যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ৮

আট

বাসু-সাহেব যখন নিউ আলিপুরের বাড়িতে ফিরে এলেন তখন রাত সওয়া– দশটা। পোর্চ-এ বসেছিল কৌশিক, সে এগিয়ে এসে বলল, আপনি ভিতরে যান, গাড়িটা আমিই গ্যারেজ করে দিচ্ছি।

– না, গাড়িটা এখানেই থাক। আরও একবার হয়তো বের হতে হবে।

– এত রাত্রে! আপনাকে?

– অন্তত তোমাকে। খেয়ে নিয়েছ?

ততক্ষণে চাকা-দেওয়া গাড়িতে পাক মেরে রানু দেবীও এসে গেছেন বাইরের বারান্দায়। সেখান থেকেই বলেন, তাই কি পারে? তুমি বাড়ি ফেরনি, আর আমরা সব খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে শুয়ে পড়ব?

বাসু বিরক্ত হন, কী আশ্চর্য! আমি তখন টেলিফোনে বললাম না, ওদের খেয়ে নিতে বল?

– সে তো রাগ করে বলেছিল!

– হায় রে আমার পোড়া কপাল! কেন? ওরা থিয়েটার দেখতে গেছে বলে? আচ্ছা, বাড়িশুদ্ধ তোমরা কি সবাই পাগল? এতে আমার রাগ করার কী হল? আমি ওকে খেয়ে নিতে বলেছিলাম একটা বিশেষ কারণে? কাকলি যদি রাত সাড়ে-দশটায় আসে তাহলে কথাবার্তা শেষ হতে হতে রাত এগারোটা বাজবে। অত রাত্রে কাকলিকে একা একা ট্যাক্সিতে বাড়িতে ফেরৎ পাঠানো ঠিক নয়।

কৌশিক বলে, ঠিক আছে, ওঁকে আমরা দুজন পৌঁছে দিয়ে এসেই না হয় ডিনার সারব। সে যা হোক, নবনীতা কেমন আছেন, মামু?

– এখনো বেঁচে আছে। আপ-টু-ডেট খবর সব রানুর কাছে পেয়ে গেছ দেখছি।

তারপর রানুদেবীর দিকে ফিরে বলেন, ডাক্তার ব্যনার্জিকে টেলিফোনে পেয়েছিলে?

– হ্যাঁ, ওঁরা যথাকর্তব্য করবেন। আমি যখন ফোন করি তখনো অ্যাম্বুলেন্সটা নার্সিংহোমে পৌঁছায়নি। ও! ভাল কথা, ইতিমধ্যে রাকেশ বাজোরিয়া ফোন করেছিলেন। তিনি নাকি তোমার গুণগ্রাহী। তিনি দোকানে এসে শুনেছেন, একজন পুলিস-ইন্সপেক্টরকে নিয়ে তুমি তাঁর দোকান গেছিলে। আমার প্রশ্নের জবাবে উনি জানালেন যে, লালবাজারে উনি যোগাযোগ করেছেন। লালবাজার যা-যা জানতে চায় সব জানিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি জানতে চাইছিলেন, তোমার বিশেষ কোনও প্রশ্ন আছে কি না।

– বুঝলাম। তা সিক্ত-মার্জারটিকে তুমি কী বললে?

– আমি ওঁকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম মিস্টার বাসুর যদি বিশেষ কোনও জিজ্ঞাসা থাকে তবে তিনি নিজেই তা টেলিফোনে জানতে চাইবেন। তাতে উনি ওঁর দোকান আর বাড়ির ফোন নাম্বার দিলেন-আর তাছাড়া বললেন, এসব হাঙ্গামা মিটে গেলে তুমি যেন সপরিবারে তোমার সুবিধামতো ওঁর গরিবখানায় একরাতে পদধূলি দাও–

– গরিবখানা না গরিব-ম্যয়খানা?

– ম্যয়খানা! সেটা আবার কী?

