রিস্তেদারের কাঁটা – ১৫

পনের

সেশন্স-জাজ ঘোষ বিচারকের আসনে বসে দেখে নিলেন বাদী ও বিবাদী পক্ষের উকিলেরা উপস্থিত কিনা। তারপর ঘোষিত হল: বিলাসসিং যাদবের হত্যা মামলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনাম শ্রীস্মরণিকা সেন ওরফে শ্রীস্মরণিকা দত্তের মামলা শুরু হচ্ছে।

পালিক প্রসিকিউটরের তরফে ট্রায়াল ডেপুটি শ্রীহরেন মল্লিক ইতিপূর্বেই ওকালতনামা দাখিল করেছেন। উঠে দাঁড়িয়ে একটি ‘বাও’ করে তিনি বলেন, আদালত অনুমতি করলে আমি একটি প্রারম্ভিক ভাষণ দিয়ে কেসটা শুরু করতে পারি।

জজ-সাহেব ঘোষ বললে, এ জাতীয় প্রাথমিক হিয়ারিঙে প্রারম্ভিক ভাষণ নিষ্প্রয়োজন।

হরেন মল্লিক বললেন, কেসটা যেহেতু জটিল, অনেক শাখা-প্রশাখায় কিছুটা দুর্বোধ্য, তাই আমাদের মনে হচ্ছিল একটি প্রারম্ভিক ভাষণ আদালতের কাজ সুবিধা করে দেবে।

বাসু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমাদের আপত্তি নেই।

ঘোষ-সাহেব বললেন, ঠিক আছে। তবে অনুগ্রহ করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেবেন।

হরেন মল্লিক আবার একটি ‘বাও’ করে বললেন, আমার মনে থাকবে, য়োর অনার। অত্যন্ত সংক্ষেপেই কেসটা নিবেদন করি: প্রতিবাদী শ্রীমতী স্মরণিকা দত্ত ওরফে সেন কিছুদিন আগে পর্যন্ত মনে করতেন যে, তিনি নিউ আলিপুরের বাসিন্দা শ্রীসত্যানন্দ সেনের ভ্রাতুষ্পুত্রী। আজন্ম স্মরণিকা দেবী ঐ বাড়িতেই মানুষ হয়েছেন ঐ পরিচয়ে। তিনি তাঁর জেঠার দেখাশোনা করতেন। বর্তমানে শ্রীসেন সত্তর বছরের বৃদ্ধ। শারীরিক ও মানসিক ভাবে অশক্ত। সেই সুযোগে প্রতিবাদী শ্রীমতী সেন ধীরে ধীরে বৃদ্ধের সমস্ত সম্পত্তি গ্রাস করবার একটি পরিকল্পনা করেন। এই সময়ে ঘটনাচক্রে শ্রীসেনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা শ্রীধনঞ্জয় চৌবে সস্ত্রীক ধানবাদ থেকে কলকাতায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে আসেন শ্রীচৌবের বন্ধু শ্রীবিলাসসিং যাদব। ওঁরা এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন: বৃদ্ধ সত্যানন্দের অবস্থা দেখে! আলমারির চাবি, ব্যাঙ্কের খাতাপত্র সব কিছুই ইতিমধ্যে অসহায় বৃদ্ধের কাছ থেকে প্রতিবাদী কব্জা করে ফেলেছেন…

বিচারক শ্রীঘোষ বাধা দিয়ে বলেন, আপনি ওটা কী বললেন তখন? প্রতিবাদী ‘মনে করতেন’ যে, তিনি ওঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী? ডিড য়ু সে দ্যাট?

– ইয়েস, য়োর অনার। আমি সেকথাই বলেছি। সে প্রসঙ্গে এখনি আসব। এই পর্যায়ে শ্রীচৌবে প্রতিবাদিনীকে বলেন মাস দু-তিনের জন্য বিশ্রাম নিতে। একথা স্বীকার্য যে, ‘তথাকথিত জেঠুর’ সেবা করতে করতে মেয়েটি সত্যিই কাহিল হয়ে পড়েছিল। শ্রীচৌবে উৎসাহ করে প্রতিবাদিনীর পাসপোর্ট ভিসা তৈরী করায়। লন্ডনে তার এক রিস্তেদারের বাড়িতে গেস্ট-হিসাবে প্রেরণ করে। এর কিছুদিন পরে শ্রীচৌবের আশঙ্কা হয় যে, শ্রীসত্যানন্দ সেন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ঐ প্রতিবাদিনীকে দিয়ে যেতে চান। শ্রীসেন ঐ মেয়েটির প্রভাবে এমনই মোহগ্রস্ত যে, দু-হাতে টাকা দিতেন। মোটা অঙ্কের চেক কেটে মেয়েটিকে ফুর্তি করতে দিতেন…

– ‘মোটা অঙ্কের চেক’ বলতে কী বোঝাতে চান?

– শেষ চেকটি, যেটা দেখে শ্রীচৌবে আর স্থির থাকতে পারলেন না, সেটা ছিল সওয়া লক্ষ টাকার।

– কত টাকার?– মনে হল নিজের কানকেও বিশ্বাস করছেন না বিচারক।

– আজ্ঞে হ্যাঁ, নিউ-আলিপুরে গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কের উপর এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকার একটা বিয়ারার চেক। ‘পেয়ী’ ঐ স্মরণিকা!

জজ-সাহেবের আর ধৈর্যরক্ষা করা সম্ভবপর হল না। জানতে চাইলেন, ঐ মেয়েটি কি ওঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী?

– আজ্ঞে না, য়োর অনার। সেন পরিবারের সঙ্গে ওঁর কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই। ওঁর গর্ভধারিণী হচ্ছেন স্বর্গগতা শান্তিরানী দত্ত। তিনি ছিলেন শ্রীসত্যানন্দের বাড়ির গভর্নেস। প্রতিবাদিনীর পিতৃপরিচয় আমরা জানি না। শ্রীসত্যানন্দ সেন ওঁকে ভাইঝির মতো মানুষ করেন এবং মিথ্যা করে প্রতিবাদিনীকে বলেন যে, তিনি তাঁর জেঠামশাই। সে যাই হোক, প্রতিবাদিনীর বিদেশ যাত্রার পরেই শ্রীসেনের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। শারীরিক এবং মানসিক। ওঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা তখন তাঁকে একটি মানসিক হাসপাতাল বা স্যানিটেরিয়ামে স্থানান্তরিত করেন। একই সঙ্গে শ্রীচৌবে অশক্ত বৃদ্ধের জন্য একজন ‘কনজারভেটর’ নিযুক্তির জন্য আদালতে আবেদন করেন এবং একটি কোর্ট-অর্ডারে সেটি কার্যকরীও হয়…এই পর্যায়ে প্রতিবাদিনী বিলেত থেকে ফিরে আসেন। বৃদ্ধের সম্পত্তি-গ্রাসের পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়ে গেছে বুঝতে পেরে তিনি এক হীন চক্রান্ত করেন। যে প্রতিষ্ঠানে বৃদ্ধ চিকিৎসাধীন ছিলেন সেই ‘শান্তিধামে’ নাম ভাঁড়িয়ে একটা চাকরি যোগাড় করেন…

জজ-সাহেব ঘোষ বলেন, এ-কথা প্রমাণ করতে পারবেন?

