সতের
বাসু জেরা করতে উঠে বললেন, মিস্টার মাথুর, আপনি ইতিপূর্বে বলেছেন, আসামী যখন আপনার পেট্রোল-পাম্প স্টেশনে ঢোকেন তখন রাত বারোটা বেজে তেতাল্লিশ। তাই না?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই।
– আপনার হাতঘড়ি মোতাবেক, না ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম?
– আমার ঘরে তিনটে ঘড়ি ছিল, স্যার। একটা ইলেকট্রিকাল দেওয়াল ঘড়ি, একটা টেবিল ক্লক, একটা রিস্ট-ওয়াচ। তিনটেতেই একই সময় দেয়। সে রাত্রেও দিচ্ছিল। ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডর্ড টাইম।
– এবং ঐ ভদ্রমহিলা যখন আপনার দোকান থেকে বার হয়ে যান তখন রাত একটা?
– আজ্ঞে হ্যা।
– কাঁটায়-কাঁটায় একটা?
– পাঁচ-দশ সেকেন্ড কম-বেশি হতে পারে।
– এই সময়কালের মধ্যে, বারোটা তেতাল্লিশ থেকে রাত একটা– এই সতের মিনিটকাল আসামী আপনার চোখের সামনে ছিলেন?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ।
– মুহর্তের জন্যেও আপনার দৃষ্টিপথের বাইরে যাননি?
– আজ্ঞে না।
– আপনি ওঁকে চিনতে ভুল করছেন না তো?
– তা কেন করব? না, নিশ্চয় করছি না।
– ওঁর মারুতি-সুজুকি গাড়ির নাম্বারটা আপনি জানেন?
– জানি। মানে, মনে নেই, লেখা আছে আমার দোকানে। কারণ টিউবটা উনি জমা রেখে যান। সচরাচর এক্ষেত্রে গাড়ির নম্বর আমরা লিখে রাখি।
– দ্যাটস্ অল যোর অনার।
পরবর্তী সাক্ষী ডাক্তার নবীন দত্ত। মাইতি-সাহেবের প্রশ্নোত্তরে তিনি বর্ণনা করে গেলেন: কীভাবে মধ্যরাত্রে বটুক ওঁকে টেনে তোলে, উনি এসে তার ঘরের ভিতর দিয়ে টর্চের আলোয় কমলেশের পা-খানা দেখতে পান। ইত্যাদি, প্রভৃতি। ইতিপূর্বে জবানবন্দিতে তিনি যা বলেছেন এবার হলফ্ নিয়ে তা আবার বলে গেলেন।
মাইতি প্রশ্ন করেন, বটুক মণ্ডল যখন আপনাকে ডাকতে আসে তার কিছু আগে কি পাশের বাড়িতে টেলিফোন বাজার শব্দ আপনি শুনতে পেয়েছিলেন?
– হ্যাঁ, পেয়েছিলাম। আমি জেগেছিলাম বিছানায়।
– বটুক মণ্ডল যখন আপনাকে ডাকতে আসে রাত তখন কটা?
– আমি ঘড়ি দেখিনি! আন্দাজ দেড়টা।
– তার কতক্ষণ আগে পাশের বাড়িতে টেলিফোন বাজে?
– আন্দাজ দশ-পনের মিনিট হবে।
– টেলিফোন বাজার পর এবং বটুকবাবু আপনাকে ডাকতে আসার মাঝখানে যে দশ-পনের মিনিট সময় পার হয়ে যায় তার মধ্যে আপনি আর কোন শব্দ শুনেছিলেন কি?
– হ্যাঁ, একটানা একটা মেকানিকাল যান্ত্রিক শব্দ।
– সেটা কিসের?
