কৌতূহলী কনের কাঁটা – ১৬

ষোলো

প্রাথমিক তদন্ত শেষ করে মামলাটা ট্রাইং ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে উঠতে দেরী হয় না; এবং তিনি আসামীকে দায়রায় সোপর্দ করলেন। চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মামলা উঠতে বিলম্ব হ’ল না। এমনটা সচরাচর হয় না। সম্ভবত, নেপথ্যে রাজনৈতিক চাপ এর হেতু। ধনকুবের-সম্প্রদায় চার-পাঁচ বৎসর অন্তর রাজনৈতিক দলগুলিকে ভোটযুদ্ধের রসদ যোগান দেন। ফলে তাঁদের প্রভাবে এদেশে অনেক কিছুই ঘটে থাকে। এ-ক্ষেত্রেও যখন ছন্দা-ত্রিদিবের বিবাহটা প্রথম থেকেই নাকচ করানো গেল না তখন ত্রিবিক্রম সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন পুত্রবধূকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে। এছাড়া তাঁর একচ্ছত্র-সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষিত হত না।

ত্রিদিব তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারবে না। উপায় নেই; কিন্তু সাংবাদিকদের হাত থেকে রক্ষা করতে ত্রিদিবকে একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা হয়েছে। সম্ভবত কোনও পাঁচতারা হোটেলের অজ্ঞাতবাসে।

মামলার দিন আদালতে অপ্রত্যাশিত জনসমাগম হয়েছে। অপ্রত্যাশিত বলাটা অবশ্য ঠিক হবে না, কারণ ইতিমধ্যে কয়েকটি সংবাদপত্রে এ-নিয়ে বিস্তারিত ‘রিপোর্টাজ’ হয়েছে। রাজপুত ঐতিহ্যের শক্তাবৎ-রাজরক্তের এক ধনকুবেরের একমাত্র পুত্রকে কী-ভাবে একটি নার্সিং-হোমের ভেতো-বাঙালী ‘নাইট-নার্স’ কব্জা করে ফেলল, কীভাবে তাদের রেজিস্ট্রি-বিবাহ সুসম্পন্ন হল, কী-ভাবে ছেলেটির কোটিপতি পিতা নাসিক থেকে উড়ে এসে সে বিবাহ অবৈধ প্রমাণে ‘আদ্রকোদক-সেবনান্তে’ প্রাণপাত করলেন, এবং কী-প্যাঁচে পি. কে. বাসু বার-অ্যাট-ল ধনকুবেরের সে উষ্ণ-প্রয়াসে এক বালতি বরফ-গলা জল ঢেলে দিলেন! এসব তথ্যই সংবাদপত্রের একনিষ্ঠ পাঠক-পাঠিকার দল প্রভাতী চায়ের উপাদান হিসাবে জানে! তাই তারা আরও জানতে আগ্রহী: ধনকুবের কি অতঃপর তাঁর বধূমাতাকে – ‘উদ্বাহন’ থেকে নিরস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে ‘উদ্বন্ধনে’ ঊর্ধ্বগামী করতে সক্ষম হবেন? মামলাটা যদিও স্টেট-ভার্সেস ছন্দা রাওয়ের – সকলে ধরে নিয়েছে বাস্তবে: ধনকুবের ত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও বনাম ব্যারিস্টার পি. কে. বাসুর।

আদালত যদি অনুমতি করেন তাহলে বাদীপক্ষ একটি সংক্ষিপ্ত প্রারম্ভিক ভাষণ দিয়ে এই মামলার সূত্রপাত করতে ইচ্ছুক। বাদীপক্ষ আশা করেন যে, তাঁরা প্রমাণ করবেন: এই মামলার আসামী শ্রীমতী ছন্দা রাও সুপরিকল্পিতভাবে তারাতলার মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে মধ্যরাতে তাঁর প্রথম পক্ষের স্বামী কমলেশ বিশ্বাসকে হত্যা করেছেন। আমরা আরও আশা রাখি প্রমাণ করব যে, মাত্র সাত দিনের কোর্টশিপে ঐ আসামী শয্যাশায়ী, অসুস্থ এক ধনকবেরের একমাত্র পুত্র তথা-ওয়ারিশকে মোহমুগ্ধ করে, তাঁর পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গোপনে রেজিস্ট্রি-বিবাহ করেন। এত অল্প সময়ের কোর্টশিপে এ জাতীয় বিবাহের একটিই উদ্দেশ্য হতে পারে– কিন্তু সেই উদ্দেশ্য সাধন করতে গিয়ে আসামী হঠাৎ এক প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়ে পড়েন: তাঁর প্রথম পক্ষের জীবিত স্বামী, কমলেশ বিশ্বাস! সদ্যোবিবাহিত রাজপুত্রের কৃবেরীর্ষিত বৈভব হস্তগত করতে হলে প্রথম পক্ষের স্বামীকে অপসারণ করা নিতান্ত প্রয়োজন। আসামী মধ্যরাত্রে সেই উদ্দেশ্যই একাকী ড্রাইভ করে প্রথম স্বামীসাক্ষাতে গিয়েছিলেন। আমরা প্রমাণ করব: সে সময় তাঁর হাতব্যাগে একটে রিভলভার ছিল; কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়েটি হত্যার হাতিয়ার হিসাবে একটা গ্যালভানাইড পাইপ বেছে নেয় – যাতে স্বতই মনে হতে পারে যে, এটা সুপরিকল্পিত হত্যা নয়, আত্মরক্ষার্থে হোমিসাইড। আমরা আরও আশা রাখি প্রমাণ করব যে, আসামী একটি মিথ্যা ডেথ সার্টিফিকেটের সাহায্যে তাঁর জীবিত স্বামীর ওয়ারিশ হিসাবে ইনশিওরেন্স পলিসি থেকে…

বাসু হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন: অবজেকশন য়োর অনার! প্রারম্ভিক ভাষণে মাননীয় সহযোগী অবান্তর প্রসঙ্গের অবতারণা করছেন। আমরা একটি হত্যা-মামলার বিচার প্রত্যাশায় এসেছি, আসামীর বিরুদ্ধে আর কোন অপরাধের জন্য পাবলিক প্রসিকিউটর যদি কোন অভিযোগ আনেন, তবে তা চার্জশিটে আইনের ধারা মোতাবেক উল্লেখ করা উচিত ছিল।

পি.পি. নিরঞ্জন মাইতি বলেন, আমরা আসামীর চরিত্র উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে…

বিচারপতি সদানন্দ ভাদুড়ী বলেন, আপত্তি গ্রাহ্য হল মিস্টার পি. পি., আপনি হত্যা-মামলার সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত প্রারম্ভিক ভাষণ দেবেন, এটাই আদালতের প্রত্যাশা।

– দ্যাটস্ অল, য়োর অনার।

বিচারক চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সদানন্দ ভাদুড়ী এবার প্রতিবাদীর দিকে ফিরে বললেন, আপনারা কি কোনও প্রারম্ভিক ভাষণ দিতে চান?

বাসু বললেন, নো, য়োর অনার। বাদীপক্ষ এবার একে-একে তাঁদের সাক্ষীদের ডাকতে পারেন।

দর্শকের প্রথম সারিতে একদিকে বসে আছেন প্রস্তরমূর্তির মতো ত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও, অন্যদিকে সুজাতা আর কৌশিক। দর্শকমণ্ডলীর ভিতর ডক্টর ব্যানার্জি আর ত্রিদিবকে দেখা গেল না। জবা কিন্তু উপস্থিত।

