যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ১৩

তের

বাসু বললেন, ঠিক আছে, জয়া, তুমি আমার ক্লায়েন্ট। আমার আরও কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। প্রথমত, তোমার অর্থনৈতিক অবস্থাটা কেমন? ব্যাঙ্কে বা ফিক্সড ডিপোজিটে আন্দাজ কত টাকা আছে?

জয়া একটু ভেবে নিয়ে বলল, মাস-ছয়েক ধরে আমি কিছুই খবর রাখি না। আমাদের সবই জয়েন্ট-অ্যাকাউন্টে। ডাক্তারবাবুর পরামর্শে ও আমাকে ওসব বিষয়ে চিন্তা করতে দিত না।

– অল রাইট। কিন্তু যাদুগোপাল যখন রওনা হয় তখন সে নিশ্চয় চেক বই পকেটে নিয়ে যায়নি?

– তাও জানি না আমি। হয়তো চেক বই ওর ব্রিফকেসে আছে। সে ব্যাগটা বাইকের পিছনে ও নেয়।

– বুঝলাম। তা তোমার কাছে এখন নগদে কত টাকা আছে?

– নগদে বিশেষ কিছু নেই। শ’-দুই হবে হয়তো। ঐ তো ব্যাগটা আছে, দেখুন না। তবে ‘ট্রাভলার্স চেক’-এ হাজার পাঁচেক আছে।

– এত টাকার ট্রাভলার্স চেক করেছিলে কেন?

– আমি একটু সুস্থ হলেই আমরা দু’জনে বেড়াতে যাব – এইরকম স্থির ছিল। তাই ঐ ট্রাভলার্স চেকগুলো করে রেখেছিলাম।

বাসু তাঁর মানি ব্যাগ খুলে পাঁচখানি একশ টাকার নোট বার করে জয়াকে দিলেন। বললেন, এটা রাখ, আর ট্রাভলার্স চেকগুলো আমাকে দিয়ে দাও।

কেন, কী বৃত্তান্ত, জানতে চাইল না। জয়া নিক্কথায় নোটগুলো নিল, ব্যাগে ভরে রাখল, আর ব্যাগ থেকে এক গোছা ট্রাভলার্স চেক নিয়ে বাসু সাহেবের হাতে দিল। বাসু উঠে গেলেন টেবিলে। হোটেল স্টেশনারির একটা রাইটিং প্যাড তুলে নিয়ে লিখলেন:

‘আমি, নিম্নস্বাক্ষরকারী, নগদে সমপরিমাণ অর্থ গ্রহণ করিয়া নিম্নবর্ণিত ট্রাভলার্স চেকগুলি– যাহা এস.বি. আই.আমার নামে ইস্যু করিয়াছে– তাহা শ্রীসুজাতা মিত্রকে অর্পণ করিতেছি এবং তাঁহাকে নির্ব্যঢ় স্বত্বে এগুলি ব্যবহারের অনুমতি দিতেছি। শ্রী সুজাতা মিত্র প্রয়োজনে আমার অছি হিসাবে এই ট্রাভলার্স চেক-এ আমার স্বাক্ষর করিয়া তাহা ভাঙাইতে পারিবেন– এ বিষয়ে তিনি আমার এজেন্ট তথা ‘অ্যাটর্নি-ইন-ফ্যাক্ট’। ইতি…

হোটেল স্টেশনারির উপর দিকে ছাপানো অংশটা ছিঁড়ে ফেলে বাসু সাহেব কাগজটা জয়ার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলেন, নাও, পড়ে দেখ, তারপর সই কর, আজকের তারিখে। আর নিজে হাতে ট্রাভলার্স চেক-এর নম্বর এবং টাকার অঙ্কগুলো লিখে দাও।

জয়া জানতে চায় না, কেন, কী জন্যে। যথানির্দেশ লিখে কাগজটা ফেরৎ দেয়।

বাসু সাহেব নিজে থেকেই বলেন, বিশেষ প্রয়োজনে তুমি এখন মীনাক্ষী মজুমদার, তাই না? হয়তো ঐ পরিচয়ে তোমাকে বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। ফলে ‘জয়া সেন’-এর সই করে তুমি এখন ট্রাভলার্স চেক ভাঙাতে পার না। আবার নগদে বেশি টাকা তোমার কাছে থাকাও ঠিক নয়। পাঁচশ দিলাম, বাকি সাড়ে চার হাজার দফায় দফায় পাবে।

– আপনাকে তো কিছু ‘রিটেইনার’ দেওয়ারও কথা আমার।

– না, তুমি আমাকে নিয়োগ করনি। সেসব হিসেব তোমার ছোট বোনের সঙ্গে হবে।

– কিন্তু একটাকথা। আমি আপনাকে যেমন সব কথা খুলে বলতে পারলাম, পুলিসের কাছে বলতে পারি না?

– না। কেন জান? তুমি তোমার স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে যে কাজটা করেছ তা তোমার কাছে মনে হচ্ছে খুবই স্বাভাবিক। পুলিসের তা মনে হবে না।বিচারকেরও তা হয়তো মনে হবে না। লোকটা টেবিলে উল্টে পড়েছিল – সে বেঁচে আছেকিনা, তুমি দেখনি। পুলিসে একটা ফোনও করনি। উপরন্তু তার মুঠো থেকে ঐ শেয়ারের কাগজগুলো ছিনিয়ে নিয়ে…

কথাটা তাঁর শেষ হল না। ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল।

বাসু সাহেব সেটা তুলে নিতেই রিসেপশন থেকে জানালো ডাক্তার ব্যানার্জি মিসেস মজুমদারের সঙ্গে দেখা করতে চান।

একটু পরেই ডাক্তার ব্যানার্জি উপরে উঠে এলেন। বাসু-সাহেব ঘরের বাইরে করিডোরে তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন। ডাক্তারবাবু জানতে চান, পেশেন্ট জেগে আছে?

– হ্যাঁ। চল ভিতরে।

– কী নাম?

— মীনাক্ষী মজুমদার। দুর্গাপুরে থাকে। একটা কথা ডাক্তার, গতকাল রাত্রে ওর একটা বিশ্রী উত্তেজনা গেছে। শকটা কাটেনি। ও যে হার্ট-পেশেন্ট তা আগেই বলেছি। ফলে ওর ব্যক্তিগত…আই মীন, পারিবারিক প্রশ্ন, যত কম করা যায়…

– বুঝলাম। তা ‘প্রাতিঃকালে বমি হয়’, কিনা এ কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারি?

– অফ কোর্স। শারীরিক যে কোন প্রশ্ন। আমি বাইরে অপেক্ষা করব। তুমি ওকে ‘থরোলি’ পরীক্ষা করে আমাকে জানিয়ে যেও ওর শারীরিক অবস্থা। সত্যি কথা বলতে, আমি ওকে লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে রেখেছি। তুমি যদি মনে কর, ও পুলিসের জেরা এবং গ্রেপ্তার হওয়ার ধাক্কা সামলাতে পারবে তাহলে আমি সে খেলাই খেব। কিন্তু…

– অল রাইট, অল রাইট, চলুন রুগীকে আগে দেখি–

ওঁরা দু’জনে জয়ার ঘরের ভিতর এলেন। বাসু সাহেব ওঁদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে জয়াকে বললেন, মীনাক্ষী, ডাক্তারবাবু তোমাকে কিছু প্রশ্ন করবেন। পরীক্ষা করবেন। আমি বাইরে আছি। ও. কে.?

