কৌতূহলী কনের কাঁটা – ১৫

পনের

পরদিন বাসু-সাহেব জেল-হাজতে গিয়ে ছন্দার সঙ্গে দেখা করলেন। ওঁর মনে হল দু-দিনেই ছন্দা বেশ ভেঙে পড়েছে। তার চোখের কোলে কালি। বোধহয় রাত্রে ঘুম হয় না। বাসু-সাহেবকে দেখে বলল, মামলার দিন পড়েছে?

– হ্যাঁ, পড়েছে। তোমাকে জানিয়েও গেছি। তোমার মনে নেই?

– না, মনে পড়ছে না। আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড!

– তা বললে তো চলবে না, ছন্দা। তোমাকে লড়তে হবে।

– কার বিরুদ্ধে?

– যারা টাকার জোরে তোমার মতো অসহায় মেয়ের সর্বনাশ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে। তুমি তো খুনটা করনি, অথচ…

– কে বললে? না, স্যার, আমি পরে ভেবে দেখেছি, খুনটা আমিই করেছি।

– জানি। আমার মনে আছে। তুমি বলেছিলে, কমলেশ দু-হাত বাড়িয়ে তোমার দিকে এগিয়ে আসে। তুমি তখন মেঝে থেকে একটা কিছু কুড়িয়ে নাও। ঘটনাচক্রে সেটা একটা গ্যালভানাইজড্ পাইপের টুকরো। তুমি সেটা এলোপাথাড়ি ঘোরাতে থাকো। তাতেই কমলেশ আহত হয়; তাই না?

– হ্যাঁ, তাই।

– কিন্তু তুমি স্বচক্ষে ওকে আহত হতে দেখনি, ঠিক তখনই আলোটা কে যেন নিবিয়ে দেয়।

– অথবা আলোটা ফিউজ হয়ে যায়।

– কিন্তু প্রথমবার আমাকে তা বলনি, বলেছিলে ‘সুইচ অফ’ হবার শব্দ তুমি স্বকর্ণে শুনেছ। ঘরে তৃতীয় ব্যক্তি ছিল, যে লোকটা বারে-বারে অন্ধকার ঘরে দেশলাই কাঠি জ্বালাচ্ছিল।

– হ্যাঁ, তা জ্বালাচ্ছিল।

– এবং তোমার মনে হল, ভারা বেয়ে সেই লোকটা নেমে গেল।

– হয়তো সে-লোকটা নয়। কারণ আমি যখন দরজা খুলে বার হয়ে আসি তখনও সে ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে। ভারা বেয়ে যে নেমে যায়, সে অন্য একজন।

– এবং আরও অন্য একজন বাইরে থেকে কলিং বেল বাজাচ্ছিল।

– হ্যাঁ, তাই।

– তার মানে কমলেশ খুন হবার সময় তুমি ছাড়া আরও দু-তিনজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। তাছাড়া কাগজে যে খবর বার হয়েছিল তাতে লেখা হয়: কমলেশের মাথার পিছন দিকে আঘাত লাগে। তা কেমন করে হয়? তুমি যখন এলোপাথাড়ি পাইপটা ঘোরাচ্ছিলে তখন সে তো তোমার দিকে ফিরে ছিল?

– কী জানি। আমি কিছু চিন্তা করতে পারছি না।

– একটা কথা অন্তত বল। কমলেশের সঙ্গে যখন দেখা করতে যাও– শনিবার রাত একটা নাগাদ, তখন ওর বাড়ির কাছে, রাস্তায় তুমি কি গাড়িটা লক করে যাওনি? ঐ অত রাত্রে গাড়িটা অরক্ষিত রেখে গেছিলে!

– হ্যাঁ তাই। নাহলে। আমি ফেরার সময় গাড়িতে ঢুকতে পারতাম না। চাবিটা তো তার আগেই ওই ঘরে পড়ে গেছিল।

– আমি যুক্তির কথা জিজ্ঞেস করছি না ছন্দা, স্মৃতির কথা জিজ্ঞেস করছি। তোমার কি স্পষ্ট মনে আছে যে, কমলেশের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে কী করে গাড়িতে উঠলে? চাবি দিয়ে দরজা খুলেছিলে কিংবা খোলনি?

– আমার কিছু মনে পড়ছে না। তখন আমি অত্যন্ত উত্তেজিত ছিলাম।

– ন্যাচারালি। কিন্তু চাবিটা তো ছিল তোমার ভ্যানিটি ব্যাগের ভিতর। কমলেশের ঘরে চাবিটা পড়ে গেল কী করে? ভ্যানিটি ব্যাগ তুমি ওর ঘরে ঢোকার পর খুলেছিলে?

– আমার মনে নেই! তবে ওই ব্যাগেই ছিল ডাক্তার ব্যানার্জির রিভলভারটা। হয়তো কমলেশ যখন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তখন আমি ব্যাগ খুলে যন্ত্রটা বার করতে চেয়েছিলাম…

– এ-ও তো ডিডাকশন। চাবিটা কীভাবে তোমার ব্যাগ থেকে বার হয়ে মাটিতে পড়ে গেল তার যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ। তোমার স্মৃতি কী বলে? তোমার মনে আছে কি, যে ব্যাগ খুলেছিলে?

– না, মনে নেই।

বাসু-সাহেব এবার তাঁর ব্রিফকেস্ খুলে একটা আবেদনপত্র বার করে ওর হাতে দিলেন। ছন্দা জানতে চায়, কী এটা?

– ত্রিদিবনারায়ণের বিরুদ্ধে তোমার বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন।

– কিন্তু আমি তো বিবাহ-বিচ্ছেদ চাই না…

– এর পরেও? আদালতের বারান্দায় সে সর্বসমক্ষে তোমাকে যে গালাগাল দিল, যে ব্যবহার করল…

ছন্দা ওঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে, সেটা ওর অপরাধ নয় স্যার, সেটাই ওর অসুখ! ও একটা অবসেশনে ভুগছে। ও যা কিছু করছে তা ওর বাবার নির্দেশে…

– তা কেমন করে হবে, ছন্দা? তোমাকে একা বিছানায় ফেলে রেখে ঘটনার পরদিন শনিবার আক্ষরিক অর্থে সাত-সকালে সে যখন আমার কাছে আসে তখন তার বাবা কলকাতায় ছিলেন না। আমার নিষেধ সত্ত্বেও সে যখন পুলিসে যায় তখন সে স্বেচ্ছায় যায়, বাবার নির্দেশে নয়…

– স্বেচ্ছায় নয়, স্যার। ‘স্ব-ইচ্ছা’ বলে ওর কিছু নেই। গুর ইচ্ছাটাই ওরা বদলে দিয়েছে। ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ, ন্যায়-অন্যায়, বিচার-বুদ্ধিটা ওর বাবা মগজ ধোলাই করে ধ্বংস করে দিয়েছে।

বাসু নিজের পকেট থেকে ফাউন্টেন পেন বার করে খাপটা খুলে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরেন। বলেন, তুমি বারে বারে অবাধ্য হয়েছে। তোমাকে আমি বারণ করেছিলাম যে, পুলিশের কাছে কোনও জবানবন্দি দেবে না। তুমি আমার কথা শোননি ফলে আত্মরক্ষার্থে তুমি কমলেশকে হত্যা করেছ– যেটা হতে পারত আমার শেষ প্রতিরোধ– তা আর দাঁড় করানো যাবে না। কারণ তুমি বলেছ যে, তুমি বাড়ির ভেতরেই যাও নি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল বাজাচ্ছিলে। কিন্তু বাস্তবে কলবেল কে বাজাচ্ছিল জান? ডক্টর ব্যানার্জি।

– ডক্টর ব্যানার্জি! তিনি তখন ওখানে কেন আসবেন?

– কেন আসবেন, তা তুমি জান। যে কারণে তোমাকে বেআইনীভাবে রিভলভারটা দিয়েছিলেন। যে কারণে তোমাকে একটা ফল্স ডেথ সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন। তার প্রতিদানে তুমি এবার চাও তোমার বদলে তিনি এসে খুনের মামলার আসামী হয়ে দাঁড়ান?

ছন্দা অসহায়ভাবে ওঁর দিকে তাকায়।

– হ্যাঁ, ডক্টর ব্যানার্জি সেই শুক্রবার রাত্রে কিছুতেই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেননি। তিনি আমার কাছে স্বীকার করেছেন যে, উনি শনিবার রাত একটা নাগাদ মা সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টে এসেছিলেন। তিনিই কলিংবেলটা বাজিয়েছিলেন।তাঁকে লালবাজার থেকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ডিভোর্সের মামলার দিন ত্রিদিবের অ্যাডভোকেট কী প্রশ্ন করেছিল মনে নেই?

এই সময় হাজতের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টার মুখ বাড়িয়ে বলে, সময় হয়ে গেছে স্যার, এবার আসুন আপনি–

বাসু বলেন, আর এক মিনিট।

লোকটা চলে যেতেই বাসু-সাহেব কলমটা ছন্দার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেন, ডক্টর ব্যানার্জিকে তুমি এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পার না, ছন্দা, ডু অ্যাজ আই সে! সই কর।

ছন্দা আর আপত্তি করে না। কলমটা হাত বাড়িয়ে নেয়। বিবাহ-বিচ্ছেদ দরখাস্তের চিহ্নিত স্থানে গোটা-গোটা হরফে নিজের নামটা সই করে দেয়।

বাড়িতে ফিরে এসে শোনেন একটা অদ্ভুত সংবাদ:

ডাক্তার ব্যানার্জি অ্যাবডাক্টড!

নার্সিং-হোম থেকে জবা ফোন করে জানিয়েছে। গতকাল মধ্যরাত্রে নাকি জবার চোখের সামনেই একদল লোক ডক্টর ব্যানার্জিকে তুলে নিয়ে গেছে। খবরটা পেয়েই কৌশিক চলে যায় নার্সিং-হোমে। জবার সঙ্গে কথা বলে। সেখান থেকে থানায় যায়। তারপর ফিরে এসে বাসু-সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছে।

বাসু বলেন, ‘জোর করে তুলে নিয়ে গেছে’ মানে কী?

কৌশিক যা বিবরণ দিল তা এই রকম:

গতকাল রাত আটটা নাগাদ একটা এমার্জেন্সি কেস আসে। জবা সচরাচর ঐ আটটা নাগাদ বাড়ি চলে যায়। শেয়ালদহ হয়ে বেলঘরিয়া। কিন্তু এমার্জেন্সি কেসটার জন্য ও আটক পড়ে যায়। এর আগেও এমন ঘটনা দু’একবার হয়েছে। ডক্টর ব্যানার্জি ব্যাচিলার, একা থাকেন, তাই তাঁর কোয়ার্টার্সে রাত কাটায় না। হয় নার্সিং-হোমে বসে বসেই রাতটা কাটিয়ে দেয়। অথবা ওর দিদির বাড়িতে চলে যায়। সেটা কাছাকাছিই। গতকাল রাত এগারোটা নাগাদ রোগীটিকে অপারেশন থিয়েটার থেকে ইন্টেন্সিভ-কেয়ার ইউনিটে অপসারণ করা হয়। তারপর রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ ডাক্তার ব্যানার্জি গাড়ি নিয়ে জবাকে তার দিদির বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য বার হন।কিন্তু কিছুটা যেতেই নির্জন গলির মুখে আর একটা কালো রঙের অ্যাম্বাসাডার ওঁর গাড়ির পথরোধ করে দাঁড়ায়। ডক্টর ব্যানার্জি কিছু বলার আগেই সেই গাড়ি থেকে দু-তিনজন লোক নেমে আসে। ব্যানার্জি তখন নিজের গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়েছেন! তিনি বলেন, এভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন কেন? এখনি তো অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যেত!

ও-গাড়ি থেকে যারা কাছে ঘনিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে দুজন ডাক্তারবাবুর দুদিকে চলে যায়। তাদের একজনের হাতে রিভলভার। ডক্টর ব্যানার্জির তলপেটে মারণাস্ত্রটা ঠেকিয়ে লোকটা বলে, চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না। এ গাড়িতে উঠে বসুন।

একজন জবার কাছে এগিয়ে আসে। তার হাতে একটা ছোরা। লোকটা বলে, দিদি, কোনও শব্দ করবেন না। জানে মারা পড়বেন। আমরা চলে গেলে একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি চলে যাবেন। ডাক্তারবাবুর গাড়ি এখানেই পড়ে থাক।

জবা জবাবে কিছু বলার আগেই ঐ কালো রঙের অ্যাম্বাসাডারখানা ডাক্তারবাবুকে নিয়ে হাওয়া।

জবা নার্সিং হোমে ফিরে যায় হেঁটেই। থানায় ফোন করে। থানা থেকে এনকোয়ারিতে আসে মধ্যরাতে। জবার জবানবন্দি নেয়। ডাক্তারবাবুর গাড়ির ইগ্মশন চাবি ড্যাশবোর্ডে লাগানোই ছিল। ওরা গাড়িটা নিয়ে গ্যারেজজাত করে চলে যায়।

বাসু বলেন, এতবড় একটা ব্যাপার হয়ে গেল, জবা তাহলে কাল রাতে আমাকে ফোন করেনি কেন?

– ও বললে, ততক্ষণে রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেছে, তাই!

– অল রাইট। আজ সকাল ছয়টা-সাতটার সময় সে ফোন করে আমাকে জানায়নি কেন?

– ও তো বলছে, বার-কতক চেষ্টা করেছিল। কানেক্সশন পায়নি। যখন কানেকশন পায়, ততক্ষণে আপনি ছন্দাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে গেছেন।

বাসু চিন্তিত মুখে বারকতক পদাচারণ করে বললেন, সবটা তদন্ত করে তোমার কী মনে হল, কৌশিক?

– থানা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে মনে হল, সে ব্যাপারটায় খুব কিছু গুরুত্ব দিচ্ছে না।

– তাই বা কী করে সম্ভব? ডক্টর ব্যানার্জি একজন অত্যন্ত নামকরা চিকিৎসক, তিনি এভাবে অপহৃত হয়ে গেলেন তাতে থানা বিচলিত নয়?

– দুটো সম্ভাবনার মধ্যে একটা আপনাকে বেছে নিতে হবে, মামু!

– কী দুটো সম্ভাবনা?

– এক নম্বর: পুলিশ জানে, ডাক্তার ব্যানার্জি কমলেশ-হত্যা মামলায় সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়াতে চান না এবং আপনিও তা চান না। তাই পুলিশ মনে করছে, এটা আপনার পরিকল্পনা মোতাবেক। অর্থাৎ অ্যাবডাকশনটা আপনিই সাজিয়েছেন। দু’নম্বর: থানা জানে যে, লালবাজার থেকে এটা অর্গানাইজ করা হয়েছে, অর্থাৎ ডাক্তার ব্যানার্জিকে আপনার নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে। মামলার দিন সকালে তথাকথিত অপহারকদল তাঁকে মুক্তি দেবে। আর তৎক্ষণাৎ পুলিশ তাঁকে সমন ধরাবে। তার মানে, আপনার বিনা তালিমে ডাক্তার ব্যানার্জি সাক্ষীর-মঞ্চে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।

বাসু-সাহেব নিঃশব্দে বারকতক পদচারণা করে হঠাৎ থেমে পড়েন। নিজের চেয়ারে বসে বললেন, তোমার দুটো যুক্তির একটাও ধোপে টেকে না।

– কেন?

– প্রথম কথা, আমি যে ‘অপারেশন-অ্যাবডাকশন’-এর পরিচালক নই তা তোমরা সবাই জান। তোমার দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাও গ্রাহ্য নয়– এই সামান্য কারণে পুলিস ডক্টর ব্যানার্জির মতো একজন বিখ্যাত চিকিৎসককে ‘অ্যাবডাক্ট’ করবে না।

– তা হলে উনি অপহৃত হলেন কেন?

– এটা ডক্টর ব্যানার্জি আর জবা মিলে অর্গানাইজ করেনি তো?

– মানে?

– মানে, সবটাই সাজানো! ডক্টর ব্যানার্জি যখন বুঝল যে দিন দশ-পনেরোর জন্য– অর্থাৎ ঐ হত্যামামলার শুনানী পর্যত– সে নিরুদ্দেশ হতে পারবে না, তখন নিজেই এই অপহরণটা সাজায়নি তো?

– সেজন্য ডাক্তার ব্যানার্জির মতো একজন ছাঁপোষা মানুষ এমন একটা অপহরণ অর্গানাইজ করাবে?

– আরে বাপু অপহরণটা তো জবার বর্ণনা মোতাবেক? আর কোনও সূত্রে তো আমরা জানি না যে ডাক্তারবাবু আদৌ অপহৃত হয়েছেন!

– তা বটে।

– সবটাই ডক্টার ব্যানার্জির উর্বর মস্তিষ্কের পরিকল্পনা বলে মনে হচ্ছে। তোমারা জান যে, লালবাজার থেকে ডাক্তারের উপর একটা নির্দেশ জারী করা হয়েছিল। কলকাতার বাইরে গেলে সে যেন তার ঠিকানা রেখে যায়। সে তখন আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে চেয়েছিল। আমি প্রত্যাখ্যান করি। হয়তো তখন ডাক্তার আর তার নার্স উদ্ভট পরিকল্পনাটা করে! সেক্ষেত্রে জবা সব কিছুই জানে। আর সে জন্যই কাল রাত্রে আমাদের অহেতুক ডিসটার্ব করেনি। আজ সকালেও তার টেলিফোন করতে এত দেরী হয়ে যায়।

সুজাতা বললে আপনি ঠিকই বলেছেন, মামু। ডাক্তার ব্যানার্জি যদি সত্যিই ঐভাবে অপহৃত হতেন তাহলে জবা নার্সিং হোমের কোন লোককে সঙ্গে নিয়ে রাত্রেই ট্যাক্সি করে এখানে চলে আসত। বিশেষ, থানা যখন তাকে আমল দিচ্ছে না।

বাসু পাইপে তামাক ঠেশত ঠেশ বলেন, প্রায় সবগুলো অসঙ্গতির যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, শুধু একটি বাদে –

রানু জানতে চান, কী সেটা?

– রাত একটার সময় ছন্দা কোন্ আক্কেলে তারাতলায় তার মারুতি-সুজুকি গাড়ির কী-বোর্ডে ইগ্মশিন চাবি রেখে, গাড়িটা লক না করে কমলেশের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়!

রানু বললেন, সে সময় ও খুব উত্তেজিত ছিল।

– না, রানু, ছিল না। ফেরার পথে সে উত্তেজিতা ছিল। ফলে সে ফেরার সময় কী করে গাড়িতে ওঠে এটা তার মনে না থাকতে পারে। কিন্তু গাড়িটা তারাতলার মতো কারখানা-এলাকায় ঐভাবে অত রাত্রে সে কেন অরক্ষিত রেখে গেল? গাড়ি থেকে নেমে গেলে ড্রাইভার কাচ উঠিয়ে গাড়ি লক করে। এটা প্রায় প্রতিবর্তী প্রেরণায়। অভ্যাসবশে। দেখলে না, ছন্দা তার জবানবন্দিতে বলল, বাড়ি ফিরে এসে যখন গাড়ি গ্যারেজ করে তখন সে স্লাইডিং ডোরটা টেনে গ্যারেজটা বন্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। অ্যামবাসাডার গাড়িটা একটু সরে-নড়ে যাওয়ায়। তখন সে খুবই উত্তেজিতা। তবু নিজের গ্যারেজের ভিতর সে গাড়ি লক্ করতে চেয়েছে। আর হপ্তাবারে…মানে সপ্তাহান্তে রাত একটার সময় তারাতলার মতো কারখানায়-ভর্তি এলাকায় সে গাড়ি লক্ না-করে গাড়ি থেকে নেবে যাবে? নাঃ। মিলছে না…

– কিন্তু গাড়ি যদি সে লক্-করে নেমে যায়, তাহলে চাবি ছাড়া সে গাড়িতে উঠবে কী করে?

– দ্যাটস্ দ্য মিলিয়ান-ডলার কোশ্চেন!