দশ
পুরো দু-দুটি দিন বাসু-সাহেব ঘর ছেড়ে বার হলেন না। ক্রমাগত পাইপ টেনে গেলেন। মূল হেতু: ওঁর মক্কেল জামিন পায়নি। ওঁর মতে জামিন দেওয়া-না-দেওয়ার দায়িত্ব আইন যাঁর স্কন্ধে ন্যস্ত করেছিল তিনি অভিযুক্তের প্রতি অহেতুক নিষ্করুণ হয়েছেন। ছন্দা কিছু মস্তান পার্টির গুণ্ডা নয়, পেশাদার সমাজবিরোধী নয়, এমনকি ব্ল্যাকমানির ধনকুবের নয় যে, জামিন পেলে সে পুলিস-কেসকে প্রভাবিত করতে পারে। নিহত ব্যক্তি স্বীকৃত সমাজবিরোধী, তার হিপ্-পকেটে রিভলভার ছিল। ছন্দারও যে তা ছিল, তা কেউ এখনো জানে না। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এটা কিছুতেই ধরে নেওয়া যায় না যে, ওই বয়সের একটি মেয়ে রাত একটার সময় অতখানি ড্রাইভ করে একা কারও বাড়িতে হানা দেবে খুন করার পূর্ব-পরিকল্পনা নিয়ে। খুনের অস্ত্রটাও তো সে সঙ্গে করে নিয়ে যায়নি। বেশ বোঝা যায় যে, ঘটনার দ্রুত আবর্তনে সে হঠাৎ পাইপটা হাতে তুলে নিয়েছিল-নিঃসন্দেহে আত্মরক্ষার্থে! ফলে পুলিসের যা বক্তব্য – এটা ‘হত্যা’ বা ‘মার্ডার’, তা ধোপে টেকে না। বড়ো জোর বলা যায়, আত্মরক্ষার্থে অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা:’কালপেবল হোমিসাইড’। তাহলে জামিন কেন দিলেন না বিচারক?
তার একাধিক হেতু হতে পারে!
প্রথম কথা : বিচারক বিশ্বাস করেছেন আসামির স্বামীর জবানবন্দি। হয়তো তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল নিজের বিবাহের প্রথম সপ্তাহের কথা! একটি সদ্যোবিবাহিতা বিয়ের কনে যার অষ্টমঙ্গলা পার হয়নি– সে তার বরকে কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মধ্যরাত্রে অভিসারে – অভিসার নাই হোক – মধ্যরাত্রে ‘গৃহত্যাগ’ করবে এটাই যে অচিন্তনীয়।
দ্বিতীয় কথা : এটাও বিচারক বিশ্বাস করেছেনে– স্বেচ্ছায়, অনিচ্ছায় বা আত্মরক্ষার্থে যাই হোক, মেয়েটির আঘাতে কমলেশ ভূতলশায়ী হয়। এক্ষেত্রে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে ফেলে পালিয়ে আসাটাও সমর্থনযোগ্য নয়। ছন্দা ওই ঘরেরই টেলিফোন ব্যবহার করে থানায়, হাসপাতালে বা কোনও অ্যাম্বুলেন্স-য়ুনিটে ফোন করে জানাতে পারত যে, ওই ঠিকানায় একজন অচৈতন্য মানুষ মাটিতে পড়ে আছে। তারপর অ্যাম্বুলেন্স এসে পড়ার আগে যদি সে পালিয়েও যেত তাহলে হয়তো তাকে ক্ষমা করা যেত! অন্তত জামিন দেওয়া।
অথবা হয়তো এসব কোনো হেতুই বিচারককে বিচলিত করেনি। ইদানিং সচরাচর যা হয়ে থাকে – তাই ঘটেছে। অর্থাৎ অত্যন্ত প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি – রাজনৈতিক ক্ষমতাদর্পে হোক অথবা অর্থকৌলীন্যের কল্যাণেই হোক – নেপথ্য থেকে কলকাঠি নেড়েছেন। সংবাদপত্রে বাসুসাহেব দেখেছেন, ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সের কলকাতা শাখা-অফিসে কী একটি সেমিনারে নাসিকের ধনকুবের ব্যবসায়ী ত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও এ সপ্তাহে একটি বক্তৃতা দিয়েছেন। সংক্ষেপে, আসামির পূজ্যপাদ শ্বশুর-মহাশয় এখন কলকাতায় বর্তমান।
ইতিমধ্যে ‘সুকৌশলী’ গোয়েন্দা সংস্থা – অর্থাৎ সুজাতা আর কৌশিক– যে সব তথ্য সরবরাহ করে চলেছে তাতে সমস্যার সমাধান তো ‘দূর অস্ত্র’ সেটা ক্রমশই জটিলতর হয়ে উঠছে।
এক নম্বর তথ্য: মৃত কমলেশের ঘরে পুলিস কোনো লেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট আবিষ্কার করতে পারেনি। সদ্য-লাগানো চকচকে ডোর-হ্যান্ডেলে নয়, টেলিফোনে নয়, গ্লাসটপ টেবিলে নয়। কেন?
কোথাও কোনো আঙুলের ছাপ কেন নেই? যদি ধরে নেওয়া যায় যে, আততায়ী হাতে গ্লাভস্ পরে এসেছিল তাহলে তার আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে না। সেটাই প্রত্যাশিত কিন্তু গৃহস্বামীর আঙুলের ছাপ পাওয়া গেল না কেন? বাসু-সাহেব নিজেও তো ঘটনার দিন ওই বাড়ির হ্যান্ডেলে হাত দিয়েছিলেন, তাঁর আঙুলের ছাপই বা মুছে গেল কী করে? সম্ভাব্য উত্তর একটাই: অপরাধটা যে করেছে সে গৃহত্যাগের আগে প্রতিটি আঙুলের ছাপ রুমাল দিয়ে মুছে দিয়ে গেছে। অর্থাৎ আতঙ্কতাড়িতা পলায়নপরা কোনো যুবতী নয়, প্রফেশনাল খুনির স্থিরমস্তিষ্কের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। পুলিস এ তথ্যটা মেনে নিয়েছে, কিন্তু কিছু সংশোধিত আকারে: ফিঙ্গারপ্রিন্ট মোছা হয়েছে রুমাল দিয়ে নয়, আঁচল দিয়ে।
দ্বিতীয় কথা: বটুক এবং তার স্ত্রী দু-জনেই শুনেছে ওই ঘরে যখন ঝগড়া মারামারি হচ্ছিল – ঝন্ধন্ করে কাচের বাসনপত্র ভাঙছিল – তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেউ একজন কলবেল বাজাচ্ছিল। বাসু-সাহেবের সিদ্ধান্ত: সেই লোকটা ওই ঘরে আদৌ আসেনি। ফলে সে খুনি হতেই পারে না। কারণ কমলেশ যখন ভূতলশালী হয় তারপরও সে ডোরবেল বাজিয়ে চলেছিল। পুলিস বোধকরি তা মানে না। পুলিস মানতে রাজি নয় যে, ছন্দা একা এসেছিল। অত গভীর রাত্রে ওই বয়সের একটি মেয়ে কলকাতার রাস্তায় একা ড্রাইভ করে না– বিশেষ তারাতলার নির্জন ফ্যাক্টরি-অঞ্চলে। সেই তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিটাই দুর্ঘটনাকে – পুলিসের মতে– ‘ডেলিবারেট মার্ডার’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে!
