রিস্তেদারের কাঁটা – নারায়ণ সান্যাল

রিস্তেদারের কাঁটা – নারায়ণ সান্যাল

রিস্তেদারের কাঁটা – নারায়ণ সান্যাল

.

উৎসর্গ

তোকে একটা মজার গল্প শোনাই, শোন, সুনীল :

বিশ-পঁচিশ বছর আগেকার কথা। তখন আমি পূর্ত-বিভাগে বর্ধমান ভুক্তির অধিক্ষক বাস্তকার। ঐ যাকে শাদা-বাংলায় বলে পি. ডাব্‌, ডি. র সুপারিন্টেন্ডিং এঞ্জিনিয়ার, বার্ডওয়ান সার্কেল। জীপে করে (তখনো এস. ই.-দের অ্যাম্বাসাডার জোটেনি) জি. টি. রোড বরাবর ইন্সপেকশানে যেতে হত। আসানসোলে পৌঁছে স্টেশান রোড পার হয়ে বাঁদিক ঘেঁষে জীপটা দাঁড়িয়ে যেত। অনিবার্যভাবে। ঠিক ই. আই.আর. স্কুলের সামনে। ড্রাইভার হাজারে-সিং জানত, ঐখানে একটি বিশেষ দোকান থেকে আমার জন্য তাকে সিগ্রেট কিনে আনতে হবে।নিত্যকর্মপদ্ধতি। ঐ বিশেষ দোকানেই। আমার ধারণা ছিল, হাজারে কোনদিন জানতে পারেনি যে, ওকে স্থানচ্যুত করে আমি জীপ থেকে নেমে দাঁড়াতাম। মাথা নিচু করে মনে মনে স্মরণ করতাম সেই সব হারিয়ে-যাওয়া আজব মাস্টারমশাইদের: হরিদাস গোসাঁই, শরদিন্দুবাবু, ভূপেনবাবু, কেদারবাবু, ক্ষিতিনবাবু, পণ্ডিতমশাইদের। যে সব কুমোরদের হাতে-গড়া পুতুল-তুই-আমি, সতু-জীতেন, সন্তোষ-ভনা, প্রভাত– শশাঙ্ক, আরও কত কে!

…আমি টের পাইনি যে হাজারে সিং ঠিক টের পেত! আার ধারণা: তার স্যারের মাথায় দু-একটা ‘স্কুপ’ ঢিলে। কিন্তু সে-কথা তো বলা যায় না! কৌতূহলটাকে সে বারবর চেপে রেখেছিল।

…সেটা টের পেলাম রিটায়ারমেন্ট-এর দিনে। ফেয়ার-ওয়েল সেরে হাজারে সিং-এর গাড়িতেই ফিরে এলাম বাড়িতে। শেষ বিদায় জানিয়ে হাজারে বললে, এক বাত পুঁছু, স্যার?

আমি সহাস্যে বলি, পুছো না, ক্যা সওয়াল?

সওয়াল যা করল তার জবাব দিতে আমি হিমসিম। আসানসোল বাজারের কাছে মন্দির-উন্দির তো কুচ্ছু নেই আছে, না? তাহলে আমি বে-ফাজুল নমস্তে করতাম কাকে?

বললুম, ঐ আসানসোল স্কুলেই আমি পড়তুম, হাজারে। মাস্টারমশাইদের কাছে মাফি মাংতুম, সিগ্রেট কিন্‌ছি বলে।

হাজারে সিং খাল্লা শিখ। সম্বঝ নিতে তার অসুবিধা হল না। গুরু নানক, গুরু গোবিন্দেরও নিষেধ আছে ধূমপানে।

এবার গল্পের ‘মরাল’টা শোনাই: হে পাঠক! মাস্টারমশাইদের উপদেশ, গুরুজনদের পরামর্শ, গুরু নানক-গুরু গোবিন্দের দোহাই উপেক্ষা করলেও শেষমেশ ও কু-অভ্যাসটাকে ছাড়তেই তো হবে। তবে ধরা কেন? এই দেখ আমাকে! হার্ট-অ্যাটাকের পর ক’বছর খাচ্ছি না! দিব্যি আছি!

নববর্ষের দিনে ‘রিস্তেদারের কাঁটা’ তোকে আর তোর বউকে উৎসর্গ করে তৃপ্তি পেলাম।

শ্রীসুনীল কুমার রায়
শ্রীসবিতা রায়
আসানসোল

নারায়ণ সান্যাল
১/১১/৯১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *