রিস্তেদারের কাঁটা – ১৭

সতের

সোমবার বেলা দশটায় বিচারক ঘোষ ঘোষণা করলেন: পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনাম স্মরণিকা সেনের মামলা শুরু হচ্ছে।

হরেন ঘোষাল চট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা বাও করে বলে, য়োর অনার! শুক্রবার মামলা যখন মুলতুবি হয় তখন ইন্সপেক্টর বরাটের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হচ্ছিল। ইফ দা কোর্ট প্লীজ, আমি ইন্সপেক্টর বরাটকে আর কয়েকটি ডাইরেক্ট প্রশ্ন করতে চাই।

বাসু বললেন, আমাদের আপত্তি নেই, য়োর অনার!

ইন্সপেক্টর বরাট সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়ালো। পূর্বদিনই তার হলফ নেওয়া ছিল।

হরেন ঘোষাল বললেন, এর আগের দিন সহযোগী ডিফেন্স-কাউন্সেল ঐ মোটেলের গ্যাস-পাইপ সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। আপনি সে সময় জানিয়েছিলেন, ঐ দাগী শর্ট-পীস পাইপটি মোটেলেই লাগানো আছে। আমি জানতে চাই, বর্তমান অবস্থাও কি তাই?

– আজ্ঞে না। শুক্রবার আদালত বন্ধ হবার পর আমি ঐ মোটেলেই যাই এবং একজন প্লাম্বারের সাহায্যে ঐ ছোট পাইপটি খুলে আনি। সেটি আমি আজ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।

– আপনি বলতে চান, তার পূর্বে বাজার থেকে ঐ মাপের একটি শর্টপীস কিনে সেখানে লাগিয়ে দিয়ে এসেছেন?

– ইয়েস, স্যার।

– এই পাইপটি খুলবার সময় কি আপনি যথোপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করেছেন, যাতে খুলবার সময় কোন নতুন দাগ না পড়ে?

– ইয়েস, স্যার। ‘শ্যাময়-লেদারে’ পাইপের টুকরোটা জড়িয়ে নিয়েছিলান।

বাসু আপত্তি জানান: অবজেকশন য়োর অনার অন দ্য গ্রাউন্ড দ্যাট নো প্রপার ফাউন্ডেশান হ্যাজ বিন লেইড!

জজ এতটু ঝুঁকে পড়ে বলেন, কী বলতে চাইছেন? শুক্রবার আপনিই তো বলেছিলেন যে, পাইপের টুক্‌াটা এভিডেন্স হিসাবে গ্রাহ্য হওয়া উচিত!

– তা বলেছিলাম। কিন্তু প্রসিকিউশন কী-ভাবে প্রমাণ করবেন যে, এটাই সেই পাইপের টুকরো? ইতিমধ্যে সাত-দশদিন কেটে গেছে। হয়তো চার-পাঁচজন আবাসিক ও ঘরে বাস করেছেন…

ঘোষ সাহেব বললেন্ ও! দ্যাটস্ এ টেকনিক্যালিটি! – তারপর বরাটের দিকে ফিরে প্রশ্ন করেন, এমন কোন সূত্র কি আপনার নজরে এসেছে যাতে আশঙ্কা হতে পারে যে, ঐ পাইপের টুকরোটা ইতিমধ্যে কেউ বদল করেছে?

– আজ্ঞে না। কোনমতেই না।

– আপনি প্রথমবার ঐ পাইপে ‘রেঞ্চ’-এর সূক্ষদাগ দেখতে পেয়েছিলেন একথা পূর্বেই বলেছেন। এবারও কি পাইপটা খোলার আগে সেই দাগগুলি দেখতে পেয়েছিলেন?

– ইয়েস স্যার!

– ভেরি ওয়েল! আদালত ঐ পাইপের টুক্রাটাকে এভিডেন্স হিসাবে গ্রহণ করছেন।

হরেন ঘোষাল যেন এক গোলে জিতছে। বললে ক্রস একজামিন!

বাসু প্রশ্ন করেন, ইন্সপেক্টর বরাট, আপনি কি পাইপটা খুলে এনে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন?

