দশ
পরদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে কৌশিক প্রশ্ন করল, কোন্ গাড়িখানায় যাওয়া হবে? আর কে কে যাবে?
বাসু বলেন, দু’ খানা গাড়িই যাবে। আমরা তিনজনই।
– কেন? তিনটি প্রাণী, দু’খানা গাড়ি কেন?– জানতে চায় সুজাতা।
– সে-কথা বললে তোমার মামিমার ধমক খাব। উনি এখনি বলবেন, এই সাতসকালে আমি আডাক-কুডাক ডাকছি। কিন্তু আমার মন বলছে, আজই একটা কিছু ঘটতে চলেছে। প্রয়োজনে যাতে আমরা আলাদা হয়ে যেতে পারি, তাই দু’ খানি গাড়িই দরকার। মিস্টার সেনকে কোনও নার্সিংহোমে পৌঁছেদিয়ে ডক্টর দাশগুপ্তকে খবর না দেওয়া পর্যন্ত আমার এ উত্তেজনা থামবে না। আমরা এই মুহূর্তেপ্রচণ্ডভাবে ভালনারেবল।
ঠিক আটটার সময় দু’খানা গাড়ি এসে থামল যদু কলোনিতে, গীতা করের বাড়ির সামনে। ‘কলবেল’ বাজাতে হল না। গাড়ির শব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে এল স্মরণিকা। ঘরোয়া পোশাক নয়, সে তৈরী হয়েই ছিল। বোধ হয় স্থির করেছিল কথাবার্তা শেষ হলেই গাড়ি নিয়ে বার হবে। ওঁদের তিনজনকে দেখে আপ্যায়ন করল, আসুন, আসুন মেসোমশাই। বসুন।
ওঁরা বসতে না বসতেই প্রশ্ন করে, গীতা নেই, আমিই গৃহকর্ত্রী। কী খাবেন বলুন? চা না কফি?
বাসু বলেন, স্থির হয়ে বস দিকিন। জরুরি কথা আছে তোমার সঙ্গে।
চুপ করে বসে পড়ে সামনের মোড়াটায়। হাত দুটি কোলের উপর রেখে ওঁর মুখের দিকে তাকায়। যেন ব্রতকথা শুনছে ভক্তিভরে! বলে, বলুন?
– তোমাকে কেউ কখনো বলে দেয়নি যে, ডাক্তারের কাছে রোগ আর সলিসিটারের কাছে ফ্যাক্ট লুকিয়ে রাখতে নেই? তাতে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা?
টুকু মুখটা নিচু করে হাতের বালাটাকে পাকাতে থাকে।
– কী? চুপ করে আছ যে? আমার কাছ থেকেও লুকাচ্ছ কেন?
– কী লুকাব? আপনি তো সবই জানেন। জানেন না? পুলিশে হয়তো ডায়মন্ড-হারবারে কল্যাণীকে খুঁজছে। কিন্তু আপনি তো বুঝতেই পেরেছেন সব কিছু?
– আমার কাছ থেকে কেন গোপন করতে চাইলে, বল তো?
– আমার সাহস হয়নি। আমার আশঙ্কা ছিল, আপনি হয়তো রাজি হবেন না। আপনার ‘প্রফেশনাল এথিক্স’ বাধা হয়ে দাঁড়াবে!
বাসু একটু থমকে গেলেন। কথাটা ভাববার। সত্যই আদালত আদেশ করেছে ডক্টর দাশগুপ্ত রোগীকে পরীক্ষা করবেন, এ সময় তিনি নিশ্চয় ওভাবে সত্যানন্দ সেনের অপসারণ অনুমোদন করতেন না। বললেন, ঠিক আছে। আমি যা যা জানতে চাইছি তার জবাব দাও তো? সতের নম্বর কেবিনে মিস্টার সেনকে কী অবস্থায় দেখতে পেলে? চামড়ার স্ট্র্যাপ দিয়ে তিনি বাঁধা ছিলেন?
– হ্যাঁ। ওরা এত জোরে বেঁধেছিল যে উনি পাশ ফিরতেই পারছিলেন না, মাথা নাড়াতে পারছিলেন না। হাত দুটিও বাঁধা। মুখে মাছি বসলেও তাড়াবার ক্ষমতা ছিল না তাঁর।
– তুমি চামড়ার স্ট্র্য্যাপটা কাটলে কেমন করে?
– রান্নাঘর থেকে একটা ধারালো ছুরি নিয়ে গেছিলাম। মাংসকাটা ছুরি।
– উনি তোমাকে চিনতে পারলেন?