– তা বলতে পারব না। আমার ধারণা হয়েছিল যে, মাঝেরহাট ব্রীজের তলা দিয়ে কোনও ইঞ্জিন না-থেমে হুইসিল বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু পরে জেনেছি, রাত একটা থেকে দেড়টার মধ্যে ঐ রকম কোন ইঞ্জিন মাঝেরহাট ব্রীজের তলা দিয়ে যায়নি। তাই আমার ধারণা: ডায়মন্ডহারবার রোডে বা তারাতলা রোডে কোনও মোটরকার-এর হর্নে শর্ট-সার্কিট হয়ে একটানা শব্দ হয়েছিল। অথবা দূর দিয়ে একটা দমকল যাচ্ছিল।
– ঐ একটানা শব্দটা কতক্ষণ হয়েছিল?
– এক থেকে দেড় মিনিট।
– ওটা টেলিফোনের আওয়াজ নয়?
– নিশ্চয় না। টেলিফোনের শব্দ অমন একটানা হয় না।
– পাশের বাড়ির ডোরবেল নয়?
– খুব সম্ভবত নয়। ডোর-বেল বাজালে কেউ সচরাচর ওভাবে পুরো এক মিনিট পুশ-বাট ধরে থাকে না। বিশেষ রাত একটার সময়। একবার বাজায়, একবার থামে।
– সচরাচর করে না। কিন্তু যদি ‘পুশবটন’ চেপে ধরে থাকে, তাহলে তো শব্দটা ঐ রকমই হবে?
– হতে পারে। কিন্তু হলফ নিয়ে আমি বলতে পারব না। ওটা ‘ডোরবেল’-এর শব্দ।
– তা তো কেউ বলাতে চাইছে না। হতে পারে কি না সেই সম্ভাবনার কথাই তো জানতে চাইছি।
– তা পারে।
বাসু জেরায় প্রশ্ন করলেন, ওটা যে ইঞ্জিনের শব্দ নয়, এটা সাক্ষী কেমন করে জানলেন। ডক্টর দত্ত জানালেন, তিনি স্বয়ং মাঝেরহাট স্টেশনে গিয়ে অ্যাসিস্টেন্ট স্টেশন মাস্টরকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেন। খুনের মামলায় ওঁকে সাক্ষী দিতে হবে শুনে এ. এস. এম. খাতা খুলে ওঁকে দেখিয়ে দেন ঘটনার রাত্রে ঐ সময় কোনও এঞ্জিন– কী আপ, কী ডাউন – মাঝেরহাট স্টেশন দিয়ে যায়নি।
পরবর্তী সাক্ষী বটুক মণ্ডল! পি. পি.র প্রশ্নের উত্তরে সে যা দেখেছে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে গেল: তার প্রথমবারের জবানবন্দির সঙ্গে বর্তমান এজাহারে বস্তুত কোন প্রভেদ হল না। মাইতি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বটুকের ঘর থেকে টর্চ ফেল্ড মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টের সদর দরজাটা দেখতে পাওয়া যায় কি না।
– আজ্ঞে, তা যায়।
– তাহলে কে কলিং-বেল বাজাচ্ছে দেখবার জন্য তুমি সেদিকে টর্চের আলো ফেলনি?
বটুক ঢোক গিল্ল। তার গলকণ্ঠটাবার কতক ওঠা-নামা করল! আড়চোখে সে বাসু-সাহেবের দিকে তাকিয়ে দেখল। বাসু-সাহেব তখন সামনের দিকে ঝুঁকে এসেছেন। জ্বলন্ত এক-জোড়া চোখে তাকিয়ে আছেন বটুকের দিকে। বটুক আমতা-আমতা করল…
– কী হল? জবাব দাও? তুমি ওদিকে টর্চের আলো ফেলেছিলে কি?
– না। ও-বাগে ফোকাস করিনি। হল তো?
– তোমার কৌতূহল হল না? জানতে, যে– কে এতরাত্রে ‘কলবেল’ বাজাচ্ছে পাশের বাড়িতে?
