এক
ইন্টারকমে ভেসে এল রানী দেবীর কণ্ঠস্বর, তোমার সঙ্গে একজন দেখা করতে চাইছে।
বাসু-সাহেব একটি এফিডেবিটের ড্রাফট সংশোধন করছিলেন। ইন্টারকমেই জানতে চান, ‘চাইছে’বললে যখন, তখন নিশ্চয় অল্পবয়সী। ছেলে না মেয়ে?
– দ্বিতীয়টা।
– বিবাহিতা না কুমারী?
– চাবিটা তো তোমার বাঁ-দিকের ড্রয়ারে আছে।
– চাবি! কিসের চাবি?
– আচ্ছা, আসছি আমি।
একটু পরেই হুইল-চেয়ারে পাক মেরে রানী এ ঘরে চলে আসেন। মানে, ব্যারিস্টার পি.কে. বাসুর খাশ-কামরায়। উনি ইনভ্যালিড-চেয়ারেই সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ান। কারণ তিনিই ব্যারিস্টার-সাহেবেররিসেপশনিস্ট তথা জীবনসঙ্গিনী।
রানী দরজা খুলে এ ঘরে এলেন। অটোমেটিক ডোর-ক্লোজারের অমোঘ আকর্ষণে একপাল্লার ফ্লাশপাল্লা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। বাসু জানতে চান, চাবির কথা কী বলছিলে? চাবি তো হারায়নি কিছু?
রানী মুখে আঁচল চাপা দেন। হাসির দমক একটু কমলে বলেন, একে ব্যারিস্টার, তায় গোয়েন্দা! চাবির রহস্যটা ধরতে পারলে না? সাক্ষাৎপ্রার্থিনী আমার সামনেই বসে আছে। তার নাকের ডগায় বসে কোন আক্কেলে বলি, শুধু বিবাহিতা নয়, সদ্য বিয়ের জল পাওয়া কনে! অষ্টমঙ্গলা পার হয়েছে কি হয়নি!
বাসু-সাহেব পকেট থেকে পাইপ-পাউচ বার করতে করতে বলেন, কীভাবে এ সিদ্ধান্তে এলে?
– ওটা বোঝা যায়, বোঝানো যায় না।
– তবু?
– রাতে ভালো ঘুম হয়নি, মুখটা ফুলো ফুলো– বাঁ হাতের অনামিকায় যে আংটি পরেছে সেটায় অভ্যস্ত হয়নি, বারে বারে ডান হাতের আঙুল দিয়ে পাকাচ্ছে। সিঁথিতে সিঁদুর পরার ঢংটা দেখেও বোঝা যায়, অভ্যস্ত হাতের কাজ নয়। তাছাড়া ও পুরুষমানুষ বুঝুক না বুঝুক, আমরা দেখলেই বুঝতে পারি।
– কী নাম?
– শিখা দত্ত।
– কী চায়?
– সে কথা শুধু তোমাকেই বলতে চায়। কী-সব লিগ্যাল অ্যাডভাইস।
– ঠিক আছে। পাঠিয়ে দাও। কৌশিক আর সুজাতা কোথায়?
– ওরা দু’জনেই বেরিয়েছে। আচ্ছা, মেয়েটিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
তে-চাকা গাড়িতে পাক মেরে রানী চলে গেলেন পাশের ঘরে। যেটাকে গৌরবে বলা হয় রিসেপশান কাউন্টার। শুধু বাসু-সাহেবের নয়, ও পাশের উইং-এ ‘সুকৌশলী’-র রিসেপশান অফিসও ওইটাই।
একটু পরে দরজায় কেউ নক করল।
– ইয়েস। কাম ইন, প্লিজ।
ভিতরে এল মেয়েটি। সপ্রতিভভাবে নমস্কার করল। বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ। আহা-মরি সুন্দরী কিছু নয়, তবে স্বাস্থ্যবতী, যৌবনের চটক আছে। দীর্ঘাঙ্গী। দেহসৌষ্ঠবও ভালো। লালচে রঙের একটা মুর্শিদাবাদি পরেছে, ম্যাচ করা ব্লাউজ। খুব সম্ভব রানী দেবীর অনুমান নির্ভুল: সদ্যোবিবাহিতা। কিন্তু ওর চোখে কুমারী মেয়ের ভীরু সরলতা। হাত তুলে নমস্কার করল বটে, চোখ তুলে তাকাতে পারল না।
– বোস ওই সোফাটায়। বল শিখা, কী তোমার সমস্যা?
