রিস্তেদারের কাঁটা – ১৩

তের

ওরা যা প্রত্যাশা করেছিল তা ঘটল না। বাসু-সাহেব চতুষ্পদী-বলা যায়, শার্লক হোমী’– ভঙ্গিতে সারাটা ঘর ম্যাগফিাইং গ্লাস সহযোগে পরীক্ষা করলেন না। মোটামুটি দেখে নিয়ে বললেন, বেশ ঘর।

বাথরুমটাও একনজর পরিদর্শন করে এসে বললেন সেই গ্যাস-পাইপের জোড়াইটা কোথায়?

কৌশিক দেখিয়ে দিল। বাসু এবার তার সামনে উবু হয়ে বসলেন। ব্রীফকেস খুলে বার করলেন একটা টর্চ আর মস্ত বড় একটা ম্যাগ্মফাইং গ্লাস। সুজাতা টর্চটা ধরল, বাসু প্রায় পাঁচ-মিনিট ধরে জোড়াইস্থলটি পরীক্ষা করলেন। জানতে চাইলেন, কে জুড়েছে আবার? জান?

কৌশিক বলে, আগেই তো বলেছি, মামু। মোটেল-ম্যানেজার এসেই স্টপ-ককটা বন্ধ করে দেয়। তাতে মেইন পাইপে গ্যাস-সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশের পরিদর্শন ও ফটো তোলা হয়ে গেলে ফ্যাকটারির প্লাম্বার এসে ওটা জোড়াই করে দিয়ে যায়।

বাসু বললেন, হুঁ! এবার তোমরা দুজনে পরীক্ষা করে দেখ।

নির্দেশমতো একে একে দুজনেই দেখল। বাসু জানতে চাইলেন, কী দেখলে?

– কী আবার দেখব? একটা গ্যাল্ডানাইজড্ শর্টপাইপ।

– হুঁ। কিন্তু তার গায়ে সূক্ষ্ম দাগ আছে, নয়? যা থেকে বেশ বোঝা যায়, অতি সম্প্রতি কেউ একটা রেঞ্চ দিয়ে ওটা জুড়েছে। অন্তত পাইপটা রঙ করার পরে।

– ‘অতি সম্প্রতি’ বলছেন কেন? ছয় মাস আগেও হয়ে থাকতে পারে?

– না পারে না। অ্যাডজাস্টেবল্ রেন এর গ্রিপ্ যেখানে হয়েছে সেই অতিসূক্ষ্ম কাটা দাগে কোনও ধুলো জমেনি।

– তা হবে।

– ‘তা হবে’ নয়, কৌশিক, তাই! এ-সব নজর করতে শেখ। আর তা যদি পছন্দ না হয় তাহলে প্রফেশন ছেড়ে দিয়ে চাকরিবাকরি ধর। কবিতা-টবিতা লিখে রোজগারের চেষ্টা দেখ।

কৌশিক ছাত্রজীবনে কবিতা লিখত। সে চুপ করে ধমকটা হজম করল। প্রসঙ্গটা বদলাতে সুজাতা বলল, কফি বলে আসব, মামু?

– না। তুমি বরং নিচে যাও।আমার গাড়িতে একজন লোক বসে আছে। তার নাম বিদ্যাধর পণ্ডা। তাকে ডেকে নিয়ে এস।

– আপনার গাড়িতে? বিদ্যাধর পাণ্ডা?

– ‘বিদ্যাধর’ নয় ‘বিদ্যাধরঅ’ – শেষ অক্ষরটা স্বরান্ত। আর পাণ্ডা নয়, ‘পণ্ডা’। যাও, কুইক।

একটু পরেই বিদ্যাধর পণ্ডাকে নিয়ে সুজাতা ফিরে এল। বছর চল্লিশের বেঁটে-খাটো মানুষ। কৃষ্ণকায়, মুখে বসন্তের দাগ, গায়ে আলোয়ান, হাতে একটা বড় র‍্যাশনব্যাগ। তাতে ওর যন্ত্রপাতি। কৌশিককে দেখে বলল, নমস্কার আইজ্ঞা।

কৌশিক দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দেয়।

বাসু বললেন, বিদ্যাধরঅ আমার বহুদিনের পরিচিত। ওর শ্যালককে একবার পুলিসে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে…

বিদ্যাধর কৃতজ্ঞতার হাসি হাসল। বাসু-সাহেব না থাকলে ওর শ্যালক মদনের নির্ঘাত জেল হয়ে যেত। গরিব মানুষ – কী বা ফী দেবে? বাকী জীবনের জন্য কেনা হয়ে আছে বিদ্যাধরঅ।

