আট
শুক্রবার নির্দিষ্ট সময়ে আদালত বসার পর ঘোষিত হল : শ্রীসত্যানন্দ সেনের অছি-নিযুক্তিকরণ সংক্রান্ত মামলার শুনানী শুরু হচ্ছে।
বিচারক ভাদুড়ী আদালতের উপর নজর বুলিয়ে নিয়ে বললেন বাদী ও বিবাদীপক্ষের কাউন্সেলার আদালতে উপস্থিত আছেন দেখা যাচ্ছে। আদালত-নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্তও হাজির হয়েছেন। সর্বাগ্রে আমি ডক্টর দাশগুপ্তের সাক্ষ্যটা গ্রহণ করব। তিনি ব্যস্ত মানুষ, হয়তো অনেক অসুস্থ মানুষ অথবা তাঁদের আত্মীয়-স্বজন তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় চেম্বারে বসে আছেন। আপনি সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়ান, ডক্টর!
দত্ত অ্যান্ড দত্ত সলিসিটার্স ফার্মের সিনিয়ার সলিল দত্ত চট করে উঠে দাঁড়ান। একটি বাও করে বলেন, ইফ দ্য কোর্ট প্লীজ, ডক্টর দাশগুপ্তের এজাহার গ্রহণের পূর্বে আমরা একটি ‘গ্রিভান্স’ আদালতের সামনে মূভ করতে চাই ধর্মাবতার…
– কী বিষয়ে আপত্তি? –জানতে চাইলেন বিচারক।
– শ্রীমতী স্মরণিকা দত্ত – যাঁকে কেউ-কেউ স্মরণিকা ‘সেন’ নামে চেনে…এইটুকুই বলেই সলিল দত্ত জিরাফীয় ভঙ্গিতে উদ্ীব হয়ে কোর্টের চারিদিকে খুঁজে কী যেন দেখেন। তারপর নিজের বক্তব্যে ফিরে আসেন – তিনি অনুপস্থিত মনে হচ্ছে, তা যাক, তাঁর তরফের অ্যাটর্নি মিস্টার পি. কে. বাসু আদালতের আদেশনামাকে অগ্রাহ্য করে গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কের শ্রীসত্যানন্দ সেনের অ্যাকাউন্ট থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন।
বিচারকের ভ্রূকুঞ্চন হল। পর্যায়ক্রমে দুই আইনজীবীর দিকে দেখে নিয়ে সলিল দত্তকেই প্রশ্ন করেন, সেটা কী করে সম্ভব? আপনারা ঐ ব্যাঙ্কের উপর কোর্ট-অর্ডার সার্ভ করেননি?
– করেছিলাম, য়োর অনার।
– তাহলে আপনার মক্কেলের স্বাক্ষর ছাড়া কী করে টাকা তোলা সম্ভব?
– সহযোগী শ্রীসেনের স্বাক্ষর-করা সেই সওয়া লক্ষ টাকার চেকটা সুযোগমতো ভাঙিয়ে নিয়েছেন।
– ঐ অ্যাকাউন্টে অত টাকা ব্যালেন্স ছিল?
– ছিল না। মাত্র পাঁচশ টাকা ব্যালেন্স রেখে আমরা বাকি টাকা অন্যত্র নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ইতিমধ্যে রাকেশ জৈন নামে একজন ব্যবসায়ী ঐ অ্যাকাউন্টে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমা দেন।
– ব্যাঙ্ক তা আপনার মক্কেলকে জানায়নি?
– জানিয়েছিল হুজুর। কিন্তু সে চিঠি পেয়ে ব্যাঙ্কে উপস্থিত হয়ে আমার মক্কেল দেখেন যে, সহযোগী তার পূর্বেই ঐ সওয়া লক্ষ টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন।
জজ-সাহেব ধমক দেন, আপনার কথা কিছুই রোঝা যাচ্ছে না। আপনি বলছেন, অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স ছিল পাঁচশ টাকা, তারপর জমা পড়ল পঞ্চাশ হাজার, আর উইথড্রয়াল হল সওয়া লক্ষ? এই কথা বোঝাতে চান?
– আজ্ঞে না, য়োর অনার! আমাকে সবটা গুছিয়ে বলতে দিন…
সলিল দত্ত অতঃপর আনুপূর্বিক ঘটনার বিবরণ দিলেন। রাকেশ জৈনের পঞ্চাশ হাজার টাকা জমা পড়ার পর বাসু-সাহেবের নগদ পঁচাত্তর হাজার টাকা জমা পড়ে। অ্যাকাউন্টটি সওয়া লক্ষ টাকায় টৈ-টম্বুর হলে মিস্টার পি. কে. বাসু ঐ চেকখানি ভাঙিয়ে নেন। দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে অ্যাডভোকেট দত্ত বলেন, সহযোগী মিস্টার বাসু এবং ব্যাঙ্ক-ম্যানেজার মিস্টার রঙ্গনাথন যোগসাজস করে আদালতের আদেশ অগ্রাহ্য করে টাকাটা উইথড্র করেছেন। ধর্মাবতার, আমরা বিচার চাই…
বাসু তাঁর সহযোগীর বক্তৃতায় কর্ণেন্দ্রিয়কে সজাগ রেখেছিলেন, কিন্তু আঁতিপাঁতি করে তিনি আদালত কক্ষে খুঁজছিলেন দুটি পরিচিত মুখ। পৈ-পৈ করে বলে দেওয়া সত্ত্বেও স্মরণিকা সময়ে আদালতে হাজিরা দেয়নি। ওর জেঠু নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যাবার খবরটুকু পর্যন্ত তাকে জানানো যায়নি। কাল রাত এগারোটা পর্যন্ত টেলিফোন বেজেই গেছে। টুকু বাড়ি ছিল না। বেমক্কা অনেক টাকা পেয়ে কি সে টাকা ওড়াচ্ছে? এদিকে কৌশিক ধানবাদ থেকে ফিরে এসেছে সে খবর পেয়েছেন, কিন্তু এখনো তার রিপোর্ট পাননি, দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। হঠাৎ চিন্তাধারায় বাধা পেলেন জজ-সাহেবের প্রশ্নে, আপনি কি এ বিষয়ে কিছু বলবেন, মিস্টার বাসু?
