কৌতূহলী কনের কাঁটা – ৩

তিন

ডাকঘর থেকে বাইরে এসে ওঁর মনে হল দু-দুটো অসঙ্গতি রয়ে গেল। এক নম্বর – যেটা উনি বলেই ফেলেছিলেন ঘোষাল মশাইকে – ‘অ্যাপার্টমেন্টস’ কথাটার মানে অনেকগুলি ফ্ল্যাট। সেক্ষেত্রে ‘দুই-এরতিন’বা ‘তিনের পাঁচ’ ইত্যাদি একটা নম্বর ঠিকানায় থাকার কথা, যাতে বোঝা যায় ‘কয়’তলায় এবং কত নম্বর চিহ্নিত দরজা। কমলেশ সেটা উল্লেখ করেনি। কেন? সে কি পুরো ঠিকানাটা জানাতে চায় না? সেক্ষেত্রে গোটা ঠিকানাটাই তো তার উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত হতে পারে – যেমন হয়েছিল কল্পিত শিখা দত্তের লেখা ‘নসীরাম পতিতুণ্ড সেকেন্ড বাই লেন।’ দ্বিতীয় প্রশ্ন, তারাতলা রোড-এর বাসিন্দা বেহুদ্দো এতদূর এসে মধ্য কলকাতার একটি পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিস থেকে টেলিগ্রাফটা করবে কেন? অবশ্য তার অনেক অজ্ঞাত কারণ থাকতে পারে। হয়তো ওর কর্মস্থল এ-পাড়ায়। যাই হোক, ওঁকে একবার তারাতলা অঞ্চলে গিয়ে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। হয়তো ‘বুনো-হাঁসের’ পিছনে এ দৌড়াদৌড়ি অহেতুক। কিন্তু উপায় নেই– ‘শিখা দত্ত’ ওর নাম না হওয়া সত্ত্বেও যে মেয়েটি ওঁকে দ-য়ে মজিয়েছে সে ওঁর ক্লায়েন্ট।

সামনেই একটা বড় ওষুধের দোকান। বাসু-সাহেব ঢুকে পড়লেন। মধ্য-দিনে তেমন ভিড় নেই। কাউন্টারের বিপরীত থেকে একজন অল্পবয়সী ডিসপেন্সিং কর্মচারী প্রশ্ন করে, বলুন স্যার?

বাসু জানতে চান, ইপ্রাল আছে।

লোকটা নেতিবাচক মাথা নাড়ল।

– ওষুধটা কোথায় পাব বলতে পারেন?

– আমি ওর নামই শুনিনি।

বাসু জানতে চান, আপনাদের এখানে কোনও ডাক্তারবাবু বসেন?

– বসেন। সকালে আর সন্ধ্যায়। এখন নেই।

হতাশ হয়ে উনি পিছন ফিরছিলেন। কে যেন ওঁর ও-পাশ থেকে বললে, ‘ইপ্রাল’ কলকাতার বাজারে পাবেন না। পেটেন্টেড ওষুধ। প্রেসক্রিপশনটা সঙ্গে আছে?

বাসু ঘুরে দাঁড়ালেন। বছর পঁয়তাল্লিশের একজন প্রৌঢ়। সাফারি সুট পরনে। জানতে চান, আপনি নিশ্চয় ডাক্তার। বলতে পারেন, ইপ্রাল কী জাতের ওষুধ? মানে কোন অসুখে…

– ওটা বিষ নয়!

– ‘বিষ নয়’! এটা বিষ, তা তো আমি বলিনি।

ডাক্তারবাবু হাসতে হাসতে বললেন, আজ্ঞে না স্যার, আপনি বলেননি, আপনার বলার কথাও নয়, ব্যারিস্টার-সাহেব! ওটা তো বলবে পাবলিক প্রসিকিউটার? যখন আমি হতভাগার পেট চিরে বলব, ‘অত্যধিক পরিমাণে কেউ একে ‘ইপ্রাল’ খাইয়েছে – সেটাই মৃত্যুর কারণ।’

বাসু এতক্ষণে হেসে ফেলেন। বলেন, এইবার আপনাকে চিনেছি। আপনি অটোপ্সি-সার্জেন ডাক্তার অতুলকৃষ্ণ সান্যাল।

– আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কেসটা কী, স্যার?

