যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ৪

চার

চৌরঙ্গী পাড়ায় “সোনালি স্বপন’ বার কাম রেস্তোরা খুঁজে বার করতে অসুবিধা হল না। এবার কাকলি ট্যাক্সি নিয়ে এসেছিল। তাই সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই এসে পৌঁছালো মদিরাগারের সামনে। সন্ধ্যা সাড়ে-ছয়টা থেকে ‘ফ্লোর-শো’ শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ পপ্ গান গাইতে সমবেত হয় কয়েকটি ছেলে মেয়ে। রাত যত বাড়ে পপ্-গানের তাল তত বৃদ্ধি পায়। গানের সঙ্গে নাচের তাল দিতে দিতে গায়ক-গায়িকার দল নর্তক-নর্তকীতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আনন্দের হিল্লোল সংক্রামিত হয় পানাহারেচ্ছুদের মধ্যে। তারাও জোড়ায়জোড়ায় নাচতে উঠে আসে।

এমন পরিবেশে কাকলির মতো বাঙালী মেয়ে কখনো একা-একা আসে না। আসে জোড়-বেঁধে। অধিকাংশই বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে, কেউ বা হবু-বর, কচিৎ কর্তার হাত ধরে। নেহাৎ যদি কেউ একা আসে – ঐ বয়সের মেয়ে – তাহলে পানাহারকারীরা ধরে নেয় তার বিশেষ কোন উদ্দেশ্য আছে। তাই দ্বারের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ও।

দরজার বাইরে একটা টুলে বসেছিল উর্দিপরা একজন দশাসই দ্বারপাল। উষ্ণীষ-সমেত তার উচ্চতা দুই মিটারের কাছাকাছি। লোকটা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। সেলাম দিল এবং বাতানুকূল করা আসবাগারের ডবল-ডোর-এর বাহিরের দ্বারটা সসম্ভ্রমে খুলে ধরল। লোকটা মনে হয় অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। কাকলি আর ইতস্তত করল না। ঢুকে গেল আসবাগারে।

প্রথমটা কিছুই নজর হল না। ভিতরটা আলো ধারি। নীলাভ একটা মোহময় বাতাবরণ। যেন সে সূর্যালোকিত প্রান্তর অতিক্রম করে হঠাৎ অজন্তার সপ্তদশ গুহা-বিহারে ঢুকে পড়েছে। অন্ধকারে মনে হয় – এখানে-ওখানে কারা যেন বসে আছে। ছোট ছোট গ্রুপ। রাজা-রাণী খলনায়ক-খিদমদগার। ঐ ছোট ছোট গ্রুপকে ঘিরে এক-একটা ‘জাতক’ কাহিনী। কোনটা মিলনান্তক, কোনটা বিয়োগব্যথায় বিধুর। কিছুই বোঝা যায় না। জন্ম যে নিয়েছে সে-ই তো জাতক।

একটু অপেক্ষা করার পর নজর হল, ও-প্রান্তে একটি কাউন্টার। লম্বাটে একটা টেবিল। তার ওপাশে একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বর্ষিয়সী মহিলা, কৌতূহলী হয়ে ওর দিকে ফিরে বললেন, ইয়াস?

কাকলি ইংরেজিতে প্রশ্ন করে, নীতা কি এসেছে?

কুঞ্চিত ভুভঙ্গে মহিলা প্রতিপ্রশ্ন করেন, নীতা! নীতা কে?

– আই মীন, নবনীতা রায়!

– আই সী। ঐ তো ও কোনায় বসে আছে।

– ঐ স্টীল-গ্রে রঙের মুর্শিদাবাদী পরে?

– হ্যাঁ; কিন্তু আপনি কি ওকে চেনেন না?

কাকলি একগাল হেসে বলে, অর্ধেক দোষ আমার, অর্ধেক আপনাদের!

– তার মানে?

– আমার দৃষ্টিশক্তি একটু ক্ষীণ, তার উপর আপনারা ঘরটাকে প্রায় অন্ধকারে ঢেকে রেখেছেন! এনি ওয়ে, থ্যাঙ্কয়্যু।

পায়ে পায়ে ও এগিয়ে গেল হল-কামরার ও-প্রান্তে। খাদ্যরসিকরা হয়তো খেয়াল করল, পানরসিকেরা করল না। স্টীল-গ্রে রঙের মুর্শিদাবাদী এতক্ষণ লক্ষ্য করছিল সবই। সেও কৌতূহলী একজোড়া চোখ মেলে তাকালো।

– আপনিই নবনীতা রায়?

– হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক–

– না, আপনি আমাকে চেনেন না। আমার নাম জয়তী চক্রবর্তী।

– মিস না মিসেস?

– তাতে কি কোনও তফাৎ হবে? আপনি তো কোনও অবিবাহিত যুবক নন।

– না, তা নই। তা হলে অবশ্য আপনাকে ও প্রশ্নটা আদৌ জিজ্ঞেস করতাম না। এ আসবাগারে অবিবাহিত যুবকেরা জীবনসঙ্গী খুঁজতে আসে না। আসে ক্ষণিকবাদিনী সান্ধ্য-সঙ্গিনীর সন্ধানে। তাই আমি যদি যুবক হতাম– নো-ম্যাটার বিবাহিত অর অবিবাহিত – এবং আপনার মতো একটি সুন্দরী যুবতী যদি এগিয়ে এসে বলতেন ‘আপনি কি রমণীমোহন রায়?’ তাহলে আমি রমণীমোহন হই-না-হই রমণীর প্রতি মোহিত হয়ে রায় দিতুম – “আলবৎ! বস, বল কী পান করবে? হুইস্কি, রাম না শ্যাম্পেন?’ আপনি মিস না মিসেস জনতে চাইছি একটা বিশেষ হেতুতে। বুঝিয়ে বলছি, আগে জবাবটা শুনি?

সরাসরি জবাব না দিয়ে কাকলি বলে, আপনি এতক্ষণ ওটা কী পান করছিলেন?

– ভদকা-উইথ-সিট্রা। কিন্তু আমার প্রশ্নটা নিরুত্তর রয়েছে–

– না, মিসেস নয়। মিস্।

– আশ্বস্ত হলাম। বসুন তাহলে -কী জানেন? অনেক বিবাহিতা মহিলা ‘সোনালি স্বপনে’ এসে হানা দেন, তাঁদের কর্তাদের পানাসক্তি বিতাড়ন-মানসে। তাঁরা আমার সাহায্য চান। অথচ এটাই হল আমার গ্রাসাচ্ছাদনের আয়োজন। এটাই আমার চাকরি….

– চাকরি? আপনি ‘সোনালি স্বপনে’র স্টাফ?

– না, স্টাফ নই। কমিশনড এজেন্ট বলতে পারেন। ওয়েষ্ট্রেস নই। ‘বার-মেইড’ শব্দটা আমার অপছন্দ। ‘সাকী’ বললে খুশি হব।

কাকলি ওর বিপরীতে চেয়ারে বসে পড়েছে। বলে, না, আমার স্বামীর বালাই নেই, আমার এমন কোনও বয়ফ্রেন্ডও নেই যাকে ‘পানদোষ’ মুক্ত করতে আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।

– দ্বিগুণ আশ্বস্ত হলাম। তাহলে আপনার আগমনের হেতু?

এই সময় একটি বেয়ারা মেনুকার্ড হাতে এগিয়ে এল ওদের টেবিলের দিকে। নবনীতা তাকে বললে, না গিরিধারী, ইনি আমার বন্ধু। কিছু খেতে আসেননি, তুমি…

কাকলি বললে, বৈকালিক চা-পানটা অসমাপ্ত আছে। এখানে কি চা পাওয়া যাবে?

গিরিধারী বললে, যাবে। আর কিছু?

– চিকেন কাবাব? ফিশ ফিঙ্গার? পাওয়া যাবে?

– দুটোই তৈরি আছে। এনে দিচ্ছি, ম্যাডাম।

কাকলি নবনীতার দিকে ফিরে বললে, আপনার জন্য কী বলব, চা না কফি?

নবনীতা অনাসক্ত ভাবে প্রশ্ন করে, বিলটা কে মেটাচ্ছে?

– আমি যখন অর্ডার দিচ্ছি, তখন আমিই।

নবনীতা এবার গিরিধারীর দিকে ফিরে বললে, আমার জন্যে আর একটা ভদকা-অ্যান্ড-সিট্রা, ব্যস।

গিরিধারী শ্রুতিসীমার বাইরে চলে যেতেই নবনীতা প্রশ্ন করে, এবার বলুন? আপনার আগমনের উদ্দেশ্যটা কী?