বাসু উঠে দাঁড়ালেন। শ্রাগ করে বললেন, আমি এ পর্যায়ে কী বলতে পারি, য়োর অনার? সহযোগী কতকগুলি ‘ফ্যাক্টস্’ দাখিল করেছেন, ব্যাঙ্কের একটি বিশেষ অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত। অভিযোগ তো কিছু পেশ করেননি। ব্যাঙ্ক বা আমি কী-জাতীয় বে-আইনি কাজ করেছি আগে শুনি। তারপর তো আমার বক্তব্য?
জজ-সাহেব সলিল দত্তের দিকে ফিরে জানতে চান, আদালতের কোন স্পেসিফিক আদেশ লঙ্ঘিত হয়েছে?
– প্রথমত ঐ সওয়া লক্ষ টাকার চেকটা ব্যাঙ্ক অনার করল কেন?
বিচারক বললেন, ঐ চেকটি আমানতকারী সই করেছিলেন কোর্ট-অর্ডারের আগে। বস্তুত আপনার মক্কেলের তরফে আপনি আদালতে অছি-নিযুক্তিকরণ আবেদন করারও পূর্বে। কোর্ট-অর্ডারে কোথাও বলা হয়নি যে, সেই তারিখের পূর্বে শ্রীসত্যানন্দ সেন যেখানে যে স্বাক্ষর করেছেন তা ‘নাল-অ্যান্ড-ভয়েড’ করা হল। চেক ছ’ মাস পর্যন্ত ভ্যালিড থাকে। ফলে তিনি যদি কোর্ট-অর্ডারের আগে তাঁর ভাইঝিকে সওয়া লক্ষ টাকার…
– স্মরণিকা ওঁর ভাইঝি নয়, ধর্মাবতার…
জজ-সাহেব ‘অ্যাডমনিশ’ করেন। মৃদু ধমকের পর্যায় সেটা। বলেন, ছেলেমানুষের মতো আদালতের কথায় বাধা দেবেন না, কাউন্সেল! আপনার জানা থাকা উচিত, স্বোপার্জিত অর্থ মিস্টার সেন সে সময় রাস্তার ভিখারিকেও দিতে পারতেন।…যাহোক, যে কথা বলছিলাম, চেক ছ’ মাস ভ্যালিড থাকে। সুতরাং ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে যদি টাকা থাকে তাহলে ব্যাঙ্ক কেন পেমেন্ট করবে না?
– কিন্তু আগের দিন যখন ঐ চেক আর শ্রীসেনের চিঠিখানি আদালতে দাখিল করা হয় তখন ব্যাঙ্ক-ম্যানেজার মিস্টার রঙ্গনাথন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিলেন ঐ চেকটির সূত্র ধরেই মহামান্য আদালত শ্রীসেনকে বিকৃত-মস্তিষ্ক বলে ধরে নিয়েছিলেন।
– ব্যাঙ্ক-ম্যানেজার কী বুঝতে পেরেছিলেন সেটা প্রশ্ন নয়। আদালত নিযুক্ত অছি ব্যাঙ্ককে নির্দেশ দিতে পারতেন যে, ঐ চেকটি যেন অনার না করা হয়। সে অধিকার তাঁর ছিল, কিন্তু তা তিনি প্রয়োগ করেননি। ফলে ব্যাঙ্কের কী অন্যায় হল?
– দ্বিতীয়ত, ব্যাঙ্ক টাকাটা ‘পেয়ী’কে দেয়নি ধর্মাবতার। দিয়েছিল মিস্টার বাসুকে।
বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে ফিরলেন। বাসু দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আইনত ব্যাঙ্ক ‘পেয়ী’কেই টাকাটা দিয়েছে। প্রথম কথা, চেকের পিছনে শুধুমাত্র পেয়ীর স্বাক্ষর আছে, আর কারও সই নেই। ফলে ব্যাঙ্ক-রেকর্ডস্ অনুযায়ী পেমেন্ট পেয়েছে স্মরণিকা সেন, পেয়ী!
সলিল দত্ত গর্জে ওঠেন, আপনি বলতে চান, আপনি নিজে হাতে টাকাটা নেননি? আপনি বলতে চান, ঐ সময় ‘পেয়ী’ স্মরণিকা সেন ব্যাঙ্ক প্রেমিসে উপস্থিত ছিল?
বাসু শান্ত গলায় বিচারককে সম্বোধন করে বলেন, য়োর অনার, সহযোগী আদালতের কর্মপদ্ধতির এলিমেন্টারি সূত্রগুলোও জানেন না। প্রথম কথা: ওঁর জানা নেই, আদালতে উকিলে-উকিলে বাকবিতণ্ডা হয় না। দু-পক্ষই আদালতকে সম্বোধন করে কথা বলে। তাই ধর্মাবতারকে অনুরোধ করছি, আমার সহযোগীকে ভারতীয় আইনের ঐ এলিমেন্টারি ধারাটি বুঝিয়ে দিতে; অ্যার্টনি-হোল্ডার ক্লায়েন্টের তরফে যে-কোন এজেন্সির কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারে। ব্যাঙ্ক থেকেও। সে আন্সারেব্ল শুধুমাত্র তার ক্লায়েন্টের কাছে। ব্যাঙ্ক-ম্যানেজার জানতেন যে, পি. কে. বাসু শ্রীমতী স্মরণিকা সেনের অ্যাটর্নি-হোল্ডার!
বিচারক বার-দুই মাথা নেড়ে দত্তের দিকে ফিরে বললেন, ব্যাঙ্ক বা কাউন্সেলার কোন বে-আইনি কাজ করেননি, কোন ভাবেই আদালতের কোন আদেশ লঙ্ঘন করেননি। আগেই বলেছি, আপনার মক্কেলের উচিত ছিল ব্যাঙ্ককে লিখিত নোটিস দেওয়া – যেন, ঐ সওয়া লক্ষ টাকার চেকটা না অনার করা হয়। সে অধিকার আদালত আপনার মক্কেলকে দিয়েছিল। অথচ দেখা যাচ্ছে তিনি তা প্রয়োগ করেননি।
– কিন্তু যে অ্যাকাউন্টে মাত্র পাঁচশ টাকা ব্যালেন্স পড়ে আছে তা থেকে সওয়া লক্ষ টাকার চেক ভাঙানো যেতে পারে তা আমার মক্কেল কেমন করে আন্দাজ করবেন?
বিচারক বিরক্ত হয়ে বলে ওঠেন, মক্কেল আন্দাজ না করলেও তাঁর অভিজ্ঞ অ্যাটর্নির সেটা আশঙ্কা করা উচিত ছিল। এনি ওয়ে – আপনি যদি ইচ্ছুক থাকেন এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। ‘প্রাইমা ফেসি’ আমি কোনও কেস দেখতে পাচ্ছি না।
ডক্টর দাশগুপ্তের দিকে ফিরে বলেন, নাউ ডক্টর, আপনি শ্রীযুক্ত সত্যানন্দ সেনকে পরীক্ষা করে দেখেছেন?
– আজ্ঞে না?
– কেন? দেখেননি কেন?
– যেহেতু নির্দিষ্ট স্যানিটেরিয়ামে তাঁর দর্শন পাইনি। তিনি ওখানে নেই।
– তাহলে তিনি কোথায় আছেন?
– তা তো আমি জানি না।
– এটা কেমন করে হতে পারে?
– তাও আমি জানি না, য়োর অনার! তবে সরেজমিনে তদন্ত করে আমি কতকগুলি সূত্র আবিষ্কার করেছি, তা থেকে কতকগুলি সিদ্ধান্তেও এসেছি।
– কী সূত্র এবং কী সিদ্ধান্ত?
– ঐ তথাকথিত স্যানিটেরিয়ামটি একটি কাঁটা-তারে ঘেরা এলাকা। সেখানে কিছু রুগ্ম অথবা অসুস্থ অথবা বয়স্ক মানুষকে তাদের আত্মীয়-স্বজনের অনুরোধে আটকে রাখার ব্যবস্থা আছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক – নিত্যানন্দ রথ– তিনি ‘ডক্টর’ উপাধি ব্যবহার করেন বটে কিন্তু আমার সন্দেহ আছে, তিনি কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক্তারি ডিগ্রি আদৌ পেয়েছেন কিনা। তবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য তিনি লাইসেন্স-প্রাপ্ত। মানসিক রোগ ও রোগীর বিষয়ে তাঁর এলিমেন্টারি জ্ঞানের অভাব! ..যাহোক, আমরা কিছু এভিডেন্স পেয়েছি, যা থেকে অনুমান করা যায় শ্রীসত্যানন্দ সেনকে ঐ রেস্ট-হাউসের সতের নম্বর কেবিনে একটা লোহার খাটের সঙ্গে চামড়ার স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ওখানে আবাসিকদের কী ঔষধ বা কী পথ্য দেওয়া হয় তার কোনও চার্ট থাকে না, রেকর্ড থাকে না; কিন্তু তাদের খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা আছে। যাই হোক, ঐ রেস্ট হাউসের স্বত্বাধিকারী মিস্টার রথ আমাকে বলতে পারেননি– রজ্জুবদ্ধ শ্রীসেন কীভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে পারেন, তবে তাঁর মতে শ্রী সেন দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য ছাড়াই ওখান থেকে পালিয়ে গেছেন।…আমি তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, একটি অসুস্থ বৃদ্ধ, যাঁকে মানসিক অস্থিরতার কারণে সর্বদা ঘুমের ঔষধ খাওয়াতে হচ্ছে– তিনি কীভাবে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করুলেন? কীভাবে হাসপাতালের পোশাক পালটে জামা-কাপড় গুছিয়ে একাই পালিয়ে গেলেন? তাঁর পকেটে একটি পয়সা ছিল না, অথচ দেখা যাচ্ছে…
হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন কাউন্সেলার সলিল দত্ত: ইফ দ্য কোর্ট প্লীজ, আমি সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই যে, সাক্ষী তাঁর সীমানা লঙ্ঘন করছেন। তিনি মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ হিসাবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না, বরং তিনি গোয়েন্দা-কাহিনীর পাঠকের মানসিকতা নিয়ে কিছু কনক্লুশন পেশ করছেন মাত্র। তিনি মহামান্য আদালত-নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ, একথা অনস্বীকার্য! তবে মনস্তত্ত্ব-বিষয়ে, গোয়েন্দা হিসাবে নয়…
জজ-সাহেব ভাদুড়ী দত্তকে বলেন, সবার আগে বলুন, মিস্টার সত্যানন্দ সেন বর্তমানে কোথায় আছেন?
– আমি জানি না, য়োর অনার!
– অত সংক্ষিপ্ত জবাব তো গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, লার্নেড কাউন্সেলার। আপনার মক্কেলের সবকিছুর জন্যই আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে। আদালত শ্রীসত্যানন্দ সেনের তরফে আপনার মক্কেলকে অছি নিযুক্ত করার অর্থ এ নয় যে, সেই বৃদ্ধের সম্পত্তির উপর অধিকারটুকুই অর্পিত হচ্ছে, সেই মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধের যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও আপনার মক্কেলের উপর অর্পিত হয়েছে!
– আমি স্বীকার করছি হুজুর! কিন্তু আমার মক্কেল, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের বন্ধু শ্রীবিলাসসিং যাদব – এঁরা কেউই জানেন না -কী করে কী হল। শ্রীসেনকে একটি মানসিক আরোগ্য-নিকেতনে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। এ-কথা ঠিক নয় যে, সেটা একটা কাঁটা-তারে-ঘেরা বন্দীশালা! এ-কথাও সত্য নয় যে, শ্রীসেনকে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হত! দাদার এই অন্তর্ধানে আমার মক্কেল শ্রীচৌবে মর্মাহত। তিনি পুলিশে সংবাদ দিয়েছেন। প্রাইভেট গোয়েন্দাও নিযুক্ত করেছেন। আজ সন্ধ্যায় টি. ভি.-তে শ্রীসেনের ফটো-সমেত নিরুদ্দেশের ঘোষণাও করা হবে! তবে এই প্রসঙ্গে আমি আরও নিবেদন করতে চাই, ধর্মাবতার, যে, সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গেই পুলিশ ইতিমধ্যে যোগাযোগ করতে পেরেছে, শুধু একটিমাত্র ব্যতিক্রম…
– কে তিনি?– জানতে চান বিচারক ভাদুড়ী।
– শ্রীমতী স্মরণিকা দত্ত, যিনি মিস্স্মরণিকা সেন এই পরিচয়ে ঐ বাড়িতে দীর্ঘদিন বৃদ্ধকে শোষণ করেছেন। পুলিশ প্রাথমিক সংবাদ পায় যে, তিনি যদু কলোনীতে, বেহালায়, তাঁর বান্ধবী শ্রীমতী গীতা করের ফ্ল্যাটে অতিথি হিসাবে আছেন। কিন্তু পুলিশ গিয়ে সংবাদ পায় গত দু’দিন ধরে তিনিও নিরুদ্দেশ। উপরন্তু শ্রীযুক্ত সেনের একটি অ্যাম্বাসাডার গাড়ি – যেটা দীর্ঘদিন রিপেয়ারশপে পড়েছিল, সেটাও আমার মক্কেলের অজ্ঞাতসারে ডেলিভারি নিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা– তিনি তাঁর তথাকথিত জেঠামশায়ের বিষয় অত্যন্ত উদ্বিগ্ন বলে নিজেকে জাহির করা সত্বেত্ত্বও আজ আদালতে অনুপস্থিত। তদুপরি আমাদের সংবাদ: আমার সহযোগী লার্নেড কাউন্সেলও জানেন না, তাঁর মক্কেল বর্তমানে কোথায়!
বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললেন: মিস্টার বাসু?
