যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ৫

পাঁচ

নবনীতা মুখটা তুলে কাকলির চোখে-চোখে তাকালো। বললে, তোমার প্রশ্নটার জবাব এবার আমি দেব কাকলি।

– কোন প্রশ্নটার?

– ওই যে. মালিক লোকটা কে?

– কী দরকার? তোমার গোপন কথা তোমারই থাক না, নীতা। তুমি খোলা মনে আমার প্রস্তাবটা এখনও গ্রহণ করতে পারছ না – ভাবছ চাকরি দেবার লোভ দেখিয়ে আমি আমার ভগিনীপতির গোপন ব্যাপারটা জানতে চাইছি, আমার স্বার্থে – আমার দিদির স্বার্থে। না নীতা, তা নয়। আমি এখন একা থাকি – একটা মেজানাইন ফ্লোরে। তুমি জানো কি জানো না জানি না, আমি আমাদের পৈতৃক বাড়ি থেকে স্বেচ্ছায় চলে এসেছি। সে বাড়িতে থাকে দিদি আর ওই যাদুগোপাল। তুমি কি জানো, যাদুগোপালের স্ত্রী – অর্থাৎ আমার দিদি – প্রায় পঙ্গু, দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী?

– না। যাদুগোপাল সে কথা কখনো বলেনি। তবে সে তোমার নাম, তোমার কথা, তোমার দোকানের গল্প করেছিল…

– তার কারণ খুলেই বলি, যাদুগোপাল আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয় বাবার মৃত্যুর পর, আমাদের ‘প্রবেট’ নেবার ব্যাপারে সাহায্য করতে। ও তখন বাবার এক অ্যাটর্নি বন্ধুর কাছে অ্যাপ্রেন্টিস ছিল। আমরা প্রবেট পাবার পর ও দেখল আমরা দুই বোন বেশ কিছু সম্পত্তির অধিকারী হয়ে পড়েছি। যাদুগোপাল প্রথমে ঝুঁকেছিল আমার দিকে – হয়তা দিদির রুগ্ম শরীরের জন্য, অথবা বয়সে সে দিদির চেয়ে ছোট বলে – কিন্তু আমি তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পর, সে আমার চোখের আড়ালে দিদিকে ‘ঊ’ করতে শুরু করে।

– কী করতে শুরু করে?

– Woo! নানাভাবে তোয়াজ করা আর কি। প্রেম নিবেদন বলতে যা বোঝায়। মোট কথা, দিদির হৃদয় জয় করে একদিন দুজনে রেজিস্ট্রি বিয়ে করে বসে।

– দিদি তোমাকে আগে কিছু বলেনি?