আরও একটা ব্যাপার ঘটেছে। ঘটনার পরদিন থেকে ত্রিদির নিরুদ্দেশ! বস্তুত থানায় এজাহার দেয়ার পর সে আর তার আলিপুরের বাড়িতে ফিরে যায়নি কোথায় গেছে? কেউ জানে না। পুলিস বাদে। না হলে টি.ভি.তে নিরুদ্দেশ-তালিকায় ধনকুবেরের একমাত্র পুত্রের ছবি দেখা যেত। বেশ বোঝা যায়, পুলিসের ব্যবস্থাপায় সে লোকচক্ষুর অন্তরালে কোনও পাঁচতারা হোটেলে তোফা আরামে আছে। ব্যবস্থাপনা পুলিসের, কিন্তু খরচ সম্ভবত তার পিতৃদেবের।
কিন্তু কেন? ত্রিদিবকে লুকিয়ে ফেলার কী কারণ– জানতে চাইলেন রানু।
ওঁরা তিনজনে বসেছিলেন লিভিং-রুমে। কৌশিক আজ তিনদিন বেপাত্তা – কোথায়-কোথায় ঘুরছে কমলেশের পূর্বজীবনের ইতিহাস সংগ্রহ মানসে। বাসু জবাবে বললেন, বুঝলে না? যাতে কারও প্রভাবে পড়ে ত্রিদিবনারায়ণ তার জবানবন্দিটা প্রত্যাহার করে না নেয়। যাতে কেউ তাকে কোনো প্রশ্ন না করতে পারে। বিশেষ করে খবরের কাগজের লোক।
সুজাতা জানতে চায়, আচ্ছা মামু, একটা জিনিস আমাকে বুঝিয়ে বলুন তো।আমি শুনেছি, ভারতীয় আইনে স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অথবা স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারে না– মানে ক্রিমিনাল কেস-এ! এটা সত্যি?
– হ্যাঁ সত্যি। তবে ‘স্পাউস’ অনুমতি দিলে, পারে।
– তাহলে এক্ষেত্রে ছন্দা যদি অনুমতি না দেয় তাহলে ত্রিদিব তো সাক্ষ্য দিতে পারবে না? ছন্দা যে তার স্বামীর চকলেটে ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিল, সে যে রাত সাড়ে বারোটায় গাড়ি নিয়ে আলিপুর থেকে রওনা হয়েছিল এসব তো ত্রিদিবের স্টেটমেন্টের উপর প্রতিষ্ঠিত?
বাসু বললেন, জবাবে তিনটে কথা বলব। প্রথম কথা:ছন্দা যে মুহূর্তে বলবে যে, স্ত্রী হিসাবে যে দাবি করছে ত্রিদিব যা দেখেছে, যা জানে তা আদালতে বলতে পারবে না, সেই মুহূর্তেই বিচারক ধরে নেবেন যে, তাহলে মেয়েটি ধোওয়া তুলসীপত্র নয়। অর্থাৎ তার স্বামী প্রথম এজাহারে যা বলেছিল – যা আদালতে পেশ করা গেল না– যার ক্রস-এগ্ামিন হল না– তার ভিতর অনেকটাই সত্য আছে। দ্বিতীয় কথা: পুলিস অসংখ্য সাক্ষী খাড়া করবে– যারা ত্রিদিবের না-বলা কথাটা প্রতিষ্ঠিত করবে। কেউ বলবে যে, রাত বারোটা পঁয়ত্রিশে সে ছন্দাকে ড্রাইভ করে তার আলিপুরের বাড়ি থেকে বার হতে দেখেছে। ত্রিদিবের কোনো বন্ধু হয়তো বলবে, ত্রিদিবনারায়ণ তাকে বলেছিল যে, ত্রিদিবের স্ত্রী তার স্বামীকে ওভারডোজের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ‘হত্যা’ করতে চেয়েছিল, তাই বাড়ি ছেড়ে হোটেলে আশ্রয় নিয়েছে।
সুজাতা বাধা দিয়ে বললে, কিন্তু আসামির অনুপস্থিতিতে ত্রিদিব আর তার বন্ধুর কথোপথন ‘হেয়ার-সে’ হয়ে যাবে না?
