যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ১০

দশ

পুরো দশ সেকেন্ড কেউ কোন কথা বলল না। তারপর বাসু বলেন, সন্ধ্যা রাত্রে পয়েন্ট থ্রি-টু ক্যালিবারের একটা রিভলভারের গুলি জীবনের জীবনাবসান ঘটিয়েছে।

কাকলি অনেক কষ্টে বললে, কে? … কে মেরেছে ওকে?

– সেটা এখনো জানা যায়নি। তবে গুলিটা ওর পিঠের দিক দিয়ে ঢুকেছে। যেই হত্যা করে থাক – আত্মরক্ষার্থে সে গুলি করেছে এটা প্রমাণ করা শক্ত হবে।

কাকলি অহেতুক হেসে ওঠে। বলে যাক বাবা, আমার একটা ‘অ্যালিবাই’ আছে।

– আছে? কী সেটা?

কাকলির কুটি হয়। বলে, সত্যিই জানতে চান? আর যু রিয়ালি সিরিয়াস?

– তুমি কি কথাটা গুরুত্ব দিয়ে বলনি?

– কোন কথাটা? ঐ ‘অ্যালিবাই’-এর কথা? নিশ্চয় নয়।

– বেশ তাহলে এস এবার আমরা গুরুত্ব দিয়ে কথাটা বিচার করি। তোমার সত্যি কোনও ‘অ্যালিবাই’ আছে?

– কী বলছেন স্যার? আমি…আমি কেন জীবন হালদারকে খুন করতে যাব? আমি তাকে চিনিই না। তাছাড়া আমি তো তার কাছ থেকে ঐ শেয়ারের কাগজগুলো…

– আমার সঙ্গে সাড়ে নয়টায় তুমি দেখা করতে পারনি একটা জরুরি কাজে। অন্তত সে কথাই তখন বলেছিলে। সেই জরুরি কাজটা কী?

– আমি…আমি যোধপুর পার্কের বাড়িতে গেছিলাম।

– দিদির কাছে? দেখা হয়েছিল?

– না, দিদি ছিল না বাড়িতে।

– তুমি না বলেছিলে তোমার দিদি শয্যাগত?

– না, শয্যাগত ঠিক নয়। মাঝেমাঝে বের হয়…।

– যাদুগোপালের সঙ্গে? সেও ছিল না নিশ্চয়?

– না। বাড়ি তালাবন্ধ ছিল।

– তাহলে তোমার ‘অ্যালিবাই’টা কী?

কাকলি দেখতে গেল জলটা ফুটেছে কি না। প্রয়োজন ছিল না। জল এত অল্প সময়ে ফুটতে পারে না। হঠাৎ কাকলি জানতে চায়, ব্রান্ডি খাবেন স্যার?

– ব্রান্ডি? তুমি খাও?

– না-না। খাই না। ডাক্তার একবার প্রেসক্রাইব করেছিলেন। মানে, ডক্টরস ব্রান্ডি। আধ বোতলটাক আছে। কফির সঙ্গে মিশিয়ে দেব? দারুণ শীত নয়?

বাসু বললেন, কই আমার তো শীত করছে না। তুমি একটা জামা গায়ে দাও না–

কাকলি কথাটা শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না। নিচু হয়ে একটা কাবার্ড খুলে বার করে আনে একটা ডক্টরস ব্রান্ডি বোতল। গ্লাসে ঢালতে থাকে। ওর হাতটা কাঁপছে। বোতলের মাথাটা গ্লাসের কানায় ঠুনঠুন করে বাজছে। শীতে? না, নার্ভাসনেস?

বাসু ঘরের চারিদিকে আর একবার চোখ বুলিয়ে দেখলেন। নিঃশব্দে চরণে সোজা এগিয়ে গেলেন একটা কাঠের ওয়াড্রোবের দিকে। তালাবন্ধ ছিল না। বাসু পাল্লাটা খুলে দেখলেন নিচে কয়েক জোড়া নানান রঙের লেডিজ শ্যু– উপরে হ্যাঙারে ঝুলছে নানান শাড়ি। আর সেই গরম ওভারকোটটা।

হঠাৎ এদিকে ফিরল কাকলি। সবিস্ময়ে বলে, ও কী করছেন?

