কৌতূহলী কনের কাঁটা – ৬

ছয়

শৈশবেই বাবা মাকে হারিয়েছে ছন্দা সেন, হ্যাঁ, কুমারী জীবনে সে ছিল সেন। কাকিমার কাছে মানুষ। তাও নিজের কাকিমা নয়, সম্পর্কে কাকির বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করতে থাকে। সাবালিকা হবার পর বাবার ইন্সিওরেন্সের টাকাটা কাকার কাছ থেকে পায়। কাকা কিন্তু বিচক্ষণ মানুষ।টাকাটা ওকে নগদে দেননা। ওর নামে ফিক্সড-ডিপোজিট কিনে নিজের কাছেই রাখেন, যাতে ওর বিয়ের সময় কাজে লাগে। ওর বয়স যখন উনিশ তখন কমলেন্দুর সঙ্গে প্রথম আলাপ। বেচারি দুনিয়াদারির কিছুই বুঝত না। কমলেন্দু ওর চেয়ে পনেরো বছরের বড়ো। কিন্তু চৌত্রিশ বছর বয়সেও তার ছিল একটা দুর্নিবার আকর্ষণী ক্ষমতা। একাধিক মেয়ে তার প্রেমে পড়েছিল। তার ভিতর ছিল ওর খুড়তুতো দিদি, রমা। কাকা-কাকি সেটা টের পেয়ে গেলেন। পাত্র হিসাবে তাঁরা কমলেন্দুকে আদৌ পছন্দ করেননি। ফলে ওদের বাড়িতে কমলেন্দুর আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেল।

রমার সঙ্গে প্রেম করলেও ছন্দাকে সে উপেক্ষা করেনি। আড়ালে আবডালে দু-জনের দেখা হোত। সত্যি-সত্যি ভালোবেসে, নাকি দিদির উপর টেক্কা দিতে – এখন আর ঠিক মনে পড়ে না-কমলেন্দুর হাত ধরে একরাতে গৃহত্যাগ করল ছন্দা। কমলের বাড়িতে কে আছে, সে কতদূর লেখাপড়া জানে, কী করে, কোথায় থাকে – এসব কিছুই না জেনে। চেনাঘাটের নোঙর তুলে অচেনা গাঙে নৌকাকে ঠেলে দিল দুঃসাহী কুমারী মেয়েটি! সঙ্গে শুধুমাত্র একটা সুটকেস। তাতে ওর পোশাক-আশাক, মায়ের ফটো অ্যালবাম, আর বাল্যের কিছু স্মৃতি। প্রথমেই ওরা এল কালীঘাটে। কমলেন্দু ওর সিঁথিতে সিঁদুর দিল, হাতে পরিয়ে দিল নোয়া-শাঁখা। এসে উঠল বেলেঘাটার একটা বস্তিতে। বারো ঘর এক উঠান। এক কামরার সংসার। পিঠামূলি ছ্যাঁচা-বাঁশের দেওয়াল – গঙ্গার পলিমাটি দিয়ে নিকানো। ঝাঁপের জানলা-দরজা। গোবরজলে নিকানো মেঝে। ছন্দার কিন্তু খারাপ লাগেনি। এ ঘরখানা ওর, ওর নিজের – না, ওদের দু জনের।

প্রায় সাত মাস ছিল টালির ঘরে। লক্ষ্মীর পট পেতেছিল। বৃহস্পতিবারে পাঁচালি পড়ত। একা একাই। কমলেন্দু বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায় কাক-ডাকা ভোরে, ফেরে রাত করে। হপ্তাবারে মদ্যপান করে। কিন্তু ওপাশের ঘরের নেতাই-এর মতো হপ্তাবারে বউ ঠ্যাঙানোর বদভ্যাস নেই। ছন্দা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল অভ্যাসটা ছাড়াবার। পারেনি। ওর ফুলশয্যা হয়নি– মানে, ফুলে-ঢাকা-শয্যায় কুমারী জীবনের শেষরাত্রি থেকে সীমন্তিনীর সৌভাগ্যে উত্তরণ। কে পাতবে ফুলশয্যা? তা বলে যৌবরাজ্যে উপনীত হওয়াটা কি থেমে থাকবে? তা যদি বল, তাহলে ছন্দার বিয়ে দু দুবার। ওই কমলেন্দুর সঙ্গেই। হ্যাঁ, শুধু কালীঘাটের বিয়েতে কমলেন্দুর মন ওঠেনি। একদিন আবার ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে সই দিয়ে বিয়ে করতে হল। ছন্দা বলেছিল, কী দরকার?

কমলেন্দু শোনেনি, বলেছিল, এটা তোমার নিরাপত্তার জন্যে। কেউ না ভবিষ্যতে বলতে পারে – তুমি আমার বিয়ে করা বউ নও!

কমলের চটকলের দু-জন মজুর বিয়েতে সাক্ষী দিতে এল। তাদের কমলেন্দু প্রকাশ্যে– মানে ছন্দার উপস্থিতিতে– মিষ্টি খাইয়েছিল, আড়ালে বেগুনি-ফুলুরি চাঁটযোগে কালীমার্কা বোতলের অমৃত।

বিয়ের পরের মাসেই দু-জনে একটি জীবনবীমা করে। ওই যে দুই বন্ধু ওদের রেজিস্টি-বিয়েতে সাক্ষী ছিল তাদেরই একজনের আগ্রহে। সে ছিল ইন্সিওরেন্স এজেন্ট। কমল প্রথমটায় কিছুতেই রাজি হয়নি, ছন্দার পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত স্বীকৃত হয়। পলিসিটা হল ‘জয়েন্ট’ নামে অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর যৌথ জীবনবীমা। দুজনেই দু-জনের নমিনি। যে কোনও একজনের মৃত্যু হলে অপর জন টাকাটা পাবে। বিপত্নীক হলে পাবে কমল, বিধবা হলে ছন্দা! পাক্কা দশ হাজার টাকা।

সাত মাসের দাম্পত্য জীবনে সে লজ্জায় কাকা-কাকি বা খুড়তুতো ভাই-বোনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। রমাদিকে টেক্কা দিয়ে সে যে খুব কিছু জিতেছে তাও তখন মনে হতো না। রমাদির বিয়ে হয়ে গেল সুপাত্রের সঙ্গে। গাড়ি-বাড়ি-টেলিফোন না থাক, পাকা ভাড়াটে বাড়ি, ভদ্র পরিবেশ, বাড়িতে টিভি! সরকারি কেরানি! পরম্পরায় খবর পেল। বিয়েতে এক-গা গহনাও পেয়েছে রমা। আর ছন্দার হয়েছে উলটো দশা।

কমলের পরামর্শে চার গাছা চুরি, গলার মালা আর কানের দুলটা খুলে রাখতে হয়েছে। সুটকেসে তালাবন্ধ করে। এগুলো ছন্দার মায়ের। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। গৃহত্যাগের রাত্রে গায়েই ছিল। কিন্তু এই বেলেঘাটার বস্তিতে সোনার গহনা পরে ঘোরাফেরা করার রেওয়াজ নেই। ছিন্তাই পার্টির দৌরাত্ম্যে। কমল অবশ্য ওকে কাঁচের চুরি, নল্লি সোনার দুল আর মঙ্গলসূত্র কিনে দিয়েছিল। এ পরিবেশে সেটাই স্বাভাবিক। সোনার গহনা সব রাখা ছিল সুটকেসে!

ঈশ্বর রক্ষা করেছেন– শুধু ঈশ্বর একাই নন, কমলও। সে এক-এক পাতাকী যেন ট্যাবলেট নিয়ে আসত। দৈনিক একটা করে খেতে হতো। তার ফলে ওদের এক-কামরার খুপরিতে অবাঞ্ছিত তৃতীয় মানবশিশুর আবির্ভাব ঘটেনি।

তারপর একদিন ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

ভর দুপুরবেলা। কে যেন ওর ঘরে টোকা দিল। এখানে এমন ব্যাপার প্রায়ই ঘটে। সোমত্ত মেয়েরা তাই হুট করে দরজার হুড়কো খোলে না। আগে জানলা দিয়ে দেখে নেয়, আগম্ভক পরিচিত মানুষ কি না – আবার শুধু পরিচিত হলেই চলবে না। চেনা-জানা লোকও এই নিঝুম ভরদুপুরে-যখন মরদেরা যে-যার ধান্দায় বস্তিছাড়া-তখন সোমত্ত-মেয়ের দোর খোলা পেলে দ্যাখ-না-দ্যাখ কাঁচাখেগো রাক্ষস হয়ে ওঠে। ছন্দা নজর করে দেখল – না, ভয়ের কিছু নয়। বাড়িউলি মাসি।

এই বারোঘর-এক-উঠানের মালকিন। কর্তা-মশাই “গঙ্গা পেয়েছেন। এই বিধবাই ওদের অভিভাবিকা। ছন্দা দোর খুলে দিয়ে বললে, কী মাসি? এই ভরদুপুরে?

– একটা প্রেয়জনে তোর কাছে এলুম, বৌমা। তোর ভাতারের কোনও ফটক আছে তোর কাছে?

– ফটক? মানে, ফটো? না তো! কেন গো মাসি?

– ওমা আমি কনে যাব! কালীঘাটে বে-করে সবাই যে জোড়ে ফটক তোলে। তোরা তুলিসনি?

ছন্দার মনে হল কথাটা ঠিক। ওদের একটা যুগলে ফটো তোলানো উচিত ছিল। আশ্চর্য! কমলেন্দুর কোনও ফটো যে ওর কাছে নেই, এই অভাববোধটার সম্বন্ধেও সে সচেতন নয়। কেন হবে? গোটা মানুষটা যার মুঠোয় বন্দি, সে কেন দৌড়াবে তার ছায়ার পিছনে? কিন্তু ওর ফটোর সন্ধান কেন করছে বাড়িউলি-মাসি? প্রশ্ন করে সেই মর্মে।

প্রৌঢ়া আর এক খিলি পান তার টোব্ললা গালে ঠেসে দিয়ে বল্লে, সে আর এক বেত্তান্ত। তোর শুনে কাজ নেই! যা, ঘরে গে খিল দে…

ছন্দার নজর হল, একটু দূরে একজন মাঝবয়সী মহিলা বাঁশের খুঁটিটা ধরে ওকেই দেখছেন, একদৃষ্টে। বছর চল্লিশ বয়স হবে তাঁর। সধবানা বিধবা ঠাওর হচ্ছে না, মাথায় সিঁদুর নেই, চোখে চশমা। চেহারার একটা আভিজাত্য আছে, যা এই বস্তিতে অপ্রত্যাশিত।

ছন্দা প্রশ্নটা না করে পারে না: উনি কে, মাসি?

মাসি পিছন ফিরে দেখল। বাঁশের খুঁটি ধরে যে মহিলাটি দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি এক-পা এগিয়ে এলেন। মাসি তাঁকে ধমক দেয়, আপনি আবার এখানে এসে জুটলে কেন গো বাছা? বললুম তো, আমি শুধিয়ে এসে তোমারে বলব নে। তা তর্ সইল না?

মহিলাটি ততক্ষণে ওর দোরগোড়ায়। মাসিকে তিনি পাত্তাই দিলেন না। ছন্দাকে বললেন, আপনার সঙ্গে কয়েকটা গোপন কথা ছিল!

– আমার সঙ্গে? কী কথা?

শেষ প্রশ্নটা উপেক্ষা করে উনি শুধু বললেন, হ্যাঁ, আপনারই সঙ্গে। আপনার এবং আমার স্বার্থে। ভিতরে আসব?

ছন্দা স্তম্ভিত হয়েযায়। সাত মাসে তার দুনিয়াদারীর অভিজ্ঞতা অনেক বেড়েছে। এইবস্তিতে নানান ঘটনা ঘটতে দেখে। অচেনা-অজানা কোনও মানুষকে, সে পুরুষ-স্ত্রী যাই হোক, হঠাৎ ঘরের ভিতর ঢুকতে দিতে নেই। কমল ওকে একথা পাখিপড়া করে শিখিয়েছে। কিন্তু এই সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলাটিকে সে প্রত্যাখ্যান করে কীভাবে?

ছন্দা জানতে চাইল, আপনি কি একাই এসেছেন?

– না, আমার একজন পুরুষ ‘এসকর্ট’ সঙ্গে এসেছেন। তবে এটা মেয়েলি ঘরোয়া ব্যাপার তো, তাই বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছেন। আপনারই নাম ছন্দা বিশ্বাস তো?

হ্যাঁ! কিন্তু আপনি কোথা থেকে আসছেন?

– বলব ভাই, সব কথাই খুলে বলব। কিন্তু জনান্তিকে। প্রাইভেটলি!

ছন্দা মনস্থির করে। বাড়িউলি মাসির দিকে ফিরে বলে, ঠিক আছে মাসি। তুমি এস এখন। শুনি, এ ভদ্রমহিলা আমাকে কী বলতে চান। তবে, একটু সজাগ থেকো। ডাকলে যেন সাড়া পাই।

মাসির বামগণ্ড স্ফীত ছিলই। পান ঠাশা। ধীরেসুস্থে আঁচলের খুঁট খুলে জর্দার কৌটটি বার করল। আপনমনে বললে: গুপন কতা। ভদ্দর মইলা। বেলেঘাটার বস্তিতে।

তারপর জর্দার টিপ্টা রক্তরাঙা মুখ-গহ্বরে নিক্ষেপ করে একটি ‘শোলক’ শুনিয়ে দিল, ‘দেকচি কত দেকব আর। চিকার গলায় চন্দ্রহার।’

বোঝা গেল, চার দশক বেলেঘাটা বস্তিতে বাস করে কলকাত্তাইয়া লবজে রপ্ত হলেও হেইপার বাঙলার বাল্যস্মৃতি একবারে মুছে যায়নি মাসির।

মহিলাটি ভিতরে এলেন। ছন্দা একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়ে বলল, বসুন।

মহিলাটি সাবধানী। দরজার হুড়কোটা টেনে দিয়ে বসলেন। বললেন, তোমাকে ‘তুমিই’ বলছি ভাই, কিছু মনে কর না। প্রথমে এক গ্লাস জল খাওয়াও।

ছন্দা বললে, তাই তো বলবেন, বয়সে আপনি কত বড়ো।

বেচারির ঘরে বাতাসা ছাড়া আর কিছু ছিল না। দু-খানা বাতাসা পেতলের রেকাবিতে সাজিয়ে জল দিল। উনি নিঃসঙ্কোচে বাতাসা মুখে দিয়ে ঢকঢক করে জলটা খেলেন। মুখটা মুছে নিয়ে বললেন, তোমার স্বামীর ছবি দেখতে চাওয়ায় তুমি খুব অবাক হয়ে গেছ, তাই না, ছন্দা?

ছন্দা বলল, তাই তো হবার কথা। কেন দেখতে চাইছেন?

– না, ছন্দা। আমি তোমার সংসার ভাঙতে আসিনি। আমি তোমার কোনও ক্ষতি করব না। কিন্তু তুমি সত্য কথা বললে আমার অপরিসীম উপকার হবে। তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?

ছন্দা বুদ্ধিমতী। বললে, তার আগে আপনার পরিচয় দিন। আপনি কে? হঠাৎ এমন ভরদুপুরে একজনের ঘরে চড়াও হয়ে তার স্বামীর ফটো দেখতে চাইছেনই বা কেন?

– সঙ্গত প্রশ্ন। বেশ আমি সব কথা খুলে বলছি। সব শুনে তুমি আমাকে বল, নিজের ক্ষতি না করে আমাকে সাহায্য করতে রাজি আছ কি না।

– বলুন?

ভদ্রমহিলার নাম শকুন্তলা দত্ত। বি. এ., বি. টি.। বরিশা-বেহালায় নিস্তারিণী সেকেন্ডারি গার্লস স্কুলের অঙ্কের মাস্টারনি। অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিসট্রেস। ওই স্কুলের কাছেই একটা দু-কামরার ভাড়াবাড়িতে থাকেন। মাত্র দুটি প্রাণী। উনি আর ওঁর ছোটো বোন, অনসূয়া – বিবাহিতা। কিন্তু স্বামীত্যক্তা। বয়সে ওঁর চেয়ে ষোলো বছরের ছোটো;নিজেরই বোন। বাবা-মা মারা যাবার সময় উনি নিজে ছিলেন বি. এ. ক্লাসের ছাত্রী। অনসূয়া স্কুলে পড়ত। প্রায় মেয়ের মতো অনুকে মানুষ করেছেন। কিন্তু ওঁর মতের বিরুদ্ধে পালিয়ে গিয়ে এক অজ্ঞাতকুলশীলকে বিয়ে করে বসল অনু। দু বছর বিবাহিত জীবনের পর আবার কাঁদতে কাঁদতে একদিন ফিরে এলো দিদির কাছে। ওর স্বামী ওর সর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে – নগদ টাকাকড়ি গহনা সব কিছু নিয়ে – ওকে ফেলে পালিয়ে গেছে। সে আজ বহু বছর আগেকার কথা। মেয়ের মতো এতদিন মানুষ করেছেন ওকে। ফেলতে পারলেন না। আবার লেখাপড়া শেখাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অনু উৎসাহ পেল না। ইতিমধ্যে একটি ছেলে ওর প্রেমে পড়েছে-ওই যে ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে উনি আজ এসেছেন বরিশা-বেহালা থেকে এই বেলেঘাটার বস্তিতে। কিন্তু প্রথম বিবাহটার বিচ্ছেদ না হলে ওরা বিয়ে করতেও পারে না। আইনে বলে সাত-সাতটা বছর নাকি অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ ওদের আরও দুটি বছর অপেক্ষা করে থাকতে হবে। এমন সময় খবর পেলেন – অনুর পলাতক স্বামী বেলেঘাটার বস্তিতে একটি মেয়েকে নিয়ে থাকে। সংবাদদাতা নাকি স্বচক্ষে দেখেছে। অনসূয়ার স্বামী কমলাক্ষ করকে সে দেখেছে, আবার বেলেঘাটা বস্তিতে ছন্দার স্বামীকেও দেখেছে। দু-জন নাকি হুবহু একরকম দেখতে। অঙ্কের দিদিমণি জানেন দুটো বাহু সমান হলেই দুটি ত্রিভুজ অভিন্ন হয় না। তাদের অন্তর্নিহিত কোণটাও সমান হওয়া দরকার। তাই যাচাই করতে এসেছেন ছন্দার গৃহকোণে। না, ছদার সংসার ভাঙতে নয়, কোনও ক্ষতি করতে নয়– যদি দেখা যায় যে, ছন্দার স্বামী আর অনসূয়ার স্বামী একই ব্যক্তি– অভিন্ন – তাহলে তাকে বাধ্য করতে হবে অনসূয়াকে ডিভোর্স দিতে। ব্যস্। আর কিছুই না। টাকা বা গহনা চুরির দায়ে ওকে দায়ী করতে চান না শকুন্তলা দেবী। তিনি শুধু ভিক্ষা করছেন তাঁর কন্যাপ্রতিম ভগ্নির মুক্তি।

শুনতে শুনতে ছন্দা পাথর হয়ে গেল। কোনওক্রমে বলল, কিন্তু দিদি, ওঁর কোনও ফটো তো আমার কাছে নেই।

– না থাক। আমার কাছে আছে আমার ভগ্নিপতির ছবি। তুমি দেখে বল একে চেন?

ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে উনি একটি ফটো মেলে ধরলেন ছন্দার দৃষ্টির সম্মুখে।

ছন্দা কোনও জবাব দিল না। প্রয়োজনও ছিল না। তার মুখের দিকে একনজর দেখে নিয়ে শকুন্তলা বললেন, তোকে বার বার বলছি, ছন্দা, আমি তোর কোনও ক্ষতি করতে চাই না। ‘দিদি’ বলে ডেকেছিস, আমি আশীর্বাদ করছি, তুই তোর স্বামী নিয়ে সুখে সংসার কর। কিন্তু আমার বোনটাকেও মুক্তি দে! শোন্! কমল ফিরে এলে আমার কথা বলবি না। সে যেন টের না পায়। আজ শুক্রবার। কাল বাদে পরশু কাকডাকা ভোরে আমি আসব। আমার একটি ছাত্রীর স্বামী ক্যালকাটা পুলিসের ইন্সপেক্টার। তাকে সঙ্গে নিয়ে আসব। য়ুনিফর্ম পরিয়ে। ডিভোর্স পিটিশানও নিয়ে আসব। হাতে-নাতে ধরতে পারলে ওর আর পালাবার পথ থাকবেনা। তুই ওকে কিছুই বলবি না, বুঝেছিস? যাতে তোকে না সন্দেহ করে। তাহলে আক্রোশটা তোর উপর গিয়ে পড়বে। আজ আমি চলি। কেমন?

ছন্দা কোনও কথাই বলতে পারেনি। টেরও পায়নি কখন সেই ভদ্রমহিলা চলে গেছেন। ও বিকালে উঠোনে-মেলা শুকনো কাপড় জামা গুছিয়ে তুলল না, চুল বাঁধল না, গা ধুলো না, রান্না করল না, উদাস দৃষ্টি মেলে শুধু বসেই রইল।

চমক ভাঙল কমলেন্দুর ডাকে: কী ব্যাপার? এমন খোলা দোরের সামনে ঠ্যাঙ মেলে উদাসনেত্রে বসে আছ? কার কথা ভাবছ? আমার? না কি…

ছন্দা সামলে নেয়। গায়ে মাথায় কাপড় তোলে। বলে, কটা বাজে?

– সাড়ে সাত। চায়ের জল বসিয়ে দাও একটু। মাসি বলছিল দুপুরে তোমার সঙ্গে কে নাকি দেখা করতে এসেছিল। কে গো?

ছন্দা চটজ়লদি জবাব দিল, উনি একজন সমাজকর্মী। নারী সমিতির তরফে একটা নৈশ স্কুল খুলতে চান। নিরক্ষরতা দূরীকরণের কাজে।

– কী নাম? কোন মহিলা সমিতি?

– দাঁড়াও দেখাচ্ছি। লিফলেট রেখে গেছেন…ওঁদের লিটারেচার…

অনেক খুঁজেও সেসব কাজপত্র পাওয়া গেল না। তবে বোধহয় কাগজগুলো ভুল করে নিয়েই গেছেন। কিন্তু সেই কাগজগুলো খুঁজতে খুঁজতে ভদ্রমহিলার কল্পিত নাম, তাঁদের মহিলা সমিতির নাম ইত্যাদি মনে মনে ছকে ফেলেছে ছন্দা। কিন্তু সেসব দিকে কমল প্রশ্ন করল না। বলল, বাড়িউলি মাসি বলছিল, সে নাকি আমার ফটো আছে কি না জিজ্ঞাসা করছিল। কেন? আমার ফটো তার কী দরকার?

এবারও চটজলদি জবাব দিল: হ্যাঁ, তোমার নাম শুনে বললেন ওঁর এক ছোটো ভাইয়ের বন্ধুরও ওই নাম। তাই দেখতে চাইছিলেন, তুমিই ওঁর ভাইয়ের সেই বন্ধু কি না।

– অ! তা তুমি দেখালে আমার ফটো?

– তোমার ফটো আমার কাছে আছে নাকি?

– নেই বুঝি? ঠিক আছে, চায়ের জল বসাও!

পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর ছন্দা দেখুল পাশের বিছানাটা খালি। ওর স্যুটকেসটাও স্বস্থানে নেই। সারা দিন সারা রাত কমলেন্দুর পাত্তা নেই। অবশ্য তার পরদিন রবিবার ভোরবেলা বোঝা গেল ব্যাপারটা। পুলিশ সার্জেন্ট যখন জানতে চাইল, আপনার চুড়ি, মালা আর দুল মিলিয়ে ক-ভরি হবে? চার-পাঁচ?

– তা হবে।

– তা হলে তিনি আর ফিরে আসবেন না কোনওদিন।

ডবল-বেড চৌকি আর মীট-সেফটা কয় মাস বাকি-ভাড়ার বাবদে মিটিয়ে প্রায় এক কাপড়ে ফিরে এল কাকা-কাকিমার কাছে। দোর খুলে দিয়ে কাকা যেন ভূত দেখলেন। কিন্তু আগেই বলেছি, তিনি বিচক্ষণ মানুষ। চেঁচামেচি, হইচই কিছুই করলেন না। ছন্দার প্রণাম সারা হলে বললেন, আয়, ভিতরে আয়। না, না, বৈঠকখানায় নয়; আমার শোবার ঘরে।

অর্গলবদ্ধ গৃহে ভ্রাতুষ্পুত্রীকে যা বললেন তা ন্যায্য কথাই।

– আমার দু-দুটি মেয়ের বিয়ে দেওয়া এখনও বাকি আছে, ছন্দা। এই সাত মাস তুই কোথায় ছিলি, কী করেছিস্ কিছুই জানি না– জানতে চাইও না। তুই সাবালিকা – একটাই জীবন তোর, যেভাবে সে জীবন কাটাতে চাস্, কাটাবি; কিন্তু আমার জীবনের পথে কোনও বাধার সৃষ্টি না করে, তাই না?

ছন্দা উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, তুমি ঠিক কথাই বলেছ, কাকু। আমার অন্যায় হয়েছে কিছুচিন্তাভাবনা না করে হঠাৎ এভাবে তোমার কাছে চলে আসা…

– বস্! মনে হচ্ছে দারুণ একটা বিপদে পড়েছিস। তাই কি?

– হ্যাঁ, তাই!

– আমাকে সব কথা খুলে বল দেখি। যদি সঙ্কোচ হয় তো বল্ তোর কাকিকে ডাকি। সে এখনও জানে না তুই এসেছিস।

ছন্দা বলেছিল, না কাকা তোমাকে সবকিছু খুলে বলতে আমার কোনও সঙ্কোচ হবে না। যাবার আগে কাকিমাকেও প্রণাম করে যাব। শোন:

বিগত সাত মাসের অভিজ্ঞতা অকপটে বিবৃত করেছিল তারপর।

কাকা সব শুনে বলেছিলেন, তুই কি এটুকু বুঝতে পারছিস, ছন্দা, যে ওই শকুন্তলা দেবী হুট করে না এসে পড়লে দু-চার মাসের মধ্যেই তুই খুন হয়ে যেতে বসেছিলি?

ছন্দা চকে উঠে বলে, মানে? ও আমাকে খুন করত?

– সেটাই তো ছিল ওর পরিকল্পনা। তাই কালীঘাটের বিয়ের ভরসায় না থেকে রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছে…

– বুঝলাম না।

– দশ-হাজার টাকার জয়েন্ট ইনশিওরেন্স করেছিলি, মনে নেই? দুর্ঘটনাটা কীভাবে ঘটবে এটুকুই স্থির করা বাকি ছিল। এর মধ্যে আচমকা শকুন্তলা দেবী এসে পড়ায় ও ওই ক-ভরি গহনা হাতিয়ে পালিয়ে গেছে।

ছন্দা প্রতিবাদ করতে পারেনি। বুঝতে পারে, গহনা খুইয়ে সে জীবন পেয়েছে।

কাকা বললেন, কী করবি ঠিক করেছিস?

– কী বলব? আমি তো পথের ভিখারী!

– কে বললে? দাদার পলিসিটা ম্যাচিওর করার পর তোর নামে ফিক্সড-ডিপজিট করেছিলাম মনে নেই। সুদে-আসলে এখন তা প্রায় পনেরো হাজার টাকা। সে টাকা তো তোর। আমার কাছে গচ্ছিত আছে– নিয়ে যা, নতুন করে বাঁচবার চেষ্টা কর!

ছন্দা একটু ভেবে নিয়ে বলেছিল, না কাকু টাকাটা আমি নেব না!

– কেন রে? এ তো তোরই টাকা…

– সেজন্যে নয়। বিচার করে দেখ, তোমার বাড়িতে আমার থাকা চলে না। সমাজে তোমার মাথা হেঁট হবে – রেবা-রেখার বিয়ে দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। ফলে আমাকে পথে নামতেই হবে। তুমি তো জানোই কাকু– নিজের দেহটাকে বাঁচাতেই আমার জান নিকলে যাবে – তারপর ওই বোঝার উপর এই শাকের আঁটি আমার সইবে না।

– তাহলে তুই কি করতে চাস?

ছন্দা একেবারে আচমকা একটা প্রস্তাব দিল। সে কোনও নার্সিং ট্রেনিং স্কুলে ভর্তি হবে। কোনও ওয়ার্কিং গার্লস হস্টেলে অর্থাৎ ভদ্র নিরাপদ পরিবেশে থাকবে। ওর থাকা-খাওয়া-ট্রেনিং-এর যাবতীয় খরচ যোগাবেন কাকু, ওই পনেরো হাজার টাকা থেকে। মাস মাস কিছু হাত খরচাও নেবে। ট্রাম বাসভাড়া, জামা-কাপড় ইত্যাদি বাবদ।

কাকা ওর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন। কাকিমাও চোখের জলে ভেসে ওকে বিদায় দিতে বাধ্য হলেন। রেবা-রেখার সঙ্গে ও দেখাই করেনি।

পাশ করে বের হবার আগেই শুভ্রার সঙ্গে ওর আলাপ হয়। পাশ করার পর তার রুমমেট হয়ে পড়ে। শুভ্রা তার অতীত জীবনের বিষয়ে কিছুই জানতে পারেনি। ও কাজ করত ডাক্তার ব্যানার্জির নার্সিংহোমে। কী বিচিত্র ঘটনাচক্র! সেখানে একদিন এক মানসিক রোগীর নার্সিং করতে করতে সব কিছু গুলিয়ে গেল ওর। কোটিপতি বিজনেসম্যানের একমাত্র পুত্র যখন ওর হাত দুটি ধরে বলেছিল, সে ওকে জীবনসঙ্গিনী করতে চায় – বাবাকে না জানিয়ে রেজিস্ট্রি মতে– তখন ছন্দার সে কথা বিশ্বাসই হয়নি! অথচ সেই সুখের সপ্তমস্বর্গেই অনায়াসে পৌঁছে গেল সে।

আর ঠিক তখনই ফিরে এল ওর জীবনের শনিগ্রহ: কমল।

নামটা সেবারে বারে বদলেছে, নতুন মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার আগে; কিন্তু বদলেছে শুধু পদবীটা। এমনভাবে, যাতে আচম্বা কেউ পিছন থেকে ওকে নাম ধরে ডাকলে কারও সন্দেহ হবে না:কমলেন্দু, কমলাক্ষ, কমলেশ– সবারই ডাক নাম কমল! যেমন বলা যায়: হলাহল, জহর গরল, কালকূট যেটাই সেবন কর; ফল হবে এক: বিষক্রিয়া! মৃত্যু!