সতের
নকিব বিচারকের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, হুজুর এবার সেই কেসটা। বিচারক দত্তগুপ্তের তা স্মরণ আছে। ওঁর এজলাসে সচরাচর ব্যারিস্টারদের আবির্ভাব ঘটে না। নুন-রিসেস-এর পরে এজলাসে প্রবেশ করেই তাঁর লক্ষ্য হয়েছে; বাঁ দিকের কোনায় জুনিয়ারকে নিয়ে বসে আছেন পি. কে. বাসু, বার-অ্যাট-ল।
দত্তগুপ্ত আদালতের উপর নজর বুলিয়ে বললেন: অর্ডার, অর্ডার।
এজলাসের কলগুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। দত্তগুপ্ত বললেন, আফটারনুন সেশনের প্রথম মামলা: ভৈরব দাশ বনাম সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরস – অর্ডার টু শো কজ এটসেট্রা এটক্সেট্রা। সলিল সেন অব ‘সেন অ্যান্ড রয়’ আছেন বাদীর পক্ষে আর পি. কে. বাসু প্রতিবাদীর তরফে।
সলিল সেন, একজন মাঝবয়সী অ্যাডভোকেট, সোৎসাহে উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন: বাদী প্রস্তুত হুজুর।
বাসুসাহেব হাত তুলে বললেন: প্রতিবাদী পক্ষও প্রস্তুত।
সলিল সেন অত্যন্ত বিস্মিতভাবে বাসুসাহেবকে বললে, মানে? ইয়ে…আপনি বলতে চান শো কজ মামলা’য় আপনি টাইম চাইছেন না?
– ঠিক তাই। – বসে বসেই জবাব দিলেন বাসু।
বিচারকও বিস্মিত। বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললেন, দেখতে পাচ্ছি, আপনাকে অত্যন্তকম সময় দেওয়া হয়েছে। বস্তুত চব্বিশ ঘণ্টাও নয়। এক্ষেত্রে আপনি সময় চাইতে পারেন–
বাসু হেসে বললেন, থ্যাঙ্কু। আমি জানি; কিন্তু আমি প্রস্তুত।
সলিল সেনকে উঠে দাঁড়াতে হল আবার, হুজুর। বাদীপক্ষ আদৌ প্রস্তুত ছিল না। এত অল্পসময়ের ব্যবধানে নোটিস দিলে প্রতিবাদীপক্ষ ‘টাইম’ চান, তা দেওয়াও হয় – এ একরকম রুটিন। তাই আমরা আশা করেছিলাম…
করুণভাবে তিনি বাসু-সাহেবের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। দেখলেন, বাসু-সাহেব নিমীলিত নেত্রে একটি ‘জনসন-বাড’ তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করিয়ে কানের খোল নিষ্কাশনে ব্যস্ত। বিচারকও তাঁকে দেখলেন। একটু বিরক্ত হয়েই সেনকে বললেন, রুটিনমাফিক যা হয় তার ব্যতিক্রমও থাকে। এই সময়টা ধার্য করা হয়েছে বাদীপক্ষের আবেদন অনুসারে। ফলে শুধুমাত্র প্রতিবাদীই সময় চাইতে পারেন। বাদীপক্ষের সে অধিকার নেই। সো, প্লীজ প্রসীড।
তারপর বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললেন, আপনি কি বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনও কাউন্টার-এফিডেভিট ফাইল করেছেন?
