রিস্তেদারের কাঁটা – ২

দুই

প্রায় ঘণ্টাখানেক পরের কথা। বাসুসাহেব অফিসে বসে একটা এফিডেবিটের ড্রাফট পড়ে দেখছিলেন। ইন্টারকমে শোনা গেল রানী দেবীর কণ্ঠস্বর, ‘মেয়েটি ফিরে এসেছে!’

– কে? স্মরণিকা? পাঠিয়ে দাও।

একটু পরেই ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ওর চোখ দুটো লাল। বেশ বোঝা যায়, এতক্ষণকাঁদছিল। বাসু জানতে চান, খারাপ খবর মনে হচ্ছে। জেঠুকে কেমন দেখলে?

– দেখিনি। জেঠু ওখানে নেই। ওরা তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।

বাসু বললেন, বস, এইরকম কিছু একটা ঘটবে বলে আশঙ্কা ছিল আমার। র’স, আগে কৌশিক আর সুজাতাকে ডাকি। ওরা একটা প্রাইভেট ডিটেক্টিভ এজেন্সি খুলেছে। এই বাড়িতেই ওদের অফিস। থাকেও এখানে। তুমি নিজেকে ততক্ষণ একটু সামলে নাও বরং। উই মাস্ট ফাইট ব্যাক।

ইন্টারকমে ওদের দুজনকে ডেকে পাঠালেন।

স্মরণিকা তার মর্মন্ত্রদ অভিজ্ঞতা পেশ করল।

ব্যাঙ্ক থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সে নিজের বাড়িতে যায়। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দেখে সদর দরজা হাট করে খোলা। ও এগিয়ে যায়। কাউকে দেখতে পায় না। বাড়িটা খাঁ-খাঁ করছে। মায় এতদিনের পুরনো ঝি-চাকর কাউকেও নজরে পড়ে না। হঠাৎ ওপাশ থেকে একজন অচেনা লোক এগিয়ে আসে, বলে, ক্যা চাহিয়ে মাইজি?

স্মরণিকার মনে হল, লোকটা দারোয়ান। নতুন বহাল হয়েছে। কিছু জবাব দেবার আগেই ওপাশ থেকে সুভদ্রা কাকিমা এগিয়ে এসে বলেন, তুম্ আপনা কামমে যাও যোগিন্দার। ম্যায় দেখতি…

স্মরণিকার দিকে ফিরে বলেন, কবে ফিরলে কলকাতায়? কোথায় উঠেছ?

– কোথায় উঠেছি মানে? নিজের বাড়ি ছেড়ে…

– না, জিনিসপত্র কিছু সঙ্গে নেই তো। তাই ভাবলাম, কোন হোটেলে উঠে দেখা করতে এসেছ বুঝি।

স্মরণিকা বলে, জেঠু, কোন ঘরে?

– উনি এ বাড়িতে নেই স্মরণিকা। উনি একটা মেন্টাল স্যানিটেরিয়ামে আছেন।

– মেন্টাল স্যানিটেরিয়াম! কেন? কী হয়েছে জেঠুর? মাথার গণ্ডগোল?

– সে অনেক কথা। মোটকথা তিনি অসুস্থ। তোমার জিনিসপত্র তোমার ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা আছে। পাছে সেসব বেহাত হয়ে যায়, তাই আমিই ঘরটা তালা দিয়ে রেখেছি। তুমি কাল-পর্শর-মধ্যে এসে তোমার মালপত্র নিয়ে যেও। তোমার কাকু এ বাড়িটা ভাড়া দিয়ে দেবার কথা ভাবছেন। নাও, চাবিটা ধর।

স্মরণিকা আকাশ থেকে পড়ে! বলে, মানে? আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব কেন? এটা আমার বাড়ি। আমি এখানে জন্মেছি, মানুষ হয়েছি। তাছাড়া জেঠু যদি অসুস্থ হয়ে নার্সিং হোমে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনিও তো দুদিন পরেই ফিরে আসবেন, নাকি? চৌবেকাকু বাড়িটা ভাড়া দিয়ে দেবেন এ কথার অর্থ কী?

হঠাৎ যেন আমূল বদলে গেল ওর সুভদ্রাকাকিমা। দাঁতে দাঁত দিয়ে বললে, কাল সন্ধ্যার মধ্যে তুমি তোমার জিনিসপত্র না নিয়ে গেলে আমরা তা রাস্তায় বার করে দেব, পর্শ সকালে। জেঠুকে কব্জা করে গোটা সম্পত্তিটা গ্রাস করার খেলা তোমার শেষ হয়ে গেছে স্মরণিকা। এবার নিজের পথ দেখ!