বসল। কিন্তু এখনও চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। আঁচলের প্রান্তটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বললে, আজ্ঞে না, সমস্যাটা আমার নয়, আমার বন্ধুর, মানে বান্ধবীর–
– আই সী! কী সমস্যা তোমার বন্ধুর, মানে বান্ধবীর?
– আমার বান্ধবীর স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল। অনেকদিন আগে। শুনেছি, ‘লিগ্যাল ডেথ’ বলে একটা কথা আছে– মানে, যখন ওই রকম নিরুদ্দিষ্ট মানুষকে আইনত মৃত বলে ধরা হয়-সেটা কত বছর?
বাসু-সাহেব সে-প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলেন, বয়স কত?
– কার? আমার বান্ধবীর?
– না। তোমার?
শিখা একটু নড়েচড়ে বসল। হ্যান্ডব্যাগটা এতক্ষণ রাখা ছিল ওর কোলের ওপর। এবার সেটাকে সোফার পাশে নামিয়ে রাখল। তারপর বলল, সাতাশ।
– তুমি যে বিবাহিতা তা তো দেখতেই পাচ্ছি, আমার সেক্রেটারির অনুমান: তুমি সদ্যোবিবাহিতা।কতদিন বিয়ে হয়েছে তোমার?
এতক্ষণে মেয়েটি চোখে চোখে তাকায়। বলে, প্লিজ স্যার, আমার প্রসঙ্গ থাক। আমার নাম, বয়স, ইত্যাদি সব কিছুই ফালতু কথা। আমি আগেই আপনাকে বলেছি যে, আমার এ সাক্ষাৎকার আমার এক বান্ধবীর তরফে। সে নিজে আসতে পারছে না বলেই আমাকে পাঠিয়েছে।
বাসু বললেন, রানু– মানে আমার সেক্রেটারি– বাই দ্য ওয়ে, উনি আমার বেটার-হাফও বটেন – এসব বিষয়ে সচরাচর ভুল করে না। ও বলছিল, তোমাদের অষ্টমঙ্গলা হয়েছে-কি-হয়নি। তোমরা হানিমুনে যাওনি কোথাও? মধুচন্দ্রিমায়?
মেয়েটি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে দেড়-মুহূর্ত নীরবে নিজেকে সংযত করল। তারপর একেবারেনিরুত্তাপকণ্ঠে বলতে থাকে, আমার বান্ধবীর স্বামী হরিদ্বার থেকে বদ্রিনারায়ণ যাচ্ছিল। অনেকদিনআগে। যাত্রীবাহী বাসটা খাদে পড়ে যায়। পুলিশ রিপোর্টে জানা যায় যে, পেট্রল ট্যাঙ্কে আগুন ধরে বহু লোক জীবন্ত দগ্ধ হয়। বহু যাত্রীর দেহ শনাক্ত করা যায়নি। কিন্তু যাত্রীর তালিকায় – মানে অফিসেযে টিকিট বিক্রি হয়েছিল তার কাউন্টার ফয়েলে – আমার বান্ধবীর স্বামীর নাম ছিল। তারপর আর তাকে কেউ দেখেনি…
– কতদিন আগে?
– বছরসাতেক।
– এই সাত বছরের মধ্যে নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির জীবিত থাকার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি? কেউকখনও তাকে দেখেনি, বা তার চিঠি পায়নি?
– হ্যাঁ, তাই।
– তোমার বিয়ে হয়েছে কবে?
– প্লিজ, স্যার – আমাকে রেহাই দিন! আপনাকে বারে বারে একই কথা শোনাতে আমারইবিরক্ত লাগছে, আপনারও নিশ্চয় তাই। আবার বলি, আমি এসেছি আমার বান্ধবীর তরফে।
– আমার মনে হচ্ছে নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির কিছু জীবনবীমা করা ছিল, আর তার স্ত্রী ইনসিওরেন্সকোম্পানি থেকে টাকাটা আদায় করতে পারছে না, যেহেতু সে ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ দেখাতে পারছেনা। তাই কি?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ তাই। সেটাও একটা সমস্যা।
– একটা সমস্যা! তাহলে মূল সমস্যাটা কী?
– আমার বান্ধবী জানতে চায়, সাত বছর যখন অতিক্রান্ত তখন সে কি আইনত বিধবা নয়? সে কি আবার বিয়ে করতে পারে? আইনত?
– ঠিক কতদিন আগে বাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল?
– সাত বছরের চেয়ে দু-তিন মাস বেশি। অবশ্য সে যখন…
মাঝপথেই মেয়েটি থেমে যায়।বাসু-সাহেব ওর অসমাপ্ত বাক্যের শব্দদুটি পুনরুচ্চারণ করেন একটাজিজ্ঞাসা চিহ্নের লেজুড় জুড়ে দিয়ে, ‘অবশ্য সে যখন…?’
– সে যখন এই নতুন ছেলেটির সঙ্গে পরিচিত হয়…মানে, যাকে সে এখন বিবাহ করতেচাইছে…অর্থাৎ সে যদি আইনত বিধবা হয়…
বাসু নীরবে পাইপে কয়েকটা টান দিয়ে বললেন, তোমার বান্ধবীর আর কোনও কিছু জিজ্ঞাস্য নেই?– আছে…মানে, সে একটা আইনের লব্-এর প্রকৃত অর্থটা জানতে চায়…আমাকে জেনে যেতে বলেছে…অবশ্য নিছক কৌতূহল…
– ‘আইনের লব্ধ’? কী কথাটা?
– Corpus delicti…কথাটার মানে কী?
বাসু-সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। কুঞ্চিত ভ্রূভঙ্গে প্রশ্ন করলেন, তোমার বান্ধবী হঠাৎ ওই ল্যাটিনশব্দটার অর্থ জানতে কৌতূহলী হলেন কেন?
– না, মানে…আসলে সে জানতে চেয়েছে…এটা কি আইনের নির্দেশ যে, হত্যাপরাধে কাউকেঅপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করতে হলে মৃত ব্যক্তির মৃতদেহের অস্তিত্বটা প্রসিকিউশনকে প্রমাণ করতেহবে?
– সেটাই বা তোমার বান্ধবী জানতে চাইছেন কেন?
– একটা গোয়েন্দা গল্পে তাই লেখা হয়েছে। কথাটা কি ঠিক?
বাসু মুখ থেকে পাইপটা সরিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, বুঝলাম। তার মানে এটাই দাঁড়াচ্ছে যে, তোমার বান্ধবী চাইছেন তাঁর মৃত স্বামীর দেহের অস্তিত্বটা প্রমাণিত হোক, যাতে এক নম্বর: তিনি ইনসিওর করা টাকাটা আদায় করতে পারেন, দু-নম্বর: সদ্যোপরিচিত পাণিপ্রার্থীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন, এবং, একই সঙ্গে, তোমার বান্ধবী চাইছেন, যেন তাঁর নিরুদ্দিষ্ট স্বামীর মৃতদেহের অস্তিত্বটা পুলিসে না প্রমাণ করতে পারে, কারণ সেক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে স্বামীহত্যার মামলা দায়ের করা যেতে পারে। মোদ্দা ব্যাপারটা তো এই?
মেয়েটি যেন ইলেকট্রিক শক খেয়েছে। সোজা হয়ে উঠে বসে বলে, এসব কী বলছেন আপনি?..বাঃ! ‘Corpus delicti’ কথাটার মানে তো সে জানতে চেয়েছে অ্যাকাডেমিক্যালি, মানে একটা গোয়েন্দা গল্পে…
বাসু একটা হাত তুলে ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। বললেন, একটা কথা বুঝিয়ে বলো তো? তোমার বান্ধবী কি আমার স্ত্রীর মতো হুইল-চেয়ারব্যবহার করেন? তিনি কি প্রতিবন্ধী?
– না, তা হতে যাবে কেন?
