রিস্তেদারের কাঁটা – ১

এক

গাড়িটাকে গাড়ি-বারান্দার নিচে পার্ক করতে গিয়ে নজর হল সেখানে একটা ট্যাক্সি মিটার ডাউন করে দাঁড়িয়ে আছে। টুকটুক করে সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে এলেন বাসু-সাহেব। নজরে পড়ল বারান্দার শেষ প্রান্তে বেতের টেবিলটা ঘিরে বসেছে চায়ের আসর। কৌশিক আর সুজাতা দুজনেই আছে, আর হুইলচেয়ারে রানী দেবী। টেবিলে কাপ, টি-পট, বিস্কিটের প্লেট। বাসু-সাহেব ওদিক পানেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন, বাধা পেলেন রানী দেবীর কথায়: তোমার অপেক্ষায় একটি মেয়ে বসে আছে লাইব্রেরী ঘরে।

দাঁড়িয়ে পড়লেন বাসু। পকেট হাৎড়ে পাইপ-পাউচ বার করতে করতে বললেন, মেয়ে? না, মহিলা?

রানী চায়ের কাপে লীকার ঢালতে ঢালতে বললেন, কৌশিকের হিসাবে হয়তো মহিলা, আমার কাছে বাইশ-তেইশ বছরের মেয়ে– মেয়েই।

– ক্লায়েন্ট?

– তাই তো মনে হল। বলছে, তার যা বক্তব্য তা শুধু তোমাকেই জানাবে, আর কাউকে নয়।

– অ। তা নাম-ঠিকানাটুকু অন্তত জানিয়েছে নিশ্চয়ই?

কৌশিক আগবাড়িয়ে বললে, তা জানিয়েছে। আর সেই সূত্রে আমার ডিডাক্শনটাও শুনে রাখুন মামু – আপনার ক্লায়েন্ট হয় ‘পসথিউমাস চাইল্ড’ অথবা আঁতুড়েই হারিয়েছে ওর মাকে।

বাসু-সাহেব ইতিমধ্যে পাইপে তামাক ঠেশে পাউচটা পকেটজাত করেছেন। কৌশিকেরদিকে ফিরে বললেন, ডিডাকশনের সূত্র?

– ওর নাম। রানী মামিমার মারফতে জেনেছি। আপনার ক্লায়েন্টকে আমি এখনো চোখেও দেখিনি।

– আই সী। কী নাম?

– স্মরণিকা সেন।

প্রখ্যাত ক্রিমিনাল-সাইডের ব্যারিস্টার পি. কে.বাসুকে যাঁরা চেনেন তাঁদের কাছে ওঁর পরিচয় দিতে যাওয়া বাহুল্য। যাঁরা চেনেন না তাঁদের শুধু এ-কথাই বলতে পারি তিনি ই. স্ট্যানলে গার্ডনার এর বিশ্ববিশ্রুত চরিত্র ‘প্যেরি মেসন’এর ছায়া দিয়ে গড়া কলকাতাবাসী একজন আইনজীবী। নিউ আলিপুরের দোতলা বাড়িতে আছেন পঙ্গু স্ত্রীকে নিয়ে। ওঁরা থাকেন একতলায়। দ্বিতলে তাঁদের স্নেহধন্য কৌশিক আর সুজাতার বাস। চারজনের একই হেঁসেল। কৌশিক আর সুজাতা একটি প্রাইভেট গোয়েন্দা অফিস চালায় ঐ বাড়িতেই, একতলায়। বাসু-সাহেব তার নামকরণ করেছিলেন:সুকৌশলী-সুজাতার ‘সু’ আর কৌশিকের ‘কৌ’– বাকি ‘শলী’টুকু নাকি পাদপূরণের ‘খলু’। বাসু-সাহেব একটু বিচিত্র কায়দায় প্র্যাকটিস করেন। জুনিয়ার ব্রীফ সাজিয়ে দেবে আর আদালতে গিয়ে সওয়াল করবেন এমন ব্যারিস্টার তিনি নন। ফলে বাসু-সাহেব কেস পেলে ‘সুকৌশলী’কেও ব্যস্ত হতে হয়। রানী দেবী দু’-তরফের রিসেপশনিস্ট। টেলিফোন আর ইন্টারকমে মাঝে-মাঝে দু’-পক্ষের হাল ধরতে হয় তাঁকে। বাসুর আবার কিছু বাতিক আছে। যদি তিনি নিজে সিদ্ধান্তে আসেন যে, তাঁর ক্লায়েন্ট নির্দোষ, তখনই তার ‘কেস’ উনি হাতে নেন। যদি মনে করেন সে দোষী, তাহলে ক্লায়েন্টকে পরামর্শ দেন দোষ স্বীকার করে শাস্তি গ্রহণ করতে অথবা অন্য কোনও আইনজীবীর দ্বারস্থ হতে। তা থেকে এমন অবস্থা হয়েছে যে, কলকাতা হাইকোর্টের সব বিচারকই জানেন, বাসু-সাহেব যার কেস নিয়ে সওয়াল করছেন, সে দোষী-নির্দোষ যাই হোক, বাসু-সাহেবের দৃষ্টিতে: নির্দোষ। তা থেকে আরও একটা ঝামেলা হয়েছে– সত্যিকারের অপরাধী ইদানীং ভুলেও বাসু-সাহেবের দ্বারস্থ হয় না, কারণ ঐ আইনজীবীর দ্বার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে এসেছে এ-কথা জানাজানি হয়ে গেলে আদালতে তার অবস্থা সঙ্গীন!