প্রায় মিনিট-কুড়ি পরে ডাক্তার ব্যানার্জি বার হয়ে এলেন। বাসু ঘনিয়ে এলেন। ব্যানার্জি বললেন, আমি মোটামুটি অবস্থাটা বর্ণনা করছি, টেকনিকাল শব্দ যতটা সম্ভব পরিহার করে। সাধারণের ধারণা হার্টের অসুখ মানেই ‘হয়ে গেল’। আসলে তা নয়। হার্ট একটা প্রত্যঙ্গ – তাতে মাংসপেশী আছে, স্নায়ু আছে, শিরা-ধমনী এবং ভ্যালভস আছে। এর যে কোনো কিছু গড়বড় হলেই আমরা বলি ‘হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে। ঐ মেয়েটির হার্ট দুর্বল ছিলই – সম্প্রতি একটা নতুন আঘাত পেয়েছে। আমার মনে হয়, মাস-কতক আগে ওর একটা ‘এন্ডোকার্ডাইটিস’-এর আক্রমণ হয়। ওর কাছে পুরানো প্রেসক্রিপশন থাকলে আরও স্পষ্ট বোঝা যেত। সে যাই হোক, অতি সম্প্রতি– আপনি বললেন গতকাল রাত্রে, তাই হবে – ওর হৃৎপিণ্ডে একটা প্রচণ্ড চাপ পড়ে। তাতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু যত্ন নিলে উনি আবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবেন।

– পুলিসের টানাহ্যাঁচড়া, গ্রেপ্তার ও সইতে পারবে?

– আমার পরামর্শ শুনুন। ওঁকে কোনও নার্সিংহোমে দেবেন না। বরং এই হোটেলে এই ঘরেই দিন-সাতেক থাকতে দিন। ঘরে একটা টি. ভি. সেট ভাড়া করে বসাতে পারলে ভাল হয়। না হলে ওঁর পছন্দমতো গল্পের বই এনে দিন। আমি ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি। পথ্য যেন ওঁর ঘরে সার্ভ করা হয়। সাতদিন বিশ্রাম নিলেই স্বাভাবিক হয়ে যাবেন। কী জানেন, বাসু-সাহেব, আমার মতে এটা একটা ‘বুন-ইন-ডিজগাইস’, মানে, ‘শাপে বর।’

– তার মানে?

– কাল রাত্রে কী ঘটেছে আমি জানি না, আমি জানতে চাইনি। কিন্তু আমার মনে হয়, উনি যে এই প্রচণ্ড বিপদের মধ্যে থেকে নিজের চেষ্টায় বের হয়ে আসতে পেরেছেন, এতে ওঁর আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে গেছে। ‘কার্ডিয়াক’ কেস-এ এমন প্রায়ই হতে দেখা যায়। আত্মীয়-স্বজনেরা পুতুপুতু করে এমন অবস্থা সৃষ্টি করে যে, রুগী মানসিক ভাবে জবুথবু হয়ে যায়। তারপর হঠাৎ ঘটনাচক্রে তাকে একা হাতে লড়াই করতে হয়– এবং তখনই সে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। ইয়ে…ওঁর নামটা যেন কী?

– মীনাক্ষী মজুমদার। তাল কথা, নবনীতা কেমন আছে?

– ভালই। ইতিমধ্যে কেমিক্যাল রিপোর্ট পাওয়া গেছে। প্রতিটি ক্যান্ডিতে সাত গ্রেন করে ভেরোনল ছিল। তার মানে, ও প্রায় পঞ্চাশ গ্রেন খেয়েছে। মনে হয় আজ বিকালেই তার ঘুম ভাঙবে। না হলে কাল সকালে নিশ্চয়ই।

ডাক্তার ব্যানার্জি প্রেসক্রিপশনটা বাসু-সাহেবকে দিলেন।

বাসুও নিঃশব্দে ওঁর ফি-টা হস্তান্তরিত করলেন।

বেলা সাড়ে ন’টা নাগাদ বাসু-সাহেব বাড়িতে এলেন। সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়ে যাননি। সবাই অপেক্ষা করছিল। উনি জয়া সেনের অবস্থার কথা জানালেন। কৌশিককে বললেন, হোটেলে গিয়ে কথাবার্তা বলতে, দিন-সাতেকের জন্যে একটা টি. ভি. ভাড়া করে ঐ ঘরে বসানো যায় কিনা। তারপর জীবন হালদারের বিষয়ে কোন সংবাদপত্রে কী ছাপা হয়েছে এই নিয়ে কিছু আলোচনা হল। কাগজে জয়া সেন বা তার স্বামীর প্রসঙ্গ কিছু আসেনি। তবে কাকলির বাড়িতে মধ্যরাত্রে পুলিস হানা দিয়েছিল খবর আছে।