– না হয়নি। তাছাড়া পাশের বাড়িতে কেউ ‘কলবেল’ বাজাচ্ছিল তা তো আমি বলিনি।
– পুলিশের কাছে প্রথম যে এজাহার দিয়েছিলে…
– সে সব কথা ছাড়ান দ্যান, হুজুর। এই কাঠগড়ায় ডাঁইরে আমি ও-কথা বলিনি। ঐ কলিংবেলের কথা…
– তুমি বলনি যে, যে সময় ঝগড়া-মারামারি হচ্ছিল তখন একটানা একটা কলিংবেলের শব্দ হচ্ছিল?
– আজ্ঞে না! একটানা ‘একটা শব্দ হচ্ছিল’ বলিচি! তবে সেটা কলিংবেলের কি না, জানি না। রেল-ইঞ্জিনের হতে পারে। মটোর-গাড়ির হর্ন অমন পাগলামি করে মাঝে-মধ্যে – তাও হতে পারে। আর, হ্যাঁ, দমকলের পাগলাঘণ্টিও হতে পারে…
– তুমি শুনলে না, ডক্টর নবীন দত্ত বললেন যে, উনি মাঝেরহাট স্টেশনে গিয়ে এ. এস. এম-এর কাছে জেনে এসেছেন, সে সময় মাঝেরহাট ব্রীজের তলা দিয়ে কোন এঞ্জিন যাচ্ছিল না। শোননি?
বটুক রুখে ওঠে, আজ্ঞে হ্যাঁ, শুনিচি! কিন্তু তার সত্যি-মিথ্যে আমি জানি না, হুজুর। ঐ শোনা কথার ভিত্তিতে আমি হলপ নিয়ে কিছু বললে ঐ উনি জেরায় আমাকে ছিঁড়ে খাবেন!
বাসু-সাহেবকে সে দেখায়।
মাইতি বলেন, দ্যাটস্ অল, য়োর অনার।
বাসু এবার উঠলেন জেরা করতে! প্রথমেই প্রশ্ন করলেন, বটুকবাবু, তোমার পানের দোকানে তাকের উপর একটা জ্যাজ কোম্পানির অ্যালার্ম-ক্লক আছে, তাই না? মা-কালীর পটখানার ঠিক ডান-বাগে?
মাইতি আপত্তি জানালেন: অবান্তর প্রশ্ন, এই অজুহাতে।
বাসু আদালতকে আশ্বস্ত করলেন যে, প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা তিনি অচিরেই প্রতিষ্ঠা করবেন। ফলে বিচারক সাক্ষীকে অনুমতি দিলেন প্রশ্নের জবাবটা দিতে। বটুক বলল, কোন কোম্পানির ঘড়ি তা বলতে পারব না, হুজুর, তবে হ্যাঁ, একটা ঘণ্টা-ঘড়ি আছে। বাবার আমল থেকে! ঐ আমার পানের দোকানে। ঠিকই বলেছেন, মা-কালীর পটের ডান বাগে।
– সেটা তুমি মাঝে-মধ্যে দম দিয়ে বাজাও নিশ্চয়?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, তা বাজাই বইকি! ভোর রেতে কোথাও যাবার দরকার হলে।
– ওটার শব্দ কেমন? টেলিফোনের মতো থেমে থেমে – ‘ক্রিরিং-ক্রিং– ক্রিরিং-ক্রিং’? নাকি দমকলের ঘণ্টার মতো একটানা ‘ঠঙাঠঙ-ঠঙাঠঙ-ঠঙাঠঙ’?
বটুক জবাব দিল না, কী যেন ভাবছে সে।
– কী হল? জবাব দাও। কী ভাবছ?
– আজ্ঞে ঐ-কথাই ভাবছি। রেতের বেলা কি তাহ’লে দোকান ঘরে আমার ঘড়িটাই বাজছিল?
– তুমি কি ওটাতে অ্যালার্ম দম দিয়েছিলে? ঐ দিন রাত একটার?
– আজ্ঞে না।
– তাহলে তোমার ঘড়ি বাজবে কী করে?
বটুক জবাব দিল না।
– এবার তুমি এই ফটোটা দেখ তো। কমলেশের টেবিলে যে অ্যালার্ম-ক্লকটা দেখা যাচ্ছে, এটা কি তোমার পানের দোকানের ঘড়িটার মতো?
