যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ১

এক

না, যাদু মাত্র তিন তিতো দেখতে গিয়েই হিমসিম। চার নম্বর তিক্ত-স্বাদের বস্তুটি কাকলির পাতে দেবার মওকা পায়নি। তাই কাকলিও ওর সঙ্গে একত্রে সপ্তপদ গমনে স্বীকৃত হয়নি। দাবা খেলার আসরে যাদুগোপাল হার মানেনি তা বলে। কাৎ করেছিল প্রতিপক্ষকে-যে প্রতিপক্ষ হলেও হতে পারত ওর স্বপক্ষ, ওর সঙ্গিনী, জীবনসঙ্গিনী।

বেমক্কা ‘কুইনটা’ খুইয়ে কাকলি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আশ্রয় নিয়েছিল সুজাতা ফটোগ্রাফিক স্টোরসের মেজানাইন ঘরে। জয়া রাগ করেমি। সে বোধকরি বুঝতেই পারেনি কেন বাড়িটা ছেড়ে কাকলি চলে গেল। জয়া মেনে নিয়েছিল ওর দাখিল করা যুক্তিটাকে।কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় কাকলি কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকতে চায়। সে আজ প্রায় তিন বছর অতীতের কথা।

হরগোপাল দত্তের প্রয়াণের পর সংসার-তরণী যখন রীতিমতো টালমাটাল তখন হাল ধরতে এগিয়ে এসছিল যাদুগোপাল। সেই তার এ বাড়িতে প্রথম পদার্পণ। সে তখন কোনক্রমে কম্পার্টমেন্টাল বি.কম.-টা পাস করে ঢুকেছে প্রিয়রঞ্জন রায়ের ফার্মে। কাজ শিখতে। এদিকে রাতে ল পড়ত। প্রিয়রঞ্জন ছিলেন হরগোপালের বন্ধু এবং অ্যাটর্নি যাদুকে উনি পাঠিয়েছিলেন দুই বোনকে “প্রবেট” নেওয়ায় সাহায্য করতে। নানান অফিসে দৌড়ঝাঁপ করতে। হরগোপাল বেশ কিছু সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন মাতৃহীন দুই বোনের জন্য: দোতলা বাড়ি, গাড়ি, এছাড়া গড়িয়াহাট রোডে “সুজাতা ফটোগ্রাফিক স্টোরস্’- এর যাবতীয় অ্যাসেট। খানচারেক দামী ক্যামেরা, মায় একখানা মুভি ক্যামেরা।

জয়া ছোটবেলা থেকেই রুগ্ন। মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে তার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে। হরগোপাল জীবিত থাকতেই। পিতৃবিয়োগের সময় সে একেবারে শয্যাশায়ী নয়, তবে খুব সাবধানে থাকতে হত তাকে। তাই সংসারের যাবতীয় দায়ঝক্কি পড়েছিল ছোটবোন কাকলির স্কন্ধে। বাবা মারা যাবার আগেই ইকনমিক্স-এ বি. এ.-টা পাস করে রেখেছিল। পিতৃ-বিয়োগের পর নাম কাটিয়ে এল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এম. এ. পড়ার মতলবটাকে ত্যাগ করল। কী লাভ? বাবার শেখানো বিদ্যাটাতে মন দিলে আখেরে কাজ দেবে। হরগোপাল ছিলেন তাঁর আমলে একজন প্রখ্যাত আলোকচিত্র-শিল্পী। একাধিকবার সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেছেন। টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনায় ফ্রি-লান্স ফোটোগ্রাফার হিসাবে একবার অলিম্পিকস কভার করতে ভারতের বাইরেও গিয়েছিলেন। ছোট মেয়েকে তিনি হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন এই বিদ্যা। পিতৃ-বিয়োগে কাকলি সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরসের উন্নতিবিধানে সর্বশক্তি নিয়োগ করল। সংসারটা তো চালাতে হবে।

দুই বোন প্রবেট নিল। প্রিয়রঞ্জনকাকাকে ডেকে প্রথমেই কাকলি সম্পত্তিটা ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। দিদির আপত্তি ছিল। কাকলি মানেনি। যোধপুর পার্কের বাড়ির একতলাটা ও যাবতীয় ফোটোগ্রাফির সরঞ্জাম কাকলির। গাড়িটা দিদির। এবারও আপত্তি করেছিল জয়া। গাড়ি নিয়ে কী করব আমি? আর কি কোনদিন গাড়ি চালাতে পারব?

কাকলি সে যুক্তি শোনেনি। জয়া দু-চার মাসের মধ্যেই নিশ্চয় আবার গাড়ি চালাতে পারবে। না হলে একজন ড্রাইভার রাখা যাবে। কিন্তু গাড়িখানা দিদির।

গড়িয়াহাটের দোকানটা কী হবে? স্থির হল, ওটা হবে লিমিটেড কোম্পানি, প্রায় আধাআধি, 40%, শেয়ার এক-এক বোনের। প্রিয়রঞ্জনকাকা তাঁর আইনের যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, অন্তত তিন জন মেজর শেয়ার-হোল্ডারের তে-পায়া টেবিল ঝানাতে না পারলে লিমিটেড কোম্পানির প্ল্যানচেট টেবিলে তেনারা আসেন না। আর নামমাত্র কিছু শেয়ার পরিবারের বাইরে কাউকে বেচে দিতে হবে। কাকলি বলেছিল, তা আপনিই নিন না. কাকা?

প্রিয়রঞ্জন রাজি হননি: না। ভেস্টেড-ইন্টারেস্ট থাকলে আর আমি তোমাদের আইনত পরামর্শ দেবার অধিকারী থাকতে পারব না। খানদশেক শেয়ার বরং যাদুগোপাল কিনে নিক।

যাদুগোপাল বলেছিল, আমার অবস্থা অদ্যভক্ষ্যধনুর্গুণ। কাকলি আর বড়দি যদি কিছু শেয়ার আমাকে দান করে তাহলে অবশ্য আমি সানন্দে স্বীকৃত।

কাকলিকে রূঢ় প্রত্যুত্তরটা দিতে হয়নি। তার পূর্বেই প্রিয়রঞ্জন বলেছিলেন, না, তা হবে না। শেয়ার যে কিনবে সে অ্যাকাউন্ট-পেয়ী চেক দিয়ে কিনবে।

আলোচনার সময় উপস্থিত ছিল স্বর্ণলতা। হরগোপালের আমল থেকেই সে ছিল এই প্রতিষ্ঠানে। হঠাৎ বলে বসল, দিদিরা যদি আপত্তি না করেন তা হলে আমি আমার জমানো টাকায় ঐ দশখানা শেয়ার কিনে নিতে পারি।

সে রকমই ব্যবস্থা হল। স্বর্ণলতা নিল দশটি। বাদ বাকি দশ পার্সেন্ট কিনে নিল পরিচিত এ-ও-সে! ইতিমধ্যে যাদুগোপাল তিল তিল করে দত্ত পরিবারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে পড়েছিল। প্রবেট পেয়ে যাবার পর তার আর এ বাড়িতে সান্ধ্য-হাজিরা দেবার কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু দেখা গেল, ব্যবস্থাপনাটা ওর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। অফিস-ফেরত নিজস্ব হিরো-হন্ডা চেপে যাদুগোপাল যোবপুরের বাসায় নিত্যি হাজিরা দিত। কাকলির সঙ্গে দু-চারটে ফষ্টি-নষ্টি করে দ্বিতলে উঠে যেত, দিদির তত্ত্বতালাশ নিতে এবং তার লাইব্রেরির বই বদল করতে। জয়া বইয়ের পোকা-আর করবেই বা কী, শুয়ে শুয়ে? কাঁহাতক টি.ভি.-র একই নিউজ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় শোনা যায়:

“প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-”, “দ্য প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ সেড-”, “প্রধানমন্ত্রীনে কহা হ্যয়-”

কাকলি লাইব্রেরিতে যাবার সময় পায় না। ফলে রুগ্ন মানুষটার জন্য যাদুগোপাল এগিয়ে এসেছিল স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে। কাকলি তাই বিনিময়ে ওর জন্য বৈকালী-ভোগের ব্যবস্থা রাখত। পরোটা, লুচি, ঘরে-করা কচুরি, ফ্রেঞ্চ টোস্ট– যেদিন যেমন।

ক্রমে কাকলি অনুভব করল, যাদুগোপাল কী একটা বিশেষ মতলব নিয়ে এ বাড়িতে আসে। এ পরিবারের সঙ্গে একটা পাকাপাকি অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রাখতে যেন সে বদ্ধপরিকর। যাদুগোপাল বয়সে জয়ার চেয়ে বছরদুয়েকের ছোট, কাকলির চেয়ে বছরখানেকের বড়। দ্বিতীয়ত, জয়া প্রায় চিররুগ্না, আজ ভাল তো কাল শয্যাশায়ী। ফলে যাদুগোপাল ঘনিষ্ঠ হতে চাইল ছোটবোনের সঙ্গে।

কাকলি সংযত হয়েছিল সময়েই। ছেলেটি স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন, কম্পার্টমেন্টাল হলেও বি.কম. পাস, পিতৃমাতৃহীন। কিন্তু কাকলির কেমন যেন মনে হত-ল-কলেজের ঐ স্বভাব-আয়েসী নৈশ ছাত্রটির মূল লক্ষ্য-যোধপুর পার্কের একটা ফ্ল্যাটবাড়ি, বেশ কিছু ইউনিট ট্রাস্ট সার্টিফিকেট এবং স্ত্রীর উপার্জনে বিনা ঘর্মব্যয়ে সুখী জীবন। কাকলি ওকে পাত্তা দিত না। ক্রমে যাদুগোপালের বৈকালী ভোগটাও বন্ধ করে দিল। কিন্তু তাতেও যাদুগোপালের রঙ্গ দেখানো বন্ধ হল না। সারা দিন দোকানে কাজকর্ম সেরে রাত নটা নাগাদ কাকলি ফিরে আসত। ফিয়াট গাড়িটা গ্যারাজে তুলে ঘরে এসে ঠিকে-ঝি শিবুর মাকে শুধাতো, আজ যাদুবাবু আসেননি, বিকাল নাগাদ?

শিবুর মা ঘর মুছতে মুছতে জবাব দিত, আসবেনি কেন? এসেছিলেন! অ্যাই তো গ্যালেন তিনি, তুমি আসার ঠিক আগে।

– চা করে দিয়েছিলে?

– শুধু চা কেন, ছোড়দিমণি? বড়দি ট্যাকা দিল, আমি ঐ সাঙ্গুভ্যালি থেকে চিংড়ির কাটলেস্ নিয়েএনু তো!

কাকলি এতে আপত্তির কিছু দেখেনি। দিদির কর্মহীন প্রহরযাপনের মাঝখানে ঐ ছেলেটি যদি কিছুটাসঙ্গ দিয়ে যায় তাতে ক্ষতি কী? কাকলি নিজে তো সময়ই পায় না।

ফলে যাদুগোপাল যথারীতি সান্ধ্য হাজিরা দিতে আসত। লাইব্রেরির বই বদলে দেবার অজুহাতে।মাঝে মাঝে সে নিয়ে আসত টাটকা ফুল, নিজেই ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখত। কখনো বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিদির সঙ্গে সাত-তাসের ফিশ খেলত-অল্প পয়সার স্টেকে।

তারপর একদিন প্রিয়রঞ্জনকাকা ওর দোকানে ফোন করে নানান কুশল প্রশ্নের পর জানতে চাইলেন, কাকলি-মা, যাদুগোপাল কি এখনো মাঝে-মধ্যে তোমাদের বাড়িতে যায়?

কাকলি স্বীকার করেনি যে, যাদুগোপাল তার রঙ্গ দেখাতে প্রতিদিন বৈকালে হানা দেয়। সে শুধু বলেছিল, হ্যাঁ, কাকামণি, উনি তো প্রায়ই আসেন। কেন?

– আমার মনে হল ব্যাপারটা তোমাদের জানিয়ে রাখা ভাল।

– ব্যাপারটা! কী ব্যাপার?

– না, মানে যাদুগোপাল সেন আর আমার ফার্মে অ্যাটাচড নেই। বস্তুত আমার সঙ্গে তার দেখাশোনা আদৌ হয় না।

– ও! তা এ-কথাটা বিশেষভাবে জানাচ্ছেন কেন?

– বিশেষ হেতু আছে বলে। যাদুগোপাল যদি বেমক্কা তোমাদের কাছে কিছু টাকা কর্জ চেয়ে বসে-তা সে দু-পাঁচ হাজার বা দু-পাঁচশো যাই হোক, -দেবে না। আমার পরিচিত দু-তিনটি পার্টির কাছ থেকে-যাদের সঙ্গে আমার মাধ্যমেই ওর আলাপ-ও এভাবে টাকা ধার নিয়েছে। তারপর থেকেই নাপাত্তা, বুঝেছ?