বাসু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ে আদালতের দ্বারপথে ব্যস্তসমস্ত হয়ে টুকু প্রবেশ করছে। তার চুলগুলো উস্কোখুস্কো, খেয়াল নেই।
বাসু নির্বিকারভাবে বললেন, সহযোগী বলেছেন, আমার মক্কেল আদালতে অনুপস্থিত, তিনি কোথায় আছেন তা তিনি জানেন না। আমার মনে হয় তাঁর অবিলম্বে কোন চক্ষু-চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার…
ইতিমধ্যে স্মরণিকা বাসু-সাহেবের পাশের সীটে বসেছে। হাত দিয়ে সিঁথিটা ঠিক করে নিচ্ছে। তার মাথার চুল এখনো উস্কো-খুস্তুকো। বাসু-সাহেব তার দিকে দৃকপাত মাত্র না করে একই সুরে বলে চলেছেন, আমরা জানি না শ্রীসত্যানন্দ যে কীভাবে ঐ স্যানিটেরিয়াম থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন অথবা বর্তমানে কোথায় আছেন। আমি এবং আমার মক্কেল মঙ্গলবার আদালত শেষ হবার পর শ্রীসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছিলাম। আমরা সেখানে পৌঁছাই বিকাল পাঁচটা চল্লিশে। ভিজিটিং আওয়ার্স সাড়ে-পাঁচটায় শেষ হয়ে গেছে এই অজুহাতে আমাদের সতের নম্বর কেবিনের আবাসিকের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না। তাই আমরা জানিনা, তিনি সেখানে তখন ছিলেন কিনা। পরদিন বিকালে ভিজিটিং আওয়ার্সে এলে রুগীর দেখা পাব কিনা প্রশ্ন করায় আমাদের বলা হল যে, ডক্টর রথ ‘নো-ভিজিটার্স’ বোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছেন। এরপর গতকাল বিকাল চারটে-দশের সময় ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্ত আমাকে ঐ শান্তিধাম স্যানিটেরিয়াম থেকে টেলিফোন করে জানান যে, শ্রীসেনকে ওখানে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তৎক্ষণাৎ সেখানে চলে যাই। পৌঁছাই চারটে বেজে পঁয়তাল্লিশে। পুলিসে খবর দেবার আগে আমরা নিশ্চিন্ত হতে চাই যে, শ্রীসেন ওখানে কোথাও লুকিয়ে নেই। তাই ডক্টর দাশগুপ্ত এবং আমি একটাপ্রা থমিক তদন্ত করি। ডক্টর দাশগুপ্ত সে-কথাই তাঁর এজাহারে বিস্তারিত বলছিলেন। সহযোগী তাতে আপত্তি করেছেন এই অজুহাতে যে, তাঁর এজাহার মনস্তত্ত্ববিদের মতো নয়, গোয়েন্দা-কাহিনীর পাঠকের কনক্লুশন। সহযোগী বুঝতে পারেননি তিনি প্রকারান্তরে আদালত অবমাননা করছেন। ডক্টর দাশগুপ্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘সরেজমিনে তদন্ত করে আমি কতকগুলি সূত্র আবিষ্কার করেছি, তা থেকে কতকগুলি সিদ্ধান্তেও এসেছি।’ এ-কথা বলে তিনি থামামাত্র মহামান্য আদালত প্রশ্ন করেন ‘কী সূত্র এবং কী সিদ্ধান্ত?’ ফলে লার্নেড কাউন্সেলের ঐ মন্তব্যটি ভ্রান্ত। ডক্টর দাশগুপ্ত আদালত-নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ; আদালত তাঁকে প্রশ্ন করেছেন, তারই জবাব তিনি দিচ্ছিলেন।…সে যাই হোক, মোট কথা, একনম্বর:আমার মক্কেল আদালতে উপস্থিত। দু-নম্বর: শ্রীসত্যানন্দ সেনের জিম্বাদারী ছিল আমার সহযোগীর মক্কেলের উপর। দেখা যাচ্ছে তিনি বৈমাত্রেয় দাদার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকা কখন কোথায় যাচ্ছে শুধু তাতেই নিবদ্ধদৃষ্টি, গোটা দাদাটি কখন কোথায় আছেন তা জানেন না।
জজসাহেব বললেন, শ্রীসত্যানন্দ সেন নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় মামলার আদ্যোপান্ত রূপান্তর ঘটে গেছে। এটি বর্তমানে একটি ‘মূট’-কেস! আদালতের এক্তিয়ার থেকে কেসটা পুলিশের এক্তিয়ারে চলে গেছে। পুলিস বিভাগের সঙ্গে আদালত যোগাযোগ করবেন। উভয় কাউন্সেলারকে আদালতের নির্দেশ: শ্রীসত্যানন্দ সেন কোথায় আছেন তা জানতে পারলেই যেন তৎক্ষণাৎ আদালতকে জানান। তখন ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্ত তাঁর আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করে রিপোর্ট দাখিল করবেন।
আগামী শুক্রবার সকাল দশটায় আবার এই কেসের শুনানির দিন ধার্য হল।
স্মরণিকাকে জনান্তিকে নিয়ে এসে বাসু-সাহেব ওকে আদালতের একটা নির্জন ছোট ঘরে বসালেন। বললেন, তোমার ব্যাপারটা কী বল তো? কাল শান্তিধাম থেকে ফেরার পথে শ্রীসেনের নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার খবরটা তোমাকে জানাতে গেলাম, যদু কলোনিতে পৌঁছে দেখি গীতার বাড়িতে তালা ঝুলছে।
– বুঝেছি, কাল সন্ধ্যায় তো? এই সাড়ে ছ’টা নাগাদ? গীতা কলকাতার বাইরে গেছে, আর আমি একটু বেরিয়েছিলাম।
– একটু – বেরিয়েছিলে? রাত এগারোটা পর্যন্ত আট-দশবার টেলিফোন করেছি। প্রতিবারই নো রিপ্লাই।
– হবেই তো! টেলিফোন লাইনটা যে সন্ধ্যা নাগাদ খারাপ হয়ে গেল। অন্য কোথাও বেজেছে। এককামরার ফ্ল্যাট, নাহলে আমি শুনতে পাব না, এ কখনো হয়?
– বাজে কথা বল না টুকু! রাতে তুমি অন্য কোথাও ছিলে কোথায়?
– বাঃ! আমি আবার কোথায় থাকব? গীতার বাড়িতেই ছিলাম–
– ছিলে না। আদালতে আসার পথে আজ সকালেও আমি খোঁজ নিতে গেছিলাম। যথারীতি তালা ঝুলছিল।
স্মরণিকা হঠাৎ তার ম্যানিকিওর করা নখগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়।
– তোমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে?
এবার চমকে চোখে-চোখে তাকায় বলে আছে, কেন বলুন তো?
– তুমি সিংজীর রিপেয়ার-শপ থেকে মিস্টার সেনের অ্যাম্বাসাডার গাড়িখানা ডেলিভারি নিয়েছ?
– আপনি কেমন করে জানলেন?
– আমি কেমন করে জেনেছি সেটা বড় কথা নয়, তুমি নিয়েছ কিনা!
– হ্যাঁ, নিয়েছি। অন্যায় হয়েছে কিছু?
– হয়নি? তুমি জান না– কোর্ট-অর্ডারে মিস্টার সেনের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অছি নিযুক্ত হয়েছে ঐ ধনঞ্জয় চৌবে?
– বাঃ! তাহলে আপনি ঐ সওয়া লাখ টাকার চেকটা ভাঙালেন কী করে?
– তর্ক কর না। সেটা কোর্ট-অর্ডার হবার আগে সই করা চেক।
– গাড়িটাও তো কোর্ট-অর্ডার হবার আগে গ্যারেজে গেছে। সিংজী আমাকে চেনে। কতবার ওর গ্যারেজে ঐ গাড়ি রিপেয়ার করিয়েছি। আপনি টাকা দিলেন, তাই গাড়িটা ছাড়িয়ে আনলাম। এতে এত রাগ করছেন কেন?
বাসু দশ সেকেন্ড পর্যন্ত একজোড়া জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি মেলে ওকে দেখলেন। তারপর প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করে নিম্নস্বরে বললেন, তোমার জেঠু কোথায়?
আঁতকে উঠল স্মরণিকা: বাঃ! আমি তা কেমন করে জানব?
– কেমন করে জানবে তা জানি না। কিন্তু তুমি যে জান, তা জানি। নাহলে এতবড় খবরে তুমি বিচলিত হচ্ছ না কেন?
– বাঃ! বিচলিত হচ্ছি না মানে? জেঠু ওখান থেকে হারিয়ে গেলেন…কেউ জানে না তিনি কোথায়! …এ কি কখনো হয়? চৌবেকাকু জেঠুকে সরিয়ে ফেলেছে। নাহলে ডাক্তারী পরীক্ষায় ধরা পড়ে যাবে যে…
ঠিক কখনই রুদ্ধদ্বারে কে যেন ‘নক’ করল। ওঁরা কথা বলছিলেন আদালতের একটি ছোট্ট ঘরে যেখানে উকিলেরা তাদের সাক্ষী বা আসামীদের সঙ্গে জনান্তিকে কথা বলার সুযোগ পায়। বাসু উঠে গিয়ে পাল্লাটা খুলে দিলেন: ইয়েস?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে একজন কোর্ট-পেয়াদা। সেলাম করে বললে, স্যার, আপনার একটা টেলিফোন আছে। পেশকারবাবু বললেন, জরুরী ফোন। আসুন।
বাসু স্মরণিকাকে বললেন, তুমি চুপটি করে এখানে বসে থাকবে। আমাকে না বলে কোথাও আবার চলে যেও না, বুঝেছ? আমি জরুরী ফোন-কল’টা শুনে এক্ষুনি ফিরে আসব।
আদালতের সকলেই এই সিনিয়ার ব্যারিস্টার-সাহেবকে চেনে, শ্রদ্ধা করে। শুধু বয়স বা অভিজ্ঞতার জন্য নয়, তাঁর আশ্চর্যসাফল্যের জন্য।নিশ্চিত হারের মুখ থেকে বহুবার বহু আসামীকে বাঁচিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বে।
পেশকার নমস্কার করে বললে, ঐ ফোনটা, স্যার…
বাসু টেলিফোনের কথা-মুখে শুধু বললেন: বাসু।
– আপনার মক্কেল শেষমেশ আদালতে পৌঁছেছে?
কণ্ঠস্বরে চিনতে পারেন। কৌশিক। সে তাহলে কলকাতায় ফিরেছে। সে সব প্রশ্ন না করে উনি শুধু বললেন, হ্যাঁ।
– আপনার কাছে-পিঠে লোক আছে? খোলা কথা বলতে অসুবিধা আছে?
– আছে।
– তাহলে একতরফা শুধু শুনে যান। হাঁ-না’ জবাব দিয়ে।
– বলো?
– আপনি কি ওকে জেরা করছিলেন এতক্ষণ?
– হ্যাঁ।
– ও কি স্বীকার করেছে যে, গত দু’দিন ও গীতা করের বাড়িতে ছিল না।
– করেনি, কিন্তু আমি জানি।
– ও কি স্বীকার করেছে, সিংজির রিপেয়ার শপ…
– করেছে।
– আপনি ওকে ছেড়ে দিন। জেরা করবেন না। ওকে যেতে দিন।
– কিন্তু ওর আচরণ রীতিমতো সন্দেহজনক। দু-একটি ব্যাপার…
– ওকে ছেড়ে দিন মামু, এক্ষুনি। পুলিস ওকে খুঁজছে! দিস্ ইজ মোস্ট আর্জেন্ট…
বাসু বলেন, দাঁড়াও, দাঁড়াও! একটা সন্দেহ জাগছে। তুমি কি বলতে চাও, আমি এখানে ডায়মন্ডহারবারের কল্যাণী দাসীকে আটকে রেখেছি?
– প্লীজ মামু! কোন নাম উচ্চারণ করবেন না। ওকে ছেড়ে দিন। হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে দিন!
বলেই লাইনটা কেটে দিল
বাসু প্রায় ছুটতে ছুটতে ফিরে এলেন সেই একান্ত-কক্ষে। তার দরজাটা ভেজানো। ঠেলতেই খুলে গেল। ফ্যানটা ঘুরছে। ভিতরে কেউ নেই। বাসু চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বসে পড়েন। ধীরেসুস্থে পকেট থেকে পাইপ আর পাউচ বার করে আপন মনেই বললেন, আগেই বোঝা উচিত ছিল! অনেকগুলো সূত্র ছিল। প্রথমত কল্যাণী দাসী চাকরি পাওয়ার আগেই মিসেস রথ পালিয়ে গেছে। ফলে তাকে মিসেস রথ দেখেনি। মিস্টার রথ দেখেছে, চিনতে পারেনি। আর দারোয়ানটা তাই ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল – নার্স দিদিমণি ওঁর গাড়িতে এসেছেন কিনা। একমাত্র দারোয়ানই স্মরণিকাকে দু-দিন দেখেছে। পূর্বদিন বাসু-সাহেবের সঙ্গে, পরের দিন বোধহয় রথ দারোয়ানকে ডেকে মেয়েটাকে চিনিয়ে দিয়েছিল নবনিযুক্ত নার্সরূপে। আর তাই সেই নার্সদিদিমণির সঙ্গে একজন প্যান্ট-শার্ট-পরা বৃদ্ধকে হাসপাতালের বাইরে যেতে দেখে দারোয়ানের কোনও সন্দেহ হয়নি। স্মরণিকা নিশ্চয় শান্তিধাম থেকে কিছুটা দূরে গাড়িটা পার্ক করেছিল। সবচেয়ে বড় ক্লু: জেঠু হারিয়ে যাওয়ায় ওর তো আবার সেই অবস্থা হবার কথা, “শী মাস্ট সূন অর আটার ক্রাই।”
তা তো হয়নি!
বাসু পায়ে-পায়ে ফিরে এলেন পেশকারের টেবিলে। জানতে চাইলেন, ভাদুড়ী-সাহেব চলে গেছেন কিনা।
– আজ্ঞে না। এইবার উনি বাড়ি ফিরবেন।
– ওঁকে একবার বলুন তো– আমি মিনিট-পাঁচেকের জন্য দেখা করতে চাই। পেশকার টেলিফোনে কথা বলে ওঁকে জানালো, যান ভিতরে যান, স্যার। বাসু-সাহেব পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকতেই ভাদুড়ী-সাহেব বলেন, আসুন বাসু-সাহেব, কী ব্যাপার?
– একটু আগে প্রকাশ্য আদালতে আমি একটা স্টেটমেন্ট করেছি, যা সে-সময়ে নির্ভুল ছিল, কিন্তু এখন অবস্থাটা একটু পাল্টে গেছে। আমার মনে হল, ব্যাপারটা আপনাকে জানানো আমার কর্তব্য। মিস্টার ভাদুড়ী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েকটি মুহূর্ত। যেন ওঁর মনের কথা পড়ে নিতে চান।
তারপর বললেন, কাউন্সেলার! আপনি ভাল ভাবেই জানেন যে, এটা একটা ‘হাড্ডাহাড্ডি’ মামলা। কয়েক লক্ষ টাকার সম্পত্তি সংক্রান্ত। ফলে আমি চাই না আপনি জনান্তিকে আমাকে এমন কোন কথা বলে বসেন যেটা বলা আপনার পক্ষে এবং যেটা শোনা আমার প্রক্ষে প্রফেশনাল এথিক্সে বারণ!
সদানন্দ ভাদুড়ী ওঁকে প্রথম ঘরে আহ্বান করেছিলেন ‘বাসু সাহেব’ সম্বোধনে, কিন্তু এখন সম্বোধন করলেন ‘কাউন্সেলার’ বলে। ফলে বাসুও জবাবে বললেন, আমি জানি, য়োর অনার।
দুজনেই নীরব। শেষে জজ-সাহেব বলেন, অলরাইট। শুধু এটুকু বলুন: প্রকাশ্য আদালতে আপনার কোন ‘স্টেটমেন্ট ‘টা?
– আমি ঘোষণা করেছিলাম, ‘মিস্টার সেন এখন কোথায় আছেন তা আমরা জানি না।’
– আপনি বলতে চান ঐ স্টেটমেন্টটা ঠিক নয়?
– সাকেটিভ বিচারে আমার জ্ঞানমতে সে-সময়ে ঠিক ছিল, কিন্তু অবজেকটিভ বিচারে এখন ঠিক নয়!
