রিস্তেদারের কাঁটা – ১৮

আঠারো

ঠিক বেলা দুটোর সময় আদালত বসতেই পালিক প্রসিকিউটর নিরঞ্জন মাইতি উঠে দাঁড়ালেন। ‘বাও’ করে বিচারককে সম্বোধন করে বললেন, ইফ দ্য কোর্ট প্লীজ, বাদীর তরফে সর্বাগ্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আছে!

– প্রসীড! – সংক্ষেপে বললেন বিচারক ঘোষ।

সর্বাগ্রেই আমি গোয়েন্দা বিভাগকে সামগ্রিকভাবে এবং ইন্সপেক্টর বরাট ও ইন্সপেক্টর রবিবোসকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত সমাধান হয়ে গেছে। হত্যাকারীর নাম ধনঞ্জয় চৌবে। সে পুলিশের কাছে লিখিত স্বীকারোক্তি দাখিল করেছে।..সংক্ষেপে তা এই: বিলাসসিং যাদব দীর্ঘদিন পূর্বে ধনঞ্জয় চৌবের বিষয়ে একটি গোপন বার্তার সন্ধান পায়। সে-কথা প্রকাশ হয়ে পড়লে চৌবের সামাজিক মর্যাদাহানি হত। এজন্য যাদব গোপনে চৌবের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত– যাকে বলে ‘ব্ল‍্যাকমেলিং’। যাহোক, সে ঘটনা বর্তমান মামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। যেটুকু জড়িত তা হচ্ছে এই যে, সেই সূত্র ধরেই বিলাসসিং ওদের সঙ্গে, ওদের গাড়িতেই ধানবাদ থেকে কলকাতায় আসে এবং সেন মশায়ের বাড়িতে খুঁটি গেড়ে বসে।..বর্তমান মামলার প্রতিবাদিনী যখন শ্রীসেনকে শান্তিধাম থেকে অপসারণের পরিকল্পনা করে তখন বিলাসসিং তা টের পায়। সে ধনঞ্জয়কে কিন্তু জানায় না। গোপনে মিস্ সেনকে অনুসরণ করে ঐ মোটেলে পৌঁছায় এবং ছদ্মনামে চার-নম্বর ইউনিটটি ভাড়া নেয়।…মজার কথা, ধনঞ্জয়ও টের পায় যে, মিস্ সেন সত্যানন্দকে অপহরণের চেষ্টা করছেন আর সেটা বিলাসসিং জানতে পেরেছে। স্মরণিকা দেবীর অলক্ষ্যে বিলাস যেমন ভাড়া করা গাড়িতে ঐ মোটেলে এসে থানা গাড়ে, ঠিক তেমনি বিলাসের অলক্ষ্যে ধনঞ্জয়ও ঐ মোটেলে এসে পৌঁছায় এবং দূরে বসে অপেক্ষা করে। রাত দশটা নাগাদ যখন শ্রীসেন তিন-নম্বর ইউনিট থেকে নেমে আসেন এবং চার-নম্বর গ্যারেজ খুলে বিলাসের ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে চলে যান তখন সে অবাক হয়ে যায়। অবাক হয় এই ভেবে যে, বিলাস কেন চিড়িয়াকে খাঁচা খুলে ভেগে যেতে দিল! সে উপরে উঠে আসে। দেখে তিন-নম্বর ঘরের দরজায় চাবিটা কী-হোলেই আটকানো আছে। চৌবে দরজা খুলে ঘরে ঢোকে। আলো জ্বালে না। পকেট-টর্চের আলোয় দেখে বিলাস অঘোর ঘুমে অচেতন। ধনঞ্জয় চৌবের ধারণা হয়, ঐ অবস্থায় যদি বিলাস মারা যায়, তাহলে হত্যাপরাধ সত্যানন্দু সেন-এর উপর বর্তাবে। তাহলে সে ঐ বিশাল সম্পত্তিটার অধিকার পাবে এবং ব্ল্যাকমেলার বিলাস সিং-এর হাত থেকে ও চিরনিষ্কৃতি পাবে। প্রয়োজন একটি অস্ত্রের। মার্ডার-ওয়েপন। অন্য কেউ হলে হয়তো ঘুমন্ত মানুষটার গলা টিপে ধরত; কিন্তু ধনঞ্জয় সে-পথে যায়নি। সে দক্ষ মিস্ত্রি! প্লাম্বার মিস্ত্রি! সে নিচে নেমে এসে তার পাইপ- রেঞ্চটা গাড়ি থেকে নিয়ে উঠে যায়। পাইপটা খুলে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে সরে পড়ে।…সুতরাং, ধর্মাবতার! প্রসিকিউশন বর্তমান প্রতিবাদিনীর বিরুদ্ধে আনীত মামলা খারিজ করে দেবার আবেদন পেশ করছে।

নিরঞ্জন মাইতি দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে আসন গ্রহণ করেন।

শ্রী ঘোষের চোখ পিট্-পিট্ করে উঠল প্রশ্নটা করতে: মিস্টার ডিফেন্স কাউন্সেল, আপনার কোনও আপত্তি আছে?

