তারিখ থাকা চাই। উইলের বক্তব্যে পারম্পর্য থাকা প্রয়োজন এবং লেখক যে সুস্থ দেহে-মনে, কারও প্ররোচনা, নির্দেশ বা অনুরোধ ব্যতিরেকে স্বেচ্ছায় সেটি প্রস্তুত করছে এ-কথার স্পষ্ট উল্লেখ থাকা চাই। সেটি যে তার ঐ তারিখে লেখা শেষ-উইল, এ কথাও!

অবশ্য ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনের সেকশন 63 অনুযায়ী উইলে অন্তত দু-জন সাক্ষী আবশ্যক। তবে একবার যদি উইলখানা বেনিফিশিয়ারির হস্তগত হয় তাহলে এদেশে দুটো কেন, পয়সা ফেললে বিশটা লোক মিলতে পারে যারা সাক্ষী হতে রাজি হবে আর পরে বলবে আমি উইল-কর্তাকে সই করতে দেখেছি।

কৌশিক বলে, তেমন উইল তিনি লিখে থাকলেও কোন সুরাহা হত না। কারণ ওঁকে বিদায় করে ওরা তিনজনে নিশ্চয় তন্নতন্ন করে সব কিছু হাতড়েছে। ওঁর বিশ্বস্ত চাকর-বাকরদের তো আগেই তাড়ানো হয়ে গেছে। ফলে…

বাসু-সাহেব বললেন, একটা ভুল কর না, সুজাতা! টুকুর সামনে পড়ে আছে সমস্ত জীবন। তার দেহে আছে শক্তি, মনে আছে বল। দু-ঘা নিতে আর দু-ঘা দিতে সে পিছপাও হবে না। লেঅনার্দো দ্য ভিঞ্চি থেকে স্বয়ং যীজাস ক্রাইস্ট-এর জীবনী সে জানে। ওর কথা আমি তাই ভাবছিনা মোটেই। আমি ভাবছি, উন্মাদাশ্রমে বন্দী সেই অসহায় বৃদ্ধটির কথা! সে বেচারি কীসের জোরে লড়বে?

হঠাৎ নড়ে-চড়ে বসল স্মরণিকা। বললে, আমাকে একবার তাঁর কাছে নিয়ে যাবেন?

যেন সেই দ্বিতীয় শৈশবপ্রাপ্তের উদ্দেশে স্বগতোক্তি: ‘সুইট চাইল্ড! আই লিভ ফর দী!’

– আলবাৎ! এখনই। গেট আপ্!

কৌশিক বলেছিল, সুজাতা মিনিবাসে বরং বাড়ি ফিরে যাক। আমরা তিনজনে…

– তুমি থাম তো! না। আমরা দুজনে যাব। তোমরা দু-জন বরং একটা ট্যাক্সি নিয়ে ডক্টর কৈলাশনাথের চেম্বারে চলে যাও। এখন পাঁচটা বাজে। উনি পাঁচটা থেকে সাতটা চেম্বারে থাকেন। আমাকে ভাল রকমই চেনেন। আমার নাম করে জানতে চেও, আগামীকাল কটার সময় উনি মিস্টার সেনকে দেখতে যাবেন। আর জিজ্ঞাসা কর, ওঁর পরীক্ষার সময় আমি যদি উপস্থিত থাকি তাহলে কি ওঁর আপত্তি আছে?

কৌশিক বলেছিল, জজ-সাহেব আদালতে ওঁকে স্পেশালিস্টহিসাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছেন মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে। উনি তো এখনো কোর্ট-অর্ডার পাননি।

– না, পাননি। কিন্তু আজ মঙ্গলবার; শুক্রবার যখন হিয়ারিঙ-ডেট দিয়েছেন তখন জাজ ভাদুড়ী টেলিফোনে ডাক্তার দাশগুপ্তকে জানিয়ে দেবার ব্যবস্থা নিশ্চয় করেছেন! স্পেশাল কুরিয়ার-সার্ভিসে কোর্ট-অর্ডার ডঃ দাশগুপ্ত ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পেয়ে যাবেন।

