পাঁচ
বাড়িতে এসে যখন পৌঁছালেন তখন সাড়ে তিনটে। রানু কী একটা বই পড়ছিলেন। বারান্দায় বসে। ট্যাক্সিটা এসে দাঁড়াতেই সুজাতা এগিয়ে এল। বাসু ভাড়া মিটিয়ে ঘরে দাঁড়িয়ে সুজাতাকে বললেন, ওর স্বামী আর শ্বশুরের নাম জানা গেছে?
– হ্যাঁ, ত্রিদিব আর ত্রিবিক্রম নারায়ণ! কিন্তু সে সব কথা পরে। মামিমা এখনও মুখে কুটোটি কাটেনি। আপনি মুখ-হাত ধুয়ে ডাইনিং হলে চলে আসুন। বড্ড বেলা হয়ে গেল আজ।
রানু বললেন, কৌশিককেও ডাক সুজাতা। সে বোধহয় না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাসু বিব্রত : তার মানে? তোমরা কেউ লাঞ্চ করোনি?
রানীর জবাবটা ধমকের মতো শোনাল : তাই কি কেউ পারে?
তিনজনে একসঙ্গে আহারে বসলেন। কারণ কৌশিক না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েনি আদৌ। সুজাতা ইতিমধ্যে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার -যাঁর অফিসে ওরা বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল- তাঁর পাত্তাটা পেয়েছে শুনে কৌশিক আবার গাড়ি নিয়ে বার হয়ে গেছে। ত্রিদিব আর ত্রিবিক্রমের বিস্তারিত সংবাদ সংগ্রহ মানসে। বাসু-সাহেবের প্রশ্নে সুজাতা জানাল, ওরা ম্যারজ-রেজিস্ট্রারের খোঁজ বার করতে পেরেছে। হ্যাঁ,ছন্দার শ্বশুর একজন ধনকুবের। বোম্বাই আর নাসিকের মাঝামাঝি তাঁর বিশাল ফ্যাক্টারি। এতদিন একচ্ছত্র মালিক ছিলেন, ইদানীং সেটি লিমিটেড কোম্পানি; কিন্তু ত্রিবিক্রমনারায়ণ রায় শেয়ারের বৃকোদরভাগ দখল করে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হয়ে বসে আছেন। ত্রিদিবনারায়ণ তাঁর একমাত্র পুত্র। বরাবর কলকাতায় থেকে পড়াশুনা করেছে। একেবারে ভেতো বাঙালি হয়ে গেছে। যদিও ত্রিবিক্রমনারায়ণ বাস্তবে ‘রায়’ নন, ‘রাও’। ওঁরা জাতে রাজপুত। শক্তাবৎ না চন্দ্রাবৎ, কী যেন একটা রাজবংশের রক্ত ওঁদের ধমনীতে। রক্ত থাক না থাক, অভিমানটা আছে। পুত্র পিতাকে গোপন করে বেমক্কা একটা রেজিস্ট্রি বিয়ে করে বসেছে।
শেষপাতে বিশে যখন পুডিং পরিবেশন করছ, তখন বেজে উঠল টেলিফোন। সুজাতার হাতের কাছেই যন্ত্রটা। তুলে নিয়ে আত্মঘোষণা করল। তারপরেই বলল, কী নাম বললেন? সুভদ্রা সেন? এই নাম্বারে…? না-না, নাম্বার ঠিকই আছে…
রানু দেবী চিৎকার করে বললেন, ফোনটা আমার। আমাকে দাও!
সুজাতা রীতিমতো বিস্মিত। তবে বিস্ময়ের অনুভূতিটা এ বাড়িতে সকলেই অনায়াসে ভোঁতা করে নিতে জানে। সুজাতা রিসিভারটা রানুর দিকে বাড়িয়ে ধরল। তিনি হাত দিয়েই খাচ্ছিলেন- কাঁটা চামচ দিয়ে নয় –বাঁ হাতে যন্ত্রটা ধরে তার ‘কথামুখে’ বললেন, সুভদ্রা সেন বলছি; কে? ছন্দা রায়?