– তোমার ওভারকোটটা…

চমকে ওঠে মেয়েটা। প্রায় দৌড়ে এগিয়ে আসে এদিকে। কিন্তু তার আগেই বাসু-সাহেব ঐ ওভারকোটের বাঁ-পকেট থেকে বার করে ফেলেছেন জিনিসটা।

কাকলি একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে মাঝপথে থমকে দাঁড়ায়।

বাসু আলোর দিকে তুলে ধরলেন যন্ত্রটা। বললেন, -হ্যাঁ, পয়েন্ট থ্রি-টু বোরই। স্প্যানিশ রুবি। চেম্বারটা খুলে আলোর বিপরীতে ধরলেন। পাঁচটা চেম্বারে টাটকা বুলেট। শুধু ট্রিগারের সামনেরটা ফাঁকা। উনি নাকের কাছে নিয়ে এসে গন্ধ শুঁকলেন। চেম্বারটা বন্ধ করলেন, ওয়াড্রোবের পাল্লাটাও। ধীর পায়ে ফিরে এসে বসলেন আবার নিজের চেয়ারে। রিভলভারটা নামিয়ে রাখলেন টি-পয়ে।

কাকলি কেটলি থেকে একটু আধাগরম জল তার ব্রান্ডি-গ্লাসে মিশিয়ে দিল। তারপর ঢেলে দিল নিজের কণ্ঠনালীতে। আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে নিল।

বাসু প্রশ্ন করেন, এটা তোমার?

– হ্যাঁ, বাবার ছিল। এখন আমার।

লাইসেন্স তোমার নামে?

– ইয়েস।

– তুমি কি জান কাকলি, ব্যালাস্টিকস এক্সপার্ট বুলেটটা উদ্ধার করতে পারলে বলে দিতে পারবে কোন রিভলভার থেকে তা ছোঁড়া হয়েছে?

কাকলি বলে– আপনি কি আমাকে লিগাল পরামর্শ দিচ্ছেন? আই মীন, আমার ল-ইয়ার হিসাবে?

– না কাকলি। তোমার আইন-পরামর্শদাতা আমি নই। তোমাকে আমি আমার ক্লায়েন্ট বলে মেনে নিচ্ছি না।

– আমি আপনার ক্লায়েন্ট নই? আমার ধারণা হয়েছিল…

– না! ধারণাটা ভ্রান্ত। এই মার্ডার কেস-এ আমি তোমাকে রিপ্রেজেন্ট করছি না।

– কেন? কেন করছেন না?

– যেহেতু এ কেসটা সম্বন্ধে আমি তোমার কাছ থেকে কিছুই শুনিনি। তুমি যখন আমার কাছে এসেছিলে তখন তোমার ওভারকোটের বাঁ-দিকের পকেটটা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ছিল। ওয়েল, থাক ওসব কথা…তুমি আমাকে বলেছিলে তোমার দোকানের শেয়ারের কথা, তখনো জীবন হালদার খুন হয়নি, –

কাকলি বলে– আপনি কি ধরে নিয়েছেন আমিই খুনটা করেছি?

বাসু উঠে গেলেন। কেটলির জলটা ফুটছে। রুমাল দিয়ে ধরে নামালেন। কফির কৌটো থেকে কফি নিয়ে কফি-পটে দিলেন। গরম জলটা এবার ঐ পটে ঢালতে থাকেন। কাকলি ওঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল না।

বাসু চিনি মেশাতে মেশাতে বললেন, আমি জানি না। তুমি আমাকে কিছুই বলনি।

– যদি সব কথা খুলে বলি?

– না, বলো না। কারণ আমি তোমাকে রিপ্লেজেন্ট না করলে তোমার পক্ষে অসুবিধা হবে। তবে দু’একটা প্রশ্ন করে মোটামুটি তোমাকে কিছু পরামর্শ দিতে পারি। সময় খুবই কম, কাকলি। আমার মনে হয়, দশ-পনের মিনিট মাত্র সময় আছে…

– কেন? তারপর কী হবে?

– লালবাজার হোমিসাইড স্কোয়াড-এর ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ এখানে এসে পৌঁছাবে।

– অল রাইট। আপনি কি আমার দিদিকে ক্লায়েন্ট বলে মেনে নেবেন? যদি আমি আপনাকে নিয়োগ করি?