– নো, য়োর অনার, আমার সে সময় ছিল না…
– কিন্তু সময় তো আপনি চাইলেই পেতে পারেন। এখনো পারেন।
– আজ্ঞে এ-কথা আপনি ইতিপূর্বেও বলেছেন। সময়াভাবে আমি কাউন্টার-এফিডেভিট দাখিল করে উঠতে পারিনি; কিন্তু সে জন্য আমি ‘কন্টিনুয়েন্স’ও প্রার্থনা করব না, যদি না প্রতিযোগী ‘রেস্ট্রেনিং-অর্ডার ভেকেট’ করার আবেদনে আপত্তি না জানান।
সলিল সেন তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে।
জজ-সাহেব তাঁকে বলেন, বুঝেছি, বসুন মিস্টার সেন। ভেরি ওয়েল মিস্টার বাসু, আপনি সওয়াল জবাব শুরু করতে পারেন।
বাসু বললেন, আমি প্রথমে আহ্বান করতে চাই বাদী শ্রী ভৈরব দাশকে।
ভৈরব রীতিমতো সেজেগুজে এসেছিল। যেন সে হালখাতার নিমন্ত্রণ রাখতে এসেছে। অথবা পাকা দেখার। গলার সোনার হার, পরিধানে ধাক্কা-দেওয়া কোঁচানো বাহান্ন ইঞ্চি কস্তাপাড় ধুতি, ঊর্ধ্বাঙ্গে চুড়িদার কাজ করা সিল্কের পাঞ্জাবি, চোখে রীমলেস রোল্ডগোল্ড চশমা। হাতে হাতির দাঁতের মুঠওয়ালা সৌখিন ছড়ি। সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে ডান হাত তুলে সে গীতাস্পর্শ করে শপথবাক্য পাঠ করল।
– আপনিই এ মামলার বাদী শ্রী ভৈরব দাশ?
আবার লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় সলিল সেন। বলে, জাস্ট এ মোমেন্ট, ধর্মাবতার। সওয়াল-জবাব শুরু হওয়ার পূর্বে আমি জানতে চাই, প্রতিবাদী পক্ষের কাউন্সেলার মিস্টার পি. কে. বাসু আদালতের আদেশ মোতাবেক সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরসের কোন শেয়ারের স্টক্-সার্টিফিকেটের গোছা নিয়ে এসেছেন কি না।
বিচারককে প্রশ্ন করবার সুযোগ না দিয়ে বাসু-সাহেব দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, ইয়েস, য়োর অনার। subpoena duces tecum-এর নির্দেশ মোতাবেক আমি শেয়ার সার্টিফিকেটগুলি নিয়ে এসেছি।
– শ্রীমতী জয়া সেন, ‘নে’ জয়া দত্তের নামে ইস্যু করা স্টক-সার্টিফিকেট? – সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চায় সলিল।
বাসু বলেন, এক্স্যাক্টলি।
জজ-সাহেব কুঞ্চিত ভ্রূভঙ্গে তাকিয়ে থাকেন।
এই সময় দর্শকের সারির পিছনের আসন থেকে একজন নিঃশব্দে উঠে বেরিয়ে যায়।
বোঝা গেল, সে প্লেন-ড্রেস পুলিস।
সাক্ষীর মঞ্চের দিকে তাকিয়ে বাসু বলেন, আপনি বেশ কিছু দিন ধরেই ‘সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরস্’-এর শেয়ার কেনার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিলেন, তাই না?
– হ্যাঁ। তাই।
– দিন পনের আগে ওই কোম্পানির দশ শতাংশ শেয়ার আপনি শ্রীমতী স্বর্ণলতা দেবীর কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলেন। তাই নয়?
– হ্যাঁ। তাই।
– আপনি আরও জানতেন যে, কোনক্রমে ওই চল্লিশ শতাংশ শেয়ারের মালিক শ্রীমতী জয়া সেন, কুমারী জীবনে যিনি ছিলেন জয়া দত্ত–
– হ্যাঁ, জানতাম।
– অত তাড়াহুড়া করবেন না মিস্টার দাশ। প্রশ্নটা আমাকে শেষ করতে দিন। আপনি আরও জানতেন যে, কোনক্রমে ওই চল্লিশ শতাংশ শেয়ার ক্রয় করতে পারলে আপনিই হয়ে যাবেন সর্বাধিক শেয়ার-হোল্ডার?