– আসবাগার! রেস্তোরাঁ-কাম-বার। ফার্সি শব্দ।

রানু জবাব দেবার সুযোগ পেলেন না। তখনই পোর্চে ওঁদের গাড়িটার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল একটা ট্যাক্সি।বাসু জানলা দিয়ে উকি মেরে দেখলেন।ট্যাক্সির একক যাত্রী নেমে এসে ভাড়া মেটাচ্ছে। ফলসা-রঙের একটা তাঁতের শাড়ি, ঐ রঙেরই ব্লাউজ। তার উপর একটা লেডিজ গরম ওভারকোট। কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ। ওভারকোটের বাঁ-দিকের পকেটটা উঁচু হয়ে আছে। টিফিন-বক্স জাতীয় কিছু আছে বোধহয়। বাসু-সাহেবের যুক্তিবাদী মনে প্রশ্ন জাগলো – মেয়েটি ওভারকোটের পকেটে না নিয়ে টিফিন-বক্সটা তো অনায়াসে ঝোলাব্যাগেই নিতে পারত। সেটাই প্রত্যাশিত।

ইতিমধ্যে ভাড়া মিটিয়ে ও বারান্দায় উঠে এসেছে। সুজাতা এগিয়ে এসে নমস্কার করে বললে, মিস কাকলি দত্ত?

– হ্যাঁ, নমস্কার। উনি কি জেগে আছেন? মানে, মিস্টার বাসু?

– জেগে তো নিশ্চয়ই আছেন। আপনার প্রতীক্ষা করছেন

মেয়েটি একটু ইতস্তত করে বলল, আমি যাঁর সঙ্গে দু-দুবার টেলিফোনে কথা বলেছি–

সুজাতা বাধা দিয়ে বললে, তিনি আমার মামিমা, মানে মিসেস বাসু। আসুন এ-ঘরে। ওরা সবাই আছেন।

কাকলি ঘরে ঢোকে। হাত তুলে বাসু আর রানু দেবীকে নমস্কার করে বলে, আপনারা বোধহয় এতরাত পর্যন্ত সচরাচর জাগেন না, বিশেষত জানুয়ারির শীতে–

বাসু বলেন, কলকাতায় জানুয়ারিতে যে শীত পড়ে তা তোমার ওভারকোট দেখে জানলাম।

তারপর রানুর দিকে ফিরে বলেন, ফর্মাল ইন্ট্রোডকশন আশা করি নিষ্প্রয়োজন – কাকলি, ইনি আমার সচিব ও ধর্মসঙ্গিনী। এস, আমার চেম্বারে এসে বসবে।

ওঁরা দুজনে বাসু-সাহেবের ঘরে এসে বসেন। এ ঘরটা এয়ার-কন্ডিশন করা। একটা ইলেকট্রিক রুম-হিটারের সুইচ অন করে বাসু-সাহেব বললেন, তোমার ওভারকোটটা বরং খুলে রাখ, গরম লাগবে না হলে।

কোটটা নিজে হাতে খুলে দিতে গেলেন। কাকলি বাধা দিল, না, না, আমার কেমন যেন-হাড়ের ভিতর শিরশির করছে। ওভারকোটটা থাক।

– তবে থাক। গরম কফি খাবে এক কাপ?

– না। আমি বরং কাজের কথাটা সেরে নিই। কিন্তু কিভাবে যে শুরু করব বুঝে উঠতে পারছি না।

– তা নিয়ে চিন্তা কর না। যেখান থেকে ইচ্ছা শুরু কর। আমি ধীরে ধীরে সব কথা জেনে নেব।

– আমার বাবা বছরতিনেক আগে মারা যান। আমরা মাত্র দুই বোন। আমি ছোট। ভাই নেই। বাবার সম্পত্তি আমরা দুই বোন পেয়েছি। যোধপুর পার্কে একটা দোতলা বড়ি আর গড়িয়াহাট রোডে একটা ফোটোগ্রাফির দোকান। দোকানটা লিমিটেড কোম্পানি। আমার আর দিদির বেশির ভাগ শেয়ার। মাত্র বিশ শতাংশ শেয়ার ছিল পরিবারের বাইরে। আজ বিকেলে আমি হঠাৎ জানতে পারলাম তার ভিতর দশ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছেন ভৈরব দাশ নামে একজন ব্যবসায়ী। লোকটা অত্যন্ত ধূর্ত – আর সিনেমার প্রডিউসার – তাছাড়া–

কাকলি ইতস্তত করে হঠাৎ থেমে পড়তেই বাসু-সাহেব বলেন, কী হল? ইতস্তত করছ কেন? ডাক্তার আর উকিলের কাছে কিছু গোপন করতে নেই। ‘তাছাড়া’–?