বাসু বললেন, এই শর্ট-পীসটা আমার চাই বিদ্যাধরঅ। কিন্তু এমন ভাবে খুলে নিতে হবে যাতে ওতে রেন্‌-এর দাগ না পড়ে।

বিদ্যাধর শর্ট-পীসটা পরীক্ষা করল। বুঝিয়ে বলল যে, তা করতে হলে ঠিক ঐ মাপের আর একটা

শর্ট-পীস বাজার থেকে কিনে আনতে হবে। অন্যান্য যন্ত্রপাতি, পাকাপুট্টি, জুট সবই আছে। নতুন শর্ট-পীসটা পেলে মিনিট-পনেরর ভিতরেই ওটা খুলে আনা যাবে। আর রেন্দিয়ে বাগিয়ে ধরার আগে একটা ন্যাকড়া দিয়ে জড়িয়ে নিলে…

বাসু পকেট থেকে একটা ‘শ্যাময়-লেদার’ বার করে ধরে বললেন, এতে হবে?

মিশিমাখা একসার দাঁত বার করে বিদ্যাধর বললে, আপনি প্রভু ‘জগন্নাথ বটেন! ভকত যখন যেটি মাঙ্গিবে…

মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে বাসু বলেন, কৌশিক, তুমি বিদা্যধরঅকে বাজাকে নিয়ে যাও এখানকার লোকাল বাজারে পাবে না। য়ুনিক পার্কের মোড়ের কাছাকাছি একটা স্যানিটরি গুড্স্-এর দোকান আছে। ‘তারা স্টোরস্’। সেখান থেকে নিয়ে এস। সুজাতা, তুমিও ওর সঙ্গে যাও।

কৌশিক ভাবল একবার প্রশ্ন করে, সুজাতাকে নিয়ে যেতে হবে কেন? ঐ তিন ইঞ্চি লম্বা, পৌনে একইঞ্চি ব্যাসের অতি ক্ষুদ্র গ্যাল্ডানাইজড্ পাইপটা কি এতই ভারি হবে যে, দুজনে ধরাধরি করে তা গাড়িতে তুলতে পারবে না? তৃতীয়জনের প্রয়োজন হবে? কিন্তু সুজাতা চোখের কী ইঙ্গিত করায় থমকে গেল। ঘরের চাবিটা রেখে কৌশিক ওদের দুজনকে সঙ্গে করে ওর সেই ‘রেন্ট-আ-কার’ গাড়িখানা নিয়ে বেরিয়ে গেল।

গাড়ির শব্দটা মিলিয়ে যাবার পর বাসু গাত্রোত্থান করলেন। পণ্ডার র‍্যাশন-ব্যাগের যন্ত্রপাতি মেঝেতে উবুড় করে ঢেলে ফেললেন। হ্যাঁ, তুরপুন আছে, স্ক্রু-ড্রাইভার, রেন, হাতুড়ি ব কিছুই আছে। বড় অ্যাড্‌াস্টেব্ল রেন্‌া ব্রীফ-কেস-এ তুলে নিলেন। চাবিটাও।তারপর দরজা টেনে দিয়ে নেমে এলেন নিচে। কৌশিকের গাড়িটা ততক্ষণে বোধ করি ডায়মন্ড-হারবার রোডে উত্তর-মুখো ছুটেছে। বাসু নিজের গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভারের সীটে উঠে বসলেন। ওঁর পিঠের দিকে একটা সাদা ধবধবে বড় তোয়ালে ঝোলানো থাকে। সেটা পেড়ে নামালেন। ঐ তোয়ালেতে বিদ্যাধরের রেন্দ্রচ্যন্ত্রটা ড্রাইভারের সীটের পাশে রেখে দিলেন।

লোকজনের যাতায়াত বেশ আছে। কিন্তু উনি কিছু চুরি করছেন না। নিজের জিনিস নিজে গ্রহণ করলে তাকে হাত-সাফাই করা বলে না। বাসু-সাহেব গাড়ির টুল-বক্স থেকে নিজের যন্ত্রটা ব্রীফ-কেস-এ উঠিয়ে নিলেন। আকারে আর আয়তনে সেটি বিদ্যাধরের যন্ত্রের হুবহু সহোদর, তবে অল্পতর ব্যবহারের জন্য কিছু বেশি চকচকে। অ্যাড্জাস্টেবল রেঞ্চ।

ব্রীফ-কেস হাতে উঠে এলেন তিন-নম্বর য়ুনিটে। ঘরে ঢুকে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন। এবার যন্ত্রপাতি নিয়ে বসলেন কাজ করতে।

‘কাজ’টা বিচিত্র। ধারালো বাটালির সাহায্যে হাতুড়ির ঘায়ে ওঁর নিজের অ্যাড্জাস্টেবল রেঞ্চ-এর দু-একটা দাঁত ফেলে দেওয়া।নিপুণ হাতে কাজটি সেরে, পরীক্ষা করে, সন্তুষ্ট হয়ে সব কিছু যন্ত্রপাতি আবার ঐ র‍্যাশন-ব্যাগে ভরে দিলেন। বিদ্যাধর যেখানে তার থলিটা রেখে গেছিল ঠিক সেখানেই সেটা থাকল, শুধু তার নিজস্ব বড় রেন্চ-এর পরিবর্তে বাসু-সাহেবের ফোগ্লা রেঞ্চ যন্ত্রটা বসানো রইল।

ঘর বন্ধ করে এবার উনি গেলেন সংলগ্ন চাইনীজ রেস্তোরাঁয়। এক-পট কফি নিয়ে জমিয়ে বসলেন।

সেই প্রায়-চীনা মেয়েটি এগিয়ে এসে জানতে চাইল কফির সঙ্গে আর কিছু চাই কিনা। বাসু জানালেন, তাঁর বয়স হয়েছে, অসময়ে ‘আর কিছু’ খেলে সহ্য হয় না। তারপরে আচমকা প্রশ্ন করে বসেন, তুমিই তো কাল সকালে সেই মেয়েটিকে চিনতে পেরেছিলে, নয়? তোমার তো আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা!

শেষ পংক্তিটা প্রকারান্তরে ‘কমপ্লিমেন্টস্’। মেয়েটি বললে, এতে আশ্চর্য হবার কী আছে। মাত্র একদিন আগেকার ঘটনা। আর তা ছাড়া, এখানে তো রেলের টিকিট-কাউন্টারের মতো ক্রমাগত খদ্দের আসে না। মানুষজনকে দেখলে মনে থাকে।

– তা বটে।তা এখানে তোমরা থাক কোথায়? রোজ কলকাতা থেকে যাতায়াত করতে হয় নাকি?

– না, স্যার। রেস্তোরাঁটা আমার এক কাকা ‘লীজ’ নিয়েছেন। ওঁরা – মানে কারখানার কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য কোয়ার্টার্স অ্যালট করেছেন।

বাসু ওর সঙ্গে ক্রমে আলাপ জমিয়ে নিলেন। এখন খদ্দেরের ভিড় নেই। ব্রেকফাস্ট খানেওয়ালারা বিদায় হয়েছে, লাঞ্চার্থীরা এখনো আসেনি। উনি কথা প্রসঙ্গে মৃত বিলাসসিং যাদব এবং প্রবীর ঘোষাল সম্বন্ধে তত্ত্বতালাশ নিলেন। মেয়েটি জানালো, বিলাসসিংকে সে জীবিত অবস্থায় দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না তবে মিস্টার ঘোষাল তিন-চারদিন ছিলেন। সকাল্ বিকাল আসতেন। তিনি বোধহয় চলে গেছেন।

বাসু জানতে চান, ঐ মেয়েটি – সেই যে তোমার কাছ থেকে রাত্রে খাবার কিনতে এসেছিল– তার সঙ্গে একজন বুড়ো-মত লোকও ছিল, নয়?

– হ্যাঁ, শুনেছি ছিল। আমি তাঁকে দেখিনি। মিস্টার দত্ত বলেন, ছিল।

– ‘মিস্টার দত্ত’ কে?

– মোটেলের ম্যানেজার।

দাম মিটিয়ে অগত্যা মিস্টার দত্তের দ্বারস্থ হলেন। কিন্তু এখানে চিঁড়ে ভিজল না। দত্ত সরাসরি বললেন, সেদিন আপনাকে দেখেছি। আপনি কে? কী জন্য এসব জানতে এতটা পেট্রল পুড়িয়ে এসেছেন?

বাসু তাঁর নামাঙ্কিত একটি ভিজিটিং কার্ড বার করে দিলেন।

দত্ত সেটি উল্টেপাল্টে দেখে ওঁকে ফেরত দিয়ে বলল, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছি। আপনিই সেই লোক! – কোন লোক?

– ঐ পুলিস ইন্সপেক্টার যাঁর কথা বলে গেস্ল। সাবধান করে গেস্ল, এক ব্যারিস্টার-সাহেব দু-একদিনের মধ্যেই আসবেন। ভাব জমাবার চেষ্টা করবেন। সিগ্রেট অফার করবেন, চাই কি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে খাইয়েও দেবেন। তাঁর কাছে মুখ খুললেই তিনি একটি ‘সমন’ ধরিয়ে দেবেন! ব্যস! হয়ে গেল! ছোট এবার আদালতে সাক্ষী দিতে! আমি ওর ভিৎরি নেই, মশাই!

বাসু ফিরে এলেন। ঠিক তখনই কৌশিকের গাড়িখানা এসে ভিড়ল। ওরা তিনজনে নেমে এল গাড়ি থেকে। বাসু কৌশিকের হাতে ঘরের চাবিটা ধরিয়ে দিলেন।

একটু পরে রুদ্ধদ্ধার কক্ষে ওঁরা কাজে বসলেন।

‘কাজ’ অবশ্য এবার করল একা বিদ্যাধর। ওঁরা তিনজনে নীরব দর্শক। বিদ্যাধর প্রথমেই স্টপ-ককের প্যাঁচ ঘুরিয়ে গ্যাসের সাপ্লাইটা বন্ধ করে দিল। তার অর্থ ডান পাশের সব ঘরে গীজারগুলো অকেজো হয়ে গেল। কিন্তু তা টের পেতে আবাসিকদের দশ-পনের মিনিট সময় লাগবে। এয়ার-কন্ডিশনিংও যে বন্ধ হয়ে গেছে তা তৎক্ষণাৎ বোঝা যাবে না। ‘শ্যাময়-লেদার’-এ জড়িয়ে সাবধানে বিদ্যাধর ঐ ‘শর্ট-পীসটা’ প্যাঁচ ঘুরিয়ে বার করে নিল। বাসু হাত বাড়িয়ে ‘শ্যাময়-চামড়া’ সমেত ছোট্ট পাইপের টুকরোটা নিলেন। সযত্নে পকেটে রাখলেন। বিদ্যাধর বললে, সি ন্যাতাটো দিঅ আজ্ঞে। নতুন পীসটো জোড়াই করিবা হেবে।

বাসু বললেন, এখন আর ন্যাকড়া জড়াবার দরকার নেই। দাগ পড়ে তো পক। নাও তাড়াতাড়ি কাজটা খতম কর, পণ্ডা।

পণ্ডার কী-যেন খেয়াল হল। টর্চটা তুলে নিয়ে হাতের যন্ত্রটাকে নিরীক্ষণ করতে থাকে। যন্ত্র বলতে, বাসু-সাহেবের গাড়ি থেকে সদ্য-আমদানি বড় অ্যাডজাস্টেব্ল রেন্। যেটিকে বাসু সযত্নে ফোগলা করে ওর ব্যাগে ভরে দিয়েছিলেন। পণ্ডার মুখে অতি দ্রুত কয়েকটি ভাবের অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। বিস্ময়-কৌতূহল-উপলব্ধি-ক্রোধ!

অস্ফুটে স্বগতোক্তি করলে, শড়া হড়ামিকো বচ্চা!

কৌশিক বিস্মিত হয়ে বলে, এ কী! খিস্তি করছ কাকে?

পণ্ডা লজ্জা পেল। দু-হাত দু-কানে ছোঁয়ালো। বুঝিয়ে বলল, ওটা স্বগতোক্তি মাত্র – ঠিক স্বগতোক্তি নয়, গালাগালটা মদনার প্রতি প্রযোজ্য। অবশ্য ‘মদন’ ওর শ্যালক– তাকে ‘শড়া’ বলার অধিকার বিদ্যেধরের আছে। আর বাকি গালটুকু দেবারও যথেষ্ট হেতু আছে!

বুঝিয়ে বলে, মদ্মা ওরই মতো প্লাম্বার মিস্ত্রি। ভবানীপুরের গাঁজা-পার্কের কাছাকাছি উড়িয়া-পাড়ায় থাকে। আগের দিন দুপুরে সে ভগ্নিপতির কাছ থেকে বড় রেন্‌ চেয়ে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় ফেরৎও দিয়ে যায়। এখন দেখা যাচ্ছে যন্ত্রটার দুটো দাঁত ফোগলা।

আবার নেড়ে-চেড়ে দেখে বলে, সেইটা মোর রেনচু হবা না পারে!

