এগারো
ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম রাত আটটা আটান্ন মিনিটে বাসু সাহেব নার্সিং হোমের উপরতলায় ডক্টর ব্যানার্জির ডোর-বেলটা টিপে ধরলেন। পাঁচ-সেকেন্ডের ভিতর সেটা খুলে গেল। উজ্জ্বল গৃহাভ্যন্তরে একটি নার্স– বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বয়স হবে তাঁর – দরজা খুলে দ্বারপথে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন: ইয়েস?
– ডক্টর পি. ব্যানার্জি আছেন?
– আছেন। কে এসেছেন জানাব?
বাসু-সাহেব নিঃশব্দে মেয়েটির হাতে একটি ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে ধরেন। দেখে নিয়ে মেয়েটি বললে, আই সি! আপনিই আজ সকালে টেলিফোন করেছিলেন, তাই নয়?
– হ্যাঁ, আপনার সঙ্গেই কথা হয়েছিল বুঝি?
– তাই হয়েছিল। আমিই সেই দূতী! তা আমি আপনার মেসেজটা ওঁকে পৌঁছে দিয়েছি:বাট, আয়াম সরি এগেন, উনি অন্য কাজে ব্যস্ত আছেন, আজ দেখা হবে না।
– বাড়িতে আর কে আছেন? মিসেস ব্যানার্জি?
– না, উনি ব্যাচিলার।
– তাহলে আমার ওই কার্ডখানা ওঁকে দেখান। আর ওঁকে বলুন যে, আমি এসেছি ওঁর পয়েন্ট-থ্রিটু-বোর কোল্ট অটোমেটিকটার বিষয়ে আলোচনা করতে, যার নম্বর থ্রি-সেভেন-ফাইভ-নাইন-সিক্সটু-ওয়ান…ফলো?
মেয়েটি রীতিমতো ঘাবড়ে যায়। বিশেষ করে সাত-সাতটা সংখ্যায়!
বাসু-সাহেব বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। অতগুলো সংখ্যা তোমার পর পর মনে থাকবে না মা, তুমি শুধু বল ডাক্তারবাবুর রিভলভারটার বিষয়ে। আর বল, আমি এখানে ত্রিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করব, তারপর দরজা খুলে ওঘরে যাব। ফলো?
নার্সটি এবার নিঃশব্দে পিছন ফিরল। ভিতরের দিকের দরজাটা খুলে অন্দরমহলে ঢুকে গেল। দরজাটা সযত্নে বন্ধ করে দিয়ে। বাসু দাঁড়িয়েই রইলেন মণিবন্ধের ঘড়িটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। ত্রিশ সেকেন্ড অতিক্রান্ত হতেই তিনি ভিতরের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। সৌজন্যমূলক মৃদু করাঘাত করে দরজাটা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন। সেটি ডাক্তারবাবুর বেড-কাম-সিটিং রুম। সিঙ্গল-বেড বিছানাটা ঘরের ও-প্রান্তে। এখানে টেবিলে টেলিফোন, কাগজপত্র। ডাক্তারবাবু বসেছিলেন তাঁর চেয়ারে। নার্সটি পাশে দাঁড়িয়ে।
দু-জনেই মুখ তুলে এমন আতঙ্কতাড়িত দৃষ্টিতে আগস্তুকের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যেন ম্যাকবেথের ডিনার-পার্টিতে অনিমন্ত্রিত ব্যাঙ্কোর ভূত বেমক্কা ঢুকে পড়েছে! যেন এখনি ডক্টর ব্যানার্জি আর্তনাদ করে উঠবেন: ‘দাউ কান্ট্ সে দ্যাট আই ডিড ইট!’
বাসু তাঁর পিছনে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গম্ভীরভাবে বলেন, সময়ের দাম আপনার-আমার দু-জনেরই আছে।তাই সৌজন্যমূলক খেজুরে আলাপ বাদ দিয়ে সরাসরি প্রসঙ্গটার অবতারণা করতে চাই। তাছাড়া ভেবে দেখুন, ডক্টর ব্যানার্জি– আপনাকে ত্রিশ-সেকেন্ডের চেয়ে বেশি সময় দিলেই আপনি একগাদা আজগুবি অবাস্তব কৈফিয়ৎ ভেবে-ভেবে বার করতেন। তাতে আবার দুজনেরই সময় নষ্ট হত– কারণ আমাকে প্রমাণ করতে হত কৈফিয়তগুলি অবাস্তব এবং আজগুবি, ধোপে টেকে না! শ্যাল আই স্টার্ট?
