কৌতূহলী কনের কাঁটা – ৪

চার

বাসু-সাহেব তাঁর চেয়ারে যতক্ষণ না স্থির হয়ে বসলেন ততক্ষণ কমলেশ টেলিফোনটাকে বাজতে দিল। তারপর তুলে নিল যন্ত্রটা। নিজে বসল না। যন্ত্রটার কথা-মুখে – না, ‘হ্যালো’ ও বলল না, নিজের নামও ঘোষণা করল না– নিজের টেলিফোন নম্বরটা ঘোষণা করল শুধু।

ওর স্থিরদৃষ্টি বাসু-সাহেবের দিকে।নজর হল, তিনি চোখ দুটি বন্ধ করেছেন। আন্দাজ করতে পারল না হেতুটা – বাসু-সাহেব তখন তাঁর মস্তিষ্কের একটি ফোকরে পর্যায়ক্রমে ছয়টি গাণিতিক সংখ্যা গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত।

ওপক্ষের কথা শুনে নিয়ে কমলেশ বললে, এ-কথা তো টেলিগ্রামেই বলেছ তুমি, তাহলে কখন আসছ।…কী? ন্যাকা সাজবার চেষ্টা কোরো না, তুমি ছাড়া কে এই টেলিগ্রামখানা পাঠাবে?… ঠিক আছে, পরে কথা হবে…না, না, বললাম তো এখন আমি ব্যস্ত আছি। আমার ঘরে ভিজিটার আছে…কী?…সেটা তো তুমি জানই…আয়াম সরি…

বাসু-সাহেব মাঝপথেই উঠে দাঁড়ান। বলেন, লাইনটা ছেড়ো না। ওর সঙ্গে আমার কথা আছে… কমলেশ গর্জে ওঠে: সিট্ ডাউন!

নিঃশব্দে টেলিফোনটা রিসিভারে বসিয়ে দেয়।

বাসু-সাহেব ধীরে ধীরে বসে পড়েন নিজের চেয়ারে।

কমলেশ বলে, বলুন, আর কী বলতে চান।

– ছন্দাই ফোন করছিল তো?

– অবান্তর কথা বলবেন না, মিস্টার বাসু। আর আমার প্রাইভেট লাইফে অহেতুক নাক গলাতেও আসবেন না। আপনার যদি কিছু বলার থাকে বলে ফেলুন; না থাকে বিদায় হন–

– আমার অনেক কিছুই জানবার আছে, মিস্টার ঘোষ।

– তাহলে শুরু করুন। আমাদের দুজনেরই সময়ের দাম আছে।

– এক নম্বর প্রশ্ন: আপনার উপাধি ‘ঘোষ’, অথচ আইনত যিনি আপনার ‘স্ত্রী’, তাঁর উপাধি ‘রায়’ – ইতিপূর্বে ছিল ‘বিশ্বাস’। এটা কেমন করে হল?

– সেটা আপনার ক্লায়েন্টের কাছ থেকে জেনে নেবেন। আর কিছু?

– গত সাত বছর আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেননি কেন? তাকে নতুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার সুযোগ দিতে?

– লুক হিয়ার, মিস্টার বাসু! আমি কিছু কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নেই যে, আপনি ক্রমাগত প্রশ্ন করে যাবেন, আর আমি জবাব দিয়ে যাব। এটা আপনি আশা করেন কোন আক্কেলে? আমার একটিমাত্র কথা বলার আছে: আমি বেআইনি কাজ কিছু করছি না। ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের কোনও ধারাই আমি লঙ্ঘন করতে চাইছি না। ফলে আপনার কিছু করণীয় নেই। আপনি ফুটুন!

– ‘ফুটুন?’

– মানে, মানে-মানে কেটে পড়ুন।

– আই সী! আপনার ওই শব্দপ্রয়োগে ফুটুন’ কথাটাতে আমার বাকি যেটুকু জানবার ছিল, তা জানা হয়ে গেছে। ‘ফোটো’ কথাটা যে সম্মানার্থে-আপনাদের ক্লাসের মানুষ ‘ফুটুন’ বলে থাকেন, তা আমার ঠিক জানা ছিল না।

উঠে দাঁড়ান উনি। দ্বারের দিকে দু-একপদ গিয়ে ফিরে দাঁড়ান। বলেন, ছন্দা তোমার ঠিকানা আমাকে জানায়নি কমলেশ, আমি নিজেই তা খুঁজে বার করেছি। আর…..ও হ্যাঁ, ও টেলিগ্রামটাও ছন্দা রায় তোমাকে পাঠায়নি ওটাও আমিই পাঠিয়েছি…

– কোন্ টেলিগ্রাম?