ভৈরব এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে পকেট থেকে একটি সুদৃশ্য রুমাল বার করে তার রীমলেস চশমার কাচটা মুছে নিল। বলল, লুক হিয়ার, মিস্টার বাসু। সময়ের দাম আপনারও আছে, মহামান্য আদালতেরও আছে। আমি আপনার সওয়াল-জবাবটা এভাবে সংক্ষিপ্ত করে দিচ্ছি: আমি একজন বিজনেসম্যান, আমি লক্ষ্য করে দেখলাম মাত্র দুটি শেয়ার-হোল্ডারের কাছ থেকে তাদের যাবতীয় শেয়ার-সার্টিফিকেটগুলি ক্রয় করে নিলে ‘সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোর্স’-এর পরিচালনা আমার কব্জায় এসে যাবে। দোকানটা থেকে ইদানীং দারুণ লাভ হচ্ছে। তাই আমি শ্রীমতী স্বর্ণলতার দশ পার্সেন্ট শেয়ার খরিদ করার পরেই উদ্যোগ নিলাম শ্রীমতী জয়া সেনের শেয়ারগুলি কিনে নিতে। কিন্তু মিসেস সেন আমাকে সরাসরি শেয়ার বেচতে রাজি হবেন এমন আশা আমার ছিল না। তাই প্রয়াত জীবন হালদারের দ্বারস্থ হলাম, তাকে বললাম, সে যদি কোনক্রমে ওই শেয়ার-সার্টিফিকেটগুলি হস্তগত করতে পারে তাহলে আমি ভাল মার্জিনে তা ওর কাছ থেকে কিনে নেব।
– জীবন হালদার একজন পাক্কা জুয়াড়ি একথা আপনি জানতেন?
– আই ডোন্ট নো, অ্যান্ড আই ডান্ট কেয়ার। আমি তাকে বলেছিলাম, শেয়ারগুলো আমার হাতে তুলে দিতে পারলে আমি তাকে ভাল দাম দেব। জীবন হালদার সেই মোতাবেক শেয়ারগুলো সংগ্রহ করে এবং আমাকে জানায় যে, সেগুলো তার হেপাজতে আছে। আমি এখন এসে তা সংগ্রহ করতে পারি।
বাসু হঠাৎ আধপাক ঘুরে কোর্ট রিপোর্টারকে বলে ওঠেন, আপনি সাক্ষীর জবাবটা একবার পড়ে শোনান তো।
কোর্ট-রিপোর্টার ওঁর অনুরোধমতো জবাবটা পড়ে শোনাল।
ভৈরব তাড়াতাড়ি সংশোধন করে বলে, তার প্রকৃত অর্থ হল আমি জীবন হালদারকে আমার বকলমে শেয়ার-সার্টিফিকেটগুলি সংগ্রহ করতে নিযুক্ত করেছিলাম।
বাসু হেসে বলেন, না, মিস্টার দাশ – আপনার প্রথম উক্তির প্রকৃত অর্থ আপনার দ্বিতীয় উক্তিটি নয়। আপনি ভেবেচিন্তে ঠিকমতো জবাব দিন: আপনি কি জীবনকে বলেছিলেন যে, সে ওই শেয়ারগুলি সংগ্রহ করতে পারলে আপনি ভাল দামে তা কিনতে রাজি, যা আপনি প্রথম দফায় বলেছেন, অথবা আপনি জীবনকে আপনার বকলমে ওই শেয়ারগুলি যে কোন দামে কিনতে বলেছিলেন? যা আপনার দ্বিতীয় দফার উক্তি।
অ্যাডভোকেট সলিল সেন উঠে দাঁড়ায়: অবজেকশন য়োর অনার। ইনকম্পিটেন্ট, ইররেলিভেন্ট অ্যন্ড ইম্মেটিরিয়াল। এ প্রশ্ন যেন তৈলটি পাত্রাধার, না পাত্রটি তৈলাধার-এ যেন ন্যায়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার হচ্ছে।
বাসু সহাস্যে বললেন, আজ্ঞে না। এই প্রশ্নটি তুলাদণ্ডের ফালক্রামের মধ্যবিন্দুর কাঁটা। আপনার মক্কেল স্বচ্ছন্দে গাছে চড়ে ফল পেড়ে খেতে পারেন। তাহলে কাঠপিপড়ের দংশনও তাঁকেসহ্য করতে হবে। অথবা তিনি মাটিতে দাঁড়িয়ে ঝড়ে– পড়া আমগুলি সংগ্রহ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে কাঠপিঁপড়ের কামড় তাঁকে সহ্য করতে হবে না। কিন্তু গাছের পাকা ফলটির দিকে হাত বাড়ানোও চলবে না। গাছেরও খাব, তলারও কুড়াব-তা চলবে না। সহজ ভাষায় বাদী যদি জীবন হালদারকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ করে থাকেন এবং জীবনকে শেয়ারের দাম না মিটিয়ে থাকেন তাহলে এ মামলা আদপেই দাঁড়ায় না। খোয়া-যাওয়া