– লোকটা প্রথমে আমাকে তার সিনেমায় অভিনয় করতে বলে, পরে আমাকে বিবাহ-প্রস্তাব দেয়। দুটোই আমি প্রত্যাখ্যান করায় ভৈরব এখন অন্যভাবে আমাকে কব্জা করতে চাইছে। আজ বিকালে সে আমার দোকানে এসেছিল। এসে দেখালো যে, দশ শতাংশ শেয়ার সে কিনে নিয়েছে। আইনত এখন সে আমাদের দোকানের একজন ছোট মাপের অংশীদার–

– বুঝলাম। তা তোমার কী মনে হয়? কী কারণে সে ঐ দশ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে? তোমার বিজনেসে নাক গলাবে বলে? না কি তোমার প্রতি প্রতিহিংসাবশে? সে নিশ্চয় আশা করে না যে, ঐ ক’খানা শেয়ার সে হস্তগত করেছে বলে তুমি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিনেমায় নামবে অথবা বিবাহবন্ধনে স্বীকৃত হবে।

– সেটা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। ও অবশ্য হাসতে হাসতে বলল যে, সে নীরব-সহযোগী হয়ে থাকবে – ‘সাইলেন্ট পার্টনার’! কিন্তু নিঃসন্দেহে ওর কোন গভীর কুমতলব আছে।

– বলে যাও। তারপর?

– আমার দিদি বছরদেড়েক হল একজনকে বিয়ে করেছে– যাদুগোপাল সেন।

– সেকী করে? চাকরি না ব্যবসা?

কাকলির ঠোঁটের প্রান্তে একটা বিচিত্র অভিব্যক্তি ফুঠে উঠল। বললে, সে আমার দিদির বিষয়-সম্পত্তির দেখ ভাল করে।

– দিদির বিষয়-সম্পক্তি কি এতই বিশাল?

– না, না, তা মোটেই নয়। বাবার উত্তরাধিকারী হিসাবে আমরা দু’বোন– দোকান-গাড়ি ছাড়া এমন কিছু পাইনি। কিন্তু আমার দিদি বেশ অসুস্থ। তার একটা মাইলড হার্ট-অ্যাটাকও হয়ে গেছে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ মতো সে বিষয়-সম্পত্তির কিছুই দেখে না। যাদুগোপালই তা দেখাশোনা করে। দিদি ওকে সব বিষয়েই পাওয়ার-অব-অ্যাটর্নি দিয়ে রেখেছে। আমার সন্দেহ তলে তলে দিদি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে!

– তোমার দিদি ঐ যাদুগোপালকে বিশ্বাস করে? তুমি বারণ করা সত্ত্বেও সে সাবধান হয় না?

– যাদুগোপালের প্রতি দিদির অন্ধবিশ্বাস। তা ছাড়া দিদিকে সাবধান করার সুযোগও আমি পাই কই? যখনই ওবাড়ি যাই যাদুগোপাল দিদিকে আগলে রাখে।

বাসু প্রশ্ন করেন, তুমি বারে বারে ওকে যাদুগোপাল বলে উল্লেখ করছ। তুমি ওকে ডাক কী নামে? জামাইবাবু, না যাদুদা অথবা যাদুগোপাল?

কাকলি একটা অস্বস্তিকে ঝেড়ে ফেলে স্বীকার করল, যাদুগোপাল আমাদের পরিবারে প্রথম আসে আমাদের দুই বোনকে প্রবেট নিতে সাহায্য করবে বলে। আমরা দুই বোন যখন বাড়ি-গাড়ি-ব্যবসার সব পেলাম তখন ও প্রথমটা আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করে। আগেই বলেছি, আমাকে প্রপোজও করে। আমি অস্বীকৃত হই। তারপর ও দিদিকে বিয়ে করে।

– তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে এ বিয়ে তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছে। তাই না?