রাগে-দুঃখে-অপমানে ও কেঁদে ফেলে। জেঠু কোন পাগলাগারদে আছেন জানতে চায়। সুভদ্রা-কাকিমা সে ঠিকানাও ওকে দেয় না। বলে, সত্যানন্দ সেন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তাঁর সাথে বাইরের লোকের দেখা করা বারণ। টুকু জানতে চায়, আমি কি বাইরের লোক?

সুভদ্রা বলে, তোমার সঙ্গে বসে বসে তর্ক করার সময় আমার নেই। এবার এস তুমি।

স্মরণিকা বেরিয়ে আসে রাস্তায়। ট্যাক্সিটা ততক্ষণে চলে গেছে। ও বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকে সামনে পার্কে। প্রতিবেশী দু-একজনের সঙ্গে দেখা করার কথা মনে হয়।তাঁরা নিশ্চয় জানেন, জেঠুর ঠিকানা। কিন্তু তারপর মনে হয়, জেঠুর শেষ নির্দেশ ছিল বাসু-সাহেবের শরণাপন্ন হওয়া। তাই হাঁটতে হাঁটতে এখানে চলে এসেছে।

বাসু বললেন, ঠিকই করেছ, টুকু। ঠিক কী ঘটেছে জানি না; কিন্তু আন্দাজ করতে পারি। সে-কথা বলছি। তার আগে তুমি আমার কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দাও দেখি। তোমার জেঠুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ কত হতে পারে?

– আমার ধারণা নেই। ওঁর বাড়ি একখানাই, এই নিউ আলিপুরের বাড়িটা। গাড়ি একটা, এখন পড়ে আছে রিপেয়ার শপে। কোম্পানির কাগজ, য়ুনিট ট্রাস্ট, ফিক্সড ডিপসিট মিলিয়ে পাঁচ-সাত লাখ টাকা হতে পারে।

– বুঝলাম। ঐ চৌবে-কাকু কতদিন পরে কলকাতায় এসেছে? তোমার জেঠুর সঙ্গে তাদের কী রকম সম্পর্ক? তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী? ধানবাদে কী করে?

স্মরণিকা যতটুকু জানে তা জানায়। চৌবে-কাকু দু-তিন বছর অন্তর কলকাতায় এলে এ বাড়িতেই উঠত। একতলায় একটা গেস্টরুম আছে। সেখানেই থাকে। সুভদ্রা-কাকিমা এর আগে কখনো আসেনি। মাস-তিনেক আগে জেঠু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জনডিস্। এত বেশি বয়সে জনডিস্দুরারোগ্য অসুখ। সুভদ্রা প্রাকবিবাহ জীবনে ছিল হাসপাতালের নার্স। তাই তাকে নিয়ে চৌবেকাকু চলে আসে কলকাতায়। জেঠু সামলে ওঠার পর ওরাই উৎসাহ করে স্মরণিকাকে বিদেশে পাঠায়। জেঠুর সেবা-শুশ্রুষা করতে করতে ও সত্যিই খুব কাহিল হয়ে পড়েছিল। সুভদ্রা বৃদ্ধের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেয়। স্মরণিকা রাজি হয়ে যায়। টুরিস্ট ভিসা নিয়ে মাসখানেকের জন্য চৌবের রিস্তেদারের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। লন্ডনে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব বেড়ায়। প্রতি সপ্তাহে জেঠুর চিঠি পেয়েছে। কোন আশঙ্কাই হয়নি তার। তারপর হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রাঘাত! জেঠুর ঐ চিঠি আর চেক। ট্রাঙ্ককলে জেঠুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। যোগাযোগ করতে পারে না। ও তখন কালবিলম্ব না করে পরের প্লেনে ফিরে আসে।

