রিস্তেদারের কাঁটা – ৩

তিন

চীফজাজ ভাদুড়ী একাই ছিলেন। কাঁটায়-কাঁটায় দুটোর সময় পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন ব্যারিস্টার পি. কে.বাসু।

– হ্যালো মিস্টার বাসু। আসুন, রসুন। আপনি বহাল তবিয়তে আছেন সে তো দেখতেই পাচ্ছি। মিসেস বাসু কেমন আছেন?

– ভালই। একটা জরুরী ব্যাপারে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।

– বলুন?

– একটা ‘কন্টেস্টেড ম্যাটারে’ আপনার এজলাসে আমাকে ‘অ্যাপিয়ার’ করতে হতে পারে। ফলে, সে সম্বন্ধে এখানে জনান্তিকে আমি কিছু আলোচনা করতে চাই না। আপনার-আমার দুজনের স্বার্থেই। তবে যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে কিছু ‘হিস্ট্রি’ সংগ্রহ করে নেব, অর্থাৎ আপনি যে অর্ডার করেছেন তার পশ্চাতে কী জাতের তথ্য পেশ করা হয়েছিল।

– কোন্ কেসটা বলুন তো?

– নিউ আলিপুরের বৃদ্ধ সত্যানন্দ সেনের তরফে ধনঞ্জয় চৌবেকে অছি নিযুক্ত করা…

– আই সী। সে তো দিন-সাতেক আগের ঘটনা।

– পাঁচদিন আগেকার।

– আপনার মনে হয়েছে যে, কোথাও কিছু…ইয়ে…গড়বড় হয়েছে?

– মাপ করবেন, তথ্য ইতিহাসের বাইরে আমরা কোন কিছু আলোচনা করতে পারি না। করবও না।

– বৃদ্ধের ‘গার্ডেইয়ানশিপ’ সম্বন্ধে আমি সাময়িক আদেশ দিয়েছি মাত্র। নতুন কোন তথ্য যদি আদালতে পেশ করা হয়, আমি শুনতে, প্রয়োজনে আমার পূর্বকৃত আদেশ পরিবর্তিত করতেও পারি। দেখুন ব্যারিস্টার-সাহেব – তথ্য কী বলছে? পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ, আমি তাঁকে দেখেছি। প্রতি কথাতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন। কথাবার্তার পারম্পর্য ছিল না। উনি যে আদালত-কক্ষে আছেন এই সহজ কথাটা তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তদুপরি দেখলাম, সওয়া লক্ষ টাকার একটা বেয়ারার চেক উনি একটি মেয়েকে ডাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন টাকাটা লুকিয়ে ফেলার জন্য। সবটা মিলিয়ে স্বতই মনে হয়েছে এই ধনী বৃদ্ধটির একজন অছি নিযুক্ত করার প্রয়োজন আছে। মিস্টার চৌবে তাঁর নিকটতম আত্মীয় – বৈমাত্রেয় ভাই। অবশ্য আপনি যদি কোনও নূতন তথ্য দাখিল করতে চান…

– আমি তাই চাই।

– অল রাইট। কাল সকালে আমার একটা কেস মুলতুবি হয়েছে। আমি না হয় সাড়ে দশটায় আদালত বসাব। আপনার অ্যাডিশনাল এভিডেন্স শুনতে ঘণ্টাখানেকের বেশি লাগবে না নিশ্চয়। কাল সকালের মধ্যে কি আপনার কেস তৈরী হবে?

– হবে। তাহলে ও-পক্ষকে আমি সেই মর্মে নোটিস জারীর ব্যবস্থা করছি।

– করুন। তবে একটা কথা। সত্যানন্দ সেনকে আদালতে হাজির করার দরকার নেই। শুনেছি তিনি নার্সিং হোমে আছেন। তাই থাকুন। বৃদ্ধের রেস্ট নেওয়া দরকার।

হাইকোর্টের অদূরে ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের একটি দ্বিতল বাড়িতে বাসু-সাহেবের চেম্বার। কয়েক দশক ধরে এখানে উনি এসে বসতেন, আদালত বসার আগে আর পরে, রিসেস্ পিরিয়ডে। এখানেই তাঁর কর্মজীবনের শুরু, প্রখ্যাত ব্যারিস্টার এ. কে. রে-র জুনিয়ার হিসাবে। এখন বাসু-সাহেব এখানে রোজ হাজিরা দেন না – ক্বচিৎ কখনো হাইকোর্ট-পাড়ায় এলে তাঁর ইজিচেয়ারটায় এসে বসেন। এখন তাঁর জুনিয়ারেরা এটা ব্যবহার করে। না, ইজিচেয়ারখানা নয়। ঘরটা। তাদের একজনকে উনি বললেন, অপর পক্ষকে নোটিস সার্ভ করাবার ব্যবস্থা করতে। ও পক্ষের উকিল ‘দত্ত অ্যান্ড দত্ত’। তার সিনিয়ার পার্টনার সলিল দত্তের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললেন।

ইতিমধ্যে আদালতের আফটার-নুন সেসান্স শুরু হল। হ্যাঙার থেকে গাউন পেড়ে নিয়ে উকিলবাবুরা একে একে সজ্জিত হলেন। সার বেঁধে চললেন যে-যার আদালতকক্ষে। ঘর খালি হতে বাসু-সাহেবের নজর হল কৌশিক দূরে একখানা চেয়ার দখল করে বসে আছে। উনি জানতে চান, কী সুকৌশলী টিকটিকি? কিছু খবর-টবর যোগাড় হল? সাক্ষী-টাক্ষি?

– তা হয়েছে মামু। আপনার তরফে এক নম্বর সাক্ষী হতে রাজি আছেন মিস্টার সি. এস. রঙ্গনাথন–

– রঙ্গনাথন? মানে গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার? সে কী বলবে?

– সত্যানন্দ বিচক্ষণ ব্যবসায়ী। বহুদিন ধরে তিনি নানান শেয়ার কেনাবেচা করে শেয়ার-বাজারের হালচাল খুব ভাল বোঝেন। তাঁর অ্যাকাউন্ট ক্রমে ক্রমে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। নানান ইনভেস্টমেন্টে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর তরফে ‘কনজারভেটার’ নিষ্প্রয়োজন।

– সব পাস্ট-টেন্স কৌশিক! সবই অতীতের গল্প! ‘মা কী ছিলেন!’ আদালত শুধু জানতে চায় ‘মা কী হইয়াছেন!’ উনি বর্তমানে কোথায় আছেন, জান?

– আজ্ঞে, হ্যাঁ। ডায়মন্ডহারবার রোডে বড়িশা-বেহালার কাছে একটি ওল্ড-এজ হোম-এ। নাম ‘শান্তিধাম’। মালিকের নাম ডক্টর নিত্যানন্দ রথ। উনি আছেন সতের নম্বর কেবিনে। টেলিফোন আছে। ফোনে ওরা কোনও খবর জানাচ্ছে না। যদি বলেন নিজে গিয়ে দেখতে পারি।

– বলছি। তার আগে বল, ধনঞ্জয় চৌবে আর বিলাসসিং যাদবের ব্যাকগ্রাউন্ডটা কিছু জানতে পেরেছ?

সে কথাও জানায় কৌশিক। ধনঞ্জয় ছিল ধানবাদে এক কারখানার ফিটার। প্লাম্বিঙের কাজ ভালোরকম জানে। কী-একটা অপরাধে বছরখানেক আগে সে চাকরি খোয়ায়। ইউনিয়ন ওর কেসটা লড়তে চায়নি। আর বিলাসসিং যাদব ছিল ওদের ইউনিয়নের একজন পাণ্ডা। বস্তুত ধানবাদের একজন নামকরা ট্রেড ইউনিয়ান লীডার। বিস্তারিত সঠিক জানতে পারিনি। তবে এটুকু জানা গেছে, তহবিল তছরূপের মামলায় দুজনেই জড়িত। বিলাসসিংএর ধারণা টাকাটা ধনঞ্জয় সরিয়ে ফেলেছে। টাকার কিছুটা ছিল কোম্পানির, কিছুটা ট্রেড ইউনিয়নের ক্যাশ। ধানবাদের কয়েকজন গুণ্ডার হাত থেকে আত্মগোপন করতেই নাকি দুজনে পালিয়ে এসেছে কলকাতায়।