স্মরণিকাকে নিয়ে অতঃপর বার হয়ে পড়েছেন দক্ষিণমুখো।

ধনঞ্জয় তার এজাহারে বলেছিল, সেটা ‘ওল্ড-এজ-হোম’। তার নাম ‘শান্তিধাম’। বাড়িটা দেখে তা মনে হল না। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা যেন একটা কারাগার। মানুষভর উঁচু পাঁচিলের উপরে কাঁটাতারের নিরাপত্তা! কেন? ‘শান্তিধাম’ থেকে বৃদ্ধদের কি পাঁচিল টপকে পালানোর আশঙ্কা আছে? গেটে দারোয়ান। ভিতরে ইতস্তত ছড়ানো ছোট-ছোট এক-কামরার চালাঘর। পলেস্তারাহীন কাদার-গাঁথনির দেওয়াল, টিনের দো-চালা। মুলিবাঁশের ঝাঁপওয়ালা জানলা! গেট দিয়ে কম্পাউন্ডে ঢুকেই একটা বাগানের আভাস। সেখানে একটি পাকা ছাদের বাড়ি। অফিস, রিসেপশন প্রভৃতি। দারোয়ানের হেপাজতে রাখা খাতায় নাম-ঠিকানা লিখে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া গেল।

‘অফিস’-চিহ্নিত ঘরখানিতে একটিমাত্র টেবিল। খান-চারেক চেয়ার। টেবিলে একটি তেকোনা বুলারের মতো কাঠের ফলক। তাতে লেখা ‘রিসেপশন’। ঘরে কেউ নেই। পাশে একটি নোটিস বোর্ড। তাতে নানান বিজ্ঞপ্তি। জানানো হয়েছে, ‘ভিজিটিং আওয়ার্স’ বিকাল চারটে থেকে সাড়ে পাঁচটা। নোটিস বোর্ডে একটি ‘কর্মখালি’র বিজ্ঞাপনও নজরে পড়ল। গৃহকর্ম-নিপুণা একটি ‘আনট্রেইন্ড-নার্স’ চাইছেন কর্তৃপক্ষ। অস্থায়ী পদ, অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বিদ্যেই যথেষ্ট। প্রার্থীকে প্রত্যয়িত সার্টিফিকেটসহ সাক্ষাৎ করতে বলা হয়েছে। নিম্নতম বেতন কত প্রত্যাশা করেন তাও তাঁকে মৌখিক বলতে হবে।

হঠাৎ ঝন্ধন্ করে টেলিফোনটা বেজে উঠল। বার-কতক আর্তনাদ করার পর পিছনের দ্বার দিয়ে একটি মধ্যবয়সী মহিলা দ্রুতপদে প্রবেশ করে তাকে ***** বাসু-সাহেবের দিকে তাকিয়ে প্রফেশনাল হাসি হেসে ভিজিটার্স-চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে টেলিফোনটা তুলে নিলেন। তার ‘কথামুখে’ বললেন: ইয়েস, স্পিকিং।…না, উনি এখন নেই…না, কখন ফিরবেন তাও বলে যাননি…অ্যাঁ? কী বললেন? কোর্ট অর্ডার?… হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝেছি।…কী নাম বললেন? ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্ত?…আই সী।…আচ্ছা, উনি ফিরে এলে তাঁকে বলব…

যন্ত্রটা রিসিভারে নামিয়ে রেখে চিন্তিত মুখে ভদ্রমহিলা তাঁর সীটে বসলেন। হঠাৎ যেন তাঁর খেয়াল হল সামনের চেয়ারে বসে আছেন একটি প্রৌঢ়। তাঁর হাতে একটি ভিজিটিং কার্ড। সেটা দেখে নিয়ে বললেন, ইয়েস? বলুন মিস্টার বাসু? আমরা কীভাবে আপনার সেবা করতে পারি?

বাসু-সাহেব তাঁর সঙ্গিনীর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এই মেয়েটি আমার ক্লায়েন্ট। বিবাহবিচ্ছেদের মামলা। মেয়েটি বিবাহ-বিচ্ছেদ চায় না। ওর স্বামীর অগাধ সম্পত্তি; কিন্তু মেন্টালি একটু ‘ইয়ে’ মতন…ওর দেওর চাইছে ডিভোর্স হয়ে যাক…কিন্তু এ তা চায় না। ওর স্বামীকে কিছুদিন এখানে রাখা যায়?

স্তম্ভিত স্মরণিকা বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।

ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, যায়। যদি খরচপত্র করতে রাজি থাকেন।

– সেদিকে আটকাবে না। সে কিন্তু বৃদ্ধ নয় আদৌ।

– ন্যাচারালি। আপনার ক্লায়েন্টকে দেখেই তা বোঝা যায়।

– আরও একটা কথা। এর স্বামী আসলে পাগল নয়, বুঝেছেন? অগাধ সম্পত্তির মালিক তো, সব উড়িয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সর্বনাশকে ঠেকাতেই আমরা চাইছি তাকে কিছুদিন এখানে…মানে, কী-ভাবে যে কথাটা বুঝিয়ে বলব…?