শেয়ারগুলি সেক্ষেত্রে জীবন হালদারের ওয়ারিশের সম্পত্তি। অপরপক্ষে বাদী যদি বলেন যে, জীবন হালদার ওঁর ‘বকলমে’ শেয়ারগুলি সংগ্রহ করেছে তাহলে জীবনকৃত প্রতিটি অপরাধের ভাগিদার তাঁকে হতে হবে। জীবন যদি জুয়াচুরি করে, লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে, আইনের কোন ধারা লঙ্ঘন করে ওই শেয়ারগুলি ভৈরব দাশের ‘বকলম’ হিসাবে সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে ভৈরব দাশকে সে অপরাধের শাস্তি পেতে হবে।
সলিল বিচারকের দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে দেখল।
বিচারক বললেন, মিস্টার বাসু যা বললেন সেটাই আইন।
সলিল কিছু বলার আগেই ভৈরব বলে ওঠে, য়োর অনার। আমি মিস্টার বাসুর প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তত। আজ্ঞে হ্যাঁ, জীবন হালদারকে আমি আমার ‘বকলমে’ শেয়ার-সার্টিফিকেটগুলি সংগ্রহ করতে বলেছিলাম। অপহৃত শেয়ার সার্টিফিকেটের মালিক আমি, বাদী ভৈরব দাশ।
– তার মানে এ মামলা চলাকালে যদি প্রমাণিত হয় যে, জীবন হালদার ঐ শেয়ারগুলি সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছু বেআইনি শাস্তিযোগ্য কাজ করেছে তাহলে জীবনের জীবনাবসানে বর্তমানে আপনি তার হয়ে সেই শাস্তি মাথা পেতে গ্রহণ করতে প্রস্তুত?
ভৈরব দাশ রুখে ওঠে, নিশ্চয় নয়। দোষ করল জীবন হালদার, আর জেল খেটে মরব আমি?
একগাল হেসে বাসু বললেন, এ্যাক্টলি। তাই খাটতে হবে। ঐ কোঁচানো ধুতি ছেড়ে, ডোরাকাটা হাফপ্যান্ট পরে। গলায় ঐ সোনার হার খুলে নম্বরী তক্তি ঝুলিয়ে – মানে যদি সশ্রম হয়!
বিচারক হঠাৎ বলে ওঠেন, মিস্টার সেন, আপনি আপনার মক্কেলকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিন।আমি পাঁচ মিনিটের জন্য কোর্ট-এ রিসেস ঘোষণা করতে পারি। ভৈরব দাশ যদি দাবী করেন যে, মৃত জীবন হালদার ছিল একজন শেয়ারের দালাল, হালদারকে তিনি ঐ শেয়ার ক্রয় করবার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন মাত্র, তাহলে তাঁর বর্তমান মামলার দাবী আদপেই টেকে না। অপরপক্ষে হালদার যদি ওঁর বকলমে লীগ্যাল এজেন্ট হিসেবে ঐ শেয়ারগুলি সংগ্রহ করে থাকে তবে হালদারের প্রতিটি কৃতকর্মের জন্য বাদীকে দায়ী হতে হবে।
সলিল সেন এবার নিজেই জানতে চায়, জীবন হালদার যদি আমার মক্কেলকে না জানিয়ে কোন অন্যায় করে থাকে…
তাকে মাঝপথে বাধা দিয়ে বিচারক বলেন, নিশ্চয়ই। ঐ শেয়ারগুলি সংগ্রহ করতে জীবন হালদার যা যা করেছে, তার জন্য দায়ী আপনার মক্কেল। কারণ সে ওঁর ‘বকলম’-এ কাজটা করেছে। জীবন হালদার সাফল্যলাভ করলে যেহেতু আপনার মক্কেলের লাভ, জীবন হালদার অন্যায় করলে সেই হেতু আপনার মক্কেল দায়ী। শুধুমাত্র যদি আপনার মক্কেল দাবী করেন যে, জীবন ওঁর ‘বকলম’-এ কাজটা করেছে–
ভৈরব দাশ রুখে ওঠে, য়োর অনার। এজন্য আদালত স্থগিত রাখার কোন হেতু নেই। আমাকে কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে না। জীবন হালদার আমার লীগাল এজেন্ট। আমার ‘বকলম’-এ সে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হোল্ডার হিসাবে ঐ শেয়ারগুলি সংগ্রহ করেছিল।
বাসু নতুন উৎসাহে শুরু করেন, অল রাইট। আপনার ‘বকলম’-এ কাজ করার জন্য আপনি জীবন হালদারকে কত টাকা দিয়েছেন?