– যাবে। আমি ‘অব্জেকশান’ দেব। বিচারক হয়তো তা ‘সাসটেইন’ও করবেন; কিন্তু সেই বিধিবহির্ভূত এভিডেন্স বিচারককে বিচলিত করবে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা: পুলিস এমন ব্যবস্থা করবে যাতে ছন্দার ওই সাংবিধানিক অধিকারটা কার্যকর করা না যায়। অর্থাৎ ছন্দাকে এমন প্যাঁচে ফেলা হবে যাতে সে ত্রিদিবের সাক্ষ্যদানে আদৌ আপত্তি করতে পারবে না।
– সেটা কীভাবে হতে পারে? – জানতে চান রানু।
– মামলাটা আদালতে ওঠার আগেই ওরা একটা পৃথক ‘অ্যাক্শন’ নেবে! আদালতে আবেদন করবে, যাতে ছন্দা এবং ত্রিদিবনারায়ণের রেজিস্ট্রি বিবাহটা ‘বাতিল’ বলে ঘোষিত হয়।
– ডিভোর্স পিটিশান?
– না গো। ডিভোর্স আদৌ নয়। আদালত ওদের বিবাহ-বিচ্ছেদ অনুমোদন করলেও ত্রিদিবনারায়ণ তার ভূতপূর্বা-স্ত্রীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারবে না– কারণ ঘটনা যেদিন ঘটেছিল সেই 22.6.91 তারিখে ওরা ছিল বৈধ স্বামী-স্ত্রী! আমি বলছি, ওপক্ষ চেষ্টা করবে ওদের বিবাহটা সমূলে অবৈধ প্রমাণ করতে। অর্থাৎ প্রমাণ করা: ওরা দুজনে– ওই ত্রিদিব আর ছন্দা কোনোদিনই স্বামী-স্ত্রী ছিল না। এক বিছানায় শুয়েছে এই পর্যন্ত! সে-ক্ষেত্রে ত্রিদিব সাক্ষ্য দিতে পারবে!
সুজাতা প্রতিবাদ করে, কিন্তু তা ওরা কীভাবে করবে? ত্রিদিব আর ছন্দা রীতিমতো রেজিস্ট্রি বিবাহ করেছে। সে বিয়ে নাকচ করা অতই সহজ।
– হ্যাঁ সহজ!
– এ-কথা কেন বলছেন?
– দ্য স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট নম্বর ফটিথ্রি অব নাইনটিন-ফিফটিফোর-এর আন্ডার সেকশন ফোর-এ বলা হয়েছে: রেজিস্ট্রি-বিবাহ তখনই সিদ্ধ যখন ‘নাইদার পার্টি হ্যাজ এ স্পাউস্ লিভিং’! অর্থাৎ রেজিস্ট্রি বিবাহকালে যদি মেয়েটির কোনো পূর্বতন স্বামী অথবা ছেলেটির পূর্বতনা স্ত্রী জীবিত থাকে, তাহলে সেই রেজিস্ট্রি-বিবাহ ভ্রমক্রমে লিপিবদ্ধ হলেও তা শুরু থেকেই অবৈধ। ওরা সহজেই প্রমাণ করবে যে, 15. 6. 91 যখন ছন্দা বিশ্বাস ত্রিদিবনারায়ণকে রেজিস্ট্রি মতে বিবাহ করে তখন ছন্দার পূর্বতন স্বামী কমলেশ বিশ্বাস জীবিত ছিল! ফলে শুরু থেকে ছন্দা ত্রিদিবের বিবাহ ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’! এককথায়, ‘অসিদ্ধ’!
এই সময়েই ডোরবেল বেজে ওঠে। বিশু গিয়ে সদর দরজা খুলে দিল। এল কৌশিক। হাতে স্যুটকেস, চেহারা ভগ্নদূতের।
বাসু বলেন, কী ব্যাপার? কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গেছিলে?
