আট
শক্তাবৎ রাজপুতের নাটকীয় প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ে তিনজনে – সস্ত্রীক কৌশিক আর রানু।
রানুই তাদের যৌথ জিজ্ঞাসাটা বাত্ময় করে তুললেন: কেন এসেছিল? ওই শক্তাবৎ রাজপুত্র?
– আমাকে কিছু আইনের পরামর্শ দিতে!
– তোমাকে! আইনের পরামর্শ! কী সেটা?
– শক্তাবৎ রাজপুতদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সূত্রটা মিতাক্ষরা আইনে, ভেতো-বাঙালিদের মতো ‘দায়ভাগ’ সূত্রে নয়।
ওঁরা তিনজনে মুখ চাওয়া-চাওয়া করেন।
বাসু বলেন, ওসব আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সূত্র তোমরা বুঝবেনা।রানু, দেখ তো ত্রিদিব নাম-ঠিকানার সঙ্গে ওর টেলিফোন নাম্বারটা রেখে গেছে কিনা। থাকলে ইমিডিয়েটলি ফোন কর। ছন্দা বাড়িতে আছে। বোধহয় এখনো ঘুমাচ্ছে। তাকে আমার দরকার।
বেলা তখন আটা। তবু ছন্দা ঘুমাচ্ছিল। শেষ রাতে কড়া ঘুমের ওষুধ খাবার ফলে। বেশ কিছুক্ষণ রিঙিং-টোনের পর ঘুম-জড়ানো কণ্ঠে সাড়া দিল সে। বাসু বললেন, ছন্দা? এখনো ঘুম ছোটেনি? শোন! যা বলছি মন দিয়ে শোন!
– আপনি কি, স্যার, বাসু-সাহেব বলছেন?
– তাই বলছি! কাল রাত্রে কী ঘটেছে তা তুমি জান! আমিও জানি!
ও-প্রান্তে ছন্দা একটা চাপা আর্তনাদ করে উঠল। বোঝা গেল, এতক্ষণ সে ছিল আধোঘুমের ঘোরে। গত রাত্রের বিভীষিকাটা ওর স্মৃতিপথে ছিল না। এতক্ষণে সে পুরোপুরি জেগে উঠল, সচেতন হল। লক্ষ্য করে দেখল, পাশের বিছানাটা খালি। কণ্ঠস্বরে সংযম এনে বলল, আমি…আমি বুঝতে পারছি না, আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন? কাল রাত্রে…মানে, কী এমন ঘটেছে?
– লুক হিয়ার, ছন্দা। তোমার ওসব পুরনো প্যাঁচ শিকেয় তুলে রাখ। তোমাকে যা বলছি তা বিনা প্রশ্নে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কেন তা করতে বলছি, সে-কথা যখন দেখা হবে তখন বুঝিয়ে বলব। এখন নয়! ফলো?
– বলুন?
– মিনিট পনেরোর ভিতর মিসেস সুজাতা মিত্র অফ ‘সুকৌশলী’ তোমার কাছে যাবে। এই পনেরো মিনিটের ভিতর একটা ওভার-নাইট ব্যাগে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভরে তৈরি হয়ে থেকো, যাতে সুজাতা পৌঁছানো মাত্র, তার আইডেন্টিটি প্রমাণ করা মাত্র, তুমি ওর সাথে রওনা হতে পার। দু-চার দিনের জন্য তোমাকে হয়তো অন্যত্র যেতে হবে। তোমার স্বামীর জন্যে…সে এখন ঘরে নেই তা আমি জানি– কোনো নোট রেখে যাবার প্রয়োজন নেই…
ছন্দা প্রতিপ্রশ্ন না করে পারে না, ও কোথায়?
– পাঁচ মিনিট আগেও আমার চেম্বারে ছিল। এখন নেই। প্লিজ! কোনো প্রশ্ন টেলিফোনে কর না। ঠিক যা যা বলছি তাই করো, সুজাতা তোমাকে সব বুঝিয়ে দেবে।
ছন্দা আরও কিছু বলতে চাইছিল, পারল না, – কারণ বাসু-সাহেব লাইন কেটে দিয়ে সুজাতার দিকে ফিরলেন, শোনো সুজাতা! ত্রিদিব থানায় গিয়ে এজাহার দেওয়ামাত্র তার ফ্ল্যাটে রেইড হবে। হয়তো মিনিট কুড়ি-পঁচিশ সময় আছে। তোমাকে কী কী করতে হবে তা তুমি নিজেই স্থির করে নিও। আমি কিছু ইনস্ট্রাকশন দেব না, দিতে পারি না। আমি শুধু আমার সমস্যাটার কথা তোমাকে বলছি। প্রথম কথা : ছন্দা আমার ক্লায়েন্ট, তার পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস আমি জানব, এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু দু-তিন দিনের জন্য সে যদি কোথাও বেড়াতে যায় – আমাকে না জানিয়ে – তাহলে তার ঠিকানা আমার জানার কথা নয়। পুলিসে জানতে চাইলে আমি নাচার। তবে আমি আশা করি– যেহেতু ছন্দা বুদ্ধিমতী – তাই কোনো হোটেলে গিয়ে উঠলে স্বনামেই রেজিস্টার খাতায় সই করবে। কারণ অন্যথায় মনে হতে পারে যে, আইনের হাত থেকে সে পালাতে চাইছে। সে দোষী, অন্তত জ্ঞানপাপী! সে তা নয়! তোমার কী মনে হয়?
সুজাতা কোনো জবাব দিল না। রানুর দিকে ফিরে বলল, মামিমা আমি একটু বেরুচ্ছি। রাতে না ফিরতে পারলে চিন্তা করবেন না।
কৌশিক মানিব্যাগ খুলে এক বান্ডিল নোট ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল। সুজাতা সেটা ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে নিয়ে রওনা হয়ে গেল।
বাসুও উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, কৌশিক তুমি দেখ রবির কাছ থেকে পুলিস-ইনভেস্টিগেশনের আর কিছু ডিটেইলস পাওয়া যায় কি না। তাছাড়া পত্রিকা-অফিসের ওই নিজস্ব সংবাদদাতার তোলা ফটোর কপিগুলো পাওয়া যায় কি না। চিফ নিউজ এডিটর আমাকে খুবই খাতির করে।
কৌশিক জানতে চায়, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
– একবার তারাতলা ঘুরে আসি। ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে।
রানু জানতে চান, দুপুরে বাড়িতে কে কে লাঞ্চ করছ?
বাসু বলেন, সুজাতা বাদে আমরা তিনজনই।
তারাতলার অসমাপ্ত সন্তোষী-মা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে টুলে বসে দুই সেপাই আপনমনে হাততালি দিচ্ছে। গাড়িটা কাছাকাছি এসে পড়ার পর বোঝা গেল, ওদের করধ্বনি কারও সাফল্যজনিত হেতুতে নয় – তারা দুজন মৌজ করে খৈনি বানাচ্ছে। বাসু-সাহেবকে গাড়িটা পার্ক করে নেমে আসতে দেখে তারা চঞ্চল হল না। টুলে বসে বসেই প্রশ্ন করল, ক্যা চাহিয়ে সাব?
– – এ বাড়ির দেড়তলায় যিনি থাকতেন– কমলেশ বিশ্বাস…
– তিনি গুজর গিয়েসেন, মানে-কি ফৌত হইয়েসেন। আখবরে দেখেন নাই?
– হ্যাঁ! খবরের কাগজে দেখেই তো খোঁজ নিতে এসেছি।
– অখন কী তালাশ নিবেন? মুর্দা তো লাশকাটা ঘরে চালান হইয়ে গেল।
– সেটা আন্দাজ করেছি। আমি কি একবার ওর ঘরটা দেখে আসতে পারি, সেপাইজী? তোমাদের সঙ্গে – মানে, কালও আমি এসেছিলাম কমলেশের কাছে, একটা জিনিস ভুলে ফেলে গেছি…
– কুঞ্চি? এক রিংমে তিনঠো চাবিকা বাৎ বোল্ড ক্যা?
– না, না, চাবি নয়। একটা নোটবই, মানে ডায়েরি।
– মাফ কিজিয়ে সাব। বিনা-পারমিট ভিতর-যানা মানা হৈ!
অগত্যা বাসু-সাহেব এপাশে ফিরলেন। বটুকনাথ দুলে দুলে বিড়িবাঁধছে, কিন্তু নজর ছিল এদিকেই। বাসু-সাহেবের গাড়ি এ গলিতে ঢোকার পর থেকেই। বাসু ওর দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন। বটুক বিনা বাক্যব্যয়ে তার উপস্থিত খদ্দেরকে পান দিল, নোট নিয়ে রেজগি দিল। তারপর দোকানটা ফাঁকা হতেই টিনের কৌটা খুলে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে বাড়িয়ে ধরল বাসু-সাহেবের দিকে। বললে, একটা দেশলাইয়ের দাম মিটিয়ে দেবেন স্যার, নিন ধরুন!
– তার মানে?
– কাল রাতভোর ধকল গেছে! কী কুক্ষণে থানায় টেলিফোন করার দুর্মতি যে হল! জবানবন্দি দিতে দিতে জান নিকলে গেছে। একবার পুলিশ, একবার খবরের কাগজ…
– সে তো বুঝলাম। টেলিফোনটা করে তুমি নাগরিকের কর্তব্য পালন করেছ, বটুক। তা ভালো কাজ করলেই নাকাল হতে হয়। এটাই হচ্ছে দুনিয়ার নিয়ম, কিন্তু ওই নোটটা আমাকে ফেরত দিচ্ছ কেন?
– দারোগাবাবু যাবার আগে হুকুম দে’ গেলেন, আমাদের যা বললে তা যদি বাইরের কোনও মনিষ্যিকে বল তাইলে সোজা হাজতে ঢুকিয়ে দোব। ইদিকে আপনার কাছ থেকে আগাম নে বসি আছি, উদিকে আমি ছা-পোষা মনিষ্যি।
বাসু পাইপটা ধরাতে ধরাতে বললেন, যদিও তুমি ঠিক ছা-পোষা মানুষ এখনো হওনি, তবে মাস-ছয়েকের ভিতরেই তা হতে চলেছ। আমি তোমার সমস্যাটা বুঝতে পারছি, বটুক। ঠিক আছে, তোমার কাছে কিছু জানতে চাইব না। তবে আমারও মুশকিল কী জান? যাকে যা দিই তা আর ফেরত নিই না। ওটা তোমার কাছেই থাক! আচ্ছা চলি…
বাসু পিছন ফিরলেন। বটুক নোটটা হাতে নিয়ে বিহ্বল হয়ে বসে রইল। আবার এদিক ফিরে বাসু বললেন, তুমি শুধু একটা কথা স্মরণ রেখ, বটুক– টাকাটা তোমাকে আমি দিয়েছিলাম ঘটনা ঘটে যাবার অনেক আগে। পুলিসের সাক্ষী ভাঙাতে ঘুষ দিইনি আমি। তাই না? তোমার তীক্ষ্ম দৃষ্টি আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে খুশি মনে দেশলাই কিনে ভাঙানিটা ফেরত নিইনি।ঠিক বলেছি তো, বটুক?
এতক্ষণ নজর হয়নি-দোকানের পিছন দিকে অন্ধকারে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল একজন। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। একপা এগিয়ে এসে বটুকের হাত থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটখানা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে বাসু-সাহেবের দিকে ফিরল। মাথার উপর ঘোমটা টেনে দিয়ে ফিস্ফিস্করে বলে, আমার নাম সদু…সৌদামিনী, আজ্ঞে। আমারে দারোগাবাবু শাসায়ে যায়নি। গেলেও আমি কান দিতাম না। এই ভিতুর ডিম মুখে কুলুপ আঁইটে রাখতে চায় তো রাখুক। ভীমা কৈবর্তের মাইয়া কারুরে ডরায় না। কী জিগাইবেন জিগান! পঞ্চাশ ট্যাহা বশকিস্ দেবার মতো হিম্মৎ কইলকাত্তা শহরে আছে কয়জন ভদ্দরলোকের? শহরের সব বীরপুরুষই তো প্যাটের তলায় ন্যাজ স্যাঁদায়ে…
শেষ দিকের বাক্যটা সে তার মরদের দিকে ফিরে বলছিল। হঠাৎ বটুক যেন সংবিৎ ফিরে পেল। কঠিন স্বরে তার ধর্মপত্নীকে প্রথমেই একটা ধমক দিল, তুই ঘর যা কেনে! সাহেবরে আমিই সব বুলব অনে? হল তো?
