যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ২

দুই

ক্রিরিং–ক্রিরিং–ক্রিরিং–ক্রিরিং–। হাত বাড়িয়ে রিসিভারটাকে ধারকযন্ত্রের সুখশয়ন থেকে তুলে কাকলি কানে লাগাল। তার কথা-মুখে বলল, সুজাতা ফটোগ্রাফিক স্টোরস–

– কুড আই টক টু মিস দত্তা? কাকলি দত্তা?

– স্পিকিং।

– আই থট অ্যাজ মাচ। কাকলি, আমি ভৈরব কথা বলছি।

কাকলি চিনেছে ঠিকই, কিন্তু ফিলম প্রডিউসার ভৈরব দাশ যে তার জাগর-মনের কোনও প্রান্তে নেই, এটাই প্রমাণ করতে বললে, এক্সকি্যুজ মি। কোন ভৈরব?

– ভৈরব দাশ। কেন ন্যাকামি করছ, কলি? চিনতে আমাকে ঠিকই পেরেছ। কেমন আছ?

– ভাল আছি। কাজের কথা কিছু কি বলার আছে?

– তা আছে। তুমি আমাকে চার-মিঠা দেখাতে বলেছিলে, মনে আছে?

– কী দেখাতে বলেছিলাম?

– চার-মিঠা। ফোর সুইটস। বলেছিলে, চার-মিঠা দেখাতে পারলে আমার সঙ্গে আসবে–

– কী আবোল-তাবোল বকছেন–

– জাস্ট আ মিনিট। লাইন কেটে দিও না প্লীজ। কাজের কথা আছে। শোন–

– বলুন?

– টেলিফোনে হবে না। সাক্ষাতে কথা হতে পারে? ধর যদি চারটে নাগাদ তোমার দোকানে যাই? তোমার দেখা পাব?

কাকলি মণিবন্ধের দিকে তাকালো। বেলা আড়াইটে। বললে, মিস্টার দাশ, আমি কাজের মানুষ। আপনার আগড়ম-বাগড়ম শুনবার মতো সময় আমার নেই। আপনার পূর্বেকার প্রস্তাবদুটি আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। সে নিয়ে কোনো আলোচনা করার সময় আমার নেই। যদি নতুন কথা কিছু –

– অ্যাবসোলিউটলি নতুন। চতুর্থ রঙ্গ।

– কী?

– সাক্ষাতে বুঝিয়ে বলব

– লাইন কেটে দিল ভৈরব দাশ।

ওই সঙ্গে চিন্তাসূত্রও ছিন্ন হয়ে গেল কাকলির। এতক্ষণ সে বসে বসে একটা প্রবন্ধ রচনা করছিল। রঙিন সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য সচিত্র প্রবন্ধ। ছবিগুলো ডেভেলপ্ হয়েছে। সাজানো আছে ওর টেবিলে। প্রবন্ধটা সেই চিত্রের সূত্র ধরে। বলা যায় ও ‘সচিত্র প্রবন্ধ’ রচনা করছিল না, করছিল ‘সব্যাখ্যা আলোকচিত্রমালা’। এই সময় ফটো-দোকানে ভিড়টা কম থাকে। ছবি তোলাতে যারা আসে তারা হাজিরা দেয় সকালে অথবা সন্ধ্যায়। মধ্যাহ্নে কাকলি সচরাচর এইসব সৃজনীমূলক কাজ করে। ভৈরবের টেলিফোনে সেই চিন্তাসূত্রটা ছিন্ন হয়ে গেল।