ডক্টর ব্যানার্জি চেয়ার চেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বলিষ্ঠ গঠন যুবাপুরুষ। যুবা ঠিক নয়, স্বাস্থ্যবান হলেও বোঝা যায়, মেঘে-মেঘে কিছুটা বেলা হয়েছে। কানের পাশে বড়ো বড়ো জুল্পিতে সাদা-আখরে সেই বার্তার ঘোষণা।
বজ্রনির্ঘোষে ডক্টর ব্যানার্জি বললেন, হু ডু যু থিংক য়ু আর? আপনি কে মশাই? কী চান? এভাবে আমার বাড়িতে চড়াও হয়েছেন কেন? এই মুহূর্তে যদি আপনি আমার ঘর ছেড়ে চলে না যান, তাহলে আমি পুলিস ডাকতে বাধ্য হব। আমিও আপনাকে ত্রিশ সেকেন্ড সময় দিচ্ছি, অনধিকার প্রবেশের মামলা থেকে বাঁচতে।
একটা হাত উনি বাড়িয়ে দিলেন টেলিফোনটার দিকে!
বাসু দু-পা ফাঁক করে রোডস্-দ্বীপের কলোসাস-মূর্তির মতো নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েকটা মুহূর্ত – তারপর বললেন, আপনি তিনটি প্রশ্ন করেছেন। ত্রিশ সেকেন্ড সময়ও দয়া করে দিয়েছেন। তা আমার জবাবটা কি ওই ভদ্রমহিলার উপস্থিতিতেই দেব?
– ও আমার কনফিডেনশিয়াল নার্স! বলুন?
– টেলিফোনে পুলিস-স্টেশনকে ধরতে পারলে থানাকে ওই সঙ্গে জানিয়ে দেবেন যে, ছন্দা বিশ্বাসের হাতব্যাগে ঘটনার রাত্রে একটা পয়েন্ট থ্রি-টু রিভলভার ছিল, যে-কথা পুলিস এখনো জানে না আর সে রিভলভারের কেরিয়ার লাইসেন্স ছন্দার ছিল না। এবং যার লাইসেন্সি…
ডক্টর ব্যানার্জি স্থিরদৃষ্টিতে ওঁর দিকে পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর পাশ ফিরে নার্সটিকে বললেন, তুমি বাইরের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা কর জবা। সি দ্যাট উই আর নট ডিস্টার্বড।
নার্সটি ভীত-চকিত দৃষ্টিপাত করে ধীরে ধীরে বাইরের ঘরে চলে গেল। তার সেই বিচিত্রদৃষ্টির মনস্তাত্ত্বিক-বিশ্লেষণ করলে শতকরা কত ভাগ ঘৃণা, কত ভাগ অপমানবোধ আর কতটাই বা আক্রোশের নির্যাস বার হবে সেটা অনুমান করা কঠিন।
ডক্টর ব্যানার্জির প্রশ্ন: এবার বলুন আপনি কে
– ছন্দা বিশ্বাসের অ্যাটর্নি।
স্পষ্টতই একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল গৃহস্বামীর। বললেন, ছন্দা আপনাকে পাঠিয়েছে?
– না।
– ছন্দা এখন কোথায়?
– আপনি জানেন না? হাজতে! খুনের অপরাধে।
– না, জানতাম না। আমার ধারণা হয়েছিল সে জামিন পেয়েছে। যাই হোক, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন? ওই রিভলভারটা ছন্দা তো ব্যবহার করেনি।
– রিভলভারটা গৌণ। আমি জানতে এসেছি অন্য একটা তথ্য! একটা ডেথ-সার্টিফিকেটের বৈধতার বিষয়ে…।
ডাক্তার ব্যানার্জির মুখটা শাদা হয়ে গেল। ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি। বললেন, বলুন! কার ডেথ-সার্টিফিকেট?