– তাহলে তাঁকে বল, আমার সেক্রেটারির সঙ্গে টেলিফোনে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিজেই চলে আসতে। দেখ শিখা, Corpus delicti শব্দের অর্থ তোমার বান্ধবী না জানলেও তাঁর ক্ষতি নেই; কিন্তু প্রতিটি মানুষের জানা উচিত যে, ডাক্তারের কাছে রোগের উপসর্গ আর সলিসিটারের কাছে সত্য ঘটনা গোপন করতে নেই। তাঁর সমস্যার কথা তিনিই যেন স্বয়ং এসে আমাকে সরাসরি জানান।
মেয়েটি রুখে ওঠে, কিন্তু কেন? আমি তার প্রতিনিধি, তার তরফে আমি জানতে এসেছি– সেইআমাকে পাঠিয়েছে। এক্ষেত্রে…
– ক্লায়েন্টের নামধাম না জেনে আমি কখনও কাউকে লিগ্যাল অ্যাডভাইস দিই না। তোমার বান্ধবীইনভ্যালিড নন একথা তুমি বলেছ। আশা করি তিনি পর্দানসিনও নন। তাঁকে স্বয়ং আসতে বল, কেমন? মেয়েটি কী একটা কথা বলতে গেল। বলল না। হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তার মুখচোখ লাল হয়ে উঠেছে। অপমান, অভিমান, না উত্তেজনায় বোঝা গেল না। কোনো কথা না বলে গট্টগট্ করে এগিয়েগেল দরজার দিকে। বাসু-সাহেবের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়নি। তিনি প্রতিমুহূর্তেই আশা করছিলেন, মেয়েটির সুবুদ্ধি হবে, সে থমকে দাঁড়াবে। ফিরে আসবে। তা সে এল না। একবার পিছন ফিরে তাকালো না পর্যন্ত। মাথা খাড়া রেখেই সে ঘর ছেড়ে বার হয়ে গেল।
বাসু-সাহেবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বিষণ্ণভাবে তিনি আপন মনেই মাথা নাড়লেন। দু-হাতের কনুই গ্লাসটপ টেবিলে রেখে দু-হাতে মুখটা ঢাকলেন।
– কী হল? এত তাড়াতাড়ি শিখা চলে গেল যে?
চোখ তুলে দেখলেন, নিঃশব্দে কখন রানী প্রবেশ করেছেন ঘরে।
– ও কিছুতেই স্বীকার করল না, সমস্যাটা ওর নিজের। ভেবেছিলাম, ও ভেঙে পড়বে, মন খুলে সব কথা বলবে। আমি ওর বাবার বয়সী, কিংবা তার চেয়েও বড়ো। কিন্তু মেয়েটা আমার কাছে মন খুলে সব কথা বলল না। ভারি জেদী মেয়ে। আত্মসম্মান জ্ঞানটা প্রখর।
– ও যে বিয়ের কনে এখনও, অন্তত সেটুকু স্বীকার করেছে?
– মা! কেন করবে? সমস্যাটা যে ওর ‘বান্ধবী’র। ওর কথা যতবার তুলতে গেলাম ততবারই বাধা দিল। ওর নাম যে ‘শিখা দত্ত’ নয় এটা নিশ্চিত। নাম ভাঁড়িয়ে ও এসেছিল, কিছু আইনের ব্যাখ্যা জেনে যেতে। ভেবেছিল সেটুকু হাতিয়ার দখলে পেলে ও নিজেই ওর প্রথম পক্ষের স্বামীর সঙ্গে লড়তে পারবে! কিন্তু ওভাবে কোনও ক্লায়েন্টকে আমি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়তে দিতে পারি না-মেয়েটা সে কথা বুঝল না!
– ওর প্রথম পক্ষের স্বামী? ও বলেছে?
– ও বলবে কেন? সেটা তো এখন সূর্যোদয়ের মতো স্বয়ংপ্রকাশ! সাত বছর আগে ওর প্রথম পক্ষের স্বামী একটা বাস-অ্যাকসিডেন্টে মারা যায় – অন্তত এটাই ছিল ওর ধারণা! সেই বিশ্বাসে ও বোধকরি ভালোবেসে সম্প্রতি বিয়ে করেছে– সাত বছরের বৈধব্য জীবন অতিক্রম করে। আর তার পরেই ও জানতে পেরেছে ওর প্রথম পক্ষের স্বামী জীবিত।
– তাহলে? এ সব কথা সে বলেনি?
– কিছুই বলেনি। এ সবই আমার অনুমান। ও তো শুধু ওর বান্ধবীর কথা শোনাতে এসেছিল।ব্যাকুলকণ্ঠে রানী জানতে চান, তুমি যা অনুমান করছ তার ফলে কী হবে?
