বারো
কৌশিক যখন নিউ-আলিপুরের ডেরায় ফিরে এল তখন পড়ন্ত বিকেল। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। স্মরণিকাকে ওবেলাতে তার বান্ধবীর বাসাতে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। আহারাদি সেরে সুজাতাও কোথায় বেরিয়ে গেছে। ওঁরা কর্তা-গিন্নি বাইরের বারান্দায় এসে বসেছেন। বিশে চায়ের জল চাপিয়েছে। ঠিক সময়েই ফিরে এল কৌশিক। গাড়িটা পোর্টিকোতে রেখে নেমে এল। একখানা বেতের চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে, অনেক খবর সংগ্রহ করে এনেছি, মামু। বিস্তারিত শুনবেন, না চুম্বকসারটুকু প্রথমেই বাতলে দেব?
বাসু-সাহেব জবাব দেবার আগেই রানীদেবী বলে ওঠেন, স্নান তো হয়নি, দুপুরের খাওয়াটা হয়েছে? না হলে…
কৌশিক হাত নেড়ে বললে, আপনি ব্যস্ত হবেন না, মামী। খালি-পেটে টিকটিকিগিরি করার মানুষই আমি নই। লাঞ্চ করেছি ঐ মোটেলের সংলগ্ন রেস্তোরাঁতে, প্রবীর ঘোষালের সঙ্গে।
– প্রবীর ঘোষাল? নামটা চেনা-চেনা লাগছে! – বলেন রানীদেবী।
বাসু বললেন, হ্যাঁ, নামটা আমার কাছে শুনেছ। শ্রীরামপুরের বাসিন্দা। অর্ডার সাপ্লায়ার। তিনিই মৃতদেহটা প্রথম আবিষ্কার করেন।
তারপর কৌশিকের দিকে ফিরে বললেন, তোমার প্রথম প্রশ্নের জবাবটা মুলতুবি আছে। তুমি বিস্তারিত বর্ণনার আগে তোমার সংগৃহীত সংবাদের চুম্বকসারটুকু প্রথমে পেশ কর দিকিন।
– তাহলে প্রথমেই আপনাকে একটা সাজেস্শান দেব, মামু।আপনি এ-কেসে হাতটা ধুয়ে ফেলুন। আপনার মক্কেলকে বলুন: হয় অপরাধ স্বীকার করে সাজা নিতে অথবা অন্য কোনও ল-ইয়ারের দ্বারস্থ হতে।
বাসু গম্ভীর হয়ে গেলেন। বলেন, বুঝলাম। এবার একটু বিস্তারিত শোনাও। প্রথম কথা, অটোপ্সি-সার্জেনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে?
– এত শিয়ির? না, মামু। অন্তত আমি জানি না। তবে মনে হয় প্রাথমিক সন্দেহটাই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হবে। টেবিলে অর্ধভুক্ত চাও-মিঙের প্যাকেট পাওয়া গেছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় তাতে ‘কাম্পোজ’-চূর্ণ পাওয়া গেছে। শতকরা নিরানব্বই-ভাগ সম্ভাবনা ঐ চাও-মিঙ খেয়ে বিলাসসিং ঘুমিয়ে পড়ে। তখন তাকে বদ্ধ ঘরের মধ্যে রেখে গ্যাসটা খুলে দিয়ে হত্যাকারী নিঃশব্দে চলে যায়, দরজাটা টেনে দিয়ে।
– ‘গ্যাসটা খুলে দিয়ে’ মানে? ঐ ঘরে গ্যাস-স্টোভ ছিল? গ্যাস-বার্নার ছিল?
– না, ছিল না। তবে মোটেলটা এয়ার-কন্ডিশন করা। সেন্ট্রাল-হীটিং সিস্টেম। ঐ ঘরগুলোর পিছন দিয়ে দেওয়াল বরাবর একটা পঁচিশ এম.এম. গ্যাল্ডানাইজড গ্যাস-পাইপ গিয়েছে। তা থেকে একটা রিডিউসিং টি-জাংশনের মাধ্যমে নাইনটিন এম এম. পাইপে গ্যাস বাথরুমে ঢুকেছে। তাতে গীজারের জল গরম করা হয়। ইলেক্সট্রসিটিতে নয়, গ্যা।ে যেহেতু ওরা কারখানায় গ্যাস তৈরী করে। সে যাই হোক, সেই মেইন এক ইঞ্চি পাইপ থেকে ঐ টী-জাংশানের কাছে একটা শর্ট-পাইপ দিয়ে কানেকশন করা ছিল। আপনার মক্কেল সেই শর্ট-পাইপের প্যাঁচ খুলে…
বাসু-সাহেব ধমকে ওঠেন, তুমি পার? গাসকেট-জোড়াই একটা থ্রি-ফোর্থ ইঞ্চ গ্যালভ্যানাইজড্ পাইপের প্যাঁচ আল্গা করে ফেলতে?