সৌদামিনী হাসল। বিজয়িনীর হাসি। মরদের আদেশটা সে নিক্কথায় মেনে নিল। তবে অন্ধকারে পিছন দিকে মিলিয়ে যাবার আগে বাসু-সাহেবের দিকে হেসে যুক্তকরে প্রণাম জানাতে ভুলল না। আর বলা বাহুল্য: যাবার আগে তার বিজয়িনীর ট্রফিটা – যেটা এতক্ষণ ধরাই ছিল তার দু-আঙুলে – আঁচলের খুঁটে বেঁধে নিতেও ভুল হল না।
বাসু বাধা দিয়ে বললেন, না বটুক! তোমাকে বিপদে ফেলব না আমি। দারোগাবাবুর আদেশ না মানলে তোমাদের মত দোকানদারের কী হাল হয় তা আমার জানা। আমার বিশ্বাস তুমি যা দেখেছ যা বুঝেছ তা সবই বলেছ পুলিসকে এবং খবরের কাগজকে। তুমি শুধু বল, তুমি কি এমন কোনো তথ্য পুলিসে বা খবরের কাগজের বাবুকে জানিয়েছ যা সংবাদপত্রে ছাপা হয়নি।
– আজ্ঞে না, স্যার। তবে দু-একটা কথা আমি ওদের আদৌ বলিনি।
– কী কথা তা আমি জানতে চাইছি না; কিন্তু কেন বলনি?
– দেখুন, স্যার– পুলিসের উপর আমার একটুও বিশ্বাস নেই। ওরা আসে শুধু মানুষজনেরে হয়রান করতে, আর টাকা খেতে। বেশ বুঝতে পারছি– ওই বিশ্বাসবাবু ছিল একটি হাড়-হারামজাদা মনিষ্যি! অনেক অনেক মেয়েরে সে ফাঁসায়েছে। তাদেরই বাপ-ভাইয়ের কেউ একজন হয়তো ওরে খুন করে গেছে! আপনি বলবেন, আইন নিজের হাতে নেওয়ার হক কারও নেই! ভালো কথা, কিন্তু আইন ওই কমলেশকে কি অ্যাদ্দিন অপকর্ম থেকে ঠেকাতে পারিছিল? আমি যদি হক কথাটা বলি, তাহলে বেহুদ্দো আমার কয়েকজন খদ্দেরের পিছনে লাগবে ওরা। তাতে আমার লাভ তো অষ্টরম্ভা, লোকশানই যোলোকলা।
বাসু বললেন, বুঝলাম। এবার বল, কথাটা কী? কী দেখেছ তুমি, যা পুলিসকে বা কাগজের লোককে জানাওনি।
বটুক চারিদিকে একবার দেখে নিতে নিম্নকণ্ঠে বলে, টর্চের আলোয় মেজেয় লুটিয়ে পড়া মানুষডার একটা ঠ্যাঙ দেখে আমি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যাই ডাক্তারবাবুরে ডাকতে। তা সেই দেড়তলা থেকে দোতলায় উঠবার সময় সিঁড়ির জানলা দিয়ে আমি দেখতে পাই গলি দিয়ে পর পর দু-খানা গাড়ি হুস্ হুস্ করে বার হয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে সিঁড়ি ঘরের বাইরের দিকে কাচের টানা জানলা আছে – তা দিয়ে গলি তো বটেই, তারাতলা রোডটাও দেখা যায়। আমি দেখলাম, গলি দিয়ে যে দু-খানা গাড়ি বার হয়ে গেল, তার একটা মোটরসাইকেল, একটা মারুতি ভ্যান। আর ঠিক তার পরেই – বলা যায় লগে-লগেই – গলির মুখে-দাঁড়ানো একটা গাড়ি স্টার্ট নিল। সে বাইরের দিকে মুখ করেই ছিল। কী গাড়ি কইতে পারব না।
– গাড়ির ভিতরে যারা ছিল তাদের দেখতে পাওনি?
– আজ্ঞে না। পেলেও ঘোর আঁধারে চেনা যেত না। তবে…
– কী তবে?
– বলাটা উচিত হবে কি না তাই ভাবছি
– আমি তো পুলিস নই, খবরের কাগজেরও কেউ নই।
– তাইলে আপনারই বা এত উতাধাই কেন, তা আমারে আগে বোঝান।
এই ‘উতাধাই’ শব্দ-প্রয়োগেই বাসু-সাহেব বটুকচন্দ্রের জাতি নির্ণয় করে ফেলেন। এ গলিতে সে হাফ-প্যান্ট পরে মার্বেল খেলে থাকতে পারে। কিন্তু সে অথবা তার পিতৃদেব এককালে নির্ঘাৎ ওপার বাঙলা থেকে এ-দেশে এসেছেন। এপার বাঙলায় কেউ ‘কৌতূহল’শব্দের সমার্থ হিসাবে ‘উতাধাই’ বলবে না। মায় ‘সমার্থশব্দকোষ’ লেখক অশোক মুখুজ্জে পর্যন্ত না। বাসু বলেন, শোন বটুক। আমার এক মক্কেল এই বিবাহ-বিশারদ কমলেশের পরিত্যক্তা স্ত্রী! তার গহনাগাঁটি নিয়ে লোকটা সটকছিল। আমার আশঙ্কা পুলিস সেই নিরপরাধিনীর ঘাড়ে হত্যার অপরাধটা চাপাতে চাইবে। তাই তাকে বাঁচাবার জন্য আমি অগ্রিম সন্ধান নিয়ে চলেছি।
– তাহলে আমি আপনার লগে আছি। সব রকম সাহায্য করতে রাজি। আমি আন্দাজ করেছি, কে খুন করেছে। সে আপনার মক্কেল নয়। সে পুরুষ মানুষ।
– তুমি তাকে চেন?
– স্যার, সে-কথা জিগাবেন না। আপনার মতো সেও আমারে কিছু আগাম দে’ গেছে। সন্ধে রাতে মোটর সাইকেলে চেপে – তারে তো আপনি চেনেনই– সেই বাবু আবার আমার কাছে এয়েছিল। আন্দাজ তখন সাতটা। তখনো কমলেশবাবু ফেরেনি। তার কথা আপনারে কেমন করে বলি, বলুন? আমি তো তারও নিমক খায়ে বসি আছি।
– বুঝেছি বটুক! আর কিছু বলতে হবে না তোমাকে।
তারাতলা থেকে ডায়মন্ড হারবার রোডে পৌঁছেবাসু-সাহেব গাড়ি পার্ক করলেন। একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে বাড়িতে ফোন করলেন। ধরলেন রানু। বাসু জানতে চাইলেন, সুজাতা কি তোমাকে ফোন করে কিছু জানিয়েছে? নিউ আলিপুরের লেটেস্ট নিউজ কী?
রানু জবাবে বললেন, আজ্ঞে না, মিস্টার বাসু কাজে বেরিয়েছেন, অ্যারাউন্ড একটা নাগাদ লাঞ্চে আসবেন।
বাসু ধমক দিয়ে ওঠেন, কাকে কী বলছ গো? আমি তোমার কর্তাই বলছি। সুজাতা কি কোনো…
কথাটা শেষ হয় না, তার আগেই রানু বলে ওঠেন, বেশ তো কাল সকালে আসুন। আমি ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্যাডে লিখে রাখছি!
এবার মালুম হল। বাসু বলেন, তোমার সামনে কেউ বসে আছে? তাই কি আবোল-তাবোল বকছ?
– এক্স্যাক্টলি!
– পুলিস ইন্সপেক্টর? আমার সন্ধানে এসে ঠায় বসে আছে?
– আজ্ঞে হ্যাঁ। ঠিকই বলেছেন!
– বুঝেছি। এবার এমনভাবে প্রশ্ন করছি যাতে তোমার উত্তর ‘হ্যাঁ-না’-র মধ্যে রাখতে পার। সুজাতা কি সফলকাম হয়েছে?
– হ্যাঁ।
– ওরা দুজনে কোথায় গিয়ে উঠেছে তা তুমি জান না, কেমন?
– ঠিক তাই।
– তোমার সামনে যে লোকটা বসে আছে সে কি হোমিসাইড-স্কোয়াডের সতীশ বর্মন?
– একজ্যাক্টলি।
– আর তাকে তুমি বলেছ আমি একটার সময় লাঞ্চ খেতে আসব?
– হাঁ, তাই
– অল রাইট, আমি আধঘন্টার মধ্যেই আসছি।
বর্মন অসহিষ্ণু হয়ে বলে ওঠে, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য, বাসু-সাহেব? আপনার মক্কেলের স্বামী বলছেন, সকাল সাড়ে ছয়টার সময় তাঁর স্ত্রী ঘুমের ওষুধ খেয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন, আর বেলা আটটা বেয়াল্লিশে তিনি কপূরের মত উপে গেলেন? স্বামীর জন্য একটা নোট পর্যন্ত না রেখে?