বাসু বললেন, শোন টুকু, তোমার বয়স কম, অভিজ্ঞতাও অল্প। যে ঘটনা তোমাদের বাড়িতে ঘটেছে তার ছকটা অতি পরিচিত। যুগে যুগে দেশে দেশে এই নাটকটাঅভিনীত হয়ে গেছে! তুমি একটা বিরাট ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়ে গেছ। তোমার চৌবেকাকু উদ্যোগী হয়ে তোমার পাসপোর্ট-ভিসা বানিয়েছিল, তার আত্মীয়ের কাছে পাঠিয়েছিল, একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। পরিকল্পনার ছকটা সবক্ষেত্রেই এক রকম। অগাধ সম্পত্তির মালিক বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়েন– হয়তো তখন তিনি বিপত্নীক, নিঃসন্তান। সম্পত্তির লোভে দূর সম্পর্কের আত্মীয়েরা এসে জোটে। যারা এতদিন বৃদ্ধের দেখাল করছিল– হয়তো অর্থের বিনিময়ে, অথবা ভালবেসে– তাদের নানান ছুতোয় দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। এটায় সামাজিক না থাক, আইনের অনুমোদন থাকে। পাড়া-প্রতিবেশী শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে! নৌকোর হালটা কব্জা করার পরেই রিস্তেদারেরা দাবী করে, বৃদ্ধ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন! নিজের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা আর তাঁর নেই। যারা এতদিন ছিল বৃদ্ধের কাছাকাছি, তারা আর তাঁর কাছে ভিড়তে পারে না। সদ্যআগত রিস্তেদারেরা আদালতের শরণাপন্ন হয়। আদালত ওদেরই একজনকে সম্পত্তির অছি নিযুক্ত করে। এখানে নাটকের প্রথম অঙ্কের সমাপ্তি। দ্বিতীয় অঙ্কে বৃদ্ধকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোনও আরোগ্য-নিকেতনে, নার্সিং হোমে, কখনো বা মানসিক রোগীর উন্মাদাগারে। সেই বিখ্যাত আরবীয় উটের ক্লাসিকাল কাহিনীটি পুনরভিনীত হয়। আত্মীয়েরা স্থায়ীভাবে সম্পত্তির দখল নেয় – আর উট হয়ে যায় অবনঠাকুরের আঁকা উট! এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। তোমার জেঠুর বুকে বিঁধেছে রিস্তেদারের কাঁটা।

স্মরণিকা প্রতিবাদ করে, কিন্তু পনের দিন আগেও তিনি সুস্থ ছিলেন। চিঠিখানা তারই প্রমাণ!

– তোমার দৃষ্টিতে! তোমার চৌবেকাকু হয়তো ঐ চিঠিখানাই প্রমাণ হিসাবে দাখিল করতে চাইবে – তোমার জেঠুর মানসিক ভারসাম্যের অভাব দেখাতে।ব্যাঙ্কের কেরাণি ভদ্রলোকের কথাটা নিশ্চয় মনে আছে তোমার – ‘দ্যাট্স এ মোস্ট আনজুয়াল চেক! ‘ তাও তো ভদ্রলোক জানতেন না যে, তোমার জেঠু একটা সাধারণ খামে ভরে ঐ সওয়া-লক্ষ টাকার বিয়ারার-চেকখানা লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন ডাকযোগে! তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ টুকু, তোমার সুভদ্রাকাকিমা ট্রেন্ড নার্স! নিজে হাতে ইনজেকশন দিতে পারে। এমন ঔষধ আছে যার সাহায্যে সুস্থ সবল লোককে মানসিক ধৈর্যচ্যুত করা চলে, কোনও বয়স্ক লোক তাতে উন্মাদ হয়ে যেতে পারে! হয়তো ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা যাবে তিনি সত্যই উন্মাদ! কী-ভাবে তা হয়েছেন তা কেমন করে প্রমাণ করা যাবে?

হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি।

ইতিমধ্যে হুইল-চেয়ার চালিয়ে রানী দেবীও এসে জুটেছেন ওখানে। তিনি বাসু-সাহেবকে ধমকে ওঠেন, তুমি থাম দেখি! অহেতুক ওকে ভয় দেখাচ্ছ!

তারপর হুইল-চেয়ারে একটা পাক দিয়ে ঘনিয়ে আসেন। টুকুর পিঠে একখানা হাত রেখে বলেন, এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না, টুকু। যারা তোমার জেঠুকে পাগল করে তুলেছে তাদের ষড়যন্ত্রজাল ভেদ করতে হবে। তোমার মেসো কেসটা নিয়েছেন। তাঁকে সব দিক থেকে সাহায্য করার দায় যে তোমার!