– তাও বলতে পারেন। আমি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। বস্তুতপক্ষে ওরা বিয়ে করার পর আমি ঐ যোধপুর পার্কের বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি। এখন আমি আমার দোকানঘরের দেড়তলায় ‘মেজানাইনে’ থাকি।

– অন্যের বাড়িতে ভাড়াটে হিসাবে?

– আজ্ঞে হ্যাঁ। বাবার আমল থেকেই আমরা ভাড়াটে।

– যোধপুর পার্কের বাড়িতে তোমার স্বত্ব ছিল না?

– ছিল, এবং আছে। একতলাটা আমার, সেটা তালাবন্ধ থাকে।

– ঠিক আছে। এ তো হল পটভূমিকা। তোমার বর্তমান সমস্যাটা কী? কী এমন জরুরি কাণ্ড ঘটল যে, কাল সকালের অ্যাপয়েন্টমেন্টটা পরিবর্তন করে আজ এত রাত্রে তুমি আমার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছ?

কাকলি এবার বিস্তারিত ভাবে জানায় তার আশঙ্কার কথা। দিদি ইতিমধ্যে তার শেয়ারগুলো যাদুগোপালকে এনডোর্স করে দিয়েছে এবং যাদু হয়তো সেগুলি জীবন হালদারের কাছে গচ্ছিত রেখে টাকা ধার নিয়ে রেস খেলে উড়িয়েছে। ভৈরবের সঙ্গে বিকেলে কথা বলার পরেই সে যোধপুর পার্কে যায়। যাদুগোপালের মটোর-অ্যাকসিডেন্টের বিষয়ে উল্টোপাল্টা কৈফিয়ৎ শুনে তার সন্দেহ জাগে। কাপাডিয়া, ভবানীপুর থানা আর নবনীতার কাছ থেকে নানান তথ্য শুনে সে আন্দাজ করছে শেয়ারগুলো বর্তমানে আছে জীবন হালদারের কাছে। ওর আশঙ্কা, ভৈরব সেগুলো হাতাবার চেষ্ট করবে।

ভৈরব দাশ যদি দিদির অংশের শেয়ার কিনতে পারে তাহলে ঐ দশ পার্সেন্ট শেয়ার সমেত ভৈরবই হয়ে যাবে সিনিয়ার 50% পার্টনার। তখন কাকলির পক্ষে আত্মসমর্পণ করা অথবা পথের ভিখারি হওয়া, দুটো পথের যেকোন একটা বেছে নিতে হবে।

বাসু জানতে চান শেয়ারগুলো যে জীবন হালদারের কাছে গচ্ছিত আছে তা কি শুধু তোমার অনুমান?

– আজ্ঞে হ্যাঁ। তাই।

– ভৈরব দাশের সঙ্গে জীবন হালদারের পরিচয় আছে এমন কথা তুমি অনুমান করছ কেন?

– এটা নিছকই আমার অনুমান। হয়তো সিঁদুরে মেঘ দেখে আমি বৃথাই ভয় পাচ্ছি। আমার এ আশঙ্কা হয়েছে নীতার সঙ্গে কথা বলে। বাই দ্য ওয়ে, নীতা, আই মীন নবনীতা রায় আসেনি? বা টেলিফোন করেনি?

– আসেনি। তবে টেলিফোন করেছিল, আসতে পারবে না জানিয়ে।

– ও! কেন আসতে পারবে না তা বলেছে?

– বলেছে। ওকে কেউ এক বাক্স চকোলেট-ক্যান্ডি পাঠিয়েছিল। সেগুলো ছিল বিষাক্ত। ও তার কয়েকটা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নীতা আমাকে ফোন করে সে কথা জানিয়েছিল। কথা বলতে বলতেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়।

কাকলির দু-চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। বলে, কী বলছেন! নীতাকে বিষাক্ত খাবার কে পাঠাবে? কেন পাঠাবে?