কৌশিক একটা চেয়ার টেনে বসে। বলে, তা কেন? সুজাতাকে তো বলে গেছি, দুর্গাপুর যাচ্ছি। আমি তো শক্তাবৎ রাজপুত নই যে, ধর্মপত্নীকে না জানিয়ে পালিয়ে যাব?
– তা সেখানে কেন? কিছু খবর পেলে?
– পেয়েছি, মামু। মারাত্মক খবর। অবিশ্বাস্য!
– ফায়ার!
– ছন্দা দেবীর প্রথম পক্ষের স্বামী কমলেশ বিশ্বাস ওরফে কমলাক্ষ, ওরফে কমলেন্দু গত শনিবার রাত্রে তারাতলায় আদৌ খুন হয়নি!
রানু আঁতকে ওঠেন: মানে?
বাসু বলেন, মানে, কৌশিক বোধহয় বলতে চাইছে ‘কমলেশ মরিয়াও প্রমাণ করিতে পারিল না যে, সে জীবিত ছিল।’ তাই কি?
– আজ্ঞে না। শনিবার যে মারা গেছে সে কমলেশের যমজ ভাই হতে পারে, কমলেশের ছদ্মবেশী হতে পারে, ছন্দা-কমলেশের যৌথ ধাপ্পাবাজি হাতে পারে…
সুজাতা বলে, যৌথ ধাপ্পাবাজি মানে?
– ওই খুন হয়ে যাওয়া লোকটা যে কমলেশ বিশ্বাস তা আমরা কী করে মেনে নিয়েছি? একমাত্র ছন্দার স্টেটমেন্ট অনুযায়ী নয় কি?
বাসু প্রতিবাদে বলেন, না! কাগজে লিখেছে পুলিস তাকে সনাক্ত করেছে বিবাহ-বিশারদ সমাজবিরোধী ‘কমল’ নামে। কমলেশ, কমলাক্ষ, কমলেন্দু নানান নামে সে কুমারী মেয়েদের ফাঁসিয়ে বিয়ে করত। একথা কাগজে যখন ছাপা হয় তখনো ছন্দা গ্রেপ্তার হয়নি। ফলে তোমার সংগৃহীত তথ্যটা দাঁড়াচ্ছে না। নাকচ হয়ে যাচ্ছে!
কৌশিক রুখে ওঠে, অল রাইট, মামু! এবার আমি যে তথ্য সংগ্রহ করে এনেছি সেটাকে নাকচ করুন।
বলো:
সুকৌশলীর উপর নির্দেশ ছিল ‘কমল’ নামধারী বিবাহ-বিশ্বারদের আদ্যোপান্ত ইতিহাসটা সংগ্রহ করা। কৌশিক ধাপে ধাপে তাই করছিল। ছন্দা তার এজাহারে বলেছিল, কমলেশের সঙ্গে গৃহত্যাগ করে ওরা প্রথমে কালীঘাটে গিয়ে বিয়ে করে, কিন্তু বেলেঘাটায় ঘর নেওয়ার পর দ্বিতীয়বার রেজিস্ট্রি মতে বিয়ে করে। তারিখটা ছন্দাই জানিয়েছিল: সাতই ডিসেম্বর 1983। কৌশিক তাই বেলেঘাটা অঞ্চলে একের পর একটি করে বিবাহ-রেজিস্ট্রেশন অফিসে খোঁজ নিতে থাকে। পঞ্চম কি ষষ্ঠ প্রচেষ্টা সাফল্যমণ্ডিত হয়। রেজিস্ট্রারের অনুমতি নিয়ে, যথাযথ ফি জমা দিয়ে একটা জেরক্স কপি সংগ্রহ করে। তাতে কমলের পিতার নাম এবং জন্মতারিখ পাওয়া যায়– সত্য হোক, মিথ্যা হোক – তা কমলেশের স্বীকৃতি-মোতাবেক। ওই বিবাহ-চুক্তিপত্রে দু-জন সাক্ষীর নাম-ঠিকানা ছিল। একজন বাঙালি, বিমল কর, একজন অবাঙালি। বাঙালি সাক্ষীর ঠিকানায় গিয়ে শোনা যায় সে এখন ওখানে থাকে না। কোথায় থাকে তা কেউ জানে না। অবাঙালি সাক্ষীর ঠিকানা ছিল দুর্গাপুরের ‘জি-টাইপ’ কোয়ার্টার্সের। কৌশিক খুঁজে খুঁজে লোকটির দেখা পায়। তার বাড়িতেই।