স্মরণিকা তার অশ্রুআর্দ্র মুখখানা তুলে বললে, কিন্তু আমি যে ওঁকে ফি-টাও দিতে পারব না, মাসিমা। আমি তো পথের ভিখারি – আজ রাতে কোথায় মাথা গুঁজব…

– সে চিন্তা করতে হবে না। তুমি আমাদের বাড়িতেই থাকবে।

স্মরণিকা নিজে থেকেই সামলে নেয় নিজেকে। বলে, না মাসিমা! আমার এক বান্ধবী আছে, একাই থাকে, এক-কামরার ফ্ল্যাটে। চাকরি করে। আমি তার কাছে থাকব। কিন্তু সম্পত্তি উদ্ধার করতে না পারলে ওঁর ফী…

বাধা দিয়ে বাসু-সাহেব বলেন, ও-কথা বল না টুকু। ধরে নাও আমি একটা জুয়া খেলছি। তোমাকে বাজি রেখে। যদি ঐ রিস্তেদারের কাঁটাখানা উচ্ছেদ করতে পারি, তাহলে তুমি আমার ‘ফী’ মেটাবে…

– না হলেও আমি গ্র্যাজুয়েট, টাইপিং জানি…নিশ্চয় কোন কাজকর্ম যোগাড় করতে পারব। ধীরে ধীরে শোধ করে দেব…

– দ্যাটস দ্য স্পিরিট! হেরে যাবার আগেই হার স্বীকার করবে কেন?

স্মরণিকা জানতে চায়, একটা কথা! জেঠু তো আপনাকে বলেছেন উইল তৈরী করে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে…

– এটাই ঐ নারকীয় পরিকল্পনার ‘বিউটি-টাচ’! আদালতের ঘোষণায় তিনি ‘ইন্কম্পিটেন্ট’-রূপে চিহ্নিত হয়ে যাবার পর স্বোপার্জিত সম্পত্তিতে আর তাঁর অধিকার থাকবে না। সেটা মহানন্দে অতঃপর ভোগ করবে তারাই, যারা তাঁকে ‘ইনকম্পিটেন্ট’-রূপে চিহ্নিত করেছে! উত্ত্যক্ত করে, উত্তেজিত করে, ইনজেকশন দিয়ে!

– কিন্তু জেঠু তো ‘ইনকম্পিটেন্ট’ নন, সারাটা জীবন নিজের বিষয় সম্পত্তি নিজেই দেখ-ভাল করেছেন। আমি ক-সপ্তাহ আগেও দেখে গেছি তিনি মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ– শারীরিক ভাবে দুর্বল হলেও!

তোমার জেঠু স্বরাষ্ট্রের সম্রাট ছিলেন এতদিন। তুমি আর ঝি-চাকরেরা মান্য করতে, শ্রদ্ধা করতে, ভালবাসতে! এতেই তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ রাতারাতি তাঁর অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল তুমি বিলেত যাবার পরেই। এক একে বিশ্বস্ত সেবকেরা বিদায় নিল। হয়তো চৌবে, তার স্ত্রী আর বিলাস সিং যাদব বৃদ্ধকে ক্রমাগত মানসিকভাবে উৎপীড়ন করছিল – তাঁর উপর ঔষধ, ইনজেকশন চলছিল। ঐ বয়সের একজন বৃদ্ধ– সদ্য যিনি জনডিস থেকে ভুগে উঠেছেন– তাঁর পক্ষেমানসিকভাবে ভেঙে পড়া তো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা–

– কিন্তু জেঠু সে-সব কথা তো আমাকে চিঠিতে লেখেননি।

– হয়তো তোমার বিদেশ ভ্রমণের পথে বাধা সৃষ্টি করতে চান না বলেই। আমার আশঙ্কা, তোমাকে লেখা ঐ চিঠিখানার ফাঁদেই উনি আটকা পড়েছিলেন। চৌবে ওখানা দেখেছে, হয়তো জেরক্স-কপি রেখে ডাকে পাঠিয়েছে। এটাই হয়তো আদালতে ওর ব্রহ্মাস্ত্র ছিল।

– বুঝলাম না। ঠিক কী বলতে চাইছেন?

– ঐ চিঠির জেরক্স-কপি আদালতে পেশ করা বলেছে– ‘এই দেখুন ধর্মাবতার – এই বৃদ্ধ সওয়া লক্ষ টাকার বেয়ারার-চেক অর্ডিনারি পোস্টে তার ভাইঝিকে পাঠিয়ে দিয়ে বলছে টাকাটা এমনভাবে লুকিয়ে ফেলতে যাতে কেউ না জানতে পারে টাকাটা কোথায় রাখা হল। এ তো বদ্ধ উন্মাদ! এর সম্পত্তি দেখ-ভাল করার জন্য একজন ‘কনজারভেটর’ এখনি বহাল করা দরকার!’