ভদ্রমহিলা একগাল হেসে বললেন, আপনাকে কিছুই বুঝিয়ে বলতে হবে না ব্যারিস্টার-সাহেব। এমন কেস তো আজকাল আখছার হচ্ছে। ঘরে ঘরে। বিশেষ করে ঐ যাদের – কী যেন কথাটা বললেন আপনি? – হ্যাঁ, ‘অগাধ সম্পত্তি’। আপনারা একটা ডাক্তারের সার্টিফিকেট যোগাড় করুন। প্রয়োজনে এবং ফী দিলে আমরাই ডাক্তারের নাম জানাব। তারপর পেশেন্টকে এখানে পৌঁছে দিন, রেজিস্টারে নিকটতম আত্মীয় হিসাবে আপনার ক্লায়েন্ট সই দিন, ব্যস্! বাকি দায়-দায়িত্ব আমাদের…

– আপনাদের সব পেশেন্টই কি পাগল?

মহিলা বিচিত্র হেসে প্রতিপ্রশ্ন করেন, আপনার ক্লায়েন্টের স্বামী কি পাগল?

– অন্তত ওঁর মতে তাই!

– একজ্যাক্টলি! আমাদের সব পেশেন্টের নিকট আত্মীয়ের মতেও তাই।

– আপনাদের মাসিক চার্জ কত?

– সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে।

– যেমন?

– যেমন, আপনারা আমাদের কাছে ঠিক কী-জাতের সার্ভিস চান তার উপর। কিন্তু সেসব বিস্তারিত আলোচনা আপনারা ডক্টর রথের সঙ্গে বরং করবেন। উনি এখানে নেই…

– সে তো এইমাত্র শুনলাম। আপনি যখন টেলিফোনে বললেন…

ভ্রূকুঞ্চন হল ভদ্রমহিলার। বললেন, কিন্তু আমি তো টেলিফোনে ডক্টর রথের নামটাও উচ্চারণ করিনি। আপনি কী করে বুঝলেন?

– তাতে কী হল? আপনি তো টেলিফোনে এ কথাও বলেননি যে, কোর্ট-অর্ডারটা হয়েছে সত্যানন্দ সেনের কেস-এ। তাই বলে আমি কি বুঝতে পারিনি সেটা?

ভদ্রমহিলা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কথা যোগালো না তাঁর মুখে।

– এবার বলুন, মিস্টার সত্যানন্দ সেন কি সতের নম্বর কেবিনেই আছেন?

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন উনি। সামলে নিয়েছেন এতক্ষণে। বললেন, সে-খোঁজে আপনার কী প্রয়োজন?

– বাঃ! তিনিও আমার ক্লায়েন্ট যে। দেখা করা দরকার।

দাঁতে দাঁত চেপে উনি বললেন, বুঝেছি! আয়াম সরি। ভিজিটিং আওয়ার্স পার হয়ে গেছে।

– তা গেছে। কিন্তু আজ এখানে ভিজিটার্সদের ভিড় তো তেমন নজরে পড়ছে না। কুল্লে আমরাই দুজন। এতদূর থেকে আসছি। না হয় ক্ষমাঘেন্না করে…

– আয়াম সরি, স্যার!

– য়ু অট টু বি।…অ্যাট্ লীস্ট য়ু উড বিইন ফিউচার! তাহলে কাল বিকাল চারটের সময়েই আসতে বলছেন?

– না! কারণ মিস্টার সেনের কেবিনে ‘নো-ভিজিটার্স’ বোর্ড টাঙানো আছে। ফলে আমি কিছুই বলছি না।..

– আহাহা! সে তো এখন বলছেন না। পরে তো বলতে হবে? যখন আমার সমন পেয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়াবেন। তখন তো অনেক কথাই আপনাকে বলতে হবে, না কি? মায় কী জাতের সার্ভিসের জন্য কী রকম চার্জ?

ভদ্রমহিলা আগুন-ঝরা চোখের দৃষ্টি মেলে শুধু নির্বাক তাকিয়ে থাকেন।

গেটের বাইরে এসে গাড়িতে উঠতে উঠতে স্মরণিকা বললে, আপনি আমাকে ম্যান্টন রোডের মোড়ে নামিয়ে দিন। ওখান থেকে খুব কাছেই গীতার ফ্ল্যাট।

– তা হোক। বাড়িটা আমাকে চিনে রাখতে হবে। শোন, শুক্রবার হিয়ারিঙের ডেট। তার আগে যে কোন সময় ডক্টর দাশগুপ্ত তোমার জেঠুকে দেখতে আসতে পারেন। কাল অথবা পশু যে কোন সময়।টাইমটা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু নাইন্টি-নাইন পার্সেন্ট চান্স উনি আমাকে সেসময় উপস্থিত থাকতে বলবেন। আমি তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাব। এ দুদিন তুমি গীতা করের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে কোথাও যেও না।