– আশ্চর্য! হ্যাঁ, পারলেন। আমি যখন যা বলেছি, তাই মেনে নিয়েছেন। জামাকাপড় বদলে তাঁকে নিয়ে আসতে কোনই অসুবিধা হয়নি।
– দারোয়ান আপত্তি করেনি? দারোয়ান কি তোমাকে চিনত কল্যাণী দাসী হিসাবে?
– না। কিন্তু জেঠুকে নিয়ে যখন চলে এলাম তখন দারোয়ান গেট-এর কাছে ছিল না। কোথায় ছিল আমি জানি না।
– তাঁকে এখানে নিয়ে এলে না কেন?
– আমার আশঙ্কা ছিল ওরা এখানে আসতে পারে। ঐ জেতুর রিস্তেদারেরা। আমার অ্যাড্রেস বইতে গীতা করের ঠিকানা আর টেলিফোন নাম্বার লেখা আছে। অ্যাড্রেস-বইটা আমার ঘরের টেবিলে পড়ে আছে।
– তোমার জেঠুকে কোথায় রেখে এসেছ?
স্মরণিকা নয়ন নত করল। শুধু মাথাটা নাড়ল ডাইনে-বাঁয়ে।
– বলবে না? আমাকেও বলবে না?
– আজ্ঞে না। হপ্তাখানেক সময় আমাকে দিতেই হবে। তিনি যেখানে আছেন সেখানে কেউ তাঁর সন্ধান পাবে না। দিন-সাতেকের মধ্যে জেঠু ঐ শক্টা কাটিয়ে উঠবেন। আমি নিশ্চিত। তখন আপনি ডক্টর কৈলাশনাথকে ডেকে আনবেন। তার আগে নয়।
– তুমি ওঁকে কিছু টাকাপয়সা দিয়েছ?
– হ্যাঁ। আপনি আমাকে যা দিয়েছিলেন সবটাই তাঁকে দিয়েছি। আমার হাতখরচের জন্য একখানা ব্যাঙ্ক-ড্রাফ্টট্ নিজের কাছে রেখেছি। আজই সেটা ভাঙাবো। পাঁচ হাজার টাকার।
বাসু ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করেন। বলেন, ওঁর এখন যা শারীরিক আর মানসিক অবস্থা তাতে চল্লিশ হাজার টাকা তাঁর কাছে রেখে এসে বুদ্ধিমানের কাজ করনি।
– আপনাকে আর একটা কথা বলা হয়নি, মেসোমশাই…..
– কী কথা?
– জেঠু একখানা সাদা কাগজে একটা উইল করেছেন। তার আদ্যন্ত তাঁর নিজের হাতে লেখা। তারিখ গত কালকের। তিনি তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর আমাকে দিয়ে গেছেন। এবং কারও প্ররোচনায় যে তিনি উইলটি লেখেননি তারও উল্লেখ আছে। আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, দুজনকে দিয়ে সাক্ষী হিসাবে সই করিয়ে নিতে।
বাসু-সাহেবের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। বললেন, আদালতে তোমার জন্ম-সংক্রান্ত যে-সব কথা উঠেছিল সে-বিষয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে?
– না, হয়নি। আমার মনে হয় এখনো তার সময় হয়নি। বাই-দ্য-ওয়ে, উইলে তিনি আমাকে ভ্রাতুষ্পুত্রী বলে উল্লেখ করেননি কিন্তু।
– উইলটা কোথায়? তোমার কাছে?
– হ্যাঁ।
– ওটা আমাকে দিয়ে দাও। আমার কাছে ওটা থাকবে।
– জেঠুও তাই বলেছেন। নিন।
ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে কাগজখানা সে বাসু-সাহেবকে দিল। উনি মিলিয়ে দেখলেন। তারিখ, সই, শেষ উইলের স্বীকৃতি। কারও প্ররোচনা ব্যতিরেকে। বললেন, উনি যে এই উইলটা করেছেন আর আমি যে সেটা গচ্ছিৎ রেখেছি এটা কাউকে বলবে না, বুঝেছ? আমি এ জাতের উইল পছন্দ করছি না। কারণ এটা ইনকমপ্লিট। আইনত সিদ্ধ নয়, তাছাড়া একবার যখন একটি আদালত তাঁকে ‘ইনকম্পিটেন্ট’ বলেছে তখন সর্বপ্রথমেই প্রমাণ করা দরকার যে তিনি ‘কম্পিটেন্ট’। আমাদের প্রথম কাজ ডক্টর দাশগুপ্তকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া।
স্মরণিকা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল, সরি, স্যার! উনি এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। যে সব ওষুধ, ইনজেকশন তাঁকে দেওয়া হয়েছিল তার প্রভাব কাটতে চার-পাঁচদিন লাগবেই।তার আগে ডক্টর দাশগুপ্ত ওঁকে পরীক্ষা করলে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসবেন।
বাসু বিরক্ত হয়ে বলেন, কী বক্ পাগলের মতো? ডক্টর দাশগুপ্তের চিকিৎসায় উনি অনেক তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে উঠবেন।
আবার মাথা নাড়ল মেয়েটি, না, স্যার, আমি রাজি নই।
– অলরাইট! তোমাকে রাজি হতে হবে না। তুমি শুধু আমাদের সঙ্গে এস দিকিন!
– কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?
– চুলোর দোরে! এস।
প্রায় আধঘণ্টা পরে দেখা গেল দুখানি গাড়ি ডায়মন্ড-হারবার রোড দিয়ে দক্ষিণে চলেছে। সামনের গাড়িতে পিছনের সীটে স্মরণিকা আর সুজাতা। চালক বাসু-সাহেব। পিছনের ‘রেন্ট-আ-কার’-এ কৌশিক একা। গাড়ি দু’খানা জি. জি.সি. এল. ফ্যাক্টরির কাছাকাছি এসে গতিবেগ কমিয়ে ফেলল। স্মরণিকার চোখে পাতাটি পড়ল না। সে সামনের দিকে তাকিয়ে নির্বাক বসে আছে। গাড়ি বাঁয়ে বাঁক নিল। গেট পার হয়ে কিছু দূরে বাঁ-হাতে সেই মোটেল। কিন্তু তার সামনে একটা জটলা। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন মানুষ ভিড় করেছে। ফ্যাকটরির সিকিউরিটি তাদের সামলাচ্ছে। আর রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের একটি জীপ। বাসু-সাহেব মোটেলের সামনে থামলেন না। একটু এগিয়ে গাড়িটা বাঁয়ে পার্ক করলেন। ঠিক পিছন-পিছন এসে থামল কৌশিকের গাড়িখানা।
বাসু পিছন ফিরে স্মরণিকাকে বললেন, হল? ঐ দেখ তোমার পাকামো করার ফল! স্মরণিকা বিহ্বলের মতো পিছন ফিরে মোটেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভিড়ের ভিতর কী আছে বোঝা যাচ্ছে না। বাসু বলেন, এখনো বুঝতে পারনি? যেভাবে আমি ঐ মোটেলটাকে খুঁজে বার করেছি ঠিক সেইভাবেই তোমার জেঠুর রিস্তেদারেরা সেটা খুঁজে বার করেছে। তারা পুলিসে খবর দিয়েছে। পলাতক পাগলটাকে ধরে নিয়ে যেতে ঐ জীপ এসেছে। তোমার মতো নির্বোধের উপযুক্ত…
হঠাৎ দু-হাতে মুখ ঢেকে স্মরণিকা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
সুজাতা ধমক দেয়; আহহ্, আপনি থামুন তো মামু!
– আই নো! আই নো! এখন সান্ত্বনার বাক্য শোনানো উচিত।
হঠাৎ পিছনের গাড়ি থেকে কৌশিক ছোট্ট একটা হর্ন দিল।
বাসু পিছন ফিরে দেখলেন।
– হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো! বাসু-সাহেব এ-পাড়ায় কী মনে করে?
ইন্সপেক্টার বরাট। বহুবার বহু কেস-এ মুখোমুখি হতে হয়েছে। হোমিসাইড-বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মচারী। বাসু তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে আসেন, যাতে পিছনের দুই আরোহিণীকে বরাট না লক্ষ্য করে। তাদের মধ্যে একজন বর্তমানে রোরুদ্যমানা – বরাটের সন্দেহ হতেই পারে। বলেন, গুড মর্নিং মিস্টার বরাট! এখানে এত ভিড় কেন?
বরাট একটা সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে বলে, আমার প্রথম প্রশ্নের জবাবটা মুলতুবি আছে ব্যারিস্টার সাহেব। তার জবাবটা আগে শুনি। আপনি সাত-সকালে জি. জি. সি. এল. ক্যাম্পাসে কী মনে করে?
– আমার এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করতে। মোটেলের সামনে ভিড়টা কিসের?
বরাট ওঁর বক্তব্যের শেষার্ধকে পাত্তা দিল না। প্রথমার্ধ বিষয়েই তার কৌতূহল। বললে, কে আপনার মক্কেল? কী নাম? জি. জি. সি. এল.-এর স্টাফ?