– আমি একটি ইনভেস্টিগেটিং ব্যুরোয় কাজ করি। একটা ক্রেম কেস-এর অ্যাসাইনমেন্ট পেয়েছে আমাদের ব্যুরো। আমি তারই তদন্ত করছি ন্যাশনাল ইন্‌শিওরেন্স তরফে।

নবনীতা মাথা নেড়ে বলল, আপনি নিশ্চয় শাদা বাঙলা বলছেন এবং এক পেগ্‌ ভদকায় আমার নেশা হয় না। তবু আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।

কাকলি হেসে বলল, শুনুন, বুঝিয়ে বলি। ন্যাশনাল ইনশিওরেন্স কোম্পানি মোটর গাড়ির বীমা করে। কোনও ইনশিওর্ড গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে তার মালিক ঐ ইনশিওরেন্স কোম্পানির কাছে খেশারত দাবী করে। যদি ইনশিওরেন্স কোম্পানি মনে করে যে, দাবীর মধ্যে কিছু ফাঁকিবাজি আছে তখন তারা আমাদের ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোকে গোাপনে তদন্ত করতে বলে। আমরা তদন্ত করে কোম্পানিকে জানাই, বাস্তব ঘটনাটা কী।

– বুঝলাম। কিন্তু তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?

– নিতান্ত ঘটনাচক্রে। গত সপ্তাহে ভবানীপুরে বিজলী সিনেমার সামনে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। একটা অ্যাম্বাসাডার আর একটা ফিয়াট গাড়িতে ধাক্কা লাগে। অ্যাম্বাসাডারের মালিক মিস্টার কাপাডিয়া ইনশিওর কোম্পানির কাছে খেশারত দাবী করেছেন। আমি সে বিষয়ে তদন্ত করতে ভবানীপুর থানায় গেছিলাম। সেখানেই আপনার নাম-ঠিকানা পাই – প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসাবে। এখন আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কি ফুটপাথের দিকে ছিলেন, না রাস্তার দিকে? মানে, যখন ধাক্কা লাগে?

নবনীতা মাথা নিচু করে একটু ভাবল। তারপর বললে, এ আলোচনা আপনার সঙ্গে করতে যাব কেন? আমার কী স্বার্থ?

– তা ঠিক! আমারই ভুল। তাহলে ও প্রসঙ্গ থাক। আমার চা এবং আপনার ভদকা পান শেষ হলে বিল মিটিয়ে আমি চলে যাব। কেমন? সত্যিই তো, আপনি কেন আমাকে সাহায্য করতে যাবেন?

নবনীতা হেসে ফেলে। বলে, না, কথাটা মনে ছিল না আমার। আপনি ইতিপূর্বেই আমার জন্য এক পেগ ভদকার অর্ডার দিয়েছেন। ভদকা বা সিট্রা কোনটাতেই লবণ থাকে না, তবু এটা নিমকহারামি হয়ে যাচ্ছে। তাই কিছুটা আমাকে স্বীকার করতে হবে। প্রথমে বলি, আপনার দুটি অনুমানই ভ্রান্ত। দুর্ঘটনা মুহূর্তে আমি না-ছিলাম রাস্তায়, না ফুটপাথে। আমি ছিলাম ঐ ফিয়াট গাড়ির ভিতর। ড্রাইভারের পাশের সীটে।

– গুড গড! ঐ ফিয়াট গাড়ির চালক যদুগোপালবাবু আপনার আত্মীয় অথবা বন্ধু?

– আজ্ঞে না। এবারও আপনার ভুল হয়েছে। দু-দুটো আন্দাজই ভুল। এক নম্বর, ভদ্রলোকের নাম যদুগোপাল নয়, যাদুগোপাল। দু-নম্বর, তিনি আমার আত্মীয়-বন্ধু কিছুই নন।

– তিনি কি তাহলে আপনাকে একটা লিফট দিচ্ছিলেন?

– তার সঙ্গে আপনার ইনুশিওরেন্স কোম্পানির খেশারতের কি কোনও সম্পর্ক আছে? আমি যাদুবাবুর আত্মীয় হতে পারি, বান্ধবী হতে পারি– অথবা আপনি যেমন বললেন– নিতান্ত অপরিচিতা হতে পারি, অর্থাৎ উনি আমাকে জাস্ট একটা লিফট দিচ্ছিলেন। বাস্তব ঘটনা যাই হোক, তার সঙ্গে অ্যাক্সিডেন্টের কী সম্পর্ক?

– সম্পর্ক কিছুটা আছে বৈকি। আপনি একটি মদিরাগারের – আপনার নিজের ভাষায়– ‘সাকী’! যাদুবাবু যদি আপনাকে এই ‘সোনালি স্বপন’ থেকে উঠিয়ে বিজলী সিনেমার দিকে গাড়ি চালিয়ে থাকেন তখন তাঁর পক্ষে মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর সম্ভাবনাটা বৃদ্ধি পায়। তাই না?