– টাকা? না টাকা কিছু দিইনি।
– বিনা আর্থিক লেনদেনে সে রাজি হয়ে গেল?
– টাকা সে পেত। সে জানত যে টাকা পারে। তাতেই রাজি হয়েছিল।
– কত টাকা? শেয়ার ভ্যালুর কত পাসেন্ট?
– না, পার্সেন্টেজের কথা কিছু স্থির হয়নি।
– কোনও এগ্রিমেন্ট হয়েছিল কি আপনার সঙ্গে? পাওয়ার-অব-অ্যার্টনি-হোল্ডার জীবন হালদারের?
– না।
– এ যে ‘নটী বিনোদিনী’-র পালাগান শুরু হয়ে গেল দাশ মশাই। গিরিশ ঘোষের ‘বকলম’-এ’ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গলায় ক্যানসার রোগের যন্ত্রণাটা সইছেন।
সলিল আপত্তি জানায়, অবজেকশন! দ্য কোশেন ইজ ইররেলিভ্যান্ট, ইম্মেটিরিয়াল–
বিচারক কিছু বলার পূর্বেই বাসু বলে ওঠেন, প্রশ্ন আমি কিছু করিনি। করেছি একটা স্টেটমেন্ট। প্রশ্নটা বরং সহযোগীকেই করি, তিনি কি জীবনে এমন কোন অলিখিত পাওয়ার-অফ-আটর্নির কথা শুনেছেন?
বিচারক বাধা দিয়ে বলেন, কাউন্সেলদের মধ্যে এ জাতীয় বাদানুবাদ আদালত অনুমোদন করেন না। আপনাদের যা বক্তব্য তা সরাসরি আদালতকে জানাবেন। য়ু মে প্রসীড মিস্টার বাসু।
বাসু ভৈরবের কাছে জানতে চান, জীবন হালদারের সঙ্গে কে আপনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল?
– তা আমার মনে নেই। জীবন হালদারকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি।
– তা তো হতেই পারে-রতনে তো রতনকে চিনবেই। কিন্তু জীবন হালদার যে জয়া সেনের শেয়ারের বান্ডিল বিশেষ কায়দায় আপনাকে কিনে দিতে পারবে এ ধারণাটা আপনার হল কোন সূত্রে?