– সেটা এখনো জানা যায়নি। তবে ঐ চকোলেট-ক্যান্ডির সঙ্গে লোকটা একটা আনকোরা ডায়েরিও পাঠিয়েছিল। আর একটা চিরকুট নীতাকে প্রীতি ও শুভেচ্ছাসহ…

কাকলি নিজের অজ্ঞাতসারেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে যেন বজ্জাহত হয়ে গেছে। বাসু বলেন, কী হল? উঠে দাঁড়ালে কেন?

– গুড হেভেন্স! ঐ ডায়েরি আর চিঠি তো আমিই পাঠিয়েছি।

– একটা পলিথিন ব্যাগে?

– হ্যাঁ।

– ঐ চকোলেট বাক্সটাও?

– না। নিশ্চয় না। বিষ-মেশানো চকোলেট আমি কেন পাঠাব?

– কখন ঐ ব্যাগটা পাঠিয়েছিলে? কার হাতে?

কাকলি আবার বসে পড়ে। বুঝিয়ে বলে যে, নবনীতার সঙ্গে কথাবার্তা বলে সে দোকানে ফিরে আসে। নবনীতাকে সে বলেছিল একটা ডায়েরি উপহার দেবে, যাতে সে জানুয়ারি-মাসের সব ঘটনা লিখে রাখতে পারে– ঐ মটোর-অ্যাকসিডেন্ট-এর বিষয়ে তার যা স্মরণে আছে তা সমেত।

তুমি ডায়েরিতেই তাহলে ঐ কথা লিখলে না কেন? ‘নীতাকে, প্রীতি ও শুভেচ্ছা সহ – কাকলি।’

– আমি ভেবেছিলাম আদালতে হয়তো আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারব যে, ডায়েরিটা ও পয়লা জানুয়ারি থেকেই লিখছে। আমি উপহার দিলে তা হতে পারে না। কারণ নানান সূত্র থেকে প্রমাণ হবে যে, ওর সঙ্গে আমার পরিচয় মটোর দুর্ঘটনার পর। সে জন্যই ডায়েরিতে আমি কিছুলিখিনি। আলাদা কাগজে লিখেছিলাম।

– কার হাতে ওটা পাঠাও?

– আমার দোকানের ছোকরা চাকর। সে ফিরে আসার পর জিজ্ঞেস করে জানতে পারি যে, সে দোকানের ভিতরে যায়নি। দারোয়ানের হাতে প্যাকেটটা দিয়ে আসে। প্যাকেটের উপর ‘নবনীতা রায়’ লেখা ছিল। দারোয়ান বলেছিল, নীতা-দিদিকে সে চেনে। দিয়ে দেবে প্যাকেটটা। আপনি স্যার কেমন করে বিশ্বাস করলেন যে, আমিই ঐ বিষাক্ত চকোলেট নীতাকে পাঠিয়েছি?

– আমি বলিনি কাকলি যে, তা আমি বিশ্বাস করেছি। এমনও হতে পারে যে, কোন একজন নবনীতাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায়। সে ঐ সোনালি-স্বপনেরই লোক। বিষাক্ত ক্যান্ডিগুলো হয়তো সে আগেই তৈরি করে রেখেছিল। তোমার পাঠানো পলিথিন-ব্যাগটা দারোয়ানের মাধ্যমে পেয়ে সে এই সুযোগটা নিয়েছে। নীতা যদি জ্ঞান ফিরে পায় তাহলে একমাত্র সেই বলতে পারে কার হাত থেকে প্যাকেটটা সে গ্রহণ করেছিল। কারণ দারোয়ান সম্ভবত বলবে যে, সে কাউন্টারে জমা দিয়ে এসেছিল। আর কিছু জানে না।

কাকলি জানতে চায়, নীতা এখন কোথায়? কেমন আছে?

– তুমি জানতে চেও না, কাকলি। এটুকু জেনে রাখ যে, তার ঠিকানা আমরা উদ্ধার করেছি। তাকেও উদ্ধার করে একটি নার্সিংহোমে পাঠিয়ে দিয়েছি। বিস্তারিত বিবরণ তোমার না জানা থাকাই ভাল। এখন আমাকে বল দিকিন– তোমার দিদির ঐ শেয়ারগুলো – যা, তোমার আশঙ্কায়, গচ্ছিত রাখা আছে জীবন হালদারের কাছে– তার বাজার দর কত?

