কৌতূহলী কনের কাঁটা – ১২

বারো

পরদিন সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে কৌশিক বললে, একটা দুঃসংবাদ আছে, মামু। বলেন তো সবিনয়ে নিবেদন করি।

বাসু-সাহেব পট থেকে কাপে ফফি ঢালতে ঢালতে বলেন, এমন কোনো সুপ্রভাতের কথা তো স্মরণ করতে পারছি না কৌশিক, যেদিন প্রাতরাশ টেবিলে দিনটা বিষিয়ে দেবার সুব্যবস্থা তুমি করনি। বল! আমি কর্ণময়। ইদানীং নীলকণ্ঠও হয়ে গেছি! সব জাতের হলাহলই হজম করতে পারছি।

কৌশিক বললে, আপনার মক্কেল আপনার পরামর্শে কান দেয়নি, ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখিত জবানবন্দি দিয়ে বসেছে।

– আরক্ষা-বিভাগের এই সুরক্ষিত গোপন তথ্য তুমি কেমন করে সংগ্রহ করলে?

– সুকৌশলী আবার কী করে জানবে? সুকৌশলে! পুলিশ বিভাগের একাংশ অর্থমূল্যে খবর বিক্রি করে থাকে। আপনি শোনেননি?

– বুঝলাম। জবানবন্দিতে ছন্দা কী বলেছে?

– বলেছে, কমলেশ তাকে ব্ল্যাকমেলিঙের চেষ্টা করছিল। বস্তুত কমলেশ এতদিন আত্মগোপন করে বসেছিল, অপেক্ষা করছিল কত দিনে ছন্দা দ্বিতীয় বার বিয়ে করে। ত্রিবিক্রমনারায়ণের একমাত্র পুত্রকে সে বিয়ে করেছে এই খবর পেয়েই কমল সবিক্রমে আত্মঘোষণা করতে উদ্‌যাগী হয়েছিল। বার-কয়েক ছন্দা নাকি টেলিফোনে কমলেশের সঙ্গে কথা বলে। ছন্দা ওকে উলটে ধমক দেয় যে, যে-মুহূর্তে সে আত্মঘোষণা করবে সেই মুহূর্তেই নানান ব্যক্তি তাকে আক্রমণ করবে – যাদের কন্যা বা ভগ্নীকে ফাঁসিয়ে এতদিন সে আত্মগোপন করে ছিল। এ আশঙ্কা কমলেশের নিজেরও ছিল। তাই সে একটা মাঝামাঝি রফা করতে চেয়েছিল। ছন্দা রাজি হয় যে, শনিবার রাত একটায় সে তারাতলায় তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবে। বস্তুত ত্রিদিব ঘুমিয়ে পড়ার পর সে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করে তারাতলায় চলে আসে। গাড়িটা পার্ক করে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে সে লক্ষ্য করে যে, কমলেশের ঘরে আলো জ্বলছে। ভিতর থেকে একটা বচসার শব্দ ভেসে আসছে। ছন্দা ওই সময় ‘কলবেল টা বাজায়। কিন্তু কেউ সাড়া দেয় না। এই সময় ঝন্কন্ করে কাচের কিছু বাসনপত্র ভেঙে যাবার শব্দ হয় আর তৎক্ষণাৎবাতিটা নিবে যায়।ঠিক তার পরেই ছন্দার নজরে পড়ে দেড়তলার ঘর থেকে কেউ বাঁশের ভারা বেয়ে নেমে আসছে। লোকটার পরনে শার্ট-প্যান্ট, মাথায় লোহার হেলমেট ছন্দা আত্মগোপন করে। একটু পরেই সে শুনতে পায় একটা মোটর সাইকেলের চলে যাবার শব্দ। ছন্দা এরপর নিজের গাড়িতে উঠে বাড়ি ফিরে আসে।– এই হচ্ছে তার জবানবন্দির চুম্বকসার।

– কমলেশের বাড়ির কাছাকাছি অন্য কোনো পরিচিত গাড়িকে সে কি পার্ক করা অবস্থায় দেখেছে? সে-সব কথা কিছু বলেছে?