– আজ্ঞে না, দেখিনি। অন্য একটি মার্ডার কেস-এ আমি শনি-রবি দুদিনই খুব ব্যস্ত ছিলাম।তাছাড়া আমার মনে হল, আপনিই ও বিষয়ে বেশি আগ্রহী। আপনিই প্রথমে দেখুন।

বাসু পকেট থেকে একটি বড় অতসীকাচ বার করে পাইপের টুকরোটাকে পরীক্ষা করলেন। তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। দুটি বস্তুই তিনি ইন্সপেক্টর বরাটের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, আপনি এবার দেখুন। ভাল করে দেখুন!

বরাট হাত বাড়িয়ে পাইপের টুকরো আর ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা নিল। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরীক্ষা করল। বেশ দেখা যায়, সেও গম্ভীর হয়ে গেল হঠাৎ।

– কিছু দেখতে পেলেন?

বরাট নড়ে-চড়ে বসল। তারপর স্বীকার করল: রেন্চ-এর একটা দাঁত ভাঙা ছিল।

– যার অর্থ, যে রেঞ্চ দিয়ে ওটা খোলা হয়েছিল সেটা কোনক্রমে খুঁজে পেলে একটা মারাত্মক এভিডেন্স লাভ করবে পুলিস!

বরাট লজ্জিতভাবে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার আগে খেয়াল করা উচিত ছিল।

– প্রতিবাদিনীর যে গাড়িটি ‘সীজ’ করেছেন তার অ্যাডজাস্টেবল বড় রেঞ্চ কি আপনি আদালতে এনেছেন?

– আজ্ঞে না।

– সেটা আনাবার ব্যাবস্থা করবেন কি?

বরাট অসহায়ভাবে হরেন ঘোষালের দিকে তাকিয়ে দেখল।

ঘোষাল কিছু বলার আগেই বিচারক বললেন, সেটা আনতে পাঠান। দেখবেন, যেন কোনক্রমেই সাবস্টিটুশন না হয়!

ঘোষাল বলল, প্রসিকিউশন রেস্টস্, য়োর অনার!

জজ প্রশ্ন করেন, প্রতিবাদীর কোন সাক্ষী আছে?

– আছে, য়োর অনার! প্রতিবাদীর এক নম্বর সাক্ষী: শ্রীসত্যানন্দ সেন।

– হোয়াট!! -আঁৎকে ওঠে হরেন ঘোষাল।

বাসু তার দিকে ফিরে বললেন, কী হল? চমকে উঠলেন কেন? আমি বলেছি: আমার এক নম্বর সাক্ষী শ্রীসত্যানন্দ সেন।

নকিব সে-নাম ঘোষণার আগেই ট্রায়াল ডেপুটি হরেন ঘোষাল লাফিয়ে ওঠে, ইফ দ্য কোর্ট প্লীজ, এটা প্রসিকিউশনের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত! আমি ব্যাপারটা পািিক প্রসিকিউটরকে জানাতে চাই। পনের মিনিটের রিসেস্ অনুমোদন করুন, হুজুর।

সেশনস্জজ বাদীর প্রার্থনামতো পনের মিনিটের জন্য মামলা মুলতুবি রাখতে স্বীকৃত হলেন। হরেন ঘোষাল দৌড়ালো আদালতের অপরপ্রান্তে পাকি প্রসিকিউটরকে খবরটা দিতে।

বাসু স্মরণিকার কাছে সরে এসে বললেন টুকু, তোমাকে একটা বিরাট ধাক্কা খেতে হবে এক্ষুনি! তা যে কী, তা আমি বলব না। কিন্তু সব কিছুর জন্যই প্রস্তুত থেকো।

টুকু সে-কথায় কর্ণপাত না করে বলল, এ কী করলেন মেসো! জেঠুকে কেন পাকড়াও করে আদালতে নিয়ে এলেন? ওরা এখনি তাঁকে ধরে নিয়ে যাবে। আবার সেই শান্তিধামে স্ট্র্য্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখবে!

বাসু মাথাটা নেড়ে বললেন, তুমি কি আমাকে ছেলেমানুষ প্রেয়েছ টুকু? কোর্ট-নিযুক্ত মনস্তত্ব-বিশারদ ডক্টর কৈলাশনাথ ইতিমধ্যে ওঁকে পরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, শ্রীসত্যানন্দ সেন মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি ছাড়া আরও দু-দুজন এক্সপার্টকে দিয়ে আমি দেখিয়েছি। আমি ‘ব্লাইন্ড’ খেলছি না, টুকু।আমার হাতে তিন-তিনটে টেক্কা! এ-পিঠ আমি তুলবই! এঁরা তিনজনেই বলেছেন, টাঁকশাল থেকে বেরিয়ে আসা ঝক্ককে টাকার মতোই উনি উজ্জ্বল বে-দাগ!