বাদীপক্ষের প্রথম সাক্ষী পুলিশ-ইন্সপেক্টর অসীম মুখার্জি। মাইতি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তার পরিচয় প্রতিষ্ঠা করলেন। ইন্সপেক্টর মুখার্জি জানালো বাইশে জুন, শনিবার, রাত একটা আঠাশ মিনিটে সে রেডিও মেসেজ পায়: তারাতলায় মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টে সম্ভবত একজন লোক খুন হয়েছে। ঐ সময় সে একটা পুলিশ-জীপে ডায়মন্ডহারবার রোডে টহল দিচ্ছিল। ওর জীপে রেডিও রিসিভারে খবরটা পায়, স্থানীয় পুলিশ-স্টেশন থেকে। মুখার্জি তখন মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টে চলে যায়। পুলিশের গাড়ি দেখেই পাশের বাড়ি থেকে দুজন লোক নেমে এসে জানান যে, তাঁরাই ফোন করে পুলিশ ডেকেছেন। তাঁদের একজনের নাম ডক্টর এন. দত্ত, অপরজনের নাম শ্রী বটুকনাথ মণ্ডল। ওঁরা মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টের সদর দরজায় কলবেল বাজান। কেউ সাড়া দেয় না। তখন বটুক ইন্সপেক্টার মুখার্জিকে তার নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় এবং টর্চের আলোয় পাশের বাড়িতে মেঝের উপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা দেহটি দেখায়। শুধু পা-টুকু দেখা যাচ্ছিল। এরপর মুখার্জির নির্দেশে একজন পুলিশ ভারা বেয়ে উপরতলায় উঠে যায়। গ্রিলহীন জানলার ফোকর দিয়ে ভেতরে গলে যায়। ভিতর থেকে ইয়েল-লক খুলে দেয়। ওঁরা সদলবলে উপরে আসেন।

ভুলুণ্ঠিত কমলেশ তখনো জীবিত ছিল; কিন্তু তার জ্ঞান ছিল না। আহতের ঘরে গৃহনির্মাণ সামগ্রী গাদা করে রাখা ছিল। তার ভিতর ছিল একটি পৌনে-এক-মিটার দীর্ঘ বিশ মিলিমিটার ব্যাসের গ্যালভানাজইড লোহার পাইপ। তাতে রক্তের দাগ। যেটি আহতের অদূরেই পাওয়া যায়। মুখার্জির ধারণা হয়: ঐ পাইপের সাহায্যেই ভূতলশায়ী লোকটি আহত হয়েছে। সে পাইপটি সংগ্রহ করে।

ডক্টর দত্ত ভুলুণ্ঠিত ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে দেখেন যে, সে জ্ঞানহীন বটে তবে মৃত নয়। ফলে ইন্সপেক্টর মুখার্জি একটি অ্যাম্বুলেন্স আনাবার ব্যবস্থা করে। বটুকের কাছ থেকে জানতে পারে আহত ব্যক্তির নাম কমলেশ বিশ্বাস। সে ঐ ঘরে একাই থাকত। তল্লাসি করতে গিয়ে ঘরের মেঝেতে– মৃতদেহের পাশেই– একটি চাবির রিঙ দেখতে পায়। তাতে তিনটি চাবি, একটি নবতাল তালার, আর দুটি মোটর গাড়ির ডোর-কী। মাইতি সেটিকে পিপল্স এক্সিবিট ‘A’ হিসাবে দাখিল করলেন। ইতিমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ি এসে পড়ে। আহতকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে মুখার্জি শুনেছে– হলপ নিয়ে বলতে পারবে না – কমলেশ ঐ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যায়। ইতিমধ্যে পুলিশ-ফোটোগ্রাফার অনেকগুলি ফটো নিয়েছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট কিন্তু কোথায়ও কোনও আঙুলের ছাপ আবিষ্কার করতে পারেনি। না– সুমসৃণ সদ্য-লাগানো দরজার ইলেক্সট্রো-প্লেটেড হ্যান্ডেলে, টেলিফোন রিসিভারে, গ্লাস্টপ টেবিলে– কোথাও কোন আঙুলের ছাপ নেই।

মাইতি বলেন: এটা আপনার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি?

বাসু তৎক্ষণাৎআপত্তি জানান: জবাবটা সাক্ষীর ‘কনব্রুশন।

মাইতি বলেন, য়োর অনার! সাক্ষী-অপরাধ-বিজ্ঞানে বিশেষ শিক্ষাপ্রাপ্ত। তাঁর যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত আদালতে গ্রাহ্য হওয়া উচিত।

বিচারক বাসু-সাহেবের আপত্তি নাকচ করে দিলেন।

ইন্সপেক্টর মুখার্জি বলে, হ্যাঁ, আমার কাছে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। আততায়ী যদি হাতে গ্লা পরে এসে থাকে তাহলে গৃহস্বামীর আঙুলের ছাপ অন্তত পাওয়া যেত। তা গেল না কেন?

