যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ৯

নয়

কৌশিক গাড়িটা নিয়ে যখন রওনা হল রাত তখন এগারোটা। পিছনের সীটে কাকলি আর ড্রাইভারের পাশে সুজাতা। বাসু তাঁর ধর্মপত্নীকে প্রশ্ন করেন, সুজাতা আবার গেল কী করতে?

রানু বললেন, সে তোমার মাথায় ঢুকবে না। এস, ভিতরে এস। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে বাইরে।

বাসু ভিতরে এসে বললেন, না, মানে সুজাতাকে যে আমার একটু দরকার ছিল।

– কী দরকার? আমাকে দিয়ে হবে না?

– হবে না কেন? হবে। বিশুকে দিয়ে তুমিই করিয়ে নাও। আজ রাতে কী খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে?

– তোমার জন্য খই-দুধ আর সন্দেশ, আর বাকি সকলের জন্য পরোটা-কিমাচচ্চড়ি। একটু কপির তরকারিও আছে। কেন বলতো? তুমি খেয়ে নিতে চাও?

– হ্যাঁ, আমার খাবারটা দিতে বল আর হট-কেস টিফিন ক্যারিয়ারে কৌশিকের পরোটা-মাংসটা ভরে দিতে বল। ওরা ফিরে এলেই আমি গাড়ি নিয়ে একবার মোমিনপুরের দিকে যাব – ঐ জীবন হালদারের ‘ডেন’-এ।

– এত রাতে একা?

– জীবন হালদারের মতো লোকের কাছে ‘নাইট ইজ প্রেটি ইয়াং’। এগারটা কোন রাত নয়। তবে একা যাওয়া বোধহয় সম্ভবপর নয়। তুমি যেমন ইদানিং রাতে আমার পরোটা খাওয়ার বদলে খই-দুধ-সন্দেশ ব্যবস্থা করেছ, কৌশিকও তেমনি গভীর রাতে আমাকে আজকাল একা বের হতে দেয় না। সেজন্যই ওর খাবারটা বেঁধে দিতে বলছি। আর ফ্লাস্কে পুরো এক ফ্লাস্ক হট কফি।

রানু তাঁর হুইল চেয়ারে পাক মেরে বিশুর তল্লাশে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলেন।

মোমিনপুরের কাছাকাছিএকটা চওড়া রাস্তায় পোর্ট-ট্রাস্টের এক সারি ত্রিতল অফিসার্স কোয়ার্টার্স। দু-একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই রাত সওয়া এগারোটার সময়ও হুল্লোড় চলছে। বাদবাকি চরাচর নিশুতি। ঐ রাস্তা থেকেই একটা ফ্যাকড়া পিচের রাস্তা ধরে কৌশিক গাড়িটাকে নিয়ে চলল। বাসু বলেন, রাস্তাটা কি তোমার চেনা?

– আজ্ঞে হ্যাঁ। এ রাস্তায় এসেছি দু-একবার। এরপর একটা ফাঁকা মাঠ মতন, তার ওদিকে একটা কুখ্যাত বক্তি।

– ‘কুখ্যাত বস্তি’ মানে?

– পোর্ট ট্রাস্টের মজদুরদের। কন্ট্রাব্যান্ড ইম্পোর্টেড মালের ডিপো। ওদের মধ্যে অনেকের কালোবাজারে খুব দাপট।

এদিকটা রীতিমতো অন্ধকার। রাস্তায় বাতি নেই, অথবা লোডশেডিং চলছে। হেডলাইটের আলোয় পথ চলা। জনমানবের সাড়াশব্দ নেই। কৌশিক বলে, মনে হয় আমরা ঠিকানা অনুযায়ী গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি এসে গেছি।

বাসু হঠাৎ কৌশিকের বাহুমূল চেপে ধরে বলেন, রোখকে, রোখকে।

কৌশিক তৎক্ষণাৎ ব্রেক-এ পা দেয়। গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ে। কৌশিক জানতে চায়, কী হল?

– সামনে পরপর চার-পাঁচটা গাড়ি পার্ক করা আছে, দেখেছ?

– হ্যাঁ, তাই তো। একটা দোতলা বাড়িতে আলো জ্বলছে। কিছু পার্টি-ফার্টি হচ্ছে নাকি?

– না। তুমি হেড লাইটটা নেবাও।

নির্দেশ মেনে ঘোর অন্ধকারে কৌশিক বলে, কী ব্যাপার?

– ঐ দোতলা বাড়িটায় কোনও পার্টি-ফার্টি হচ্ছে না কৌশিক। ওখানে কোন খুনজাতীয় কিছু ঘটেছে। শেষ গাড়ির নম্বরটা আমার চেনা। হোমিসাইড সেকশানের। ওটাতেই এতক্ষণ ঘুরছিলাম। লালবাজারেরর নিখিল দাশের গাড়ি।

কৌশিক কিছু বলার আগেই বিপরীত দিক থেকে একটা মোটর-বাইক এসে থামল বাকি রাস্তা জুড়ে। আরোহী নেমে এসে একটা টর্চ জ্বালল। অবাক হয়ে বললে, স্যার! আপনি! এতরাত্রে এখানে?

বাসু গাড়ির ভিতরের সুইচটা জ্বেলে দিয়ে বললেন, বিশ্বরূপ! তুমি এখানে! সামনের ঐ বাড়িতে বিশেষ কিছু ঘটেছে, তাই নয়? খবর সংগ্রহে এসেছ?

বিশ্বরূপ কলকাতার একটি নামী সংবাদপত্রের রিপোর্টার। সে বললে, কাল সকালে যদি নিউজটা ছাপতে হয় তাহলে আমার হাতে একটুও সময় নেই, বাসু-সাহেব। আপনি অনুমতি দিলে আমি রওনা হই, তবে আপনি যদি কোন ‘স্কুপ’ দিতে পারেন তাহলে না হয় দু-মিনিট দাঁড়িয়ে যাই।

– ‘স্কুপ নিউজ’! কী বিষয়ে?

– বিষয় তো ঐ একটাই। যে জন্য মাঝরাতে হানা দিয়েছেন। ঐ মার্ডার কেসটার বিষয়ে।

– মার্ডার! ওখানে কেউ খুন হয়েছে?

বিশ্বরূপ হাসল। স্বীকারও করল, আপনি হাসালেন, স্যার। বলতে চান সেটা না জেনেই সুকৌশলীর কৌশিক-সহ মধ্যরাত্রে এপাড়ায় হানা দিয়েছেন?

বাসু বলেন, বিশ্বাস কর, বিশ্বরূপ, আমি সত্যিই এখনো জানিনা, কে খুন হয়েছে। আমি এপাড়ায় এসেছিলাম একজনের সঙ্গে দেখা করতে–

– ঐ বাড়িটায়? জীবন হালদারের সঙ্গে?

– হ্যাঁ, কী করে আন্দাজ করলে?

বিশ্বরূপ ওঁর শেষ প্রশ্নটা এড়িয়ে বলল, ঠিকানাটা ঠিকই খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু ঠিকানার মালিক জীবনের হাল ধরে নেই আর। আজ সন্ধ্যারাতে – ঠিক কটার সময় বলতে পারব না – এপাড়ার মস্তান ‘জীবনগুরু’ ভবনদীর ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন তাঁর হাল-ভাঙা নৌকার হাল ধরে।

– লোকটা খুন হয়েছে? কী ভাবে?

– কাল সকালে কী পড়বেন তার অ্যাডভান্স সামারিটা শুনিয়ে যাই। “মেয়েটি আন্দাজ করতে পারেনি: যে রক্ষক সেই ভক্ষক। জীবন-মস্তান ওর দিকে এক-পা এগিয়ে আসতেই সে টেবিলের ওপর থেকে রিভলভারটা তুলে নেয়। হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, জীবনকে ভয় দেখাতে, নিজের ধর্ম রক্ষা করতে। চাপা গর্জন করে ওঠে। ‘আর এক পা এগোবার চেষ্টা করলেই….’। দুঃসাহসিক জীবন হালদার কর্ণপাত করে না। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সামনের দিকে। চেপে ধরে সুন্দরী মেয়েটির মুঠি আর তখনই ক্রুদ্ধ গর্জন করে ওঠে – রিভলভারটা! জীবন লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। মেয়েটি দেড়-মুহূর্ত স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর সম্বিত ফিরে পেয়েই ছুটে পালায়”….নাঃ! দেরি হয়ে যাচ্ছে, স্যার! চলি….

বাসু গাড়িতে বসে বসেই হাতটা বাড়িয়ে দেন। ওর হাতখানা চেপে ধরে বলেন মেয়েটা? ‘মেয়ে’ তা বুঝলে কী করে?

– ইন্সপেক্টর নিখিল দাশের তাই ধারণা। আর তাছাড়া আপনি তো তাকে চেনেন, স্যার।

– আমি? আমি তাকে চিনি? কেমন করে? কী তার নাম?

– কী মুশকিল! আমি তার নাম জানব কী করে? আপনি জানেন, যেহেতু, আপনার ক্লায়েন্ট। তারই স্বার্থে এই মধ্যরাত্রে আপনার অভিসার…আচ্ছা, চলি স্যার…

– যাও। তেমাকে রুখব না। শুধু একটা কথা বলে যাও, মৃত্যুর সময়টা কি কিছু আন্দাজ করা গেছে?

– ইন্সপেক্টার দাশের ধারণা রাত নয়টার আগে নয়, আর এগারোটার পরে নয়। কিন্তু এটা ওর নেহাতই আন্দাজ। অটোপ্সি-সার্জেন-এর টেকনিক্যাল রিপোর্ট না পেলে কিছু বলা সম্ভবপর নয়।

– আর মার্ডার ওয়েপনটা? রিভলভারটা?

– সেটা নিয়েই মেয়েটি সটকে পড়েছে। মানে, আপনার ক্লায়েন্ট…

বিশ্বরূপকে আর ধরে রাখা গেল না। সে ভটভটিয়ে মধ্যরাত্রের কলকাতাকে কাঁপিয়ে ছুটল অফিসমুখো। কৌশিক প্রশ্ন করে, এখন কী করবেন? এগুবেন না পিছুবেন?

– পিছুবার জন্য এগোব!

– মানে?

– ঐ বাড়িটা অতিক্রম করে সামনের দিকে চলে যাও। বেশ ধীরে ধীরে। যতটা নিঃশব্দে সম্ভব। তারপর কিছুদূর গিয়ে মোড় ঘুরিয়ে এই রাস্তা দিয়েই উল্টোমুখে ফিরে যাব আমরা। এ অবস্থায় আমি ইন্সপেক্টার দাশের মুখোমুখি হতে চাই না।

– কেন মামু? ইন্সপেক্টর দাশ তো শুনেছি আপনার ‘ফ্যান। ইন্সপেক্টর বরাট হোমিসাইড থেকে বদলি হয়ে যাবার পর ও নতুন এসেছে। আপনার সঙ্গে তো এখনো কোনও বিরোধের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আপনি কি আশা করছেন না যে, ওর কাছ থেকে আরও বিস্তারিত খবর পাওয়া যাবে?

– যাবে কি যাবে না জানি না। কিন্তু তার আগে আমাকে একটি কাজ করতে হবে, কৌশিক। ইন্সপেক্টর দাশের জীপ গড়িয়াহাটায় পৌঁছানোর আগে আমাকে একবার কাকলির সঙ্গে দেখা করতে হবে। কেন কী বৃত্তান্ত সে পরে শুনো। স্টার্ট দাও।

যতটা নিঃশব্দে সম্ভব কৌশিক স্টার্ট দিল। ধীর গতিতে জীবন হালদারের বাড়ির সামনে দিয়ে প্রায় দু-তিনশ মিটার এগিয়ে গেল। যাওয়ার পথে বাসুসাহেব চলতি গাড়ি থেকে কিছুই দেখতে পেলেন না। এ পাড়ায় লোড-শেডিং চলছে বটে কিন্তু জীবন হালদারের বাড়িতে ডায়নামো আছে। তার ভটভট্ শব্দের সুযোগে কৌশিক নিঃশব্দে স্টার্ট নিতে পেরেছিল। বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যেতেও পেরেছিল। নির্দেশমতো এবার সে গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে নিল। ধীরে ধীরে বাড়িটা অতিক্রম করার সময় এবার তাকে বাধ্য হয়ে ব্রেক কষতে হল। পথের মাঝখানে একজন পুলিস হাত তুলে ওকে গাড়ি রুখতে বলছে।

কৌশিক গাড়িটা থামালো। বাড়ির ভিতর থেকে বের হয়ে এল ইন্সপেক্টার দাশ। কাছাকাছি এসে কৌশিককে জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথা থেকে আসছেন?

বাসু ওর পাশের সীটে নিখিল দাশের উল্টো দিকে মুখ করে বসে আছেন। তাঁর মুখ অন্ধকারে। কৌশিক বললে, রাস্তা ভুল করেছি। এ গলি নয়।

– অল রাইট। কোথায় যাবেন আপনি এত রাত্রে?

বাসু এদিকে ফিরে বললেন, আরে। নিখিল?

নিখিল হাতের টর্চটা জ্বালল। এখন মোটামুটি সকলকেই চেনা যাচ্ছে। নিখিল বলল, একী! আপনি! এখানে এত রাত্রে!

– জীবন হালদারের কাছে এসেছিলাম– ঐ নবনীতার কেসটার ইনভেস্টিগেশানে, কিন্তু এইমাত্র শুনলাম…

– এইমাত্র? না, খবরটা জেনে তারপর এসেছেন?

– না, নিখিল। এখানে এসে একজন রিপোর্টারের কাছে খবরটা প্রথম শুনলাম। সত্যিই জীবন হালদার খুন হয়ে গেছে?

নিখিল ওঁর বাহুল্য প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে আজ রাত সাড়ে নটায় দু-জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। তার মধ্যে একজন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। কেন পারেননি তা আমি জানি, কিন্তু সে ভদ্রমহিলা আপনার ক্লায়েন্ট নন। ক্লায়েন্টের তরফে হয়তো সাক্ষী হতেন, তাই নয়? আপনার ক্লায়েন্ট কি অ্যাপয়েন্টমেন্টটা রাখতে পেরেছিলেন, স্যার? তাঁর সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে?

– হ্যাঁ, হয়েছে। তাকে আমি জানিয়েছি যে, নবনীতাকে কেউ…

– আই নো, আই নো! তাহলে ক্লায়েন্টের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে। রাত ক’টার সময়, স্যার? বাসু বলেন, এ সব অ্যানালিটিক্যাল আলোচনা পরেও তো হতে পারে। তুমি কি ফটোগ্রাফার আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টদের…

কথাটা তাঁর শেষ হল না। ইন্সপেক্টর দাশ বলে, তারা জীবন হালদারের ঘরটা তন্নতন্ন করে সার্চকরছে। ফটো নিচ্ছে, ডাস্টিং করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিচ্ছে। কিন্তু আমি আপনাকে যে প্রশ্নটা করলাম….

এবারও বাধা পড়ল। একজন অফিসার বাড়ি থেকে বার হয়ে এসে ইন্সপেক্টর দাশকে প্রশ্ন করল, এবার কি ডেডবডি রিমুভ করব, স্যার?

ইন্সপেক্টার দাশ তাকে বললেন, আমি দেখছি।

বাসু হাত নেড়ে বললেন, বেস্ট অব ল্যক।

কৌশিক সঙ্কেতটা বুঝল। তৎক্ষণাৎ স্টার্ট দিল গাড়িতে।

মোমিনপুর থেকে ফেরার পথে হাজরা রোডে একটা পেট্রল পাম্প স্টেশন অত রাত্রেও খোলা পাওয়া গেল। বাসু গাড়িটা ওখানে ঢোকাতে বললেন। কৌশিক বলে, গাড়িতে তেল যথেষ্টই আছে।

বাসু বলেন, জানি। তুমি পেট্রল নিতে নিতে আমি একটা টেলিফোন সেরে নিই।

– এতরাত্রে কাকে ফোন করবেন?

– তা নিয়ে তোমার কেন মাথাব্যথা?

কৌশিক দশ লিটার পেট্রল ভরে নিল। ইতিমধ্যে বাসু-সাহেব ফোন করলেন সানি-সাইড নার্সিংহোমে। মিনিটখানেকের মধ্যেই রিসেপশানিস্ট ডক্টর ব্যানার্জিকে লাইনটা দিতে পারল।

– পি. কে. বাসু বলছি, বাঁডুজ্জে। নবনীতাকে কেমন বুঝছ?

– বেঁচে যাবে।

– ক্যান্ডি-চকোলেটগুলো কি বিষ মেশানো ছিল?

– হ্যাঁ, প্রতিটি ক্যান্ডির মাঝখানে বিষাক্ত ট্যাবলেট অতি সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

– কী বিষ?

– বিষ ঠিক নয়, কড়া ঘুমের ওষুধ। রুগীর বিভিন্ন সিমটম দেখে আন্দাজ করছি কোন এক রকমের বার্বিচুরিক ডেরিভেটিভ, সম্ভবত ভেরোনল। ভেরোনল ট্যাবলেটের স্বাদ একটু টকটক– অ্যাসিডিক স্বাদ। বাদাম মেশানো চকোলেটের সঙ্গে দিব্যি মিশে যায়।

– কতটা ভেরোনল খেয়েছে? কতটা খেলে ঘুম আর ভাঙে না?

– ‘ভেরোনল’ ঘুমের ওষুধ। নিদ্রা-আকর্ষক এবং মৃত্যু-আকর্ষক ডোজ-এর মধ্যে যথেষ্ট ফারাক সচরাচর ঘুম পাড়াতে আমরা পাঁচ থেকে দশ গ্রেন প্রেসক্রাইব করি। ষাট গ্রেন খেয়ে রুগী মারা গেছে এমন নজির আছে, আবার তিনশ গ্রেন শরীরে প্রবেশ করা সত্ত্বেও রোগীকে বাঁচানো গেছে, এমন রেকর্ডও আছে। তবে সেটা একটা এক্সেপশন। বলা যায়, দুশো গ্রেনের বেশি সচরাচর ‘ফেটাল ডোজ’। আমরা এখনো বাকি চকলেটগুলোর কেমিক্যাল অ্যানালিসিস রিপোর্ট পাইনি। কিন্তু আমার ধারণা, প্রতিটি চকোলেটে আন্দাজ পাঁচ গ্রেন ভেরোনল আছে, ম্যাক্সিমাম সাত গ্রেন। তার মানে, ও পঞ্চাশ গ্রেনের বেশি খায়নি ছয়টা চকোলেটে। আমার তো আশা আছে শতকরা পঁচানব্বই ভাগ চান্স ও বেঁচে যাবে।

– ও কি ঘুমাচ্ছে?

– অঘোর ঘুমে। শ্বাস-প্রশ্বাস একটু ধীরে। টেম্পারেচার এক ডিগ্রি বেড়েছে। কিন্তু বেঁচে যাবে নিঃসন্দেহে।

– ঠিক আছে। তুমি তিন-শিফট-এ নার্সের ব্যবস্থা কর। চব্বিশ ঘণ্টা যেন ওর কাছে কেউ না–কেউ থাকে। ওকে যে খাবার দেওয়া হচ্ছে…

– বাসু-সাহেব, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, এই নার্সিংহোমের ভিতর ওর খাদ্যে নতুন করে কেউ ভেরোনল মেশাতে পারবে না। আমার এখানে সাবধানতা নিশ্ছিদ্র।

– ধন্যবাদ। কখন ওর জ্ঞান হবে মনে হয়?

– ও এখন বেশ কিছুক্ষণ ঘুমাবে। আমরা ওর স্টম্যাক-ওয়াশ করেছি, কিন্তু বেশ কিছুটা ভেরোনল ওর সিস্টেমে মিশে গেছে। ওকে আরও চব্বিশ ঘণ্টা ঘুমোতে দিন, তারপর ও আপনার সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে।

বাসু বললেন, আমার কি মনে হয় জানো, ডাক্তার? কে ওকে চকোলেটগুলো পাঠিয়েছিল, তা আমার আন্দাজের বাইরে-কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সে লোকটা নবনীতাকে হত্যা করতে চায়নি। সে শুধু চেয়েছিল চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে ওকে ঘুম বাড়িয়ে রাখতে।

– আমি ওসব জানি না, বুঝি না। আমি এটুকু বলতে পারি– মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠবে। অলমোস্ট নির্ঘাৎ। তবে চব্বিশ ঘণ্টার আগে কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। এ বিষয়ে তাড়াহুড়া চলবে না।

– একটা অনুরোধ করব, ডাক্তার?

– বলুন?

– মেয়েটি জ্ঞান হলে আমি যেন প্রথম খবরটা পাই।

– ব্র্যাকেটে ফার্স্ট।

– বেগ য়োর পার্ডন?

– আমি বলছি, আপনারা দুজন একই সঙ্গে বিজ্ঞাপিত হবেন। আপনি এবং লালবাজারের হোমিসাইড স্কোয়াড। কারণ, ঐ পুলিস ইন্সপেক্টরটি রোগী ভর্তি করে আমাকে একই অনুরোধ করে গেছে, রোগিণী কথা বলার মতো অবস্থায় এলে আমি যেন তাকে সবার আগে জানাই।

– অল রাইট! আমরা যেন একই সঙ্গে ব্র্যাকেটে ফার্স্ট হই।

– তাই হবে।

কৌশিক ইতিমধ্যে পেট্রল ভরে নিয়ে বিল মিটিয়ে তৈরি। বাসু গাড়িতে উঠে বললেন, এবার চল গড়িয়াহাটে। কাকলির বাড়িতে। সেটা তো তোমার চেনা।

কৌশিক বিনা বাক্যব্যয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিল।

কাকলির বাড়ির দোরগোড়ায় যখন গাড়িটা পৌঁছাল রাত তখন পৌনে– বারটা। গড়িয়াহাটের মতো কর্মব্যস্ত রাজপথ তখন ঘুমে অচেতন। কিন্তু কাকলির মেজানাইন-ঘরে আলো জ্বলছে। মেয়েটি বাসু–সাহেবকে অনুরোধ করেছিল দুটো-তিনটে যতই রাত হোক, বাসু-সাহেব যেন জীবন হালদারের সঙ্গে দেখা করার পরে ওকে একটা ফোন করেন। না হলে ওর সারারাত নাকি ঘুম হবে না। কেন? কাকলি কি জানত, বাসু-সাহেব জীবন হালদারের ‘ডেন’-এ পৌছালে একটা বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হবেন? কিভাবে এটা সে অনুমান করল?

বাসু গাড়ি থেকে নেমে বললেন, কৌশিক, তুমি গাড়িতেই থাক। তবে এখানে নয়, একশ গজ এগিয়ে গিয়ে গাড়িটা পার্ক কর। কারণ আমার আশঙ্কা আধঘণ্টার মধ্যেই নিখিল দাশ এখানে হাজির হবে। আমি তার মুখোমুখি হতে চাইনা। তাই তুমি এমনভাবে গাড়িটা পার্ক কর যাতে দূর থেকে তোমার নম্বর-প্লেটটা পড়া না যায় – আধ-অন্ধকারে গাড়িটা রেখ। ততক্ষণ তুমিরাতের খাবারটা খেয়ে নাও। কেমন?

কৌশিক ঘাড় নেড়ে সায় দিল। বাসু এগিয়ে গেলেন ফটোগ্রাফিক স্টোরসের দিকে। দোকানের পাশ দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি। কিন্তু এই মধ্যরাত্রে তা কোলপসিবল গেটে বন্ধ। বাসু এদিক-ওদিক কলিংবেল খুঁজতে থাকেন। হটাৎ মেজানাইন-ঘরের জানলাটা খুলে গেল। কাকলি মুখ বার করে বললে, আসছি স্যার।

মিনিটখানেকের মধ্যেই নেমে এসে ও তালা খুলে ওঁকে ভিতরে নিল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে কাকলি প্রশ্ন করে, জীবন হালদারের সঙ্গে দেখা হল?

– না, হল না। তুমি ওভারকোটটা খুলে রেখেছ কেন? শীত করছে না?

– করছে। আমি এতক্ষণ কম্বলের তলায় ছিলাম। আসুন–

বাসু ওর পিছন-পিছন ঘরে ঢুকে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন। ছিমছাম সাজানো এক-কামরার ফ্ল্যাট। সব রকম ব্যবস্থাই আছে।

ঘরে ঢুকে কাকলি দরজাটা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়ালো। বললে, একটু কফি খাবেন? গরম কফি? হীটারে বসিয়ে দেব?

– দাও। কিন্তু জীবন হালদারের সঙ্গে কেন দেখা হল না তা তো তুমি জানতে চাইলে না, কাকলি?

কাকলি কেটলিতে জল ভরে হীটারে বসাতে বসাতে বললে, ও কি বাড়িতে ছিল না? অত রাতেও?

– না, ছিল। বাড়িতেই ছিল।

তবু বাসু-সাহেবের চোখে-চোখে না তাকিয়ে কাকলি জানতে চায়, তাহলে কি নেশায় বুঁদ হয়ে ছিল?

– না, মদের নেশায় নয়। জীবন হালদার আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি, কারণ লোকটার দেহে প্রাণ ছিল না!

কাকলি ঘুরে দাঁড়ায়। ওঁর চোখে চোখে তাকিয়ে বলে, মানে?

– মানেটা তুমি কি সত্যিই জান না, কাকলি?

কাকলি স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার কণ্ঠে স্বর ফোটে না।