– থাক সে-সব বেদনাদায়ক ইতিহাস। মোট কথা আমি ঐ বাড়ি ছেড়ে চলে আসি। আমাদের যৌথ সম্পত্তি ওই ফোটোগ্রাফিক স্টোরসের দেড়তলায় মেজানাইন-ফোর ফ্ল্যাটে। সেখানে অনায়াসে দু-খানা চৌকি পাতা চলে। সঙ্গে আছে অ্যাটাচড কিচেনেট আর স্নানাগার। গ্যাস আছে। রান্নার মোটামুটি সব সরঞ্জাম আছে। কিন্তু মাসে দশটা দিনও রান্না করার সময় বা সুযোগ পাই না। একটা ছোকরা চাকর আছে। রাত্রে দোকানের ভিতরে শোয়। সে হতভাগা রান্নায় দ্রৌপদী। চায়ের জলটা শুধু গরম করতে শিখেছে। ফলে মাসে বিশদিন ওই চাকরটাকে দিয়ে ওড়িয়া হোটেল থেকে টিফিন-ক্যারিয়ারে করে ভাত-ডাল-মাছ-তরকারি কিনে এনে খেতে হয়। কাজের এতই চাপ। বুঝতেই পারছ, এভাবে শরীর খারাপ হবেই। অম্বলের একটা ব্যথা সম্প্রতি শুরু হয়েছে। তাই একজন সহচরী খুঁজছি আমি। এমন একজন সহচরী যে বান্ধবীর পরিচয়ে, অথবা ছোটবোনের মতো একই ঘরে থাকবে, শোবে পাশাপাশি চৌকিতে। আমরা দু’জনেই রান্নাবান্না করব। চাকরটা যদি দোকানের কাজে বাইরে থাকে তবে দু’জনেই দু’জনের এঁটো বাসন ধূয়ে নেব। তুমি যদি আমার সঙ্গে থাক তাহলে আমরা পালা করে দোকানে বসতে পারি। কাউন্টারে আমাকে সব সময় একজনকে রাখতে হয়। এখন যে মেয়েটা বসে – সুপর্ণা – সে গত সপ্তাহে আমাকে নোটিস দিয়ে রেখেছে। আমি তাকে আটকাতে চাই না। বেশি মাইনেতে সে যদি অন্য কোথাও ভাল চাকরি পায় তাহলে আমি তাকে কেন আটকাৰো? আর তা ছাড়া আমি চাইলেই বা সে থাকবে কেন? তাই তোমাকে আমার প্রয়োজন। বন্ধু হিসাবে চাইলেও – সুপর্ণাকে যা মাহিনা দিই, সে টাকা আমি তোমার নামে ব্যাঙ্ক-অ্যাঙ্কউন্টে মাসে-মাসে জমা দিয়ে যাব। যদি কোন কারণে তোমার আমার বন্ধুত্বে ছেদ হয় তাহলে সে টাকা নিয়ে তুমি আমাকে ছেড়ে যাবার সময় বলবে, ‘তামাম শুধ’। এই সমস্ত আয়োজনটা হচ্ছে আমার স্বার্থের খাতিরে। কিন্তু বিশ্বাস কর, নীতা, মানুষ সব কিছুই স্বার্থপ্রণোদিত হয়ে করে না।..তোমার কথা শুনতে শুনতে আমার হঠাৎ মনে হল, হয়তো আমি একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে একজন সমব্যর্থীর উপকার করতে পারি। সে মেয়েটি আমারই মতো এই পুরুষ-শাসিত সমাজে একা-হাতে লড়তে-লড়তে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। এখন সে পারিশ্রমিক পর্যন্ত চায় না – চায় মাথার উপর ছাদ, ভাতকাপড় আর বিশেষ করে নিরাপত্তা। আমি যদি তাকে বিশ্বাস করতে পারি তাহলে সে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পাবে। মদটা ছাড়তে পারবে। এরপর যদি ফটো তোলা বিদ্যেটা মন দিয়ে শিখতে পারে তাহলে একদিন সে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। স্বনামখ্যাত হতেই বা বাধা কী? স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া সেটাও আমার উদ্দেশ্য। – তাই ‘মালিক’ বলতে তুমি কাকে ‘মীন’ করছিলে তা আমি জানতে চাই না।– যদি না অবশ্য তুমি মনে কর, তোমাকে এখান থেকে উদ্ধার করার চেষ্টায় সে তোমার বা আমার ক্ষতি করতে পারে।

নবনীতা হাসতে হাসতে বলে, না কাকলি, তুমি আমাকে এই নরক থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলে জীবন হালদার বুক ফেটে মরে যাবে না।

– জীবন হালদার লোকটা কে?

– এই কারবারের সিনিয়র পার্টনার। আমার স্বপ্নের সেই রাজপুত্র। যার হাত ধরে একদিন গ্রাম থেকে শহরের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম।

– তাকেই তুমি ‘মালিক’ বলছ?

– সবাই তাই বলে। যদিও এ দোকানটা পার্টনারশিপ বিজনেস। দ্বিতীয়. মালিক, স্লীপিং পার্টনার। শুধু টাকার যোগান দেয়, লাভের হিস্যা বুঝে নেয়। কলকাঠি সব জীবন হালদারের হাতে।

– তোমাকে এখান থেকে নিয়ে গেলে জীবন আপত্তি করবে না?

– আপত্তি? সে তোমাকে দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করবে। কেন জানো? আমাকে সে ঘাড় থেকে নামাতেই চায়। নতুন পুতুল নিয়ে খেলার শখ হয়েছে তার। শুনেছি, আজ রাতেই তার ইন্টারভিয়ু।

– এখানে?

– তুমি ছেলেমানুষ। এখানে ‘ইন্টারভিযু’ হয় নাকি? তা হবে জীবন হালদারের ‘ডেন’-এ। ‘ডেন’ বোঝ? সিংহের বাসা। সারারাত ধরে ইন্টারভিয়ু চলবে। জমিদারি বিলোপ হবার আগে যেমন ছিল ‘বাগানবাড়ি’, একালীন মস্তানদের তেমন থাকে এক-একটা ‘ডেন’।

– মস্তান! জীবন হালদার কি একজন মস্তান?

– স্বনামখ্যাত। পার্টি-মস্তান। ওর নামে অনেকগুলো খুন-বলাৎকার ডাকাতির মামলা ঝুলছে। অথচ পুলিশে তাকে ঘাঁটায় না। ওর দলে অনেক নামকরা গুণ্ডা।

– যাদুগোপাল কি ওই দলের?

– মোটেই না। যাদুগোপাল ও দলের কাউকে চেনে না। আমি তার যোগসূত্র। এখানে মদ খেতে আসত যাদুগোপাল। আমার সঙ্গে আলাপ। আমার মাধ্যমেই সে মালিকের কাছ থেকে মোটা টাকা ধার নিয়েছে–

– মোটা টাকা ধার নিয়েছে? কেন? কী করবে?

– বড়লোক হবে বলে। রেস খেলে। সে টাকা এতদিনে ঘোড়ার খুরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধূলো হয়ে গেছে। কী হল?

কাকলি কোনরকমে সামলে নিয়ে বলে, কিছু না!

– কিছু না মানে। তুমি ও ভাবে শকড় হলে কেন?

ম্লান হাসল কাকলি? বলল, যাদুগোপাল কী বন্ধক রেখেছে জানো?

– ঠিক জানি না। বোধহয় কিছু শেয়ার।

– হ্যাঁ ঠিকই আন্দাজ করেছ তুমি। আমার দোকানের শেয়ার।

– তোমার দোকানের মানে? সে কেমন করে পাবে?

– আমার দোকানের প্রায় আধাআধি শেয়ার আমার দিদির নামে। যাদুগোপাল দিদিকে দিয়ে নিশ্চয় সেগুলো এনডোর্স করিয়ে নিয়েছে।..তুমি, তুমি আমার একটা উপকার করবে, নীতা?

– বল?

– আমার সঙ্গে ব্যারিস্টার পি. কে. বাসুর কাছে তোমাকে যেতে হবে। সব কথা তাঁকে খুলে বলতে হবে। আমি জানি না, তিনি আমাকে কতটা সাহায্য করতে পারবেন, আদৌ পারবেন কিনা। কিন্তু তোমার কাছ থেকে নিশ্চয় তিনি কিছু জানতে পারবেন। তুমি আসবে?

– কবে? কখন?

– আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাল বিকালে। কিন্তু আমি সেটা এগিয়ে আনতে চাই। দেখি ওঁকে একবার ফোন করে। কাছাকাছি পাবলিক টেলিফোন বুথ কোথায় আছে বল তো?

– তুমি এস আমার সঙ্গে। আমাদের কাউন্টার থেকেই ফোন করতে পার, না হলে আমার ঘর থেকে।

– তোমার ঘর? সেটা কোথায়? ঘরে টেলিফোন আছে?

– হ্যাঁ, আছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সেটাই ছিল ‘মালিক’-এর ডেন। তবে খুব কাছে নয়, ইলিয়ট রোডে।

– না, অত দূরে যাব না। তুমি বস। আমি আশপাশের কোনও দোকান থেকে ওঁকে ফোন করে দেখি। তোমাদের রেস্তোরাঁ থেকে ফোন করা ঠিক হবে না। কেউ কিছু শুনে ফেলতে পারে। এখানে অনেকেই হয়তো লক্ষ্য করেছে যে, তুমি আর আমি দীর্ঘ সময় আলোচনা করছি। তোমার মালিকের কোনও চর যদি দোকানে থাকে তবে সে হয়তো ইতিমধ্যেই আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। আমি এখান থেকে টেলিফোন করলে সে আড়িপাতার চেষ্টা করতে পারে।

একশ টাকার একটা নোট টেবিলে নামিয়ে দিয়ে কাকলি বললে, গিরিধারী এলে বিলটা মিটিয়ে দিও। আমি এখনি ঘুরে এসে ব্যালেন্সটা নেব।

কাছেই একটা দোকান থেকে অর্থমূল্যে টেলিফোন করার অনুমতি পাওয়া গেল। এবারও ধরলেন মিসেস বাসু। কাকলির পরিচয় পেয়ে বললেন, আপনি তো কাল বিকালে চারটের সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলেন?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, করেছিলাম। কিন্তু ইতিমধ্যেই এমন কতকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে যে, সম্ভব হলে আজ রাত্রেই আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। সম্ভবপর হবে?

রানু বললেন, লাইনটা ধরে থাকুন। আমি জিজ্ঞেস করে দেখছি।

মিনিট তিন-চার টেলিফোনটা নীরব রইল। তারপর হঠাৎ ভারী গলায় শুনতে পেল, ইয়েস। পি. কে. বাসু স্পিকিং…

কাকলি বললে, নমস্কার স্যার। আমার নাম –

– আই নো। শ্রীমতী কাকলি দত্ত, পার্ট-ওনার অব সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরস। মিস না মিসেস?

– মিস দত্ত।

– বয়স কত?