বাসু হাসলেন, নান্ হোয়াটােএভার, য়োর অনার!

বিচারক বললেন, প্রতিবাদিনীর বিরুদ্ধে মামলা খারিজ হয়ে গেল। তাকে মুক্তি দেওয়ার আদেশও দেওয়া হচ্ছে। কোর্ট ইজ অ্যাডজর্নড।

জজ-সাহেব তাঁর চেম্বারের দিকে রওনা হতেই দর্শকেরা সামনের দিকে ছুটে এল। নবীন, বিশ্বনাথ, ঠাকুর সিং এসেছে আদালতে। রোজই আসে। ওরা এগিয়ে এসে সত্যানন্দকে প্রণাম করল। গীতা কর আর মোতির মা এসে চেপে ধরল টুকুর দুই হাত। তারপর ওরা দু-জন বাপবেটি– এগিয়ে এলেন বাসু-সাহেবের কাছে। টুকু বলল, অনেক অন্যায় জমা হয়ে আছে, মেসো। ক্ষমা চাইবার মুখ নেই। কিন্তু আজ আনন্দের দিনে জেঠুর সঙ্গে…

– জেঠু! জেঠু কে? তোমার সঙ্গে আমার শর্ত হয়েছেনা যে, জেঠুর কথা আমরা মুখে আনব না!

টুকু তার বাবার দিকে ফিরল। বৃদ্ধ ওকে বুকে টেনে নিলেন।

বরাট এগিয়ে এসে বাসু-সাহেবের কর্ণমূলে বললে, এক মিনিট!

– ইয়েস!

দুজনে জনান্তিকে সরে এলেন।

– আপনাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা আমার জানা নেই ব্যারিস্টার-সাহেব, কিন্তু গল্পচ্ছলেও যদি কোনদিন কাউকে ঐ পাইপটার কথা বলেন…

– পাগল! কিন্তু রবির উপর যেন রাগ পুষে রাখবেন না!

বরাট একই কথা বলল: পাগল।

ওঁরা যখন হাত-ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছেন– ব্যারিস্টার বাসু আর ইন্সপেক্টর বরাট – তখন হঠাৎ দু-তিনটি ফ্ল্যাশ-বাল্ব জ্বলে উঠল। একজন সাংবাদিক এগিয়ে এসে বাসু-সাহেবকে প্রশ্ন করে, ইন্সপেক্টর বরাট আপনাকে কী বলেছিলেন, স্যার?

– উনি বলছিলেন, আমি যদি আমার হাতের তাসগুলো আগে বিছিয়ে দিতাম তাহলে প্রসিকিউশন স্মরণিকাকে আদৌ গ্রেপ্তার করত না! প্রথম হিয়ারিঙেই মামলার ফয়শালা হয়ে যেত।

সাংবাদিকটি প্রশ্ন করে, ঠিক কথা। তা আপনি প্রথমেই ও-কথা পুলিশকে বলে দিলেন না কেন? তাহলে এতদিন সময় নষ্ট হত না!

বাসু বুড়ো আঙুল দিয়ে কী যেন ইঙ্গিত করলেন।

ওঁর অঙ্গুলিনির্দেশে দেখা গেল সত্যানন্দ চেকবুক খুলে একটা চেক লিখছেন।

বাসু হেসে বললেন, বোকা ছেলে! একদিনে মামলার ফয়শালা হয়ে গেলে কেউ মোটা ফী দেয়?

সত্যানন্দ ততক্ষণে এগিয়ে এসেছেন চেকটা হস্তান্তরিত করতে। শেকহ্যান্ড করতে। সাংবাদিক তার ক্যামেরা বাগিয়ে ধরে বললে, মিস্ সেন, আপনি যদি দুজনের মাঝখানে, অর্থাৎ আপনার জেঠুর এপাশে..

বাসু গর্জে ওঠেন; অবজেকশন! ফের জেঠু!

(সমাপ্ত)