– না।

– তারপর বোধকরি পুলিশ-অফিসার ওর নাকের ডগায় একটা চাবির-রিং দুলিয়ে প্রশ্ন করেছিল: এটা তাহলে কী করে ঘরের ভিতর পাওয়া গেল?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, তা করেছিল। ছন্দা তার জবাবে বলেছে যে, সে বিকালের দিকে তারাতলায় একবার এসেছিল। কমলেশের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে; কিন্তু বেশিক্ষণ বসতে পারেনি। চাবিটা হয়তো তখনই ওর ভ্যানিটি-ব্যাগ থেকে পড়ে যায়।

বাসু ম্লান হেসে বললেন, কেউ নিজের পায়ে নিজেই কুডুল চালায়, কেউ কুডুলটা খাড়া করে পেতে তাতে পদাঘাত করে! ফল একই!

রানু জানতে চান, এ কথা কেন বলছ?

– হতভাগীকে পইপই করে বলে এলাম যে, পুলিস তোমাকে নানান জাতের রাঙামূলো দেখাবে। লোভে পড়ে কোনোটা গিলতে যেও না। আমার অনুপস্থিতিতে কোনো স্টেটমেন্ট দিও না। তা শুনল না মেয়েটা। প্রথম থেকেই দেখছি– বড্ড একবপ্পা! নিজে যা ভালো বোঝে তাই করবে।

কৌশিক সায় দেয়, ঠিক তাই। পুলিশ নানা সার্কামস্ট্যান্সিয়াল এভিডেন্স থেকে প্রমাণ করবে যে, শনিবার বিকাল থেকে রাত একটা পর্যন্ত ছন্দার কাছে চাবির থোকাটা ছিল। এরমধ্যে হয়তো দু-একবার গ্যারেজের তালা বন্ধ করেছে ত্রিদিব। ছন্দা তা খুলেছে। হয়তো কোনো পেট্রোল পাম্পের ‘বয়’ আদালতে উঠে সাক্ষী দেবে ওই মেমসাহেব রাত আটটার সময় তাদের দোকান থেকে পেট্রোল খরিদ করেছেন – চাবির থোকাটা ওই ছোকরার হাতে দিয়েছেন পেট্রোল ট্যাঙ্ক খুলতে। সেই পেট্রোল পাম্পের মালিক ভাউচারের কাউন্টার ফয়েলে হয়তো ওই মারুতি গাড়ির নম্বরটা এসট্যাব্লিশ করবে।

বাসু বলেন, এসব অনেক অনেক সাক্ষীর সম্ভাবনা তো আছেই। তা ছাড়াও কিছু প্রত্যক্ষ বিপদের সম্ভাবনা আছে। বাস্তবে কে যে কলবেলটা বাজিয়েছে তা আমরা জানি না, কিন্তু ঘটনাস্থলে ওই সময়ে আরও দু-জন বা তিনজন ব্যক্তির উপস্থিতির কথা অনুমান করা যাচ্ছে। যে লোকটা ভারা বেয়ে নেমেছিল, যে-লোকটা দেশলাই জ্বালাচ্ছিল, যে-লোকটা মোটর বাইকে করে পালায় এবং – নিজ স্বীকৃতি মতে – ডক্টর ব্যানার্জি। পুলিস যদি কোনোক্রমে ব্যানার্জির সন্ধান পায় এবং তাঁকে কাঠগড়ায় তোলে তাহলে তিনিই দাবি করবেন যে, কল-বেলটা তাঁরই আঙুলের ছোঁয়ায় বেজেছিল…

সুজাতা বলে, ছন্দা ওই জবানবন্দি দিয়েছে জেনেও–

বাসু বলেন, প্রথম কথা তিনি যদি সত্যিই কলবেল বাজিয়ে থাকেন তাহলে হলফ নিয়ে তিনি মিথ্যা সাক্ষী দিতে পারেন না, এমন কি ছন্দাকে বাঁচানোর জন্যও নয়। দ্বিতীয় কথা: পুলিস যদি ওই ফলস্ ডেথ-সার্টিফিকেটের অস্তিত্ব টের পায় তাহলে ডাক্তারবাবু নিতান্ত বেকায়দায় সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়াবেন। পুলিস যে-ভাবে চাইবে সেভাবেই তাঁকে সাক্ষী দিতে হবে।

কৌশিক বলে, তাছাড়া ওই মোটর-বাইকের আরোহী – সম্ভবত যে ভারা বেয়ে নেমে এসেছিল – তাকেও যদি পুলিশ পাকড়ও করে তাহলে সেও ওই সুযোগটা চাইতে পারে। কারণ বোঝা যাচ্ছে, কলবেলটা যে বাজিয়েছে সে ভিতরে ঢোকেনি!