মহেশপ্রসাদ তিওয়ারি দুর্গাপুরের একজন নামকরা লেবার লিডার। সে কিন্তু কিছুতেই স্মরণ করতে পারল না কোনো ছন্দা বা কমলেশ বিশ্বাসকে। কৌশিক তখন বিবাহের চুক্তিপত্রের জেরক্স কপিটা দেখায়। মহেশপ্রসাদ স্বীকার করে, জি হাঁ! সিগ্রনচর তো হমারই আছে! লেকিন হমার তো কুছু য়্যাদ হচ্ছে না।
কৌশিক জানতে চায়, বিমল করকেও কি আপনি চিনতেন…
– নেহী নেহী। বিমলবাবু সিটু যুনিয়নে ছিলেন। তাঁকে পহছান্তে পারছি। লেকিন তিনি তো গুজর গিয়েসেন!
কৌশিক পুনরায় জানতে চায়, আপনাদের দু জনের মধ্যে একজন, আই মিন, ওই বিয়ের দু-জন সাক্ষীর মধ্যে একজন কোনো ইন্শিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট ছিলেন। কে? আপনি না বিমলবাবু?
– হামি। কেঁও?
– ছন্দা দেবী আমাকে বলেছেন যে, সেই এজেন্টের অনুরোধে ওঁরা স্বামী স্ত্রী একটি যৌথ ইন্শিওরেন্স করেন, দশ হাজার টাকার!
– হাঁ-! আভি য়্যাদ হল। ঠহরিয়ে বাবু-সাব। আরাম কিজিয়ে। ম্যয়নে ঢুঁড়কে দেখুঁ!
তেওয়ারিজী ইন্শিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে যাঁদের জীবনবীমা করিয়েছেন তাদের নাম-ধাম-ইন্শিওরেন্স নাম্বার ইত্যাদি একটি মোটা খেরো খাতায় পর পর লিখে রেখেছেন।বার্ষিকযা কমিশনপান তার হিসাব মিলানোর জন্যই শুধু নয়, ইনকাম ট্যাক্স অফিসারকে সন্তুষ্ট করার জন্য। সেই খেরো-খাতা দেখে তেওয়ারিজী জানালেন, হ্যাঁ ছন্দা আর ওঁর সদ্য পরিচিত অর্থাৎ বিমলের বন্ধু কমলেশ বিশ্বাস একটি যৌথ পলিসি করেছিল বটে, জেনারেল ইনশিওরেন্স কোম্পানিতে। দশ হাঁজার টাকার। একুশে ডিসেম্বর, তিরাশি সালে। কিন্তু সে পলিসি এখন আর চালু নেই। তা থেকে তেওয়ারিজীর কোনো অর্থাগম বর্তমানে হয় না। তার কারণ 27.3.88 তারিখে কমলেশ বিশ্বাস মারা গেছেন এবং তাঁর স্ত্রী নমিনি হিসাবে দশ হাজার টাকা লাভ করেছেন।
কৌশিক যথারীতি আকাশ থেকে পড়ে। তবে সে কোনো বিস্ময় প্রকাশ করে না। ইন্শিওরেন্স কোম্পানির কলকাতা-অফিসের ঠিকানা আর পলিসি নাম্বারটা টুকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসে।