নবনীতা একটু কুণ্ঠিতস্বরে বললে, আমাকে মার্জনা করবেন, মিস চক্রবর্তী; এ কথার জবাব আমি দেব না – দিতে পারি না। আই মীন, যাদুগোপাল সেনের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক, সে কেন, কোথা থেকে কোথায় আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল তা আমি আপনাকে জানাতে পারি না।

– কিন্তু ‘কেস’-টা আদালতে গেলে পুলিস তো আপনাকে সমন ধরাবে। তখন তো সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আপনাকে সব কথা স্বীকার করতে হবে।

– করব। তখন স্বীকার করব। তখন তো কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, আমি প্রতিহিংসাবশে বা টাকা খেয়ে মালিককে ফাঁসাতে চাইছি। হলফ নিয়ে আমাকে সত্য কথা বলতেই হবে।

– ‘মালিককে’ মানে?

– মিস চক্রবর্তী! প্লীজ এসকিউজ মী! ভদকা-উইথ-সিট্রার দামটা না হয় আমিই মেটাবো!

– কী বকছেন পাগলের মতো! বেশ তো, না বলতে চান, বলবেন না। আসুন, আমরা ততক্ষণ অন্য কিছু আলোচনা করি। সত্যজিতের শেষ ছবিটা দেখেছেন? ‘আগন্তুক’?

নবনীতা আপন মনেই মাথা ঝাঁকি দিল। হঠাৎ কাকলির একখানা হাত চেপে ধরে বললে, আমি….আমি একটা নরকের কীট! নরক-যন্ত্রণা সইছি। সইতে হবে বাকি জীবন! তাই ওসব কথা বলতে পারছি না। বিশ্বাস করুন!

– বেশ তো! বলবেন না। কিন্তু আপনার হাতে-পায়ে তো শেকল পরানো নেই। দরজাটাও খোলা। নরকে পড়ে আছেন কেন?

– আপনি দেবেন আমাকে একটা চাকরি? মাইনে-টাইনে চাইনে। মাথার উপর একটা ছাদ, নিরাপত্তা আর ভাতকাপড়! দেবেন?

কাকলি কী-একটা কথা বলতে গেল। তার আগেই এগিয়ে এল গিরিধারী। নবনীতা এতক্ষণ কাকলির হাতটা ধরেছিল। সেটা ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। গিরিধারী পানাহার টেবিলে সাজিয়ে দিল। নবনীতা ভদকার গ্লাসে সিট্রা মিশিয়ে টেনে নিল। কাকলি কাবাবের ডিশটা ওর দিকে ঠেলে দিয়ে বললে, খালি পেটে খাবেন না।

নবনীতা একটা কাবাবের টুকরো তুলে নিয়ে মুখে দিল। টী-পটে চামচ নাড়াতে নাড়াতে কাকলি প্রশ্ন করে, আপনি যা বললেন তাতে মনে হচ্ছে নরকের কুম্ভীপাকে পড়ে আছেন। সুযোগ পেলেই এখান থেকে লাফ মেরে পালাতে চান–

– প্রভাইডেড সেটা ‘ফ্রাইং প্যান টু ফায়ার’ না হয়ে যায়। এখানে আত্মসম্মান নিয়ে কাজটা করতে পারছি। আমি কোথায় থাকি তা এই প্রতিষ্ঠানের কেউ জানে না। ডিউটি খতম হলেই আমার মুক্তি। মাঝরাতে কেউ মত্তাবস্থায় আমার বাড়িতে চড়াও হতে পারে না। ছোট্ট ঘর – নানান অসুবিধা– নিজে হাতে সব কিছু করতে হয়। তবু সম্মানটা বজায় রাখা চলে।

– অন্য আর কোথাও কখনো চাকরির চেষ্টা করে দেখেছেন?

– দেখেছি। কিছুদিন একটা কনফেকশনারিতে কাজ করেছি। কেক, চকোলেট, প্যাস্ট্রি বানানোর কারখানায়। ছয় মাসও টিকতে পারিনি। তারপর একটা টয়-মেকিং-শপ’-এ খেলনা বানানোর কাজ করতে যাই। সেখানে মাস-দেড়েকও চাকরি করতে পারিনি।

– কেন? অসুবিধাটা কী হল?