বাসু-সাহেবের চেম্বারে দিনের প্রথম সাক্ষাৎপ্রার্থী একজন স্বনামধন্য বিশিষ্ট ব্যক্তি। রানু তাঁর আগমনবার্তা ইন্টারকমে জানালেন না। সাক্ষাৎপ্রার্থীকে রিসেপশন-কাউন্টারে বসিয়ে নিজেই চাকা-লাগানো চেয়ারে পাক খেয়ে এঘরে চলে এলেন। বাসুকী একটা নোট দেখছিলেন। চোখ তুলে তাকিয়ে বলেন, কী ব্যাপার? কেউ দেখা করতে চায়?

– তা চায়। ভি. আই. পি. ভিজিটার। স্বয়ং শ্বশুরমহাশয়!

– মানে? কার শ্বশুর?

– কার আবার? তোমার মক্কেলের!

– আই সি! স্বনামধন্য বাণিজ্যচুম্বক ত্রিবিক্রমনারায়ণ। ঠিক আছে। পাঠিয়ে দাও। তাঁকে আমার দরকার। এই বিপুল খরচের ব্যয়ভার মেটানোর জন্যে…

– তুমি কি আশা করছ পুত্রবধূর মামলায় উনি খরচ করবেন?

– তা তো করতেই হবে। ‘খানদান’ বলে কথা! শক্তাবৎ রাজপুত রাও পরিবারের বধূমাতা হত্যার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন অথচ তার শ্বশুরমশাই খচর করবেন না? একি হয়?

– আমি বাজি ধরতে পারি, তুমি ওঁর কাছ থেকে একটা পয়সাও আদায় করতে পারবে না।

– আমি তোমার বাজিটা অ্যাকসেপ্ট করতে পারছি না রানু, সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। তুমি জিতলে অথবা হারলে টাকাটা আমাকে মিটিয়ে দিতে হবে – যেহেতু আমাদের জয়েন্ট-অ্যাকাউন্ট। মহান অতিথিকে আর বেশিক্ষণ বসিয়ে রেখ না। পাঠিয়ে দাও।

রানু দুই ঘরের দরজাটা খুলে নেপথ্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, আসুন রাও-সাহেব।মিস্টার বাসু আপনার প্রতীক্ষা করছেন।

রাও ত্রিবিক্রমনারায়ণ ঘরে প্রবেশ করেলন। ‘বাও’ করলেন, মৃদু হাসলেন, কিন্তু করমর্দনের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলেন না।

বাসু দাঁড়িয়ে পড়েছেন। হাত বাড়িয়ে একটি চেয়ারকে নিদের্শ করলেন। উভয়েই উপবেশন করলেন। নিঃশব্দে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন মিসেস বাসু। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ত্রিবিক্রম বললেন, আপনি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন কেন এই আন্-অ্যাপয়েন্টেড সাক্ষাৎকার?

বাসু সহাস্যে বলেন, আমি বস্তুত প্রতিদিনই আপনাকে প্রত্যাশা করছি! কাগজে যখন দেখলাম, আপনি ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সে বক্তৃতা দিতে কলকাতায় এসেছেন।

– সেটা গৌণ কারণ, ব্যারিস্টার-সাহেব। আমাকে নাসিক থেকে উড়ে আসতে হয়েছে আমার ‘খানদান’-এর খাতিরে।

– বুঝেছি। আপনার পুত্র ত্রিদিবের সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে? কলকাতায় আসার পর? শুনেছি, সে সে সেই রবিবার সকাল থেকে আর আলিপুরের ঠিকানায় থাকে না?