বাসু বললেন, সুজাতা, তোমাকে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি। এই ট্রাভলার্স চেকগুলো নাও। প্রথমে ‘জয়া সেন’-এর স্বাক্ষরটা মকশো কর। একেবারে ‘পার্ফেক্ট’ যেন না হয়। আপাতদৃষ্টিতে যেন একই রকম লাগে। তারপর ওর ভিতর একটা হাজার টাকার ট্রাভলার্স চেক দেখতে পাবে। সেটা নিয়ে কোনও বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসে চলে যাও। আন্দাজ পঞ্চাশ টাকার জিনিস কিনে ঐ হাজার টাকার ট্রাভলার্স চেকের মাধ্যমে পেমেন্ট করার চেষ্টা কর।

রানু বললেন, এ তো সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। ও ধরা পড়ে গেলে জেল খাটবে না?

বাসু ধর্মপত্নীকে আশ্বস্ত করেন, না। খাটবে না। অন্তত আইনের দিকটুকু আমাকেই ভাবতে দাও তোমরা। বাকি ভাবনা তোমাদের।

কৌশিক জানতে চায়, আপনার মূল উদ্দেশ্যটা কী?

বাসু সে কথার জবাব না দিয়ে সুজাতার দিকে ফিরে বলেন, পঞ্চাশ টাকার জিনিস কিনে হাজার টাকার ট্রাভলার্স চেক ভাঙাতে চাইলে ক্যাশিয়ারের একটু সন্দেহ হবেই। হয়তো সে জানতে চাইবে আপনার কাছে খুচরো পঞ্চাশ টাকা নেই? অমনি তুমি লাফিয়ে উঠবে ‘গুড গড! আমার হাতব্যাগ! সর্বনাশ! ‘ ক্যাশিয়ারকে বলবে, ট্যাক্সিতে ফেলে এসছি। তার মধ্যে নগদে তিন হাজারর টাকা আছে। এই কথা বলে ট্রাভলার্স চেকটা ক্যাশিয়ারের টেবিলে ফেলে রেখে– তুমি সটকে পড়বে।

– তারপর?

– সোজা চলে আসবে বাড়িতে।

এবার সুজাতাই প্রশ্ন করে, ঠিক আছে। কিন্তু আপনার মূল উদ্দেশ্যটা কী?

– পুলিসকে বাধ্য করা তারা যাদুগোপালকে খুঁজুক।

– এখন খুঁজছে না?

– না। হোমিসাইড এখনো জানে না, যাদুগোপাল বা তার স্ত্রী নিরুদ্দেশ।

রানু বলেন, তুমি যদি পুলিসকে ও-কথা জানাও আর যাদুগোপালকে খুঁজতে বল, তাহলেও ওরা তা করবে না?

– না। এটা ওদের আত্মাভিমানে লাগবে। আমাকে ওরা পাত্তা দেবে না।

– তুমি সুজাতাকে যা করতে বলছ তা ও করলেই বা পুলিস যাদুগোপালকে খুঁজতে উঠে পড়ে লাগবে কেন?