– আমি তো বটেই, সুজাতাও পারে। মামীও পারবেন, এই হুইল চেয়ারে বসে-বসেই, যদি গ্যারেজ থেকে তাঁর টুল-বক্সটা কেউ নিয়ে আসে, যাতে অ্যাডজাস্টেব্ল রেন্চা রাখা থাকে। আপনার মক্কেলের গাড়িতে নিশ্চয় তা ছিল।
বাসু বলেন, তবে টুকু কেন? কেন নয় ধনঞ্জয়? কেন নয় প্রবীর ঘোষাল? অথবা সত্যানন্দ?
– ভিন্ন ভিন্ন হেতুতে, মামু। ধনঞ্জয় চৌবে শয্যাশায়ী, অ্যাকিউট ডায়েরিয়া। শুধু মিসেস্ চৌবে নয়, ও বাড়ির দারোয়ান যোগিন্দর সিংও বলেছে, মালিক গতকাল সারাদিন বাড়ি ছেড়ে বার হয়নি। তার অ্যালেবাই পাক্কা। দ্বিতীয়, প্রবীর ঘোষাল? তার কোনও মোটিভ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তৃতীয়ত সত্যানন্দ সেন। তিনি বেলা এগারোটা থেকে অনুপস্থিত। মোটেলে আদৌ ছিলেন না।
– কী করে জানলে?
– দুপুরে প্রবীর ঘোষালের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে খেতে।
প্রবীর ঘোষাল চার-নম্বর ইউনিটে ছিল। পাশের ঘরে যখন একজন বৃদ্ধ একটি সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নিলেন তখনি তার নজরে পড়েছিল। সে ঐ ইউনিটে দু-তিনদিন ধরে আছে। ‘এরিয়ার বিল’ পাস করানোর ধান্দায়। সে লক্ষ্য করেছিল, মেয়েটি দশটা নাগাদ বেরিয়ে গেল বুড়োকে ঘরে একলা রেখে। তারপর সে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেলা এগারোটা নাগাদ সে একবার গাড়ি নিয়ে •বেহালার দিকে যায়। তখন হঠাৎ ওর নজরে পড়ে ঐ বৃদ্ধ বাস-স্ট্যান্ডে একা দাঁড়িয়ে আছেন। কলকাতা যাওয়ার বাসস্ট্যান্ডের কাছে। প্রবীর তার গাড়ি নিয়ে ঘনিয়ে আসে। বৃদ্ধকে প্রশ্ন করে, কোথায় যাবেন আপনি?
বৃদ্ধকে যেন কিছু একটা তাড়া করেছে। সভয়ে গাড়ির চালকের দিকে ফিরে বললেন, দমদম এয়ারপোর্ট।
– আপনার নাতনী কোথায়?
– নাতনী? ও টুকু? সে গাড়ি নিয়ে কোথায় যেন গেছে।
– ঠিক আছে। আপনি উঠে আসুন। তারাতলার মোড় পর্যন্ত আপনাকে লিফ্ট দিতে পারব।
বৃদ্ধ তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যান। যেন তাঁকে যে বাঘটা তাড়া করেছে, তার হাত থেকে পালাতে চান।
প্রবীর আরও জানিয়েছে, এরপর সে বৃদ্ধকে দেখেনি। বস্তুত তাঁর নাতনী– মানে ‘টুকু’ নামের ঐ মেয়েটিকেও নয়। রাত সওয়া দশটা নাগাদ ডিনার খেয়ে যখন নিজের ইউনিটে ফিরে আসে তখন পাশের ঘর থেকে গ্যাসের গন্ধ পায়। ও সেই ঘরের সামনে গিয়ে ‘নক্’ করে। কেউ সাড়া দেয় না। তখন ও ম্যানেজারকে খবর দেয়। ম্যানেজার ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজাটা খোলে…
বাসু জানতে চান, ওদের সব দরজায় কি ‘ইয়েল-লক’?