বাসু ধমকে ওঠে: সেসব তোমাদের শালা-ভগ্নিপোতের ব্যাপার। এখন কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ কর দিকিনি।

বিদ্যাধর পুনরায় ঐ শ্যাময়-লেদারটা প্রার্থনা করে। বলে, না হলে পাইপে ফোগ্লা দাঁতের দাগ পড়ে যাবে।

বাসু আবার ধমকে ওঠেন, পড়ে পড়ুক! পাঁচ-মিনিটের মধ্যে কাজ খতম কর, বিদ্যাধর। আমার জরুরি কাজ আছে।

বিদ্যাধর আর বাক্যবিনিময় না করে ঐ ফোগ্লা রেন্স-এর সাহায্যেই শর্ট-পীসটা এঁটে দিল। এবার গ্যাস-লাইনের স্টপ-কক খুলে দিতে আর কোন অসুবিধা হল না।

ওঁরা সদলবলে ফিরে এলেন। প্রথম গাড়িতে বাসু-সাহেব, বিদ্যাধরকে নিয়ে। পরের গাড়িটায় কৌশিক চেক-আউট করে।

বিদ্যাধরের অনুরোধমতো তাকে ভবানীপুরে গাঁজা-পার্কের কাছে নামিয়ে দিলেন। গাড়িটা পার্ক করে বিদ্যাধরের হাতে একটা একশ’ টাকার নোট ধরিয়ে দিতে গেলেন যখন, তখন সে প্রবল আপত্তি করল। তার বক্তব্য– ওর শ্যালক মদনের বেকসুর খালাসের ব্যাপারে উপযুক্ত ‘ফী’ সে দিতে পারেনি। এখন মজুরি সে কিছুতেই নিতে পারে না। বাসুও নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, মদন সেবার সত্যিই অপরাধী ছিল না, ফলে বাসু-সাহেব সত্যধর্মের জন্য লড়াই করেছেন। এটা তাঁর কর্তব্য ছিল। এজন্য ফী নেওয়াটাই তাঁর পক্ষে অন্যায়। তবে নাকি এটাই তাঁর পেশা, তাই যারা আর্থিকভাবে সমর্থ তাদের কাছে উনি ‘ফী’ নিয়ে থাকেন। শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের কিছু কিছু উদ্ধৃতি শুনিয়ে ‘নিষ্কাম কর্ম’ কাকে বলে তা বোঝাবার চেষ্টা করলেন। বিদ্যাধর ঘন-ঘন মাথা নাড়ল।

বাসু বললেন, আমরা নিজেরা ভুল করি আর অন্য লোককে দায়ী করি। সেবার যেমন মদনাকে অহেতুক পুলিশে ধরে ছিল..

বিদ্যাধর মেনে নিল, ইটো যথার্থ বলিছেন, আজ্ঞে!

– কিম্বা এই যে তুমি একটু আগে মদনাকে গালমন্দ করলে, হয়তো দোষটা তার নয়। তোমার যন্ত্রের দাঁত সে ফেলেনি…

বিদ্যাধর তার মিশিমাখা দাঁত বার করে বললে, না, আজ্ঞে! ইটো মদ্মার বজ্জাতি বটে…

বাসু একটা বিশ টাকার নোট ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এক প্যাকেট ইন্ডিয়া-কিং সিগ্রেট কিনে আন তো পণ্ডা?

বিদ্যাধর রাস্তাটা পার হয়ে দোকান থেকে সিগ্রেট কিনে আনতে গেল। ওর বড় র‍্যাশন ব্যাগের থলিটা সীটে পড়ে ছিল। বাসু তার গর্ভ থেকে ওঁর নিজের ফোগলা যন্ত্রটা বার করে আনলেন, আর তোয়ালে জড়ানো যন্ত্রটা তোয়ালে খুলে সেখানে ঢুকিয়ে দিলেন।

একটু পরে বিদ্যাধর সিগ্রেট নিয়ে যখন ফিরে এল তখন বাসু বললেন, ঐ ঘরে একটা খুন হয়েছে, পণ্ডা। যে লোকটা খুন করেছে তাকে ধরবার জন্য আমি এই শর্ট-পীসটা সংগ্রহ করে রাখলাম, বুঝেছ? তুমি কাউকে বলবে না তোমাকে দিয়ে আমি এ-কাজটুকু করিয়ে দিয়েছি। কেমন?

বিদ্যাধর দু-হাত তার দু-কানে ঠেকালো।

– আর মদনার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি কর না। সে তোমার যন্ত্রের দাঁত ভাঙেনি! বুঝলে? বাড়ি গিয়ে

আগে ভাল করে নিজের যন্ত্রটা পরীক্ষা করে তারপর মদনার সঙ্গে ঝগড়া কর! কেমন?

বিদ্যাধর ঘাড় চুলকাতে থাকে। কথাটা তার পছন্দ হয় না।