ত্রিবিক্রম হাসলেন। বলেন, ব্যারিস্টার-সাহেব, আমার মনে হয় আমি যে উদ্দেশ্যে এসেছি, যে প্রস্তাবটা পেশ করতে চাই, তা প্রথমে দাখিল করি। তারপর আপনি আপনার সওয়াল শুরু করবেন…

– ঠিক আছে। বলুন, কী আপনার প্রস্তাব?

– দেখুন বাসু-সাহেব, আমি খোলা কথার মানুষ। শুনেছি, আপনিও তাই। আমি পেশাগতভাবে একজন ‘ফিনানশিয়ার’। টাকা খাটাই। দৈনিক লাখ লাখ নয়, কোটি টাকা হাত ফিরি হয়। সবই যে আমার টাকা তা নয়, তবে আমার হাত দিয়ে যায়। এর ফলে বেশ কিছু সুদক্ষ আইনজীবীকে আমি মাস-মাহিনায় রাখতে বাধ্য হয়েছি। তবে তারা সবাই করপোরেট বা কমার্শিয়াল-ল-এর বিশেষজ্ঞ। সবাই দেওয়ানি আদালতের। আপনিই আমা ‘কর্মজীবনে’ প্রথম ক্রিমিনাল ল-ইয়ার, যাঁর সঙ্গে আমাকে কারবার করতে হচ্ছে।…আমি জানি, দেওয়ানি আদালতের ওই সব গয়ংগচ্ছ আইন বিশারদের মতো গদাই-লস্করি চাল আপনাদের পোষায় না। আপনাদের অত্যন্ত দ্রুত অথচ নির্ভুল বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হয় – কারণ ভুল হলে আপনার মক্কেল গাঁটগচ্চা দিয়েই নিষ্কৃতি পাবে না; তাকে জেল খাটতে হবে বা ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে…

বাধা দিয়ে বাসু বলেন, আপনি কিন্তু কাজের কথায় এখনও আসেননি। ভূমিকাটা সংক্ষেপ করলে দু-পক্ষেরই সুবিধা।

– ধন্যবাদ। আমার পুত্র আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে প্রথম সুযোগেই। সে তার সহধর্মিণীকে বাঁচাতে চায় – খুবই স্বাভাবিক প্রেরণা। কিন্তু যেহেতু তার ধমনীতে শক্তাবৎ-রাজবংশের রক্ত বইছে, যেহেতু সে রাঠোর রাজপুত, তাই সে মিথ্যার সঙ্গে আপোস করতে অসম্মত। স্ত্রীর প্রতি অনুরাগ বা সহানুভূতি তাকে কিছুতেই সত্য থেকে বিচলিত করবে না। এই তার খানদান!

বাসু পাইপে আগুন দিতে দিতে বলেন, আপনি কিন্তু ভূমিকা পর্যায়েই আটকে আছেন এখনও। আমাকে নতুন কোনো তথ্য সরবরাহ করতে পারেননি।

– আমি আমার বক্তব্যের বনিয়াদটা বানাচ্ছিলাম।

সেটা নিতান্ত নিষ্প্রয়োজন। আপনার পুত্র তার নিদ্রাগতা ধর্মপত্নীকে ত্যাগ করে স্ত্রীর অজ্ঞাতসারে আমার সঙ্গে এবং থানা অফিসারের সঙ্গে দেখা করে ইতিপূর্বেই ‘ফাউন্ডেশনটা’ বানিয়ে ফেলেছে। আপনি সরাসরি সুপার-স্ট্রাকচারের বক্তব্যে আসতে পারেন।

– ঠিক আছে। বক্তব্যটা এই: আমার পুত্র আপনাকে নিয়োগ করেছিল তার স্ত্রীর তরফে। সে কোনে। ‘রিটেইনার’ দিয়ে যায়নি। আমি জানি, অগ্রিম না পাওয়া সত্ত্বেও আপনি ত্রিদিবের স্ত্রীর জন্য অনেক ছোটাছুটি করছেন, অনেক খরচও ইতিমধ্যে করে বসে আছেন। আমি এও জানি যে, আপনি প্রত্যাশা করছেন যে, আপনার ‘ফি’টা আমি মিটিয়ে দেব। আপনি জানেন যে, আমার পুত্রের নিজস্ব বলতে কিছুই নেই। তার সব খরচপত্র আমিই বহন করি।…আমি ত্রিদিবের নির্বাচন ক্ষমতাকে নিশ্চয় তারিফ করব। তার স্ত্রী যে জটিল মামলায় জড়িয়ে পড়েছে তা থেকে তাকে মুক্ত করবার ক্ষমতা যদি কলকাতার কোনো আইনজীবীর থাকে তবে তিনি হচ্ছেন পি. কে. বাসু, বার-অ্যাট-ল! তাই এই পর্যায়েই আমার মনে হল, আপনাকে জানিয়ে রাখা উচিত যে, আমি আপনার যাবতীয় বিল মেটাব কিন্তু একটি শর্তসাপেক্ষে–