– তোমার দিদি? এ কেসের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

– বলতে পারি, যদি কথা দেন আপনি গোপন রাখবেন?

– কী পাগলামি করছ, কাকলি। তুমি আমাকে যা বলবে তা তৃতীয় ব্যক্তিকে আমি বলব না, তোমার কেস নিই বা না-নিই।

কাকলি এবার বিস্তারিত খুলে বলে তার অভিজ্ঞতার কথা।

‘সোনালি স্বপন’ থেকে ফিরে এসে সে চাকর দিয়ে নবনীতাকে ঐ ডায়েরিটা পাঠিয়ে দিয়েছিল। ততক্ষণে ওর কাউন্টার-গার্ল সুপর্ণাও চলে গেছে। দোকান বন্ধ করে কাকলির মনে হয় হাতে যথেষ্ট সময় আছে। সে সত্যিই আর একবার যোধপুর পার্কের বাড়িতে যায়। রাত তখন পৌনে নয়টা। সত্যিই দেখে, সদরে তালা ঝুলছে। কাকলি খুবই অবাক হয়।

এতরাত্রে যাদুগোপাল তার স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় গেল? ওর কাছে ডুপ্লিকেট-চাবি ছিল। সদর খুলে ও একতলায় আসে। সেখান থেকে ওদের গ্যারেজটা দেখা যায়। দেখে, গ্যারেজে গাড়িটা নেই। সেটাই স্বাভাবিক। যাদুগোপাল সস্ত্রীক কোথাও গেলে গাড়ি নিয়েই যাবে। মাসদুয়েক জয়া শয্যাশায়ী ছিল। ইদানীং দু-একবার যাদুগোপাল ওকে নিয়ে এখানে-ওখানে যেতে শুরু করেছিল। কিন্তু একটা ব্যাপারে ওর খটকা লাগে। যাদুগোপালের মোটর সাইকেলটাও গ্যারেজে অনুপস্থিত। এটা কেমন করে হয়? কাকলি দ্বিতলে উঠে আসে। দ্বিতলের সদর-দরজাটা চাবি বন্ধ ছিল না। ও ঘরে ঢোকে। আলোটা জ্বালে। ওদের ডবল-বেড খাটের মাথার কাছে একটা লকার আছে। এখন এই ডবল-বেড পালঙ্কটা ওর দিদি–জামাইবাবু ব্যবহার করে; এককালে ওরা দুই বোন ব্যবহার করত। ঐ লকারের চাবি দু-বোনের কাছেই ছিল, এখনো আছে। কাকলি ঐ লকারটা তার ডুপ্লিকেট-চাবি দিয়ে খুলে ভিতরে দেখতে গেল….

বাসুসাহেব এতক্ষণ নিঃশব্দে ওর জবানবন্দি শুনে যাচ্ছিলেন। এবার বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, ঐ বেডসাইড লকারের ভিতর কী খুঁজছিলে তুমি? দিদির লেডিজ ব্যাগ? ড্রাইভিং লাইসেন্স?

– আজ্ঞে না। এই রিভলভারটা–

– সে কী। তুমি যে বললে এটা তোমার?

– হ্যাঁ, আমারই ছিল, আমারই আছে। বাবা মারা যাবার পর ওটা আমার নামে ট্রান্সফার করা হয়েছে। কিন্তু দিদি অসুস্থ, ও বাড়িতে কখনো কখনো একেবারে একা থাকে, যখন যাদুগোপাল ইয়েল-লক বন্ধ করে বাইরে যায়। তাই আমি প্রায় মাসদুয়েক আগে এটা দিদিকে রাখতে দিয়েছিলাম। আমি জানতাম, দিদি ঐ লকারে রিভলভারটা রাখে।

– আই সী। তারপর? বলে যাও।

– ড্রয়ারে রিভলভারটা ছিল না। বুঝুন তখন আমার অবস্থা! দিদি যদি যাদুগোপালের সঙ্গে বাড়ির বাইরে গিয়ে থাকে তা হলে মোটরবাইকটা গ্যারেজে থাকার কথা। তা যখন নেই তখন দিদিই ড্রাইভ করছে। ঐ আগ্নেয়াস্ত্রটা নিয়ে অসুস্থ-অবস্থায় দিদি নিজে গাড়ি চালিয়ে কোথায় যেতে পারে?

– তখন রাত ক’টা?

– আমি জানি না। ন’টার কাছাকাছি। আমি ওখান থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিই। কাছাকাছি আমাদের আত্মীয়-বন্ধু যাঁরা থাকেন তাঁদের কাছে একের পর এক খোঁজ নিতে থাকি। কোথাও ওদের দেখা পাই না।

– তার মানে কালকের কাগজে এই হত্যাকাণ্ডের খবরটা ছাপা হলে আর তোমাকে পুলিসে অ্যারেস্ট করলে বেশ কিছু সাক্ষী পুলিস যোগাড় করতে পারবে, যারা কাঠগড়ায় উঠে বলবে তুমি ট্যাক্সি নিয়ে তোমার দিদি-জামাইবাবুকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলে?

– তাই বলছি, আপনি, স্যার, দিদিকে রিপ্রেজেন্ট করুন।

– দাঁড়াও, দাঁড়াও, আগে সবটা শুনি। প্রথমে বল – পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক জবাব দাও – তুমি জীবন হালদারকে খুন করনি?

– কী বলছেন আপনি? না, নিশ্চয় না।

– তুমি কি তোমার দিদি অথবা জামাইবাবুর সাক্ষাৎ পেয়েছ তারপর?

– আজ্ঞে না।

– তাহলে তোমার কাছে যন্ত্রটা এল কী করে?

– সে কথাই তো বলছিলাম, আপনি মাঝখানে থামিয়ে দিলেন।

– অল রাইট। বাকিটা বল, কিন্তু খুব সংক্ষেপে।

– ট্যাক্সি করে যখন ওদের এখানে-ওখানে খুঁজছি তখন হঠাৎ খেয়াল হল যে, রাত সাড়ে ন’টায় আপনার বাড়িতে আসার কথা। সে সময় আমি গড়িয়াহাটাতেই। তাই ট্যাক্সিটাকে ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আপনাকে টেলিফোনে জানাতে চাই যে, বিশেষ কারণে সাড়ে নয়টায় আমি আসতে পারিনি। আপনি তখন বাড়িতে ছিলেন না। রাত তখন নটা চল্লিশ। মেসেজটা মিসেস বাসুকে দিই।

– রিভলভারটা কোথায় পেলে সেটা ঝটপট বল।

– রাত পৌনে দশটা নাগাদ আবার আমি যোধপুর পার্কের বাড়িতে পৌঁছাই। এবারও বাড়ি বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল। ওদের দু’জনের কেউই তখনো ফেরেনি। কিন্তু আশ্চর্য।দোতলায় বাতিটা জ্বলছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যখন প্রথমবার নির্জন বাড়িতে-আমি আসি, মানে যখন দেখি যে, বেড-সাইড লকারে রিভলভারটা নেই, তখন ঘর ছেড়ে যাবার আগে আমি সুইচটা অফ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসি। সিঁড়ির উপরে-নিচে সুইচ আছে। তাই নিচে নেমে এসে সিঁড়ির আলোটাও নিবিয়ে দিই। তাই আমি খুব অবাক হয়ে যাই। আলোটা আবার জ্বলে উঠল কী করে? আমি ভাবলাম…

– তুমি কি ভাবলে তা আমি জানতে চাই না কাকলি, তুমি পর পর কী করলে তাই শুধু বলে যাও…অ্যান্ড বি স্ন্যাপি। সময় খুব কম।

কাকলি বলে, – এরপর সে পুনরায় তার চাবি দিয়ে সদর খোলে। সিঁড়ির আলো জ্বালে। উপরে ওঠে। ওদের ফ্ল্যাটে সদর এখনো খোলা পড়ে আছে। ও ঘরে ঢোকে। আলোটা জ্বলছে। দু’একবার দিদিকে ডাকে। কেউ সাড়া দেয় না। ও লক্ষ্য করে দেখে দিদির কিছু জামা-কাপড় খাটের উপর পড়ে আছে। যা আগের বার ছিল না। ও এগিয়ে এসে আবার লকারটা খোলে। দেখতে পায় এবার রিভলভারটা রয়েছে। কাকলি যন্ত্রটা হাতে তুলে নেয়। চেম্বারটা খুলে দেখে পাঁচটা তাজা বুলেট ভরা আছে, কিন্তু ট্রিগারের সামনে চেম্বারটা ফাঁকা। কাকলি ওটার গন্ধ শুঁকে দেখে। বেশ বোঝা যায়, কিছুক্ষণ আগেই যন্ত্রটা ব্যবহার করা হয়েছে। বারুদের গন্ধ তখনো লেগে রয়েছে। ও যন্ত্রটা ওভারকোটের পকেটে ভরে নেয়। সোজা চলে আসে নিউ আলিপুরে বাসু-সাহেবের বাড়িতে।