– তা কেমন করে জানব রানু। প্রথম কথা, সাত বছর ওর স্বামী আত্মগোপন করে রইল কেন? অ্যামনেশিয়া? মানে স্মৃতিভ্রংশ? নাকি, সে প্রতীক্ষায় ছিল কতদিনে মেয়েটি আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় – কারণ তারপর থেকেই যে তার ব্ল্যাকমেলিঙের খেলা শুরু করতে পারবে।
– কিসের ব্ল্যাকমেলিং?
– বাঃ! প্রথম স্বামী জীবিত আছে এটা প্রমাণিত হলেই তো তার দ্বিতীয় বিবাহ অসিদ্ধ! ভালোবেসে যদি বিয়ে করে থাকে তাহলে বাকি জীবন তাকে গহনা বেচে বেচে. প্রথম পক্ষের স্বামীকে টাকা জুগিয়ে যেতে হবে!
– কী সর্বনাশ! তাহলে তোমার ক্লায়েন্ট…
– কে আমার ক্লায়েন্ট? ওই একগুঁয়ে জেদী মেয়েটা? যার নাম পর্যন্ত আমি জানি না? যে আমাকে বিশ্বাস করে মন খুলে তার সমস্যার কথা বলতে পারল না? বাপের বয়সী…
বাধা দিয়ে রানী বলে ওঠেন, ‘শিখা দত্ত’ ওর নাম হোক না হোক, সে তোমার ক্লায়েন্ট তো বটেই।ওই নামেই তো রসিদটা কেটেছি আমি!
এবার বাসু-সাহেবের ইলেকট্রিক শক খাবার পালা।
ধীরে ধীরে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি: কী? কী বললে? রসিদ? রিসিট? তুমি কি ওর কাছ থেকে কিছু রিটেইনার নিয়েছ? টাকা নিয়েছ?
– হ্যাঁ। মেয়েটি নিজে থেকেই একটা একশো টাকার নোট আমার টেবিলে রেখে দিয়ে বললে, এটা রাখুন। আমার রিটেইনার! আমি ওঁর কাছ থেকে কিছু লিগ্যাল অ্যাডভাইস নিতে এসেছি!
– মাই গড! দেন…দেন শী ইজ মাই ক্লয়েন্ট! অগ্রিম টাকা দিয়ে সে আমার কাছে পরামর্শ চাইতে এসেছিল। আর আমি তাকে নিয়ে শুধু ব্যঙ্গ করেছি, তার আত্মাভিমানে আঘাত করে…ছি! ছি! ছি!
অশান্তভাবে ঘরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত একবার পদচারণা করেই থমকে থেমে পড়েন। বলেন, ওকে খুঁজে বার করতেই হবে। ও প্রচণ্ড বিপদে পড়েছে। ওকে রক্ষা করা আমার ধর্ম…
প্রৌঢ় মানুষটি প্রায় ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইলেন ঘর ছেড়ে।
প্রায় ধাক্কা লাগার মত অবস্থা। সেদিক থেকে ঘরে ঢুকছিল কৌশিক। বললে, কী ব্যাপার? কাকে খুঁজছেন?
– একটি মেয়ে। রানী-কালারের মুর্শিদাবাদি শাড়ি – অ্যারাউন্ড পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি – বয়স সাতাশ–
– হ্যাঁ, সে চলে গেছে। আমি যখন গেট খুলে ঢুকছি, তখনই। একটা ফোর-ডোর মারুতি-সুজুকিচালিয়ে। মেয়েটি অবশ্য জানে না যে, একজন অ্যামেচারিশ গোয়েন্দা তাকে ফলো করছে…
– তুমি কি করে জানলে?
– গোয়েন্দাটা ছিল ওই মিষ্টির দোকানের কাছে। একটা জিপে। আপনার ক্লায়েন্ট মারুতিতে স্টার্টদেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেও জিপটা চালু করে। মেয়েটির পিছন পিছন সেও চলে গেল-প্রায় বিশ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে।
– এটা একটা কোয়িন্সিডেন্সও তো হতে পারে।
– না পারে না। মেয়েটিকে দেখার আগে – ইন ফ্যাক্ট, সে আপনার চেম্বার থেকে বের হবার আগেই ওই জিপের ড্রাইভারটিকে আমার নজরে পড়ে। তখন আমি বাড়ি থেকে প্রায় ত্রিশ মিটার দূরে। লোকটার হাতে একটা বাইনোকুলার ছিল। দৃষ্টি আপনার ঘরের দিকে। মেয়েটি আপনার ঘর ছেড়ে বার হওয়া মাত্র সে বাইনোটা ঝোলা ব্যাগে ভরে নেয়।
– সে লোকটা কি জানে যে, তুমি তাকে লক্ষ্য করেছ?