– বলুন? আমার এখন শুধু শুনে যাওয়ার কথা।

– বলছি। কিন্তু মুশকিল কী জানেন? মন খুলে আপনাকে সব কথা যে বলা যায় না!

– কেন?

– কারণ ইতিপূর্বেই পাবলিক প্রসিকিউটার অ্যাডভোকেট নিরঞ্জন মাইতি মশায়ের সঙ্গে এই কেসটা নিয়ে কিছু আলাপচারি হয়েছে। তিনি আমাকে কথাপ্রসঙ্গে জানিয়েছেন: মামলাটা কোন্ পথে পরিচালনা করার প্রকল্পনা আছে তাঁর। সেটা তিনি আমাকে বিশ্বাস করে বলেছেন। তা নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে পারি না। তাতে বিশ্বাসভঙ্গ করা হবে।

– বটেই তো! সুতরাং?

– কিন্তু আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলে বিখ্যাত। আপনি যদি নিজে থেকেই সেটা অনুমান করে আমাকে জানান, তাহলে আমি বিশ্বাসভঙ্গ না করেই ব্যাপারটা আলোচনা করতে পারি!

বাসু-সাহেবের দশটা আঙুল দশ সেকেন্ড গ্লাসটপ টেবিলে টরে-টক্কা বাজালো। তারপর তিনি বললেন, আপনি বোধহয় বলতে চান যে, যতদিন আপনার পুত্র এবং ছন্দার সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রী, ততদিন মাইতি মশাই ত্রিদিবকে সাক্ষীর মঞ্চে তুলতে পারবেন না। ফলে, মাইতিমশায়ের প্রথম স্ট্র্যাটেজি হবে ওই বিবাহটা অ্যানাল করা অর্থাৎ বিবাহ-মুহূর্ত থেকে অসিদ্ধ প্রমাণ করা। তাই তো?

– ধন্যবাদ। আমি জানতাম, আপনি সঠিক অনুমান করতে পারবেন এবং এটাও আপনি অনুমান করতে সক্ষম যে, আমি ওই বিবাহটাকে অসিদ্ধ প্রমাণ করার বিষয়ে কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করি। তাই না?

– আপনার ধারণায় পুত্র অবাঞ্ছিত বিবাহবন্ধনে নিজেকে আবদ্ধ করেছে। তাই কি?

– নিশ্চয়! সে এমন একটি স্ত্রীলোককে বিবাহ করেছে যে অন্যপূর্বা, যে বয়সে বড়ো, যার ‘খানদান’ নেই এবং শুধুমাত্র আমার পুত্রের বৈভবের কথা চিন্তা করেই তাকে বিবাহ করছে।

– সে কী? আপনি তো এইমাত্র বললেন যে, .আপনার একমাত্র পুত্র কপর্দকহীন! স্ত্রীকে ভাত-কাপড়ের জোগান দেবার প্রয়োজনে তাকে বাপের কাছে হাত পাততে হয়।

ত্রিবিক্রম আগুনঝরা চোখে বাসু-সাহেবের দিকে সেকেন্ড-পাঁচেক নির্বাক তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্তকণ্ঠে বললেন, আপনার মক্কেল জানে, তার স্বামী আমার সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র ওয়ারিশ।