– তার মানে ওটাতে তোমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাবে?

– তা তো যাবেই।

– তোমার ধারণা তোমার দিদি ঐ বুলেটটা ছুঁড়েছে?

– না! যাদুগোপাল ওটা ব্যবহার করেছে।

কাকলির বিশ্বাস, বিকালে সে যখন যাদুগোপালের সঙ্গে ঝগড়া করেছিল তখন সিঁড়ির মুখে এগিয়ে জয়া সেটা শুনেছে। তারপর কী হয়েছে বলা মুশকিল; কিন্তু ওর বিশ্বাস যাদুগোপাল স্ত্রীর লকার থেকে রিভলভারটা তুলে নিয়ে মোমিনপুরের দিকে রওনা দেয় রাত সাড়ে আটটা নাগাদ। তার মোটর সাইকেলের শব্দে জয়া সেটা টের পায়। ও নিজের গাড়ি নিয়ে যাদুগোপালের পিছু নেয়। এ-ছাড়া গ্যারেজ এবং লকার শূন্য থাকার আর কোনো যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা হতে পারে না। তারপর ওদের মধ্যে যে কোনও একজন ফিরে এসে রিভলভারটা ঐ লকারে রেখেছে। কাকলির ধারণা, গুলিটা করেছে যাদুগোপাল, কিন্তু জয়া সেটা জানে।

– তুমি চাও, আমি জয়ার প্রক্ষে থাকি? জয়া আমার ক্লায়েন্ট?

– হ্যাঁ, তাই।

– তার মানে, জয়াকে বাঁচাতে গিয়ে যদি অপরাধটা তোমার দিকে ঠেলে দিতে হয় তাহলে আমি দ্বিধা করব না। কেমন?

– হ্যাঁ, তাই। আমি নিজেকে রক্ষা করতে জানি। পারব। দিদি অসুস্থ, ওকে যদি পুলিস ধরে, জেরা করে, কাঠগড়ায় তোলে, তাহলে ও হার্টফেল করেই মারা যাবে। আপনি শুধু ওর ইন্টারেস্টটা দেখুন। আমি নিজেরটা দেখব।

বাসু-সহেব হঠাৎ প্রশ্ন করেন, কাকলি, তুমি ‘প্যারাফিন-টেস্ট’ কথাটা কখনো শুনেছ?

– ‘প্যারাফিন-টেস্ট’? না শুনিনি। প্যারাফিন জানি। একটা হাইড্রোকার্বন। গলানো মোমজাতীয় পদার্থ। ‘টেস্ট’ তো পরীক্ষা। দুটো মিলিয়ে…

– শোন বুঝিয়ে বলি, কেউ যদি একটা রিভলভার ছোঁড়ে তাহলে কিছুটা বারুদ ব্যাকফায়ার করে পিস্তল-ব্যবহারকারীর হাতে-চামড়ার খাঁজে খাঁজে ঢুকে যায়। সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেললেও এবং চোখে দেখা না গেলেও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় বলে দেওয়া যায়-কেউ সম্প্রতি একটা রিভলভার ব্যবহার করেছে কি না।

– কেমন করে?