– আজ্ঞে হ্যাঁ। বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে দিলে আর বিনা চাবিতে বাইরে থেকে খোলা যায় না।
বাসু নীরবে পদচারণা শুরু করেন। বাড়ির চারজন বাসিন্দাই জানেন পিছনে হাত দিয়ে এই নীরব পদচারণার অর্থ: উনি গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করছেন। অভিজ্ঞতা বলে, এই সময় সেই নীরবতা ভঙ্গ করলে ধমক খেতে হয়। আজ কিন্তু কৌশিকের সবুর সইল না। বলে বসে, আমার কী ধারণা বলব, মামু?
‘প্রত্যাশঙ্কিত’ প্রতিক্রিয়া হল না। বাসু ক্ষেপে গেলেন না, বা ধমক দিয়েও উঠলেন না। নীরবে ইজিচেয়ারে এসে বসে বললেন, বল?
– কাল আমি আর সুজাতা দেখেছি, মিস্ সেন সন্ধ্যানাগাদ তাঁর জেঠুর জন্যে বাজার করেছেন। তারপর রেস্তোরাঁয় গিয়ে চাইনীজ-খাবার বানিয়ে কার্টনে করে নিয়ে দোতলায় উঠেছেন। রাত তখন আটটা পাঁচ। মিনিট দশেক অপেক্ষা করে সওয়া আটটা নাগাদ আমরা ফিরে আসি। কেমন তো? আমরা ধরে নিয়েছিলাম তার অর্থ– সওয়া আটটা নাগাদ ওঁরা দুজনেই খাবার ভাগ করে খাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তা তো নাও হতে পারে। হয়তো ঘটনা ঘটেছিল এই রকম: দরজায় নক্ করতে ভিতর থেকে দরজা খুলে দেওয়া হল। ঘরটা অন্ধকার। স্মরণিকা অন্ধকারের মধ্যেই প্রশ্ন করে, ‘আলো জ্বালোনি কেন জেঠু?’ ঠিক তখনই আলোটা জ্বলে ওঠে। এবং দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। টুকু দেখে ঘরে তার জেঠু নেই এবং বিলাসসিং যাদব আছে! তা হতে পারে না?
বাসু বলেন, পারে, যদি আমরা ধরে নিই– এক: প্রবীর ঘোষাল সত্য কথা বলেছে। দুই: সত্যানন্দ যাবার সময় দরজাটা টেনে দিয়ে যাননি অথবা চাবিটা দরজায় লাগিয়ে রেখে-গেছিলেন এবং তিন…
– আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার কাছে ঐ তিন-নম্বর যুক্তিটাই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। আমি যা কল্পনা করেছি বাস্তবে তা ঘটে থাকলে এটা অনুমান কার যায় যে, বিলাসসিং টুকুকে প্রস্তাব দেয় নগদ প্রাপ্তির বিনিময়ে সে তার জেঠুকে চৌবের কবল থেকে উদ্ধার করে দেবে। এটাও অনুমান করতে পারি, টুকু রাজি হবার ভান করে। দুজনে চীনে খাবার ভাগ করে খায়। টুকু কায়দা করে ঘুমের ওষুধটা বিলাসের খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়, আর সে ঘুমিয়ে পড়লে গাড়ি থেকে অ্যাডজাস্টেবল রেঞ্চটা নিয়ে এসে গ্যাসটা খুলে দেয়। তারপর দরজাটা টেনে দিয়ে গাড়ি নিয়ে যদু কলোনিতে ফিরে আসে, ধরুন আন্দাজ নয়টা, সাড়ে নটায়। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে কাল রাত দশটা চল্লিশে যখন আপনি ফোন করেন তখন তার পক্ষে এমন সহজভাবে কথা বলা কি সম্ভবপর?
বাসু ইজিচেয়ার ছেড়ে আবার উঠে পড়েন। পদচারণা করতে করতে বলেন, অনেক– অনেকগুলো অসঙ্গতি আছে। অনেকগুলি মিথ্যে কথা আমরা শুনেছি। ঠিক কোন্-কোন্ট না জানলে…
– কী কী অসঙ্গতি?
প্রথম কথা : প্রবীর বলেছে সত্যানন্দ এগারোটার সময় দমদমে চলে গেছেন। অথচ টুকু বলছে, রাতে ফিরে এসে সে জেঠুকে দেখেছে। দ্বিতীয় কথা, চাওমিঙ-এর মাঝখানে ‘কাম্পোজ’-এর বড়ি থাকলে তা টের পাওয়ার কথা…
– না, মামু। যে ওটা মিশিয়েছে সে সুচারুরূপে কাজটা সম্পন্ন করেছে। কাম্পোজের বড়িগুলোর খুব মিহিভাবে গুঁড়ো করে নেওয়া হয়েছিল…
– কী ভাবে? ওখানে খল-নুড়ি রাখা ছিল নাকি?
– আজ্ঞে না। তবে বাথরুমে সেলোফেন কাগজ-মোড়া একটা স্টেরিলাইজড্ প্লাস্টিকের মগ ছিল। আর নতুন টুথব্রাশটার একটা শক্ত স্বচ্ছ খাপ ছিল। হত্যাকারী সেই দুটির সাহায্যে কাম্পোজ-এর বড়িগুলোকে গুঁড়ো করে নিয়েছিল। মগটা তার ‘খল’, টুথব্রাশের শক্ত কভারটা তার ‘নুড়ি’! ল্যাবরেটরি-টেস্টের দরকার নেই– সাদা চোখেই ফিকে গোলাপী আভা দেখা যাচ্ছে। পুলিশ সে দুটি ‘সীজ’ করে নিয়ে গেছে। যাবার সময় রবি আমাকে সেটা দেখিয়ে বলল, কী মনে হয় কৌশিকবাবু, এই আজব ‘খলনুড়ি’ অর্ধোন্মাদ সত্যানন্দ সেনের মাথা থেকে বার হতে পারে?
বাসু বলেন, এটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে না? বিলাস সিং-এর চোখের সম্মুখে ঐভাবে কাম্পোজ গুঁড়ো করা?
কৌশিক জবাব দিল না।
বাসু বললেন, তৃতীয় কথা, টুকু একবার বলল, আদালতে যাবার আগে সে তার জেঠুকে টাকাটা দিয়ে যায়। আর একবার সুজাতাকে বলল, আদালতে আসার আগে সে গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্ক থেকে ড্রাফট্ওলো ভাঙায়। দুটো স্টেটমেন্ট একই সঙ্গে সঠিক হতে পারে না। যদি প্রথমটা ঠিক হয়, অর্থাৎ আদালতে আসার আগে সে জেঠুকে টাকা দিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তা নগদ টাকা নয়। ব্যাঙ্ক-ড্রাফ্ট। যদি রাত আটটায় দিয়ে আসে, তাহলে তা হয়তো নগদ চল্লিশ হাজার টাকা। দুটো জিনিসে আকাশ-পাতাল প্রভেদ। বৃদ্ধের পকেটে নগদ চল্লিশ হাজার টাকা যদি থাকে তাহলে হত্যার মোটিভ ও হত্যাপরাধীর সম্ভাব্য রেঞ্জ বদলে যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে: টুকু অমন উল্টোপাল্টা স্টেটমেন্ট করল কেন? তা থেকেই মনে পড়ছে, রবি বোস যাবার সময় যে কথা গেল: আপনার মক্কেল এবারও বিচলিত হচ্ছে না কেন?…ভাল কথা, ঘরটা কি পুলিস সীল করে রেখেছে?
– না মামু। মৃতদেহ অপসারণের পর ওরা তন্নতন্ন করে খুঁজেছে। বহু ফটো নিয়েছে। ফিঙ্গার-প্রিন্টের জন্য ডাস্টিং করেও ফটো নিয়েছে। তারপর বেলা তিনটা নাগাদ ঘরটা রিলিজ করে দিয়েছে–
– তার মানে আমি ইচ্ছে করলে এখন ঘরটা ‘বুক’ করতে পারি? ঐ তিন-নম্বর ঘরটা?
– না পারেন না, মামু। ঘরটা অলরেডি বুকড্!
তারপর সহাস্যে যোগ করে, বাট্বাই সুকৌশলী। ইয়েস, মামু! আমার মনে হল আপনি একবার স্বচক্ষে দেখতে চাইবেন। তাই পুলিশে ঘরটা রিলিজ করামাত্র আমি সেটা আমার নামে বুক করেছি।
– ভেরি গুড! দেন গেট আপ! চল এখনি যাব।
– চা-টা না খেয়েই?
ঠিক তখনই ট্রেতে তিন কাপ চা নিয়ে শ্রীমান বিশুর প্রবেশ।
কিন্তু শান্তিতে চা-পান ওঁর কপালে নেই। ঠিক তখনই বেজে উঠল টেলিফোনটা। বাসু তুলে নিয়ে বললেন, ইয়েস, বাসু স্পিকিং।
– আমি স্মরণিকা বলছি, মেসো। গীতার ফ্ল্যাট থেকে। আমার সামনের চেয়ারে বসে আছেন ইন্সপেক্টর বরাট। উনি আমাকে অ্যারেস্ট করতে এসেছেন। ওঁর অনুমতি পাওয়ায় আপনাকে ফোন করছি।
– অ্যারেস্ট! বরাট তোমাকে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট দেখিয়েছে?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, নির্দিষ্ট অপরাধে। বিলাসসিং যাদবকে হত্যা করার অপরাধে। আপনি কি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চান?
– না। ওঁর সঙ্গে কথা হবে আদালতে। তোমাকেই আমার একটা কথা বলার আছে, টুকু। একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা। কোনও প্ররোচনাতেই পুলিশের কাছে কোনও জবানবন্দি দেবে না, কোনও কথার জবাব দেবে না। থানা-অফিসার যদি বলে, ‘আমার হাতঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে, আপনার রিস্টওয়াচে কটা বাজে, মিস সেন?’ তুমি জবাবে বলবে: ‘আস্ক মাই সলিসিটার প্লীজ! উকিলের অনুপস্থিতিতে আমি কোনও প্রশ্নের জবাব দেব না।’ পারবে?
– পারব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
– অলরাইট। দু-এক দিনের মধ্যেই জেল-হাজতে তোমার সঙ্গে দেখা করব। বেস্ট অব লাক্!
টেলিফোনটা স্বস্থানে নামিয়ে মিনিটখানেক চুপ করে বসে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, কৌশিক, তুমি একটা ওভার-নাইট ব্যাগে পাজামা টুথব্রাশ শেভিং সেট-মেট ভরে নাও। তোমাকে ঐ মোটেলে ফিরে যেতে হবে। রাত্রে ওখানেই থাকবে।
কৌশিক মাথাটা চুলকায়। তার ব্যাজার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে রানী বলে, কেন? কৌশিক কেন ওখানে গিয়ে থাকবে?
বাসু রুখে ওঠেন, ওর আপত্তিটাই বা কিসের? সেখানেও ডানলোপিলোর বিছানা, অ্যাটাচড্ বাথরুম, মায় ঘরটা এয়ার, কন্ডিশন করা। ওর যাতায়াতে যে পেট্রল পুড়বে তাও আমার অ্যাকাউন্টে…
– তাহলে তুমি নিজে গিয়েই থাক না বাপু?
– তা কি পারি না? তাও থাকতে পারি। তবে বুড়োমানুষটাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিয়ে…
কৌশিক আগবাড়িয়ে বলে না, না, মামু! আমি যাচ্ছি। ওখানেই রাতে থাকব। শুধু বলুন…
– তুমি থাম তো দেখি! – রানী ধমকে ওঠেন কৌশিককে। বাসুকে বলেন, বয়েস হয়েছে বলেই তোমাকে যেতে বলছি। কৌশিক কচি বউটাকে ফেলে…
বাসু একটা হাত বাড়িয়ে রানীকে মাঝপথে থামিয়ে দেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। একপাক পায়চারি করে ফিরে এসে বলেন, আই গেট দ্য পয়েন্ট। শোন কৌশিক, তোমার সঙ্গে সুজাতাও যাবে। তোমরা দুজনেই রাতে ওখানে থাকবে। ঐ সংলগ্ন চাইনীজ হোটেলে দুজনে নৈশাহার করবে: চাওমিঙ, চিলি-চিকেন আর ফ্রায়েড-প্রন। সবই আমার এই কেস-অ্যাকাউন্টে। তার পর রাতটা ঐ ঘরে দুজনে কাটাবে। সকালে, এই ধর নয়টা নাগাদ, আমি যাব। তখন কথা হবে।
কৌশিক বলে, আপনি যা-যা বললেন, তা অক্ষরে-অক্ষরে পালিত হবে। কিন্তু আপনি কি ভেবে দেখেছেন, মামু, ঘরটা পুলিশে ‘চিরুনি-তল্লাসী’ করেছে। তারপর ‘পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ-ঘা’ পর্যায় শেষ হবার পর মোটেল কর্তৃপক্ষ এসে ঘরটা ফিনাইল দিয়ে ধুয়েছে, মুছেছে, মুর্দার ব্যবহৃত বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় সব বদলেছে। অ্যাশ-ট্রে, ওয়েস্ট-পেপার-বাস্কেট…
– আই নো! আই নো! তবু আমি সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে চাই! তোমাদের আপত্তি আছে?
কৌশিক ‘শ্রাগ’ করল। বাসু রানীদেবীর দিকে ফিরে গম্ভীর স্বরেই বললেন, ম্যাডামেরও নিশ্চয় আপত্তি নেই এ ব্যবস্থায়? ভাগ্নে-ভাগ্নীর এই হনিমুন অ্যানিভার্সারিতে?
রানী মুখ টিপে হাসলেন শুধু।