বাসু বললেন, আমি তো আপনাকে কিছু বিশ্বাস করতে বলিনি। সব তথ্য তো আপনিই সরবরাহ করছেন।
– এগুলো ফ্যাক্ট। টেক ইট ফ্রম মি!
– নিলাম। কিন্তু আমার কাছে কী জানতে চাইছেন?
– আপনার মক্কেল এখন কোথায়?
– আমি জানি না।
– একথা আপনি আগেও বলেছেন। কিন্তু সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য? অফটার অল, সে হল আপনার মক্কেল!
– তার স্বামী কোথায়?
– আমাদের হেপাজতে।
– সে জানে না তার স্ত্রী কোথায়? আফটার অল, সে হল মেয়েটির স্বামী!
– তার মানে আপনি বলবেন না?
– আজ্ঞে না। তার মানে, আমি জানি না। জানলে বলতাম। পুলিসের সঙ্গে আমি সব সময়েই সহযোগিতা করে চলি।
বর্মন উঠে দাঁড়ায়। উকিলী-কায়দায় একটা ‘বাও’ করে বলে, সে তথ্যটা আমি অস্থিতে-অস্থিতে জানি, য়োর অনার!
রাত আটটা নাগাদ ফিরে এল সুজাতা। ভগ্নদূতের মতো। বললে, মামিমা, রাতে খাব আর থাকব।
বাসু বলেন, কী ব্যাপার? তুমি না বলে গেলে রাতে ফিরবে না।
– তাই বলেছিলাম। কিন্তু আপনি বোধহয় সান্ধ্য-এডিশন খবরের কাগজটা দেখেননি? তাই নয়?– না দেখিনি। কিছু খবর বের হয়েছে?
– তা হয়েছে। কীর্তিটা আপনার মক্কেলের শিভালরাস্ শক্তাবৎ মরদের। তার উদ্যোগে আজ একটি কাগজের সান্ধ্য-এডিশনে ছন্দার একটি ছবি ছাপা হয়েছে। পুলিস ছবিটা ছেপে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, এই মেয়েটিকে তারাতলা-হত্যা বাবদে পুলিসে খুঁজছে। আমরা সেটা জানতাম না; কিন্তু যে হোটেলে ডবল-বেড রুম বুক করে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম সেই হোটেলের ম্যানেজার কাগজটা দেখে। ছন্দা স্বনামে ঘর নিয়েছিল। ফলে ম্যানেজার তাকে সহজেই শনাক্ত করে। থানায় ফোন করে। রাত সাতটা নাগাদ পুলিসভ্যান এসে পৌঁছায়। বডি-ওয়ারেন্ট দেখায়। ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে আমি চেক-আউট করে চলে আসি।
বাসু বললেন, বুঝলাম। সারাটা দিনে তুমি তাকে কতটা জানতে দিয়েছ আর কতটা জেনেছ?
– আমাকে সে কিছুই বলেনি। ইন ফ্যাক্ট, বলতে চেয়েছিল, আমিই শুনতে রাজি হইনি। তাকে বলেছিলাম, আমাকে তুমি কিছু বোলো না। কারণ পুলিসে আমাকে ‘সামন’ করলে আদালতে সব কথা আমাকে স্বীকার করতে হবে। আমাকে যা বলবে তা প্রিভিলেজড-কম্যুনিকেশন নয়।
– ভেরি কারেক্ট। কিন্তু তুমি তাকে কতটা জানিয়েছ?
সুজাতা বলে, আমি শুধু বলেছি যে, ত্রিদিবনারায়ণ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আর কিছু বলিনি। …ও হ্যাঁ, আর তাকে বলেছিলাম, যদি ঘটনাচক্রে পুলিসে তাকে গ্রেপ্তার করে তাহলে সে যেন কোন অবস্থাতেই কোন জবানবন্দি না দেয়। পুলিস তাকে যে-কোন প্রশ্ন করলেই যেন সে বলে ‘আমার অ্যাটর্নির অনুপস্থিতিতে আমি কিছুই বলব না।’
– গুড গ্যের্ল!