ওই যেটা আমার উপস্থিতিতে তুমি ডেলিভারি নিলে – ‘ইম্পর্ট্যান্ট ডেভেলপমেন্ট নেসেসিটেট্স ইন্ডল্ডেফিনিট পোস্টপোনমেন্ট’ এটটরা এটসেটরা…

কমলেশ বুকপকেট থেকে টেলিগ্রামখানা বার করে পড়ে দেখল। ওর চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। বললে, ইজ দ্যাট সো? তা আপনিই বা আমাকে অমন একখানা টেলিগ্রাম পাঠালেন কেন? সি. রায়ের নাম ভাঁড়িয়ে?

বাসু বললেন, জবাবে আমিও তো ওই কথা বলতে পারি, কমলেশ! ওই যেটা তুমি এখন আমাকে শোনালে? পারি না?

– কী কথা?

– ‘লুক হিয়ার, মিস্টার ঘোষ! আমি কিছু কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নেই যে, আপনি ক্রমাগত প্রশ্ন করে যাবেন আর আমি জবাব দিয়ে যাব! ‘

কমলেশ হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে।

বাসু বলেন, হয় আমরা পরস্পরের কাছে প্রশ্ন পেশ করব এবং জবাব শুনব, অথবা তুমি তাতে রাজি না থাকলে, আমি আপাতত ‘ফুটব’ এবং পরে এমন ব্যবস্থা করব, যাতে তুমি ফুটন্ত ডেকচিতে ‘ফুটবে’! কমলেশ শান্ত স্বরে বললে, বসুন। অলরাইট! আমরা একের পর একজন প্রশ্ন করব এবং অপরপক্ষের জবাব শুনব। একবার আমি, একবার আপনি। পর্যায়ক্রমে। আপাতত বলুন, আমার শেষ প্রশ্নটার কী জবাব?

– তোমার শেষ প্রশ্নটা ছিল, সি. রায়ের নাম ভাঁড়িয়ে? আমার জবাব হচ্ছে; সি. রায় আমার ক্লায়েন্ট! সলিসিটার ক্লায়েন্টের তরফে চিঠি লিখলে বা টেলিগ্রাম করলে আইনত তাকে নাম ভাঁড়ানো বলে না।

– সে কথা আমি বলতে চাইনি, আমার প্রশ্ন…

– আই নো, আই নো! কিন্তু শেষ প্রশ্নটা তোমার ওই রকমই ছিল। আমি তার জবাব দিয়েছি। তোমার সার্ভিস নেট-এ আটকে গেছে। এবার আমার সার্ভিস করার কথা। তুমি রিটার্ন দেবে। তাই না? শর্ত হয়েছে দুপক্ষই পর পর প্রশ্ন করব। সুতরাং এবার বলো, কেন তুমি সাত বছর আত্মগোপন করে প্রতীক্ষা করেছিলে?

– আমি..আমি আত্মগোপন করেছিলাম না মোটেই। বাস-অ্যাকসিডেন্ট-এ আমার স্মৃতিভ্রংশ হয়ে যায়, – ওই যাকে বলে অ্যামনেশিয়া – হঠাৎ আমার পূর্বস্মৃতি ফিরে এসেছে!

বাসু হাসলেন। বললেন, সুন্দর জবাবটা দিয়েছ, কমলেশ। তোমার একটিই ভুল হয়েছে-কর্তৃবাচক পদটির দ্বিত্বপ্রয়োগ! বুঝলে না? কৈফিয়ৎটা তোমার সড়গড় হয়নি। তোমার বলা উচিত ছিল, ‘আমি আত্মগোপন করে ছিলাম না মোটেই।’

– তাই তো বলেছি আমি!

– না, তা বলোনি। বলেছ: ‘আমি…আমি আত্মগোপন করেছিলাম না মোটেই।’ প্রথম ‘আমি’র পর যে সামান্য বিরতি দিয়ে দ্বিতীয়বার ‘আমি’ বললে, ওটাই প্রশ্নকর্তাকে বুঝিয়ে দিল: এটা মিথ্যা অজুহাত। সে যা হোক, এবার তোমার প্রশ্ন করার পালা। সার্ভ করো।

– আপনার ক্লায়েন্ট…

– সরি, ফর ইন্টারাপ্টিং য়ু। এই পর্যায়ে আমার পক্ষে জানিয়ে রাখা শোভন যে, আমার ক্লায়েন্ট ‘ছন্দা’ নয়, তার স্বামী মিঃ রায়। ইয়েস, বলো কী জানতে চাইছ?