– সর্বত্র ঝাঁকে-ঝাঁকে হাঙর!

কাকলি বলল, এবার আমাকেই ঐ প্রশ্নটা পেশ করতে হয়। আপনি কি কুমারী, না সধবা, অথবা….

– আমি নিজেই তা জানি না।

– মানে?

– শৈশবে বাবা-মা মারা যান। মামার কাছে মানুষ। উনিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করি। মামার তিন-তিনটি অবিবাহিত মেয়ে ছিল। ভালবেসে যে ছেলেটির হাত ধরে গ্রাম ছাড়ি, সে কালীঘাটে নিয়ে এসে আমার সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। মাসখানেকের মধ্যেই জানতে পারি, আমার সেই স্বপ্নের রাজপুত্র বিবাহিত, দুটি সন্তানের জনক। অর্থাৎ আমাদের কালীঘাটের বিয়েটা অবৈধ! এবার আপনিই হিসেব করে বলুন– আমি কী? বিধবাই ধরে নেওয়া উচিত, কী বলেন? আমার সেই স্বপ্ন-রাজপুত্রের অকালমৃত্যুতে?

কাকলি বললে, ‘সোনালি স্বপনে’ আপনি কী সূত্রে বন্দিনী?

– অর্থনৈতিক সূত্রে। এ জবাব তো আপনাকে আগেই দিয়েছি। জুটিয়ে দিতে পারেন একটা সাদামাটা চাকরি!

– চেষ্টা করে দেখতে পারি। তাহলে জানতে হয়, আপনার কোয়ালিফিকেশন কী, কোন্ কোন্ কাজ করতে পারবেন। কত টাকা মাইনে চান, ইত্যাদি….

নবনীতা আর এক সিপ্ ভদকা পান করে প্রতিপ্রশ্ন করে, আপনি সিরিয়াসলি জানতে চান?

– কেন, আপনার সন্দেহ হচ্ছে?

– তা একটু হচ্ছে, আপনি কায়দা করে জেনে নেবার চেষ্টা করছেন যাদুগোপালের ব্যাপারটা।

– ও! তবে থাক। আসুন আর কোন বিষয় আলোচনা করি। ভাল কথা, তখন একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম…কী যেন প্রশ্নটা?

– হ্যাঁ, মনে আছে আমার। না, আগে দেখিনি, এখন দেখছি।

– কী?

– ‘আগন্তুক’ গল্পটা শুনেছি শুধু। আপনাকেও ঠিক ঐ রকম লাগছে। আপনি ‘আসল বন্ধু’, না ‘নকল বন্ধু’ ঠিক ঠাওর হচ্ছে না। সত্যি করে বলুনতো, মিস চক্রবর্তী – কেন আমাকে চাকরির লোভ দেখাচ্ছেন?

কাকলি ম্লান হাসল। বলল, এতক্ষণে আপনার ঐ কথাটার একটা অর্থ খুঁজে পাচ্ছি। ঐ যে আপনি তখন নিজেকে ‘নরকের কীট’ বলছিলেন না? একটা নারকীয় পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে আপনার চিন্তাধারাই বাঁকা হয়ে গেছে। আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না: একটি আন-অ্যাটাচড্ মহিলা – যে পুরুষশাসিত সমাজে একা-হাতে লড়াই করতে করতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে – সে সমপর্যায়ের আর একটি মেয়েকে নিঃস্বার্থ সাহায্য করতে হাতটা বাড়িয়ে দিতে পারে!

নবনীতা বাকি মদটুকু কণ্ঠনালীতে ঢেলে দিয়ে বলে, জীবনে বহুবার বহু লোককে বিশ্বাস করে ঠকেছি। না হয় আরও একবার ঠকব। বলুন? কী আপনার প্রশ্ন? ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমি হায়ার সেকেন্ডারিটা কোনক্রমে পাস করেছি। রান্না করতে জানি। প্রয়োজনে কাপড় কাচব, ঘর মুছব, কিন্তু অপরের উচ্ছিষ্ট বাসন মাজতে পারব না। মাহিনা -না, সে বিষয়ে কোনও দরাদরি নেই – চাই আশ্রয়, নিরাপত্তা এবং ভাতকাপড়।

কাকলি চায়ের নিঃশেষিত কাপটা নামিয়ে রেখে বললে, তাহলে তো পারব না, নীতা। ঐ শর্তটা মানা চলবে না।

– কোনটা?

– অপরের উচ্ছিষ্ট বাসন মাজবনা!