সলিল আবার আপত্তি তোলে। এ প্রশ্ন অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক।
বাসু বলেন, ইফ দ্য কোর্ট প্লীজেস, আমি এ প্রশ্নটা আপাতত মুলতুবি রাখছি। আদলতের সময় আমি নষ্ট করতে চাই না। তাই এ প্রশ্ন মুলতুবি রেখে আমি পরবর্তী সাক্ষীকে ডাকতে চাই। যদি সেই পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয় যে, আমার ঐ মুলতুবি প্রশ্নটি অবান্তরও নয়, অপ্রাসঙ্গিকও নয়, তখন আবার আমি শ্রী ভৈরব দাশকে তাঁর বাকি সাক্ষ্য দিতে ডাকব। আপনি দয়া করে মঞ্চ থেকে নেমে আসুন মিস্টার ভৈরব দাশ। আমার পরবর্তী সাক্ষী মিস্টার রাকেশ বাজোরিয়া।
আদালতের সমন পেয়ে ‘সোনালি স্বপন’-এর কর্ণধার রাকেশ বাজোরিয়া ব্যাজারমুখে উপস্থিত ছিলেন পাশের ঘরে। এদিকে তাঁর নাম ঘোষণা করায় তাঁকে আসতে হল। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে রাকেশের সম্যক পরিচয় দিয়ে বাসুসাহেব প্রশ্ন করেন, আপনি আর জীবন হালদার কতদিন হল পার্টনারশিপে এ ‘সোনালি স্বপন’ রেস্তোরাঁ-কাম-বার খুলে বসেছেন?
– তা সাড়ে চার বছর হবে হুজুর।
– আমি শুনেছি আপনি স্লিপিং পার্টনার – টাকার যোগাড় দিয়েই খালাস, আর লাভের হিস্যা নিয়ে। অর্থাৎ দোকানের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দিকটা জীবন হালদারই দেখতেন। এ কথা সত্য?
– জী, হ্যা।
– ভৈরব দাশকে আপনি কতদিন চেনেন?
এটি স্পষ্টতই লীডিং কোশেন; কিন্তু সলিল সেন আপত্তি করল না। বাজোরিয়া তাঁর দিকে একনজর দেখে নিয়ে বললেন, তাও চার সাড়ে চার বছর হোবে হুজুর।
– তার মানে বার লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকেই ফিল্ম প্রডিউসার ভৈরব দাশ আপনাদের ঐ ঠেক-এ আসতেন?
– ঠেক? কী বলছেন স্যার?
– তাই তো বলে ‘মদের দোকান’কে। বলে না? ‘ঠেক’?
– জী, না। আপনি ‘বঙ্গাল ভাষা’ ঠিকমতো রপ্ত করতে শেখেননি। ‘ঠেক’ দুসরা চিজ আছে।
– আচ্ছা, না হয় ‘ঠেক’ নাই হল, আপনার ‘বার-কাম-রেস্তোরাঁ’-য় প্রথম থেকেই ভৈরব দাশ আসতেন?
– হ্যাঁ বহুৎ দিন হুয়ে গেল।
– আপনার মনে আছে বাজোরিয়া-সাব কার সঙ্গে ভৈরবের প্রথম আলাপ? সে আপনার মাধ্যমে ‘সোনালী-স্বপন’-এ আসে, না জীবন হালদারের?
– জী, হালদারই ওঁকে পহেলি বার দুকানে নিয়ে আসে। হমার সঙ্গে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দেয়।
– আর যাদুপাগোপাল সেন? তাকে কতদিন ধরে চেনেন?
এবার তড়াক করে দাঁড়িয়ে ওঠে সলিল। আপত্তি দাখিল করে, প্রশ্নটা অবৈধ, লীডিং কোশ্চেন। কিন্তু বিচারক এ বিষয়ে রুলিং দেবার আগেই গরুড় পক্ষীর মতো হাত দুটি জোড় করে বাজোরিয়া বলে ওঠে, যাদুগোপাল সেন? হামি জিন্দেগিভর তাঁকে আপনা আঁখসে দেখি নাই হুজুর!
বিচারক বললেন, ইটস সার্টেনলি এ লীডিং কোশ্চেন। তবে আমার রুলিং দেবার আগেই সাক্ষী তাঁর জবাবটা তড়িঘড়ি দিয়ে বসেছেন। এনি ওয়ে, এই সওয়াল ও জবাব আদালতের নথি থেকে কেটে বাদ দেওয়ার অর্ডার হল।
বাসু বলেন, মিস্টার বাজোরিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিন নায়ক, হিটলার, স্তালিন আর রুজভেল্টকে চেনেন? চেনা-চেনা লাগলে দয়া করে বলুন জিন্দেগিভর আপনি ওঁদের কাউকে আপনার আঁখসে দেখেছেন কিনা?