– আপনি তো এতক্ষণ বলেননি যে, ‘ছন্দা’ নয়, ‘ত্রিদিবনারায়ণ’ই আপনার ক্লায়েন্ট! কেন?

– তার হেতু তুমি তো এতক্ষণ আমার সঙ্গে সহযোগিতা করতে স্বীকৃত হচ্ছিলে না। দোর থেকেই আমাকে ‘ফোটাতে’ চাইছিলে। এখন শর্ত হয়েছে দুজনেই প্রশ্ন করব এবং উত্তর শুনব, তাই।

– সেক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন–

– সরি, কমলেশ! এবারও তোমার সার্ভিস নেটে আটকে গেছে! ডাব্‌ ফল্টু। তোমার প্রশ্ন তুমি পেশ করেছ এবং আমি তার জবাব দিয়েছি। এবার আমার প্রশ্ন করার পালা: তুমি কি জান যে, ত্রিদিবনারায়ণ রায়ও জানতে পেরেছে যে, তার স্ত্রীর প্রথমপক্ষের স্বামী জীবিত এবং সে ব্ল্যাকমেলিং-এর ধান্দায় আছে?

কমলেশ স্থির দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর প্রায় আত্মগতভাবে বললে, ইম্পসিবল!

– কোনটা ইম্পসিবল? ত্রিদিবনারায়ণ জানে না ছন্দার প্রথম স্বামী জীবিত থাকার তথ্যটা? না কি ব্ল্যাকমেলিং করবার কথাটা?

– কে ব্ল‍্যাকমেলিং করতে চাইছে? সে প্রশ্ন তো এখনও ওঠেনি?

– না, ত্রিদিবের বিশ্বাস তার স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেলিং করতে চাইছে একজন তৃতীয়পক্ষ– একজন প্রফেশনাল ব্ল্যাকমেলার – যে, ঘটনাচক্রে জানতে পেরেছে ধনকুবের ত্রিদিবনারায়ণের স্ত্রী অন্যপূর্বা!

কমলেশের বোধকরি গুলিয়ে গেল খেলার আইনটা। এক-একবার সার্ভ করার কথা। কে কাকে প্রশ্ন করছে আর কে কাকে জবাব দিচ্ছে তার হিসাবটার কথা তার মনে রইল না।

কমলেশ বললে, তৃতীয়পক্ষ! তা হতেই পারে না। তৃতীয়পক্ষ কোথা থেকে আসবে? আর ত্রিদিব এমন গবেট…

– না, কমলেশ! তুমি ত্রিদিবকে যতটা গবেট ভাবছ, ততটা সে নয়!

– কেন? তার ‘অতিবুদ্ধির’ কী পরিচয় পেয়েছেন আপনি?

– তা পেয়েছি বইকি কিছুটা। তার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়নি যে, সে আলালের ঘরের দুলাল।

– তাহলে বলব, মানুষ চেনার ক্ষমতা আপনার আদৌ নেই!

– কিন্তু এ কথা তো ঠিক – একটু আত্মশ্লাঘা হয়ে যাচ্ছে – ত্রিদিব খুঁজে খুঁজে জব্বর উকিলকেই কেস্টা দিয়েছে। একটা ফেরেব্বাজ টাউটের পাল্লায় পড়ে রক্তচোষা বাদুড়ের খপ্পড়ে পড়েনি–

কমলেশ বাধা দিয়ে বললে, তার কারণ অন্য কিছুও হতে–

ওকে বাধা দিয়ে বাসু বলে ওঠেন, তা অবশ্য হতে পারে, মানে তুমি যা বলছ…

– আমি আবার কী বললাম?

– অর্থাৎ ত্রিদিব আমাকে নিজে নির্বাচন করেনি। সে ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে দেখা করেছিল বটে। কিন্তু আমাকে নির্বাচন করেছেন তার স্বনামধন্য পিতৃদেব!

– আমি মোটেই সে কথা বলিনি। ত্রিবিক্রমনারায়ণ কিছুই জানেন না এখনও।

– তুমি বলতে চাও যে, ত্রিদিব যে একটি হাসপাতালের নার্সকে বেমক্কা বিয়ে করে বসে আছে সে খবরটাও ধনকুবের ত্রিবিক্রমনারায়ণ রায় জানেন না?