টুকুর চোখ দুটি জলে ভরে আসে। আনন্দে, আবেগে।

– এখানে চুপটি করে বসে থাক। আমি আসছি।

বাসু এ-পাশে সরে আসতেই ঘনিয়ে আসে রবি বসু। তাঁর কানে কানে কিছু বলে। উনি মাথা নেড়ে সায় দেন। বলেন, বি ভেরি ভেরি কেয়ারফুল! যা ঘটবার দেড়-দু ঘণ্টার মধ্যেই ঘটবে কিন্তু। যা দেখবে তার সাক্ষী রাখবে, এভিডেন্স রাখবে!

পনের মিনিট পরে যখন আদালত আবার বসল তখন দেখা গেল ট্রায়াল ডেপুটি হরেন ঘোষালকে সরিয়ে বাদীর পক্ষে মধ্যমণির আসনটি দখল করেছেন পার্লিক প্রসিকিউটর নিরঞ্জন মাইতি স্বয়ং। বিচারক শ্রীঘোষ সেটা লক্ষ্য করে বললেন, আপনি নিজেই এসেছেন দেখছি! বিশেষ কোন কারণ আছে নাকি?

– আছে, য়োর অনার! আমি প্রথমেই আদালতকে জানাতে চাই যে, প্রতিবাদিনী যদি বিলাসসিং যাদবকে হত্যা না করে থাকে তাহলে শ্রীসত্যানন্দ সেনের পক্ষে সে কর্মটি করা অসম্ভব নয়। তাই প্রথম থেকেই আমি স্বয়ং উপস্থিত থেকে বাদীপক্ষের মামলাটা পরিচালনা করতে চাই।

– ভেরি ওয়েল! আপনার প্রথম সাক্ষীকে ডাকুন, মিস্টার বাসু!

বাসুর আহ্বান-মতো বৃদ্ধ সত্যানন্দ সেন সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন। শপথবাক্য পাঠ করলেন। কিন্তু বাসু-সাহেবের প্রথম প্রশ্নটি উচ্চারিত হবার পূর্বেই নিরঞ্জন মাইতি বলে ওঠেন, জাস্ট এ মোমেন্ট! আমি চাই, এই সাক্ষীকে প্রথমেই সাবধান করে দেওয়া হোক যে, তিনি একক অথবা বর্তমান প্রতিবাদিনীর সঙ্গে যৌথভাবে বিলাসসিং যাদবের হত্যা-মামলার আসামী হতে পারেন। আমি চাই, আদালত ওঁকে সাবধান করে দিন, এখানে সাক্ষ্যদান-কালে তিনি যা বলবেন তা তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে পারবে!

বাসু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, য়োর অনার! আই অবজেক্ট! মিস্টার পাকি প্রসিকিউটার আদালতের অধিকারে হস্তক্ষেপ করছেন। সাক্ষী যাতে খোলা-মনে সাক্ষ্য দিতে না পারেন…

মাইতি কর্ণপাতমাত্র না করে একই নিশ্বাসে বলে চলেন, আর তাছাড়া, বর্তমান সাক্ষীর সাক্ষ্য দেবার অধিকারটাই প্রসিকিউশন চ্যালেঞ্জ করছে। তিনি একটি আদালত থেকে ‘ইনকম্পিটেন্ট’ রূপে চিহ্ণিত হয়েছেন। উনি যে অসুখে ভূগছেন তার নাম: ‘সেনাইল ডিমেনশিয়া’!

– আপনার বলা শেষ হয়েছে? – প্রশ্ন করেন বাসু।

– ইয়েস।

– য়োর অনার, আমি আদালতের কাছে আর্জি রাখব: পাবলিক প্রসিকিউটরকে অনুরোধ করতে দুটি বিকল্পের ভিতর যে কোন একটিকে বেছে নিতে। শ্রীসত্যানন্দ সেন যদি ‘ইন্ধম্পিটেন্ট’ হন, তাহলে আদালতের পক্ষে তাঁকে সাবধান করে দেওয়া নিরর্থক। আবার আদালত যদি ওঁকে সাবধান করে দেওয়াই মনস্থ করেন, তবে ধরে নিতে হবে যে সাক্ষী সাবধানবাণী শ্রবণে, প্রণিধানে সক্ষম। তিনি কম্পিটেন্ট। দুধ এবং তামাক দুটোই খাওয়া চলবে না।

দায়রা জজ হাসলেন। সাক্ষীর দিকে ফিরে বললেন, আদালত আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চায়, মিস্টার সেন!