– লজিক্যালি পর পর ভেবে দেখ। ক্যাশিয়ারের সন্দেহ হবে মাত্র পঞ্চাশ টাকার মাল কিনে ঐ ভদ্রমহিলা কেন হাজার টাকার ট্রাভলার্স চেক ভাঙাতে চাইছেন? দ্বিতীয়ত, সে হয়তো লক্ষ্য করে দেখবে, সইটা মিলছে না। তৃতীয়ত, মেয়েটি কেন চেকটা ফেলে রেখে চলে গেল? কেন সে ফিরে এসে চেকটা সংগ্রহ করল না? চতুর্থত, মেয়েটি বলে গেল তার ব্যাগে নগদে তিন হাজার টাকা আছে। তাহলে সে কেন হাজার টাকার ট্রাভলার্স চেক ভাঙাবে? ফলে, ক্যাশিয়ার ম্যানেজারকে জানাবে। ম্যানেজার পুলিসকে জানাবে। পুলিসের কাছে ‘জয়া সেন’ নামটা অজানা নয়। তারা ওর যোধপুর পার্কের বাড়িতে ফোন করবে, লোক পাঠাবে। তখনই জানবে যে, স্বামী-স্ত্রী কাল রাত থেকে নিরুদ্দেশ।দু’জনের তল্লাসি শুরু হবে।

কৌশিক বলে, ও, ভাল কথা। আপনাকে দু’টো খবর দেওয়া হয়নি।

– বলো?

কৌশিক সংবাদ দু’টি একে একে পেশ করে। প্রথম খবর হচ্ছে, ভোরবেলা কাকলি একটা টেলিফোন করেছিল। সে জানায় যে, তার দিদি এবং ভগ্নিপতির মধ্যে কেউই রাত্রে যোধপুর পার্কের বাড়িতে ফিরে আসেনি। টেলিফোন বারে বারে বেজে গেছে। সাড়া নেই। দ্বিতীয় খবর, কৌশিক বেলা আটটা নাগাদ গিয়ে দেখে এসেছে পুলিস ক্রেন দিয়ে জয়া সেনের ফিয়াট গাড়ির সামনের দিকটা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ঐ গ্যারেজের সামনেটা ফাঁকা করে দিচ্ছে।

এরপরেই বিশু এসে জানালো একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসেছেন।

বাসু অগত্যা তাঁর চেম্বারে গিয়ে বসলেন। একটু পরে রানু ইন্টারকমে জানালেন, মিস্টার ভৈরব দাশ সাক্ষাৎপ্রার্থী।

– অল রাইট। পাঠিয়ে দাও।

মিনিটখানেক পরে ঘরে ঢুকল ভৈরব দাশ। বছর পঁয়তাল্লিশ। সাজ-পোশাকে যথেষ্ট পরিপাট্য। শেরওয়ানি, চুস্ত আর রিমলেস চশমা।

বাসু বললেন, সিট ডাউন, মিস্টার দাশ। আমার একটু তাড়া আছে। আপনার যা বলবার তা একটু তাড়াতড়ি বললে সুবিধে হয়।

ভৈরব গুছিয়ে বসল। বলল, পরিচয় দিতে হবে না, আশা করি।

– না, সরাসরি বক্তব্যে আসতে পারেন।

– আমি কী জন্যে এসেছি সেটা কি আপনি আন্দাজ করতে পারছেন না?

– পারছি। তবু কথাটা আপনার মুখ থেকেই শুনতে চাই।

– মিস্টার বাসু, আমি সচরাচর কোনও জিনিসের প্রতি লালায়িত হই না। তবে যা চাই তা যেনতেনপ্রকারেণ হস্তগত করি। এ পর্যন্ত কখনো ব্যর্থ হইনি। এটাই আমার স্বভাব। এটাই আমার বৈশিষ্ট্য।

– আমি তো বললাম, আপনাকে, আমার সময় কম। ঐ সব ধানাই-পানাই ভূমিকা বাদ দিয়ে সোজা করে বলুন, কেন এসেছেন।