– না, মরেনি কেউ। পুলিস একজনের মেডিসিন-ক্যাবিনেট সার্চ করে যেসব ওষুধ পেয়েছে তার মধ্যে ছিল এক শিশি ‘ইপ্রাল’। শাদা শাদা ছোটো ছোটো ট্যাবলেট। ওটা কীসের ওষুধ তা জানা থাকা ভালো। তাই, জিজ্ঞাসা করছিলাম।

– ‘ইপ্রাল’ একটা ‘হিপনটিক’– এক রকমের ‘ঘুম-পাড়ানিয়া’। বিদেশী ওষুধ। এখানে পাওয়া

যায় না। আমরা তার বদলে ‘কাম্পোজ’, অ্যাট্রিভান, বা অন্য জাতের ওষুধ প্রেসক্রাইব করি। ইপ্রালের বৈশিষ্ট্য এই যে, ঘুমটা খুব গাঢ় হয়। কিন্তু পরদিন ঘুম ভাঙার পর কোনও ‘আফটার-এফেক্ট’ থাকে না। মাতালের যেমন খোঁয়াড় ভাঙতে বিলম্ব হয়, ইপ্রালে তা হয় না। ঘুম ভাঙলেই খুব ঝরঝরে লাগে। মার্কিন মুলুকে ড্রাগ-অ্যাডিক্টদের চিকিৎসায় এর ব্যাপক ব্যবহার।

– যদি কাউকে ‘ইপ্রাল’ এর ওভারডোজ খাওয়ানো হয়?

– ঘুম পাড়ানিয়ার ওভারডোজ-এর মতো কাণ্ড ঘটবে। তার ঘুম ভাঙবে না, আর আমার ঘুম ছুটে যাবে–

– আপনার?

– নয়? আমি তো অটোন্সি-সার্জেন। মরাকাটা ঘরে আমাকেই তো পেট চিরে বলতে হবে: ইটস এ কেস অব ওভারডোজ অব স্লিপিং ট্যাবলেটস!

– থ্যাঙ্কু ডক্টর!

– য়ু আর ওয়েলকাম। ধন্যবাদ তো আমিই দেব। পুলিশের পক্ষে সাক্ষী দিতে উঠে বরাবর আপনার ধমক খেয়েছি। আজ প্রশ্নোত্তরের সময় আপনি কিন্তু একবারও ধমকাননি স্যার!

বাসু-সাহেব হা হা করে হেসে ওঠেন।

ডক্টর সান্যাল নমস্কার করে বিদায় হলেন।

বাসু-সাহেব এবার দোকানের মালিকের দিকে ফিরে বলেন, একটা টেলিফোন করতে পারি।

– শ্যিওর! করুন, স্যার।

বোধকরি ওঁদের কথোপকথন কিছুটা শুনেছেন তিনি। টেলিফোনটা দোকানের একান্তে। নিম্নকণ্ঠে কথোপকথন করলে দোকানের আর কেউ শুনতে পাবে না। ঘড়িটা দেখলেন একবার; বারোটা কুড়ি। তার মানে শুভ্রা দেবীর বাড়ি থেকে ফোন করার পর দু’দুটি ঘণ্টা কেটে গেছে। ইতিমধ্যে কৌশিক কোনও সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছে কি না জানা দরকার।

দু’বার রিঙিং টোন হতেই রানী লাইনে এলেন: হ্যালো?

– কৌশিক কি কোনও পাত্তা পেল? ওই লাইসেন্সটার ব্যাপারে?

– কোন লাইসেন্স?

– আরে বাপু, আমিই বলছি। লাইসেন্স নাম্বার; থ্রি-সেভেন-ফাইভ নাইন-সিক্স-টু-ওয়ান!

ওঁকে কোনও ডায়েরি বা-পকেট-বুক দেখতে হল না-নম্বরগুলো পরপর ওঁর মস্তিষ্কে ‘গ্রে সেল’-এর খাঁজে খাঁজে সাজানো। কিন্তু রানীদেবী চটজলদি তাঁর খাতা দেখে মিলিয়ে নিয়েছেন। বলেন, হ্যাঁ পেয়েছে। লাইসেন্স হোল্ডারের নাম ডক্টর পি. সি. ব্যানার্জি’– প্রতুলচন্দ্র– এম. আর. সি. পি.। পাম অ্যাভিন্যু যেখানে বন্ডেল রোডে পড়েছে তার কাছাকাছি একটা নার্সিং হোম। অনেক ডাক্তার বসেন। উনিই মালিক। নাম– ‘সানিসাইড নার্সিং হোম’।

– এত কথা লাইসেন্সে লেখা থাকে?