হাওড়া স্টেশন থেকে সে সরাসরি ওই ইনিশিওরেন্স কোম্পানির অফিসে যায়। এ-ঘর-ওঘর এ-সাহেব ও-সাহেব করতে করতে একসময়ে তথ্যটার হদিশ পায়। হ্যাঁ, বিমা কোম্পানি যথারীতি অনুসন্ধান চালিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে নমিনিকে টাকাটা মিটিয়ে দিয়েছে। কমলেশ বিশ্বাসের মৃত্যুর অবিসংবাদিত প্রমাণগুলিও ওই পলিসি-পেমেন্ট ফাইলে গাঁথা আছে। ‘সুকৌশলী’-র লিখিত আবেদন-মোতাবেক ইনিশিওর কোম্পানির এক বড়ো-সাহেব সেই প্রমাণের জেরক্স কপি ইস্যু করার অনুমতি দিলেন। কৌশিক এবার তার বাসু-মামুর সামনে একে-একে দাখিল করল তার কাগজপত্র: কমলেশ বিশ্বাসের ডেথ্-সার্টিফিকেট, নার্সিং-হোমের ডিস্চার্জ বিল-ভাউচার, ক্রিমেটোরিয়ামের বিল! সবই 27.3.1988 তারিখের। বললে, এবার বলুন মামু, কমলেশ বিশ্বাসের কয়বার মৃত্যু বিশ্বাসযোগ্য?
বাসু জবাব দিলেন না। সহধর্মিণীকে বললেন, সানি-সাইড নার্সিংহোমে একবার টেলিফোনে দেখ তো, ডাক্তার প্রতুল ব্যানার্জিকে পাওয়া যায় কিনা।
টেলিফোন ধরল রিসেপশনিস্ট। মহিলা-কণ্ঠে শোনা গেল, ইয়েস! ডক্টর ব্যানার্জি আছেন ও. টি. তে। জানতে চাইল কে ফোন করছেন এবং কেন ফোন করছেন।
বসু বললেন, একটা মেসেঞ্জু কাইন্ডলি লিখে নেবেন?
– বলুন?
– আজ রাত নয়টার সময় আমি ডঃ ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করতে যাব। আমার নাম পি.কে. বাসু, অ্যাটর্নি।
মেয়েটি সবিনয়ে বললে, সরি, স্যার। রাত নয়টার সময় উনি নার্সিং হোমে থাকেন না। বাড়িতে থাকেন।
– অল রাইট! বাড়িতেই যাব। সেটা তো ওই নার্সিং হোমের উপরতলায়, তাই নয়?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ।বাট সরি স্যার, সন্ধ্যায় ওঁর আর কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে কি না তা তো আমি জানি না…
– কে জানে?
– ডক্টর ব্যানার্জি হিমসেল। কিন্তু তিনি এখন অপারেশন থিয়েটারে..
– আই নো! তাহলে মেসেজটাতে আরও লিখে রাখুন – অন্য কোনো সান্ধ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে ডক্টর ব্যানার্জি যেন তা ক্যানসেল করে আমার জন্য অপেক্ষা করেন – অ্যাট নাইন পি. এম.শার্প!
মেয়েটির বোধকরি ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, বলল, আয়াম সরি এগেন, স্যার! ডক্টর ব্যানার্জি – আমি যতদূর জানি – কারও হুকুমে চলেন না।
বাসু বললেন, আপনি তো রিসেপ্শনিস্ট, দূত মাত্র: আপনি এত ঘনঘন ‘সরি’ হচ্ছেন কেন? যে মেসেজটা দিলাম সেটা ডক্টর ব্যানার্জির হাতে ধরিয়ে দেবেন। উনি অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসার পর এবং এক-কাপ স্টিমুলেন্ট পান করার পর। ফলো?
মেয়েটি জবাব দেবার আগেই টেলিফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