বাসু-সাহেব অ্যাশট্রেতে ছাইটা ঝেড়ে ফেলে বললেন, লুক হিয়ার, মিস্টার রাও! আপনি অহেতুক কুণ্ঠা করছেন। আপনার প্রস্তাবটা আমিই বাতলে দিচ্ছি। দেখুন মেলে কি না। যে মেয়েটি খুনের মামলায় ফেঁসেছে তার যাবতীয় ব্যয়ভার আপনি মেটাতে স্বীকৃত একটি শর্তসাপেক্ষে। শর্তটা হল এই যে, আমি ‘ম্যারেজ-অ্যানালমেন্ট’ কেসটাতে কোনো ডিফেন্স দেব না। নির্বিবাদে ছন্দার সঙ্গে ত্রিদিবের বিবাহটা আইনত অসিদ্ধ হয়ে যাবার পর আমি মেয়েটিকে খুনের দায় থেকে বাঁচাব। অর্থাৎ বিবাহটা নাকচ হতে দিলেই আপনি আমার ফিজ মেটাবেন, আর আসামি যদি আপনার পুত্রবধূ হিসাবে মামলা লড়ে তাহলে আপনি একটি কানাকড়িও ঠেকাবেন না। মোদ্দা কথাটা তো এই?

ত্রিবিক্রম একটু নড়েচড়ে বসলেন। অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলে অবশেষে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন, তবে বড়ো চাঁচাছোলা ভাষায়।

– কিন্তু মূল বক্তব্যে কোনো ভুল নেই। তাই নয়?

– হ্যাঁ, তাই। অবশ্য আমার সঙ্গে সহযোগিতা করলে-আপনার ন্যায্য বিলই শুধু মেটাব না, তার চেয়ে অনেক-অনেক বেশি…

বাসু বাধা দিয়ে বলেন, ‘বিল’-এর উপর ‘টিপ্স’ দেওয়া হবে। এই কথা কি বলতে চান?

– ছিঃ। আমি ‘সম্মানমূল্যের’ কথা বলছি। ‘অনারেরিয়াম্’…

– বুঝেছি, বুঝেছি। বিহারে ওকে বলে ‘এথি’, রাখা-ঢাকা-বাংলায় ‘পান খেতে দেওয়া’, বফর্স কেস-এর ব্যাপারে বিজনেস্ ওয়ার্ল্ডে ‘কমিশন’আর হর্ষদ মেহতা বা আপনার মতো ধনকুবেরদের ভাষায় ‘অনারেরিয়াম’! প্রাকৃতজনের খেলো কথায়: ‘ঘুষ’! তাই তো?

ত্রিবিক্রম প্রতিবাদ করেন, এবার আপনার জবাবটা এককথায় শুনে যাই?

বাসু বলেন, তা কেমন করে হবে রাও-সাহেব? প্রস্তাবটা পেশ করার আগে আপনি দীর্ঘ ধানাই-পানাই-ভূমিকার ফাউন্ডেশন গেড়েছেন, এখন এককথায় আমার জবাবটা শুনতে চাইলে আমিইবা রাজি হব কেন? আমার জবাবেরও একটা ভূমিকা চাই তো?

– ঠিক আছে। বলুন?

প্রথম কথা : ত্রিদিবনারায়ণ রাও একটি মেরুদণ্ডহীন ইনভার্টিব্রেট! এ কথা আপনিও জানেন, আমিও জানি। কিন্তু এ দুর্ঘটনার জন্য সে বেচারি কতটা দায়ী, আর কতটা আপনি, সে-কথা আমি জানি, কিন্তু আপনি জানেন না…

ত্রিবিক্রম চাপা গর্জন করে ওঠেন, আপনি এভাবে আমাকে বাগে পেয়ে অপমান করছেন?

বাসু-সাহেব বলেন, অপমান। না তো! আপনি প্রস্তাবটা পেশ করার অবকাশে ধরে নিতে পারলেন যে, আমি সজ্ঞানে আমার মক্কেলের সর্বনাশ করব, আমি একজন অযোগ্য ঘুষখোর অ্যাটর্নি; আর আমি তার জবাব দেবার সময় ‘আর্ন্ত’ করতে পারব না, আপনি সজ্ঞানে আপনার সন্তানের সর্বনাশ করেছেন, আপনি একজন অযোগ্য অপরিণামদর্শী পিতা?

পুরো আধ মিনিট ত্রিবিক্রমের বাক্যস্ফূর্তি হল না। তারপর দাঁতে দাঁত দিয়ে বললেন, আপনি আমার প্রস্তাবটা গ্রহণ করেছেন, না– না?