কৌশিক হঠাৎ বলে বসে, মিস্টার সেনের ওটা নির্বুদ্ধিতা হয়েছিল!

– সার্টেনলি নট! – গর্জে ওঠেন বাসু-সাহেব। ঘূর্ণমান চেয়ারে আধাপাক দিয়ে কৌশিকের মুখোমুখি হয়ে বলেন, তুমি সেই অসহায় বৃদ্ধের অবস্থাটা আন্দাজ করতে পারছ না কৌশিক! তিনি বুঝতে পেরেছিলেন – ঐ বৈমাত্রেয় ভাইয়ের পৈশাচিক পরিকল্পনাটা! ওরা তাকে পাগল করে তুলছে উত্ত্যক্ত করে, উত্তেজিত করে, ঔষধ প্রয়োগে, ইনজেকশন দিয়ে! কিছু করার নেই! বিশ্বস্ত সেবকদের ওরা তাড়িয়ে দিয়েছে। উনি বুঝতে পারছিলেন– ওরা দুদিনেই ওঁর বিষয়-সম্পত্তি গ্রাস করবে। বুঝতে পারছিলেন, ওরা তাঁকে পাগল করে তুলছে! তাই স্মরণিকা ফিরে এলে ‘ফাইট-ব্যাক’ করার জন্য কিছুটা অর্থ উনি সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন – একটা চান্স নিয়েছিলেন। জানতেন, চেকটা বেহাত হলেও আশঙ্কার কিছু নেই। গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক একটা বেগানা লোককে সওয়া লক্ষ টাকা নগদে দেবে না – বেয়ারার-চেক হওয়া সত্ত্বেও! বিশেষ – ‘পেয়ীকে’, মানে মিস্স্মরণিকা সেনকে – ব্যাঙ্ক-ম্যানেজার ব্যক্তিগতভাবে চেনেন! সেটা কেটে অন্য নাম লেখা হলে চেকটার পেমেন্ট কিছুতেই হত না! ‘রেফার টু ড্রয়ার’ হয়ে যেত।

স্মরণিকা জানতে চায়, ঐ চিঠিখানার জন্যই কি জজ-সাহেব জেঠুকে ‘ইনকম্পিটেন্ট’-রূপে চিহ্নিত করেছেন?

– খুব সম্ভবত তাই। তবে নিশ্চিতভাবে জানি না। আগামীকাল জানতে পারব, জজ-সাহেবের সঙ্গে কথা বলে। চীফ জাজ ভাদুড়ীর সঙ্গে কাল বেলা দুটোর সময় একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি।

স্মরণিকা অবাক হয়ে যায়। চীফজাজ ভাদুড়ীর এজলাসেই নিশ্চয় ঐ কেসটা উঠেছিল, কিন্তু উনি তা কী করে জানলেন? বেচারি জানত না, ব্যাঙ্ক থেকে ফিরেই বাসু হাইকোর্ট-পাড়ায় ফোন করেছিলেন ওঁর জুনিয়ারকে। তার মাধ্যমে কোর্ট-রেকর্ড থেকে জেনেছেন সত্যানন্দ সেনের কেসটা কোন জজসাহেব বিচার করেন। তথ্যটা সংগ্রহ করে চীফজাজ সদানন্দ ভাদুড়ীর পেশকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আগামীকাল বেলা দুটোর সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছেন। সওয়া দুটোয় ওঁর এজলাস বসবে। অবশ্য বিচারক ভাদুড়ী জানেন না– বাসু কী বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান।

কৌশিক আর সুজাতা বাসু-সাহেবের গাড়িতে করে স্মরণিকাকে পৌঁছে দিয়ে এল বেহালায়, তার বান্ধরীর যদু-কলোনির ফ্ল্যাটে। গীতা কর একটি বিখ্যাত ফার্মের ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের পার্সোনাল সেক্রেটারি। কোম্পানির খরচে তার ফ্ল্যাটে একটি টেলিফোন আছে। গীতা বিবাহিতা, কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে বর্তমানে একলা থাকে। সে ফ্ল্যাটে ছিল। মালপত্রসমেত টুকুকে সেখানে পৌঁছে দিয়ে কৌশিক আর সুজাতা ফিরে এল।