হঠাৎ কী খেয়াল হয় কমলেশের। সে আচমকা উঠে দাঁড়ায়। বলে, আপনি ক্রমাগত আমার পেট থেকে কথা বের করে নিচ্ছেন। অথচ নিজে থেকে কিছুই বলছেন না।

– আমিও তো তোমাকে বলছি, কমলেশ। বলছি, সাবধান হও!

– সাবধান হব! কেন? কী করেছি আমি?

– সেটা তুমিও জান, আমিও জানি। সেটা আলোচনা না করা দুপক্ষেরই মঙ্গল। তোমার সঙ্গে আমার যেমন কোনও দোস্তিনেই তেমনি কোনও শত্রুতাও নেই। আমি শুধু আমার ক্লায়েন্টের মঙ্গলাকাঙক্ষী। আর সেটা যদি বিনা রক্তপাতে হয়…

– ‘বিনা রক্তপাতে’ মানে?

– তুমি তো গবেট নও, কমলেশ! ত্রিবিক্রমনারায়ণ তাঁর পারিবারিক সুনাম রক্ষার জন্যে কতদূর যেতে পারেন…

– আপনি কি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছেন?

– আমার স্বার্থ?

– আপনার ব্যক্তিগত নয়, কিন্তু আপনার ক্লায়েন্টের স্বার্থ জড়িত আছে বইকি।

– তার মানে ধনকুবের ত্রিবিক্রমনারায়ণের পারিবারিক সুনাম নষ্ট করতে তুমি বদ্ধপরিকর?

– তেমন কথা আমি আদৌ বলিনি!

– বলনি। ইঙ্গিত করেছ, যদি তোমার স্ত্রী টাকাটা না মিটিয়ে দেয়।

দুর্ভাগ্য! নিতান্ত দুর্ভাগ্য! এই মুহূর্তে আবার বেজে উঠল টেলিফোনটা।

কথার মারপ্যাঁচে সাক্ষীকে পেড়ে ফেলাই ওঁর পেশা ও নেশা। সেই কায়দাতে শুভ্রার কাছ থেকে আদায় করেছিলেন ওঁর ক্লায়েন্টের নাম। এখানেও সেই একই কায়দায় কমলেশের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন তাঁর ক্লায়েন্টের স্বামী ও শ্বশুরের নাম। কথাবার্তা আর একটু চালাতে পারলে ছন্দা রায়ের ঠিকানা অথবা টেলিফোন নাম্বারটা ঠিক সংগ্রহ করা যেত। অথচ ওই ব্রাহ্মমুহূর্তেই ক্রিরিং-ক্রিরিং করেবেজে উঠল টেলিফোনটা। যেন সম্মোহনের একটা ঘোর থেকে জেগে উঠল কমলেশ। যন্ত্রটা তুলে নিয়ে এবার আর নাম্বার বলল না, বলল–

কমল বলছি…বলো?..না, ওয়েট! একটু লাইনটা ধরো…

যন্ত্রটা নামিয়ে রাখল টেবিলে। বাসুসাহেবের দিকে ফিরে শান্ত স্বরে বললে, প্লিজ মিস্টার বাসু! এবারআসুন আপনি।

– ছন্দাই আবার ফোন করছে?

– গর্জে উঠল কমলেশ, দ্যাটস্ নান্ অব ইয়োর বিজনেস! প্লিজ গেট আউট!

বাসু উঠে দাঁড়ালেন। শান্তস্বরে বললেন, তুমি অহেতুক রাগারাগি করছ কেন কমলেশ? আমি তো তোমার শত্রুপক্ষ নই!

কমলেশ হিপপকেট থেকে তার আত্মরক্ষার অস্ত্রটা বার করে বলল, লুক হিয়ার মিস্টার বাসু। আমি আপনার ক্লায়েন্টের মতো আলালের ঘরের দুলালও নই, গবেটও নই! ফ্র্যাঙ্কি-পাইলের মাঙ্কিটার দুমদুম শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?