একটু চিন্তা করে ভাদুড়ী-সাহেব, অর্থাৎ এখন আপনি জানেন, বর্তমানে মিস্টার সত্যানন্দ সেন কোথায় আছেন?
– নিশ্চয় না। তাহলে কোর্ট-অফিসার হিসাবে তা আমি পুলিসকে, আপনাকে এবং ডক্টর দাশগুপ্তকে জানিয়ে দিতাম। মিস্টার সেন আমার ক্লায়েন্ট নন।
পুনরায় নীরবতা। ন্যায়াধীশের নিরপেক্ষতা আর মানুষী কৌতূহলের একটা দ্বন্দ্ব।
দ্বিতীয়েরই জয় হল। বললেন, তাহলে কী জন্যে এসেছেন?
– আমি মনে করি – এইমাত্র আমি কতকগুলি সূত্র আবিষ্কার করেছি যার সম্বন্ধে কোর্ট-অফিসার হিসাবে আপনাকে অবহিত করা আমার কর্তব্য।
– কিন্তু আমি তো পুলিস নই। জনান্তিকে সেসব শোনা আমার পক্ষে ঠিক হবে না।
বাসু হেসে বলেন, তাহলে গুড-নাইট, য়োর অনার!
– না, দাঁড়ান! আমি বরং দু-একটি প্রশ্ন করি। আপনি ‘হাঁ-না’-র মধ্যে সীমিত করে তার জবাব দিন।
– বলুন?
– আপনার স্টেটমেন্টে ঐ ‘আমরা’ শব্দটুকুই কি ভুল?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– ওটা ‘বহুবচন’ না হলে ভুল হত না, কেমন?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– অলরাইট! আপনি বলুন! কী ‘কু’ পেয়েছেন ঐ সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে?
– পরশু ঐ শান্তিধামে একটি আন-আইডেন্টিফায়েড আনট্রেইন্ড-নার্স চাকরিতে বহাল হয়। তার বয়স, চেহারা ইত্যাদি আমার ক্লায়েন্টের মতো। মিস্টার সেন নিরুদ্দেশ হওয়ার ঠিক পর থেকে সেই নবনিযুক্ত নার্সকে ওখানে আর কেউ দেখেনি। দ্বিতীয়ত, আমার মক্কেল আমার অজ্ঞাতসারে একটা রিপেয়ার-শপ থেকে মিস্টার সেনের একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি ডেলিভারি নিয়েছে। তৃতীয়ত, আমার মক্কেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। চতুর্থত, তার কাছে হাজার-পঞ্চাশ টাকা আছে; সর্বোপরি, মিস্টার সেনের অন্তর্ধানে আমরা সবাই চিন্তিত, আতঙ্কিত, অথচ আমার মক্কেল…
বুঝেছি! এই সূত্রগুলি আপনি কতক্ষণ আগে আবিষ্কার করেছেন?
ধরুন মিনিটপাঁচেক। আমি আমার মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার আগেই ছুটে এসেছি আপনাকে জানাতে।
কোথাও কিছু নেই হঠাৎ অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন ভাদুড়ী-সাহেব।
বাসু-সাহেব নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর গম্ভীর হয়ে ভাদুড়ী বলেন, কাউন্সেলার! এসব বিষয়ে জনান্তিক আলোচনা প্রফেশনাল এথিক্সে বারণ! কোর্ট-অফিসার হিসাবে যা-যা করণীয় আপনি তা নিশ্চয় করবেন, আমি জানি। তবে এ প্রসঙ্গে একটা ধন্যবাদ আপনারপ্রাপ্য। আপনি এই তথ্যটুকু আমাকে আজ না জানালে সারারাত আমার নিদ্রা হত না।…অমন করে তাকিয়ে কী দেখছেন মিস্টার বাসু? বিচারক হলেও আমি তো মানুষ? পঁচাত্তর বছর বয়সের ঐ রকম একজন বৃদ্ধ…কিন্তু একটা কথা আমার বোধগম্য হয়নি বাসু-সাহেব…
– সেটা কী?
– খবরটা আন্দাজে বুঝে নিয়ে আমি যে রকম খুশিয়াল হয়েছি, খবরটা ‘ডিডিউস’ করে আপনি তো তেমন হননি?
– আজ্ঞে না, হইনি। কারণ যা ঘটে গেছে আমি সে-সব কথা নিয়ে চিন্তা করছি না আদৌ। যা ঘটতে পারে তাই ভেবেই আজ সারারাত আমার নিদ্রা হবে না।
– যা ঘটতে পারে! কী ঘটতে পারে?
– ধরুন কাল ভোররাত্রে আমি যদি ‘হোমিসাইড’ থেকে একটা টেলিফোন পাই যে, শহরতলীর একটা হোটেলে মিস্টার সেনের ডেড বডি পাওয়া গেছে, আর আমার মক্কেলের হেপাজতে পাওয়া গেছে সদ্যকৃত স্বহস্তলিখিত একটি উইল, যাতে শ্রীসেন তাঁর সর্বস্ব আমার মক্কেলকে দিয়ে গেছেন! তাহলে?
জজ-সাহেব ভাদুড়ী নির্বাক তাকিয়ে থাকেন ওঁর দিকে।