– জানি না, কিন্তু এটুকু তার বিশ্বাস আছে যে, ভবিষ্যতে তাকে আমি শনাক্ত করতে পারব না। কারণ ওর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, গোঁফ, টুপি, গগ্ল সব কিছুই টিপিক্যাল অ্যামেচারিশ গোয়েন্দার ছদ্মবেশ!
কৌশিককে সঙ্গে নিয়ে বাসু-সাহেব ফিরে এলেন তাঁর চেম্বারে।
নজরে পড়ে, রানী তাঁর চাকা-দেওয়া চেয়ারে বসেই মেঝে থেকে কী একটা জিনিস তুলবার চেষ্টা করছেন। পারছেন না।
– কী করছ তুমি?
রানী সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, তোমার ক্লায়েন্ট একটা ব্যাগ ভুলে ফেলে গেছে।
এতক্ষণে নজরে পড়ে। যে ভিজিটার্স-সোফায় মেয়েটি বসেছিল তার পাশে পড়ে আছে একটা লেডিজ-ব্যাগ। কৌশিক সেটা সাবধানে তুলে আনে। বাসু-সাহেবের হাতে দেয়। বাসু নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। একটা প্যাড আর ডট পেন রানীর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, লেখ–
– কী লিখব?
– ইনভেন্ট্রি। লেডিজ হাতব্যাগে কী কী পাওয়া গেল তার তালিকা।
সাবধানে ব্যাগ থেকে একটি একটি করে গচ্ছিত সম্পদগুলি তাঁর গ্লাসটপ টেবিলে সাজিয়ে রাখতে রাখতে ঘোষণা করতে থাকেন: একটা লেসবসানো লেডিজ রুমাল, একটা পার্স– তাতে নোট আর খুচরোয় মিলিয়ে দুশো বাহাত্তর টাকা আশি পয়সা, লিপস্টিক একটা, কম্প্যাক্ট একটা। একটা ওষুধের শিশি – ভিতরে সাদা রঙের ট্যাবলেট। ওষুধের নাম ‘ইপ্রাল’। একটা বড় হাতলওয়ালা চিরুনি, টেলিগ্রামের খাম একটা। টেলিগ্রামের প্রাপক সি রায়, একুশের-এক বেণীমাধব সরকার লেন। টেলিগ্রামের বক্তব্য: ‘শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা হচ্ছে সময়ের শেষসীমা– কমলেশ…হঠাৎ মুখ তুলে বলেন, আজ কী বার?
– আজই তো শুক্রবার। কৌশিক জবাবে জানায়।
বাসু আবার ব্যাগের ভিতর হাত চালিয়ে দেন। তোয়ালে জড়ানো ভারী কী একটা ব্যাগের তলা থেকে উদ্ধার করে আনেন। সাবধানে তোয়ালের পাক খুলে বলে ওঠেন: দ্যাখো কাণ্ড!
তাঁর হাতে একটি ঝকঝকে ছোট্ট রিভলভার!
রানী আঁৎকে ওঠেন: কী সর্বনাশ!
বাসু নির্বিকার। বলে চলেন, লিখে নাও– পয়েন্ট থ্রি টু ক্যালিবারের কোন্ট অটোমেটিক। নাম্বার: থ্রি-সেভেন-ফাইভ-নাইন-সিক্স-টু-ওয়ান। ম্যাগাজিন চেম্বারে ছয়টা স্টিল-জ্যাকেট বুলেট। ব্যারেল সাফা। বারুদের গন্ধ নেই। ছ’টা বুলেটই তাজা।
প্রতিটি বস্তু নিজেই রুমাল দিয়ে সাফ করে অর্থাৎ আঙুলের ছাপ মুছে নিয়ে আবার ভরে রাখলেন। শুধু টেলিগ্রামখানা ভরে নিলেন নিজের পকেটে।
রানী বলেন, রিভলভার নিয়ে ঘুরছে কেন?