শেষ প্রশ্নটা আপাত-অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু তার মর্মগ্রহণে অসুবিধা, হল না বাসু-সাহেবের। অদূরেই কোনও বাড়িতে পাইল-বনিয়াদ্ বানানোর জন্য সাত-সেকেন্ড পর পর একটা ‘দুম্’ শব্দ হচ্ছে। সেটার কথাই বলছে। কমলেশ সেই অপ্রাসঙ্গিক কথাটা অর্থবহ করে তুলল তার পরবর্তী কথায়: ঠিক ওই শব্দটার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ফায়ার করলে ত্রিসীমানায় কেউ বুঝতে পারবে না, বাসু-সাহেব তাঁর মানবলীলা এই অসমাপ্ত প্রাসাদের ভিতর সংবরণ করলেন। আর বিলিভ ইট অর নট-এ বাড়ির পিছনেপ্লি ন্থ ভরাট করানোর জন্য বিরাট বড়ো বড়ো গর্ত খোঁড়া আছে। লাশ পাচার করতে আমার কোনও অসুবিধা হবে না।

বাসু বলে ওঠেন, এসব কী বলছ, কমলেশ?

মারণযন্ত্রটা উঁচু করে জবাবে ও বলল, আমি তিন গুণব। তার মধ্যে আপনি যদি সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু না করেন…আই মিন, না ‘ফোটেন’…

– অলরাইট, অলরাইট! ওটা নামিয়ে রাখো..ওটা লোডেড…

পায়ে-পায়ে উনি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলেছেন। কমল দেখা গেল অত্যন্ত সাবধানী। বাসু-সাহেবের পিছনে পিছনে সে নিজেও নেমে এল নিচে। দরজা খুলে বৃদ্ধকে আক্ষরিক অর্থে পথে নামিয়ে ইয়েল লক দরজা বন্ধ করে দিল। বাসু ঘড়ি দেখলেন। অনেক বেলা হয়ে গেছে। রাস্তা দিয়ে কিছু প্রাইভেট কার যাতায়াত করছে বটে, খালি ট্যাক্সির কোনও চিহ্নমাত্র নেই। কী করবেন স্থির করতে গিয়ে প্রতিবর্তী প্রেরণায় ডান হাতটা চলে গেল পকেটে, পাইপ-পাউচ-এর সন্ধানে। দুর্ভাগ্য সবদিকেই। অনেকক্ষণ খচর্-খচর্ করেও লাইটারটা জ্বালাতে পারলেন না। সম্ভবত জ্বালানি ফুরিয়েছে। রি-ফিল করতে হবে। আপাতত সমাধান: একটি দেশলাই খরিদ করা। নজর গেল গলি রাস্তার ওপারে-যে পান-বিড়ির দোকানে সংবাদ নিয়েছিলেন প্রথমে। লোকটার গালে এখনও পান-ঠাসা। দোকানের সামনে একটি মাত্র খদ্দের। মটোর সাইকেলে বসে কী যেন বলছে। লোকটার মাথায় হেলমেট, চোখে সানগ্লাস-চেনা মুশকিল। বাসু গুটিগুটি সেদিকপানে এগিয়ে গেলেন।

পানওয়ালা তখন বলছে, আজ্ঞে না বাবু, আপনি ভুল ঠিকানায় এসেছেন। এই গলিতে আমি হাফ-প্যান্ট-পরে মার্বেল খেলেছি, এ পাড়ার সব্বাইকে চিনি। ‘দত্ত-মজুমদার’ নামে কেউ এ গলিতে থাকেন না।

বাসু এসে দাঁড়ালেন। মোটর-বাইকের আরোহীর বয়স সাতাশ-আঠাশ। নিম্নাঙ্গে জীন, ঊর্ধ্বাঙ্গে উইন্ড-চিটার। অত্যন্ত বলিষ্ঠগঠন যুবাপুরুষ। বাসু-সাহেবকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে তাঁকেই প্রশ্ন করে, আপনি কি এপাড়ায় থাকেন, দাদু?

বাসু বললেন, না দাদু, থাকি না। তবে অনেক অনেক দত্ত-মজুমদারকে চিনি। কেউ এ পাড়ার, কেউ বে-পাড়ার। বাই এনি চান্স, তুমি কি কমলেশ দত্ত-মজুমদারকে খুঁজছ?

লোকটা পকেট থেকে একটি সুদৃশ্য সিগ্রেট-কেস বার করে ঠোঁটে একটা সিগ্রেট চেপে ধরে লাইটার জ্বালিয়ে সেটাকে ধরাল। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললে, কমলেশ নয়, কমলচন্দ্র দত্ত মজুমদার…

– বাসু হাত বাড়িয়ে ওর কাছ থেকে লাইটারটা চেয়ে নিয়ে নিজের পাইপটা ধরিয়ে বললেন, সরি। তাহলে সে অন্য কমল। আমি বলছিলাম কুলীন-কমলের কথা।

ছেলেটি উৎসাহ দেখাল, কী কমল? ‘কুলীন’ কমল মানে?

– কুলীনরা সেকালে অনেক অনেক বিয়ে করত শোননি? আমি যে কমল-এর কথা বলছি সে ছিল তেমনি বিবাহ-বিশারদ কমল। কমলচন্দ্র নয়, কমলেশ…

ছেলেটা তার বাহনকে স্ট্যান্ডের উপর দাঁড় করায়। ঘনিয়ে এসে বলে, আপনি যার কথা বলছেন, আমিও বোধহয় তার কথাই বলছি…

– বয়স বছর পঁয়তাল্লিশ, রোগা, মুখে বসন্তের দাগ?

– এগ্‌জ্যাক্টলি। কোথায় থাকে জানেন?

– জানি। এ পাড়ায় নয়।

– পানওয়ালা ওপরপড়া হয়ে বলে ওঠে, দেখলেন? এ পাড়ার নাড়ি-নক্ষত্র আমার নখদর্পণে।

ছেলেটি বলে, তবে কোথায়?

বাসু বললেন, এসো, ওই দোকানে গিয়ে একটু চা পান করা যাক। তোমার মটোর-সাইকেলটা এখানেই থাক।…কী বল!

শেষ প্রশ্নটা পান-বিড়ি-ওয়ালাকে। সে স্বীকৃত হল।

চায়ের দোকানে দূরতমপ্রান্তে দুজনে গিয়ে বসলেন। এই পড়ন্ত বেলায় আর কোনও খদ্দের ছিল না। দোকানদারও ঝিমোচ্ছিল। ঢুলু-ঢুলু চোখে জানতে চায়, কী দেব, স্যার?

– দু-কাপ চা।

– ঠিক আছে, বসুন। একটু দেরি হবে কিন্তু আঁচটা নেমে গেছে।

বাসু বললেন, ‘উঁচু করো। আমাদের তাড়া নেইি

ছেলেটি বসল দেয়াল-ঘেঁষে। রাস্তার দিকে মুখ করে, যাতে বাহনটাকে নজরে রাখা যায়।

বাসু জানতে চান, কমলকে খুঁজছ কেন? আগে সেটাই বল?

– সে অনেক কথা, দাদু! আপনি তাঁর বর্তমান ঠিকানাটা জানেন?

– জানি। তোমাকে জানাতে রাজি আছি। কিন্তু তার আগে আমার কয়েকটি কৌতূহল মেটাতে হবে। প্রথম প্রশ্ন: তুমি যাকে খুঁজছ সেই কমল যাকে ফাঁসিয়েছে সে মেয়েটি তোমার কে?

ছেলেটি একটু অবাক হল। বলল, আপনি যে গণৎকার ঠাকুরের মতো ভে িশুরু করলেন, দাদু! কেমন করে জানলেন যে, আমি যে কমলকে খুঁজছি সে একটি মহিলাকে ফাঁসিয়েছে?

বাসু বললেন, দেখ ভাই। আমি খোলা কথার মানুষ। এভাবে উলটো-পালটা প্রশ্নোত্তর করলে আমার চলবে না। তুমি যদি আমার সাহায্য চাও তাহলে আমাকে সাহায্যও করতে হবে। তুমি না চাও কথোপকথন বন্ধ করেআমরা দু-জনেই যে যার বাড়ি পানে হাঁটা ধরতে পারি। আর যদি আমার মাধ্যমে কমলের বর্তমান ঠিকানাটা জানতে চাও…

ছেলেটি বাধা দিয়ে বলে, বুঝেছি, বুঝেছি। বলুন, কী জানতে চান?

বাসু পকেট থেকে তাঁর নামাঙ্কিত একটি কার্ড ওর সামনে টেবিলে রেখে বলেন, প্রথম প্রশ্ন, তোমার নাম ও ঠিকানা।

ছেলেটা ওঁর কার্ডখানার দিকে তাকিয়েও দেখল না। ফেরত দেবার জন্য বাড়িয়ে ধরে বললে, মাপ করবেন, দাদু, আমি তে-তাস খেলার আসরে প্রথমে তিন ডীল ব্লাইন্ড খেলি।

বাসু নির্বিবাদে ওঁর নিজের নামাঙ্কিত কার্ডখানি তুলে নিয়ে বললেন, তাহলে ওই প্রশ্নটার জবাব দাও, যে মেয়েটিকে কমল ফাঁসিয়েছে সে তোমার কে?