ভৈরব তিলমাত্র বিচলিত হল না। একই বিলম্বিতলয়ে বলে চলল, এবারও আমি যা চাইছিতা আমার হাতের মুঠোয় আসবে। অবধারিত ভাবে। সহজ রাস্তায় না হলে হয়তো একটু বাঁকা পথে। আপনি ঠেকাতে পারবেন না। বৃথা চেষ্টা। আমি যা করি তা আটঘাট বেঁধে করি। আমি আপনার কৃতিত্ব সম্বন্ধে অবহিত, আপনাকে একটুও আন্ডার-এস্টিমেট করছি না। আপনিও তা করলে, ভুল করবেন বাসু–সাহেব…

– ঠিক এই মুহূর্তে আপনার নজরটা কোনদিকে? গড়িয়াহাট রোডের ‘সুজাতা ফটোগ্রাফিক স্টোরসের’ একচ্ছত্র মালিকানা?

– মালিকানা, তবে একচ্ছত্র নয়।মাত্রফিফটিওয়ান পারসেন্ট শেয়ার। সিনিয়ার পার্টনারশিপটুকু।ব্যস।

– কেন? বাকি ফরটিনাইন কী দোষ করল?

– আমি চাই না যে, আপনার ক্লায়েন্ট সব কিছু বেচে দিয়ে নতুন কোনো ব্যবসার নেমে পড়ুক।

– সেটাই বা কেন?

– তাহলে সেই ব্যবসাটাও তো আমাকে কিনে নিতে হবে?

– অর্থাৎ আপনি আসলে ফটোগ্রাফিক দোকানটার প্রতি অর্থনৈতিক কারণে ইন্টারেস্টেড নন, দোকানটার বর্তমান ‘মালকিন’ই আপনার মূল লক্ষ্য?

– এতক্ষণে আপনি ‘বুলস-আই’ হিট করেছেন, ব্যারিস্টার-সাব।

– কিন্তু কেন? কেন এভাবে একটি স্বাবলম্বী স্বাধীনচেতা কুমারী মেয়ের সর্বনাশ করছেন? স্বর্ণলতার দশ পার্সেন্ট শেয়ার কিনে ‘সূচ’ হয়ে ঢুকে এখন যাদুগোপালের মাধ্যমে ‘ফাল’ হতে চাইছেন। এটা সহজবোধ্য। ভেবেছিলাম, তার কারণ দোকানটা আপনি গ্রাস করতে চান শুধু টাকার জন্যই…।

– ঐখানে আপনার ভুল হয়েছে। সেই ভুলটাই ভেঙে দিতে এসেছি। দোকানটা আমার চাই। তার মালকিনসমেত।

– কিন্তু কেন? কেন এভাবে ঐ মেয়েটার…

– সেটাই তো বোঝাতে চাইছিলাম। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়ালে আমি তাকে শুইয়ে দিই। আপনার ক্লায়েন্ট আমাকে অপমান করেছে, তাকে ক্ষমা করতে পারি না।

– আপনি বিবাহিত?

– হ্যাঁ, অতি সম্প্রতি, পূর্ব স্ত্রী বিয়োগের পর। একথা কেন?

– তাহলে, মানে, কাকলিকে…

– ঐ যে বললাম, শুইয়ে দিতে চাই।

– বাসু ইন্টারকমটা তুলে ধরে রানুর মাধ্যমে ‘সুকৌশলী’-কে চাইলেন। সুকৌশলীর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির ঘরটা বারান্দার ও-প্রান্তে। একটু পরে কৌশিক সাড়া দিল, বলুন?