– পারব, য়োর অনার। ‘শান্তিধাম স্যানিটেরিয়াম’-এর অন্তত সাতজন সাক্ষী প্রতিবাদিনীকে সনাক্ত করবে যে, তিনি ‘কল্যাণী দাসী’র ছদ্মনামে ওখানে চাকরি নিয়ে ঢুকেছিলেন এবং পরদিনই বৃদ্ধকে অপহরণ করে সরিয়ে ফেলেন। শ্রীমতী স্মরণিকা বৃদ্ধকে ডায়মন্ড-হারবার রোডে অবস্থিত একটা মোটেলে নিয়ে যান। স্বনামে একটি ঘর বুক করেন। বৃদ্ধকে লুকিয়ে রাখেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দু-তরফা। প্রথমত, আদালত ইতিমধ্যে ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্তকে নিযুক্ত করেছেন শ্রীসত্যানন্দ সেনকে পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে। ডক্টর দাশগুপ্ত সে-কাজ সম্পন্ন করলে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হত যে, শ্রীসত্যানন্দ সেন একটি মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন। যাকে বলা হয়: ‘সেনাইল ডিমেনশিয়া’। প্রতিবাদিনীর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল ডাক্তারী পরীক্ষায় উনি মানসিকভাবে অসুস্থ প্রমাণিত হবার পূর্বেই তাঁকে দিয়ে একটা উইল তৈরী করিয়ে নেওয়া। সে যাই হোক, আমরা ‘সাকমিস্ট্যান্সিয়াল এভিডেন্স’ থেকে প্রমাণ করব যে, শ্রীচৌবের বন্ধু স্বর্গত বিলাসসিং যাদব কোনক্রমে জানতে পারে প্রতিবাদী কোথায় বৃদ্ধকে লুকিয়ে রেখেছেন। সে একটি গাড়ি ভাড়া করে ঐ মোটেলে হানা দেয়; কিন্তু তার পূর্বেই প্রতিবাদিনী শ্রীসেনকে সুকৌশলে কোনও অজ্ঞাতস্থানে সরিয়ে ফেলেন। বিলাসসিং ওখানে পৌঁছে বৃদ্ধের দেখা পায় না। সে প্রতিবাদিনীকে বলে, এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া তাঁর অত্যন্ত অন্যায় হচ্ছে। প্রতিবাদিনী ঐ সময় কিছু চাইনীজ ফুড কিনে এনে সবে খেতে বসেছিলেন, তিনি বিলাসসিংকে খাদ্যের ভাগ নিতে আমন্ত্রণ করেন। বিলাস রাজি হয়। দুজনে খাবার ভাগ করে খেতে খেতে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু এই অবকাশে প্রতিবাদিনী বিলাসের খাদ্যাংশে কিছু কাম্পোজ ট্যাবলেট মিশিয়ে দিতে সক্ষম হন। বিলাস অনতিবিলম্বেই ঘুমিয়ে পড়ে। তখন প্রতিবাদিনী নিজের গাড়ির অ্যাডজাস্টের রেন্যন্ত্রটা নিয়ে এসে একটি গ্যাস-পাইপের জোড়াই খুলে দিয়ে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে পালিয়ে যান। ঘুমন্ত বিলাসের কিছু করার ছিল না। বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসবুদ্ধ হয়ে সে মারা যায়।

এবারও ধৈর্যহারা হয়ে জজ-সাহেব প্রশ্ন করেন, সেই বৃদ্ধ, অর্ধোন্মাদ সত্যানন্দ সেন বর্তমানে কোথায়?

– তাঁর সন্ধান কেউ জানে না, য়োর অনার। পুলিশ তাঁকে খুঁজে পায়নি। হয়তো তিনি জীবিত নেই। পুলিশ প্রতিবাদিনীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল, কিন্তু তিনি কোনও উত্তর দিচ্ছেন না। বস্তুত তাঁর উকিলের পরামর্শেতিনি পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃত। অথচ মজার কথা এই যে, আমরা দেখছি: নিরুদ্দেশ হবার অব্যবহিত পূর্বে শ্রীসত্যানন্দ সেন– যিনি ‘সেনাইল ডিমেনশিয়ার’ অর্ধোন্মাদ রুগী – তিনি একটি স্বহস্ত-লিখিত উইলে পাকা-বয়ানে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ঐ রক্তের-সম্পর্ক-বহির্ভূত প্রতিবাদিনীকে নির্ব্যঢ়-স্বত্ত্বে দান করে গেছেন!

জজ-সাহেব ঘোষ অগ্নিদৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে দেখলেন প্রতিবাদিনীর দিকে। তারপর গম্ভীরভাবে বললেন, য়ু মে প্রসীড উইথ দ্য কেস!

বাসু উঠে দাঁড়ালেন। সবিনয়ে জানতে চাইলেন, প্রতিবাদিনীর তরফে আমি কোন প্রারম্ভিক ভাষণ দিতে পারি কি? কেস শুরু হবার আগে?

– নিশ্চয়, নিশ্চয়। আপনি যদি তাই চান– বললেন সেশনস জাজ।

বাসু তাঁর প্রারম্ভিক ভাষণ শুরু করেন:

– সহযোগী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, প্রারম্ভিক ভাষণে এই কেসটার জটিলতা সরল করে দেবেন। কিন্তু আমরা দেখছি, তিনি একটি সরল ‘কেস’কে বাগবিস্তারের মাধ্যমে জটিল করে তুলেছেন। আমরা এখানে সমবেত হয়েছিলাম এই বিশ্বাসে যে, আমাদের মূল লক্ষ্য বিলাসসিং যাদব নামে এক ব্যক্তির হত্যায় স্মরণিকা সেনের হাত থাকতে পারে কিনা তাই যাচাই করা। সহযোগীর ভাষণে ঐ হত্যাকাণ্ড এবং তাতে প্রতিবাদিনীর ভূমিকার কথা ছিল সামান্যই-ওঁর বক্তব্যের সিংহভাগ অধিকার করে আছে কপোল-কল্পনায় ঘটনার বিকৃতি ঘটিয়ে স্মরণিকার চরিত্রহননের প্রচেষ্টা। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে সে-সব প্রসঙ্গে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে–

– আমরা প্রমাণ করব: শতাব্দীর একপাদকাল – মানে দীর্ঘ পঁচিশ বছর, শ্রীধনঞ্জয় চৌবে তাঁর বৈমাত্রেয় দাদার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। কিন্তু যেই মাত্র শুনলেন যে, দাদার সম্পত্তিটা লোভনীয় হয়েছে অমনি তিনি সস্ত্রীক এখানে এসে খুঁটি গেড়ে বসলেন। আমরা প্রমাণ’করব: এই পঁচিশ বছরের ভিতর দুই ভাইয়ের পত্রালাপ ছিল না, এমন কি বিজয়ায়, নববর্ষে বা দেওয়ালীতে দুই বৈমাত্রেয় ভ্রাতার ভিতর কুশল বা পত্র বিনিময় হয়নি; কিন্তু শ্রীধনঞ্জয় চৌবে তাঁর দাদার পঁচিশ বছর পূর্বেকার একটি বিশেষ পত্র – যাতে স্মরণিকার জন্মবৃত্তান্ত জানিয়ে বৈমাত্রেয় ভাইকে গোপনতা রক্ষা করতে অনুরোধ করেছিলেন– সেই চিঠিখানি সযত্নে পঁচিশ বছর ধরে সঞ্চয় করে রেখেছিলেন। তাতে ন্যাপথলিন আর ডি.ডি.টি.-পাউডারের গন্ধ। অর্থাৎ শ্রীচৌবে জানতেন, ঐ পত্রখানি একটি মারাত্মক দলিল! স্মরণিকাকে বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার প্রয়োজনে একদিন-না-একদিন সেটা কাজে লাগবে। মাস তিন-চার আগে কলকাতা এসে যখন দেখলেন শ্রীসেন সুস্থ মস্তিষ্কে ঐ মেয়েটিকেই– সে ওঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী হোক-বা-না-হোক-তাঁর সম্পত্তি উইল করে দিয়ে যেতে চান, তখন চৌবে-দম্পতি একটি নারকীয় পরিকল্পনা ফাঁদলেন। প্রতিব্বাদিনীকে বিলেতে পাঠিয়ে দিলেন। দেখা যাচ্ছে, স্মরণিকা বিলেত যাবার অব্যবহিত পরে ঠিক যখন শ্রীচৌবের স্ত্রী, মিসেস্ চৌবে, বৃদ্ধের সেবাযত্বের ভার নিলেন তার পরেই – শ্রীসত্যানন্দ সেন অসুস্থ হয়ে পড়েন।শারীরিক ও মানসিক ভাবে।.আমরা আরও প্রমাণ করব যে, সত্যানন্দ আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতার স্ত্রী – যিনি একজন ট্রেইন্ড-নার্স, এবং যিনি স্মরণিকাকে দূরে পাঠানোর পর ওঁকে নানারকম ইনজেকশন-ঔষধ দিয়ে চলেছেন– তাঁর সেবাযত্নে উনি দুদিনেই বদ্ধোন্মাদ হয়ে যাবেন…

হরেন ঘোষাল উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, অবজেকশন, য়োর অনার! এ অভিযোগ সর্বের মিথ্যা!

বাসু বিচারকের দিকে ফিরে বলেন, আমি তো কোনও অভিযোগ আনিনি। আমি বলেছি, শ্রীসত্যানন্দ সেন ঐরকম আশঙ্কা করেছিলেন। ‘আশঙ্কা ‘টা সত্যও হতে পারে, নাও পারে। কিন্তু সত্যানন্দ যে ঐরকম আশঙ্কা বাস্তবে করেছিলে, তার প্রমাণ আমি দেব। রজ্জুতে সর্পভ্রম হলে ‘ভীতি’টা মিথ্যা হয়ে যায় না!

দায়রা জাজ বলেন, ‘অবজেকশন ওভাররুল্ড’। প্রারম্ভিক ভাষণে এ-জাতীয় ‘অবজেকশন’আদালত বাঞ্ছনীয় মনে করেন না। য়ু মে প্রসীড, মিস্টার ডিফেন্স কাউন্সেল!

বাসু বলতে থাকেন, ঐরকম আশঙ্কা হওয়ায় তিনিতিবাদিনীকে একটি সওয়া-লক্ষ টাকার চেক পাঠিয়ে আদেশ করেন টাকাটা ভাঙিয়ে আমার কাছে গচ্ছিত রাখতে। ওঁর বৈমাত্রেয় ভাই ও ভাই-বউ যদি ওঁকে ‘ইন্কম্পিটেন্ট’-রূপে প্রমাণ করতে চান, তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কব্জা করে নেন, তাহলে যাতে প্রতিবাদিনী ওঁকে উদ্ধার করতে পারেন।..কিন্তু এসব আলোচনা বর্তমান ‘কেস’-এর সঙ্গে খুব একটা সম্পর্কযুক্ত নয়। আমরা বিলাসসিং যাদবের মৃত্যু কেমন করে হল সে বিষয়েই এখানে অনুসন্ধান করতে বসেছি। আমরা প্রমাণ করব: ঘটনার দিন প্রতিবাদিনীর অনুপস্থিতিতে বিলাসসিং বৃদ্ধের কাছে আসে। সত্যানন্দকে বলে যে, সে একাই জানতে পেরেছে ‘শান্তিধাম’ থেকে পালিয়ে এসে উনি কোথায় লুকিয়ে আছেন। ধনঞ্জয় অথবা পুলিশ তা জানে না। বিলাস প্রস্তাব দেয়, তাকে নগদ এক লক্ষ টাকা দিলে সে গোপনতা রক্ষা করবে, নচেৎ সে পুলিশে খবর দেবে, যাতে আবার ঐ বৃদ্ধকে শান্তিধামের খাটে স্ট্র্য্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। আমরা প্রমাণ করব: ঐ সময় মরিয়া হয়ে শ্রীসত্যানন্দ সেন ওর খাবারে কাম্পোজ ট্যাবলেট মিশিয়ে দেন, যাতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। এ-ছাড়া ওর হাত থেকে মুক্তির আর কোনও পথ খুঁজে পাননি অসহায় বৃদ্ধ।বিলাস সিং খাবারটা খেয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। সত্যানন্দ সেই সুযোগই খুঁজছিলেন। তার বহু পূর্বেই প্রতিবাদিনী ঘটনাস্থল ত্যাগ করে গেছে, নাহলে যে গাড়িতে তিনি ঐ মোটেলে এসেছিলেন সেই গাড়িতেই সত্যানন্দ নিশ্চয় পালাবার চেষ্টা করতেন। তখন বাধ্য হয়ে বিলাস সিং-এর পকেট হাতড়ে ‘রেন্ট-আ-কার সার্ভিসের’ গাড়ির চাবিটি উদ্ধার করেন। সেই গাড়ি চালিয়ে উনি স্বেচ্ছায়, নিজের উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় দমদম এয়ারপোর্টে চলে যান। ইন্ডিয়ান এয়ার-লাইন্স-এর একটি টিকিট কেটে কলকাতা ত্যাগ করে যান। পরদিন পুলিশ ঐ মটোর-গাড়িটা এয়ারপোর্টের পার্কিং-লটে উদ্ধার করে। আমরা প্রমাণ করব: সত্যানন্দের মোটেল ত্যাগের পরে একজন তৃতীয় ব্যক্তি ঐ ঘরে প্রবেশ করে। নিদ্রিত বিলাস সিংকে দেখতে পায়। সে বিলাস সিং-এর মৃত্যুকামী। সে গ্যাস-পাইপের প্যাঁচটা খুলে দিয়ে দরজাটা টেনে দিয়ে নিঃশব্দে চলে যায়।

বিচারক প্রশ্ন করেন, এটা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন?

– ইয়েস, য়োর অনার। যদিও আমার দায়িত্ব শুধু এটুকুই প্রমাণ করা যে, গ্যাস-পাইপের প্যাঁচ যে খণ্ড-মুহূর্তে খোলা হচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে প্রতিবাদিনী অকুস্থল থেকে অন্তত সাত-মাইল দূরে-যদু কলোনিতে!

ঘোষ-সাহেব মিনিটখানেক স্থিরদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর হরেন ঘোষালের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আপনার এক নম্বর সাক্ষীকে ডাকতে পারেন।

প্রথম সাক্ষী: প্রবীর ঘোষাল।

যথারীতি শপথ গ্রহণ করে সাক্ষীর মঞ্চ থেকে প্রবীর নিজের নাম, পরিচয়, পেশা ইত্যাদি জানালেন। জানালেন যে, ঘটনার দিন-তিনেক আগে থেকেই তিনি দুই-নম্বর ঘরে বাস করতেন।তিনি ঐ কারখানার সাপ্লায়ার। কিছু ‘এরিয়ার-বিল’-এর হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে তাঁকে ওখানে দু-তিন দিন থাকতে হয়। বললেন, যে, ঘটনার দিন প্রতিবাদিনী মিস্ সেন এবং একজন বৃদ্ধ যখন মোটেলে আসেন তখন তিনি দেখেছিলেন। ওঁরা ঠিক পাশের তিন-নম্বর ইউনিটটা ভাড়া করেন। তখন সকাল ছয়টা সওয়া ছয়টা হবে। তারপর সারাদিনই এখানে-ওখানে ঐ বৃদ্ধ এবং তরুণীকে তিনি দেখেছেন। ওঁর ধারণা হয়েছিল ওঁরা দাদু ও নাতনী। বৃদ্ধের সঙ্গে দু-একটি কথাও হয়। তা থেকে জানতে পারেন, প্রতিবাদিনীর ডাকনাম ‘টুকু’। সে যাই হোক, রাত দশটা-সওয়া দশটায় প্রবীর নিজে মোটেল-সংলগ্ন চীনা রেস্তোরাঁয় নৈশাহার করতে যান। আহারাদি করে ফিরে আসেন ঠিক এগারোটায়। তাঁর মনে আছে, কারণ তিনি ঘড়ি দেখেছিলেন। নিজের দু-নম্বর ইউনিটের দরজা খুলবার সময় তিনি ‘গ্যাস’-এর গন্ধ পান। প্রবীর দু-তিনদিন ঐ মোটেলে আছেন, তিনি ভাল-ভাবেই জানেন যে, মোটেল-ইউনিটে কোনও কিচেনেট বা গ্যাস-স্টোভ নেই। তাঁর তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে যায় ভূপালের গ্যাস দুর্ঘটনার কথা। তিনি নিচে নেমে আসেন। কোন লোকজন তাঁর নজরে পড়ে না। বাইরের বাতাসে গ্যাসের গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আবার দ্বিতলে উঠে যান। এবার তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয়, গন্ধটা ঐ তিন-নম্বর ইউনিট থেকেই আসছে। বারকতক কলবেল বাজান। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কাও দেওয়া হল। কিন্তু কারও সাড়া পাওয়া যায় না। তখন তিনি মোটেল-ম্যানেজারকে খবর দেন।

– তখন ঠিক কয়টা? – প্রশ্ন করেন হরেন ঘোষাল।

– আমি ঘড়ি দেখিনি। আন্দাজে মনে হয় এগারোটা পাঁচ-সাত হবে।

হরেন ঘোষাল বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বলেন, য়োর উইটনেস!

বাসু প্রশ্ন করেন, আপনি বলেছেন, পাশের ঘরে অর্থাৎ তিন-নম্বর ইউনিটে এক বৃদ্ধ এবং তরুণী উঠেছেন তা আপনি সকাল ছয়টার সময় লক্ষ্য করেন। এবার বলুন: ঐ বৃদ্ধকে শেষ কখন দেখেন এবং কোথায় দেখেন?

– ঐদিন বেলা চারটে নাগাদ, ডায়মন্ড-হারবার রোডের বাসস্ট্যান্ডে।

– আপনার সঙ্গে তাঁর কি কোন কথোপকথন হয়েছিল? হয়ে থাকলে কী কথোপকথন হয়েছিল?প্রবীর ইতিপূর্বে কৌশিককে যা বলেছে তারই পুনরাবৃত্তি করল। বেলা চারটের সময় সে তারাতলা মোড়ের কাছে বৃদ্ধকে নামিয়ে দেয়। তারপর সেখান থেকে তিনি কী করে দমদম যান, আদৌ যান কিনা, তা সে জানে না। প্রবীর আরও জানালো, বৃদ্ধের সঙ্গিনীকে – পরে জেনেছে সেই হচ্ছে ঐ প্রতিবাদিনী শ্রীমতী স্মরণিকা– সে দুপুরে বা বিকেলে দেখেনি।

পরবর্তী সাক্ষী মোটেলের ম্যানেজার সুশীল দত্ত। তার সাক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হল মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়েছে রাত এগারোটা নাগাদ। ডাক্তারবাবু অফিশিয়ালি তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন এগারোটা সাতে। এত শীঘ্র সেটা সম্ভবপর হয়েছিল এজন্য যে, মোটেলের অন্য একটি ইউনিটে ছিলেন একজন ডাক্তার যিনি চেঁচামেচি শুনে উঠে আসেন। দত্তের জবানবন্দীতে দুটি গাড়ির নম্বর, কে-কখন এসেছে তা জানা গেল। স্মরণিকা তার অ্যাম্বাসাডার গাড়ি ও বৃদ্ধ সহযাত্রীকে নিয়ে চেক-ইন করে সকাল ছয়টা বেজে তিন-মিনিটে। চার-নম্বর ইউনিটটি ভাড়া নেয় শঙ্করপ্রসাদ দোবে। পরে প্রমাণিত হয়েছে, তার আসল নাম বিলাসসিং যাদব। তার চেক-ইন টাইম সকাল ছয়টা সাতাশ।

বাসু সুশীল দত্তকে জেরা করলেন না।

সরকার পক্ষের তৃতীয় সাক্ষী ডক্টর অতুলকৃষ্ণ সান্যাল।

তাঁর মতে বিলাসসিং যাদব শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে অক্সিজেনের অভাবে। মৃত্যুসময়ে সে অঘোরে ঘুমে অচেতন ছিল, কারণ তার পাকস্থলীতে অর্ধজীর্ণ খাদ্যের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে ‘কাম্পোজ’-নামে একটি ঘুমের ওষুধ ছিল। ডাক্তার সান্যালের মতে মৃত্যুর সময় রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটা।

হরেন ঘোষাল বাসুকে বললেন, ঘু মে ক্রস হিম নাউ।

বাসু প্রশ্ন করেন, আপনি বলেছেন মৃত্যুর সময় রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটা। এটা কী-ভাবে নির্ধারণ করলেন? রিগার-মর্টিস্ দেখে? নাকি ওঁর পাকস্থলী বা অন্ত্রে অর্ধজীর্ণ খাদ্যের রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে?

– দ্বিতীয় পদ্ধতিতে।

– মৃতের পাকস্থলী ও অন্ত্রে কী-জাতীয় খাদ্য আবিষ্কার করেছেন?

– আমার মনে হয়েছে তা চাও-মিঙ এবং চিলি-চিকেন। আর কাম্পোজ।

– মৃতব্যক্তির পাকস্থলী ও অন্ত্রে যে অর্ধজীর্ণ খাদ্য পাওয়া যায় তা পরীক্ষা করে কি বলা যায় যে, ওটা ‘চাও-চাও’, না ‘চাও-মিঙ’ অথবা ‘ফুয়ো-মিঙ-চাও’? এবং প্রোটিন-অংশটা ‘চিলি-চিকেন’ অথবা ‘ফ্রায়েড-চিকেন উইথ চিলি’?

ডঃ সান্যাল একটু নড়ে-চড়ে বসলেন। ভেবে নিয়ে বললেন, ‘চাও-চাও’, ‘চাও-মিঙ’ আর ‘কুয়োমিঙচাও’-এর পার্থক্য ঠিক কী, তা আমি জানি না। পাকপ্রণালী বা রন্ধনবিদ্যায় আমি বিশেষজ্ঞ নই। আমিঐ নামগুলি বলেছি এজন্য যে, শুনেছি এই খাবারগুলি ঐ তিন-নম্বর ইউনিটে আনা হয়েছিল।

– আই সী! তার মানে বিশেষজ্ঞ হিসাবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফল নয়! লোকের কথায়, হেয়ার-সে রিপোর্টের ভিত্তিতে আপনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন?

ডঃ সান্যাল রুখে ওঠেন: এগুলোকে ‘হেয়ার-সে’ রিপোর্ট বলে না। মৃতের নাম যে ‘বিলাস’, প্রতিবাদিনীর নাম যে ‘স্মরণিকা’, একহিসাবে এও তো শোনা কথা। এমনকি আমার নাম যে ‘অতুলকৃষ্ণ’ তাও তো ঐ হিসাবে হলফ নিয়ে বলতে পারব না, যেহেতু আমার নামকরণের সময়…

– দ্যাটস্ অল! দ্যাটস্ অল্! এবার বলুন, খাদ্য গ্রহণের কতক্ষণ পরে মৃত্যু হয়েছে?

ডঃ সান্যাল প্রতিপ্রশ্ন করেন, কী জানতে চান? খাদ্য-গ্রহণের শুরু থেকে সময়টা ধরব, না খাদ্যগ্রহণ সমাপ্তির পর?

– খাদ্য-গ্রহণ সমাপ্তির পর?

– আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

– আহার করতে ওঁর কতক্ষণ লাগে বলে মনে হয়? জাস্ট য়োর গেস্!

– মিনিট পনেরো।.

– এবার বলুন, খাদ্য-গ্রহণের শুরু থেকে ধরলে তার কতক্ষণ পরে মৃত্যু হয়েছে?

হরেন ঘোষাল বলে ওঠেন, অবজেকশন, য়োর অনার! সহযোগী অহেতুক আদালতের সময় নষ্ট করছেন!

বিচারক বাসুর দিকে তাকাতে বাসু বলে ওঠেন, নো, য়োর অনার। আমি দেখাতে চাইছি, বর্তমান সাক্ষী পুলিশের একটি বিশেষ থিয়োরীকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পূর্ব-সিদ্ধান্ত-অনুযায়ী সাক্ষ্য দিচ্ছেন, বিশেষজ্ঞ হিসাবে মহামান্য আদালতকে সত্য-নির্ধারণে সাহায্য করতে নয়। আমি যখন প্রশ্ন করলাম, খাদ্য-গ্রহণের কতক্ষণ পরে মৃত্যু হয়েছে তখন ওঁর প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘খাদ্য-গ্রহণের শুরু থেকে সময়টাধরব, না সমাপ্তির পর’? এ-প্রশ্ন যিনি জিজ্ঞাসা করছেন তিনি নিশ্চিয় তাঁর অসংখ্য রোগীকে ব্লাড-সুগার করাতে নির্দেশ দেন, ‘আহারের দুইঘণ্টা পরে ব্লাড দেবেন’। ব্যাখ্যা করে বলেন না, শুনুন মশাই, সময়টা আহার্যগ্রহণের শুরু থেকে ধরবেন না, আঁচানোর পর থেকে ধরবেন। আমি যখন ব্যাখ্যা করে বললাম, আহার্যগ্রহণের পর থেকে সময়টা ধরতে, তখন ওঁর জবাব হল ‘আধঘন্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট’। এখন আমি জানতে চাই, এবার ওঁর জবাব কী হবে? সেই আন্দাজিক্যালি ‘আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট?’ অথবা পনের-মিনিট এদিক-ওদিকে যোগ করা? সেই উত্তর থেকে বোঝা যাবে সাক্ষী অকপটে তাঁর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের মাধ্যমে আদালতকে সাহায্য করতে প্রস্তুত অথবা পুলিশ যেভাবে সাক্ষ্য দিতে বলেছে…

বিচারক ঘোষ বলেন, অবজেকশন ওভাররুলড। অ্যানসার দ্যাট কোশ্চেন।

ডঃ সান্যাল বললেন, আন্দাজে ঐ রকমই বলা যেতে পারে, আধঘণ্টা থেকে পৌনে একঘন্টা।

– আহার-কার্য শুরু থেকেও তাই, সমাপ্তি থেকেও তাই? পনের মিনিট গ্যাপ্? তাহলে কেন জানতে চেয়েছিলেন, শুরু থেকে বলবেন না সমাপ্তি থেকে?

হরেন ঘোষাল আবার দাঁড়িয়ে উঠছে দেখে বলেন, অল রাইট! আই উইথড্র! ও প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না আপনাকে। এবার বলুন ডাক্তার সান্যাল, আপনার সুচিন্তিত অভিমত মৃত্যু রাত দশটার আগে হতে পারে না, কেমন তো?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই।

– আমি যদি বলি মৃত্যু হয়েছে, দশটা বাজতে পাঁচে?

– ‘দশটা’ মানে ‘দশটা বাজতে পাঁচ’ হতে পারে বৈকি!

– না, তাহলে চলবে না। আপনি এক্সট্রিম্ লিমিটটা বিশেষজ্ঞ হিসাবে দয়া করে ঘোষণা করুন।

ডক্টর সান্যাল বললেন, সাড়ে নয়টার আগে কিছুতেই নয়।

– ধরুন, নয়টা আঠাশ?

ডক্টর সান্যাল রুখে ওঠেন, না!

– নয়টা ঊনত্রিশ?

– এ কি মাছের বাজার পেয়েছেন নাকি? বলছি তো, না!

– নয়টা একত্রিশ?

হরেন ঘোষাল আবার দাঁড়িয়ে ওঠেন: অবেজকশন য়োর অনার! সহযোগী ক্রমাগত অহেতুক আদালতের সময় নষ্ট করছেন। সাক্ষী বিশেষজ্ঞ হিসাবে ইতিপূর্বেই বলেছেন– এক্সট্রিম লিমিট সাড়ে নয়টা। তারপর…

– অবকশান সাসটেইনড্।

– দ্যাটস্ অল, য়োর অনার! আমার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই।

এরপর হরেন ঘোষাল একের পর এক সাক্ষী মঞ্চে তুলতে থাকেন। প্রথমেই ডক্টর নিত্যানন্দ রথ। তিনি তাঁর সাক্ষ্যে বর্ণনা দিলেন কীভাবে প্রতিবাদিনী কল্যাণী দাসীর পরিচয়ে শান্তিধাম স্যানিটেরিয়ামে চাকরি নেয়, এবং ডায়মন্ড-হারবার থেকে জামা-কাপড় আনতে যাবার ছুতো করে ছুটি নিয়ে সরে পড়ে। যাবার সময় সত্যানন্দ সেনকে অপহরণ করে। নিত্যানন্দের মতে– শ্রীসত্যানন্দ যে অসুখে ভুগছিলেন তার নাম ‘সেনাইল ডিমেনশিয়া’র প্রাথমিক অবস্থা। তিনি আশা করেছিলেন ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্ত তাঁর ডায়াগনসিস্কনফার্ম করবেন। প্রতিবাদিনী মাঝখান থেকে রুগীকে অপহরণ করায় সেটা করা যায়নি।

বাসু-সাহেব তাঁকে ক্রস-এগজামিন আদৌ করলেন না।

পরবর্তী সাক্ষী পুলিশ ল্যাবরেটারির একজন রসায়নবিদ। তাঁকেও ক্রস করলেন না বাসু-সাহেব। তাঁর সাক্ষ্যে প্রমাণিত হল তিন-নম্বর ইউনিটে প্রাপ্ত বাথরুমের মগের ভিতর দিকে এবং একটি টুথপেস্টের খোলের বাইরের দিকে কাম্পোজ ঔষধের চূর্ণ পাওয়া গেছে। বেশ বোঝা যায়, কেউ ঐ মগটাকে ‘খল’ আর টুথপেস্টের শক্ত খোলটাকে ‘নুড়ি’ হিসাবে ব্যবহার করে কাম্পোজ ট্যাবলেট গুঁড়ো করেছিল।

বাসু নিমীলিত নেত্রে এইসব সাক্ষীর বক্তব্য শুনে গেলেন। মাঝ মাঝে মনে হচ্ছিল তিনি নিদ্রাভিভূত। মোটকথা কাউকেই উনি ক্রস করলেন না। তার পরবর্তী সাক্ষী মঞ্চে উঠে শপথ নিতেই সোজা হয়ে বসলেন বাসু-সাহেব।

ইন্সপেক্টর বরাট শপথ নিয়ে তার প্রাথমিক তদন্তের বর্ণনা দিল। স্থানীয় থানা টেলিফোন পায় রাত এগারোটা বাইশে। বরাট একজন জুনিয়ার ও দুটি কন্সটেব্ল নিয়ে অকুস্থলে উপনীত হয় রাত বারোটা সতেরোয়। অত রাত্রে তারা বিশেষ কিছু করতে পারে না। প্লাম্বারের সাহায্যে শর্ট-পীসটা এঁটে দিয়ে স্টপ-ককের চাবি খুলে দিয়ে, আর ঘরটা তালাবন্ধ করে ফিরে আসে। পরদিন খুব ভোরে ওরা আবার যায়। লেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে। মোটেলের রেজিস্টারের ফটো কপি করে। মৃতদেহ সনাক্ত করায় এবং অপসারণ করে। বরাট আরও জানায়, মৃতদেহ সনাক্ত হবার আগেই প্রতিবাদীর উকিল দুখানা গাড়ি নিয়ে অকুস্থলে হাজিরা দেন। তার সঙ্গে বাসু-সাহেবের কী কথোপকথন হয়েছিল সে-কথাও বিস্তারিত জানায়। স্বীকার করে যে, বাসু-সাহেবের গাড়ির পিছনের সীটে দুজন মহিলা ছিলেন। কিন্তু বরাট তাদের লক্ষ্য করে দেখেনি। না, সে হলপ নিয়ে বলতে পারবে না যে, ওদের মধ্যে একজন ঐ প্রতিবাদিনী! সেই মেয়েটির বয়স কত, কী পোশাকে ছিল, কী করছিল সে ইত্যাদি হরেন ঘোষালের প্রত্যেকটি প্রশ্নের জবাবেই বরাট জানালো: তার মনে নেই। সে লক্ষ্য করে দেখেনি। তবে তার আধঘণ্টা পরে যদু কলোনীতে ঠিকানা খুঁজে-খুঁজে গীতা করের বাসায় উপস্থিত হয়ে যখন সে মিস্টার পি. কে. বাসুকে প্রতিবাদিনীর সঙ্গে কথা বলতে দেখে তখন তার সন্দেহ হয়েছিল– ঐ মেয়েটিকেই সে আধঘণ্টা আগে দেখেছে! না – একথা সে হলপ নিয়ে বলতে পারবে না – এ তার আন্দাজ মাত্র।

ইন্সপেক্টর বরাটের দীর্ঘ জবানবন্দি শেষ হবার পর বাসু উঠে দাঁড়ালেন তাকে ক্রস-একজামিন করতে: ইন্সপেক্টর বরাট, আপনি আপনার জবানবন্দিতে বলেছেন যে, ঐ তিন-নম্বর ঘরে একটি গ্যাস-পাইপের প্যাঁচ খুলে দেওয়ায় বদ্ধ ঘরে অক্সিজেনের অভাবে বিলাসসিং মারা যায়। তাই না?

– হ্যাঁ, তাই বলেছি আমি।

– এবং আপনার বিশ্বাস বিলাসসিং ঘুমিয়ে পড়ার পর পাইপটা খোলা হয়। তাই তো?

– নিশ্চয়। বিলাস জেগে বসে আছে আর দেখছে তার চোখের সামনে কেউ গ্যাস-পাইপ খুলছে, যাতে সে মরতে পারে– এমন কল্পনা করা কি সঙ্গত?

– তা নয়, আমি ভাবছিলাম: বিলাস যদি নিজেই পাইপটা খুলে দিয়ে থাকে তাহলে সে তা করেছে ঘুমিয়ে পড়ার আগে…

– নিজেই পাইপটার প্যাঁচ খুলে দিয়েছে? কেন?

– ধরা যাক। আত্মহত্যা করতে?

বরাট হাসল। বিজয়ীর হাসি। বললে, যে অস্ত্রের সাহায্যে মৃত্যু ঘটানো হয় সেই অস্ত্রটি যখন অকুস্থলে খুঁজে পাওয়া যায় না তখন আমরা আত্মহত্যার সম্ভাবনাটাকে বাতিল করে থাকি, স্যার।

– অস্ত্র? এখানে তো ছোরা-ছুরি-রিভলভারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়নি!

– তা হয়নি। তবে একটা ‘অ্যাডজাস্টে পাইপ-রেন্’-এর প্রয়োজন ছিল অনিবার্য। খালি হাতে ঐ পাইপ কেউ খুলতে পারে না।

– আহ্ ইয়েস! ‘অ্যাডজাস্টেব্ল পাইপ-রেন্জ’। তার সাহায্য ছাড়া ঐ পাইপের জোড়াই খোলা যায় না। তাই নয়?

– হ্যাঁ, তাই।

– খুব জোর লাগে নিশ্চয়? দৈহিক শক্তির কথা বলছি!

বরাট হাসল। বলল, তা লাগে। তবে যদি জানতে চান যে, একজন বিশ-পঁচিশ বছরের সুস্থ-সবল তরুণীর দৈহিক ক্ষমতায় তা সম্ভব কিনা, তাহলে…

– না, ইন্সপেক্টর! আমি সে-কথা জানতে চাইনি আদৌ। আমি বরং জানতে চাইছি: খুব জোর দিয়ে ঘোরাতে হলে অ্যাডজাস্টেব্র-রেন্ডাকে খুব কষে সাঁটতে হবে। ফলে পাইপে তার দাঁতের দাগ থেকে যাবার কথা। তাই না?

– হ্যাঁ, তাই।

– সেই রকম দাগ দেখতে পেয়েছিলেন বলেই আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আততায়ী একটি ‘অ্যাডজাস্টেবল-রেঞ্চ’-এর সাহায্যে ঐ শর্ট-পীসটা খুলে ফেলেছিল। তাই নয়?

– ঠিক তাই।

– ও; কে.! আপনি কি ক্লোজ-আপ অ্যাটাচমেন্ট লাগিয়ে ঐ শর্ট-পাইপটার দাগের ফটোগ্রাফ নিয়েছিলেন?

– ফটোগ্রাফ? ফটো নেব কেন?

– নিয়েছিলেন কিনা তাই শুধু জানতে চাইছি। ‘কেন’ করবেন সেটা পরের কথা।

– না, নিইনি।

– তার মানে বাজার থেকে ঐ মাপের একটি শর্ট-পীস কিনে এনে আপনি লাগিয়ে দেন আর সেই ‘দাগী’ শর্ট-পীসটিকে এভিডেন্স হিসাবে সংগ্রহ করেন?

– আজ্ঞে না। তা করতে যাব কেন?

– আবার আপনি ‘কেন-কেন’ করছেন! আমি যা জানতে চাই শুধু তার জবাব দিন। আপনি কি ঐ দাগগুলো মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে পরীক্ষা করেছিলেন?

– মাইক্রোস্কোপ! কেন? আই মীন: না, করিনি!

– কোন বড় ম্যাগ্মনফাইং গ্লাসের সাহায্যে?

– আজ্ঞে না, মশাই। খালি চোখেই দেখা যাচ্ছিল ‘রেঞ্চ’ দিয়ে চেপে ধরায় পাইপে দাগ পড়েছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেউ সেটা সম্প্রতি প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুলেছে। ম্যাগনিফাইং গ্লাস ছাড়াই তা দেখা যাচ্ছিল।

– আপনি কি কর্নেল চার্লস অগাস্টাস লিন্ডবার্গ-এর নাম শুনেছেন?

বরাট নির্বাক তাকিয়ে আছে দেখে লাফিয়ে ওঠেন হরেন ঘোষাল: অবেজ্ঞকশন, য়োর অনার। ইন্‌ম্পিটেন্ট, ইম্মেটিরিয়াল অ্যান্ড অ্যাবসার্ড! নো ফাউন্ডেশন হ্যাজ বিন লেইড!

বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে ফিরলেন। বাসু-সাহেব ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন: কর্নেল লিন্ডবার্গ একজন বিশ্ববিখ্যাত বৈমানিক। ঊনিশশ সাতাশ সালে একা একটা প্লেন নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে প্যারী পাড়ি দিয়ে বিশ্বরেকর্ড করেন। তাঁর এক বছর বয়সের পুত্রকে একজন অপহরণ করে কয়েক লক্ষ ডলার ‘র‍্যানসম মানি’ দাবী করে। মাস্টার লিন্ডবার্গ ছিলেন দোতলার ঘরে। তাই অপহরণকারী একটি কাঠের মই নিয়ে এসে বাইরে থেকে জানলা খুলে ঘরে ঢোকে। ঘটনাচক্রে মইটা ভেঙে যায়। অপহরণকারী লিন্ডবার্গের শিশুটিকে নিয়ে এবং মইটাকে ফেলে পালিয়ে যায়।…পরে মার্কিন গোয়েন্দা-বিভাগ ঐ কাঠের মই-য়ের সূত্র থেকে আবিষ্কার করে আততায়ী কোন কাঠগোলা থেকে মইটা কিনেছিল।

জজসাহেব খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছিলেন। বলেন, সেটা কেমন করে?

– প্রতিটি টাইপরাইটারের, প্রতিটি রিভলভারের যেমন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে তেমনি প্রতিটি করাত-বাটালি-প্লেনযন্ত্রেই তা থাকে কিনা তা বিজ্ঞান এখনো জানে না; কিন্তু যন্ত্রে যদি কোনও ‘ডিফেক্ট’ থাকে – ভাঙা দাঁত থাকে তবে তা টের পাওয়া যায়।…যুক্তির খাতিরে ধরা যাক তিন-নম্বর ইউনিটের শর্ট-পীসে কোন দাঁতের দাগ নেই এবং পুলিশ প্রতিবাদিনীর যে গাড়িটা সীজ করেছে তার ভিতর বড় রেঞ্চ-যন্ত্রটার একটা দাঁত ভাঙা। তাহলে আমরা ডিফেন্সের তরফ থেকে বলতে পারব: প্রতিবাদিনী তার গাড়ির যন্ত্র ব্যবহার করে ঐ পাইপ খোলেনি।

ঘোষ সাহেব বললেন:আ! নাউ আই রিমেম্বার! চার্লস লিন্ডবার্গের শিশু-অপহরণকারী শেষমেশ ধরা পড়ে আর তার ডেথ্-সেন্টেন্স হয়!

– ইয়েস, য়োর অনার! এবং পুলিশ যেসব যুক্তি দেখিয়েছিল তার অন্যতম ছিল ঐ ভাঙা মইয়ে ব্যবহৃত প্লেন-যন্ত্রের ফোগলা দাঁতের দাগ!

জজসাহেব সম্মতিসূচক শিরশ্চালন করে বললেন, অবজেকশন ওভাররুলড্। আনসার দ্যাট কোশ্চেন!

বরাট অকপট জবাব দিল : ইয়েস স্যার, আপুনি যখন প্রশ্ন করেন তখন আমি জানতাম না কর্নেল লিন্ডবার্গ কে; কিন্তু এখন আমি তা জানি সেটা কথা নয়, কথা হচ্ছে: আমি স্বীকার করছি – ইনভেস্টিগেটিং অফিসার হিসাবে ঐ পাইপের টুকরোটা আমারা সংগ্রহ করা উচিত ছিল। যাহোক সে ত্রুটি এখনো শোধরানো যায়

বাসু হেসে বললেন, যায় না ইন্সপেক্টার! এতদিন পরে আপনি কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবেন না: পুলিসে সীজ করা গাড়ির ভিতর থেকে রেঞ্চটা কেউ বদল করেনি! এনি ওয়ে, দ্যাটস্ অল য়োর অনার!

জাস্টিস ঘোষ ক্যালেন্ডার দেখে বললেন, শনি-রবি বাদ দিয়ে সোমবার সকাল দশটায় আবার আদালত বসবে। আসামীকে জেনানা জেল-হাজতে রাখতে হবে।

আদালত ভাঙার আগে বাসু-সাহেব এগিয়ে গিয়ে মেট্রনকে বললেন, আসামীর সঙ্গে দু-একটা কথা বলার আছে।

– ইয়েস স্যার। আসুন এদিকে…

নির্জন ঘরে ওকে বসিয়ে বাসু বললেন, তোমাকে দু-একটা প্রশ্ন করতে চাই, টুকু…

– বলুন, তবে জেঠু সম্বন্ধে কোন প্রশ্নের জবাব আমি যে দেব না সে-কথা তো আগেই বলেছি।

– হ্যাঁ, মনে আছে আমার। জেঠু সম্বন্ধে নয়, সূর্যের সম্বন্ধে।

– কীসের সম্বন্ধে?

