যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ১১

এগার

কাকলি অত্যন্ত দ্রুতহাতে রিভলভারটা গুঁজে দিল একটা সয়েড্ লিনেন ব্যাগে। পরদিন ড্রাইং ক্লিনিং-এ পাঠাবে বলে ছাড়া শাড়ি-শায়া বিছানার চাদরে বোঝাই ব্যাগ বাসু মাথা নেড়ে শুধু বললেন, বোকামি– বোকামি! কাজটা আদৌ বুদ্ধিমতীর মতো হচ্ছে না কিন্তু। ইন্সপেক্টার দাশ ওটা খুঁজে দেখবেই।

ঠিক তখন ওর ডোরবেলটা বেজে উঠল। বাসু বললেন:দরজাটা খুলে দাও, কাকলি।

কাকলি এগিয়ে এসে ওর ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে দিল। কোলাপসিবল গেটটা এখন বন্ধ করা ছিল না। তাই নিখিল দাশ সোজা চলে এসেছে আধতলায় – মেজানাইন-ফ্লোরে। একমাত্র এ ঘরেই বাতি জ্বলছে।

খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টার দাশ কাকলিকে প্রশ্ন করে, মিস কাকলি দত্ত?

– ইয়েস। কী চান?

– এক্ষনি এ ঘরে একটা রিভলভার ফায়ার করা হয়েছে। কে করেছে, আপনি?

কাকলি দরজাটা পুরোপুরি খোলেনি। শুধু মুখটুকু বার করে কথা বলছিল। সে জবাবে বললে, এ ঘরে! রিভলভার! কী বলছেন?

– ফায়ারিঙের শব্দটা শুনতে পাননি বলতে চান?

– ফায়ারিঙ? না। আমি তো ভাবলাম রাস্তায় কোনও গড়ি ব্যাক-ফায়ার করল?

– তাই বুঝি? দরজাটা ছেড়ে দাঁড়ান। আমি ভিতরে আসব।

– কেন? মাঝরাত্রে বিনা-ওয়ারেন্টে আপনি…

– জাস্ট এ মিনিট। ঘরের ভিতর ওই বসে আছেন, উনি কে? মিস্টার পি. কে. বাসু?

বাসু ওখান থেকেই বলেন, হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো।

ইন্সপেক্টার দাশ জোর করে ভিতরে ঢুকল। কাকলি আর বৃথা বাধা দিল না। নিখিল দাশ বললে, দিনের মধ্যে ক’বার আমাদের মুখোমুখি মুলাকাৎ হল, স্যার?

বাসু হাসতে-হাসতে বলেন, ওমা! সে কী কথা গো? আজ এই তো প্রথম দেখা হল তোমাতে–আমাতে। ‘পহেলি-মুলাকাৎ হো’।

– পহেলি-মুলাকাৎ?

– নয়? এখন বারোটা বেজে সাত। দিন শুরু হয়েছে সাত মিনিট আগে। চলি….

নিখিল বাধা দেয়, না, যাবেন না। আপনার ক্লায়েন্টকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করব। সেটা আপনার সামনেই হওয়া ভাল।

– ক্লায়েন্ট। কে আমার ক্লায়েন্ট?

– এ ঘরের মালকিন, মিস কাকলি দত্ত! চিনতে চান না নাকি?

– আয়াম সরি, ইন্সপেক্টার। মিস কাকলি দত্ত আমার ক্লায়েন্ট নয়।

– নয়? তা হলে মাঝরাতে আপনি এখানে কেন?

– এই একটু তত্ত্বতালাশ নিতে। কাকলি বলল, অ্যাক্কাপ কফি খেয়ে যান, তাই…তা, কফি পান আমার শেষ হয়েছে। তোমরা গল্পগাছা কর বাছা, আমি চলি। রাতও অনেক হয়ে গেছে।

নিখিল দাশ বল, এ ঘরে একটি একটি রিভলভার ছোঁড়া হয়েছে। আপনি ছুঁড়েছেন?

– রিভলভার! বাই জোভ! নো!

নিখিল ঘরের চতুর্দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ওর সন্ধানী চোখে বেশিক্ষণ দেরি হল না। জানলার পর্দায় একটা নিটোল গর্ত। সে নীচু হয়ে এক টুকরো কাচ কুড়িয়ে নিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দেখল। প্লেট-গ্লাসেও একটা নিটোল ছিদ্র। নিখিল ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, এ গর্তটা কতদিন হয়েছে? এ কাচের টুকরোটা কত দিন মেজেতে পড়ে আছে? ঘর কতদিন ঝাঁট দেওয়া হয়নি?

– কাকলি চমকিত হবার অভিনয় করে, আরে তাই তো! তাহলে তো মোটর গাড়ির ব্যাক-ফায়ার নয়। কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের মারবার জন্য ফায়ার করেছে। ওটা ‘গান-ফায়ার’ই বটে!

নিখিল বলে, তাহলে আপনার মতটা কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তাই না, মিস দত্ত? রিভলভারের শব্দই শুনেছেন। তবে ঘরের ভিতর কেউ ফায়ার করেনি, করেছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। হয়তো আপনাকে হত্যা করতে। অথবা বাসু-সাহেবকে! কেমন তো?

– তাছাড়া আর কী হতে পারে? কাচে, পর্দায় ফুটো হয়েছে। মেঝেতে কাচের টুকরোও পড়ে আছে…

নিখিল দাশ বললে, কিন্তু মুশকিল কী জানেন মিস দত্ত? আপনার থিয়োরি মেনে নিলে একথাও মেনে নিতে হয় যে, আপনাকে যে গুলি করে মারতে চেয়েছিল সে লোকটা হয় হেলিকপ্টারে চড়ে এসেছিল, অথবা পাঁচ মিটার লম্বা রণ-পায়ে।

কাকলি জবাব দেয় না। বড় বড় চোখে তাকিয়ে দেখে।

ইন্সপেক্টর দাশ বলে, পর্দায় ফুটো আর কাঁচের ফুটো যোগ করে সরলরেখা টানলে তা আকাশপানে যায়। রাস্তার দিকে নয়। আপনি যদি অপরাধ-বিজ্ঞান নিয়ে আমার মতো অথবা বাসু-সাহেবের মতো পড়াশুনা করতেন তাহলে বুঝতে পারতেন যে, কাঁচে বুলেটের ছিদ্র হলে তা পরীক্ষা করে বলে দেওয়া যায় গুলিটা কোন দিক থেকে কোন দিকে গিয়েছিল।

কাকলি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। নিখিল দাশ একনাগাড়ে বলেই চলল– এবার অনেকটা স্বগতোক্তি ধরনের কথা: গুলিটা যখ ছোঁড়া হয় তখন আপনি এইখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর আপনি দশ থেকে পনের সেকেন্ড মাত্র সময় পেয়েছেন। এত তাড়তাড়ি রিভলভারটা কোথায় লুকাতে পারেন?

ইন্সপেক্টার দাশ হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নিচেটা দেখতে থাকে। কাকলি প্রতিবাদ করে, বিনা ওয়ারেন্টে আপনি এভাবে আমার ঘর সার্চ করতে পারেন না।

নিখিল জবাব দেয় না। আপন মনে তল্লাশিটা চালিয়ে যায়।

– কী করছেন, আপনি? গর্জে ওঠে কাকলি।

– দেখতেই তো পাচ্ছেন। রিভলভারটা খুঁজছি। জাস্ট এ মিনিট। এটা কী? সয়েলড্ লিনেন? হ্যাঁ, এটা খুব চমৎকার জায়গা। দশ সেকেল্ডের মধ্যে যন্ত্রটা লুকিয়ে ফেলার পক্ষে আইডিয়াল প্লেস।

নিখিল ব্যাগের তলা থেকে রিভলভারটা উদ্ধার করে। একগাল হেসে বলে, মিস দত্ত, যে লোকটা হেলিকপ্টার থেকে আপনাকে খুন করতে চেয়েছিল সে ভুল করে যন্ত্রটা এ ঘরেই ফেলে গেছে। কিন্তু জানলা তো বন্ধ ছিল। কী করে করল?

ঠিক সেই মুহূর্তে বাসু-সাহেবের মনে হল, বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো। রিভলভারটা আবিষ্কার করে অতি উৎফুল্ল না থাকলে ইন্সপেক্টার দাশও হয়তো শব্দটা শুনতে পেত। বাসু উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আমি এবার যার, দাশ। অনের রাত হয়ে গেছে।

– কিন্তু আপনাকেও যে আমার কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল।

– কাল সকালে। আমার ব্যাপারটা বিবেচনা কর, ইন্সপেক্টার।

না, মিস দত্তের জবানবন্দি নেবার সময় আপনার উপস্থিতিটা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে রিভলভাররটা যখন খুঁজে পাওয়া গেছে।

– কিন্তু আমি তো আগেই বলেছি, কাকলি দত্ত আমার ক্লায়েন্ট নয়।

– সে তো আরও ভাল। তাহলে আপনি সাক্ষী দিতে পারবেন।

বাসু হেসে বলেন, তুমি হোমিসাইডে নতুন এসেছ, দাশ, তাই জান না। তোমার প্রেডিসেসার ইন্সপেক্টর বরাট এ-সব ক্ষেত্রে আমাকে ত্রিসীমানায় থাকতে দিত না। তাকে দোষও দিতে পারি না। কী জান নিখিল, আমার কিছু মুদ্রাদোষ আছে। পুলিস যখন কাউকে জেরা করে তখন আমি লক্ষ্য করে দেখি নাগরিকেরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিনা। বরাট মনে করত আমি তার কাজে ইচ্ছাকৃত বাধা দিয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত।

ইন্সপেক্টার দাশ একটু ইতস্তত করে। বাসু বলেন, ধর কাকলির কথাই। ও তো আমার ক্লায়েন্ট নয়, তবু আমি এখানে থাকলে ওকে বলব, ওর সাংবিধানিক অধিকার আছে তোমার কোনও প্রশ্নের কোনও রকম জবাব না দেওয়ার। মানে, যতক্ষণ না ওর আইন-পরামর্শদাতা উপস্থিত হন। অথবা যতক্ষণ না তুমি ওকে গ্যারান্টি দাও যে, ওকে অভিযুক্ত করবে না।

নিখিল দাশ বললে, অল, রাইট, স্যার। আপনি বাড়ি যান। হ্যাঁ, বরাট আমাকে বলেছিল বটে। আসুন আপনি….

– গুডনাইট টু য়্যু বোথ।

ধীরে-সুস্থে উনি বেরিয়ে যান ঘর থেকে। তারপর প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন। রাস্তায় নেমেই দেখেন একটি ফিয়াট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার চালকের আসনে একজন ভদ্রমহিলা। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স হবে তাঁর। উনি দরজা খুলে নামতে চাইছিলেন। বাসু-সাহেব বড়-বড় পা ফেলে এগিয়ে আসেন। ঝুঁকে পড়ে বলেন, জয়া সেন?

রীতিমতো চমকে ওঠেন ভদ্রমহিলা। বলেন, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে?

– গাড়ি থেকে নামবেন না। আমার নাম পি.. কে. বাসু। আমি…

– হ্যাঁ, আপনাকে চিনতে পেরেছি। কিন্তু কী বলছেন আপনি? নামতে বারণ করছেন কেন?

– আপনি এখন কাকলির কাছে যাবেন না।

– যাব না? কেন?

– শোন জয়া, কাকলি চায় আমি তোমাকে রিপ্রেজেন্ট করি–

– রিপ্রেজেন্ট করেন। আমাকে? কেন? কী ব্যাপারে?

– তা আমি জানি না। কিন্তু শুনে রাখ, কাকলির ঘরে এখন যে লোকটা উপস্থিত আছে তার নাম ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ। লালবাজার হোমিসাইডের অফিসার। সে কাকলিকে জেরা করছে।

– জেরা করছে? কী বিষয়ে?

– তুমি তা জান, জয়া। জীবন হালদারের হত্যার ব্যাপারে। তোমাকে খুঁজে পেলে পুলিসে এখনই তোমাকে অ্যারেস্ট করবে। তোমার যা শরীরের অবস্থা তাতে পুলিসের ইন্টারোগেশন সইতে পারবে না।

– তাহলে…মানে, কী করব আমি? বাড়িতে ফিরে যাবে?

বাসু বলেন, না। সরে বসো জয়া। আমি গাড়িটা চালাব।

জয়া আপত্তি করল না। সরে বসল। বাসু স্টার্ট দিলেন। শ-তিনেক মিটার এগিয়ে এসে দেখলেন আধা-অন্ধকারে ওঁর নিজের গাড়িটা পার্ক কবা আছে। উনি তার সামনে জয়ার ফিয়াট গাড়িটা রাস্তায় ধারে পার্ক করলেন। ও গাড়ি থেকে কৌশিক নেমে এল।

বাসু জয়াকে বললেন, এর নাম কৌশিক। আমার লোক। তুমি এর কথা মতো চলবে। কেমন?

জয়া বুঝতে পারল কি না বৌঝা গেল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল।

বাসু কৌশিককে বললেন, তুমি এ গাড়িতে চলে এস। জয়াকে নিয়ে সোজা চলে যাও ‘পান্থজনসখা’ হোটেলে। চেনো সেটা?

– না। কোথায়?

– আনোয়ার শাহ রোড দিয়ে টি.ভি.স্টেশনের দিকে এগিয়ে যাবে। স্টেট ব্যাঙ্ক পার হয়েই দেখতে পাবে নিয়ন বাতির সাইন-বোর্ড। হোটেলটা নতুন হয়েছে। ওখানে গিয়ে জয়াকে হোটেলে একটা সিঙ্গল-বেড ঘরে ভর্তি করে দেবে। স্বনামে নয়। ওর নাম মীনাক্ষী মজুমদার। দুর্গাপুর আর্যভট্ট রোডের বাসিন্দা। তুমি ওর ছোট ভাই। দিদির একটা অপারেশন হবে। তাই দুদিন আগে এসে হোটেলে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছ, কারণ তুমি মেসবাড়িতে থাক। তোমরা দুজন দুর্গাপুর থেকে বাই-রোড এসেছ। মাঝরাস্তায় গাড়ি গণ্ডগোল করায় মধ্যরাত্রে পৌঁছেছ। তুমি থাক এই আনোয়ার শাহ রোডেই, তাই দিদিকে কাছাকাছি হোটেলে রাখছ।

– বুঝলাম তারপর গাড়িটা?

– দিদিকে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা নিয়ে চলে আসবে আমাদের নিউ আলিপুরে। আমাদের বাড়ি থেকে এক ফার্লং দূরে যে কোনও গ্যারেজওয়ালা বাড়ির গ্যারেজের ঠিক সামনে ফাঁকা গাড়িটা পার্ক করবে। স্টিয়ারিং এবং সমস্ত গাড়িটা ভাল করে মুছবে। যেন কোন ফিঙ্গার-প্রিন্ট কোথাও না থাকে। তারপর গাড়িটা লক করে হেঁটে বাড়ি ফিরবে। ফেরার পথে পথের ধারের কোনও নর্দমার ঝাঁঝরি–মুখ গলিয়ে গাড়ির ইগনিশান কীটা ফেলে দেবে। ও. কে.?

হোটেলের লোকজন সন্দেহ করবে না? উনি দুর্গাপুর থেকে আসছেন, অথচ সঙ্গে একটা স্যুটকেস পর্যন্ত নেই?

জয়া এতক্ষণ চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। এবার বলে ওঠে, স্যুটকেস তো আছে পিছনে ডিকিতে। কাকলির কাছে ক’দিন থাকব ভেবেছিলামবাসু বললেন, ব্যস। সমাধান হয় গেল।

তারপর জয়ার দিকে ফিরে বলেন, তোমার নামটা যেন কী?

বাসু সাহেবের দিকে ফিরে ও বলে, জয়া সেন।

– না! ঐ ভুলটা করবে না। তোমার নাম মীনাক্ষী মজুমদার। তোমার বাড়ি যেন কোথায়?

এবার আর ভুল করল না জয়া। বলল, মনে আছে, দুর্গাপুর, আর্যভট্ট রোডে।

– ভেরি গুড। এ ছেলেটির তোমার যেন কে হয় মীনাক্ষী?

– ছোট ভাই। ও এই আনোয়ার শাহ রোডেই একটা মেসবাড়িতে থাকে।

– পারফেক্ট। শোন, মীনাক্ষী। কাল আমি এসে তোমার সঙ্গে দেখা করব। তুমি এই ‘পান্থজনসখা’–তেই থাকবে।কারও সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করবে না। তোমার নামটা কেন বদলে দিলাম তা বুঝেছ?

– হুঁ। পুলিস আমাকে খুঁজছে।

– দ্যাটস কারেক্ট। তাই ফোন করবে না। পুলিস যেন তোমার হদিস না পায়। কাল খবরের কাগজও দেখবে না। তোমার শরীর খুব দুর্বল। সম্পূর্ণ ‘রেস্ট’-এ থাকা দরকার। ওষুধপত্র তুমি যা খাও তা সঙ্গে আছে তো?

– হ্যাঁ, আমি তা নিয়ে এসেছি।

– অল রাইট। তাহলে তোমরা রওনা দাও।

কৌশিক বলল, একটা কথা, মামু। গাড়ির চাবিটা ড্রেনে ফেলে দিলে, পরে গাড়ি চালাব কী করে?

– সেসব তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।

জয়া সেনকে নিয়ে ফিয়াট গাড়িটা আনোয়ার শাহ রোডের দিকে রওনা দিল। বাসু গুটিগুটি এগিয়ে গেলেন তাঁর গাড়িরদিকে।

নির্জন ঘরে ওরা দু’জন বসে আছে মুখোমুখি।

ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ আর আলোক-চিত্রশিল্পী কাকলি দত্ত।

দু’জনেই মধ্য যৌবনে, দু’জনেই সুদর্শন, দু’জনেই অবিবাহিত, কিন্তু একজন অপরজনের বিপক্ষ শিবিরে।

নিখিল দাশ অন্তত নিজের মনের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হল কাকলির সৌন্দর্য তার যৌবনের দীপ্তিতে নয় – তার ব্যক্তিত্বের মহিমায়। পুরুষশাসিত এই নিষ্ঠুর সমাজে সে লড়াই করে যাচ্ছে একা হাতে। যাদুগোপাল তাকে ঠকাতে চায়, ভৈরব দাশ তার নাকে দড়ি পরিয়ে হারেমজাত করতে চায়, আর এখন এই হোমিসাইডের ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ মধ্যরাতে এসেছে ওর হাতে একটা স্টেনলেস স্টিলের বালা পরাতে।

কাকলি বলল, মিস্টার দাশ, আমি ক্লান্ত, অত্যন্ত ক্লান্ত। আমার ঘুম পাচ্ছে। আপনি রাতের বাকি ক’ঘণ্টা আমাকে ঘুমাতে দেবেন? প্লীজ! কাল সকালে আমি আপনাকে ব্রেকফাস্টে নিমন্ত্রণ করছি।

নিখিল বললে, আয়াম সরি। বেশিক্ষণ সময় আমি নেব না, মিস দত্ত। রিভলভারটা লুকোবার চেষ্টা না করলে এতক্ষণ হয়তো আমি বিদায় নিতাম। ফলে, দোষ আমার একার নয়। আপনারও। তাই নয়? আমি আপনাকে সরাসরি দুটি প্রশ্ন করছি। আপনি এককথায় তার জবাব দিন।

– কী প্রশ্ন? কাকলি বিরক্ত। তার জোড়া-ভূতে কুঞ্চন।

– প্রথম প্রশ্ন, মিস নবনীতা রায়কে বিষ-মেশানো ক্যান্ডির প্যাকেটটা কি আপনিই পাঠিয়েছিলেন?

– না।

– দ্বিতীয় প্রশ্ন জীবন হালদারকে কি আপনিই হত্যা করেছেন?

– না।

নিখিল দাশ নড়ে-চড়ে বসল। বলল, দ্যাটস ফাইন। আমি আপনার কথা মেনে নিচ্ছি। আরও জানাচ্ছি যে, যদি আপনি নবনীতাকে ঐ ক্যান্ডির প্যাকেট পাঠিয়ে থাকেন কিংবা যদি আপনি জীবন হালদারকে গুলি করে মেরে থাকেন, তাহলে আমার পরবর্তী কোনও প্রশ্নের জবাব আপনি দেবেন না। এ বিষয়ে আপনার সাংবিধানিক অধিকার সম্বন্ধে আমিই আপনাকে সচেতন করে দিচ্ছি….

কাকলির নাকের পাশে একটা কুঞ্চন জাগল। বললে, আপনি কী মহানুভব! আপনার প্রশ্ন দুটির যে কোনও একটির জবাবে আমি যদি বলতাম, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ’, তাহলে আপনি বলতেন, আপনার হাত দুটো বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কাইন্ডলি ও দুটি বাড়িয়ে ধরুন। আমি একজোড়া স্টেনলেস স্টিলের মকরমুখী বালা পরিয়ে দিই। তাই না?

নিখিল ম্লান হেসে বলল, ঠিক তা নয়।আপনারমুখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি এ জাতীয় জঘন্য অপরাধ করতেই পারেন না।

কাকলি তিক্তস্বরে বলে, বাঃ বাঃ! এমন অলৌকিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সামান্য পুলিসের চাকরি করেন কেন? ‘ভৃগু সম্রাট’-এর ভেক ধরে কালোবাজারীদের মাথায় টুপি পরালে তো আরও অনেক বেশি রোজগার হয়। সে যাই হোক, আমার মুখ দেখেই যখন বুঝতে পেরেছেন যে, আমি নির্দোষ, তখন আমাকে রেহাই দেবেন কি?

– দেব। কিন্তু অত তাড়াতাড়ি নয়। যেহেতু আপনার স্বীকারোক্তি মোতাবেক আপনি দুটি অপরাধের একটাও করেননি তাই আমি আশা করব, আপনি আমাকে সাহায্য করবেন– যাতে ঐ দুটো জঘন্য অপরাধের প্রকৃত অপরাধীর হাতে আমি স্টেনলেস-স্টিলের মকরমুখী বালা পরাতে পারি।

– আমি কী ভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

– আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে।

– কতক্ষণ চলবে আমাদের এই চাপান-উতোর?

– ধরুন আধঘণ্টা।

– তার মধ্যেই আপনি রহস্যের সমাধান করতে পারবেন?

অন্তত প্রাথমিক কাজটা।

কাকলি বলল, বেশ। কী জানতে চান বলুন?

– এই রিভলভারটা কার?

– আমার।

– লাইসেন্স আপনার নামে?

– হ্যাঁ।

– দেখা যাচ্ছে, এতে চারটি তাজা বুলেট ভরা আছে। দুটো ফায়ার করা হয়েছে। একটার শূন্যগর্ভ টোটাটা চেম্বারে আছে, আর তার আগেরটায় নেই। অর্থাৎ সেটা থেকে ফাঁকা কার্তুজটা ফেলে দেওয়া হয়েছে। যে শূন্যগর্ভ কার্তুজটা স্বস্থানে রয়েছে সেটা কে ফায়ার করেছিল তা আমি জানতে চাইছি না। তার আগের ফাঁকা ব্যারেলের বুলেটটা কে ছুঁড়েছিল?

– কবে?

– আজ সন্ধ্যারাত্রে?

–

– এ সিদ্ধান্তে আপনি এলেন কিভাবে আগে তার যৌক্তিকতা বোঝান, তারপর আমার জবাব দেবার প্রশ্ন উঠবে।

– তার মানে?

– আমি যদি প্রশ্ন করি, আপনার মাজায় যে রিভলভারটা দেখতে পাচ্ছি সেটা থেকে শেষ-গুলির আগের গুলিটা কে কোথায় কবে ছুঁড়েছিল, তা বলতে পারবেন আপনি?

– গুড পয়েন্ট। না, তা বলতে পারব না। সত্যি কথা বলতে কি, হোমিসাইডে আসার পর এ রিভলভারটা এখনো আমাকে ব্যবহার করতে হয়নি।

– বিশ্বাস করুন, ইন্সপেক্টার দাশ– এই ‘পয়েন্ট-কাউন্টার-পয়েন্ট’ গেমটা মধ্যরাত্রে আমার একটুও ভাল লাগছে না। আজ– আজ কেন, কাল বিকাল চারটের পর থেকে আমার একটা ‘হেকটিক’ পিরিয়ড গেছে। আমার দোকানের ব্যবসা-সংক্রান্ত ঝামেলা। তাই আমি এখন ক্লান্ত, অত্যন্ত ক্লান্ত।

– অল রাইট, অল রাইট। দোকান-সংক্রান্ত কী জাতের ঝামেলা? আমাকে কিছুটা ইঙ্গিত দিতে পারেন?

– না, পারি না।

– ঝামেলাটা পাকাচ্ছে কে? আপনার ভগ্নিপতি যাদুগোপাল? না কি ভৈরব দাশ? আপনার দিদির শেয়ারের কাগজগুলো জীবন হালদারের কাছে পৌঁছেদিয়েছিল রেসুড়ে যাদুগোপাল। সেকথা আপনিও জানেন, আমিও জানি। কিন্তু তার মূলে কে আছে? কী আছে? যাদুগোপালের রেসের নেশা, না জীবন হালদারের অর্থলিপ্সা, অথবা ভৈরব দাশের পৈশাচিকতা? আপনার কী মনে হয়?

কাকলি জিব দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল, আপনি এতসব কথা শুনলেন কার কাছে?

– রাকেশ বাজোরিয়া। চেনেন?

– না, কে সে?

– কাল পর্যন্ত ছিল ‘সোনালি স্বপন’-এর স্লীপিং পার্টনার। আজ বোধকরি সোল প্রোপ্রাইটার।

– ও বুঝেছি। নবনীতা বলেছিল বটে। নামটা জানায়নি। তা রাকেশ বাজোরিয়া এত কথা জানে?

নিখিল বললে, মিস দ্ভত্ত, বুঝতেই পারছেন, আমরা ইচ্ছে করলে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারি। সবটা রাকেশ বলেনি, অন্যান্য সূত্র থেকেও আমি জেনেছি। সে সব কথাও আপনাকে জানাতে পারি। যদি আপনি খোলা মনে আলোচনা করতে রাজি হন।

– আমি রাজি হচ্ছি না।

– কেন?

– আমি কী করে বুঝব যে, আপনি আমাকে ফাঁদে ফেলবার জন্য এভাবে ঘনিষ্ঠতা করতে চাইছেন না?

– কিন্তু আপনি তো অপরাধ দুটোর একটাও করেননি, কাকলি দেবী। শুধু অপরাধীকেই ফাঁদ পেতে ধরা যায়।

– মাঝরাতে ভারী নতুন কথাটা শোনালেন পুলিস-সাহেব। আপনারা কোনোদিন কখনো কোনও নিরপরাধকে ফাঁদ পেতে ধরে ফাঁসি-কাঠের দিকে ঠেলে দেবার চেষ্টা করেননি, তাই না?

– দ্য পয়েন্ট ইজ ওয়েল টেকন। অল রাইট, আমি আপনাকে পর পর কয়েকটা ‘শব্দ’ বলব আর সেই শব্দগুলি শুনে আপনার মনে যে যে কথা জাগছে, আপনি তৎক্ষণাৎ জবাবে তা বলবেন। এ একজাতের টেস্ট–

– আর এক জাতের ফাঁদ? যদি এটায় ধরা পড়ে পাখিটা?

নিখিল গম্ভীর হয়ে বলল, মিস দ্রুত্ত। আমি আপনাকে বারে বারে বলেছি যে, আপনি যদি অপরাধ দুটোর একটাও করে থাকেন তাহলে আর কোনও কথার জবাব দেবেন না। সুতরাং ফাঁদ পাতার প্রশ্নটা আসছে কোথা থেকে?

– আর আমি যে-কথাটা বারে বারে বলছি তাও যে আপনার কানে যাচ্ছে না।

– কী কথা?

– কোনও একটা অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিস খাড়া করতে চায় একজন আসামীকে, সে অপরাধী কি না সেটা প্রশ্ন নয়, দেখতে হবে তার বিরুদ্ধে যেসব এভিডেন্স আদালতে দাখিল করা হবে তা যেন নিশ্ছিদ্র হয়। নিরপরাধ বলেও বেটা যেন খালাস না পায়। তাহলেই পুলিস অফিসারের রেকর্ডে দাগ পড়ে যাবে। কনভার্সলি, নিরপরাধের কনভিকশন হলে পুলিস অফিসারের প্রমোশন হবার সম্ভাবনা।

– অন্তত আমি তা চাই না। আমার রেকর্ডে কী দাগ পড়ছে তা আমি ভূক্ষেপ করি না, কিন্তু আমি কোনো দিনই চাইব না আমার তদন্তে কোনও নিরপরাধের শাস্তি হোক। দরকার হলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব মিস দত্ত।

কাকলি একদৃষ্টে দৃপ্তভঙ্গিতে বসে থাকা নিখিল দাশের দিকে দু-তিন সেকেন্ড তাকিয়ে কী যেন সমঝে নিল। তারপর বলল, অল রাইট। শুরু করুন ‘অ্যাসোসিয়েশন-টেস্ট’।

– আপনি জানেন ‘অ্যাসোসিয়েশন-টেস্ট’ কাকে বলে?

– জানি। ক্রিমিনোলজি-র উপর পড়াশুনা করিনি বটে, তবে বি.এ. তে আমার সাইকোলজি ছিল।

– তাহলে তো আপনি মোটামুটি জানেনই। তবে এটা ঠিক সাইকোলজির ‘অ্যাসোসিয়েশন-টেস্ট’ নয়। কারণ আমি কোনও স্টপ ওয়াচ ব্যবহার করছি না। আমার উচ্চারিত শব্দের জবাবে আপনার উচ্চারিত শব্দের আবির্ভাবের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কতটা হচ্ছে তা আমি আদৌ মাপছি না। আপনি শুধু মনটাকে ফাঁকা করে রাখুন। যত দ্রুত সম্ভব আমার উচ্চারিত শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আপনার মনে যে শব্দটি উদয় হচ্ছে তা বলুন। কেমন?

– অল রাইট। শুরু করুন।

– বাড়ি?

– ভূমিকম্প!

– ফটোগ্রাফ?

– খদ্দের! – নিখিলের উচ্চারিত শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ও জবাব দিচ্ছে।

– বিবাহ?

– বিচ্ছেদ!

– নারী?

– নির্যাতন!

নিখিলের প্রশ্ন আরও দ্রুতগতিতে আসতে থাকে। যেন ওরা ক্রমে ক্রমে তেহাই-এর দিকে চলেছে। যেমন প্রশ্ন, তেমন জবাব।

– রিভলভার।

– অ্যাকসিডেন্ট!

– সোনালি?

– স্বপন।

– পুলিস?

– আপনি।

– প্যারাফিন?

– টেস্ট!

নিখিল এলিয়ে বসল চেয়ারে। হাসল। বলল, আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম মিস দত্ত-আপনাকে প্রকারান্তরে আমি স্বীকার করিয়ে নেবই।

কাকলি বিস্মিত হবার অভিনয় করে, কী? – কী স্বীকার করেছি আমি?

– আপনি স্বীকার করেছেন যে, একটি গূঢ় তত্ত্ব সম্বন্ধে আপনি অবহিত, যা একজন ফটোগ্রাফার মহিলার জানার কথা নয়। অর্থাৎ ক্রিমিনোলজিতে ইদানীং ‘প্যারাফিন টেস্ট’ পরীক্ষা করে বলা সম্ভব হচ্ছে সন্দেহজনক ব্যক্তি সম্প্রতি রিভলভার ছুঁড়েছে কিনা। সম্ভবত বাসু সাহেব এ তত্ত্বটা আপনাকে জনিয়েছেন। অতি সম্প্রতি, মানে আধঘণ্টা আগে – তাই কথাটা আপনার চেতন-মন এখনো অবচেতনে গোপন করতে পারেনি। আপনি ‘প্যারাফিন-টেস্টের’ ব্যাপারটা জানেন।

– হ্যাঁ, জানি। তাতে কী হল? আপনিও তা জানেন, বাসু-সাহেবও তা জানেন। তাহলে কি আমরা তিনজনেই অপরাধী? এই আপনার যুক্তি?

– না। আমাদের তিনজনের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। আপনার হেপাজতে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি রিভলভার, যার একটা গুলি কীভাবে খরচ হয়েছে তা আপনার স্মরণে নেই। আমাদের অবস্থা তা নয়। দ্বিতীয়ত, আমরা দু’জন ‘ক্রিমিনোলজি’-নিয়ে পড়েছি– আপনার শুধু বি. এ.-তে সাইকোলজি ছিল। তাতে অ্যাসোসিয়েশন-টেস্টই পড়ানো হয়, প্যারাফিন-টেস্ট-এ বারুদের নাইট্রেট কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায় তা শেখানো হয় না। আমি নিশ্চিত যে, একটু আগে বাসু-সাহেব আপনাকে প্যারাফিন-টেস্ট-এর কথাটা বলেছেন। আর আপনি বুঝতে পেরেছেন যে, সাবান দিয়ে ধুয়ে, ঝামা দিয়ে ঘষে আপনার হাতের চামড়া থেকে ঐ বারুদের চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে না। সুতরাং যেই মাত্র আমার গাড়ির আওয়াজ শুনলেন অমনি জানলার দিকে রিভলভারটা তুলে ধরে ট্রিগার টেনে দিলেন। তাই না? এখন যদি প্যারাফিন-টেস্ট-এ আমি প্রমাণ করি যে, আপনার হাতে, আপনার তালুতে-আঙুলে বারুদ লেগে আছে অমনি আপনার ডিফেন্স কাউন্সেল বলবেন, তা তো থাকবেই। রিভলভারটা যে অ্যাকসিডেন্টালি মিস দত্তের ফায়ার হয়ে গেছিল। আর ঠিক সেই জন্যেই রিভলভার-শব্দের জবাব ছিল ‘অ্যাকসিডেন্ট’। ঠিক বলছি না কি?

কাকলি বলল, বিশ্বাস করুন মিস্টার দাশ, আমি অত্যন্ত ক্লান্ত। আমার ঘুম পাচ্ছে। আমাকে যদি অ্যারেস্ট করতে চান, তাহলে তাই করুন। ‘প্যারাফিন– টেস্ট’ শব্দটার অর্থ জেনে ফেলার মতো গুরুতর অপরাধ যখন করেই ফেলেছি তখন আমাকে অ্যারেস্ট করতে আর দেরি করছেন কেন? হাজতে একটা বিছানা দেবেন নিশ্চয়? কনভিক্টরাও তা পায়?

নিখিল উঠে দাঁড়ায়। বলে, না, মিস দত্ত। আমি আপনাকে অ্যারেস্ট করছি না। তবে থানাকে না জানিয়ে আপনি কলকাতার বাইরে যাবেন না।

– ‘প্যারাফিন-টেস্ট’ ব্যাপারটা জেনে ফেলার মতো গুরুতর অপরাধে আমাকে গ্রেপ্তার করছেন না। সে কী! কেন?

নিখিল বলে, আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। আপনার প্রখর ব্যক্তিত্ব। স্বীকার করছি, আপনার মতো দৃপ্ত দুঃসাহসী মহিলা আমি আগে কখনো দেখিনি। আমার একটা কৌতূহল চরিতার্থ করবেন, মিস দত্ত?

– বলুন?

– আপনি কি যুক্তিতর্ক দিয়ে আন্দাজ করতে পারছেন, কেন আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করছি না? এ-কথা সন্দেহাতীত ভাবে জেনেও যে, আপনি ইচ্ছা করে আমাদের প্রমাণটা লুপ্ত করবার জন্যই – প্যারাফিন-টেস্ট পরীক্ষাটা ব্যর্থ করতেই – দ্বিতীয়বার গুলি ছুঁড়েছেন?

কাকলিও উঠে দাঁড়ায়। বলে, আয়াম সরি। ক্লান্তিতে আমার ব্রেন ঠিক মতো কাজ করছে না। আমি ঠিক মতো আন্দাজ করতে পারছি না। হয়তো আমার মতো একজন আনঅ্যাটাচড কুমারী মেয়ের প্রতি করুণাবশে আপনি আমার মাজায় দড়ি বাঁধছেন না।

– করুণা নয়, শ্রদ্ধায়। কিন্তু সেটাই একমাত্র যুক্তি নয়। আরও একটা হেতু আছে।

– সেটা কী?

– দ্বিতীয় একটা বিকল্প সম্ভাবনাও রয়ে যাচ্ছে না? – আপনার ঐভাবে দ্বিতীয় বুলেটটা খরচ করে ফেলার? স্বেচ্ছায় হাতে বারুদের অদৃশ্য চিহ্ন সংগ্রহ করার?

– সেটা কী? আমি তো ভেবেছিলাম একটাই যুক্তি। প্রথম গুলিটা আমি ছুঁড়েছি। তাই দ্বিতীয় গুলিটা ছুঁড়ে প্যারাফিন-টেস্ট-এর অভিযোগটা নাকচ করে দেবার জন্যই আমার ঐ কাজ। দ্বিতীয় বিকল্পটা কী?

– ধরুন, আপনি জানেন কে জীবন হালদারকে খুন করেছে। হয়তো সে আপনার অত্যন্ত প্রিয়একজন। তর্কের খাতিরে ধরা যাক, তিনি আপনার দিদি। তাহলে আপনি জানেন যে, আপনার নিরুদ্দিষ্ট দিদিকে–

– আমার দিদি কি নিরুদ্দেশ?

– সেটা আপনিও জানেন, আমিও জানি। যে কথা বলছিলাম, আপনার নিরুদ্দিষ্ট দিদিকে পুলিস যদি গ্রেপ্তার করতে পারে, তাহলে ‘প্যারাফিন-টেস্ট’-করে প্রমাণ করা যাবে যে, তিনি কয়েক ঘণ্টা আগে একটি গুলি ছুঁড়েছেন। আপনি অত্যন্ত দুঃসাহসিকার মতো সেই উষ্ণ সম্ভাবনার উপর এক বালতি ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিয়েছেন। এখন প্রমাণ করা কঠিন যে, প্রথম গুলিটা কে ছুঁড়েছিল। তাই নয়? আপনাদের দুই বোনের ক্ষেত্রেই ‘প্যারাফিন-টেস্ট’ পজেটিভ রেজাল্ট দিচ্ছে। দ্বিতীয় বুলেটটা আপনি ছুঁড়েছেন তার সাক্ষী আছে; পি. কে. বাসু স্বয়ং। কিন্তু প্রথম বুলেটটা কে ছুঁড়েছেন তা যুক্তির বিশ্লেষণে প্রমাণ করা যাবে না। আপনার দিদিও হতে পারেন। আপনি নিজেও।

কাকলি বলে. আমি সজ্ঞানে ফাঁসির দড়িটা আমার নিজের গলার দিকে টেনে নেব? এটা কি ডারউইনের বির্বতনবাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না। ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা’ থিয়োরির?