– কৌশিক? শোন, আমি বাসু-মামু বলছি। একটু লিখে নাও। লোকটার নাম ভৈরব দাশ, ফিল্ম প্রডিউসার বলে কেউ কেউ তাকে চেনে বটে, কিন্তু বক্স-অফিস সাকসেসফুল ছবি আজও একটাও তুলতে পারেনি। বয়স অ্যারাউন্ড আটচল্লিশ, সাজগোজ ‘ফপিশ’। চোখে রিমলেস চশমা। কথাবার্তায় একটু হামবড়াই ভাব। গট ইট? লোকটা গড়িয়াহাট রোডের ‘সুজাতা ফটোগ্রাফিক স্টোরস’-এর কিছু শেয়ার সম্প্রতি কিনেছে। ঐ দোকানের প্রায় আধাআধি শেয়ারের মালিক শ্রীমতী জয়া সেন। প্রায় ইনভ্যালিড। তার স্বামী যাদুগোপাল সেন ‘রেশুড়ে’। ঐ শেয়ারগুলি বন্ধক রেখে যাদুগোপাল একজনের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়। লোকটা ‘সোনালি স্বপনের’ সিনিয়ার পার্টনার ছিল জীবন হালদার। আজকের কাগজে দেখে নিও, লোকটা কাল রাত্রে ফৌত হয়েছে। মার্ডার। এই ঘটনার সঙ্গে ঐ ভৈরব দাশের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ থাকার সম্ভাবনা। তুমি একটা ডোসিয়ার তৈরি কর – ‘ফ্লপ ফিল্ম প্রডিউসার ভৈরব দাশে’র নামে। তার পুরো ইতিহাসটা আমার চাই। ভৈরব দাশের সঙ্গে জীবন হালদার, রাকেশ বাজোরিয়া অথবা নবনীতা রায়ের কোনও যোগাযোগ গত এক পক্ষকালের মধ্যে হয়েছে কিনা – ওরা পরিচিত কিনা, আমি জানতে চাই।

কৌশিক জানতে চায়, আর কিছু?

– হ্যাঁ, ঐ ভৈরব দাশ-এর অতীত ইতিহাসে কোনও দুর্বলস্থল থাকলে সেটাও আমি জানতে চাই। লোকটার হামবড়াই ভাবের কথা বলেছি। সে দাবি করে যে, এ পর্যন্ত জীবনে যা যা চেয়েছে তা যেনতেনপ্রকারেণ পেয়েছে। কথাটা মিথ্যা হতে পারে – সত্য হলে ওর অতীত জীবনে একাধিক দুর্বলস্থান থাকবে। আমি জানতে চাই। ও. কে?

ইন্টারকম অফ করে মুখ তুলে দেখলেন ভৈরব ইতিমধ্যে একটা বার্মা চুরুট ধরিয়েছে। একগাল হেসে সে বললে, দারুণ ড্রামাটিক। তবে কী জানেন, ব্যারিস্টার-সাহেব, পয়সা আপনারও আছে, আমারও আছে। প্রয়োজনে ডজনখানেক ‘সুকৌশলী’ গোয়েন্দা আমিও লাগাতে পারি। তা আমি লাগাবো না। কেন জানেন? যেহেতু আমার প্রয়োজন হবে না; যেহেতু আমার কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে যে, আপনার ক্লায়েন্ট মিস কাকলি দত্ত কাল রাতম টা নাগাদ মোমিনপুরে গেছিল। আনফরচুনেটলি, বাড়িটা চিনত না বলে একটা বড় স্টেশনারি দোকানে রাস্তার ডিরেকশন নেয়। আনফরচুনেটলি, সে সরাসরি প্রশ্ন করে না যে, জীবন হালদারের বাড়িটা কোথায়? কায়দা করে জানতে চায়, রবি বসুর বাড়িটা কোথায়, যে রবি বসু সুবিখ্যাত জীবন হালদারের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িতে ভাড়া থাকে। আনফরচুনেটলি এগেন, সেটা ছিল দোকানের মালিকের বার্থ-ডে পার্টি। অন্তত দশজন সাক্ষী আমি খাড়া করব, যারা আপনার ক্লায়েন্টকে আইডেন্টিফাই করবে। এরপর আপনি কী বলবেন?

– গো টু হেল!

– আজ্ঞে নরকেই আমার বাস। অ্যাদ্দিন একা ছিলাম। এবার সঙ্গী পাব। আপনাকে আর আপনার মক্কেলকে। চলি, নমস্কার।

ভৈরব সোজা দ্বারের দিকে এগিয়ে যায়।