– সাম মিস্টার কমলেশ বিশ্বাস! লোকটা আপনার নার্সিং হোমে মারা যায়। ম্যালিগ্ন্যান্ট টাইপ লাং-ক্যান্সারে। সাতাশে মার্চ, উনিশ-শ অষ্টআশি সালে…
ব্যানার্জি তাঁর বিশুষ্ক অধরের উপর জিবটা বুলিয়ে নিয়ে কোনোক্রমে বললেন, অষ্টাশি সাল! সে তো তিন বছর আগেকার কথা! কী নাম বললেন? বিশ্বাস? কমলেশ বিশ্বাস? আপনি কাল আসুন…আমি রেজিস্ট্রি খাতা খুঁজে…
বাসু ঝুঁকে আসেন একটু: নাউ, লুক-হিয়ার, ডক্টর ব্যানর্জি। সওয়াল-জবাব করাই আমার পেশা! সাক্ষীকে পাঁকাল মাছ হতে দেওয়া আমার স্বভাববিরুদ্ধ। ছন্দা বিশ্বাসের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কথা আমি জানি– না হলে ওকে নিজের রিভলভারটা ওভাবে ধার দিতেন না। রেজিস্ট্রি খাতা দেখার দরকার নেই – আমি মুখে মুখে বলে যাচ্ছি, শুনুন। বাইশে মার্চ আপনার নার্সিং-হোমে একটি মরণাপন্ন ক্যান্সার রোগী ভর্তি হয়। পাঁচদিন পরে সে মারা যায়। আপনি তার ডেথ-সার্টিফিকেট দেন। মনে পড়েছে?
ব্যানার্জি বলেন, দেখুন…কী বলব?…খাতাপত্র কিছু না দেখে…
বাসু পকেট থেকে একখণ্ড কাগজ বার করে ওঁর টেবিলে মেলে ধরেন। বলেন, দেখুন! এটা আপনার স্বাক্ষর? এই ডেথ-সার্টিফিকেটে? এবার আমাকে বুঝিয়ে বলুন কীভাবে আপনার হসপিটাল-রেজিস্টারে এই রোগীর যাবতীয় তথ্য ছন্দার নিরুদ্দিষ্ট স্বামীর সঙ্গে হুবহু মিলে গেল? নাম, বয়স, বাবার নাম, পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস এটসেট্রা, এটসেট্রা…
পুনরায় ডক্টর ব্যানার্জি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মিনিটখানেক কী ভেবে নিয়ে বললেন, আপনাকে একটা কথা বলব, বিশ্বাস করবেন?
– কী কথা?
– ছন্দাকে আমি ভালোবাসি…
– এ আর কী নতুন কথা? আমিও তাকে ভীষণ ভালোবাসি। বিশ্বাস না হয় তার সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন। সে আমাকে মাত্র একশ টাকার রিটেইনার দিয়েছে, আর আমি ইতিমধ্যে তার পিছনে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বসে আছি।
– আমি সে অর্থে ভালোবাসার কথা বলিনি। আমি কেন একাজ করেছি তা আপনি বুঝবেন না। কারণ বুঝলে, এভাবে আমাকে ব্যঙ্গ করতেন না। আমি সত্যিই তাকে আমার প্রাণের চেয়ে ভালোবাসি।
– কিন্তু ফলস্-সার্টিফিকেটটা সই করলেন কেন?
– না হলে ছন্দা কিছুতেই প্রমাণ করতে পারত না যে, বাস-আাক্সিডেন্টে তার স্বামী মারা গেছে। ইনিশিওরেন্সের সেই ন্যায্য টাকাটা সে কোনদিন আদায় করতে পারত না। ও নিজেকে মনে করত বিধবা; কিন্তু আইনের চোখে সেটা প্রমাণ করা যাচ্ছিল না। এই সময় আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে। এক ভদ্রলোক তাঁর মেসের এক রুমমেটকে আমার নার্সিং-হোমে ভর্তি করাতে চাইলেন। লোকটার তিনকুলে কেউ নেই। কলকাতার একটা মেসে থেকে কী একটা কোম্পানীতে ভেন্ডারের কাজ করত। নার্সিং-হোমে ভর্তিহবার মতো সঙ্গতি তার নেই। কোনো হাসপাতালেও ফ্রি-বেড পাচ্ছিল না। কারণ সব হাসপাতালই বলেছে কেস টা অ্যাকিউট ক্যান্সারের। চিকিৎসার বাইরে। অথচ মেস-ম্যানেজার ওই মরণাপন্ন রোগীকে মেসেও রাখতে রাজি নয়। আমি ওর রুমমেটকে বললাম, আমি রুগিকে একটা ফ্রি-বেড দিতে পারি যদি সে আমার নির্দেশ মতো নাম ধাম লেখায়। রোগীর তখন বাক্শক্তি লুপ্ত হয়েছে। তার রুমমেট নিকট আত্মীয়ের মিথ্যা পরিচয়ে রোগীর নাম-ধাম, বয়স ইত্যাদি খাতায় লিখিয়ে দিয়ে যায়। বিশ্বাস করুন মিস্টার বাসু, চিকিৎসার কোনো ত্রুটি আমরা কেউ করিনি। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই রোগীটি মারা গেল। আমি ডেথ-সার্টিফিকেট লিখে দিলাম। হিন্দু সৎকার-সমিতির গাড়ি আনিয়ে দিলাম। ওর রুমমেট রুগিটিকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে সেই যে কেটে পড়ল আর এ দিকে ভেড়েনি। হয়তো তার ভয় ছিল মিথ্যা নাম-ধাম লেখানোর জন্য। যাই হোক, আমি, আমার দুই স্ট্রেচার-বেয়ারা, আর ছন্দা সৎকার সমিতির গাড়িতে করে হতভাগ্যকে ক্যাওড়াতলা ক্রিমেটোরিয়ামে পুড়িয়ে দিয়ে এলাম। বিশ্বাস করুন মিস্টার বাসু, শ্মশানে ছন্দা হাউ-হাউ করেকাঁদছিল। আমাকে বললে, মনে হচ্ছে আমি দ্বিতীয়বার বিধবা হলাম।
– তারপর ছন্দা দশ হাজার টাকা আদায় করল?
– তা করল। আমার ওই ডেথ-সার্টিফিকেটের বলে!
– আঁপনি কতদিন ধরে ওকে চেনেন?
– ও পাস করার পর থেকে-প্রায় ছয় বছর। এখানে কাজ করতে আসে যখন, তখন ওর সিঁথিতে সিঁদুর ছিল। এখানে কাজ করতে করতেই খবর পায় বাস-দুর্ঘটনায় ওর নিরুদ্দিষ্ট স্বামী মারা গেছে। তারপর এখানেই কাজ করতে থাকে নার্স হিসাবে।
– ও বিধবা হবার পর আপনি কি ওকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন?
ডাক্তার ব্যানার্জির মুখচোখ লাল হয়ে ওঠে। মুখ তুলে বলেন, এসব প্রশ্নের কি কোনো প্রয়োজন আছে?
– আছে। বলুন?
– হ্যাঁ, চেয়েছিলাম। সে রাজি হয়নি।
– কেন সে আপনাকে ভালোবাসতে পারল না, তা আন্দাজ করতে পারেন?
– কে বললে সে আমাকে ভালোবাসতে পারেনি? আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল সম্পূর্ণ অন্য কারণে। ও স্থির করেছিল আবার বিয়ে করবে না। পুরুষমানুষকে আর সে বিশ্বাস করতে রাজি ছিল না – অন্তত স্বামী হিসেবে নয়।
– – তারপর হঠাৎ একদিন সে ধনকুবেরের একমাত্র পুত্রটিকে রাতারাতি বিয়ে করে বসল!
– আদালত আর অপরাধ জগতের বাইরে আপনি যে কিছুই বোঝেন না, সে-কথা আপনার এই মন্তব্যে বোঝা যায়!
– কোনটা ভুল বলেছি? ত্রিদিবনারায়ণ ধনকুবেরের একমাত্র সন্তান নয়? নাকি মাত্র এক সপ্তাহের কোর্টশিপে ওদের বিয়েটা হয়নি।
– কথাটা তা নয়। প্রতিটি নারীর আদিম প্রেরণা: মাতৃত্ব! এটা জীববিজ্ঞানসম্মত, বিবর্তনবাদসম্মত। তার যে মোহিনীরূপ, পুরুষকে ভালোবাসা, পুরুষকে কাছে পেতে চাওয়া, তারও মূল প্রেরণা ওই ‘সারভাইভাল অব দ্য স্পেসিস্’। কমলেশের বিশ্বাসঘাতকতায় ওর মনের একটা দিক থেঁতলে গেছিল। কিন্তু তার মাতৃত্বকামনাটাকে কমলেশ মাড়িয়ে যেতে পারেনি। ত্রিদিবের মধ্যে ছন্দা সেই অনুভূতিটা চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। ত্রিদিব ওকে আঁকড়ে ধরেছিল, ভেবেছিল সে নিজে ছন্দার প্রেমে পড়েছে – আসলে সে শুধু বাঁচতে চেয়েছিল। যেন ডুবন্ত মানুষের কাছে ছন্দা একটা ভেসে যাওয়া কাঠ! আর ছন্দা চেয়েছিল তার অপূর্ণ মাতৃত্ব কামনাকে চরিতার্থ করতে! আমি মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করেছি। তাই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু ছন্দাকে বুঝিয়ে দিতে পারিনি। সে মনে করেছিল, আমি ত্রিদিবকে ঈর্ষা করছি অহেতুক।
– তারপর কি আপনার সঙ্গে ছন্দার মনান্তর হয়?
– মোটেই নয়। আমরা দু-জনে দুজনের বন্ধু। ছন্দার রেজিস্ট্রি বিয়েতে আমিই একমাত্র কনের তরফের বন্ধু হিসাবে উপস্থিত ছিলাম।
– তারপর হঠাৎ কমলেশের আবির্ভাব ঘটল?
– হ্যাঁ! হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে সে এসে উপস্থিত। বোধকরি ইনশিওর কোম্পানিতে খোঁজ নিয়ে সে জানতে পেরেছিল ছন্দা কীভাবে টাকাটা আদায় করেছে।
– আপনাকে ব্ল্যাক-মেইল করার চেষ্টা করেনি?
– না! ডেথ-সার্টিফিকেট কে দিয়েছে, তা ও জানতে পারেনি। ও আমাকে চিনত না। ও শুধু ছন্দার টাকা চেয়েছিল।
– কত টাকা?
– তৎক্ষণাৎ দু-হাজার আর এক মাসের মধ্যে দশ হাজার।
– ছন্দার কাছে অত টাকা ছিল না?
– না, ছিল না। আমি ধার দিতে চেয়েছিলাম। সে রাজি হয়নি। বলেছিল, এভাবে ব্ল্যাকমেলারকে রোখা যায় না। কমলেশ ওকে চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিয়েছিল।
– সেজন্যই ওকে রিভলভারটা দিয়েছিলেন?
– ঠিক সেজনাই নয়। ও যাতে আত্মরক্ষার্থে ব্যবহার করতে পারে তাই ওটা ছন্দাকে রাখতে দিয়েছিলাম।
– আপনি তাহলে জানতেন যে, শনিবার রাত একটার সময় ছন্দা ওই কমলেশের সঙ্গে দেখা করতে যাবে? তারাতলায়?
– – হ্যাঁ, জানতাম। ছন্দা আমাকে বলেছিল।
– সেই জন্যেই আপনি রাতে তারাতলায় যান?
– আমি? তারাতলায়? শনিবার রাতে? নিশ্চয় নয়!
– শনিবার রাত একটার সময় আপনি কোথায় ছিলেন?
– ন্যাচারালি বাড়িতে। ঐ সিঙ্গল-বেডখাটে অঘোর ঘুমে অচেতন।
– আপনার কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ আছে?
– এর আবার কী প্রমাণ থাকবে?
– আপনার বাড়িতে একজন ওড়িয়া চাকর আছে। আপনার কম্বাইন্ড হ্যান্ড। সে কোথায়?
– আপনি কী করে জানলেন?
– তাকে ডাকুন। আমি জানতে চাই শনিবার রাত দেড়টার সময় টেলিফোন ধরে কেন সে মিথ্যা কথা বলেছিল?
– গদাধর? কী বলেছে গদাধর?
– ‘ডাক্তারবাবু গাড়ি নিয়ে কোথায় বেরিয়ে গেছেন! ‘ কেন? আপনি ফিরে আসার পর সে আপনাকে বলেনি যে, একটা টেলিফোন কল এসেছিল রাত বারোটা তেতাল্লিশে?
– গুড গড! আপনি…আপনি ঘটনার আগে কেমন করে আমাকে ফোনে…
– আপনি যখন সাক্ষী দিতে উঠবেন তখন পুলিসের কাউন্সেল ওই প্রশ্নটা করবে। আপনি কোথায় রোগী দেখতে গেছিলেন, শনিবার রাত বারোটা তেতাল্লিশে।
– আমি…আমি কেন সাক্ষী দিতে যাব?
– যেহেতু আপনি সমন পাবেন। শুনুন ডক্টর ব্যানার্জি, আপনাকে বিপদে ফেলা আমার উদ্দেশ্য নয়। ছন্দা আমার ক্লায়েন্ট; ন্যাচারালি ছন্দার বন্ধুদের উপকারই আমি করব। পরিবর্তে তাদের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করি আমি। আপনি আদ্যন্ত সত্য কথা খুলে বলবেন? ওই শনিবার রাত্রির ঘটনাটা?
একমুহূর্তে চিন্তা করে রাজি হয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু। বলে গেলেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা–
হ্যাঁ, উনি জানতেন যে, ছন্দা রাত একটার সময় কমলেশের বাড়িতে যাবে বলে কথা দিয়েছে। ছন্দার ইচ্ছে ছিল কমলেশকে বুঝিয়ে বলবে যে, তার অনেক কীর্তি-কাহিনীর কথা ছন্দাও জানে। একটা মুখোমুখি ফয়শলা করতে চেয়েছিল সে। ডাক্তারবাবু ওকে আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসাবে আগ্নেয়াস্ত্রটা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ছন্দা ওঁকে বলেছিল যে, জীবনে সে পিস্তল ছোঁড়েনি। প্রয়োজনে সময় মতো সেটা ব্যবহার করতে পারবে কি না তার নিজেরই সন্দেহ আছে। রাত বারোটা নাগাদ উনি উঠে পড়েন। গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বার করে চলে আসেন তারাতলায়। কমলেশের বাড়িটা উনি চিনতেন। প্রায় একশ গজ দূরে গাড়িটা পার্ক করে উনি হেঁটে চলে– আসেন। তখন কমলেশের ঘরে আলো জ্বলছিল।রাস্তার ধারে ছন্দার মারুতি গাড়িটাকে পার্ক করা অবস্থায় দেখতে পান। কিছু দূরে একটা মোটর সাইকেলও দাঁড় করানো ছিল। বাড়ির কাছাকাছি এসে ওঁর মনে হল দেড়তলার মেজানাইনে একটা বচসা হচ্ছে। তারপরেই কাচের কিছু একটা ভেঙে যাবার শব্দ আর সঙ্গে সঙ্গে বাতিটা নিবে গেল। ডক্টর ব্যানার্জি তখন ডোরবেলটা টিপে ধরেন।
কেউ সাড়া দেয় না। হঠাৎ রাস্তায় একটা বম্ এক্সপ্লোশান হল যেন। উনি ছুটে পালিয়ে গেলেন কিছু দূরে। সেখান থেকে পিছন ফিরে দেখেন– না, শব্দটা মোটর-বাইক স্টার্ট হবার। উনি দাঁড়িয়েপড়েন। বোধহয় মিনিটখানেক পরে কমলেশের সদর দরজা খুলে যায়। ছন্দা ছুটে বেরিয়ে আসে। গাড়িতে উঠে বসে। স্টার্ট দেয়। ছন্দা পালিয়ে আসতে পেরেছে দেখে উনি নিশ্চিন্ত হন। উনিও নিজের গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেন। পিছনে কী ঘটল তা আর দেখেননি।
– আপনি আর কোনো লোককে দেখেননি?
– কোথায়?
– ধরুন, ওই বাড়ির কাছে-পিঠে বা বাঁশের ভারা বেয়ে নামতে?
– না।
– আর কোনো গাড়ি কি পার্ক করা ছিল। রাস্তার ধারে?
– তা হয়তো ছিল। আমি নজর করিনি।
– বাসু-সাহেব দশ সেকেন্ড চিন্তা করে বললেন, এবার আমি আপনাকে একটা খুব গোপন কথা বলতে চাই। যদি আপনি কথা দেন যে, কথাটা পাঁচ কান করবেন না!
– কী কথা?
– আমি বলতে চাইছিলুম যে, আপনাকে খুব সুস্থ বোধ হচ্ছে না।
– এই আপনার গোপন কথা? আমার যা মানসিক অবস্থা তাতে আমাকে কেমন দেখানোর কথা? খুব সুস্থ? হেইল অ্যান্ড হার্টি?
– তা নয়, মানে এই রকম শারীরিক, এমন মানসিক অবস্থায় সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে…
– সাক্ষী! আমি কেন সাক্ষী দিতে যাব? ছন্দার পক্ষে? আপনি ‘সমন’ করবেন?
– না, আমি করব না। আপনার সাক্ষ্য তো ছন্দার ক্ষতিই করবে শুধু। আমার মনে হয় ছন্দার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবার জন্য আপনার ডাক পড়বে, পুলিসের তরফ থেকে! পুলিস যখনই আবিষ্কার করবে যে, ছন্দা ওই ইনশিওরেন্স-এর টাকাটা তার স্বামীর জীবিতকালে নিয়েছে তখনই আপনাকে তলব করবে। প্রমাণ করতে যে, মেয়েটি পাকা ক্রিমিনাল, – আগেও তঞ্চকতা করেছে! আপনাকেও এ মামলায় তারা জড়াতে চাইবে – ফল্স ডেথ সার্টিফিকেট দেবার জন্য!
ডাক্তারবাবু অসহায় ভঙ্গিতে বাসুর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।
– তাই তো বলছিলাম, আপনাকে খুবই অসুস্থ লাগছে! আপনার কোনো পেশেন্ট যদি এমন অবস্থায় পড়ে তখন আপনি তাকে কী পরামর্শ দেন? একজন স্পেশালিস্টকে দিয়ে দেখাতে। তাই নয়? আমার কথায় কিছু করে বসবেন না। তবে স্পেশালিস্টের কাছে আপনি জানতে চাইতে পারেন এ অবস্থায় বায়ু পরিবর্তনে কোনো উপকার হতে পারে কি না। আই মিন…
– কী বলছেন আপনি! ছন্দার এই বিপদ, আর আমি তাকে ফেলে এখন বেড়াতে যাব?
– তা যদি বলেন ডক্টর ব্যানার্জি, তা হলে বলি – আপনার কলকাতায় উপস্থিতিটাই ছন্দার সর্বনাশের কারণ হতে পারে। অবশ্য আমি শুধু স্বাস্থ্যের কারণে আপনাকে রাতারাতি চেঞ্জে যেতে বলছি, তার সঙ্গে ছন্দার কোনো সম্পর্ক নেই। সেটা শুধু আপনার স্বাস্থ্যের কারণে। অবশ্য আমি তো ডাক্তার নই। আপনি কোনো স্পেশালিস্টের পরামর্শ মতো যদি…
হঠাৎ দাঁড়িয়ে ওঠেন ডক্টর ব্যানার্জি। বাসু-সাহেবের দুটো হাত চেপে ধরে বলে ওঠেন, থ্যাঙ্কস কাউন্সেলার! কথাটা অনেক আগেই আমার বোঝা উচিত ছিল! কাল সকালেই..
– আপনার অবসর বিনোদন কালের ঠিকানাটা…
– না, না, নিশ্চিন্ত থাকুন। জবাকেও তা জানিয়ে যাব না। এ মামলা না মেটা পর্যন্ত… অল রাইট, অল রাইট! এসব কথা আলোচনা করাও মূর্খতা। আই নো!
– বঁ ভয়েজ! – বাসুও উঠে দাঁড়ান!
যেন ডাক্তারবাবু এখনই রওনা দিচ্ছেন।
