যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ১৫

পনের

ব্রিফকেস থেকে একগোছা লম্বাটে কাগজ বার করে বাসু-সাহেব রানু দেবীর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, এগুলো আলমারিতে তুলে রাখ তো।

সুজাতা এগিয়ে এসে বলে, মামিমা কেন কষ্ট করবেন, আমি তুলে রাখছি। দিন।

রানু ইতিমধ্যে কাগজের বাণ্ডিলটা নিয়ে দেখেছেন। রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যান তিনি। বলেন, এগুলো তোমার কাছে এল কী করে? এ তো সেই দোকানের শেয়ার।

বাসু সুজাতার দিকে ফিরে বললেন, কাজটা যদি তোমাকে দিয়ে হত সুজাতা, তাহলে আমিই বা রানুকে কষ্ট দেব কেন? আমার ইচ্ছা ছিল ব্যাপারটা তোমার কাছ থেকে গোপন রাখা। কিন্তু রানু তা হতে দিল না।

রানু বলেন, সুজাতার কাছে গোপন করার কী আছে?

বাসু পাইপ আর পাউচের সন্ধানে পকেটে হাত চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তু খুঁজতে খুঁজতে বললেন, আইনজীবীর সহধর্মিণী হয়ে এটুকু তুমি বুঝতে পারলে না, রানু? তুমি আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি, তাই তোমাকে বা আমাকে কেউ প্রশ্ন করলে আমরা জবাব নাও দিতে পরি, কিন্তু সুজাতাকে কাঠগড়ায় তুলে যদি প্রশ্ন করা হয় তখন ও স্বীকার করতে বাধ্য হবে।

সুজাতা জানতে চায়, ওগুলো ওই প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার? জয়া দেবীর অংশের শেয়ারগুলো?

বাসু ততক্ষণে পাইপটা ধরিয়েছেন। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, না। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির হলে যাদুগোপাল ওই শেয়ার গচ্ছিত রেখে জীবন হালদারের কাছ থেকে কর্জ করতে পারত না।

কৌশিক জানতে চায়, কেন?

– ছাপ্পান্ন সালের কোম্পানিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী। কারণ, প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার বোর্ড অফ ডিরেক্টার্সের অনুমতি ছাড়া কেনা-বেচা করা যায় না। ওই ফটোগ্রাফিক স্টোর্স বাস্তবে একটা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। তার চল্লিশ শতাংশ শেয়ার কাকলির আর সমপরিমাণ শেয়ার ছিল জয়ার। দশ শতাংশ ছিল স্বর্ণলতার, যা বর্তমানে ভৈরব হস্তগত করেছে। আর বাদবাকি দশ শতাংশ ওদের সাত-আটজন আত্মীয় বন্ধুর নামে। তা সে যাই হোক, মিসেস সেনের চল্লিশ শতাংশ শেয়ার যে আমার কাছে আছে এ-কথা তোমরা দু’জন গোপন রেখ। মানে, যতক্ষণ না কাঠগড়ায় উঠে হলফনামা নিচ্ছ।

কেউ কোন জবাব দেয় না।

বাসু আবার বলেন, কই বিশুটা কোথায় গেল? আজ বিকালে চা-টা পাওয়া যাবে না? আমাকে যে একবার বেরুতে হবে। সে অনেকক্ষণ আগে টেলিফোন করেছিল।

কৌশিক গাড়িটা পার্ক করল গড়িয়াহাটা রোডে, সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরসের কাছাকাছি। সুজাতা নামল গাড়ি থেকে। বাসু কৌশিককে বললেন, তাড়াহুড়ায় মনে ছিল না। তুমি একটু এগিয়ে কোনও দোকান থেকে একবার ‘পান্থজনসখা হোটেলে’ ফোন কর। রিসেপশনকে বল, মিসেস মীনাক্ষী মজুমদারকে লাইনটা দিতে। জয়ার সঙ্গে যোগাযোগ হলে জানতে চাইবে এ বেলা সে কেমন আছে, আর ইতিমধ্যে সে কাকলিকে কোনো ফোন করেছে কিনা।