মাইতি জানতে চান: এমনটা হল কেমন করে?

বাসু এবারও আপত্তি জানালেন। বিচারক পুনরায় তা নাকচ করলেন।

মুখার্জি বলল, তার সিদ্ধান্ত: আততায়ী ঘর ছেড়ে চলে যাবার আগে একটা রুমাল দিয়ে সবকিছু মসৃণ পদার্থ মুছে দিয়ে যায়।

মাইতি বলেন, ‘রুমাল দিয়ে’ কী করে বুঝলেন?

– না, রুমাল দিয়েই যে মোছা হয়েছে এ-কথা বলা যায় না। হয়তো শাড়ির আঁচল দিয়ে মোছা হয়েছে!

মাইতি বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললেন, যু মে ক্রস্ হিম!

বাসু জেরা করতে উঠে প্রথমেই বললেন, মিস্টার মুখার্জি, আপনি এইমাত্র বললেন ‘রুমাল দিয়েই যে মোছা একথা বলা যায় না। হয়তো শাড়ির আঁচল দিয়ে মোছা হয়েছে।’ তাই না?

– হ্যাঁ, তাই বলেছি আমি।

– তার মানে আপনার বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত: যে-লোকটা সব কিছু থেকে আঙুলের ছাপ মুছে দিয়ে যায় তার পরিধানে শাড়ি ছিল। ধুতি কোনক্রমেই থাকতে পারে না, তাই কি?

– না, তাই নয়। এজন্যই আমি ‘হয়তো’ বলেছি।

– কিন্তু নিরপেক্ষ এক্সপার্ট হিসাবে কি আপনার বলা উচিত ছিল না: ‘হয়তো শাড়ির আঁচল অথবা কোঁচার খুটে?

মাইতি আপত্তি তোলেন, সহযোগী তাঁর মনোমত জবাব পাননি বলে ক্ষুব্ধ হতে পারেন; কিন্তু ক্ষোভের এ-জাতীয় প্রকাশ হওয়াটা অবাঞ্ছনীয়। আমি আপত্তি জানাচ্ছি, হুজুর।

বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বলেন, য়োর পয়েন্ট ইজ ওয়েল টেক্। আপনি পরবর্তী প্রশ্নে এগিয়ে যান।

বাসু বলেন, আমি শুধু দেখাতে চাইছিলাম, বর্তমান সাক্ষী আদৌ নিরপেক্ষ এক্সপার্ট নন, একটি পূর্ব-ধারণার বশবর্তী হয়ে সহযোগীর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন।

– আদালত আপনার যুক্তি শুনেছেন, যা সিদ্ধান্ত নেবার তা নেবেন। আপনি পরবর্তী প্রশ্নটি পেশ করুন।

বাসু টেবিলের উপর থেকে পিপল্স এিিজবিট ‘বি’-এর একটি ফটো তুলে নিয়ে সাক্ষীকে দেখান। বলেন, এ ফটো আপনার উপস্থিতিতে পুলিস ফোটোগ্রাফার সে রাত্রে তুলেছিল? যখন আপনি ঐ ঘরে তদন্ত করছেন? তাই না?

– হ্যাঁ, তাই।

– ফটোতে টেবিলের উপর একটা টেব্ল-ক্লক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেটাতে সময় দেখা যাচ্ছে দুটো বেজে দশ। যেহেতু আপনি বলছেন যে, আপনি ঐ ঘরে পদার্পণ করেন রাত একটা চল্লিশে তাই বিশেষজ্ঞ হিসাবে আপনি কি বলবেন যে, আপনার ঐ ঘরে পদার্পণের ঠিক আধঘণ্টা পরে ফটোটি তোলা হয়।

– আজ্ঞে না। তা বলব না। বলব: পঁয়ত্রিশ মিনিট পরে। কারণ ঘরে ঢুকেই আমি নিজের হাতঘড়ির…যেটা নির্ভুল ইন্ডিয়ান স্টান্ডার্ড টাইম দিচ্ছিল– সঙ্গে ওটা মিলিয়ে দেখি। আমি লক্ষ্য করেছিলাম: ঐ টেবিল ঘড়িটি পাঁচ-মিনিট স্লো ছিল।

– সেই টেব্‌ল্ অ্যালার্ম-ক্লকটা কোথায়?

– আমরা ওটা ‘সীজ’ করে নিয়ে এসেছিলাম। জমা দিয়েছিলাম। এখন কোথায় আছে, তা জানি না।

বাসু-সাহেব নিরঞ্জন মাইতির দিকে ফিরে জানতে চান, ঘড়িটা কি আদালতে উপস্থিত করা যাবে?

মাইতি বললেন, যাবে। যখন বাদীপক্ষ সেটা উপস্থিত করার সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন যাবে। এখন নয়।

বাসু-সাহেব নিরুপায়ের ভঙ্গিতে শ্রাগ’ করলেন। পুনরায় সাক্ষীর দিকে ফিরে প্রশ্ন করেন, ঐ টেবল-ঘড়িতে সময়ের কাঁটা দুটো ফটো-তোলার মুহূর্তে দুটো বেজে দশ মিনিট দেখাচ্ছিল, কিন্তু ওর অ্যালার্ম-কাঁটা কী সময় নির্দেশ করছিল তা ম্যাগ্‌ফাইং গ্লাসের সাহায্যে ফটো দেখে বলবেন কি?

– ফটো দেখার দরকার হবে না। আমার মনে আছে: ঠিক একটা।

বাসু-সাহেব পি. পি.-র দিকে ফিরে বললেন, ঘড়িটা কি এখন আদালতে আনা যেতে পারে?

মাইতি দৃঢ়স্বরে বললেন, না। বাদীপক্ষ ঐ ঘড়ির প্রসঙ্গে কোন প্রশ্নই করেননি। ফলে, এখন ওটা অবান্তর।

বাসু বিচারকের দিকে ফিরে বললেন, য়োর অনার! বাদীপক্ষ ঐ ফটোটা তাঁদের একজিবিট হিসাবে দাখিল করেছেন। ফটোতে একটি টেব্ল-ক্লক আছে, এটা প্রত্যক্ষ সত্য। বাদীপক্ষের সাক্ষী ঐ ঘড়ি সম্বন্ধে দু-একটি তথ্য দাখিল করেছেন যা আদালতে নথীবদ্ধ হয়েছে। সাক্ষী এ কথাও স্বীকার করছেন যে, তাঁর ‘সীজার লিস্টে’ ঐ ঘড়িটি আছে। অর্থাৎ সেটি বাদীপক্ষের হেপাজতে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবাদী পক্ষের আর্জি: সেটি আদালতে দাখিল করা হোক, যাতে আমরা বর্তমান সাক্ষীকে ও বিষয়ে আরও কিছু জেরা করতে পারি।

বিচারক সম্মত হলেন না। তাঁর মতে বাদীপক্ষ ঘড়িটিকে তাঁদের এভিডেন্সের মধ্যে এখনো আনেননি! যখন আনবেন, তখন প্রয়োজনে বর্তমান সাক্ষীকে আবার কাঠগড়ায় তুলে প্রতিবাদী জেরা করতে পারবেন।

বাসু বললেন, ঠিক আছে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে এই সাক্ষীকে জেরায় আর কোন প্রশ্ন করছি না। ওঁরা পরবর্তী সাক্ষীকে ডাকতে পারেন।

পরবর্তী সাক্ষী অটোন্সি সার্জন ডাক্তার অতুলকৃষ্ণ সান্যাল। জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি তাঁর বিশেষজ্ঞের মতামত দিলেন: কমলেশের মৃত্যু হয়েছে, রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। মৃত্যুর হেতু কোন একটি ডাণ্ডা জাতীয় কঠিন বস্তু দিয়ে কেউ কমলেশের মাথার পিছন দিকে আঘাত করেছিল, তাতে তার ‘সেরিবেলাম’ আহত হয়। সে জ্ঞান হারায়।

মাইতি সুচতুরভাবে প্রশ্ন করেন, আপনি বলতে চান আততায়ী পিছন থেকে কমলেশের মাথায় আঘাত করেছিল?

– সে-কথা আমি আদৌ বলিনি। আমি বলেছি, তার মাথার পিছন দিকে অবস্থিত ‘সেরিবেলাম’ আহত হয়েছিল – আততায়ী যে আক্রান্ত ব্যক্তির পিছনে ছিল এ-কথা আমি বলিনি!

– কিন্তু তা কী করে সম্ভব? সামনে দাঁড়িয়ে আততায়ী কী করে একজনের মাথার পিছন দিকে আঘাত করবে?

– হ্যাঁ, সেটাও সম্ভব। সেটাই ঘটেছে, একথা আমি বলছি না অবশ্য। বলছি, সেটাও অসম্ভব নয়…

– কী ভাবে? একটু বুঝিয়ে বলুন?

– কমলেশের দেহে দুটো আঘাত-চিহ্ন ছিল। একটি মাথার পিছন দিকে– সেটি ওর মৃত্যুর কারণ; দ্বিতীয়টি ওর বাম ভ্রর উপর। এমন হতে পারে যে, ওরা দুজন সামনা-সামনি ছিল। আততায়ী প্রথমে কমলেশের বাম ভ্রূতে আঘাত করে। তাতে কমলেশ ওর সামনে উবুড় হয়ে পড়ে যায়। তখন আততায়ী ওর মাথার পিছন দিকে অনায়াসে দ্বিতীয়বার আঘাত করতে পারে। আই রিপীট…এমনটা ঘটেছিল তা আমি বলছি না, এমনটা ঘটতে পারে, তাই বলছি

– দ্যাটস্ অল যোর অনার।

বাসু জেরা করতে উঠে বললেন, ডক্টর সান্যাল, আমি আপনাকে একটা বিকল্প ঘটনা-পরস্পরা শোনাচ্ছি। ধরা যাক: যে প্রথম বাড়িটা মারে কমলেশের বাম ভ্রূতে – সে আত্মরক্ষা করতে চাইছিল। হয়তো সে স্ত্রীলোক, অথবা দুর্বল, তাই নিজেকে রক্ষা করতে সে এলোপাথাড়ি ডাণ্ডা ঘোরাচ্ছিল। কমলেশ বাঁ-চোখে আঘাত পেয়ে পড়ে যায়। আত্মরক্ষাকামেচ্ছু তখন লোহার পাইপটা ফেলে পালিয়ে যায়। কমলেশ মিনিটখানেক পরে সামলে নিয়ে উঠে বসতে চায়। আর তখন ঘরে উপস্থিত কোনও তৃতীয় ব্যক্তি ঐ পাইপটা তুলে নিয়ে কমলেশের মাথার পিছনে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে! এমনটা যে ঘটেছিল সে দাবী কেউ করছে না, কিন্তু এ জাতীয় ঘটনা-পরম্পরায় কি কমলেশের মৃত্যু হতে পারে? এক্সপার্ট হিসাবে আপনার কী অভিমত?

– নিশ্চয় পারে।

– থ্যাঙ্কু ডক্টর! আমার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই।

নিরঞ্জন মাইতি তখন একের পর এক সাক্ষীকে কাঠগড়ায় তুলে ঘটনাপরম্পরা প্রতিষ্ঠিত করতে থাকেন। পাশের বাড়ির একজন ভদ্রলোক মধ্যরাত্রে ছন্দাকে তার মারুতি-সুজুকি গাড়ি চালিয়ে আলিপুরের বাড়ি থেকে রওনা হতে দেখেছে। রাত তখন বারোটা পঁয়ত্রিশ। সে ওদের অবাঙালী প্রতিবেশী। ত্রিদিবকে দীর্ঘদিন ধরে চেনে। ত্রিদিব যে সম্প্রতি একটি নার্সকে বিবাহ করেছে, তা ও খবর রাখে। তার নাকি ‘ইনসম্নিয়া’ আছে। রাত্রে ঘুম হয় না। ঘটনার রাত্রে সে বস্তুত জেগেই ছিল। তাই জানে, ঠিক একঘণ্টা পরে – রাত একটা পঁয়ত্রিশে – ছন্দা মারুতি-সুজুকি গাড়িটা চালিয়ে ফিরে আসে।

বাসু লোকটাকে আদৌ জেরা না করায় কৌশিক বিস্মিত হল। নিম্নস্বরে বলল, লোকটাকে জেরা করলেন না, মামু?

– পণ্ডশ্রম! ওকে তোতাপাখির মতো সব কিছু শেখানো হয়েছে। ত্রিবিক্রমনারায়ণের আমদানী করা পেশাদার মিথ্যে সাক্ষী! ওকে জেরায় কব্জা করা যাবে না।

তারপর সাক্ষী দিতে এলেন আরও একজন অবাঙালী: যশপাল মাথুর। তাঁর একটি পেট্রোল পাম্প আছে। ডায়মন্ডহারবার রোডে। তিনি তাঁর সাক্ষ্যে জানালেন যে, ঘটনার দিন, রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ তিনি ক্যাশ মেলাচ্ছিলেন, এমন সময় একটা মারুতি-সুজুকি চালিয়ে একজন ভদ্রমহিলা ওঁর পেট্রোল-পাম্পের শেডের ভিতর ঢুকলেন। সচরাচর এসব উনি নজর করে দেখেন না; কিন্তু একটা বিশেষ কারণে উনি বিস্মিত বোধ করেন। গাড়ি চালিয়ে যিনি প্রবেশ করলেন তিনি যুবতী – বাঙালী মহিলা, এবং গাড়িতে আর কেউ নেই। এ জন্যই ঘড়ির দিকে তাঁর নজর পড়ে। রাত তখনো বারোটা বেজে তেতাল্লিশ! অত গভীর রাত্রে ঐ বয়সের একটি বাঙালী মহিলা একা ডায়মন্ডহারবার রোডে গাড়ি চালাচ্ছেন দেখেই উনি কৌতূহলী হয়ে পড়েন। সব কিছু খুঁটিয়ে দেখেন।

মাইতি প্রশ্ন করেন, সে ভদ্রমহিলা কি এখন আদালতকক্ষে আছেন?

– আজ্ঞে হ্যাঁ। ঐ তো আসামীর কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে আছেন।

– তিনি কি পেট্রোল কিনতে এসেছিলেন?

লীডিং কোশ্চেন! হোক, বাসু আপত্তি করলেন না।

মাথুর বললেন, আজ্ঞে না। তাঁর গাড়িতে পিছনের ডানদিকের চাকাটায় একদম হাওয়া ছিল না। উনি হাওয়া নিতে এসেছিলেন।

– আপনি ওঁর গাড়ির চাকায় হাওয়া ভরে দিলেন?

– আজ্ঞে না। আমি নয়। রামবিলাস। আমার কর্মচারী।

মাথুর বর্ণনা করলেন: রামবিলাস প্রথমে জ্যাক দিয়ে গাড়ির পিছন দিকটা তুলল। চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া চাকাটা বার করে নিল। ‘ডিক্’ থেকে স্পেয়ার চাকাটা ‘লাগ খুলে বার করে এনে লাগালো। তারপর জ্যাক সরিয়ে নিতেই দেখা গেল – এ টায়ারটাও জখম। দ্রুত হাওয়া বের হয়ে যাচ্ছে। নজর হল, তাতে একটা পেরেক বিঁধে আছে। তাই আবার বাধ্য হয়ে জ্যাক লাগাতে হল। স্পেয়ার-টায়ার থেকে জখম-টিউবটা বার করে একটা নতুন টিউর দিতে হল। রামবিলাস জানতে চাইল, জখম টিউবটা উনি মেরামত করাতে চান কিনা। তার জবাবে মহিলা বলেন, অনেক রাত হয়ে গেছে। টিউবটা এখানেই থাক। পরদিন মেরামত করা টিউবটা উনি সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন। এই সময়ে মাথুর বেরিয়ে এসে বলেন, ‘আপনার গাড়িতে আর স্পেয়ার টায়ার থাকল না কিন্তু ম্যাডাম। আবার যদি পাঞ্চার হয়…’ জবাবে উনি বলেন, উনি বেশি দূরে যাবেন না। তারাতলা যাচ্ছেন। এক কিলোমিটারও হবে না। রামবিলাস একটা রসিদ ধরিয়ে দেয় টিউবটা রাখার জন্য। ভদ্রমহিলা যখন চলে যান তখন রাত ঠিক একটা।

কাঁটায়-কাঁটায়!