বাসু বলেন, খুনি বলে যখন আশঙ্কা করা যাচ্ছে না, তখন আত্মরক্ষার্থে নিশ্চয়।
কৌশিক বলে ওঠে, কলকাতা শহরে কেউ আত্মরক্ষার্থে রিভলভার নিয়ে ঘোরাফেরা করে না।
বাসু বলেন, তাহলে বোধহয় টিফিন বক্স নিতে গিয়ে ভুল করে রিভলভারটা ব্যাগে ভরেছিল।
রানী ধমক দেন, রসিকতা থাক। রিভলভার নিয়ে ঘোরাফেরা করার হেতু নিশ্চয় আছে। মেয়েটি জানে, তার সামনে প্রচণ্ড বিপদ আসতে পারে!
বাসু প্রসঙ্গটা অন্য দিকে মোড় ঘোরালেন, রানু, দেখতো মেয়েটি রেজিস্টারে নিজের কী ঠিকানা লিখেছে।
ব্যারিস্টার-সাহেবের সঙ্গে যারা দেখা করতে আসে – অর্থাৎ ক্লায়েন্ট হিসাবে– তাদের একটা রেজিস্টারে নাম-ধাম স্বহস্তে লিখতে হয়। স্বাক্ষরও করতে হয়।
সেই রেজিস্টার দেখে রানী বললেন, নামধাম ও যা লিখেছে তা হল: ‘শিখা দত্ত, একশ বত্রিশ নসিরাম পতিতুণ্ড সেকেন্ড বাই লেন।’
বাসু কৌশিকের দিকে ফিরে জানতে চান, চেন?
– শিখা দত্তকে?
– আরে না রে বাপু। কলকাতা শহরে নসিরাম পতিতুণ্ডের নামে কোনও রাস্তা?
কৌশিক নেতিবাচক মাথা নেড়েই থামে না। বইয়ের র্যাক থেকে কলকাতা শহরের পথনির্দেশিকা দেখে নিয়ে বলে, ‘সেকেন্ড বাই লেন’ দুরঅস্ত! ও নামে কোনও রাস্তাই নেই!
– অলরাইট! আমি একটু বেরুচ্ছি! একফোঁটা একটা মেয়ে এভাবে তেজ দেখিয়ে বেরিয়ে যাবে! ওকে খুঁজে বার করতেই হবে।
রানী বলেন, পৌনে তিনশো টাকার মায়ায় না হলেও ওই রিভলভারটার জন্য ওকে ফিরে আসতেই হবে।
বাসু-সাহেব পিঞ্জরাবদ্ধ শার্দুলের মতো ঘরময় পায়চারি করছিলেন। রানীর কথায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। বলেন, আসবে না! লিখে দিতে পারি। ভারি জেদী মেয়ে। ও জানে, আমার চেম্বারে ওর রিভলভারটা থাকাও যা, ব্যাঙ্ক ভল্টে থাকাও তাই। কিন্তু হতভাগিটা নিরস্ত্র হয়ে গেল যে–
কৌশিক প্রশ্ন করে, আপনি কোথায় যাবেন খোঁজ নিতে?
– সে কথা তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তুমি বরং লালবাজারে চলে যাও আমার গাড়িটা নিয়ে। রবিকে ধরো, রবি বোস, পুলিস ইন্সপেক্টর। আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে। তার মাধ্যমে দেখ, ওই রিভলভারটার লাইসেন্সি কে! ভালো কথা, গাড়ি দুটোর নম্বর নোট করে নিয়েছিলে?
– জিপের নম্বরটা টুকেছি; কিন্তু মারুতির নম্বরটা…
– টোকনি! কারণ সেটাই যে আমার বিশেষ প্রয়োজন!
– কী আশ্চর্য! আপনি খামোকা রাগ করছেন। দু-দুটো গাড়ি হুস-হুস করে বেরিয়ে গেল নাকের ডগা দিয়ে। ন্যাচার্যালি আমি শুধু পিছনের গাড়ির নম্বরটা টুকে নেবার সুযোগ পেয়েছি…আর তাছাড়া আমি কেমন করে জানব , ে আপনি আপনার ক্লায়েন্টের নাম-ধাম জানেন না?
বাসু-সাহেব ওর দিকে একটা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন।