– না, থাকে না। কিন্তু কৌশিক টেলিফোনে যখন জানায় যে, ওই যন্ত্রটার লাইসেন্সি ডাক্তার পি. সি. ব্যানার্জি, তখন সুজাতা এখানে ছিল। ঠিকানাটা নিয়ে ও তৎক্ষণাৎ একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যায়। তার ফোনও পেয়েছি। ডক্টর ব্যানার্জিকে সে ধরতে পারেনি; কিন্তু একথা জানতে পেরেছে ওই নার্সিং হোমেই মাসখানেক আগে ছন্দা বিশ্বাস চাকরি করত। বর্তমানে সে ছন্দা রায়। তার স্বামীর নামটা জানা যায়নি। তবে এটুকু জানা গেছে যে সে অত্যন্ত বড়লোকের একমাত্র পুত্র – মানে, রিয়েল মালটি– মিলিয়নেয়র ধনকুবের! ওদের ঠিকানাটা জানা যায়নি, তবে জাতীয় গ্রন্থাগারের পিছনে আলিপুর রোডে অথবা…

– অলরাইট! অলরাইট! তোমরা কাজ অনেকটা এগিয়ে রেখেছ দেখছি। সুজাতা বা কৌশিকের ভেতর কেউ কি ফিরে এসেছে?

– দু’জনেই এখন এখানে।

– দু’জনকেই বেরিয়ে পড়তে বল। জাতীয় গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র হিসাবে ধরে নিয়ে ম্যাপের উপর এক মাইল ব্যাসার্ধের বৃত্ত টানলে কলকাতা শহরের যতটা ভূভাগ বৃত্তের ভিতর আসবে তার মধ্যে কোনায় শুধু সেই ঘরের বাইরের দিকের জানলায় গ্রিল বসানো। ঘরে চৌকি, বিছানা পাতা। টেবিল-চেয়ার কিছু। টেবিলে টেলিফোন, কিছু নকশা ছড়ানো। এক পাশে নানান গৃহ-নির্মাণের সরঞ্জাম স্তূপাকার করে রাখা। স্যানিটারি পাইপ, কমোড, ওয়াশ-বেসিন। গ্যালভানাইজড জলের পাইপ। আরও কীসব সরঞ্জাম বড়ো বড়ো ক্রেটে বাক্সবন্দী করা। বাসুর দিকে একটি চেয়ার বাড়িয়ে দিয়ে লোকটা তাঁর মুখোমুখি বসল। বাসু জানতে চাইলেন হাইকোর্টের অর্ডারে নাকি এ বাড়ির নির্মাণ-কাজ বন্ধ আছে?

– হ্যাঁ, মাস-দুয়েক। কর্পোরেশনের মতে বেআইনি কাজ হয়েছে।

– আপনি কি কেয়ার-টেকার, মিস্টার ঘোষ?

– সর্ট অফ! এন্টারপ্রেনার আমার বন্ধু। আমি এখানে থাকায় তাকে দারোয়ান রাখতে হয় না। আমিই দেখভাল করি।

– যদি দলবেঁধে ডাকাত আসে?

কমলেশ টেবিলের টানা-ড্রয়ার খুলে একটা কালোমতো যন্ত্র বার করে দেখাল। বললে, আপনি যে বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছেন সে কথাই বলুন। ছন্দা রায়ের কী প্রস্তাবের কথা বলতে চান?

– আমি তো বলতে আসিনি কমলেশবাবু, শুনতে এসেছি।

– এই যে বললেন, ছন্দা রায়ের কাছ থেকে এসেছেন?

– সে তো বটেই। ওই পরিচয় না দিলে আপনি দোর-গোড়া থেকেই আমায় বিদায় দিতেন, তাই নয়? কিন্তু আমি তো বলিনি যে, তার কাছ থেকে কোনও প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।

– অ! তার মানে আপনার কিছু বলার নেই?

– সেটাও ঠিক নয়। আমার কিছু বলার আছে। এক নম্বর কথা, ছন্দা রায় মেয়েটি খুব ভালো। তার জীবনে কোনও অশান্তি বা বিড়ম্বনা আসে, এটা আমি চাই না।

– আমিই কী সেটা চাইছি? আমি তার শত্রুপক্ষ নই।

– বটেই তো! আইনত আপনিই যখন ছন্দা রায়ের স্বামী!

লোকটা স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।তারপর বললে, বুঝেছি। কাজটা ছন্দা ভালো করেনি। আপনাকে সব কথা বলে ফেলা…

– ফর ইওর ইনফরমেশান, ছন্দা রায় আদৌ বলেনি যে, ‘কমলেশ ঘোষ’ তার প্রথম পক্ষের স্বামী।

– তাহলে কে বলেছে সে কথা?