– ইয়েস স্যার। করুন?

– আপনি বর্তমানে কোথায় আছেন বলুন তো?

– সাক্ষীর মঞ্চে। স্টেট ভার্সেস স্মরণিকা সেনের মামলায় ডিফেন্স কাউন্সেল আমাকে এক নম্বর সাক্ষী হিসাবে ডেকেছেন, তাই।

– আপনাকে কি কোন আদালত ‘ইন্কম্পিটেন্ট’ রূপে চিহ্নিত করেছে?

– করে থাকলে তা আমার অজ্ঞাতসারে। আমাকে আমার কয়েকজন অর্থগৃধ্ন আত্মীয় জোর করে একটা উন্মাদাশ্রমে ধরে নিয়ে যায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে নানান ঔষধ ও ইনজেকশন দেওয়া হয়। আমি ক্রমে ক্রমে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। ঠিক জানি না, হয়তো আমি সত্যিই পাগল হয়ে যেতাম। সে যাই হোক, ঐ অবস্থায় কোন আদালত যদি আমাকে ‘ইনকম্পিটেন্ট’ রূপে চিহ্নিত করে থাকেন তবে তা আমার অজানা।

বিচারক বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বলেন, আপনি কতদূর জানেন, সংক্ষেপে বলুন?

– সিটি কোর্টের চীফ জাজ সদানন্দ ভাদুড়ীর আদালতে কেসটা চলছিল। তিনি ডাক্তার কৈলাশনাথ দাশগুপ্তকে নিযুক্ত করেন মিস্টার সেনকে পরীক্ষা করে রিপোর্ট করতে…

হরেন ঘোষাল বলে ওঠেন, কিন্তু ডক্টর দাশগুপ্ত ওঁকে পরীক্ষা করার পূর্বেই শ্রীসেন অপহৃত হন। ঐ প্রতিবাদিনীর কারসাজিতে।

সত্যানন্দ বলেন, ইয়েস, য়োর অনার! প্রতিবাদিনী আমাকে উদ্ধার করে। এ জন্য আমি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

নিরঞ্জন মাইতি বলে, সাক্ষী ব্যক্তিগতভাবে কার কাছে কৃতজ্ঞ তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আদালতও তা জানতে আগ্রহী নন। আমাদের আর্জি: শ্রীসত্যানন্দ সেন ‘ইন্‌ম্পিটেন্ট’। সেনাইল ডিমেনশিয়ার রুগী। তাঁর সাক্ষ্য গ্রাহ্য হতে পারে না।

বাসু আবার উঠে দাঁড়ালেন: য়োর অনার! আদালত-নিযুক্ত মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ ডঃ কৈলাশনাথ দাশগুপ্ত গতকাল আমার বাড়িতে মিস্টার সেনকে পরীক্ষা করেছেন। তাঁকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং কম্পিটেন্ট-রূপে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেটি আমি আদালতে নথী হিসাবে এখন পেশ করছি, উইথ আ কপি টু প্রসিকিউশন! এছাড়া আরও দুজন বিশেষজ্ঞ ওঁকে পৃথক ভাবে পরীক্ষা করে ‘কম্পিটেন্ট বলেছেন। প্রসিকিউশন এ নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে গেলে ঐ সার্টিফিকেটগুলিও আমি অতিরিক্ত নথী হিসাবে দাখিল করব।

বিচারক মাইতিকে প্রশ্ন করেন, আপনার আর কোনও আপত্তি আছে কি?