কৌশিক বলে, ফোনটা তো কাকলির দোকান থেকেও করা চলে মামু।

– হয় তো চলে, হয় তো চলে না। ঠিক জানি না। কাকলি ঘণ্টাখানেক আগে ওর দোকানে আসতে বলেছিল। তার এমন কিছু বক্তব্য ছিল যা টেলিফোনে বলার যোগ্য নয়। তাই আমি ও রিস্কটা নিতে চাই না। সেখানে ইতিমধ্যে কী পরিস্থিতি হয়েছে কিছুই তো জানি না।

কৌশিক ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে আবার গাড়িতে স্টার্ট দিল। ওঁরা দুজন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন ফোটোগ্রাফিক স্টোরস-এ। কাউন্টারে বসেছিল সুপর্ণা। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আসুন স্যার, ফটো তোলাবেন তো?

ভিতরে একটা কাচের পার্টিশন দেওয়া ঘরে বসেছিল কাকলি। সে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল। সুপর্ণাকে বলল, না, ওঁরা আমার কাছে এসেছেন। আসুন স্যার।

সুপর্ণা সামলে নিল। হঠাৎ তার কৌতূহল যেন উথলে উঠল। খুঁটিয়ে দেখতে থাকে দুই আগন্তুককে।

কাকলি বাসু-সাহেবকে বলে, স্যার ও কোথায় আছে আপনি নিশ্চয় জানেন। আমাকে এখনি সেখানে নিয়ে চলুন।

বাসু দৃঢ়মুষ্টিতে কাকলির বাহুমূল চেপে ধরে বললেন, ব্যস্ত হয়ো না। চল, প্রথমে তোমার ঘরে গিয়ে বসি।

তিনজনে দোকানের মালিকের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে বসলেন। বড় কাচের দরজা বন্ধ হয়ে গেল ওঁদের পিছনে। ওঁ-ঘর থেকে দোকানের বাকি অংশ, এমনকি গড়িয়াহাটা রোডও দেখা যায়। মেঝে থেকে মিটারখানেক কাঠের প্যানেল। উপর দিকটা স্বচ্ছ প্লেট-গ্লাস। বাসু জানতে চান, এ ঘরে কথাবার্তা বললে, তা বাইরে থেকে শোনা যায়? তোমার ক্যাশ কাউন্টারের ওই মেয়েটি–

– কে? সুপর্ণা? না না, ও বিশ্বস্ত। তবে সব বিষয়েই ওর অতিরিক্ত কৌতূহল।

– বুঝলাম। কিন্তু আমাদের কথাবার্তা কি ও শুনতে পাবে?

– না, না।

– তোমার সেই আগের কর্মচারী….কী নাম যেন-হ্যাঁ, স্বর্ণলতা বাসু– যার কাছ থেকে ভৈরব কিছু শেয়ার কিনেছে, তার সঙ্গে এই সুপর্ণার আলাপ আছে?

– হ্যাঁ, আছে বৈকি। কেন?

বাসু ‘কেন’-র জবাব না দিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করেন, আর ভৈরব দাশের সঙ্গে?

– হ্যাঁ, ভৈরব প্রায়ই এ দোকানে আসত। সুপর্ণা ওর প্রডাকশানে অভিনয় করতে ইচ্ছুক। তাই…

– বুঝেছি। শোন কাকলি তোমার দিদি কোথায় আছে তা আমি জানি। কিন্তু এখনি তোমাকে তার কাছে আমি নিয়ে যেতে চাই না। সে একটা হোটেলে ছদ্মনামে নিরাপদে আছে।

– কিন্তু কেন নিয়ে যেতে পারেন না?

– বুঝছ না? তুমি টের পাওনি, কিন্তু তুমি পুলিসের নজরবন্দি হয়ে আছ। শাদা পোশাকের পুলিস কোথায় বসে তোমাকে লক্ষ্য করছে তা না জান তুমি, না জানি আমি। কিন্তু তোমাকে নিয়ে আমি সেদিকে রওনা হওয়া মাত্র সে আমাদের অনুসরণ করবে। তোমার দিদিকে এখনি পুলিসি জেরার মুখে আমি ফেলতে চাই না। সে কিছুটা সামলে নিক।

হঠাৎ বাসুসাহেবের নজর হল একজন খদ্দের দোকানের সদর দরজা অতিক্রম করে সুপর্ণাকে কী যেন জিজ্ঞেস করছে। তার পিছন পিছন কালো কোট পরা ছাতা-বগলে একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক।

কাকলির ভূকৃঞ্চন হল। চাপা গলায় বললে, ওই লোকটা ভৈরব দাশ।

বাসু ততক্ষণে চিনেছেন। বললেন, জানি। ইতিপূর্বে মুলাকাৎ হয়েছে।

ভৈরব এগিয়ে আসে। কাকলির ঘরে কাচের দরজার ওপাশে দাঁড়ায়। শালীনতা রক্ষাকারী আনুষ্ঠানিক টোকা দিয়েই ঠেলে দরজাটা খোলে। প্রৌঢ় ভদ্রলোকও বিনা আমন্ত্রণে ওর পিছন পিছন ঘরের ভিতর ঢুকে পড়েন। ভৈরব একগাল হেসে বাসু-সাহেবকে বলে, সরি ফর দি ইন্টারাপশন।

তৎক্ষণাৎ পাশ ফিরে প্রৌঢ় বেঁটে লোকটিকে বলে, ইনিই।

প্রৌঢ় ছাতাটাকে নামিয়ে রাখে কাকলির টেবিলে। যন্ত্রচালিতের মতো কালো কোটের বাঁ-পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে। গড়গড় করে পড়ে যায়, মিস কাকলি দত্ত পিতা ঈশ্বর হরগোপাল দত্ত, সাকিন চুয়াত্তরের সাতের এক বি গড়িয়াহাট রোড। কলিকাতা সাত-শূন্য-শূন্য-শূন্য-এক-নয়, আপনাকে মেসার্স সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোর্সের বোর্ড অব ডাইরেক্টার্সের প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিম্ন সীলমোহরাঙ্কিত আদালতের আদেশনামা মোতাবেক নোটিস জারি করা যাইতেছে যে…

সুজাতা বাকিটা শুনতে পেল না। তার মনে হল কাক্কেশ্বর কুচকুচে তার দুর্বোধ্য নোটিসটা পাঠ করে চলছে ‘যথাবিহিত…কার্য ইত্যাদি, প্রভৃতি।’ সে বিহ্বলভাবে তাকিয়ে থাকে।

বাসু বললেন, নাও, কাকলি, আদালতের নোটিসটা সই করে নাও।

তারপর ভৈরবের দিকে ফিরে বলেন, ব্যাপারটা কী?

– মামুলী সিভিল সুট, স্যার। ওই যাকে বলে ‘Complaint, summons, order to show cause, preliminary injunction and restraining order.’

বাসু বলেন, বুঝলাম। কিন্তু আপনার দাবীটা কী?

আদলতের প্রসেস-সার্ভার বাসু সাহেবকে বোঝাবার চেষ্টা করে, বাদী শ্রীভৈরব দাশ দাবী করেছেন, 
যে ঐ কোম্পানির কিছু শেয়ার, যার ওপর বাদীর নির্ব্যঢ় অধিকার ও স্বত্ব বর্তমান, তা হয় নষ্ট অথবা অগ্নিদগ্ধ অথবা অপহৃত, কিংবা অনধিকারীর এক্তিয়ারভুক্ত হয়ে গেছে, যার ফলে আদালত এই রিস্ট্রেনিং ইনজাংশন মোতাবেক মিস কাকলি দত্তকে আদেশ জারি করছেন যে, ইতিমধ্যে নিম্নবর্ণিত শেয়ারগুলি…

ভৈরব মাঝপথে প্রৌঢ়কে ধমকে ওঠে, কী মায়ের কাছে মাসির গপ্পো শোনাচ্ছেন আপনি? উনি সবই বুঝেছেন। জানেন উনি কে? উনি একজন ব্যারিস্টার।তার মানে বোঝেন? বিলেতে পাশ উকিল। সারা ভারতে গুটিকতক টিকে আছে আজও।

এবার প্রসেস-সার্ভারই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

বাসু বলেন, ঠিক আছে, কাকলি সই করে দিয়েছ তো? ব্যস! আর তোমার কিছু করণীয় নেই।

ভৈরব বলে, নাঃ! আর কী করণীয় থাকবে? শুধু কাল বেলা দুটোর সময় আদালতে হাজির হয়ে ওই নোটিসের জবাবদিহি করা ছাড়া। সে তো কাল।

এটা যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত কাকলির কাছে তো বটেই এমনকি বাসু-সাহেবের কাছেও, এটুকু ভৈরব দাশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে চাইল। তাই এবার বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললে, , ব্যাপারটা অতি সরল। আসলে ওই চল্লিশ শতাংশ শেয়ারের মালিক আমি। ঘটনাচক্রে অরিজিনাল সার্টিফিকেটগুলো খোয়া গেছে। ইতিমধ্যে সেগুলি কেউ যাতে উপস্থিত করে তার নতুন শেয়ার সার্টিফিকেট ইস্যু করাতে না পারে সে জন্যই এই অন্তর্বর্তীকালীন ইনজাংশন।

বাসু জানতে চাইলেন, আপনার হেপাজত থেকে শেয়ারগুলো খোয়া গেল কীভাবে?

– যে ভদ্রলোক আমার তরফে ওগুলো গচ্ছিত রেখেছিলেন তিনি গতকাল খুন হয়েছেন এবং তাঁর হেপাজত থেকে কে বা কারা শেয়ারগুলো অপহরণ করেছে।

বাসু জানতে চান, যিনি খুন হয়েছেন তিনি কি আপনার বকলমে ও শেয়ারগুলি ক্রয় করেছিলেন, নাকি আপনার ব্রোকার এজেন্ট?

ভৈরব বলে, নোটিসের কাগজগুলো পড়লেই টের পাবেন।

কাকলি বললে, মিস্টার দাশ, আপনি কিসর্বসমক্ষে স্বীকার করছেন যে, আমার ভগিনীপতিকে রেসে প্রলুব্ধ করতে আপনি ভাড়াটে টাউট নিযুক্ত করে…

ভৈরব বাধা দিয়ে বলে ওঠে, আপনার ভগিনীপতিকে প্রলুব্ধ করবার জন্য আমি কোনো ভাড়াটে টাউট নিযুক্ত করিনি ম্যাডাম! ‘মদ-মাতাল’ আর ‘মন-মাতালে’ ফারাক আছেজানেন তো? ঠিক তেমনি ফারাক আছ ‘ধন-রেসুড়ে’ আর ‘মন-রেসুড়ে’র মধ্যে। যার টাকা আছে, রেস খেলে টাকা ওড়ায়, তাকে বলে ‘ধন-রেসুড়ে’। আর আপনার ব্রাদার-ইন-ল হচ্ছেন ‘মন-রেসুড়ে’ ক্লাসের। আপনমনে রেস খেলে চলেন, পকেটে টাকা থাক বা না থাক। তাতে দোষের কিছু নেই। ধরুন ত্রেতাযুগের যাদুগোপালের ভগ্নীর স্বামী cum ভাসুর-ঠাকুর। বউ-বাঁধা রেখে তিনি জুয়া খেলেছিলেন। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের কথা বলছি আর কি! তাহলে কলিযুগের যাদুগোপল বউ’এর পৈত্রিক সম্পত্তি বাঁধা দিয়ে…

কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে ধমকে ওঠে কাকলি, মিস্টার দাশ! আপনার নোটিস-সার্ভিং তো শেষ হয়েছে। এবার আপনি বাইরে যান।

– না, না, কাজ আমার মেটেনি। আরও একজনের এখানে এসে পড়ার কথা। আমি তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছি। এখনি এসে যাবেন।

কাকলি, গর্জে ওঠে, তার জন্যে আপনি সারা রাত অপেক্ষা করতে পারেন; কিন্তু ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। দোকানটা আমার…

ভৈরব আবার এ-কান-ও-কানহাসল। বলল, হিসাবে থোড়াসে গলতি হইয়ে গেল, মিসিবাবা। দুকান ঘরের টেন পার্সেন্ট ঠাঁই দখল করার হক হমার আছে। ব্যারিস্টার-সাবকে পুছ করে দেখুন। হামি এই এককোনায় খাড়া থাকব। টেন পার্সেন্ট এরিয়ায়।

এই সময় দরজার কাছে দেখা গেল কৌশিককে। সেও কাচের দরজায় যথারীতি টোকা দিয়ে ঢুকল। নিঃশব্দে বাসু-সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরল একটা ভাঁজ করা কাগজ। বাসু-সাহেব সেটা গ্রহণ করা মাত্র কৌশিক নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল ঘর থেকে। বাসু ভাঁজ খুলে কাগজটায় কী লেখা আছে পড়লেন: “মিসেস মীনাক্ষী মজুমদার আজ দুপুরে হোটেল থেকে চেক আউট করে চলে গেছেন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে।”

বাসু-সাহেব ভাঁজ করা কাগজটা কাকলির দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।

কাকলি পড়ল। বুঝল। ভৈরবের উপস্থিতিতে নির্বাক রইল।

ভৈরব বলল, আমি রীয়ালি সরি ব্যারিস্টার-সাহেব। আপনাদের অসুবিধায় ফেলছি জানি, তবু আমাকে অপেক্ষা করতে হবে।

– কার জন্যে? জানতে চাইলেন বাসু।

– সে এলেই টের পাবেন। ঐ বোধহয় এসে গেল।

সকলের দৃষ্টি আবার পড়ল সদর দরজার দিকে। কৌশিক ততক্ষণে চলে গেছে। প্রবেশ করছে ইন্সপেক্টর নিখিল দাশ, তার পাশে একজন মাঝবয়সী মহিলা। ববকাট চুল, চোখে চশমা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। সুজাতা নিঃশব্দে তার হাতটা বাড়িয়ে দেয়। বাসু-সাহেবের হাতটা ধরে।ভৈরব স্বগতোক্তি করে, নাঃ এরা নয়। আমার লোক আসেনি। এখনি এসে পড়বে।

বাসু সাহেব সুজাতার কর্ণমূলে প্রশ্ন করেন, ক্যাশিয়ার?

সুজাতার চোখ দুটো একবার বুঁজে খুলে যায়। সম্মতিসূচক।

নিখিল কাচের দরজায় সৌজন্যমূলক টোকা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করল না। দরজাটা খুলে ধরল। মহিলাটি প্রবেশ করলেন। পিছন পিছন ইন্সপেক্টার দাশ। বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে নিখিল বলল, আপনিও যে, স্যার, ঈশ্বরের মতো সর্বত্র বিরাজমান হয়ে উঠেছেন। যখন যেখানে যাই…

কথাটা তার শেষ হয় না। মধ্যবয়সী মহিলাটি হঠাৎ বলে ওঠেন, ওই তো সেই মেয়েটি। তার এই আকস্মিক ঘোষণা থেকে বোঝা যায়, ইন্সপেক্টর দাশ তাকে আগেভাগে জানায়নি যে, এই ঘরে সেই মেয়েটির সাক্ষাৎ পাওয়া যেতে পারে।

বাসুর মুঠোয় ধরা ছিল সুজাতার ঘামে-ভেজা হাত। তিনি মহিলাটিকে প্রতিপ্রশ্ন করেন, আপনি বলতে চান এই মেয়েটিই আপনার কাছে ট্রাভলার্স চেকটা ভাঙাতে চেয়েছিল?

ভদ্রমহিলা প্রত্যুত্তর করার আগেই নিখিল বাধা দেয়: সবার আগে আমি জানতে চাই সুকৌশলীর মিসেস্ সুজাতা মিত্র এ বিষয়ে কী বলেন?

বাসু বলেন, তার প্রয়োজন হবে না।

নিখিল দাশের ভূকুঞ্চন হল। সে বেশ বিরক্ত। ভদ্রমহিলা এবার দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আমি নিঃসন্দেহ। চিনতে ভুল হয়নি আমার। ঐ উনিই জয়া সেনের ট্রাভলার্স চেক ভাঙাতে এসেছিলেন।

বাসু বলেন, না, মা, মানুষ চিনতে ভুল হয়নি তোমার।

নিখিল দৃঢ়স্বরে বললে, মাপ করবেন বাসুসাহেব, আমি আবার বলছি-এ বিষয়ে মিসেস্ মিত্র কী বলতে চান তাই শুনবার জন্য অপেক্ষা করছি। সন্তোষজনক কৈফিয়ৎ দিতে না পারলে আমি ওঁকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হব।

এবারও সুজাতার হাতে চাপ দিলেন বাসু। সে নীরবই রইল। বাসুই জবাবে জানতে চান, কোন অপরাধে?

– জালিয়াতি এবং সইজাল।

বাসু বললেন, হঠকারিতা কর না, দাশ। সুজাতা ‘সুকৌশলী’কে রিপ্রেজেন্ট করে। প্রাইভেট গোয়েন্দা হিসাবে ওর লাইসেন্স আছে।

নিখিল রুখে ওঠে, সেটা যাতে ক্যানসেল হয়ে যায়, তাও দেখব আমি।

বাসু আবার বললেন, তার আগে তুমি তোমাদের আইন পরামর্শদাতার সঙ্গে কথাবার্তা বলে নিলে ভাল করতে, নিখিল। সুজাতা কোনো বেআইনি কাজ করেনি কিন্তু।

নিখিল দাশ বাসু-সাহেবের গুণগ্রাহী। ‘ফ্যান’ই বলা চলে। কিন্তু এতক্ষণে তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। বলল, আপনার সঙ্গে তর্ক করা আমার শোভা পায় না। আপনি মস্ত ব্যারিস্টার। তবে পুলিসে চাকরি করতে কিছুটা আইন আমাকেও জানতে হয়েছে। তাতে আমি জানি যে, শ্রীমতী সুজাতা মিত্র যদি কোন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ক্যাশিয়ারের কাছে গিয়ে একটা ট্রাভলার্স চেক ভাঙিয়ে টাকা নেন-যেটা এস. বি. আই. মিসেস জয়া সেনকে ইস্যু করেছে-এবং মিসেস মিত্র যদি সেই চেক-এ মিসেস জয়া সেনের সই জাল করেন তাহলে পেনাল-কোডের কোনো না কোনো একটা ধারা লঙ্ঘিত হয়।

বাসু শান্ত স্বরে বললেন, প্রথম কথা, মুজাতা ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে একটা নয়া পয়সাও নেয়নি। দ্বিতীয় কথা: সে ক্যাশিয়ারকে একবারও বলেনি যে, তার নাম জয়া সেন। সুজাতা ঐ ক্যাশিয়ার ভদ্রমহিলাকে শুধু বলেছিল যে, সে একটা হাজার টাকার ট্রাভলার্স চেক ভাঙাতে চায়। জেনে রাখ নিখিল : আর পাঁচটা ‘চেক’-এর সঙ্গে ট্রাভলার্স চেক-এর কিছুটা পার্থক্য আছে। ডিমান্ড ড্রাফট-এর মতো এ-ক্ষেত্রেও আগে টাকাটা জমা দিতে হয়। অথচ ডিমান্ড-ড্রাফট্ সচরাচর যাকে ইচ্ছা হস্তান্তরিত করা যায় না, ট্রাভলার্স চেক যায়। যারা ‘ট্রাভেল’ করে তাদের সুবিধার জন্য এগুলি ইস্যু করা হয়।

– ট্রাভলার্স-চেক কাকে বলে তা আমাকে শেখাতে আসবেন না, স্যার। শুধু বলুন, আইনের কোন ধারায় বলে একজন অপর জনের সই জাল করে ট্রাভলার্স-চেক ভাঙাতে পারে।

বাসু ধীরেসুস্থে তাঁর কোটের ইনসাইড পকেট থেকে বার করলেন সেই চিরকুটখানা-যেখানা জয়া সেন তাঁকে লিখে দিয়েছিল।

নিখিল সেটা পড়ল। প্রথমটা তার মুখটা থমথমে হয়ে গেল। তারপর ধীরেধীরে তার মুখে একটা ক্রুর হাসি দেখা দিল। বলল, ঠিক আছে, স্যার। তবে টাক-ডুমাডুমের আগে একটু ভেবে দেখেছেন কি যে আপনি ‘নরুনে’র বদলে আমার হাতে ‘নাকটা’ তুলে দিচ্ছেন?

– তার মানে?

– সুজাতা দেবীকে বাঁচাতে গিয়ে আপনি নিজে জড়িয়ে পড়লেন।

– কী ভাবে?

– এই কাগজখানা বলছে: হয় এটা জাল, অথবা আজ আপনার সঙ্গে মিসেস জয়া সেনের সাক্ষাৎ হয়েছে। কারণ সইয়ের তলায় তারিখটা আজকের।

– হ্যাঁ, তা তো হয়েছেই। আজ সকালে। তাতে কী?

– য়্যু হ্যাভ-বিন এইডিং অ্যান্ড আবেটিং ইন দ্য কমিশন অব এ ফেলনি।

– হঠাৎ এ-কথার মানে?

– এতে প্রমাণ হচ্ছে আপনি জেনেশুনে একজন আত্মগোপনকারী অপরাধীকে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করেছেন।

– আমি তো জানি না মিসেস জয়া সেন কোন অপরাধ করেছেন!

– এখন তো জানলেন। আমি এখন আপনাকে জানাচ্ছি সে কথা। মিসেস সেন আত্মগোপন করে আছেন। পুলিস তাঁকে খুঁজছে। এবার বলুন:তিনি কোথায়?

– কিন্তু তার অপরাধটা কী?

– জীবন হালদারকে হত্যা করা।

– কিন্তু তুমি আজ দুপুরে আমাকে বললে না যে, জয়া সেন নয়, তার স্বামীকে হত্যাপরাধে খুঁজছেপুলিস!

– মিস্টার বাসু! আপনি ক্রমাগত কথা ঘোরাবেন না। আমার প্রশ্নের পয়েন্ট-ব্ল‍্যাঙ্ক জবাব দিন। জয়া সেন বর্তমানে কোথায়?

– পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক জবাব: আমি জানি না।

– এ কাগজখানা তিনি কোথায়, কখন আপনাকে দেন

– পান্থজনসখা হোটেলে। আজ সকালে তিনি ওটা আমাকে দেন।

– ওখানে উনি স্বনামে হোটেলরুম ভাড়া নিয়েছেন?

– না, ছদ্মনামে। মীনাক্ষী মজুমদার নামে। আমারই পরামর্শে।

– আপনারই পরামর্শে?

– তাই তো বললাম।