– কার? আমার?

– না তো কি আমার?

– বত্রিশ।

– ঠিক আছে, তবে ‘তুমিই’ বলি। হঠাৎ কী হল তোমার?

– হঠাৎ কতকগুলো সূত্রে…

– আই নো, আই নো। মিসেস বাসুকে তা বলেছ। তুমি কোথা থেকে ফোন করছ? দোকান থেকে না বাড়ি থেকে?

– আজ্ঞে না। একটা স্টেশনারি দোকান থেকে।

– তবে যেটুকু বলেছ তার বেশি বলা ঠিক নয়! তোমার আশেপাশে লোকজন আছে নিশ্চয়?

– আজ্ঞে হ্যাঁ। তা আছে।

– তাহলে ফোনে আর কিছু বল না। তুমি আজ রাত সাড়ে ন’টায় আমার বাড়িতে আসতে পারবে?

– তাই আসব, স্যার। আমার সঙ্গে আরও একজন থাকবে-আমারই বয়সী একটি মেয়ে। ‘সোনালি স্বপন’-এ কাজ কর। তার নাম নবনীতা রায়। সে অনেক কথা বলতে পারবে, যা আমি জানি না। সে অনেক কিছু জানে।

– তা যদি জানে, তাহলে সে তোমাকেই তো তা জানাতে পারে?

– কিছু অসুবিধা আছে, স্যার। আপনি যেভাবে ক্রস করে ওর কাছ থেকে বাস্তব ঘটনাগুলো জানতে পারবেন, আমি হয়তো তা পারব না। আপনার যদি অসুবিধা না হয়, তাহলে অনুমতি দিন স্যার, আমি ওকে নিয়েই আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাব।

– ঠিক আছে। আমার বাড়িতে আসার রোড-ডিরেকশনটা চাও?

– আজ্ঞে না, আমি জানি।

– অলরাইট। আমি প্রতীক্ষা করব। এস তোমরা। নাইন থার্টি পি. এম.।

লাইনটা কেটে দিয়ে কাকলি ‘সোনালি স্বপন’-এ ফিরে এল।

নবনীতা চুপচাপ বসে আছে একই চেয়ারে।

কাকলি তার কাছে এগিয়ে আসতেই সে এক গুচ্ছ নোট আর খুচরো বাড়িয়ে ধরে।

– এটা কী?

– তোমার ব্যালেন্স।

কাকলি হাত ব্যাগে নোট-খুচরো ভরে ফেলে জানতে চায়, তোমাকে এখানে আর কতক্ষণ থাকতে হবে?

– ঘণ্টাখানেক। রাত সাতটা পর্যন্ত। কেন?

– ব্যারিস্টার-সাহেবের সঙ্গে আজ রাত সাড়ে-ন’টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি। তোমাকে কি এই দোকান থেকে পিক আপ করে নেব?

– না। আমাকে একবার আমার ডেরায় যেতে হবে। বাসু-সাহেবের বাড়ি তো নিউ আলিপুরে। আমি ঠিক পৌঁছে যাব। হয়তো দু’দশ মিনিট দেরি হবে।

– ঠিক আছে। ট্যাক্সি নিয়ে যেও। অ্যাট মাই কস্ট। আর তোমার টেলিফোন নাম্বারটা আমার এই ডায়েরিতে লিখে দাও। আর তোমার মালিকের ‘ডেন’-এর ঠিকানাটাও। ও ভাল কথা, তুমি রাত সাতটা পর্যন্ত এ দোকানে আছ তো? তার মধ্যেই তোমাকে সেই ব্ল্যাঙ্ক ডায়েরিটা পাঠিয়ে দেব। কাল তোমাকে নিয়ে যাব আমার ‘ডেন’-এ। ‘ডেন’ বোঝ তো? সিংহীর বাসা।তুমি শিফট্ করার জন্য তৈরি হয়ে নিও কেমন?

নবনীতা ওর ডায়েরীতে নির্দেশ মতো টেলিফোন নম্বর আর ঠিকানা লিখে দিল। বলল, একটা কথা, কাকলি, তুমি জীবন হালদারের ঠিকানা চাইছ কেন?

– কারণ আমার ধারণা ওই ঠিকানাতেই আমার বুকের পাঁজর ক’খানা রাখা আছে। দোকানের শেয়ারগুলো। আমার ব্যবসায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী সেগুলো খাবলা মেরে তুলে নেবার আগেই আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

– কে সেই প্রতিদ্বন্দ্বী?

– আজ নয়, নীতা। কাল সব কথা খুলে বলব। পাশাপাশি খাটে শুয়ে শুয়ে, কেমন?

