উনিশ
পরদিন সকাল।
ওঁরা চারজনে ব্রেকফাস্টে বসেছেন। আজ প্রাতরাশে কিছু রকমফের হয়েছে– কড়াইশুটির কচুরি। বোধকরি বাসু-সাহেবের সাফল্যের কারণে। সুজাতা কচুরিগুলো বেলে দিয়ে এসেছে। বিশু একটার পর একটা কড়াইয়ে ছাড়ছে, আর গরম-গরম পাতে নামিয়ে দিচ্ছে। রানু হিসাব রাখছেন জনান্তিকে – ব্যারিস্টার সাহেবের পাতে ক-খানা নামল। তাঁর কোলেস্টরল বুঝি বিপদসীমা ছুঁই-ছুঁই। তাই বেশি ভাজা খাওয়া মানা, অর্থাৎ ভাজা বেশি খাওয়া মানা।
কৌশিক বলল, একটা জিনিস কিন্তু আমার কাছে পরিষ্কার হয়নি, মামু। ত্রিদিবের আগে-আগে যে ছায়ামূর্তি ভারা বেয়ে নেমে গিয়েছিল সে কে?
বাসু, পাতের স্ফীতোদর খাদ্যবস্তুটার উদরে ফর্ক সহযোগে একটা ছিদ্র করে, ফুঁ দেওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন। বললেন, শিবানী সোমের কমিশন এজেন্ট।
– রানু একটু বিস্মিত হয়ে পড়েন: শিবানী সোম? সে কে?
– তোমরা এখনো চেন না। আমি চিনি।
– তাহলে আমাদের চিনিয়ে দাও।
– দিতে পারি। যদি তুমি আর একখানা কচুরি স্যাংশন কর! বিনা কমিশনে ‘কমিশন-এজেন্টে’র তথ্য পেশ করা চলবে না।
রানু হেসে ফেলেন। বলেন, পাতে যেটা রয়েছে সেটা নিয়ে ক-খানা হল?
– তিনখানা।
সুজাতা টপ্ করে ওঁর পাতে আর একটা কচুরি নামিয়ে দিয়ে বলে, তিন শত্রুর করতে নেই। নিন, হল তো? এবার বলুন – শিবানী সোম কে? তার পাত্তা কোথায় পেলেন?
– তথ্যটা সরবরাহ করেছে বটুক। সে দু নৌকোয় পা দিয়ে চলতে চেয়েছিল। কিন্তু দোহাত্তা লোটা তার বরাতে নেই। শিবানী সোমের এজেন্ট কেটে পড়ায় সে শুধু আমাকেই সংবাদ সরবরাহ করে পকেট ভারী করছিল। একেবারে শেষ পর্যায়ে।
কৌশিক বলে, বুঝেছি। কমলেশ খুন হওয়ার আগেই পানের দোকানে যে মোটর সাইকেলের মালিকের সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়। যে-ছোকরা সাহস করে আপনার চেম্বারে আসতেই রাজি হয়নি।
বাসু কচুরিতে একটা কামড় দিয়ে বলেন, হ্যাঁ, সেই ছোকরাই শহরতলির মস্তান। শিবানী সোমও বিবাহ-বিশারদ কমলের এক ধর্মপত্নী। তার কিছু গহনা হাতিয়ে কমল নিরুদ্দেশ হয়েছিল। ওই কমিশন-‘এজেন্ট ছোকরাও ঘটনার রাত্রে ওখানে উপস্থিত ছিল। সম্ভবত সে এসেছিল ত্রিদিবেরও আগে। আমার মনে হয়, সে যখন ভারা বেয়ে উঠছে তখনই ত্রিদিব এসে তার গাড়িটা রাস্তার ধারে রাখে। তাতেই ও আত্মগোপন করে লুকিয়ে বসে থাকে। সমস্ত ঘটনার হয়তো সে নীরব দর্শক– আড়ালে লুকিয়ে থেকে। চোখের সামনে কমলকে খুন হতে দেখে সে ভারা বেয়ে নেমে যায়। তার মোটর-সাইকেলের শব্দ অনেকেই শুনেছে।
– তাহলে ফিঙ্গার-প্রিন্টগুলো মুছে দিয়ে গেল কে?