নিরঞ্জন তাঁর ট্রায়াল ডেপুটির সঙ্গে আলাপ করে বলেন, আমরা আপাতত ঐ আপত্তি উইথড্র করছি কিন্তু সাক্ষীকে যেন সাবধান করে দেওয়া হয়, তাঁর বক্তব্য তাঁর বিরুদ্ধেই প্রযুক্ত হতে পারে।

শ্রী জাস্টিস্ ঘোষ সেই মর্মে সাক্ষীকে সচেতন করে দিলেন। বললেন, আপনি ইচ্ছে করলে একজন আইনজীবীকে আপনার স্বার্থ দেখবার জন্য নিযুক্ত করতে পারেন।

– আমি তার কোন প্রয়োজন দেখি না, য়োর অনার!

– মিস্টার পি. কে. বাসু কি আপনার পক্ষের উকিল?

– আমি ‘কম্পিটেন্ট’ এইটুকু প্রমাণের জন্য। মিস্টার পাল্লিক প্রসিকিউটর যে খুনের মামলার কথা বললেন সে মামলার জন্য নয়।

– আপনি আপনার স্বার্থ দেখবার জন্য কোনও উকিল দেবেন না, স্বেচ্ছায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন এবং এই সাক্ষ্য আপনার বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হতে পারে জেনেও সাক্ষ্য দিচ্ছেন! তাই তো?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই।

– ভেরি ওয়েল! আপনি জেরা শুরু করতে পারেন, মিস্টার বাসু।

বাসু উঠে দাঁড়িয়ে প্রথম প্রশ্নটিতেই বোমা ফাটালেন: প্রতিবাদিনীর সঙ্গে আপনার কি কোনও রক্তের সম্পর্ক আছে, মিস্টার সেন?

বৃদ্ধ সাক্ষী একবার জজ-সাহেব ঘোষের মাথার উপর প্রলম্বিত জাতির জনকের প্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে বললেন, আছে। প্রতিবাদিনী আমার কন্যা।

– আপনার ‘কন্যা’? একটু জোরে বলুন, যাতে আদালত শুনতে পান!

বৃদ্ধ দ্বিতীয়বার একই কথা উচ্চারণ করলেন।

বাসু বলেন, একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?

– বলব। প্রতিবাদিনীর গর্ভধারিণী স্বর্গতা শান্তিরানী দত্ত দীর্ঘদিন আমার বাড়িতে ‘হাউস-কীপিং’ করেছেন। আমি তাঁকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতাম। কিন্তু সে ছিল বিবাহিতা। তার স্বামী ছিল একটা পাষণ্ড। ওকে অর্থের বিনিময়ে ব্রথেলে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। আমি তাকে উদ্ধার করি। তখনো হিন্দু কোড বিল পাস হয়নি। ওকে বিবাহ করার উপায় ছিল না। আইনত। স্মরণিকাকে ভাইঝি সাজিয়ে মানুষ করি। শান্তিরানীকে আমার সর্বস্বের ওয়ারিশ করে আমি একটি উইল প্রণয়ন করি; কিন্তু শান্তির মৃত্যু আমার আগেই হয়ে গেল। সেটা নাকচ করে নতুন উইল বানিয়ে টুকুকে সর্বস্ব দিতে চাইলুম। কিন্তু পাকেচক্রে তা হল না। নিজের হল জনডিস। টুকু গেল বিলেত। পরে…

– আপনি কি স্মরণিকাকে সর্বস্ব দিয়ে একটি উইল প্রণয়ন করেছেন?

– করেছি। সেটা তো আপনার কাছেই গচ্ছিৎ আছে, মিস্টার বাসু!

– ‘শান্তিধাম’ স্যানিটেরিয়ামে কি আপনি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন?

– আদৌ নয়। আমাকে ওরা জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল…পাগল বানাতে…

– ওরা বলতে?

– ঐ ধনঞ্জয় চৌবে, তার স্ত্রী আর বিলাসসিং যাদব! ঈশ্বর করুণাময়। টুকু যদি আমাকে উদ্ধার না করত তাহলে এতদিনে আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যেতাম। পাব্ললিক প্রসিকিউটর মহোদয় ইতিপূর্বে বলেছেন, এ বিষয়ে ওঁদের কোন মাথাব্যথা নেই। অথচ সেটাতেই পাবলিকের মাথাব্যথা! ওঁরা ‘দুষ্টের পালন ও শিষ্টের শাসন’-এ আগ্রহী বলে!