সলিল সেন পুনরায় আপত্তি দাখিল করে, অপ্রাসঙ্গিক।
বিচারক সেটা নাকচ করে দেন। কারণ এ প্রশ্ন যে ইতিপূর্বেকার বাতিল হয়ে যাওয়া লীডিং কোশ্চেনের জের টেনে তা বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয়নি।
বাজোরিয়া স্বীকার করেন, ঐ তিনজন রাষ্ট্রনায়কের নাম তিনি শুনেছেন, তাঁদের পরিচয় জানেন, চাক্ষুষ না দেখলেও।
এবার তাহলে হুজুরকে বলুন: মিসেস জয়া সেনের স্বামী, যাদুগোপাল সেনকে আপনি সেই অর্থে চেনেন কিনা তাঁকে জিন্দেগিভর আঁখসে না দেখলেও।
বাজোরিয়া করুণভাবে বাদীর অ্যাডভোকেটের দিকে তাকিয়ে দেখে। কিন্তু সলিল কী ভাবে প্রশ্নটায় আপত্তি করবে বুঝে উঠতে পারে না।
বাজোরিয়াকে স্বীকার করতে হল, হাঁ, হামি উনার নাম শুনিয়াছে।
বাসু বলেন, য়োর অনার। সাক্ষী ইন্টারেস্টেড পার্টি। সে খোলা-মনে সত্য উদ্ঘাটনে আদালতকে সাহায্য করতে প্রস্তুত নয়। এ ক্ষেত্রে তাকে আমি ‘হোস্টাইল উইটনেস’ হিসাবে চিহ্নিত করে অতঃপরে লীডিং কোশ্চেন জিজ্ঞেস করার অনুমতি চাইছি।
বিচারক বললেন, ইয়েস। দ্য উইটনেস অ্যাপিয়র্স টু বি হোস্টাইল। যু মে আস্ক হিম লীডিং কোশ্চেনস।
বাসু হঠাৎ বাজোরিয়ার খুব কাছাকাছি সরে এলেন। একটু নাটকীয় ভাবে দক্ষিণ তর্জনীটি তার নাকের ডগায় তুলে নিম্ন কিন্তু স্পষ্টস্বরে বললেন, মিস্টার বাজোরিয়া, আপনি সত্য গোপন করবার চেষ্টা করবেন না। মিথ্যা সাক্ষী প্রমাণিত হলে পার্জারি কেস-এ আপনার সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপনার কোনও বেতনভুক্ত কর্মচারী কিন্তু আপনার হয়ে হাফপ্যান্ট পরে গম পিষতে আসবে না।
বাজোরিয়া ধর্মভীরু ব্যবসায়ী। সে ভয়ে শাদা হয়ে যায়। তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে অ্যাডভোকেট সলিল সেন, ইয়োর অনার। সহযোগী সাক্ষীকে ভয় দেখাচ্ছেন।
বাসু বিচারকের দিকে ফিরে বললেন, নো ইয়োর অনার। একটু আগে সাক্ষী যেভাবে যাদুগোপাল সেনকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে বাক্তাতুরির আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাতে আমি মনে করি-ওঁকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে, হলফনামা নিয়ে সাক্ষী দেবার গুরুত্ব কী প্রচণ্ড। ওঁকে আমি যে সব প্রশ্ন করব তার মিথ্যা জবাব দিলে পরিণাম কী ভীষণ হতে পারে এই অবাঙালি ব্যবসাদারটিকে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেছি বলেই ও কথা বলেছি। ভয় দেখাতে নয়।
বিচারক বললেন, এনিওয়ে, যু মে প্রসীড মিস্টার বাসু।
বাসু প্রশ্ন করেন, মিস্টার বাজোরিয়া, এ মামলার বাদী মিস্টার ভৈরব দাশ যখন জীবন হালদারকে এই শেয়ারগুলি সংগ্রহ করতে বলে, তখন আপনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন তা আমি জানি, কিন্তু এ ছাড়াও চতুর্থ ব্যক্তি একজন ছিল। সে কে?
সলিল সেন লাফ দিয়ে ওঠে, অবজেকশন যোর অনার। অবান্তর প্রশ্ন।
বিচারক বাসু-সাহেবের প্রশ্নটি শুনে টেবিলের উপর ঝুঁকে এসেছিলেন। তৎক্ষণাৎ ‘বলেন, অবজেকশন ওভাররুলড।
বাজোরিয়া বললে, জী হুজুর। সে মীটিং-এ নবনীতা রায় ভি ছিল।
– নবনীতা রায়? যে মেয়েটি কমিশন বেসিসে আপনার বার-এ ‘বার্টেন্ডার’-এর কাজ করে?
– জী হ্যাঁ।
– কবে এ আলোচনা হয়?
– তারিখ মনে নাই হুজুর। সাত-দশ-দিন পহিলে–
– কোথায় আলোচনাটা হয়?
– সোনালি স্বপন-মে। আই মীন, উপরে ম্যানেজারের ঘরে।
– ঠিক কী ভাষায় কথোপকথন হয়, তা আপনার স্মরণে আছে?
– জী না। কেঁওকি বাৎচিৎ সুরু হতেই হামি নিচে নেমে যাই। উ বিজনেস জীবনের পার্সোনাল। হমার কোম্পানির নয়। ভৈরব ফটোহাউসের শেয়ার খরিদ করতে চাইল। জীবন বললে সে কোশিশ করবে। নবনীতাকে বলল কি তুমি সাকসেসফুল হলে মুনাফার টেন পার্সেন্ট কমিশন মিলবে।
– কী বিষয়ে সাকসেসফুল হলে?
রাকেশ যুক্তকরে বললে, বিশওয়াস করুন ব্যারিস্টার-সাব, হামি জানি না। ওরা তিনজনে ঘরের ভিতর শলা-পরামর্শ করছিল। আমি অচানক ঘুসে পড়ি। জীবনের সঙ্গে একঠো জরুরি বাত ছিল। তা জীবন হমাকে বলল কি বৈঠ যেতে। এক পেগ পান করে যেতে। হামি দশ মিনিটের জন্য বসে গেলাম। ই কারণে হামি পহিলে কী বাৎচিৎ হয়েছে; পিছেই বা কী হয়েছে সে জানি না।
– অলরাইট। তা সেই আলোচনাকালে– মানে আপনি যতক্ষণ উপস্থিত ছিলেন– তার মধ্যে যদুগোপাল সেনের প্রসঙ্গ ওঠেনি?
বাজোরিয়া একটু ভেবে নিয়ে বললে, জী হাঁ, উঠেছিল। ভৈরব বাবু জানালো কি মিসেস জয়া সেনের শেয়ার উনার হাজবেন্ড যাদুগোপালবাবুর হেপাজতে আছে।
– যাদুগোপালের ছিল প্রচন্ড রেসখেলার নেশা, তাই নয়?
– তা হামি কেমন করে জানব হুজুর?
– আপনাদের ওখানে রেস মাঠের ‘বুকি’রা কেউ কেউ আসে, তাই না?
– তা আমি কেমন করে জানব হুজুর? হরেক কিসিমের আদমি আসে। হামি স্লিপিং পার্টনার আছি।
অনেকটা আত্মগতভাবে বাসুসাহেব বললেন, ঠিক কথা! রেস মাঠের বুকিদের নামে এখনো সমন ধরাতে পারেনি। তবে পরের সেশনে আপনি ওদের অনেককেই চিনতে পারবেন। হিটলার, স্তালিন, যাদুগোপালের মতো–
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বিচারকের মুখোমুখি হয়ে বলেন, যোর অনার, আমার মনে হয় আপনি অনুমতি করলে আজকের মতো আমরা এখানেই থামতে পারি। অর্থাৎ এবার আমি এ হিয়ারিঙের ‘কন্টিন্যুয়েন্স’-এর জন্য প্রার্থনা জানাচ্ছি-কাল সকাল দশটা পর্যন্ত।
সলিল সেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বলে, আমাদের তরফে কোনও আপত্তি নেই।
বিচারক সেই মর্মে ঘোষণা করে আদালত সমাপ্ত করলেন