– আপনি। এইমাত্র! ছন্দা আমার কাছে এসেছিল তার বান্ধবীর জন্য কিছু লিগাল অ্যাডভাইস নিতে। সে একবারও বলেনি যে, তার প্রথম পক্ষের স্বামী সাত বছর নিরুদ্দেশ ছিল। ওটা আমার আন্দাজ। আপনি এইমাত্র সেটা কনফার্ম করলেন।

লোকটা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকল পুরো একটা মিনিট! তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, ছন্দা যদি আপনার মাধ্যমে কোনও প্রস্তাব না পাঠিয়ে থাকে তাহলে আপনি অনুগ্রহ করে যেতে পারেন।

বাসু জবাব দেবার আগেই কলিং-বেলটা বেজে উঠল। একবার দু’বার।

– কমলেশ জানতে চায়, আপনি কি একা এসেছেন? না গাড়িতে আর কেউ আছে?

– আমি একাই এসেছি। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়েছি।

– তাহলে কলিং-বেল বাজাচ্ছে কে?

– আপনার কোনও সাক্ষাৎপ্রার্থী। আমি কেমন করে জানব?

কমলেশ টানা-ড্রয়ার থেকে রিভলভারটা হিপ-পকেটে ভরে নিল। বলল, আপনাকে একটু কষ্ট দেব, মিস্টার বাসু। আপনাকে এখানে একা ছেড়ে রেখে আমি যেতে পারব না। আপনিও আসুন আমার সঙ্গে।

– অল রাইট। চলুন।

বাসুকে অগ্রবর্তী করে কমলেশ নিচে নেমে এল। দ্বার খুলে দিল। বাইরে একজন ডাক-পিয়ন। বললে: টেলিগ্রাম! কমলেশ ঘোষ? আছেন?

– আমারই নাম। দাও।

টেলিগ্রাম-পিয়ন খাতায় সই নিয়ে টেলিগ্রামটা হস্তান্তরিত করে চলে গেল। কমলেশ খামটা ছিঁড়ে টেলিগ্রামটা পড়ল। মুখ তুলে বলল, ছন্দারই টেলিগ্রাম। কিন্তু সে তো আপনার আসার সম্ভাবনার কথা কিছু লেখেনি।

– ন্যাচারালি। সে জানে না যে, আমি এখানে আসছি। ইন ফ্যাক্ট, সে আপনার নাম বা ঠিকানা কোনওটাই আমাকে জানায়নি।

– তাহলে আপনি কেন এসেছেন আমার কাছে? শুধু জানাতে যে, ছন্দা একটা লক্ষ্মী মেয়ে, অথবা তার বান্ধবীর স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে?

– না, মিস্টার ঘোষ। আমি এসেছি ছন্দার বর্তমান ঠিকানার সন্ধানে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করাটা জরুরি দরকার; কিন্তু সে কোথায় থাকে তা আমি জানি না।

– এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ছন্দা আপনার ক্লায়েন্ট, অথচ আপনি তার ঠিকানা জানেন না?

বাসু জবাব দেবার আগেই দ্বিতলে টেলিফোনটা বেজে উঠল। কমলেশ বলল, আপনার বক্তব্য বলা নিশ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এবার আসুন আপনি।

– না, মিস্টার ঘোষ। আমার আরও কিছুটা বলার আছে। কিছুটা শোনারও আছে। আপনি বরং টেলিফোনের ঝামেলাটা প্রথমে মিটিয়ে নিন।

– অল রাইট। তাহলে আপনি আমার সামনে সামনে চলুন।

– কোন প্রয়োজন নেই, কমলেশবাবু। আপনি সার্চ করে দেখে নিতে পারেন আমি নিরস্ত্র। আপনার চেয়ে বয়সে আমি না-হোক পঁচিশ বছরের বড়ো। আপনার হাতে রিভলভার। অত ভয় পাচ্ছেন কেন?

– ভয় আমি পাইনি।

– পেয়েছেন। অন্য কারণে।গিল্টি কনশিয়েন্স। যা হোক। চলুন– উপরে চলুন। আচ্ছা আমিই না হয় আগে আগে যাচ্ছি।

দু’জনে সিঁড়ি দিয়ে দ্বিতলে উঠে আসেন।

টেলিফোনটা তখনও একনাগাড়ে বেজে চলেছে: ক্রিরিং…ক্রিরিং…