বাসু-সাহেবের বিষয়ে আর একটি কথা বলা দরকার, তাঁর একটি আনব্রোকেন রেকর্ড আছে – তাঁর কোনও মক্কেল, খুনী-আসামী, আজ পর্যন্ত সাজা পায়নি!

লাইব্রেরি ঘরে উনি ঢুকতেই স্মরণিকা উঠে দাঁড়ালো। টেবিলটা পাক দিয়ে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল বাসু-সাহেবকে। উনি বাধা দিলেন না। এসব ভারতীয় শিষ্টাচার ভালই লাগে নিখুঁত সাহেবী-কেতার মানুষটির। নিজে আসন গ্রহণ করে বললেন, তোমার নাম ‘স্মরণিকা সেন’ এটুকুই জেনেছি। নাম থেকে মনে হয়েছে জীবনের প্রারম্ভেই তোমার কোনও প্রিয়বিয়োগ ঘটেছে, নামটা ঠাকুর্দা’র দেওয়া, না দাদামশায়ের?

স্মরণিকা হাসি লুকিয়ে বললে, দুজনের একজনও নন, জেঠুর। আমার শৈশবে একটা মোটর অ্যাকসিডেন্টে বাবা ও মা দুজনেই একসঙ্গে মারা যান।

– বুঝলাম। এবার বল, আমার কাছে এসেছ কি নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা মতো? নাকি কেউ পরামর্শ দিয়েছে?

– জেঠুই একটা চিঠি লিখে আপনার কাছে আসতে বলেছেন।

– চিঠি লিখে? কেন? তোমরা দুজনে কি দু জায়গায় থাক?

– আজ্ঞে না। তবে আমি কিছু দিনের জন্য ভারতের বাইরে গেছিলাম…

বাধা দিয়ে বাসু-সাহেব বলেন, তোমার জেঠুর কী নাম? কত বয়স?

– জেঠুর বয়স পঁচাত্তর। তাঁর নাম শ্রীসত্যানন্দ সেন।

– আর তোমার বাবার নাম? যিনি বছর পঁচিশ আগে মারা যান?

স্মরণিকা হাসল। বললে, আমার বয়স বাইশ। বাবা মারা যান একুশ বছর আগে। তাঁর নাম ছিল সত্যপ্রিয় সেন। জেঠুর চেয়ে তিনি আঠারো বছরের ছোট ছিলেন। আমি জেঠুর কাছেই মানুষ।

– তোমরা কয় ভাই-বোন?

– আমি বাবা-মার একমাত্র সন্তান।

– আর তোমার জাঠতুতো ভাই-বোন?

– না, জেঠু কনফার্মড ব্যাচিলার।

– তাহলে তোমাকে মানুষ করলেন কে? রাবা-মা যখন মারা যান তখন তোমার বয়স তো মাত্র এক, জেঠুও ব্যাচিলার… তাহলে?

– মামণি, মানে শান্তি মাসি…না, না মানে তিনি আমার নিজের মাসি নন। দাঁড়ান, বুঝিয়ে বলি…

– বল। তবে আমি দাঁড়াতে পারব না বাপু। বসে বসেই শুনব।

স্মরণিকা আবার হাসে। বোঝে, এঁর সামনে প্রতিটি কথা ওজন করে বলতে হবে। জবানবন্দিতে সে যা বলল তার সারমর্ম এই রকম: সত্যানন্দ সেন একজন সফল ব্যবসায়ী। প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন জীবনে। সংসার করেননি। ছোট ভাইটির বিবাহ দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের নিয়েই তাঁর জীবন কেটে যাবে। দুর্ভাগ্যবশত সেটা হয়নি। শান্তি মাসির সঙ্গে সেন-পরিবারের কেনও রক্তের সম্পর্ক নেই। তিনি ঘটনাচক্রে হয়ে পড়েছিলেন সেন-সাহেবের আশ্রিতা। শান্তি দেবীর স্বামী সুহাস দত্ত ছিলেন সত্যানন্দের ফার্মের একজন কর্মচারী। বস্তুত তাঁর প্রতিষ্ঠানের একজন দক্ষ কর্মী। সত্যানন্দই উৎসাহ করে তার বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পরেই সুহাসের কী-যে হ’ল, রাতারাতি সংসারত্যাগ করল সে। সত্যানন্দ নিজেকেই দায়ী করলেন খানিকটা। তাঁর সহকারীর যে ধর্ম-ধর্ম বাতিক ছিল এটা তিনি জানতেন। গরিবের ঘর থেকে সুন্দরী মেয়ে নিয়ে এসে তাকে নিয়ে সংসার বাঁধতে চেয়েছিলেন। সুহাসের হঠকারিতায় সব ভেঙে গেল। ঠিক একই সময়ে তাঁর নিজের সংসারেও ঘটল মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা। ভাই ও ভাই-বউ মারা গেল মোটর অ্যাকসিডেন্টে। তিনি নিজে বিবাহ করেননি। এক বছরের ভাইঝিটিকে মানুষ করার প্রয়োজনে বাড়িতে একজন গভর্নেস-জাতীয় মহিলাকে এনে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। শান্তি দেবীকে তিনি সসঙ্কোচে প্রস্তাবটা দিলেন। শান্তি রাজি হলেন। বয়সে তিনি সত্যানন্দর চেয়ে ষোলো বছরের ছোট। তিনি এসে ঐ অনাথ শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন। তাকে মানুষ করে তোলেন। মাত্র তিন বছর আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। এখন স্মরণিকাই সংসারটা দেখে। তারপর মাসখানেক আগে টুরিস্ট-ভিসা নিয়ে সে ইয়োরোপ বেড়াতে যায়। সেখানেই সে জ্যেঠুর জরুরি চিঠিখানা পায়। পত্রপাঠ সে ফিরে আসে ভারতে…

বাধা দিয়ে বাসু-সাহেব বলেন, কবে এলে তুমি ভারতে?

ঘণ্টাকতক আগে। আজই। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আপনার কাছে এসেছি। এখনো বাড়ি যাইনি।

– সে কী! কেন গো?

– চিঠিখানা পড়লেই সেটা বুঝতে পারবেন। আগে এটা পড়ুন…

বাসু হাত বাড়িয়ে খামটা নিলেন। উপরে স্মরণিকার নাম, লন্ডনের এক ঠিকানা: বি. কে. চতুর্বেদী। বাসু জানতে চান– তিনি কে?

– চৌবে কাকুর রিস্তেদার!

– অবভিয়াসলি। যেহেতু চৌবে আর চতুর্বেদী সমার্থক। কিন্তু এই চৌবে কাকুটি কে?

– জেঠুর ভাই হন সম্পর্কে। চৌবেকাকু আবার জেঠুর, মানে আমাদের রিস্তেদার।

– সেটা তো সহজে হজম করতে পারছি না, স্মরণিকা। ‘চৌবে’ একটি বিহারী ব্রাহ্মণের টাইটেল, তোমরা ‘সেন’। কায়স্থ, বদ্যি না সোনার বেনে?

– কায়স্থ।

– তাহলে? চৌবে কোন সূত্রে তোমাদের রিস্তেদার হয়?

– আপনি স্যার, প্রথমে চিঠিখানা পড়ুন।

বাসু-সাহেব চিঠিতে মনোনিবেশ করলেন। পাকা হতের লেখা। তবে একটু যেন কাঁপা-কাঁপা। মনে হয়, পত্রলেখক বয়সের ভারে ক্লান্ত। ঠিকানা নিউ আলিপুরেরই। তবে অন্য ব্লকের। তারিখ প্রায় পক্ষকাল পূর্বেকার।

“স্নেহের টুকু-মা,

তুই তাড়াতাড়ি ফিরে আয়। আমার আর ভাল লাগছে না। কিন্তু কলকাতা পৌঁছে সোজা বাড়ি আসিস না। আমি যা বিিছ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে তারপর বাড়ি আসবি। আমি দমদম এয়ারপোর্টে তোকে রিসিভ করতে যেতে পারব না। সম্ভবত বাড়ির গাড়িও যাবে না। সেটা এখনো সিংজীর রিপেয়ার-গ্যারেজে পড়ে আছে। তুই দমদমে নেমে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে যাবি ব্যারিস্টার পি. কে. বাসুর বাড়িতে। তাঁর এই নিউ-আলিপুরেরই ঠিকানা ও-পাতায় লিখে দিলাম। বাসু-সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাঙ্কে যাবি। এই চিঠির সঙ্গে যে চেকটা পাঠাচ্ছি সেটা ভাঙাবি। টাকাটা বাসু-সাহেবকে দিয়ে বলবি সেটা এমনভাবে লুকিয়ে ফেলতে যাতে কেউ না টাকাটার সন্ধান পায়। এ-কাজটা শেষ হলে বাড়িতে আসবি, তার আগে নয়। বাড়ি এসে হয়তো এমন কিছু দেখবি যা তোর চিন্তার বাইরে। মেজাজ ঠাণ্ডা রাখিস। রাগের মাথায় কিছু বোকামি করে বসিস না। পি. কে. বাসু-সাহেবকে বলিস, আমার জন্যে একটা উইল তৈরী করতে। আমার সর্বস্ব আমি তোকে দিয়ে যেতে চাই। উইলটা যেন সংক্ষিপ্ত হয়, এবং অনতিবিলম্বে প্রস্তুত হয়। তৈরী হলেই দুজন সাক্ষী সমেত, আর, হ্যাঁ, একজন ডাক্তার সমেত, বাসু-সাহেব যেন আমার সঙ্গে দেখা করেন। এ বাড়িতে ঢুকতে কোন বাধা পেলে যেন তিনি তা অগ্রাহ্য করেন। বাড়ি আমার। আমার আমন্ত্রণেই তিনি আসবেন। উইলে সই হয়ে গেলে তিনিই সেটা সংরক্ষণ করবেন। আমার অবর্তমানে উইলটি কার্যকরী করার জিম্মাদারীও তাঁর। সব কিছু যেন অত্যন্ত গোপন থাকে। শেষ কথা: টুকু-মা! একটা কথা ভুলিস না। যাই ঘটুক না কেন, বিশ্বাস রাখিস, এই দুনিয়ায় তোকেই সবচেয়ে আমি ভালবাসি।

আশীর্বাদক জেঠু”

চিঠিখানা পড়া শেষ করে বাসু বললেন, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা জরুরী।কী ব্যাপার কিছু আন্দাজ করতে পার?

– আজ্ঞে না। ঐ চিঠিখানা পেয়েই আমি ফেরার ব্যবস্থা করি। চৌবেকাকুর রিস্তেদার, মিস্টার চতুর্বেদী – মানে, যাঁর বাড়িতে আমি গেস্ট হয়ে ছিলাম লন্ডনে– তিনি আমার জন্য একটা স্কটিশ্-টুরও ঠিক করেছিলেন। আমি রাজি হইনি। সোজা চলে এসেছি। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল – চৌবেকাকু আর কাকিমা…

– এবার বল, তাঁরা কোথা থেকে উদয় হলেন।

অগত্যা আবার কিছুটা ব্যাখ্যা দিতে হল স্মরণিকাকে। প্রায় মাস-তিনেক আগে ধানবাদ থেকে ওঁরা আসেন – ধনঞ্জয় চৌবে, তাঁর স্ত্রী সুভদ্রা কাকিমা আর বিলাস সিং যাদব।

– সবাই তোমার জেঠুর রিস্তেদার?

– আজ্ঞে না। বিলাস সিং হচ্ছেন চৌবেকাকুর বন্ধু। ইন ফ্যাক্ট, আপনি ঠিকই ধরেছেন-চৌবেকাকু অথবা সুভদ্রা কাকিমার সঙ্গেও আমাদের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। আমার ঠাকুর্দা, মানে জেঠুর বাবা সত্যপ্রসন্নের দুই বিয়ে। চৌবেকাকুর মা জেঠুর বিমাতা। দাদু বিহার-শরিফে যখন বদলি হয়ে যান, তখন ঐ বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সে আমলে বামুন-কায়েতের বিয়ের সামাজিক অনুমোদন না থাকায় জেঠুর বিমাতা কোনদিনই কলকাতায় আসেননি। তবে শুনেছি: চৌবেকাকু দাদুর সম্পত্তির অংশ পেয়েছিলেন। ওঁরা তিনজনে সম্প্রতি কী কাজে কলকাতায় আসেন। আমাদের বাড়িতেই ওঠেন। তারপর থেকে এখানেই আছেন। জেঠুর সেবাশুশ্রুষা করতে করতে আমি খুব কাহিল হয়ে পড়েছি এই কথা বলে চৌবেকাকুই আমার বিলেত যাবার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর দাদার বাসায় ছিলাম লন্ডনে। নিজের দাদা নয়, রিস্তেদার। পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট-মিকিট সব কিছুই চৌবেকাকু আর বিলাসকাকু করে দেন। জেঠু শুধু খরচটা দেন।

– বুঝলাম। এবার চেকটা দেখি…

বাসু-সাহেব হাতটা বাড়িয়ে দেন।

চেকটা নিয়ে সেটা দেখেই সোজা হয়ে বসেন। স্মরণিকার দিকে তাকিয়ে বলেন, এর মানে কি? গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কের উপর সওয়া লক্ষ টাকার চেক!

– জানি স্যার! আমিও ওর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি।

– কিন্তু আমি যেন কিছু কিছু বুঝতে পারছি, টুকু! তোমার জেঠুকে কিছু একটা খোঁচাচ্ছে! না হলে ও-কথা কেন লিখবেন– “বাড়ি আমার, আমার আমন্ত্রণেই তিনি আসছেন’। তাঁর বাড়িতে ঢুকতে আমি বাধা পেতে পারি, এ-কথা কেন মনে হল ওঁর? চল, প্রথমে ব্যাঙ্কে যাই। তোমাকে ব্যাঙ্কের কেউ চেনে? না চিনলেও ক্ষতি নেই। সঙ্গে তোমার পাসপোর্ট আছে, তাতেই তোমার সনাক্তিকরণ!

– না, না, ব্যাঙ্কে অনেকেই আমাকে চেনেন। জেঠুর যাবতীয় ব্যাঙ্কের কাজ তো আমিই করতাম এতদিন।

– কী মনে হয়, সওয়া লাখ টাকা ঐ অ্যাকাউন্টে আছে তো?

– আছে। আমি যখন বিলেত যাই তখন ঐ অ্যাকাউন্টে দেড় লাখের উপর ছিল। কত আর খরচ হবে ছয় সপ্তাহে?

– তুমি তোমার জেঠুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট দেখাল কর? জয়ে অ্যাকাউন্ট?

– না, না। অ্যাকাউন্ট জেঠুর নামে। আমি চেক লিখি, জেঠু সই করেন।

– ঠিক আছে। চল। তোমার মালপত্র কি ঐ ট্যাক্সিতে?

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

– মালপত্র নামিয়ে চল ট্যাক্সিটা ছেড়ে দেওয়া যাক। আমরা হেঁটেই যাব। ব্যাঙ্ক এমন কিছু দূরে নয়। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার আমাকেও চেনে। কিন্তু একটা কথা। সওয়া লক্ষ টাকা ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে তুমি তো ট্যাক্সিতে ঘোরাফেরা করতে পারবে না টুকু। তোমার ডাকনাম তো ‘টুকু’? না কি? তোমার জেঠুর চিঠি পড়ে তাই তো মনে হল।

– আজ্ঞে না। আমার ডাকনাম ‘টুকু’ নয়। একমাত্র জেঠুই ঐ নামে মাঝে মাঝে ডাকেন। আপনিও ঐ নামে ডাকলে আমি সাড়া দেব, আপত্তি করব না। কিন্তু যে-কথা হচ্ছিল, জেঠুই তো বলেছেন – টাকাটা আপনি আপাতত গচ্ছিৎ রাখবেন।

– তা বলেছেন। কিন্তু আমি তো এ জাতীয় কাজ করি না। সে যাহোক, সমস্ত ব্যাপারটা খতিয়ে দেখা পর্যন্ত টাকাটা না হয় আমার কাছেই গচ্ছিৎ থাকল। কথা হচ্ছে, ট্যাক্সিভাড়া মিটিয়ে দেবার মতো টাকা তোমার কাছে আছে তো?

টুকু রাঙিয়ে ওঠে। বলে, আজ্ঞে না। বস্তুত আমার কাছে ভারতীয় মুদ্রা কিছুই নেই। সামান্য কিছু শিলিং-পেন্স ভাঙানি আছে। আপনিই ভাড়াটা মিটিয়ে দিন স্যার, চেকটা ভাঙানো হলেই…

– ঠিক আছে, ঠিক আছে। চলো।

গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কের নিউ আলিপুরের শাখা ওঁর বাড়ি থেকে হাঁটাপথের দূরত্বে। তা হোক, সওয়া লক্ষ টাকা হাতব্যাগে নিয়ে এটুকু পথও পাড়ি দেওয়া উচিত নয়? যা দিনকাল পড়েছে! বাসু-সাহেব তাঁর ভল্টের চাবিটা সঙ্গে নিয়ে নিলেন। নগদ টাকাটা ঐ ব্যাঙ্কে তাঁর ভল্টে রেখে দেবেন চেকটা ভাঙিয়ে।

সত্যই এ জাতীয় কাজ তিনি করেন না। কিন্তু মেয়েটির বিচিত্র ঘটনাপরম্পরাতাঁকে দূরন্ত কৌতূহলী করে তুলেছে। এ সমস্যার শেষটুকু না দেখে তাঁর তৃপ্তি নেই। দেখাই যাক না – ঘটনা কোন্ দিকে গড়ায়, ভাবখানা এইরকম।

বেলা এখন সাড়ে এগারো। ব্যাঙ্কে লোকজন যথেষ্ট। স্মরণিকা টেলার কাউন্টারে গিয়ে কিউ-এ সামিল হল। একটু পরেই সামনের ক’জন কাজ সেরে সরে গেলেন। স্মরণিকা কাচের ফোকর দিয়ে চেকটা বাড়িয়ে ধরল। ভিতরে যে ব্যাঙ্ক-কর্মচারী হাত বাড়িয়ে সেটা নিলেন তিনি প্রশ্ন করলেন, কবে ফিরলেন, মিস্ সেন?

বাসু বুঝতে পারেন, স্মরণিকা ঐ কর্মচারীর পরিচিত। সে যে ভারতের বাইরে গেছিল এ খবরটাও রাখে। তবে টুকুকে জবাব দিতে হল না। কেরানী ভদ্রলোক ইতিমধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, গুড হেভেন্স! নগদে? এত টাকা?

এবারও স্মরণিকা জবাব দেবার সুযোগ পেল না। ভদ্রলোকই পুনরায় বললেন, এক্সকিউজ মি। আমি এখনি আসছি…

চেকটা হাতে করে তিনি কাউন্টার ছেড়ে ম্যানেজারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। একটু পরেই আবার ফিরে এলেন। তাঁর হাতে চেকটা ধরা। এতক্ষণে স্মরণিকার সঙ্গীটিকে ওঁর নজরে পড়ে। বলেন, গুড মর্নিং স্যার। আপনি কি ওঁর সঙ্গে আছেন?

বাসু বলেন, ইয়েস। শী ইজ মাই ক্লায়েন্ট।

কর্মচারী বলেন, আয়াম সরি মিস্ সেন। চেকটা বাউন্স করছে, মানে, অত টাকা ঐ অ্যাকাউন্টে নেই।

– নেই? কত টাকা আছে?

– আপনি জানেন মিস্ সেন, কত টাকা আছে, তা শুধু অ্যাক্সাউন্ট-হোল্ডারকেই জানানো চলে। তবে এক্ষেত্রে একটা কথা আপনাকে জানাতে পারি, ইতিমধ্যে কোর্ট অর্ডারে ঐ অ্যাকাউন্টের সব টাকাই তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আমার মনে হয়, মিস্ সেন, আপনি এখনি আপনার জেঠার সঙ্গে দেখা করুন চেকটার ব্যাপারে। ব্যারিস্টার-সাহেব আপনাকে আইনের দিকটা বুঝিয়ে দেবেন।

বাসু বলেন, ব্যারিস্টার-সাহেব নিজেই কিছু বুঝছেন না, ক্লায়েন্টকে কী বোঝাবেন? ঠিক কী ঘটেছে বলুন তো?

– আদালত মিস্টার সেন-এর জন্য একজন কন্ডার্ভেটার নিযুক্ত করেছেন। আদালত-নিযুক্ত কনজারভেটর জানতে চান ঐ অ্যাকাউন্টে কত টাকা ব্যালেন্স আছে। সেটা জেনে ব্যাঙ্কিং রুর মিনিমাম ব্যালেন্সের মাত্র পাঁচশ’ টাকা রেখে সমস্ত টাকাই ঐ কন্জারভেটর তাঁর নিজের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছেন।

– কী নাম আদালত-নিযুক্ত কনজারভেটরের?

– মিস্টার ধনঞ্জয় চৌবে। মাত্র পরশু দিন।

– আই সী।

কেরানী ভদ্রলোক স্মরণিকার দিকে ফিরে পুনরায় বললেন, আয়াম রিয়ালি সরি, মিস সেন। কিন্তু ঐ চেকখানাও মোস্ট আন-ইউজুয়াল।

স্মরণিকা বললে, জানি! কিন্তু, মানে জেঠু…

– যা হোক, এখন কেমন আছেন আপনার জেঠু?

– এখন কেমন আছেন মানে? কী হয়েছে তাঁর?

ক্লার্ক ভদ্রলোক ততক্ষণে চেয়ারে বসে পড়েছেন। পরের চেকখানি গ্রহণ করেছেন। বাসু-সাহেব মেয়েটির বাহুমূল ধরে আকর্ষণকরেন। একটু দূরে সরে এসে বলেন, চেকটা আমার কাছেই থাক টুকু। তুমি ওর পিছনে ইতিমব্যে স্বাক্ষরও করেছ। ওটা প্রায় নগদ টাকার সামিল। তোমার ব্যাগে ওটা থাকা সেফ নয়, যদিও অ্যাকাউন্টে অত টাকা নেই। তা হোক! তুমি বরং একবার তোমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে এস। তোমার মালপত্র আমার বাড়িতেই থাক। চল, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।

মেয়েটি রাজি হল না। বললে, না, আমি একাই বাড়ি যাব। ঐ একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। ওটা ধরি। একটু পরে ফিরে এসে মালপত্র আপনার বাড়ি থেকে নিয়ে আসব।

– দ্যাট্স অল রাইট। চেক আর চিঠিখানা দাও। আর এই খুচরো টাকাটা রাখ। ট্যাক্সিভাড়া।

স্মরণিকা চেক আর চিঠিখানা বাসুসাহেবকে দিল, কিন্তু টাকাটা নিল না। বললে, আর টাকার দরকার হবে না। জেঠুর কাছেই তো যাচ্ছি। তাঁর কাছ থেকে ট্যাক্সি-ফেয়ারটা নিয়ে নেব।

বাসু-সাহেব খপ্ করে ওর মণিবন্ধটা চেপে ধরেন। বলেন, জানি না সেটা সম্ভবপর হবে কিনা। দুই সপ্তাহ আগে তোমার জেঠু সুস্থ-সবল ছিলেন, এই চিঠিখানা তারই প্রমাণ। কিন্তু ইতিমধ্যে গুরুতর কিছু ঘটে গেছে বলে আশঙ্কা করছি। ঠিক কতটা ঘটেছে তা জানি না, কিন্তু বাড়ি গিয়ে তুমি অপ্রত্যাশিত কিছুর মুখোমুখি হবে, টুকু। মনকে এখন থেকেই তৈরী করে রাখ। শোন, বাড়ি পৌঁছে আমাকে একটা ফোন কর। জানিও জেঠু কেমন আছেন, আর কখন তোমার মালপত্র নিতে আসবে, সেটাও জানিও। নাও, টাকাটা ধর। না লাগে, টাকাটা পরে আমাকে ফেরৎ দিও।

স্মরণিকা বিহ্বল ভাবে টাকাটা নিল। ট্যাক্সিটার দিকে এগিয়ে গেল।