সাক্ষী ছবিটা দেখে নিয়ে নিজে থেকেই আত্মজিজ্ঞাসা করল, সে-রাতে কি তাইলে ঘড়িটাই একটানা বেজে চলেছিল? তাই শুনিচি?
বাসু বিচারকের দিকে ফিরে বললেন, প্রতিবাদীপক্ষ থেকে পুনরায় দাবী করা হচ্ছে, য়োর অনার! কমলেশের ঘর থেকে অপসারিত ঘড়িটি আদালতে উপস্থাপিত করা হক। বর্তমান সাক্ষী প্রসিকিউশন তরফের। সে সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, এই ঘড়ির শব্দই ঘটনার রাত্রে শুনে থাকবে। এ-ক্ষেত্রে বাদীপক্ষ ঘড়িটি আদালতে নিয়ে আসুন। তাঁদের তরফে সাক্ষীকে সে ঘড়ির অ্যালর্মটা শুনিয়ে দিন। প্রতিবাদী পক্ষ জানতে ইচ্ছুক ঐ অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দ শোনার পর সাক্ষীর স্মৃতি কী বলে।
বিচারক মাইতির দিকে ফিরে বলেন, অপনার নিশ্চয় আর কোন আপত্তি নেই?
মাইতি তড়াক করে উঠে দাঁড়ান: কী বলছেন ধর্মাবতার? প্রচণ্ড আপত্তি আছে। ঘড়িটা আমরা এখনি আদালতে আনতে চাই না। এভাবে বাসু-সাহেব প্যাঁচে ফেলে আমাদের বাধ্য করতে পারেন না…
বিচারক তাঁর কাঠের হাতুড়িটা টেবিলে ঠুকলেন। দৃঢ়স্বরে বললেন, মিস্টার পি.পি! আপনি বসুন! আপনার ভাষা অনুমোদনযোগ্য নয়। প্রতিবাদী পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বাদীপক্ষের ‘সীজ’-করা একটা বিশেষ দ্রব্য আদালতে উপস্থাপিত করা হোক। এ দাবী ইতিপূর্বেই ডিফেন্স-কাউন্সেল দু-দুবার পেশ করেছিলেন এবং আমি তখন তা নাকচ করে দিই। বর্তমানে বাদীপক্ষের সাক্ষী স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে বলছেন যে, হয়তো তিনি ঐ পুলিশের সীজ করা ঘড়ির আওয়াজটাই শুনেছেন! এক্ষেত্রে বর্তমানে আদালত মনে করছেন যে, প্রতিবাদীর দাবী যুক্তিসঙ্গত! সুতরাং এখন আমি জানতে চাইছি: মৃত কমলেশের ঘর থেকে অধিকৃত ঐ অ্যালার্ম-ক্লকটি কোথায় আছে?
মাইতি জবাব দিলেন না। অবাধ্য ছাত্রের মতো গোঁজ হয়ে বসে রইলেন।
ভাদুড়ী পুনরায় বলেন, মিস্টার পি.পি.! আমি আপনাকেই জিজ্ঞাসা করছি! কমলেশের ঘর থেকে ‘সীজ’ করা ঘড়িটি কোথায়?
এবার মাইতি বললেন, পেশকারবাবুর কাছে জমা আছে।
বিচারকের আদেশে পেশকারবাবু অ্যালার্ম-ক্লকটি এনে জজ-সাহেবের টেবিলের উপর রাখলেন। জজ-সাহেব সেটা নেড়েচেড়ে দেখলেন। মাইতি সাহেবকে প্রশ্ন করেন, এইটাই সেই আইডেন্টিকাল অ্যালার্ম-ক্লক?