ভৈরব দাশ লোকটা কী-জানি কেন কাকলির পিছনে আঠার মতো সেঁটে আছে আজ বছর দেড়-দুই। বস্তুত ওর পিতৃ-বিয়োগের সময় থেকে। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স মাঝারি উচ্চতা। স্বাস্থ্যবান চেহারা। দাড়ি গোঁফ কামানো। ব্যাকব্রাশ চুল। ব্রহ্মতালুতে অকাল-ইন্দ্রলুপ্তের আভাস। সচরাচর পায়জামা- পাঞ্জাবি পরে থাকে। দু-হাতে গ্রহ-বারণ সাত-আটটা আংটি লোকটার নাকি অগাধ পয়সা। পরপর দুটি বাংলা ফ্লপ-ছবি তুলেও তার আশ মেটেনি। টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় এখনো একটা ঘর আছে ওর। ভাড়া গুণে যায়। আশা নতুন বক্স-অফিস-হিট ছবি শীঘ্রই তুলবে। কাকলির দ্বারস্থ হয়েছিল তাকে দিয়ে অভিনয় করাবে বলে। অভিনেত্রী হবার বিদুমাত্র বাসনা কাকলির নেই। এ কথা শোনার পর ভৈরব কাকলিকে তার ইউনিটে টানতে চেয়েছিল ‘অ্যাসিস্টেন্ট ক্যামেরাম্যান’ হিসাবে। সেজন্য সে সিনেমা জগতের ঐতিহ্যময় “ক্যামেরাম্যান” শব্দটাকেও বদল করতে প্রস্তুত ছিল; কিন্তু কাকলি ওই উপজীবিকাকে প্রত্যাখ্যান করল। সে ভৈরব দাশ-এর “জয় সন্তোষী মা প্রোডাকশনের” অ্যাসিস্টেন্ট ক্যামেরাপার্সন হতেও অস্বীকৃত।

ভৈরব দাশ এর তিন নম্বর ‘মিঠা’-টা ছিল খুবই দামী। ‘সুইট ড্রীমস’নয়, ‘সুইট-মীটস্’নয়, একেবারে আখেরি আর্জি-‘সুইটী’।আদম যা পেশ করেছিল ঈভের কাছে-জীবনসঙ্গিনী হওয়ার প্রস্তাব। কাকলি সেটাও সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল। খোদায় মালুম, বেলা চারটের সময় কী ‘মিঠা’ পরিবেশন করতে আসছে সে।

কাচের পার্টিশনের ভিতর দিয়ে দেখতে পেল দু’জন খদ্দের এসেছে কাউন্টারে। স্বামী-স্ত্রী কি? না হলে ওরা হয়তো শীঘ্রই তা হবে। সুপর্ণাকে স্লিপ বার করে দেখালো। সুপর্ণা টানা ড্রয়ার খুলে বান্ডিল বাঁধা খাম দেখছে। সুপর্ণা দাশগুপ্তা ওর কাউন্টারে বসে ক্যাশ ও হিসাব রাখে, ফটো ডেলিভারি দেয়। প্রয়োজনে ডেভলপিং, প্রিন্টিং-এ সাহায্যও করে। তারও নিজেস্ব ক্যামেরা আছে। বস্তুত কাকলির কাছে অবসর সময়ে সে ফটো-তোলার কায়দা শেখে।

কর্তা-গিন্নি অথবা হবু-স্বামী-স্ত্রী, যাইহোক, ফটোর খামখানা নিয়ে বাকি পেমেন্ট করে চলে গেল।

কাকলি তার টানা-ড্রয়ার খুলে একটা গোয়েন্দা গল্পের বই বার করে পড়তে বসল। ভৈরব দাশ ওর শিল্পীমনের ভারসাম্যটা নষ্ট করে দিয়েছে। ও খুলে বসল স্ট্যানলি গার্ডনারের পেরি মেসন সিরিজ এর একটা পেপারব্যাক “দ্য কেস অব দ্য সাইলেন্ট পার্টনার।”

অচিরেই ডুবে গেল গোয়েন্দা গল্পে।

কখন কেটে গেছে দু-দুটি ঘন্টা। বেলা চারটে। কাঁটায় কাঁটায়। কাচের পার্টিশনের ভেতর দিয়ে দেখতে পেল ভৈরব দাশ এসেছে কাউন্টারে।সুপর্ণার সঙ্গে কী যেন কথাবার্তা বলছে। সুপর্ণা ভাল করেই চেনে ভৈরবকে। কাকলি জানে না, সুপর্ণা সুযোগমতো ভৈরবকে কিছু তৈলমর্দনও করেছে, সিনেমা অথবা টি. ভি সিরিয়ালে অভিনয় করার সুযোগ-প্রত্যাশায়। ভৈরব পকেট থেকে কী একটা কালো মতন জিনিস বার করে সুপর্ণাকে দিল। সুপর্ণা দ্রুতগতি সেটা ড্রয়ারে রেখে দিল।

ভৈরব এগিয়ে এল কাকলির ঘরের দিকে। গ্লাস-প্যানেলে টোকা দিল। কাকলি বলল, ইয়েস। কাম ইন প্লীজ–

ভৈরব নিঃশব্দে প্রবেশ করল ঘরে। একটু ছদ্ম অভিবাদনের ভঙ্গি করে বললে, গুড আফটারনুন, ম্যাডাম।

বসল কাকলির ভিজিটার্স চেয়ারে।

– তারপর? কেমন আছ?

কাকলি ঠিক করেছিল অপ্রয়োজনে কড়া কথা বলবেনা। ভৈরবকে ইতিপূর্বে ও বারণ করেছে “তুমি” বলে কথা বলতে। ভৈরব শোনেনি। শোনে না। বলে আমার প্রস্তাবটা যদি তুমি গ্রহণ করতে কলি, তাহলে আমরা দু’জনেই দুজনকে ‘তুমি’ বলতাম। তা যখন হল না তখন অন্তত ‘হাফা-হাফি’ রাজি হয়ে যাও। তুমি আমাকে ‘আপনি’ই বল, বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবেই ধরে নাও– আমি ‘তুমি’ বলব। কাকলি প্রতিবাদ করেনি।

– কী হল? আমি তো কুশল জানতে চাইছি শুধু। কেমন আছ?

– ভাল।

– দিদি কেমন আছে?

– ভাল, অনেক ভাল। কী বলতে এসেছেন বলুন।

– বলছি, বলছি, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? শোন, কলি –

– জাস্ট-আ-মিনিট! আমার নাম কাকলি।নাম ধরে ডাকতে হলে আমার পুরো নামটাই উচ্চারণ করবেন প্লীজ, না হলে–

– কেন, কলি? এখানে তো তৃতীয় ব্যক্তি নেই–

কাকলি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, এক্সকিউজ মি! আমি তাহলে আপনার সঙ্গে কোনো আলোচনা করব না।

ভৈরব একগাল হেসে বললে, কী করবে? তোমাদের দোকানে কোনো দারোয়ান আছেবলে শুনিনি। দুই মহিলা মিলে আমাকে গলাধাক্কা দিয়ে দোকান থেকে বার করে দিতে পারবে?

– না, তা পারব না। তবে আশপাশের দোকানে কিছু বন্ধুশ্রেণীর ভদ্রলোক আছেন, তাঁরা এগিয়ে এসে আপনাকে গলাধাক্কা দিয়েই তাড়িয়ে দিতে পারবেন। দেখতে চান?

ভৈরব গম্ভীর হয়ে বললে, স্থির হয়ে বস। শোন কাকলি, তুমি আমার প্রডাকশান য়নিটে আসতে রাজি হলে না। না অভিনয় করতে, না ক্যামেরা-পার্সন হিসাবে। তাহলে আমাকেই তোমার এস্টাব্লিশমেন্টে ঢুকতে দাও না কেন?

– মানে?

– ধর আমি তোমাদের দুই বোনের সহযাত্রী হয়ে গেলাম। তোমর দু’জনে আমাকে কিছু-কিছু শেয়ার বেচে দাও। আমার থাকবে ফিফটি-ওয়ান পার্সেন্ট শেয়ার, আর তোমাদের দু’বোনের মিলিতভাবে ফর্টিনাইন। তারপর তুমি এই ‘সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোর্স’এর এক্সপ্যানশনে যত টাকা ঢালতে চাইবে আমি যোগাব, ব্যাঙ্ক ইন্টারেস্টের আধাআধি রেট-এ। তুমি যদি ফিল্ম বা টি. ভি. সিরিয়াল তুলতে চাও – আমি ফিনান্স করব, তুমি যদি –

– জাস্ট এ মিনিট।

– ইয়েস?

– আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমরা রাজি নই।

– বাট হোয়াই? কেন?

– ‘কেন’ সে প্রসঙ্গ থাক। আমরা আপনাকে আমাদের কোম্পানির মেম্বার হিসাবে স্বীকার করতে রাজি নই।

ভৈরব হাসল। বিচিত্র হাসি। বলল, তুমি কি মনে কর, দুনিয়ার সব কিছু তোমার মর্জিমাফিক চলবে –

– না তা মনে করি না। তবে আমার দোকানের সবকিছু আমার মর্জিমাফিকই চলবে–

– তাই বা কেন কাকলি? তোমার বিজনেস পার্টনারদের কোনও বক্তব্য থাকতে পারে না?

– পারবেনা কেন? পারবে। আছে। কিন্তু দিদির ইচ্ছে আর আমার ইচ্ছেয় কোনও প্রভেদনেই–

– কিন্তু কোম্পানির প্রধান শেয়ার-হোল্ডার তো – আমি যতদূর জানি-– দুই নয় অন্তত তিনজন। তাই নয়?

কাকলি কুঞ্চিত ভূভঙ্গে বলে, আপনি এত কথা কী করে জানলেন?

– যেহেতু আমি ভৈরব দাশ। বিজনেসম্যান। তুমি জান না, তোমাদের কোম্পানির সেই তিন নম্বর মেজর শেয়ার হোল্ডারের নাম ভৈরব দাশ। হিয়ার্স ইট।

ফোলিও ব্যাগ থেকে একখণ্ড কাগজ ভৈরব নামিয়ে রাখল কাকলির গ্লাসটপ টেবিলে। বলল্, যাদু এ তো বড় রঙ্গ, যাদু এ তো বড় রঙ্গ। চার ‘ভেলকি’ দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ। এই সেই চতুর্থ ভেলকি।

বজ্রাহতা হয়ে গেল কাকলি। কাগজটা তুলে নিয়ে বললে, স্বর্ণলতাদি তাঁর দশ পার্সেন্ট শেয়ার আপনাকে বেচে দিয়েছেন?

– হ্যাঁ। তুমি বোধহয় জান না, স্বর্ণের স্বামী এখন আমার প্রোডাকশন য়ুনিটে এমপ্লয়েড। তুমি এই শেয়ার সার্টিফিকেট ক’খানা আমার নামে এন্ট্রি করে নতুন করে ইস্যু করার ব্যবস্থা কর। জেরক্স কপি আমি দাখিল করে যাচ্ছি, অরিজিনালও দেখিয়ে গেলাম। নতুন শেয়ার পেলে এগুলো তোমাকে দিয়ে যাব। ঠিক আছে?

কাগজগুলো উল্টোপাল্টে দেখে কাকলি বলে, এটা ঠিক হয়নি।

– কোনটা?

– স্বর্ণদি নিজে থেকে চেয়েছিল বলেই তাকে আমরা মাত্র দশ পার্সেন্ট শেয়ার বিক্রি করেছিলাম, যাতে ‘বোর্ড অব ডাইরেক্টর্স’-এ তিনজন মেমবার থাকে। স্বর্ণলতাদি যদি সে শেয়ার বিক্রি করতে চায় তাহলে সে আমাকে বলতে পারত।

– পারত। খদ্দের না পেলে হয়তো বলতোও; কিন্তু এটা তার পক্ষে ‘অবশ্যকর্তব্য’ ছিল না, যে-কোন কোম্পানির শেয়ার একটা হস্তান্তরযোগ্য কমোডিটি। যে-কোন শেয়ার-হোল্ডার যে কোনো প্রার্থীকে তা বেচে দিতে পারে। স্বর্ণও তাই বেচেছে। এতে তার অন্যায়টা কী হল?

– সে আপনি বুঝবেন না। এটা একটা এথিকাল পয়েন্ট। স্বর্ণদির সংসার যখন চলছিল না তখন বাবা তাকে ডেকে চাকরি দিয়েছিলেন–

– সো হোয়াট? স্বর্ণলতার সংসার ক’মাস আগে চলছিল না। আমি তার স্বামীকে ডেকে চাকরি দিয়েছিলাম।

কাকলি রুখে ওঠে, দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। বাবা স্বর্ণদির নিঃস্বার্থ উপকার করতে চেয়েছিলেন। তখনো সে বিয়ে করেনি। এই ‘সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোর্স’-এ গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা না হলে বেচারি হয়তো ভেসে যেত। কিন্তু আপনি ওর স্বামীকে কাজ দিয়েছেন নিতান্ত স্বার্থপ্রণোদিত হয়ে– ওই সামান্য ক’খানা শেয়ার হাতিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে।

– হাতিয়ে নেওয়া? আমি কি ন্যায্য দাম দিয়ে তা কিনিনি?

– য়ু নো হোয়াট আই মীন।

ভৈরব হাসল। বললে, তুমি এখন উত্তেজিত আছ কাকলি, তাই সহজ কথাটা তোমার মাথায় ঢুকছে না; কিন্তু তুমি বুদ্ধিমতী। তাই রাগ পড়ে গেলে বুঝবে – স্বর্ণলতা কিছুই অন্যায় করেনি। আমি তার স্বামীর এমপ্লয়াব। আমাকে খুশি রাখতে সে আগ্রহী। তাছাড়া যে শেয়ার তার নিজের, তা সে যাকে খুশি, যে কোন দরে, বিক্রি করতে পারে। পারে না? আমিও কিছু অন্যায় করিনি। যে কোন শেয়ার যে কোনো দরে বাজার থেকে আমি কিনতে পারি, যদি ‘সেলার’ সে দরে বেচতে রাজি থাকে। তাহলে তুমি রাগটা করছ কার উপর? ঠাণ্ডা মাথায় পরে ভেবে দেখ: তোমার নিজের উপর।

কাকলি জবাব দিল না। নিরুদ্ধ-আক্রোশে নতনেত্রে বসেই রইল।

ওর সেই আরক্ত মুখের অরুণাভাটা ভৈরব যেন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল। তারপর বলল, না, অন্যায় তুমি করনি, করেছ ভুল। কাজে অবহেলা। স্বর্ণ মাতৃত্ব-সম্ভাবনায় তোমার দোকান থেকে মেটার্নিটি লীভ পায়নি। না, সে তা চায়ওনি। – আমি জানি। রিজাইন দিয়ে চলে গেছিল মা হতে কাকলি, তখন তোমার উচিত ছিল ওর কাছ থেকে বেনামে ওই সামান্য ক’খানা শেয়ার কিনে নেওয়া। তা তুমি নাওনি। সন্তান হবার পর তুমি নার্সিং হোমে স্বর্ণকে দেখতে গেলে, ছেলের অন্নপ্রাশনে দামী ‘বাওয়া স্যুট’ উপহার দিলে – কর্তব্যে কোথাও তোমার কোনও ত্রুটি হয়নি। গত বছর ডিরেক্টরস বোর্ড মিটিঙে স্বর্ণ তোমাকে নমিনেশন-পত্র পাঠিয়ে আইন বাঁচিয়েছিল। সবই মানছি। কোথাও তোমার কোনো ত্রুটি হয়নি। মানুষ হিসেবে। কিন্তু ব্যবসায়ী হিসেবে তুমি একটা হিমালয়ান্তিক ভুল করেছিলে। তুমি ভেবে দেখনি, আক্রমণটা এদিক থেকেও আসতে পারে। তাই না?

এবারও কাকলি জবাব দিল না।

ভৈরব আবার বললে, অবশ্য এটাই তোমার স্বভাব। বরাবর দেখেছি, প্রথমে বজ্র আঁটুনি দিয়ে শুরু করে তুমি ফসকা গেরো দিয়ে শেষ কর। যাদুগোপালের বেলাতেও তুমি এ-রকম একচক্ষু হরিণের মতো–

কাকলি হঠা উঠে দাঁড়ায়। বলে, সোজাসুজি বলুন তো মিস্টার দাশ, ঠিক কী চান আপনি?

– তোমাদের কোম্পানির শ্রীবৃদ্ধি। যেহেতু আমার টেন পার্সেন্ট স্বার্থ তাতে জড়িত। নাথিং এলস। বিশ্বাস কর কাকলি, তোমাদের কাজ-কর্মে কোনও বাধা আমি দেব না। আপাতত আমি হচ্ছি একজন ‘সাইলেন্ট পার্টনার’– নীরব সহযাত্রী। তোমরা দুই বোন উন্নতি কর। আমি মালা গেঁথে তোমাদের গলায় পরাব। বলতে পার, আমার বর্তমান লক্ষ্য ‘আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর।’ আচ্ছা চলি।

ভৈরব আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হেলতে-দুলতে বার হয়ে যায় ঘর ছেড়ে। পিছনে হাত দিয়ে, দেওয়ালে টাঙানো ফোটোগ্রাফগুলো দেখতে দেখতে, মরালগতিতে সে চলে গেল বহির্দ্বারের দিকে। কাচ-পার্টিশনের ভিতর দিয়ে জ্বলন্ত একজোড়া চোখে ওকে দেখতে থাকে কাকলি। ঠিক কাউন্টারের কাছে পৌঁছেই ভৈরবের বাঁ-হাতটা ঢুকে গেল বাঁ-পকেটে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবার মূহূর্তে সে তাকিয়েছিল রাস্তার দিকে। কিন্তু যন্ত্রচালিত ভঙ্গিতে বাঁ-হাতখানা রাখল সুপর্ণার কাউন্টার-টেবিলে। হাতটা সরে যেতেই কাকলি দেখল – কী একটা কালো মতন জিনিস। কালো নয়, নীলচে। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সুপর্ণা সেটা নামিয়ে রাখল তার ড্রয়ারে।

কী হতে পারে? কাকলি উত্তেজিত ছিলই। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে সে ছুটে চলে গেল কাউন্টারের কাছে। সুপর্ণা সবিস্ময়ে উঠে দাঁড়ালো। কাকলি জানতে চাইল, ভৈরববাবু তোমাকে কী দিয়ে গেলেন?

কুঞ্চিত ভূভঙ্গে সুপর্ণা বললে, তা নিয়ে আপনার এত কৌতূহল কেন?

– যেহেতু দোকানটা আমার, কাউন্টারটা আমার, কাউন্টারে বসা মেয়েটি আমার কর্মচারি।

সুপর্ণা নিঃশব্দে ড্রয়ার খুলে বার করে জিনিসটা দেখালো।

একটা ক্যাডবেরি চকোলেটের প্যাকেট।

কাকলি অবাক হল। কিছু বলল না। সে পিছন ফেরার উপক্রম করতেই সুপর্ণা ক্যাডবেরি চকোলেটের প্যাকটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল রাস্তায়।

কাকলি প্রশ্ন না করে পারল না, কী হল? এভাবে ফেলে দিলে কেন?

সুপর্ণা বললে, যেহেতু চকোলেট-প্যাকেটটা আমার, প্রেজেন্টেশনটা আমার, কাউন্টারে বসা মেয়েটি আমি নিজে।

কাকলি কী বলবে ভেবে পেল না।

তারপর হঠাৎ বলে বসল, আয়াম সরি।