স্মরণিকা রাজি হল।

বাসু-সাহেব যখন নিউ আলিপুরের বাড়িতে এসে পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কৌশিক আর সুজাতা তখনো ফেরেনি। রানী দেবী একাই বসেছিলেন বাইরের বারান্দায়। বাসু-সাহেব ঘনিয়ে এসে বসলেন। ছোকরা কম্বাইন্ডহ্যান্ড বিশে চায়ের ট্রে রেখে গেল। একটু পরেই বাইরের ঘরে টেলিফোন বাজল। বাসু উঠে গিয়ে ধরলেন: বাসু স্পিকিং…

– গুড্ ঈভনিং ব্যরিস্টার-সাহেব। আপনার দূত-দম্পতি আমার সামনে বসে আছে। আপনার প্রস্তাবটা আমি শুনেছি। আমার প্রত্যুত্তরটা আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই বলে ফোন করছি…

– বলুন, ডাক্তার-সাহেব?

– দেখুন বাসু-সাহেব, কেসটা সাব-জুডিস। আপনি একপক্ষের কাউন্সেলার। শুনলাম আদালত আপনাকে amicus curiae হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করতে চায় – কিন্তু এখনো করেনি। মেয়েটির কাউন্সেলার হিসাবে আপনার স্ট্যাটাসকেও নাকি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, এবং জজ-সাহেব তাঁর সিদ্ধান্ত মুলতুবি রেখেছেন। এক্ষেত্রে আমি মনে করি…

বাধা দিয়ে বাসু বলে, য়ু আর পার্ফেক্টলি রাইট, ডক্টর দাশগুপ্ত। আমি শুধু নিশ্চিন্ত হতে চাই– বুড়োটা যেন একটা ‘ফেয়ার চান্স’ পায় প্রমাণ করতে যে…

– আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমি কাল বিকালে, চারটের সময় মিস্টার সেনকে দেখতে যাব। ঐ ওল্ড-এজ হোমকে টেলিফোন করে জানিয়েছি ওরা যেন কোন সিডেটিভ না দেয়। তাতে ওখানকার ইন চার্জ জানান রোগী খুব রেস্টলেস, তার ঘুম হচ্ছে না– হেভি সিডেটিভ দিতে হবেই। ‘হেভি সিডেটিভ’ কথাটা নিয়ে সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার কিছু মতপার্থক্যজনিত বৈজ্ঞানিক বাকবিতণ্ডাও হয়ে গেছে। যাহোক কতটা ঘুমের ঔষধ দিতে পারে তার লিমিট আমি জানিয়েছি। আমি নিজস্ব নার্সনিয়ে যাব। একান্তেই পরীক্ষা করব।আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, বৃদ্ধের মানসিক ভারসাম্য কতটা বজায় আছে তা সম্বঝ নিতে কোন ত্রুটি হবে না।

– থ্যাঙ্কয়ু ডক্টর! এখন বুঝতে পারছি জাজ ভাদুড়ী কেন আপনাকেই দায়িত্বটা দিয়েছেন।…একটা কথা, ঔষধ খাইয়ে বা ইনজেকশন দিয়ে…

ওঁকে মাঝপথে থামিয়ে ডক্টর দাশগুপ্ত বলে ওঠেন, এসববিস্তারিত আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। আপনি যেমন আপনার কাজটা বোঝেন, আমিও তেমনি বুঝি আমার কাজটা। হ্যাঁ, আছে। এমন ইনজেকশন আছে যা ইন্ট্রাভেনাস প্রয়োগে রোগীর মানসিক ভারসাম্য সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়ে যায়, দিনকতক উল্টোপাল্টা কথা বলে, লোকজন চিনতে পারে না…

– পরীক্ষা করে তা বোঝা যায় না?

– যায় এবং যায় না। ব্লাড টেস্ট-এ কখনো তা ধরা পড়ে, আবার কখনো কনক্লুসিভ প্রমাণ পাওয়া যায় না। আদালতে প্রমাণ না করা গেলেও ডাক্তার বুঝতে পারে কী জাতের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। মোটকথা, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আমি খুব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করব। প্রয়োজনে বৃদ্ধকে অন্য একটি নার্সিং হোমে সরিয়ে নিয়ে দিন-সাতেক পরে আবার পরীক্ষা করব…

– থ্যাঙ্ক য়ু ডক্টর।