কাকলি বুদ্ধিমতী। বুঝতে পেরেছিল সহজেই। কিন্তু কিছুতেই এই সহজ তত্ত্বটা বোঝাতে পারেনি দিদিকে। প্রসঙ্গটা দিদির কাছে উত্থাপনমাত্র জয়া বলেছিল, জানি। প্রিয়কাকা অত্যন্ত অন্যায় ব্যবহার করেছেন যাদুর সঙ্গে। ব্যাপারটা আদ্যোপান্ত যাদু বলেছে আমাকে। বেচারিকে অনেক দুঃখ সইতে হয়েছে।

বাধ্য হয়ে শুনতে হয়েছিল কাকলিকেও। আদ্যন্তই। বেশ বুঝতে পেরেছিল, যাদুগোপালের এটি দু-নম্বর রঙ্গ। বানিয়ে বানিয়ে অতি তিক্ত স্বাদের গল্প ফেঁদেছে। সে কিস্সায় খলনায়ক এক বৃদ্ধ অ্যাটর্নি আর কাহিনীর বঞ্চিত নায়ক সামান্য বি.কম. পাশ প্রবেশনার। যুক্তি দিয়ে, বিচার-বিশ্লেষণ দিয়ে দিদিকে বোঝাতে পারেনি তত্ত্বটা। তারপর ভেবেছিল, ঠিক আছে। কী দরকার দিদিকে জ্ঞানবৃক্ষের ফলাস্বাদন করানোর? জয়েন্ট-অ্যাকাউন্টের চেক বই, ইউনিট ট্রাস্ট আর শেয়ারের কাগজ ইত্যাদি শুধু দোতলার আলমারি থেকে একতলার আলমারিতে স্থানান্তরিত করেছিল। জয়ার কাছে দু-পাঁচশ নগদ টাকা থাকেই। তা সরায়নি। কারণ কাকলি মনে মনে খুশি হত তা থেকে দিদি যদি ওকে কিছু ধার দিত। ঐ বাদুড়ে-খাওয়া মাকাল ফলটার হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে ও একটা সহজ পন্থা-দু-পাঁচশ টাকা ধার দেওয়া।

ঘটনাটা ঘটল সম্পূর্ণ অন্যরকম। একচক্ষু হরিণের মতো কাকলি ওদিকটা একেবারেই নজর করেনি। এ যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণ! তবু আপ্রাণ লড়াই করেছিল-দ্বন্দ্বযুদ্ধ-একদিকে ক্ষুরধারবুদ্ধি সংসার-অভিজ্ঞ অনার্স গ্র্যাজুয়েট কাকলি দত্ত, অন্যদিকে কম্পার্টমেন্টালে বি. কম. পাশ উদীয়মান ল-স্টুডেন্ট যাদুগোপাল সেন। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত, তবু ল-পরীক্ষাটা ওর পাশ করা হয়নি। সে দ্বৈরথ সমরে কাকলি ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। হার মানেনি; কিন্তু ‘কুইনটা’ খোয়া গেল।

যাদুগোপাল বসেছিল দাবাবোড়ের ছক পেতে। অস্বীকার করতে পারে না কাকলি, সে যে বেমক্কা দাবা ধরে ঘোড়ার ওঠসাই কিস্তি দিতে পারে এটা আন্দাজ করেনি, এই যা। মাৎ সে হয়নি। কিন্তু দাবাটা বেমক্কা মার খেল। আবাল্যের জীবনসঙ্গিনী, কত সুখ-দুঃখের সাথী দত্তবাড়ির আদরের ঐ ‘কুইন’।

কাকলি তার পৈত্রিক বাসস্থান ছেড়ে চলে গেল। যোধপুর পার্কের একতলায় নিজের ঘরখানায় চাবি দিয়ে। এসে উঠল ‘সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোর্স-এর ‘মেজানাইন’-এ। যাদুগোপালও একই সঙ্গে বাসা বদলালো। উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি গলির দীর্ঘদিনের বাসাটা। মেসবাড়ির ছারপোকা-অধ্যুষিত চৌকিখানা হাফ-প্রাইসে বেচে দিয়ে এসে উঠল যোধপুর পার্কের বাড়ির দ্বিতলে। ন্যায্য অধিকারে। স্ত্রীর সম্পত্তিতে।

জয়া বয়সে তার চেয়ে দু-বছরের বড়। তা হোক, সে ওর ধর্মপত্নী। রীতিমতো রেজিস্ট্রি করা বিয়ে।