– আমার ক্লায়েন্ট।

– যেহেতু এটা সেকেন্ড ডিল তাই বোধহয় আমার প্রশ্নটা করা সমীচীন হবে না – মেয়েটি তোমার ক্লায়েন্ট হল কোন সুবাদে – ডাক্তারি, ওকালতি, ঘটকালি…

– আজ্ঞে না, ওর একটাও নয়। আমি কমিশন নিয়ে কার্যোদ্ধার করি। আমার ক্লায়েন্টের বিশ হাজার টাকা মেরে দিয়ে ওই হারামজাদা গা-ঢাকা দিয়েছে। টাকাটা উদ্ধার করতে পারলে আমি কমিশন পাব টোয়েন্টি-ফাইভ পার্সেন্ট অর্থাৎ পাঁচ হাজার নেট!

– নেট? অর্থাৎ তোমার খরচ-খরচা ছাড়া?

– আজ্ঞে হ্যাঁ! এক্সপেন্সেস্ পৃথক। কিন্তু এত বিস্তারিত জানতে চাইছেন কেন?

– একই হেতুতে। আমিও ওই বিবাহ-বিশারদ কমলকে খুঁজছি একই কারণে। তাই ভাবছি, তোমাকে কমিশনে কাজটার দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না?

– কেন যাবে না! আমার রেট বাঁধা। টোয়েন্টি-ফাইভ। আপনার আত্মীয়ার কত খোয়া গেছে? কত দিন আগে?

– আমার মনে হচ্ছে থার্ড ডিল খেলা হয়ে গেছে। এখন তোমার নাম পরিচয়টা…

– আজ্ঞে না। আপনি যে পুলিশের লোক নন, তার প্রমাণ এখনও আমি পাইনি।

– আমার ভিজিটিং কার্ড তো তুমি দেখতেই চাইলে না।

– ভিজিটিং কার্ড-এ কিছু প্রমাণ হয় নাকি? সঙ্গে আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে? কিংবা পাসপোর্ট? একটি বাচ্চা ছেলে দু-কাপ চা নামিয়ে রাখল। তার হাতে একটা পাঁচ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বাসু উঠে পড়লেন। তাঁর ভিজিটিং কার্ডখানা এই অজ্ঞাতনামা যুবকটির দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, হিম্মতে যদি কুলায় তাহলে ওই ঠিকানায় কাল সকালে আটটার সময় আমার সঙ্গে দেখা কর। আমার ড্রাউভিং লাইসেন্স আর পাসপোর্ট দুটোই দেখাব। তবে হ্যাঁ…তোমার আইডেন্টিফিকেশনের সন্দেহাতীত প্রমাণটা নিয়ে যেও, ব্রাদার।

ছেলেটি বাধা দেয়, শুনুন, স্যার! আচ্ছা সব কথা বলছি…

বাসু রাজি হলেন না। বললেন, সরি যু হ্যাভ মিস্ড য়োর বাস্। কাল সকাল আটটায়। আমার চেম্বারে।

ছেলেটি উবুড়-করা কার্ডটা এবার চিত করে দেখল। কোন উচ্চবাচ্য করল না। রাস্তা পার হয়ে মটোর বাইকে সওয়ার হল। পাড়া কাঁপিয়ে নিঃশব্দে চলে গেল পুবমুখো।

বাসুও রাস্তা পার হলেন। লক্ষ্য হল পানওয়ালা দুলে দুলে বিড়ি বানিয়ে চলেছে বটে কিন্তু ওঁদের দু-জনকে মাঝে মাঝে চোখ তুলে নজর করছে। বাসু ওর কাছে ঘনিয়ে এসে বললেন, একটা দেশলাই দেখি।

লোকটা ‘নিক্কথায়’ একটা টেক্কামার্কা চতুষ্কোণ ওঁর দিকে বাড়িয়ে ধরল। বাসুও হিপ-পকেট থেকে ভারি ওয়ালেটটা বার করে তার গর্ভ থেকে বার করে আনলেন একটা বিশ টাকার নোট।এবার লোকটা পানের পিক্ ফেলতে বাধ্য হল। একটু ধমকের সুরে বললে, দেশলাই কিনে কি বিশ টাকার নোট ভাঙানো যায়, বাবু?

– না, যায় না!

– তাহলে? খুচরো দিন?

– না! গোটা নোটখানাই তোমার। ভাঙানি দিতে হবে না তোমাকে।

লোকটার গালে ঠাসা পান। তবু মুখটা হাঁ হয়ে গেল।

বাসু পাদপূরণ করলেন, তুমি এ পাড়ায় হাফপ্যান্ট পরে ড্যাংগুলি খেলেছ। সবাইকে চেন। তোমাকে বেশ চালাক-চতুরও মনে হচ্ছে আমার। তাই তোমার কাছে আমি কিছু সাহায্য চাইব। ও বিশ টাকা থাক। ভালো সার্ভিস দিলে আরও পাবে।

পানওয়ালা সামলে নিয়েছে। কিন্তু নোটখানা নেয়নি। সেটা ওর সামনে মার্বল স্ল্যাবে পাতা-পানের পাশে পড়েই আছে। বললে, তার আগে একটা কথা বলুন, স্যায়, আপনি পুলিশের লোক, না পার্টির? পাটি হলে কোন পার্টি।

বাসু নিকথায় নোটখানা তুলে নিলেন। পরিবর্তে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট সেখানে রেখে বললেন, তোমাকে আমি আন্ডার-এস্টিমেট করেছিলাম। তুমি বুদ্ধিমান। এই ধর আমার কার্ড। আমি ব্যারিস্টার। ওই দোতলায় যে লোকটি থাকে- যাকে তুমি ঘোযবাবু নামে চেন- ওরই সন্ধানে আমি এসেছিলাম…

– সে তো দেখতেই পেলাম, পাকা চল্লিশ মিনিট আপনি ছিলেন ওর দোতলার ঘরে।

– তা ছিলাম। তা তোমার নামটি কী বাপু? তুমি কোথায় থাক?

– আজ্ঞে, আমার নাম ঘটুক। বটুকনাথ মণ্ডল। থাকি এই বাড়িতেই। দিনে দোকান দেখি। রাতে থাকি এর উপরের ঘরখানায়। দেড়তলার কামরায়।

– একা?

– আজ্ঞে না, আমার পরিবারও থাকে, মানে ইস্ত্রি। মাত্র দু-জন…

– ওই ঘোষবাবু এ পাড়ায় ক’দিন এসেছে?

– কমলেশ ঘোয?

– কমলেশ? ওঁর নাম কমলেশ তা তুমি জানতে?

– আজ্ঞে আজ সকালেও জানতাম না, কিন্তু এখন জানি। আপনি তো কমলেশ ঘোষকেই খুঁজছিলেন।

– তা খুঁজছিলাম। তা উনি কতদিন এ বাড়িতে এসেছেন?

– ধরুন হপ্তাখানেক। মথুরাবাবু গাড়ি করে ওকে পৌঁছে দিয়ে গেছিলেন।

– মথুরাবাবুটি কে?

– যিনি এই বাড়িটা বানাচ্ছিলেন। ঠিকাদার। লক্ষপতি মানুষ।

– ঠিক আছে বটুক। আজ আমি যাই। পরে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। ওই কমলেশের বাড়িতে কে কখন আসছে, নজর রেখো। গাড়ি বাট্যাক্সিতে এলে গাড়ির নম্বর টুকে রেখো। আর কমল নিজে যদি বাড়ির বাইরে যায়, তাহলে কখন গেল, কখন ফিরল লিখে রেখো, কেমন?

– একটা কথা বলুন, স্যার? লোকটা কি মস্তান পার্টির? মানে রাজনৈতিক দাদাদের পোষা গুণ্ডা? পুলিশের সঙ্গে আঁতাত রেখে…

– না, বটুক, সে দিকে ভয় নেই। তবে হ্যাঁ, লোকটা আঁধারের কারবারিই।

– তাহলে স্যার, আমি ছা-পোষা মানুষ…

– ‘ছা’ আবার এল কোথা থেকে? এই যে বললে, দোতলার ঘরে তোমরা মাত্র দু-জন থাক? তুমি আর তোমার স্ত্রী?

– একটু রেখে-ঢেকে বলেছিলুম আর কী। দুই নয়, সওয়া দুই। আমার স্ত্রী- মানে- আর মাস ছয়েক-

– বুঝেছি। না, লোকটার সঙ্গে সংঘর্ষে যেয়ো না। দূর থেকে নজর রেখো শুধু। তোমার স্ত্রীর পিছনে খরচাও তো করতে হচ্ছে। উপরি কিছু রোজগারে আপত্তি কী?

– তা তো বটেই স্যার!