প্রতিবাদিনী ইতিমধ্যে আঁচলে মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে। তার পিঠটা ফুলে ফুলে উঠছে। ওদিকে সত্যানন্দ ধীরে ধীরে বর্ণনা করে চলেছেন – কীভাবে তিনি বিলাসকে ঘুম পাড়িয়ে পালিয়ে যান। দর্শকেরা উদগ্রীব হয়ে শুনছে। আদালতে সূচীপতন নিস্তব্ধতা। দীর্ঘ জবানবন্দি শেষ হলে বাসু-সাহেব পাবলিক প্রসিকিউটরের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন, ক্রস এগজামিন?

বিশালকায় নিরঞ্জন মাইতি দাঁড়িয়ে বললেন, ইফ দ্য কোর্ট প্লীজ, শ্রীসত্যানন্দ সেনের এই জবানবন্দী প্রসিকিউশনের পক্ষে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। বস্তুত শ্রীসেন ছিলেন একজন নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তি, একজন ইনকম্পিটেন্ট, একজন অপহৃত রোগী। ফলে আমাদের নূতন করে কেস সাজাতে হবে। আদালত যদি এই পর্যায়েই ‘নূন-রিসেস্’ ঘোষণা করেন তাহলে দুটোর সময় আমরা আবার শুরু করতে পারি।

জজ-সাহেব ঘড়ি দেখে বললেন, তাই হোক। বেলা দুটোয় আবার আদালত বসবে।

বিচারক তারপর খাশ-কামরার দিকে চলে গেছেন।

সত্যানন্দ দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন স্মরণিকারদিকে। চোখের-জলে ভিজে মুখখানা বেচারি কোথায় লুকাবে ভেবে পাচ্ছিল না। হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেল। মুখ লুকালো বাপের বুকে। বাসু সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে রবি বসু এসে ওঁকে জনান্তিকে টেনে আনল। নিম্নস্বরে বলল, আপনার ভবিষদ্বাণীই ফলে গেছে, স্যার! অক্ষরে অক্ষরে!

– কী ঘটেছে সংক্ষেপে বল?

– মিস্টার বরাট যখন কোর্ট থেকে বেরিয়ে গেলেন স্মরণিকার গাড়ি থেকে অ্যাডজাস্টেবল রেঞ্চ আনতে, তখন আরও একজন নিঃশব্দে আদালত-কক্ষ ত্যাগ করে গেল। আমার লোক– যে ওকে পশু থেকে ‘শ্যাডো’ করছে– সেও নিঃসাড়ে বার হয়ে গেল। এইমাত্র ওরা দুজনেই ফিরে এসেছে। আপনার সেই বাস্তঘুঘুটি চুপ করে গিয়ে বসেছে দর্শকের আসনে। আমার ‘নজরদার’ও এইমাত্র ফিরে এসে আমাকে একটি আজব রিপোর্ট দিল।

– সংক্ষেপে বল। সময় খুব কম।– ঘড়ি দেখে বাসু বললেন।

– আপনার ‘ঘুঘু’ গাড়ি নিয়ে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে দক্ষিণে চলতে থাকে। গাড়িতে সে একাই ছিল। সেকেন্ড-হাওড়া-ব্রিজ সাইটের প্রায় নির্জন একটি এলাকায় গাড়িটা পার্ক করে। গাড়ি থেকে নেমে ঘটা করে কানে পৈতে জড়ায়। তারপর একটা জংলা এলাকার দিকে এগিয়ে যায়। ওখানে বোধহয় বিকেলে কোনও আক-মাড়াইওয়ালা এসে আখের রস বেচে। কারণ পাঁচিলের ধারে আখের ছিবড়ে ডাঁই করা। আমার লোক লক্ষ্য করল – কানে ‘জনৌ’ জড়িয়ে ও যখন আখের ছিবড়ের পাহাড়ের ওপাশে চলে গেল তখন তার হিপ-পকেটে ছিল একটা বেশ বড় অ্যাডজাস্টেবল পাইপ- রেঞ্চ; কিন্তু একটু পরে যখন সে গাড়িতে ফিরে এল তখন তার হিপ-পকেটে রেঞ্চ ছিল না!

বাসু-বললেন, গুড-ওয়ার্ক! তোমার লোক কি তারপর রেঞ্চ সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছে?

– আজ্ঞে না। ঐখানে তার সহকারীকে পাহারাদার হিসাবে বসিয়ে রিপোর্ট করতে ফিরে এসেছে।

– দ্যাটস্ গুড! ভেরি, ভেরি গুড! তুমি বরাটকে ডেকে নিয়ে এস দিকিন। বল, আমি ডাকছি। মোস্ট আর্জেন্ট।

মিনিট-খানেকের মধ্যেই ইন্সপেক্টর বরাট এসে ছদ্মবিনয়ের অভিনয় করে বলল, ইয়েস স্যার! বলুন, কী ভাবে আপনার সেবা করতে হবে? আবার কোন মৃতদেহ আবিষ্কার করেছেন নাকি?

বাসু ওর বাহুমূল ধরে আরও দূরে সরে এলেন। নিম্নস্বরে বললেন, মিস্টার বরাট, ও-বেলা আপনি বললেন যে, ‘শর্ট-পীস’ পাইপটা বদল হয়নি! কথাটা কি ঠিক?

বরাট হেসে বলল, ব্যারিস্টার-সাহেব! এ-প্রশ্নের জবাব তো স্বয়ং জজ-সাহেবই আদালতে দিয়েছিলেন – ‘ইটস্ জাস্ট এ টেক্যিালিটি!’ আপনিও জানেন, আমিও জানি – এটা সেই একই পাইপ। অবশ্য স্বীকার করছি, এই দশদিন আমি ঐ তিন নম্বরে কোনও সেপাইকে পাহারাদার হিসাবে পাঠাইনি। তাই হলপ নিয়ে আমি অনায়াসে বলতে পারলাম: এটা সেই পাইপই।

– আপনি একটা বিরাট ভুল করেছেন, ইন্সপেক্টর বরাট!

বরাটের ভুকুঞ্চন হল। বলল, মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি।

– পাইপটা বদল হয়ে গেছে! আমি জানি।

– আপনি জানেন! কে, কে বদল করেছে?

– আমি।

– আপনি। মানে?

– শুনুন, শুক্রবারে আদালতে যখন ঐ আলোচনা হয় তার আগেই আমি ঐ ‘শর্ট-পীসটা’ অতি ‘সাবধানে সংগ্রহ করি, পাইপটাকে ‘শ্যাময়-লেদারে’ জড়িয়ে। যাতে খুলবার সময় কোনও দাগ না পড়ে। আর ওখানে একটা নতুন ‘শর্ট-পীস’ লাগিয়ে দিই– যেটা আপনি খুলে এনেছেন।

– কেন? কেন এমন কাজ করলেন, মিস্টার বাসু?

– কারণ ঐ শর্ট-পীসটা বদল করে আমি একটা ‘দাগী’ শর্ট-পীস ওখানে সেঁটে দিয়েছিলাম। অর্থাৎ তার গায়ে দাঁত-ভাঙা পাইপ- রেঞ্চ দাগ ছিল। ইন্ফ্যাক্ট, আমার নিজের পাইপ- রেঞ্চ -এর দাঁত ফেলে তাই দিয়ে এঁটেছিলাম।

– আপনি কী বুঝতে পারছেন, কত বড় বে-আইনী কাজ আপনি করেছেন? একটা হত্যা-মামলার এভিডেন্স আপনি সজ্ঞানে ট্যাম্পার করেছেন!

– না, মিস্টার বরাট, না। শুনুন। আমি এভিডেন্সটাকে সযত্নে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলাম। এই নিন – এটাই সেই পাইপটা…আপনি যদি মনে করেন যে এটার কোনও ‘এভিডেন্টারি ভ্যালু’ আছে তাহলে নিন, ব্যবহারে করুন। কিন্তু না, এটা এভিডেন্স হিসাবে কোন কাজে লাগবে না। আপনারও না, আমারও না।

– তাহলে কেন আপনি অমনভাবে হাতসাফাই করলেন?

– কারণ আমি আশা করেছিলাম: ঠিক ঐভাবে যদি আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, হত্যাকারী যে রেঞ্চ দিয়ে পাইপটা সেঁটেছিল তার একটা দাঁত ভাঙা – সেটা উদ্ধার করতে পারলে পুলিশ একটা মারাত্মক – বস্তুত ‘কনক্লুসিভ’ প্রমাণ পেয়ে যাবে, তখনই হত্যাকারী ঘাবড়ে যাবে। সৌভাগ্যবশতই হোক অথবা দুর্ভাগ্যবশত – আমি হত্যাকারীকে চিহ্নিত করেছিলাম অনেক-অনেক দিন আগে।কিন্তু ‘কনক্লুসিভ প্রুফ’ কিছু ছিল না আমার হাতে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, লোকটা ক্রিমিনাল-টাইপ। ইতিপূর্বেই মোটা অঙ্কের তহবিল তছরূপ করেছে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, বিলাসসিং যাদব তাকে ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছে। বিলাসের মৃত্যুতে আর্থিকভাবে সেই সবচেয়ে লাভবান হবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তার অ্যালেবাঈ পাক্কা। সে ডিসেন্ট্রিতে ভুগছিল। শয্যাশায়ী। কিন্তু সে ঘটনার প্রমাণ কী? পাড়ার ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, স্ত্রী এবং দারোয়ানের সাক্ষী। দারোয়ানটি সদ্যনিযুক্ত-ধানবাদ থেকে আমদানী-করা। ধনঞ্জয় চৌবের দলের লোক।

– ধনঞ্জয় চৌবে? কিন্তু প্রমাণ কী?

– সেটা রবি বোস সাপ্লাই করবে। কৃতিত্বটা রবিরই। ওই তাকে চিহ্নিত করেছে।

বরাট একবার রবি একবার বাসুর দিকে দেখে নিয়ে বললে, আর তাই রবি আমাকে না জানিয়ে সবার আগে আপনার কাছে রিপোর্ট করেছে?

বাসু গম্ভীর হয়ে বললেন, ল্যুক হিয়ার, ইন্সপেক্টর। কেসটার ফয়শালা দু-ভাবে করা যায়। আমি চৌবেকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলে পাঁচ মিনিটে ফয়শালা করে দিতে পারি। সে-ক্ষেত্রে পুলিস-বিভাগ বে-ইজ্জত হবে বেহুদ্দো! দ্বিতীয়ত, কৃতিত্বটা আপনি আর রবি ভাগাভাগি করে নিতে পারেন। অপরাধীকে চিহ্নিত করার দায় আমার নয়। আমার মক্কেল খালাস পেলেই আমি খুশি।

বরাট গোঁজ হয়ে মিনিটখানেক কী ভাবল। তারপর একগাল হেসে বললে, আই থিংক য়ু আর করেক্ট! কে হত্যা করেছে তা নিয়ে আপনার কেন মাথাব্যথা? আমরাই তাকে ধরি বরং। এস রবি…

বাসু বলেন, আর একটা কথা। মনে রাখবেন, ধনঞ্জয়ের রেঞ্চটার দাঁত ভাঙা নয়! অথচ আপনি হলপ নিয়ে যে পাইপটা আদালতে এক্সিবিট হিসাবে দাখিল করেছেন…

– তাই তো!

– না। আপনি-আমি জানি, কিন্তু ধনঞ্জয় তা জানে না। ওর রেঞ্চ-এর দাঁত ভাঙা কিনা। অথবা শর্ট-পীসটা বদল হয়েছে কিনা। কায়দা করে চেপে ধরলে ধনঞ্জয় ভেঙে পড়বেই। ওর দারোয়ান আর স্ত্রীকে অ্যারেস্ট করুন। আর তাছাড়া একটা মারাত্মক এভিডেন্স তো লুকানো আছে আপনার আস্তিনের তলায়!

বরাট বিহ্বল হয়ে তাকায়। তার চোখে: প্রশ্ন।

– ইউনিট নম্বর তিনে যতগুলি লেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে তার দুটি এখনো সনাক্ত করা যায়নি! তাই নয়? মিস্টার সত্যানন্দ সেনের টিপছাপ নিন– কোয়েড্রেটিক ইকোয়েশনের একটা রুট জানা হয়ে যাবে। দ্বিতীয় যেটি পড়ে থাকবে সেটা হত্যাকারীর। সেটা যদি ধনঞ্জয় চৌবের না হয় তাহলে কেসটা নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের।

ঘড়ি দেখে বললেন, আর মাত্র বত্রিশ মিনিট বাকি আছে। আপনারা রওনা দিন…

বরাট রবিকে ডাকল, কুইক! লেট’স গো!

হুবহু জেমস্ বন্ডের ভঙ্গিতে জীপে লাফিয়ে উঠল বরাট।