কাকলি মাথা নিচু করে একটু ভেবে নিয়ে বলল, দেখুন স্যার – ব্যাপারটা এই রকম: দিদির সবগুলো শেয়ার বেচতে গেলে আমরা দেড়-দু-লাখ টাকা পাব কি না সন্দেহ। কিন্তু আমার কাছে ওর দাম পঞ্চাশ লক্ষ টাকা! কারণ ঐ শেয়ারগুলো খোয়া গেলে আমি পথের ভিখারি হয়ে যাব! ভৈরব আমার দোকানের সিনিয়ার-মোস্ট পার্টনার হয়ে বসবে। আমার উপর ছড়ি ঘোরাবে। আমায় হয়তো সুইসাইড করতে হবে।

– ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল। যা বলছি তার জবাব দাও। আমাকে হয় তো তোমার অ্যাকাউন্টে কিছু খরচ করতে হবে। শেয়ারগুলো ফেরত পাও বা না পাও আমাকে কতদূর খরচ করতে দিতে পার তুমি?

কাকলি একটু ভেবে নিয়ে বলল, ধরুন দশ হাজার টাকা।

– তার বেশি নয়?

– ন্-না। অন্তত আমাকে না জানিয়ে নয়।

– হয়তো আমাকে কিছুই খরচ করতে হবে না। তবু ওটা জেনে রাখা ভাল। তাই জিজ্ঞেস করলাম।

ইন্টারকমে মিসেস বাসুকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ঐ বাজোরিয়ার রেসিডেন্সে একটা ফোন কর তো। লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না জানি না। আমাকে এখনি জানতে হবে জীবন হালদারের ঠিকানাটা। একমাত্র বাজোরিয়াই তা বলতে পারবে। ওকে ফোনে ধর তো।

কাকলি একটু ইতস্তত করল। তারপর ওর শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা হাত ব্যাগ বার করল। তা থেকে একটা ডায়েরি বার করে মেলে ধরল বাসু-সাহেবের সামনে। বলল, জীবন হালদারের ঠিকানা আমার কাছে লেখা আছে। এখান থেকে বেশি দূরে নয়। মোমিনপুরের কাছে – এই নিন।

– তোমার ডায়েরিতে জীবন হালদারের ঠিকানা এল কেমন করে?

– ওটা নবনীতার হাতের লেখা। কিন্তু ওর নামটা যেন প্রকাশ হয়ে না পড়ে। ও বিশ্বাস করে আমাকে দিয়েছিল।

– ঠিক আছে। কথাটা গোপনই থাকবে।

– আপনি কি জীবন হালদারের সঙ্গে দেখা করবেন?

– অফ কোর্স! আজ রাত্রেই। সে যাহোক, ও নিয়ে তুমি চিন্তা কর না। রাত এগারটা বাজে প্রায়। এতরাত্রে তোমার একলা ফেরা ঠিক নয়। আমার ভাগ্নে – সুকৌশলীর কৌশিক – তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।

কাকলি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। বাসু ধমক দিয়ে ওঠেন। ডোন্ট আর্গু! যাও এবার। ট্যাক্সি এতরাত্রে পাওয়াও কঠিন। পেলেও নিরাপদ নয়।

সুজাতা দ্বারপ্রান্ত থেকে ডাকল, আসুন! আমিও যাব আপনার সঙ্গে।

কাকলি বাসু-সাহেবকে বলল, আমার কিছুতেই ঘুম আসবে না। জীবন হালদারের বাড়ি থেকে ফিরে এসে আমাকে একটা ফোন করবেন স্যার?

– কাল সকালে করলে হয় না?

– হয়। কিন্তু রাত দুটো-তিনটের সময় ফোন করলেও বাকি রাতটুকু আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি, এই আর কি!

– অল রাইট। যত রাতই হোক, তোমাকে ফোন করব।