– ‘নেতি-নেতি’ করতে করতে যে লোকটি অকুস্থলে সর্বশেষ উপস্থিত ছিল– যার ধমনীতে শক্তাবৎ রাজরক্ত! আপাতদৃষ্টিতে তাকে ন্যালা-ক্যাবলা মনে হলেও শয়তানি বুদ্ধি তার কম নয়! হয়তো প্রচুর ডিটেক্টিভ গল্প ওর পড়া আছে। তাই যখন দেখল সব শুনশান্– ডোরবেল বাজানোও বন্ধ হয়ে গেছে তখন ত্রিদিবই সব কিছু মসৃণ বস্তু তার রুমাল দিয়ে মুছে দিয়ে যায়। এমনও হতে পারে যে, রুমাল বার করবার সময়েই তার গাড়ির চাবিটা পড়ে যায়।
সুজাতা জানতে চায়, কিন্তু ঐ চাবির থোকাটা – মানে, যেটার ফটো খবরের কাগজে ছাপা হয়– সেটা যে ছন্দার নয়, ত্রিদিবের, তা বুঝলেন কেমন করে?
বাসু বললেন, সেটাই হওয়ার সম্ভাবনা। ছন্দার মতো সুস্থ মস্তিষ্কের মেয়ে তারাতলার মতো এলাকায় রাত একটার সময় গাড়ি ‘আন্নক’ করে নেমে যাবে এটা বিশ্বাস করা শক্ত। যদি যায়ই, তাহলে সে ফেরার পথে গাড়ি স্টার্ট করবে কেমন করে? কারণ আমাদের হাইপথেসিস্ – ত্রিদিবের প্রথম দিনেরবক্তব্য অনুযায়ী – ছন্দা নিজের সেট চাবিটা খুঁজে পায়নি বলেই থার্ড চাবিটা নিয়ে গিয়েছিল! সেটা যদি কমলেশের ঘরে খোয়া গিয়ে থাকে তাহলে ছন্দা ফেরার পথে গাড়ি স্টার্ট করতে পারে না! কিন্তু ত্রিদিবের মতো মানসিক রোগাগ্রস্ত রোগির পক্ষে তা সম্ভব। সে গাড়ি আন্নক অবস্থায় ড্যাশ-বোর্ডে চাবি রেখে চলে যেতে পারে। অথবা তার নিজস্ব চাবির থোকাটা হয়তো তার নিজের কোটের পকেটেই ছিল, যা সে খুঁজে পায় ফেরার পথে গাড়িতে ওঠার আগে পকেট তল্লাসী করতে করতে।
হঠাৎ কলবেলটা বেজে ওঠে। বিশু গিয়ে দরজা খুলে দেখল। আগন্তুক বাধা মানল না। সরাসরি চলে এল ভিতর বাড়িতে– ডাইনিং হলে। রানু সবার আগে দেখতে পেলেন। খুশিমনে ডেকে ওঠেন, এস, এস ছন্দা! ছাড়া পেয়ে গেছ তাহলে? বস ওই চেয়ারটায়।
ছন্দা এগিয়ে এল। নত হয়ে প্রণাম করল বাসুকে আর রানুকে। বলল, হাজত থেকে সোজা চলে এসেছি। আর যাবই বা কোথায়? আলিপুরের বাড়িতে তো প্রবেশ নিষেধ। ভ্রাদির বাড়িতে যেতে পারতাম, কিন্তু সেখানে যেতেও কেমন যেন সঙ্কোচ হল।
বাসু বললেন, এখানে চলে এসে বুদ্ধিমতীর মতো কাজ করেছ। তবে ইচ্ছা করলে যে-কোনও পাঁচতারা হোটেলে ভি. আই.পি. সুইটেও তুমি উঠতে পারতে।
ছন্দা ম্লান হাসে। বলে, ধনকুবেরের প্রাক্তন পুত্রবধূকে নিয়ে লেগ-পুলিং করছেন, স্যার?
রানু হাত বাড়িয়ে কর্তাকে বাধা দিলেন। ছন্দাকে বলেন, তুমি বাথরুমে গিয়ে মুখে-হাতে জল দিয়ে এখানে এসে বস দিকিন। সকাল থেকে এক কাপ চাও কপালে জোটেনি মনে হচ্ছে!
সুজাতা ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।
একটু পরে মুখ মুছতে-মুছতে ছন্দা ফিরে এসে বসল একটা চেয়ারে।
বিশু ওর সামনে নামিয়ে রাখল গরম কচুরির প্লেট।
আহারান্তে বাসু বললেন, রানু বাধা দেওয়ায় তখন তোমার প্রশ্নটার জবাব দিতে পারিনি ছন্দা। এখন বলি: না! রসিকতা আমি করিনি। ধনকুবেরের প্রাক্তন পুত্রবধূ হিসাবে তুমি আজ সত্তর লক্ষ টাকার মালিক! পাঁচ তারা হোটেলের বিলাসবহুল কক্ষ তোমার কাছে স্বপ্নরাজ্য নয়।
সুজাতা সংশোধন করে দেয়, সত্তর নয় মামু, সাতাত্তর লক্ষ।
– না সুজাতা। পাঁচ লাখ টাকার চেক ছন্দা দেবে কমলাক্ষ করের বিধবা অনসূয়া করকে, আর দু-লাখ কমলাপতি সোমের বিধবা শিবানী সোমকে। ওরা দু-জনেও কম ভোগেনি। ওদের কথা মনে ছিল বলেই আমি সত্তরের বদলে অঙ্কটা সাতাত্তর লাখ করেছি।
ছন্দা বোকার মতো একবার এদিকে একবার ওদিকে তাকিয়ে দেখে। শেষ বলেই ফেলে, এ সব কী আবোল-তাবোল বকছেন আপনারা?