– ঐ ‘প্যারাফিন টেস্ট’ করে। রিভলভার ব্যবহার করার তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে যদি পরীক্ষা করা যায়, তাহলে তথ্যটা ধরা পড়ে। প্রথমে গলানো প্যারাফিন সন্দেহভাজন ব্যক্তির হাতে ঢেলে দেওয়া হয়। তারপর পাতলা একটা তুলোর প্রলেপে হাতটা ঢেকে দেওয়া হয়। তারপর প্যারাফিনটা ‘সেট’ করে গেলে খুব সাবধানে তুলোর ব্যান্ডেজটা গুটিয়ে নেওয়া হয়। হাতে চামড়ায় যে-সব অদৃশ্য বারুদের টুকরো গেঁথে গিয়েছিল তা ঐ প্যারাফিনের সঙ্গে উঠে আসে। তার পর একটা রাসায়নিক ‘রি-এজেন্ট’ ঐ প্যারাফিনে ঢেলে দেওয়া হয়। একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়– বারুদের নাইট্রেট-কণা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে…

– আপনি এসব কথা আমাকে বলছেন কেন?

– বলছি এজন্য যে, জয়া যদি রিভলভারটা না ব্যবহার করে থাকে তাহলে যত শীঘ্র সে ধরা পড়ে ততই ভাল। এখনি ‘প্যারাফিন-টেস্ট’করে বলে দেওয়া যায় যে, চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে সে কোনও রিভলভার ছোঁড়েনি।

– কিন্তু..কিন্তু ধরুন যদি সে রিভলভারটা ছুঁড়ে থাকে? আই মীন আত্মরক্ষার্থে?

– ভুলে যেও না কাকলি, গুলিটা জীবন হালদারের পিঠের দিক দিয়ে ঢুকেছে। তার মানে সে পিছন ফিরে ছিল। আত্মরক্ষার দাবিটা খুব জোরদার হবে না।

– তা হলে কী হবে?

– সেটা সহজবোধ্য। যদি পুলিস রিভলভারটা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, আর দেখা যায় যে, প্রথমত তার একটা গুলি সম্প্রতি ফায়ার করা হয়েছে; যদি টেস্ট-ফায়ারিং করে পুলিস প্রমাণ করতে পারে, দ্বিতীয়ত, যে, যে-গুলিটা জীবন হালদারের পিঠ দিয়ে ঢুকে হৃদপিণ্ডে বিদ্ধ হয়েছে সেটা ঐ রিভলভার থেকে নিক্ষিপ্ত, এবং যদি পুলিস প্যারাফিন-টেস্টে প্রমাণ করতে পারে, তৃতীয়ত, যে, তোমার দিদির হাতের আঙুলে বারুদ রয়েছে; এবং, চতুর্থত, যদি আমি তোমার দিদির ডিফেন্স-কাউন্সেলার হিসাবে আদালতে উঠে দাঁড়াই, তাহলে নিরঞ্জন মাইতি একটা ডিনার থ্রো করবে।

– বুঝলাম না। নিরঞ্জন মাইতি কে?

– পাবলিক প্রসিকিউটর। কারণ অনেক-অনেক দিনের অপূর্ণ ইচ্ছাটা তার পূরণ হবে। আমি কেস-এ হারব। তোমার দিদির ফাঁসি না হলেও যাবজ্জীবন হয়ে যাবেই।

কাকলি তার নিঃশেষিত কফি-কাপটা নামিয়ে রাখল। হাত বাড়িয়ে টি-পয় থেকে রিভলভারটা উঠিয়ে নিল। বলল, আমার মনে হয় আমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট এটায় থাকা ঠিক নয়। তাই না?

বাসু বলেন, আমি কী বলৰ? আমি তো তোমাকে রিপ্রেজেন্ট করছি না। করছি তোমার দিদিকে।

– ঠিক বলেছেন। যা করবার তা আমাকেই করতে হবে।

সে আঁচল দিয়ে আঙুলের দাগ মুছে দিতে যায়।

বাসু বলেন, সাবধান। ওটা কিন্তু লোডেড। তোমার আঙুল ট্টিগার স্পর্শ করে আছে। ঠিক তখনই পাড়া কাঁপিয়ে একটা পুলিস-গাড়ির সাইরেন বেজে উঠল। বাসু বললেন, যা আশঙ্কা করছিলাম। ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ এসে গেছে। ওটা থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে দেবার চেষ্টা…ও কী করছ? এই…এই…

কাকলি হঠাৎ জানলার দিকে রিভলভারটা তুলে ট্রিগার টেনে দিল।

মধ্যরাত্রির নৈঃশব্দ্য খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল।