বারো
পরদিন সকাল সাতটায় বাসু-সাহেব আনোয়ার শাহ রোডে ‘পান্থজনসখা’ হোটেলে এসে হাজির। রিসেপশন থেকে জানালো, মিসেস মজুমদার আছেন দুই/সাত নম্বর সিঙ্গল-বেড ঘরে।
বাসু দোতলায় এসে সাত নম্বর ঘরে নক করলেন। কেউ সাড়া দিল না। দরজা
ঠেলতেই সেটা খুলে গেল। বাসু ভিতরে এলেন। দেখলেন জয়া অঘোরে ঘুমাচ্ছে। রাত্রে সে দরজাটা বন্ধ পর্যন্ত করেনি। উনি পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলেন। নিচে এসে হোটেলের পাবলিক টেলিফোন কর্নার থেকে ফোন করলেন বালিগঞ্জে ‘সানিসাইড নার্সিংহোমে’। নার্সিংহোম-এর রিসেপশনিস্টের মাধ্যমে ডক্টর ব্যানার্জিকে ধরলেন। বাসু-সাহেবের সাড়া পেয়েই ডক্টর ব্যানার্জি বলে ওঠেন, এত তাড়াহুড়ো করলে তো চলবে না, বাসু-সাহেব। আপনার মক্কেল, অর্থাৎ আমার পেশেন্ট, আরও একদিন ঘুমোবে। সে ভালই আছে। ব্যস্ত হবেন না।
বাসু বলেন, না ডাক্তার, আমি এখন ফোন করছি অন্য একটি পেশেন্টের ব্যাপারে!
– কী হয়েছে তার? বিষ খেয়েছে? না গুলি? নাকি বধূ-হত্যা?
– না, না সে সব কিছুই নয়। নার্ভাস ব্রেকডাউন। হয়তো কার্ডিয়াক প্রবলেমও কিছু আছে। বছর-দেড়েক আগে একটা হার্ট অ্যাটাক মতো হয়েছিল – ইসকিমিয়া বোধহয় – ঠিক জানি না। কিন্তু কাল রাত্রে ঘটনাপরম্পরায় খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। আমি চাই তুমি একবার এসে দেখে যাও…
– আপনার বাড়িতে? নিউ আলিপুরে?
– না, না, আনোয়ার শাহ রোডে। ‘পান্থজনসখা’ হোটেলে। রুম নং 27, রোগিণীর নাম মীনাক্ষী মজুমদার।
– আপনি কোথা থেকে ফোন করছেন?
– ওই হোটেলের লাউঞ্জ থেকে।
– অল রাইট। আমি নার্সিংহোমে একটা রাউন্ড দিয়ে আপনার ওখানে পৌঁছাব। ধরুন সওয়া আটটায়। তাহলে হবে?
– হবে। আমি অপেক্ষা করব।
আরও মিনিটপনের পরে বাসু-সাহেব আবার ফিরে এলেন জয়া সেনের ঘরে। এতক্ষণে সে উঠেছে।
বেড টি পান করছে। এটা বোধহয় কৌশিক ব্যবস্থা করে গেছে।
– এখন কেমন আছ?– জানতে চাইলেন বাসু।
– অনেকটা ভাল। খুব ঘুমিয়েছি রাত্রে। ডবল ডোজ ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম।
– সকালে খালি পেটে ওষুধ খাও? না কিছু খেয়ে তারপর?
– খালি পেটে একটা সরবিট্রেট খাই। খেয়ে নিয়েছি সেটা।
– তুমি নিজে নিজে বাথরুমে যেতে পারবে তো?
– কাল ড্রাইভ করতে পারলাম আর আজ ওটুকু পারব না?
– দ্যাটস ফাইন। আমি একজন ডাক্তারকে ‘কল’ দিয়েছি। ঘণ্টাখানেক পরেই তিনি আসছেন।
– না, না, ডাক্তার কেন? তাহলেই সব জানাজানি হয়ে যাবে।
– যাবে না। এঁর মাধ্যমে আমি অনেক কিছু করি। অত্যন্ত বিশ্বস্ত।
– কিন্তু উনি তো আমার নাম জানতে চাইবেন।
– চাইবেন তো। মীনাক্ষী মজুমদারের নামে প্রেসক্রিপশনও লিখবেন। তুমি কি মুখ ধুয়ে আসবে এখন?
– হ্যাঁ। আপনি একটু বসুন। আমি বাথরুম ঘুরে আসি। চা খাবেন, অথবা কফি?
– না, তুমি বাথরুম ঘুরে এস প্রথমে।
মিনিট পনের পরে রাতের পোশাক পাল্টে জয়া এসে ওর খাটে উঠে বসল। বাসু ইতিমধ্যে পাইপ ধরিয়েছেন। বললেন, কালকের ঘটনাটা এখন সংক্ষেপে আমাকে বলতে পারবে?
– কাল একটা নার্ভাস শক পেয়েছিলাম। তাতেই–
– জানি। মোটামুটি সবই আমার জানা। দু-একটি মিসিং লিংক জানতে চাই আমি। তুমি অতি সংক্ষেপে বল তোমার অভিজ্ঞতা।
জয়া বলল, তাহলে আপনি আগে বলুন, আপনি কতটা জানেন। কোথায় কোথায় আপনার অজ্ঞাত ফাঁক-ফোকর।
– কাল সন্ধ্যায় কাকলি তোমার সঙ্গে দেখা করতে যায়। তোমার সঙ্গে দেখা করার পরে নিচে এসে যাদুগোপালের সঙ্গে আলোচনার সময় তারা কথা কাটাকাটি করে। যাদুগোপাল উত্তেজিত হয়ে গলা চড়ায়। কিছু কিছু কথা দোতলা থেকেই সম্ভবত তোমার কানে যায়…
– না, স্যার। আসলে তা ঘটেনি। কলি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলে আমি সিঁড়ির মাথায় এসে আড়ি পেতেছিলাম। কেন ওরা পরস্পরকে সহ্য করতে পারে না তাই জানতে চেয়েছিলাম আমি।
– বুঝলাম। মোটকথা তোমারও সন্দেহ হয় যে, শেয়ার সার্টিফিকেটগুলো ভল্টে নেই। অন্যত্র আছে। তাই একটু পরে যাদুগোপাল যখন তার মোটর সাইকেলে রওনা হয় তখন তুমিও তাকে অনুসরণ কর নিজের গাড়িতে। তাই না?
জয়া কী একটা কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল।
বাসু বললন, মোমিনপুরে জীবন হালদার খুন হয়েছে রাত নয়টার কাছাকাছি। কাকলির ধারণা ওটা তোমার কাজ।
– কাকলির ধারণা আমি ওকে খুন করেছি? ও বলেছে?
– না, বলেনি। কিন্তু সে আমাকে তোমার তরফে ‘রিটেইন’ করতে চেয়েছে। ফলে, কাকলির বিশ্বাস, হয় তুমি নিজেই খুনটা করেছ, অথবা তুমি জান কে করেছে– সেই প্রিয়জনকে তুমি বাঁচাতে চাইছ।
জয়া সিলিঙ-এর দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল।
– তুমি আমাকে সত্যি কথাটা জানাবে, জয়া?
– না। তা আমি পারি না।
– তুমি কি গুলিটা ছুঁড়েছিলে?
– না
– জীবন হালদারের কাছে তোমাদের দোকানের শেয়ার গচ্ছিত রেখে যাদুগোপাল অনেক টাকা ধার নেয়। এ কথা তুমি জানতে। তাই নয়?
– ওটা ভুল খবর। শেয়ার সার্টিফিকেট কেউ গচ্ছিত রাখেনি।
– তবে সেগুলো জীবনের কাছে গেল কী করে?
– কে বললে? যায়নি তো।
– যায়নি? তাহলে শেয়ারগুলো কোথায়?
– আমার কাছে।
– তোমার কাছে! বাড়িতে? ভল্টে?
– না। ঘটনাচক্রে আমার ওই হাতব্যাগে। ব্যাগটা দিন। দেখাই আপনাকে।
বাসু সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, এবার হিসাবটা মিলছে। সেই জন্যই কাকলি চাইছিল আমি তোমাকে ‘ডিফেন্ড’ করি।
– এ কথার মানেটা কী হল?
– তুমি কাল মোমিনপুর থেকে এই শেয়ার সার্টিফিকেটগুলো উদ্ধার করে নিয়ে এসেছ।
– কী উল্টোপাল্টা বলছেন? এগুলো তো বরাবরই আমার কাছে আছে।
বাসু ধীরে ধীরে না-য়ের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
– কী হল? ‘না’ মানে?
– আয়াম এক্সট্রিমলি সরি, জয়া। তোমাকে ক্লায়েন্ট বলে আমি মেনে নিতে পারছি না। ডাক্তারবাবু আসুন। তোমাকে দেখুন। তারপর…
– কেন? আমি কী অপরাধ করলাম?
– ক্লায়েন্ট খোলা মনে আদ্যোপান্ত সত্য কথা না বললে আমি সে কেস নিই না। শেয়ার সার্টিফিকেটগুলো বরাবর তোমার কাছে থাকতে পারে না। তুমি যাদুগোপালের অপরাধটা ঢাকতে চাইছ।
– ও খুন করেছে বলতে চান?
– না। তা বলছি না। করে থাকতে পারে।। তুমি বা কাকলিও করে থাকতে পার। প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন এই যে, যাদুগোপাল ওই শেয়ার সার্টিফিকেটগুলো জীবন হালদারের কাছে গচ্ছিত রেখে অনেক অনেক টাকা ধার নিয়েছিল। রেস খেলে উড়িয়েছে। এটা ফ্যাক্ট। সেটা তুমি গোপন করতে চাও, কর। অস্বীকার করতে চাও, কর। আমি হাত ধুয়ে ফেলব।
জয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ধীরে ধীরে সে শুয়ে পড়ল।
বাসু-সাহেবের করুণা হল। কিন্তু তিনি নির্বাক বসেই রইলেন।
ও আবার উঠে বসল। বলল, নাঃ। আপনার কাছে কিছু লুকাব না। সব কথা অকপটে স্বীকার করব।
– ও. কে.। বল। শুধু মূল তথ্যগুলো। যত সংক্ষেপে সম্ভব।
– কলি চলে যাবাব পর আমি আমার স্বামীর কাছ থেকে ব্যাপারটা জেনে নিতে চাইছিলাম, কিন্তু আমি যে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আড়ি পেতেছি ওটা ওকে জানাতে চাইছিলাম না। আমি ঘরে ফিরে গেলাম। পোশাক বদলে নিলাম। ভেবেছিলাম, ওকে বলব গাড়িটা বার করতে। দু’জনে কোথাও বেড়াতে যাব; সেখানেই গল্পে গল্পে প্রসঙ্গটা তুলব– মানে ওইশেয়ার সার্টিফিকেটগুলোর কথা। ইতিমধ্যে শুনতে পেলাম নিচে ও কাকে যেন ফোন করছে। শেয়ার শব্দটা সে বার-দুয়েক উচ্চারণ করল। কী কথা হল জানি না, কিন্তু ওকে খুব উত্তেজিত মনে হল। তারপর ও আমাকে কিছু না জানিয়ে ওর মোটর বাইকটা স্টার্ট দিল। আমার গাড়ির চাবিটা আমার কাছে ছিল। হয়তো আমার মুখোমুখি হতে চাইছিল না বলেই ও নিজের মোটর সাইকেল নিয়ে রওনা হল। আমার জেদ চেপে গেল। শরীরে বইবে কি না একথা খেয়াল হল না। আমি গাড়ি নিয়ে ওর পিছন পিছন যাব স্থির করলাম। আমার লেডিজ ব্যাগটা তুলে নিলাম। তারপর–
দম নেবার জন্য ও থামল। বাসু একটু অপেক্ষা করলেন। তারপর বুঝলেন, ও দম নেবার জন্য মাঝপথে থামেনি। থেমেছে সঙ্কোচে। তাই তাগাদা দিলেন, তারপর?
– তারপর মনে হল রিভলভারটা সঙ্গে নেওয়া উচিত। কলি ওটা আমার কাছে রেখেছিল। সেটা যেখানে থাকে–
– বুঝেছি। সেখানে হাতড়ে দেখলে যে অস্ত্রটা নেই। তাইতো?
জয়া উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল, বুঝুন আমার অবস্থা। অস্ত্রটা কাকলি নিতে পারে না। তাহলে কে নিয়েছে? আমি মরিয়া হয়ে ওর পিছু নিলাম।
– তখনো যাদুগোপাল তোমাদের বাড়ি থেকে বহুদূরে চলে যায়নি?
– না। ওর বাইকে কী যেন গণ্ডগোল হয়েছিল। ইঞ্জিনটা খুলে দেখছিল বাড়ির কাছাকাছিই। আমি প্রায় দু’শ মিটার দূরে চুপচাপ অপেক্ষা করলাম। মোট কথা, ওকে অনুসরণ করতে আমার কোনও অসুবিধা হয়নি।
– রাত তখন কত?
– আন্দাজ ন’টা-সাড়ে নটা। আমি ঘড়ি দেখিনি।
– ওকে অনুসরণ করে তুমি যোধপুর পার্ক থেকে মোমিনপুরে চলে এলে?
– হ্যাঁ। কিন্তু একেবারে শেষাশেষি ও ঠিক কোন দিকে মোড় নিল বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু ও যে মোমিনপুরে জীবন হালদারের কাছে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরেছিলাম।
– তুমি জীবন হালদারকে চিনতে? সে যে মোমিনপুরে থাকে–
– না। চিনতাম না। কিন্তু নামটা শোনা ছিল। আমার স্বামীর কাছেই। একবার ও বলেছিল মোমিনপুরের জীবন হালদারের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছে। উনি নাকি খুবই ইনফ্লুয়েন্সিয়াল। ওঁর মাধ্যমে ও কী-একটা ব্যবসা করতে চেয়েছিল। কিছু ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙাতে চেয়েছিল। আমি রাজি হইনি। বলেছিলাম, আগে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠি। তারপর ওসব ব্যবসা-ট্যাবসা….
– বুঝেছি। তারপর কী হল বল?
জয়া বিস্তারিত বর্ণনা দিতে থাকে। যাদুগোপালের মোটক বাইক ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে ফেলার পর ওর মনে হল এখন লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জীবন হালদারের বাড়িটা চিনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। একটা বাড়ির সামনে তিন-চারটে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। বাড়ি নয়, বড় দোকানের সামনে। স্টেশনারি দোকান। জয়া সেখানে গিয়ে জীবন হালদারের বাড়ির সন্ধান জেনে নেয়। অনেকেই তার বাড়িটা চেনে।
– তারপর তুমি জীবন হালদারের আস্তানায় গেলে?
– হ্যাঁ।
– এখন বল তো জয়া, যাদুগোপাল তোমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার আন্দাজ কতক্ষণ পরে তুমি জীবন হালদারের বাড়িতে পৌঁছাও?
– মিনিট দশ-পনের।
– ঠিক আছে। বলে যাও…
জয়া বর্ণনা দেয়, জীবনের বাড়িতে পৌঁছেও ডোরবেল বাজায়। একবার – দুবার। কেউ সাড়া দেয় না। অথচ বৈঠকখানা ঘরে আলো জ্বলছে।ত্রিসীমানায় লোকজন ছিল না। হঠাৎ জয়ার লক্ষ্য হয়-দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ নয়, ইঞ্চিখানেক ফাঁক আছে।
– তুমি দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলে?
– ইয়েস।
– কী দেখলে?
– আপনি তো তা জানেন…একজন প্রৌঢ় লোক…সেই বোধহয় গৃহস্বামী… টেবিলের উপর উবুড় হয়ে পড়ে আছে। তার পা-দুটো মাটিতে, মাথাটা টেবিলে। পিঠ থেকে একটা রক্তের …
জয়া মাঝপথেই থেমে গেল। ওর নীল ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে।
বাসু বলে ওঠেন, ঠিক আছে। ঠিক আছে…তুমি কী করলে বল।
জয়া হাত তুলে বোঝাতে চাইল সে একটু বিশ্রাম করতে চায়। মিনিটখানেক সে চোখ বুঁজে রইল। তারপর আবার ওঁর দিকে তাকিয়ে বলল, কী আশ্চর্য দেখুন! ঐ বীভৎস দৃশ্যটা দেখে আমার তো ‘ফেইন্ট’ হয়ে পড়ে যাবার কথা। অথচ আমার কোন ভাবান্তর হল না। মানে, ঠিক তখন। আমি যেন সিনেমা দেখছি। অথবা একটা নাটক। ওখান থেকেই আমার চোখ পড়ল মেঝেতে – পড়ে আছে একটা রিভলভার। আমি চিনতে পারলাম। ওটা আমারই, মানে কলির।
– কী করে চিনলে তুমি?
– হাতলের কাছে ঝিনুকের একটা নকশা ছিল। তার একটা কোনা চটে গেছিল। তাছাড়া ওটা খুঁজে না পেয়ে আমার ধারণা হয়েছিল ওটা নিয়েই ও মোমিনপুরে এসেছে…
– অল রাইট। তখন কী করলে তুমি?
– রিভলভারটা কুড়িয়ে নিলাম। আমার হাতব্যাগে ভরে নিলাম।
– চেম্বারটা পরীক্ষা করে দেখলে না? কোনও গুলি ছোঁড়া হয়েছে কিনা?
– না, তা আমি দেখিনি।
– তোমার হাতে গ্লাভস পরা ছিল না নিশ্চয়, তুমি কি ব্যাগে ভরার আগে আঁচল দিয়ে ওটা মুছে নিয়েছিলে?
– না তো। এসব কথা আমার মনেই পড়েনি।
– তুমি ওটা কুড়িয়ে নিলে কেন? যেহেতু ওটা তোমার বোনের? তোমাকে রাখতে দিয়েছিল?
জয়া ওঁর চোখে চোখে তাকিয়ে বলল, শুধু সে জন্যেই নয়। আমি জানতাম, ও আমার আগে আগে এসেছে। আমি জানতাম রিভলভারটা যেখানে রাখা ছিল সেখানে নেই। তার তো একটাই অর্থ হয়। আমি আমি…ওকে বাঁচাবার চেষ্টা করব না?
– অল রাইট। তারপর তুমি কী নজর করলে?
– তারপর আমার নজর হল….ঐ লোকটার….মনে, জীবন হালদারের মুঠিতে এক গোছা কাগজ ধরা আছে। সেটাও চিনতে পারলাম আমি। লিথোগ্রাফির মনোগ্রাম দেখে। আমাদের দোকানের শেয়ার। আমি, সেটা ধরে টান দিলাম। অনায়াসে সেটা ওর হাত থেকে বেরিয়ে এল।
– তখনো রিগর-মর্টিস শুরু হয়নি?
– আজ্ঞে?
– ঠিক আছে। শেয়ার সার্টিফিকেটগুলো কোথায়?
– তখন যে বললাম, আমার হাতব্যাগে।
– বুঝলাম। তারপর তুমি ঘর থেকে বার হয়ে এলে, কেমন? দরজাটা খোলা থাকল না বন্ধ?
– না, বাইরে বেরিয়ে এসে আমি টেনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
– এবং তারপর ডোর-হ্যান্ডেলে তোমার আঙুলের ছাপটা নিশ্চয় আঁচল দিয়ে মুছে দাওনি?
– আমার ওসব মনেই ছিল না।
জয়া এরপর বাড়ি ফিরে আসে। রিভলভাররটা সচরাচর যেখানে থাকে সেখানে রেখে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যাদুগোপালের জন্য। কিন্তু সে ফিরে আসে না। এতক্ষণে বীভৎস ব্যাপারটা দর্শনের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ও কাকলিকে ফোন করে, ফোন বেজে যায়। কাকলির ঘরের একটি ডুপলিকেট চাবি ওর কাছে থাকে। ওর আশঙ্কা হয় যে, যাদুগোপাল হয়তো রাত্রে ফিরবে না। পুলিসের ভয়ে সে পালিয়ে গেছে। ফাঁকা বাড়িতে ও একা থাকতে সাহস পায় না। কারণ ক্রমেই ওর হাত-পা শিথিল হয়ে আসছিল। ও একসঙ্গে দু-দুটো সরবিট্রেট বড়ি খেয়ে আবার গাড়ি নিয়ে রওনা হয়। একটা স্যুটকেসে কিছু জামা-কাপড়, টুথব্রাশ চিরুনি নিয়ে। ও ভেবেছিল, কাকলি যদি বাড়িতে না থাকে, তাহলে তার ঘরে ঢুকে তার বিছানায় শুয়ে থাকবে। যত রাতই হোক, কাকলি গড়িয়াহাটের মেজানাইনে ফিরবেই। যাদুগোপাল হয়তো আদৌ যোধপুর ফিরবে না।
– রাত তখন কটা?
– আমি জানি না। আমি যন্ত্রের মতো কাজ করে গেছি। ঘড়ি দেখিনি। কিন্তু ঘরে আমি পৌঁছাতে পারিনি। ওর দোকানের সামনে গাড়ি পার্ক করতেই একজন ভদ্রলোক…ও, আয়াম সরি, সে তো আপনিই।