মাইতি বললেন, ওর গায়ে লেবেলেই তো সে কথা লেখা আছে।
বিচারক কী একটা কথা বলতে গিয়েও বললেন না। ঘড়ির গায়ে লেবেল আঁটা কাগজটা পড়ে দেখে বললেন, হ্যাঁ এটাই সেই ঘড়ি। বাইশে জুন রাত্রে মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
ঘড়িটি বিচারক বাসু-সাহেবের হাতে দিলেন। বাসু বলেন, ধরে নিচ্ছি যে, আপনি আমাকে এটা ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছেন। দম দিতে বা বাজাতে?
বিচারক পাবলিক প্রসিকিউটারের দিকে দূকপাত করে দেখলেন। কিন্তু মাইতি তখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি।
বিচারক বললেন, আদালতের নির্দেশেই বাদীপক্ষ তাঁদের ‘সীজ’-করা ঘড়িটি আদালতে উপস্থাপিত করেছেন। আপনি প্রতিবাদীর পক্ষ থেকে এটি বাজিয়ে প্রসিকিউশনের সাক্ষীকে শোনাতে চাইছেন। আমি আপত্তির কোন কারণ দেখছি না। পি. পি.-র যদি আপত্তির কারণ থাকে তবে তাঁকে তা এখনি জানাতে হবে।
মাইতি তাঁর চেয়ারে প্রস্তরমূর্তির মতো নিশ্চল বসে রইলেন।
বাসু হাত বাড়িয়ে ঘড়িটি নিলেন। সেটি বটুকের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, বটুকবাবু, তুমি লক্ষ্য করে দেখ, অ্যালার্ম-কাঁটাটা একটার ঘরে আছে। তাই না?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই আছে বটে। ঠিক একটার ঘরে।
– আরও লক্ষ্য করে দেখ বটুকবাবু, ‘অ্যালার্ম-দম’ শেষ হয়ে গেছে। মানে বর্তমানে অ্যালার্ম দম দেওয়া নেই।
মাইতি এতক্ষণে বলে ওঠেন, বিস্ময়কর তথ্য! শুধু অ্যালার্ম কেন? ঘড়িটাও তো দম না পেয়ে বন্ধ হয়ে গেছে পুলিশের গুদামঘরে।
বিচারক বলেন, অবান্তর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
বাসু-সাহেবকে বলেন, আপনি কি অ্যালার্ম ঘড়িটা বাজিয়ে শোনাতে চান?
– ইয়েস, য়োর অনার। আমি প্রথমে ফুরিয়ে যাওয়া অ্যালার্ম দমটা দেব। তারপর মিনিটের কাঁটাখানা ধীরে-ধীরে ঘোরাতে থাকব, কারণ আমি দেখতে চাই শেষ বার অ্যালার্মটা কটার সময় বেজে শেষ হয়েছিল। অর্থাৎ ঠিক কটার সময় মিনিটের কাঁটাটা পৌঁছলে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করে। আর তখনই আমি সাক্ষীর মতামতটা শুনতে চাই। ঘটনার রাত্রে নিজের ঘর থেকে সে এই ঘড়ির অ্যালার্ম-এর আওয়াজটাই শুনেছিল কি না।
বিচারক বললেন, আপনি তা করতে পারেন। মিস্টার পি.পি., আপনি এখানে এগিয়ে এসে কাছাকাছি দাঁড়াতে পারেন। বাদীর পক্ষ থেকে সবকিছু তদারক করতে পারেন।
মাইতি দৃঢ়স্বরে বললেন, পি. কে. বাসু-সাহেবের এ-জাতের হাত-সাফাই আমার অনেক দেখা আছে। আদালত যখন অনুমতি দিয়েছেন তখন তিনি আবার ভানুমতীর খেল দেখান। আমার তা দেখবার উৎসাহ নেই।
চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, মিস্টার পি.পি.! আপনি অবহিত আছেন কি না জানি না, আপনার আচার এবং কথাবার্তা কিন্তু আদালত-অবমাননার সীমান্তের কাছাকাছি এসে গেছে। আপনাকে আমি ‘অ্যাডমনিশ্’ করছি! ফর দ্য লাস্ট টাইম!
হঠাৎ এদিকে ফিরে বাসুকে বলেন, ইয়েস কাউন্সেল, আপনি যে পরীক্ষাটা করতে চান এবার শুরু করুন।
পি. কে. বাসু এগিয়ে এলেন। এখন তিনিই আদালতকক্ষের মধ্যমণি। অহেতুক – সম্ভবত নাটকীয় ভাবটা ফুটিয়ে তুলতে, অথবা মাইতির ঈর্ষা অগ্নিতে সমিধনিক্ষেপমানসে– বিচারককে একটি ম্যাজিশিয়ানি ‘বাও’ করলেন। তারপর ঘড়িতে ‘অ্যালার্ম দম’ দিলেন। ধীরে ধীরে মিনিটের কাঁটাটা ঘোরাতে শুরু করলেন। কাঁটা যখন বারোটা আটান্ন মিনিটে পৌঁছালো তখনই ঝন্কন্ করে বেজে উঠল ঘড়িটা।
যেন অপ্রত্যাশিত একটা সাফল্যলাভ করেছেন! বাসু-সাহেব টেবিল-ঘড়িটা ম্যাজিস্ট্রেট-সাহেবের বেঞ্চে-এ রেখে নিজের চেয়ারে ফিরে এসে বসলেন। মিনিটখানেক বেজে ঘড়িটা থামল।
বাসু উঠে দাঁড়ালেন। সাক্ষীকে বললেন, বটুকবাবু, এবার বল, তুমি যে একটানা শব্দটা শুনেছিলে তা কি রেল-ইঞ্জিনের হুইসিল? নাকি মটোর গাড়ির শর্ট-সার্কিট হয়ে যাওয়া হর্ন, অথবা দমকলের একটানা ঠনাঠন, কিংবা…
কথাটা তাঁর শেষ হল না। বটুক বলে উঠল: ঐ ঘড়িটা!
– কী ঐ ঘড়িটা?
– ঐ ঘড়ির ‘ঠনাঠন’-শব্দটা আমি শুনেচি হুজুর!
– তুমি নিঃসন্দেহ?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, নিষ্যস, নিঃসন্দেহ।
– তুমি হলপ নিয়ে এ-কথা বলছ কিন্তু!
– জানি হুজুর। মিছে কথা বললে আপনি আমারে ডোরাকাটা হাফপ্যান্ট পরাবেন, গলায় তক্তি ঝোলাবেন, পানসাজা ছেড়ে আমারে মাটি কোপাতে হবে! সব, স-ব কথা– মনে আছে হুজুর। আমি নিয্যস ঐ ঘড়িটার ঠনাঠন-ঠনাঠন শুনেছিলাম! সেদিন রেতের বেলা!
– তোমার মনে কোনও সন্দেহ নেই?
– তিলমাত্র নয়।
– তাহলে ঐ ঠনাঠনটা তুমি শুনেছিলে রাত ঠিক একটা বেজে তিন-এ?
– আজ্ঞে না। একটা বাজতে দুইয়ে। বারোটা আটান্ন-মিনিটে!
– সে তো ঐ অ্যালার্ম-ঘড়ির টাইমে। কিন্তু শুনলে না, ইন্সপেক্টর মুখার্জি সাহেব এক্সপার্ট ওপিনিয়ান দিয়ে গেলেন ঐ অ্যালার্ম-ঘড়িটা পাঁচ মিনিট স্লো ছিল? তার মানে অ্যালার্মটা বেজেছিল একটা বেজে তিন-এ?
– ও হ্যাঁ। তা বটে। ঘড়িটা পাঁচমিনিট শোলো ছিল।
বাসু-সাহেব বিচারকের দিকে ফিরে বলেন, দ্যাটস্ অল য়োর অনার।
বিচারক নিরঞ্জন মাইতির দিকে ফিরে বলেন: এনি রিডাইরেক্ট?
মাইতি মাথা নেড়ে অস্বীকার করেন।
বাসু বিচারককে বলেন, ইতিপূর্বে ডক্টর নবীন দত্তকে ঐ অ্যালার্ম ক্লক সম্বন্ধে কোনও প্রশ্ন করা যায়নি, কারণ তখনো সেটা আদালতে উপস্থিত করা হয়নি। আমি আর একবার বাদীপক্ষের ঐ সাক্ষীকে কাঠগড়ায় তোলার জন্য আর্জি জানাচ্ছি।
বিচারক বললেন, বর্তমান অবস্থায় এটা অনুমোদনযোগ্য।
ডক্টর দত্ত পুনরায় কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়ালেন। বাসু জানতে চান, আপনি কি অ্যালার্ম-ঘড়ির শব্দটা শুনেছেন?
– হ্যাঁ, শুনেছি।
– আপনার কি মনে হয় ঘটনার রাত্রে আপনি যে একটানা শব্দটা শুনেছেন তা ঐ ঘড়ির অ্যালার্ম?
– খুব সম্ভবত তাই। ‘নিশ্চিত তাই’ বলতে পারছি না।
– আপনি পেশায় চিকিৎসক। মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। তাই জানতে চাইছি: কোন ঘুমস্ত ব্যক্তির নাগালের মধ্যে যদি মাঝ রাতে অ্যালার্ম ক্লক বেজে ওঠে তাহলে সে কি প্রতিবর্তী প্রেরণায় ঘুম ভেঙেই ঘড়িটা বন্ধ করে দেয় না?
মাইতি আপত্তি করেন: আর্গুমেনটেটিভ। কনশন।
বিচারক আপত্তি নাকচ করেন। সাক্ষী একজন বিশেষজ্ঞ। এ-জাতীয় প্রশ্বের সুচিন্তিত জবাব দেবার শিক্ষা তাঁর আছে। সাইকলজি ওঁর অধীতবিদ্যা।
– ওয়েল, ডক্টর দত্ত। আনসার দ্যাট কোশ্চেন।
– হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। ঘুম ভেঙে উঠেই প্রতিবর্তী-প্রেরণায় সে হাত বাড়িয়ে অ্যালার্মটা বন্ধ করে দেয়। বিশেষ মধ্যরাত্রে।
– বর্তমান ক্ষেত্রে যদি প্রমাণিত হয় যে, আপনি ও বটুকবাবু ঐ অ্যালার্ম ক্লকের শব্দটাই শুনেছেন, তাহলে কী কারণে কমলেশ সেটা বন্ধ করে দেননি? আপনার কী অনুমান?
– অবজেকশন য়োর অনার! এ প্রশ্নটা শারীরবিদ্যা সংক্রান্ত নয়, সাক্ষীর অধীত-বিদ্যার অন্তর্গত নয়।বিশেষজ্ঞহিসাবে তার অনুমাননির্ভর জবাব উনি দিতে পারেন না। এটা ক্রিমিনোলজির প্রশ্ন, শারীর-বিদ্যার নয়।
– অবজেকশন সাসটেইন্ড!
বাসু একগাল হেসে বললেন, এবার তাহলে প্রসিকিউশন ইন্সপেক্টর মুখার্জিকে আর একবার কাঠগড়ায় তুলুন। সহযোগী তো তাঁকে ইতিপূর্বেই ক্রিমিনোলজির এক্সপার্ট হিসাবে দাবী করছেন। আমরা তাঁর কাছেই ঐ প্রশ্নটার জবাব শুনি বরং। একটা বেজে তিন-মিনিটে কমলেশ কেন অ্যালামটা বন্ধ করতে পারেনি! কেন ঘড়িটা দম শেষ হওয়া পর্যন্ত একটানা বেজে গেল।
ম্যাজিস্ট্রেট-সাহেব ঘড়ি দেখে বললেন, রিসেস-এর সময় হয়ে গেছে। নেক্সট সেসনে ইন্সপেক্টর মুখার্জির ক্রস শুরু হবে। আপাতত আদালত মুলতুবি থাকছে; কোর্ট ইজ অ্যাডজর্নড!