ও-প্রান্ত থেকে ভেসে এল প্রত্যুত্তর, হাঁ। আপনি শুভ্রাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন আমি যেন রিং-ব্যাক করি। তাই নয়?
– হ্যাঁ তাই। তোমাকে কিছু বলার আছে, ছন্দা…
– তার আগে বলুন, আপনি কেমন করে জানলেন এই নাম্বারে শুভ্রা চৌধুরী আমার বন্ধু?
– বলব। তারও আগে বলি, কমলেশ ঘোষ আমার বন্ধু নয়। আদৌ। শুভ্রা ওটা ভুল বলেছে তোমাকে। সে নিশ্চয় বলেছে যে আমি কমলেশের বান্ধবী এবং তোমাকে কমলেশের তরফে কিছু জানাতেই চাই, বলেনি?
ছন্দা ওঁর এই বাহুল্য প্রশ্নের কোনও জবাব দেবার চেষ্টাই করল না। সরাসরি বললে, তাহলে আপনি কে? আমাকে কী বলতে চান?
আমার নাম সুভদ্রা নয়, আমার নাম রানু বাসু। আমি মিস্টার পি. কে.বাসুর বাড়ি থেকে বলছি। তুমি আজই সকালে আমাদের বাড়িতে এসেছিলে,নিউ আলিপুরে, শিখা দত্তের পরিচয়ে..
– গুড গড! আপনি কেমন করে…?
– শোন, তুমি এখানে একটা ব্যাগ ফেলে গেছ। সেটা টের পেয়েছ নিশ্চয়। তাতে অনেক দামি জিনিস আছে…
– জানি, জানি, কিন্তু শুভ্রাদির নাম্বারটা…
– তোমাকে আরও জানাই, মিস্টার পি. কে. বাসু তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমার পাশেই তিনি বসে আছে। তুমি কি তাঁর সঙ্গে কথা বলবে?
– আর কোনও অলটারনেটিভ্ রেখেছেন আপনারা? দিন!
বাসু ওঁর হাত থেকে টেলিফোন-যন্ত্রটা নিয়ে তার কথামুখে বললেন, অনেক ভুগিয়েছ ছন্দা, এবার এসে মুখোমুখি বসে সব কথা বলবে?
– তার আগে একটা কথা বলুন, আপনি কি ওকে একটা টেলিগ্রাম করেছেন?
– ‘ওকে’ মানে? তোমার বান্ধবীর স্বামী নিরুদ্দিষ্ট কমলেশ ঘোষকে? হ্যাঁ, করেছি।
– আপনি ওর নাম-ঠিকানা জানলেন কীভাবে?
– ঠিক যেভাবে তোমার এবং তোমার স্বামী ত্রিদিবনারায়ণ রাওয়ের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেছি। কিন্তু সে-সব কথা টেলিফোনে আলোচনা করতে চাই না। তুমি কি একবার আসতে পার?
– না! আপনি ইতিমধ্যেই সর্বনাশ যা করার তা করেছেন! আর না!
– তাহলে আমিই তোমাদের আলিপুরের বাড়িতে…
– সর্বনাশ! না, না, সে চেষ্টাও করবেন না।
– তাহলে? একটা কিছু তো করতে হবেই। উই মাস্ট সিট অ্যাক্রস্ দ্য টেব্সাম্বহায়্যার!
– অল রাইট। আমিই আসছি। আধঘণ্টার মধ্যে।
– এস। তবে তোমার মারুতি গাড়িতে নয়। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা ফ্লাইং-ট্যাক্সি ধরে।
– কেন বলুন তো?
– তুমি কি এখনও টের পাওনি যে, তোমাকে একজন ফলো’ করছে?
– না তো? কে? কেন? আমার পিছু নেওয়ার কী উদ্দেশ্য?
– সেটা তো তুমিই আমাকে বলবে, ছন্দা।
আধঘণ্টার মধ্যে এল মেয়েটি।
ওঁর একান্ত কক্ষে বসলেন দু-জনে।
ছন্দা মুখ খোলার আগেই উনি একনিশ্বাসে বললেন, আ’য়াম সরি, ছন্দা। আমি জানতাম না, তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার আগেই রানুকে একটা রিটেইনার দিয়ে এসেছিলে!
ছন্দা অবাক হয়ে বলে, তাতেকী হল?
– তাতে এই হল যে, রানু ‘রিটেইনার’ গ্রহণের মুহূর্ত থেকে তুমি আমার ক্লায়েন্ট। তুমি জান না, এথিক্যাল কারণেক্লায়েন্টের জন্যে আমি জান-কবুল। তাই সারা দিনে তোমার নাম, স্বামীর নাম, স্বশুরের নাম, মায়, তোমার প্রথম স্বামীর নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে ফেলেছি।
– আপনি জানেন না, এইভাবে আপনি আমার কী সর্বনাশ করে বসে আছেন!
– না, তা নয়। সে যাই হোক, তুমি কমলেশের সঙ্গে সন্ধ্যা পাঁচটার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা রাখতে পারলে না কেন?
– কারণ আমি এখনও কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।
– কমলেশ কেন দেখা করতে বলেছে? সে কী চায়?
– এখনও বোঝেননি? টাকা।
– কত?
– কাল সকালে ব্যাঙ্ক খোলার আগে দুই হাজার। এ সপ্তাহের ভিতর দশ হাজার।
– অত টাকা তোমার আছে?
– না নেই। ধার করতে পারি।
– কেন? তুমি তো বড়োলোকের বউ। তোমার স্বামী তো কোটি কোটি টাকার ওয়ারিশান।
– সে-কথা আপনি কেমন করে জানলেন?
– সে-কথা মুলতুবি থাক না, ছন্দা। আমি কি ভুল বলেছি?
– না, ভুল নয়। তবে স্বামী বর্তমানে কপর্দকহীন। তাছাড়া তার টাকা আমি নেব কেমন করে, কেন নেব?
– ঠিক কথা। ত্রিদিব কি জানে কমলেশের কথা?
– না!
দু-জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। নীরবতা ভেঙে ছন্দাই প্রশ্ন করে, এত কথা আপনি কী করে জানলেন বলবেন না?
– সে অনেক কথা। সে-সব তোমার না জানলেও চলবে। বরং আমি যা জানতে চাই তা জানাও। ডাক্তার পি. সি. ব্যানার্জি কে?
ছন্দা একটু সময় নিল জবাবটা দিতে। গুছিয়ে নিয়ে বললে, আমার এক্স-এমপ্লয়ার। তাঁর নাসিং-হোমে আমি নার্স হিসাবে চাকরি করতাম, মানে এই বিয়ের আগে।
– ত্রিদিব কি তার কথা জানে?
– হ্যাঁ, ডাক্তার ব্যানার্জিকে সে চেনে বইকি। তাঁর নার্সিং হোমেই তো ও ভর্তি হয়েছিল। সেখানেই ওর সঙ্গে আমার আলাপ। আমি তার নাইট নার্স ছিলাম।
একটু চুপচাপ। তারপর ছন্দা জানতে চায়, আপনি তো সব কথাই জানতে পেরেছেন। এখন একটা কথা আমাকে বুঝিয়ে বলবেন?
– কী কথা?
– একটা মানুষ যদি সাতটা বছর নিরুদ্দেশ হয়ে থাকে, তাহলে আইনের চোখে সে কি মৃত নয়? সাত-সাতটা বছর স্বামী তাকে দেখভাল করেনি, মুখের অন্ন, পরিধেয় বস্ত্র জোগায়নি, সে যে বেঁচে আছে, শুধু আড়ালে লুকিয়ে আছে তা পর্যন্ত জানায়নি। আর সাত-সাতটা বছর জীবনযুদ্ধে ক্ষত বিক্ষতহয়ে যদি সেই তথাকথিত ‘বিধবা’ নতুন করে সংসার পাততে চায় তাহলে আইন তাকে সে অধিকার দেবে না?
– দেবে। সাত বছর ধরে কেউ যদি নিরুদ্দেশ থাকে তবে আইনের চোখে সে তথাকথিত মৃত। বিধবা পত্নী – বলা উচিৎ তার পরিত্যক্তা পত্নী, যদি নতুন করে কাউকে বিয়ে করে তবে সে বিবাহসিদ্ধ।
ছন্দার মুখটা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। প্রথম সূর্যের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়োটা যেমন ধীরে ধীরে ঝলমল করে ফুটে ওঠে। একটা দমবন্ধকরা শ্বাস – হয়তো কয়েক মাস ধরে এই দীর্ঘশ্বাসটা তার বুকে আটকে ছিল – ত্যাগ করে বলল, এই কথাটাই আজ সকালে আমি জানতে এসেছিলাম। আপনি আমাকে বাঁচালেন।
বাসু-সাহেবের মুখটা বেদনার্ত হয়ে ওঠে। তিনি ধীরে ধীর নেতিবাচক ভঙ্গিতে দু-দিকে মাথা নাড়ছিলেন।
ছন্দা জানতে চায়, কী ‘না’?
– আই অ্যাম সরি, ছন্দা। সাত বছর নিরুদ্দিষ্টের পত্নী দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে পারে এবং সে বিবাহ আইনত সিদ্ধ একটা বিশেষ শর্তসাপেক্ষে। প্রোভাইডেড্ ওই নিরুদ্দিষ্ট প্রথম স্বামী সশরীরে কোনদিন ফিরে না আসে। যে মুহূর্তে সে রঙ্গমঞ্চে পুনঃপ্রবেশ করবে, সেই মুহূর্তেই ওই দ্বিতীয় বিবাহ অসিদ্ধ: ‘নাল্ অ্যান্ড ভয়েড! ‘
ব্যাখ্যাটা দিতে ওঁর দু-মিনিটও লাগেনি, কিন্তু মনে হল পুরো দিনটাই কেটে গেছে। সূর্য নেমে গেল অস্তাচলে – কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারশুভ্রশিখরের রক্তিমাভা ঢাকা পড়ে গেল কালো আবরণে। ঘনিয়ে এল অন্ধকার।
ছন্দা ওঁর দিকে দু-চোখ মেলে তাকাল। তার ডাগর দুটি চোখ জলে ভরে এল। সে সংকোচ করল না, আঁচল দিয়ে চোখ দুটি মুছল না। ওর দু-গাল দিয়ে অশ্রুর দুটি ধারা নেমে এল। অস্ফুটে বলল, বেচারি।
– বেচারি? কার কথা বলছ?
– ত্রিদিব। আমার স্বামী।
বাসু ওর পিঠে একখানি হাত রাখলেন। বললেন, ওর সব কথা আমাকে বুঝিয়ে বল, ছন্দা? কেন সে ‘বেচারি’? কমলেশ অর্থমূল্যে তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারে। তাহলে ত্রিদিবের সঙ্গে তোমার বিবাহটা…
– তা হবার নয়, স্যার! ত্রিবিক্রমনারায়ণ যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন যে, আমি আইনত তাঁর পুত্রবধূ নই…
– তাই বা কেন? তাঁকে অস্বীকার করে ত্রিদিব তো তোমাকে রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছে…
– তাই তো বলছি, ‘বেচারি ত্রিদিব’! আপনি ওর সব কথা জানেন না।
– বল, সব কথা আমাকে বুঝিয়ে বল।
– বললেও আপনি বুঝবেন না। কেউ কোনও দিনই ওকে বুঝবে না। আর সেটাই ওর ট্র্যাজেডি! ওর বাড়ির কেউ, এমনকি ওর বাবাও ওর সমস্যাটা বুঝতে পারেননি, বুঝতে পারবেন না।
– কিন্তু ওর মা?
– শৈশবেই ও মাতৃহারা, বিমাতার কাছে মানুষ।
– কিন্তু ওর সমস্যাটা কী? ওর চরিত্রের কোন্ জটিলতাটা কেউ বুঝতে পারবে না বলতে চাও? যা, একমাত্র তুমিই বুঝেছ?
– না, স্যার! তেমন দাবি আমি করিনি। আমিও বুঝিনি, তবে বোঝবার চেষ্টা করেছি। আমিই প্রথম। বোধকরি তার আগে সাইকিয়াট্রিস্ট
– কী সেটা?
– ও একটা অবসেশনে ভুগছে। ও একা নয়, সবাই। গোটা রাও পরিবার। ওর বাবা ত্রিবিক্রমনারায়ণ তো বটেই। ওদের ধমনীতে নাকি বইছে রাজরক্ত। ওরা রানা প্রতাপের বংশধর, সংগ্রাম সিংহের অধঃস্তন পুরুষ। ওদের ধমনীতে সেই রাজরক্ত। যে রক্ত বইতো ফ্রম রাজসিংহ ব্যাক টু-হেভেন নোজ-কোন্ এক ‘গায়েব-গায়েবী’।
– বেশ তো তাই না হয় বইছে। তাতে কী?
– আপনাকে কেমন করে বোঝাব? তাই এরা যখন হাঁটে তখন ওদের ঠ্যাঙজোড়া এই ধূলিময় ধরণীর স্পর্শ পায় না, তার বিঘৎখানেক উপর দিয়ে ওরা চলে – হোভারক্রাফ্ট-এর মতো!
– হোভারক্রাফট? শব্দ প্রয়োগটা তোমার, না তোমার স্বামীর?
– আমারই। আমার তাই মনে হয়েছে ওরা সবাই অতীত আঁকড়ে জীবনযাপন করে, বর্তমান ওদের কাছে ছায়া-ছায়া। তাতে আর কার কী ক্ষতি হয়েছে জানি না, ত্রিদিব হয়ে গেছে যন্ত্রমানব। ওর বাবা ওকে পঁচিশ বছর ধরে ‘স্পুন-ফিডিং’ করিয়েছেন– চামচেটা অবশ্য সোনার!
– ও কি তোমার চেয়ে বয়সে ছোটো?
– হ্যাঁ, সেটাও একটা হেতু, আমাকে পুত্রবধূ বলে মেনে না নেবার। তবে সেটা পরোক্ষ হেতু মূল কারণ আমার ধমনীতে কোন নীল রক্ত বইছে না।
– বিয়ের পরে তোমার শ্বশুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি?
– আগেও নয়, পরেও নয়। তাঁকে আমি চোখে দেখিনি। ও তাঁকে না জানিয়েই আমাকে রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছে। টেলিগ্রাম করে বাবাকে জানিয়েছিল। তিনি টেলিগ্রামে আশীর্বাদ পাঠিয়েছিলেন। ব্যাস!
– ওর সঙ্গে তোমার কোথায় প্রথম আলাপ?
– বললাম যে – হাসপাতালের কেবিনে, নার্স হিসাবে। ও যে মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী এটা ও আজকাল বুঝতে শিখেছে। জীবনযুদ্ধে পরাজয়টা ভুলতে কিছু ইয়ারদোস্ত যে পথটা বাতলায় সে পথেই এগিয়ে চলছিল। এভাবেই ও ড্রাগ-অ্যাডিক্ট হয়ে পড়ে। তারপর নার্সিংহোমে ভর্তি হয়। ডক্টর ব্যানার্জির পেশেন্ট হিসাবে। সেখানেই আমার সঙ্গে ওর আলাপ… আমার কাছে ও সব কথা স্বীকারকরেছিল, বলেছিল যে, তার বাড়ির লোকেরা যদি জানতে পারে যে, সে ড্রাগ-অ্যাডিক্ট, তাহলে আত্মহত্যা করা ছাড়া ওর বাঁচবার কোনও পথ থাকবে না।
– আত্মহত্যা করে বাঁচা?
– হ্যাঁ! ওরা যে রানা প্রতাপের বংশধর। ওদের বংশে পদ্মিনী নারীরা জহর ব্রত পালন করে দিব্যজীবন লাভ করত– আপনি শোনেননি?
– বুঝলাম। তোমার প্রথম বিয়ের কথা বল। ওই কমলেশের কথা!
ছন্দার ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল। কোনওক্রমে বলল, সে জীবনের কথাটা আমি ভুলে থাকতেই চাই, স্যার।
– কেন? যা ফ্যাক্ট, যা সত্য, তাকে ভুলে থাকলেই কি তার জের মেটে? কেন ভুলে থাকতে
চাও সে জীবনটাকে?
– ছেলেমানুষ ছিলাম তখন। ছেলেমানুষের মতো নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছি। কড়ায়-গণ্ডায় তার মাসুলও দিয়ে এসেছি অবশ্য।
– তবে আর কী? ছেলেবয়সে মানুষে পাকা মাথার পরিচয় দেয় না। দ্যাট্ন্যাচারাল। তুমিও দিয়েছ। সো হোয়াট? বেশ তো, সে জীবনটার স্মৃতি যদি তোমার বর্তমান জীবনকে বিড়ম্বিত করে, তবে তাকে সাময়িক ভাবে জাগ্রত মনের আড়ালে সরিয়ে রাখ, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু প্রয়োজনে যেন সেই জীবনের প্রতিটি ঘটনা মনে করতে পার, সেটাও দেখতে হবে। কারণ ওগুলো ফ্যাক্ট! আজ সেই রকম একটি লগ্ন এসেছে। আমার জানা দরকার – আই মাস্ট নো – কবে, কোথায় তুমি কমলেশের সাক্ষাৎ পেয়েছিলে? কী কারণে তাকে বিয়ে করেছিলে? কেমন ছিল তোমাদের দাম্পত্যজীবন, এটটেরা, এটসেটরা!
ছন্দা নতনেত্রে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। ওঁর টেবিলে একটা কাচের রঙিন কাগজচাপা নিয়ে কিছুক্ষণ অহেতুক নাড়াচাড়া করল। তারপর মনস্থির করে বল, হ্যাঁ, বলব, আপনার জানা থাকা দরকার, অ্যাজ্ মাই অ্যাটর্নি! কী জানেন? চরম উত্তেজনায় মুহূর্তের সুযোগ পেলে আমি ওই লোকটাকে খুন করে ফেলতে পারি! কিন্তু বিশ্বাস করুন, স্যার, তেমন কোনও পূর্ব-পরিকল্পনা আমার মাথায় নেই! ওই দুর্ঘটনা যদি আদৌ ঘটে, তবে দ্যাট উড বি জ্যস্ট আ কালপেব্ল হোমিসাইড, নট আ ডেলিবারেট মার্ডার! খুন করার পূর্বসিদ্ধান্ত মোতাবেক নয়, ওর উস্কানিতে উত্তেজিত হয়ে, প্রচণ্ড রাগে…অথবা ঘৃণায়…
মাঝপথেই ও থেমে যায়। অসমাপ্ত বাক্যটা শেষ করে না। বাসুসাহেব ধৈর্য ধরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। ছন্দা আত্মস্থ হয়ে নিশ্চুপ বসেই রইল। পড়ন্তবেলার রোদ পশ্চিমের জানলা দিয়ে মেঝেতে গ্রিল-এর একটা সিলুয়েট-আলপনা এঁকেছে– সেইদিকে তাকিয়ে ও দীর্ঘসময় ধ্যানমগ্ন হয়ে রইল। তারপর যেন সেই ভাবের ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল। হাসল। বলল, না! তেমন দুর্ঘটনা ঘটবে না, কিছুতেই ঘটবে না। আমার ঘরে, জানেন, এককালে ভারি ইঁদুরের উপদ্রব ছিল। আমি ইঁদুর-কল পেতে ওদের ধরে, দূরের মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসতাম। মাঠে লক্ষ্য করে দেখতাম, কাকগুলো ঘুরঘুর করত খাঁচায় ইঁদুর দেখে। তাই আমি ঘন ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে ইঁদুর-কলের ঢাকনাটা খুলে দিতাম…
বাসু বললেন, তাহলে তোমার হাত-ব্যাগে লোডেড রিভলভার থাকে কেন?
আবার আত্মস্থ হয়ে যায়। হাসে। বলে, সে কথা থাক!
– থাকবে কেন? সব কথাই তো খুলে বলতে রাজি হয়েছ?
– না স্যার! সব কথা নয়। আমার জীবনের এ জটিলতার দিকটা আপনাকে জানাতে পারব না– সরি। রাওয়ের কথা বলব, বিশ্বাসের কথা বলব, কিন্তু…
– বিশ্বাস! ‘বিশ্বাস’ কে?
– আমার প্রথম পক্ষের স্বামী: কমলেন্দু বিশ্বাস!
– আই সী! বল?