বাসু নিঃশব্দে উঠে গেলেন পাশের ঘরে। তখনই ফিরে এসে চেকটা বাড়িয়ে ধরলেন ছন্দার দিকে টাকার অঙ্কটার দিকে নজর পড়ায় বজ্রাহত হয়ে গেল যেন। প্রশ্ন করবার ক্ষমতাও ছন্দার আর অবশিষ্ট ছিল না।
বাসু বললেন, ত্রিবিক্রম রাও আমার ফি মিটিয়ে দিয়েছেন। এটা তোমার ‘নেট’। তবে ওই সাতলাখ তোমার খরচ হবে! বুঝলে না? এটা তোমার বিবাহ-বিচ্ছেদের খেশারত। তোমার প্রাক্তন স্বামী দিচ্ছে: ‘অ্যালিমনি কাম-মানি-সেন্টে।’
ছন্দা বীরে-ধীরে চেকটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। মখটা থমথমে হয়ে গেল তার। বললে, ত্রিবিক্রম রাও-এর দেওয়া ঘুষ আমি নেব, এটা আপনি ধরে নিলেন কেন?
– ঘুষ! সাটেন্ল্ল নট! সবটাই লিগাল-মানি। কালো টাকার নয়। ত্রিবিক্রম ঘুষ দেবে আর আমি তাই হাত পেতে নেব? কী বলছ ছন্দা? এ তার অর্থদণ্ড! ঠিক আছে। চেকটা এখানেই থাক। তুমি এই কাগজগুলো নিয়ে ওঘরে যাও। পড়। তারপর ফিরে এসে তোমার সিদ্ধা জানিও…
ছন্দা জানতে চায়, কীসের কাগজ এগুলো?
– তোমাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলার ব্যাপারে ত্রিদিব কী ডিপজিশন দিয়েছে তা পড়ে দেখ। তারপর কী করতে চাও, বল।
প্রায় আধঘণ্টা পরে ছন্দা ফিরে এল। বলল, আশ্চর্য! আমি তো স্বপ্নেও এমন কথা ভাবতে পারিনি। ডাক্তার ব্যানার্জি তাহলে ঠিকই বলেছিলেন, মাতৃত্ব কামনার তির্যক পরিতৃপ্তির সন্ধানে আমি অন্ধ হয়ে গেছিলাম। ওকে শোধরানো অসম্ভব। জেনে-বুঝে সে আমাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দিচ্ছিল! আমার চাবির গোছাটা চুরি করে…
এই সময় বেজে উঠল টেলিফোনটা। এ কাজ চিরকাল রানুর। উনি আগ বাড়িয়ে যন্ত্রটা তুলে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই খবর পেয়েছেন। ছন্দা ছাড়া পেয়ে গেছে।…না, জামিন নয়, মুক্তি। পুলিশ আর মামলা চালাতেই চায় না।…আপনি কোথা থেকে বলছেন?….কী?…ক্যালাঙ্গুটে! সেটা আবার কোথায়?…না, না, নিতান্ত ঘটনাচক্রে সে এখানেই বসে আছে! ..এই তো আমার সামনে! ..আচ্ছা দিচ্ছি তাকে…
টেলিফোনটা বাড়িয়ে ধরে ছন্দাকে বলেন, ডাক্তার ব্যানার্জি! গোয়া থেকে এস. টি. ডি. করছেন…নাও, কথা বল…না, বরং এক কাজ কর। আমার রিসেপশনে চলে যাও। এই টেলিফোনের এক্সটেনশনে জনান্তিকে কথা বলতে পারবে। যাও।
ছন্দা সলজ্জে ও-ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। চেকটা তুলে নিয়ে।
রানু সুজাতার দিকে ফিরে বলেন, বল তো সু, ‘শেষের কবিতা’র শেষ কবিতার মোদ্দা কথাটা কী?
সুজাতা অবাক হয়ে বলে, আমি জানি না। হঠাৎ এ কথা কেন?
বাসু বললেন, ‘পরশুরামে’র মতে : উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে, সেই ধন্য করিবে আমাকে!’
(সমাপ্ত)