নবনীতা একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি একজন ‘মেইড সার্ভেন্ট’ খুঁজতে ‘সোনালি স্বপনে’ এসেছেন, মিস চক্রবর্তী?

– না, কম্প্যানিয়ন। বান্ধবী! যে পাশাপাশি চৌকিতে আমার সঙ্গে একঘরে থাকবে। হাতে-হাতে কাজ করবে। প্রয়োজনে আমি তার এঁটোবাসন ধুয়ে নেব, সে আমার উচ্ছিষ্ট বাসন ধুয়ে দেবে। কী? পারবে না?

নবনীতা পুরো বিশ সেকেন্ড ওর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকল। তারপর বললে, আমি তাহলে আর এক পেগ্‌ ভদকা নেব, জয়তী!

– নিতে পার। এ পেগের দামটাও আমি মেটাব। তবে শুধুমাত্র যদি প্রত্যাখ্যান কর আমার প্রস্তাব, তাহলেই। আর যদি আমার প্রস্তাবটা গ্রহণ কর – আমার বান্ধবী হতে স্বীকৃত হও, তাহলে এটাই তোমার শেষ ‘পেগ’! আর কোনদিন কোন অ্যালকহলিক ড্রিংকস্ পান করা চলবে না।

– এ তো অত্যন্ত কঠিন শর্ত।

– ‘বন্ধুত্ব লাভ’ একটা সহজ প্রক্রিয়া ভেবেছিলে নাকি?

– অল রাইট! আই অ্যাকসেপ্ট য়োর চ্যালেঞ্জ।

– চ্যালেঞ্জ কি গো? আমি তো বন্ধুত্ব করতে হাতটা বাড়িয়ে দিচ্ছি, লড়াই করতে নয়।

নবনীতা ওর হাতটা তুলে নিয়ে বললে, ঠিক কথা! তুমি কোথায় থাক গো, জয়তী?

– জয়তী নয়, আমার নাম কাকলি দত্ত। আমি থাকি –

যেন প্রতিবর্তী প্রেরণা। নবনীতা ওর হাতখানা ছেড়ে দিয়ে বলল, তাই বল। তাই এই ফাঁদ পেতেছ। তুমি যাদুগোপালের শ্যালিকা।

– কারেক্ট। কিন্তু ফাঁদ আমি পাতিনি, নীতা। আমার বন্ধুত্বের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হাত যেমন ছিল তেমনই আছে। যাদুগোপাল যে মদ্যপ, রেসুড়ে, এসব তথ্য আমার জানা। তার আর কোন ম-কারান্ত দোষ আছে কি না তা আমি জানি না, জানতে চাই না। আমি শুধু অনুরোধ করব – গত সোমবার যা যা ঘটেছে তা তুমি এখনি–স্মৃতি টাটকা থাকতে থাকতে – তোমার ডায়েরিতে লিখে ফেল।

নীতা বলে, ডায়েরী! আমি ডায়েরি কোথায় পাব? আমি কি ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার না বিজনেসম্যান? আমি ডায়েরি রাখি না।

– এবার থেকে রাখতে হবে। যদি আমার ‘কম্প্যানিয়নশিপ’ অ্যাকসেপ্ট কর। আমার কাছে ব্ল‍্যাঙ্ক ডায়েরি আছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি-ঘণ্টাখানেকের ভিতর। এটা জানুয়ারি তৃতীয় সপ্তাহ। স্মৃতি থেকে একমাসের কথা সব কিছু ডায়েরিতে লিখে ফেল। আর লেখাটা চালিয়ে যেও – যাতে আদালতে দিনপঞ্জিকাটা দাখিল করলে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কেমন?

নবনীতা নতনেত্রে কী যেন ভাবছে।

কাকলি বললে, আরে বাপু, ফাঁদই যদি পাতব তাহলে নিজে থেকে নাম-পরিচয়টা জানাব কেন, বল?

নবনীতা স্বীকার করে, তা বটে!

– তাহলে আমর কম্প্যানিয়ন হতে রাজি? বিশ্বাস কর নীতা, যাদুগোপালের সঙ্গে তোমার ঘনিষ্ঠতা কতদূর হয়েছে তা জানবার কৌতূহল আমার আদৌ নেই। আমি যেটা জানতে চাই, তা তোমার অজানা।

– সেটা কী?

– যাদুগোপাল তার ধর্মপত্নীকে কতটা ডোবাচ্ছে! কারণ তার সঙ্গে আমারও ডুবে যাবার আশাঙ্কা।