সব জেনে-বুঝেও কাকলি বাধা দিতে পারেনি। দিদিকে সে সত্যিই ভালবাসতো। ও বুঝতে পেরেছিল, ঐ চির-রুগ্না মেয়েটির জন্য কোনদিনই শাদা ঘোড়ায় চেপে দরজার সামনে হাজির হবে না কোন রাজপুত্র। কাকলি নিজে ভূক্ষেপ করে না। কাজের মধ্যেই মেতে আছে সে। বান্ধবীরা বলে, ও নাকি পঞ্চপাণ্ডরের দ্রৌপদী-পাঁচ-পাঁচটা ক্যামেরার যৌথ মালকিন। কিন্তু জয়ার কথা আর কেউ না জানলেও কাকলি তো জানে। সেই কিশোরী বয়স থেকেই রুগ্ন দিদিটা কিসের স্বপ্ন দেখে এসেছে: একটা ঝকঝকে ঘর, একটা তকতকে বর, আর একটা বকবকে বাচ্চা।

শরীর যত ভেঙে পড়েছে, কামনাটা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। এ একদিক থেকে ভালই হল। দিদি ঝকঝকে ঘর পেয়েছিল-বাবার আশীর্বাদে।বকবকে বাচ্চা পেলেও পেতে পারে। ডাক্তারবাবুদের সাধনায়। তবে হ্যাঁ, বর সে পেয়েছে নিজের কেরামতিতে। ভালবেসে। অন্তত তার তো সেটাই ধারণা। কাকলি জানত, দিদি মূর্খের স্বর্গে বাস করছে; কিন্তু যে-কটা দিন স্বর্গসুখ পায় সে-কটা দিন তাকে তা পেতে দেবে না কেন?

কাকলি বুঝতে পেরেছিল-যাদুগোপালের এই চরম-রঙ্গের তিক্ততা সে নিজে বরদাস্ত করতে পারবে না। তাই কাজের অজুহাতে ও বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল। ওতপ্রোতভাবে ডুবে গিয়েছিল দোকানের কাজে। ইতিমধ্যে ‘ক্যামেরা-পার্সন’ হিসাবে কাকলি দত্তও ক্রমে ক্রমে স্বনামধন্যা হতে শুরু করেছে। অনেক নাম করা জার্নালে তার তোলা ফটো ছাপা হয়। মুভি-ক্যামেরা নিয়ে একটা ডকুমেন্টারিও তুলেছে। রাশ-প্রিন্ট দেখে বুঝেছে ভালভাবে এডিট করাতে পারলে দামি ছবি হতে পারে। বিষয়বস্তুটা “বাংলার মেলা”।

শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা থেকে ঘোষপাড়ার মেলা, মায় মকর-সংক্রান্তির সাগর মেলা। এডিটিংটা কাকলি ভাল জানে না। তাই ছবিটা পাতে দেবার মতো প্রস্তুত নয়।

মাঝে মধ্যে যোধপুর পার্কের বাড়িতে যায়। দিদির সঙ্গে গল্প-গুজব করে আসে। যাদুগোপাল আগলে রাখে স্ত্রীকে। শালীর দেখ-ভাল করার অছিলায়। কাকলি বোঝে সবই। সহ্য করতে হয় তাকে। দিদি যেন টের না পায়।

জয়া এখনো শয্যাশায়ী।

ডাক্তারবাবু নাকি বলেছেন, জয়াকে সাংসারিক চিন্তা-ভাবনা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। হার্টের অসুখ তো! রক্ত চাপ-কালাজ্বর রোগীর টেম্পারেচারের মতো-ক্রমাগত ওঠে আর নামে। যাদুগোপাল বুক দিয়ে আগলে রাখে স্ত্রীকে। জয়া কৃতজ্ঞ। বিগলিত।যাদুগোপালের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কী সেবাটাই না করছে বেচারি।

সাংসারিক কোনও দায়ঝক্কি জয়াকে আর পোহাতে হয় না।

ঘরের কাজকর্ম শিবুর মা-ই করে। ঐসঙ্গে রেখেছে একটা ছোকরা কম্বাইন্ড হ্যান্ড। রান্নাবান্নাটা ঐ ছোকরাই করে। মেদিনীপুরে বাড়ি। নাম নেতাই।

আর নৌকার হাল ধরে বসে আছে স্বয়ং যাদুগোপাল।

ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, হিসাব রাখা, ইলেকট্রিক বিল, টেলিফোনের বিল মেটানো ইত্যাদি সব দায়ঝক্কি যাদুগোপালের।

কাকলি সঙ্কোচে দিদিকে প্রশ্ন করতে পারেনি আলমারির চাবিটা থাকে কার কাছে? অথবা সেভিংসঅ্যাকউিন্ট থেকে টাকা তুলতে কি দুজনের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয় না?