– প্লিজ মিস্টার রাও! আমাকে বলতে দিন।

– কী বলবেন? বলুন?

– আপনার আশঙ্কা হয়েছে যে, ছন্দা যদি আপনার পুত্রবধূ হয়ে টিকে থাকে তাহলে আপনার একচ্ছত্র সাম্রাজ্যে একটা বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। ছন্দা হয়তো ভালোবাসার জোরে স্বামীর মেরুদণ্ডের ‘কার্টিলেজ’-হয়ে যাওয়া অস্থিগুলোকে কঠিন করে তুলবে। তাই আপনি তাকে সরাতে বদ্ধপরিকর। তাই না?

– আপনি কিন্তু এখনও আমার প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরটা দেননি।

– দিইনি? এবার তাহলে তাই দিচ্ছি: আমি ছন্দা রাওয়ের ডিফেন্স কেসটা নিয়েছি। সে আমার মক্কেল। তার স্বার্থের কথা সবার আগে দেখব আমি। আপনার পুত্রের মুখটা বন্ধ রাখতে পারলেই আমার মক্কেলের মস্ত সুবিধা। ফলে বিবাহ-নাকচের মামলাটা আমাকে লড়তেই হবে– জান-কবুল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই!

– কিন্তু আইনজ্ঞ হিসাবে আপনি তো বুঝতে পারছেন যে, সে চেষ্টা বৃথা। অ্যাডভোকেট মাইতি বলেছেন, এটা জাস্ট ‘ওপেন অ্যান্ড শাট কেস’– দশ-মিনিটের ভিতর বিবাহটা নাকচ হয়ে যাবে, যেহেতু ছন্দা যখন আমার পুত্রকে রেজিস্ট্রি-বিবাহ করে তখনও কমলেশ জীবিত। ছন্দা সেই মুহূর্তে ছিল বিবাহিতা।

বাসু বললেন, মামলায় হার-জিত থাকেই। আমি মাইতির সঙ্গে একমত: মামলার রায় হয়তো দশ মিনিটেই দেওয়া যাবে;কিন্তু, ‘প্রফেশনাল এথিক্স’ বলে তো একটা কথা আছে। বিবাহ নাকচের মামলাটা আমাকে লড়তেই হবে।

– আপনার মক্কেল যদি আপনার ফিজ না মেটাতে পারে, তবুও?

– মামলা জিতলে সে নিশ্চয় আমার প্রাপ্য মিটিয়ে দেবে। কারণ তখন তার স্বামী হয়ে যাবে কোটিপতির ওয়ারিশ। আর তার যদি সাময়িকভাবে সে ক্ষমতা না থাকে তাহলে খানদানের খাতিরে তার স্বনামধন্য শ্বশুরমশাই নিশ্চয় পুত্রবধূকে ঋণমুক্ত করে দেবেন।

– সেই হিসাবটাতেই প্রচণ্ড ভুল হচ্ছে আপনার।

– হতে পারে। আপনি বাণিজ্যচুম্বক। ‘ফাটকা’ নিশ্চয় খেলেন, অন্তত ফাটকা খেলা কাকে বলে তা জানেন। আমি একটা ফাটকা খেলছি। হারলেও এটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে, একজন নিষ্ঠুর কোটিপতি শ্বশুরের বিরুদ্ধে এক অসহায় নিঃস্ব পুত্রবধূর হয়ে লড়েছি। বিনা পারিশ্রমিকে। আর জিতলে? সেক্ষেত্রে আপনি এই ঘরে ওই চেয়ারে বসে আমাকে আমার ন্যায্য পারিশ্রমিকটুকু মিটিয়ে দেবেন। বিনা ‘টিপ্স’-এ।

ত্রিবিক্রমনারায়ণ চেয়ারে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। একটা বিচিত্র ব্যঙ্গহাস্য ফুটে উঠল তাঁর ওষ্ঠাধরে। বললেন, এরপর আর কথা চলে না। আমরা দুজনেই দুজনকে চিনেছি। ঠিক আছে। খেলুন ফাটকা! প্রাণ ভরে। নমস্কার।