ব্যবসার বাজারটা মন্দা চলছে। বাসু-সাহেবের হাতে বর্তমান কোনও কেস নেই। বছরের প্রথম থেকেই। মামুলি কেস উনি নেন না– সে দোষটা অবশ্য ওঁর নিজেরই। বাসু-সাহেবের হাতে কেস না থাকলে ‘সুকৌশলী’ও বেকার। তাই সন্ধ্যার শো’তে কৌশিক আর সুজাতা গেছে অ্যাকাডেমিতে মনোজ মিত্রের কী একটা নতুন নাটক দেখতে। রানু বসেছেন টিভি দেখতে। বাসু-সাহেব টিভি দেখেন বিশেষ বিশেষ সময়ে – বি.বি.সি.র প্রোগ্রাম। তিনি পাশের লাইব্রেরি ঘরে ইজিচেয়ারে লম্বমান হয়ে কী একটা বই পড়ছেন। রাত আটটা বাজতে পাঁচ। হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। বাসু বইটার পাতার ভাঁজে একটা পেজ-মার্ক গুঁজে উঠে দাঁড়ালেন। ওখান থেকেই হাঁকাড় পাড়লেন, আমি দেখছি।

তৎপরতার প্রতিযোগিতায় রানু হার মানতে রাজি নন। রিমোট কন্ট্রোলে টিভিটার কণ্ঠ রোধ করে তাঁর হুইল-চেয়ারে পাক মেরে টেলিফোন-স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাসু টেলিফোনের কাছাকাছি এসে পৌঁছবার আগেই রানু যন্ত্রটা তুলে নিয়ে কানে বসিয়েছেন, হ্যালো?…হ্যাঁ, ব্যারিস্টার বাসুর বাড়ি…আর একটু পরিষ্কার করে বলুন। কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কে? কী নাম বললেন?

বাসু এসে দাঁড়িয়েছেন ওঁর পাঁজর-ঘেঁষে। টেলিফোন যন্ত্রের ‘কথামুখে’ হাত চাপা দিয়ে রানু বললেন, মেয়েটা মদে চুর হয়ে আছে! সব কথাই জড়িয়ে যাচ্ছে।

– মেয়েটা? সেই ফোটোগ্রাফার? কাকলি দত্ত?

– না। নবনীতা রায়।

– হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। তারও আসার কথা ছিল। দাও তো ফোনটা।

রানুর হাত থেকে যন্ত্রটা কেড়ে নিয়ে বললেন, ইয়েস? বাসু বলছি। বল, কী বলতে চাইছ? নবনীতা?….হ্যালো?…নবনীতা?

ও-প্রান্তবাসিনীর কণ্ঠ রীতিমতো জড়ানো – যান্ত্রিক গোলযোগ নয় – সম্ভবত ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন মিসেস বাসু: অত্যধিক মদ্যপান! ওর কথা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

– হ্যাঁ, বল। পরিষ্কার করে বল। কী বলছ?

– কথা দি’ছিলাম…যাবো…রাত সাড়ে ন’টায়…পাৰ্ছি না, পার্ব না। সরি।

– কেন? কী হয়েছে তোমার? বেশি মদ খেয়ে ফেলেছ?

– মদ নয়! বিষ! ওরা আমার মুখটা….মুখটা বন্ধ করে দিল। সাখ…. সাক্ষী দিতে দেবে না।

– তুমি কোথা থেকে ফোন করছ?

– বা-বাড়ি থেকে।

– ঠিকানাটা বল, কুইক।

– ওরা এক বাক্স ক্যা– ক্যান্ডি পাঠিয়েছিল। বিষ মাখানো চকোলেট। খেয়ে মরেছি।…প্লীজ স্যার সেন্ড হেল্প। পুলিশ। ডাক্তার। অ্যাম….অ্যাম্বুলেন্স

– তোমার ঠিকানাটা বল? নীতা-নীতা হ্যালো….

– থার্টিন বাই ওয়ান বি থা-থা-থার্টিন বাই ওন বি

– ইয়েস। রাস্তার নাম?

ও-প্রান্ত থেকে কোনও জবাব এল না। একটা দেহপতনের শব্দ। মনে হল হাত থেকে টেলিফোনটা ছিটকে পড়ল। বাসু বার বার ‘হ্যালো’হাঁকলেন। কেউ সাড়া দিল না। পুরো এক মিনিট। তারপর কে যেন যন্ত্রটা স্বস্থানে বসিয়ে দিল। তারপর স্তব্ধতা। একটানা স্তব্ধতার গুঞ্জন।