– আপনি ডিকেন্সের ‘আ টেল অব ট্যু সিটিজ’ উপন্যাস্রটা পড়েছেন?

– পড়েছি। হঠাৎ সে কথা আসছে কেন?

– সিডনে কার্টন চার্লস ডার্নের হয়ে গিলোটিনে মাথা পেতে দিতে গেছিল কেন?

– বিকজ নো-বডি কেয়ার্ড ফর সিডনে কার্টন….

– নেভারদ্যলেস, সিডনে কার্টন কেয়ার্ড ফর হিজ লেডি-ল্যভ!

– অল রাইট। তাহলে আপনি আমাকে অ্যারেস্ট করছেন না। আর কিছু জিজ্ঞাসা আছে?

– আছে। এই রিভলভারটা আপনি কোথায় পেলেন?

– আমি পেয়েছি উত্তরাধিকার সূত্রে। বাবা কিনেছিলেন সি. সি. বিশ্বাসের দোকান থেকে।

– না। আমি জিজ্ঞেস করছি, গতকাল রাত্রে?

– কী আশ্চর্য! গতকাল রাত্রে এটা আবার আমাকে নতুন করে পেতে হবে নাকি? বাবার পরলোকগমনে যন্ত্রটা আমি পেয়েছি। ‘সি.পি.’– মানে ক্যালকাটার পুলিস কমিশনার – আমার নামে লাইসেন্সটা ট্রান্সফার করেছেন। ফলে অস্ত্রটা তো আমার কাছেই বরাবর থাকতে পারে। পারে না?

– পারে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনি কাউকে বাঁচাতে চাইছেন। এমন একজন, যাকে আপনি ভালবাসেন।

– সে মানুষটি আমি নিজেও তো হতে পারি? সব চাচাই তো আপন প্রাণকে বাঁচাতে উদগ্রীব। তাই নয়?

– হ্যাঁ, তাই। সেটাও অসম্ভব নয়। আমি আগেও বলেছি আবার বলছি, আপনার মতো দুঃসাহসী, ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা ইতিপূর্বে আমার নজরে কখনো পড়েনি। আপনি অনন্যা! রিভলভারটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। এটা থেকে টেস্ট-বুলেট ছুঁড়ে দেখতে হবে যে, এই রিভলভার থেকে জীবন হালদারের মৃত্যুবাণ নিক্ষিপ্ত হয়েছিল কিনা। আজ রাত্রে আপনাকে আর কোনও প্রশ্ন করব না। যতই অন্ধকার লাগুক এ রাত্রিটা, বিশ্বাস করুন কাকলি দেবী, ‘নিষ্প্রভাত রাত্রি’ হয় না। আবার কাল সকালে সূর্য উঠবে।

কাকলি তিক্তস্বরে বললে, আশ্চর্য নতুন কথাটা শোনালেন বটে। আর কিছু? আশা করি এর পর সকাল-বিকেল আপনি এখানে হাজিরা দেবেন?

– না, মিস দত্ত। আপনি ব্যঙ্গ করে আমাকে কাল প্রাতরাশে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, সেটুকু বুঝবার মতো বুদ্ধি আমার আছে। আমি আর একবার মাত্র আসব। এই রিভলভারটা থেকে একটা টেস্ট-বুলেট ছুঁড়ে দেখার পর। তারপর আর আসব না। হয় আপনাকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে যাব, অথবা আপনাকে ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার চার্জে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাব।

কাকলি বললে, থ্যাংস আ লট।

নিখিল পকেট থেকে একটা রুমাল বার করল। রিভলভারটার ট্রিগার-এর লুপ-এ একটা ফাঁস পরিয়ে ঝুলিয়ে নিল, যাতে ওর আঙুলের ছাপ অস্ত্রটাতে না লাগে। তারপর দু-আঙুলে সেটাকে ঝুলিয়ে নিয়ে কাকলির দিকে ফিরে বললে, একটা শেষ প্রশ্ন মিস দত্তা।

– বলুন?

– আজ রাত্রে আমি আপনার প্রতি যে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি, – অ্যান্ড আই হেট টু ডু দিস – তাতে আপনি আমাকে একজন ভদ্রমানুষ হিসাবে দেখতে পারেন না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে ফাঁদে ফেলতে আদৌ আসিনি– আমি আসল অপরাধীকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। যে অন্ধকারের কারবারী নবনীতাকে বিষ দিয়েছে, জীবন হালদারকে গুলি করেছে; আমি জানি, সে অপরাধজীবী আপনি নন, আপনার সাহায্যে তাকে আমি চিহ্নিত করতে চেয়েছি মাত্র।

কাকলি ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আপনি একটা শেষ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন বলেছিলেন। এটা তো প্রশ্ন হল না, এটা একটা স্বগতোক্তি, একটা স্টেটমেন্ট।

– প্রশ্নটা এই, আপনি ফটোগ্রাফার, আমি পুলিস অফিসার। এই দুইয়ের খোলসের বাইরে বেরিয়ে এসে আমরা দুজন কি বন্ধু হতে পারি না?

কাকলি তৎক্ষণাৎ বলল, তা কেমন করে সম্ভব মিস্টার দাশ? ও ছাড়াও তো একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমাদের আছে।

– কী তা?

– আমি সম্ভাব্য আততায়ী, আর আপনি সম্ভাব্য সাকসেসফুল পুলিস অফিসার! ‘টম-অ্যান্ড-জেরি’র মধুর সম্পর্ক!