– সূর্য। দ্য সান্! এক নম্বর প্রশ্ন: মাউন্ট আবুতে একটা সানসেট পয়েন্ট আছে। তুমি কি কখনো সেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখেছ?

টুকু অবাক হল। সংক্ষেপে বলল, না।

– ‘বিবেকানন্দ রকে’ বসে একই দিনে সমুদ্র থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছ?

টুকু রীতিমতো বিস্মিত। বলল, দেখেছি। জেঠুর সঙ্গে ছেলেবেলায় কন্যাকুমারী বেড়াতে গেছিলাম। তখন। সেকথা কেন?

– কোন হোটেলে উঠেছিলে?

– তা আমার মনে নেই।

– টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখেছ কখনো? দার্জিলিঙে?

– দেখেছি। এবার মনে আছে কোন্ হোটেলে উঠেছিলাম।

– কোন হোটেলে?

– হেনাদির হোটেলে। হোটেল কুণ্ডুজ।

– আর কোনার্কের সূর্যমন্দির?

– না দেখিনি। এসব কথা কেন জানতে চাইছেন?

বাসু জবাব দিলেন না। বললেন, সোমবার সকালে দেখা হবে।

টুকু জানতে চায়, কেসটা কেমন বুঝছেন?

– খুব ভাল। বেকসুর খালাস না হবার কারণ নেই।

– আপনি কি জেঠুর সন্ধান করছেন এখনো?

বাসু ব্রীফ-কেসটা হাতে তুলে নিতে নিতে বললেন, শর্ত হয়েছিল, তোমার জেঠুর বিষয়ে আমরা কোন কিছু আলোচনা করব না। আমাদের আলোচনার কেন্দ্র-বিন্দুতে ছিল: সূর্য! তাই নয়? বেস্ট অব লাক!

আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে বেরিয়ে এসে গাড়ির দিকে এক-পা এগিয়ে যেতেই অগ্রসর হয়ে এল রবি বসু।

– রবির কী খবর?

রবি ঘনিয়ে এসে নিম্নস্বরে বললে, আপনি ঠিকই ধরেছেন: প্রবীর ঘোষাল জি. জি. সি. এল. থেকে শ্রীরামপুরে ফেরার পথে নিজের বাড়ি না গিয়ে প্রথমে তার ব্যাঙ্কে যায়। যে ব্যাঙ্কে তার ভল্ট আছে। সুতরাং এমন সন্দেহ করা অসঙ্গত নয় যে, বিলাস ঐ বৃদ্ধের কাছ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা কেড়ে নেয়। আর পালাবার সময় সে-কথা খেয়াল ছিল না অর্ধোন্মাদ সত্যানন্দের। হয়তো তিনি দরজাটা টেনে দিয়ে যেতেও ভুলে যান। তা যদি ঘটে থাকে…

বাধা দিয়ে বাসু বলেন, অবভিয়াসলি। প্রবীর ঘুমন্ত-বিলাসের পকেট হাতড়ে চল্লিশ হাজার টাকা উদ্ধার করে। নিজেই পাইপটা খুলে দেয়। দরজাটা টেনে দেয়। মিনিট দশেক পরে ম্যানেজারকে খবর দেয়।

– কিন্তু প্রবীর তো মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ম্যানেজারকে ডাকে…

– তার স্টেটমেন্ট অনুযায়ী। সে যে অনেক আগে রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে আসেনি তারই বা প্রমাণ কী?

– তা বটে।

বাসু বলেন, যে-কয়জনকে নজরবন্দী রাখতে বলেছি তা রাখা হচ্ছে তো?

– আজ্ঞে, হ্যাঁ!

– ডিপার্টমেন্টাল ফর্মালিটিতে যদি অসুবিধা হয়, তাহলে আমার অ্যাকাউন্টে ‘শ্যাডো’ এমপ্লয় করবে। তিন-শিফটে। প্রতিটি মুহূর্তে ওরাকী করছে, কোথায় যাচ্ছে যেন জানতে পারি আমি। বিশেষ করে আগামী বাহাত্তর ঘণ্টা।

– আগামী বাহাত্তর ঘন্টা? আপনি কি, স্যার, আশা করছেন আগামী সোমবারই মামলার ফয়শালা হয়ে যাবে?

– তা তো যাবেই। এমন কি আগামী সোমবারের মধ্যে আসল ঘুঘুটি ফাঁদে পড়বেন।

– আপনি তাকে চিনতে পেরেছেন?

– প্রথম দিন থেকেই। তবে কনভিকশন হবার মতো এভিডেন্স এতদিন যোগাড় করতে পারিনি।– এতদিনে পেয়েছেন?

– আমি পাইনি। তুমি পেয়েছ। না হলেও ইতিমধ্যে পেয়ে যাবে! আয়াম শ্যিওর। আফটার অল, কৃতিত্বটা তো তোমারই!

ফেরার পথে ওরা তিনজনই ছিলেন গাড়িতে। সুজাতা জানতে চায়, আপনি তো নিত্যানন্দকে কোন জেরা করলেন না, মামু?

– সেটা পণ্ডশ্রম হত। টুকু যে তার জেঠুকে অপসারণ করেছিল সেটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তার সঙ্গে এই হত্যার কী সম্পর্ক?

কৌশিক জানতে চায়, সেদিন ঐ বিদ্যাধর পাণ্ডা…আয়াম সরি, বিদ্যাধর পণ্ডা – যে শর্ট-পীসটা খুলে আপনাকে দিয়েছিল সেটার…

বাসু বললেন, ওসব ফাল্গু কথা থাক। তুমি এই সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুর মোড়ে নেমে যাও। কাল সকালে ফ্লাইটে আমরা দুজন– তুমি আর আমি, বাগডোগরা যাব আর পর্শ্ব আমরা তিনজন ফিরে আসব। টিকিটগুলো কেটে নিয়ে ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরে এস বরং।..

মানিব্যাগ খুলে উনি একশটাকার একতাড়া নোট গুণতে থাকেন। কৌশিক অনিবার্য প্রশ্নটা না করে পারে না, যাব দুজনে, ফিরব তিনজন। তৃতীয় ব্যক্তির নামটা যে জানা দরকার, মামু, বুকিং করতে হলে।

– থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার হচ্ছেন: শ্রীসত্যানন্দ সেন।

– সে কী! কেমন করে জানলেন উনি বাগডোগরায় আছেন?

– ‘বাগডোগরায়’ নয়, দার্জিলিঙে আছেন। হোটেল কুণ্ডুজ!

– তাই বা জানলেন কেমন করে?

– এইমাত্র টুকু যে বলল: হেনাদির হোটেলে উঠে টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখেছিল ওরা!

কৌশিক আর সুজাতার দৃষ্টি-বিনিময় হল

বাসু বললেন, অমন করুণভাবে তাকাচ্ছ কেন ওর দিকে? একদিন পরেই তো ফিরে আসবে। একটা দিন কি ঐ কচি বউটা একা থাকতে পারবে না? ওকেও নিয়ে যেতাম, কিন্তু রানু যে তাহলে…

– কী যে বলেন! – কৌশিক পালিয়ে বাঁচে।