বাসু কথা বলতে বলতে একটু দূরে সরে আসেন। স্মরণিকাকে সামলে নেবার সুযোগ দিতে। বললেন, মিসেস্ বরাট আপনার সঙ্গে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে গেলে…
বরাটের গলায় সিগ্রেটের ধোঁয়া আটকে যায়। কোনক্রমে কাশতে কাশতে বলে, হোয়াট? কী বকছেন পাগলের মতো? ওয়াইফের সঙ্গে আমার ঝগড়া হল কবে?
– না, তাই বলছি। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছি আর কি। অর্থাৎ আপনাদের দাম্পত্য-জীবন নিয়ে আমার কৌতূহল জাগাটা ঠিক নয়। জাগলেও সেটা আমার দমন করা উচিত।ঠিক যেমন, আমার ক্লায়েন্টের নাম, সে কোথায় চাকরি করে এইসব বৃত্তান্ত…
– যাক মশাই। আপনাকে আর ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না। আমি শুধু জানতে চাইছিলাম, আপনার মক্কেল কি কোনও হোমিসাইড কেস-এ ফেঁসেছে?
– কী কেস?
– হোমিসাইড? খুন? কাল রাত্রে এই মোটেলে এক ভদ্রলোক বেমক্কা খুন হয়ে গেছে। চীনে খাবারের সঙ্গে কেউ কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বেচারীকে ঘুম পাড়িয়েছে। তারপর দরজা-জানলা বন্ধ করে গ্যাস-স্টোভটা খুলে দিয়ে কেটে পড়েছে। পাশের ঘরের ভদ্রলোক গ্যাসের গন্ধ পেয়ে চেঁচামেচি জুড়ে দেন। ওঁরা গ্যাস বন্ধ করে দরজা -জানলা সব খুলে দেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে!
– ‘যা হবার হয়ে গেছে’! মানে?
– ঐ সাধুভাষায় যাকে বলে ‘পঞ্চত্বপ্রাপ্তি’ আর কি! তাই আপনাকে দেখেই আমার সন্দেহ হল, আমরা একই কেস-এ এসেছি নাকি? আপনি এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারেই কোনও মক্কেলের স্বার্থে আসেননি তো?
বাসু বললেন, বিশ্বাস করুন ইন্সপেক্টর বরাট, মোটেলে যে একজন মানুষ খুন হয়েছে এ-কথা আপনার কাছে এইমাত্র শুনলাম। লোকটার পরিচয় জানা যায়নি?
– গেছে, নাম এবং ঠিকানা। লোকটির নাম সত্যানন্দ সেন। যা হোক, আপনি যখন অন্য কেস-এ এসেছেন তখন আর আপনাকে আটকাবো না।
কে বলবে ওঁর ষাট বছর বয়স! তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসেন চালকের আসনে। তৎক্ষণাৎ স্টার্ট দেন। লম্বা একটা চক্কর মেরে ফের ডায়মন্ড-হারবার রোড-এ। পিছন থেকে শোনা যায় সুজাতার কণ্ঠস্বর : গাড়িটা দাঁড় করান মামু। ও ফেইন্ট হয়ে গেছে।
পরপর দু’খানি গাড়ি ডায়মন্ড-হারবার রোডের পাশে দাঁড়ালো। মুখে-চোখে জলের ঝাপটা দিতেই জ্ঞান ফিরে এল স্মরণিকার। পাথরের মূর্তির মতো সে বসে রইল পিছনের সীটে।
গাড়ি দু’খানি ফিরে এল যদু কলোনিতে। সুজাতার হাত ধরে, বস্তুত তার কাঁধে ভর দিয়েই, স্মরণিকা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে ফ্ল্যাটের দরজা খুলল। চারজনেই বসলেন। বাসু বললেন, আমাদের হাতে সময় খুব কম। আমি কয়েকটা কথা জেনে নিতে চাই…
কৌশিক উঠে গিয়ে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল।
– আমি তোমার কাছে সহজ সরল প্রত্যুত্তর শুনতে চাই স্মরণিকা। তুমি নিজেকে তৈরী করে নাও।
অসীম মনোবল মেয়েটির। বললে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। কী জানতে চান, জিজ্ঞেস করুন।
– করছি। তার আগে বলি, তোমার-আমার কথোপকথন একটা বিশেষ জাতের। তুমি আমাকে কী বলেছ তা পুলিস জানতে চাইতে পারবে না। আদালত জিজ্ঞাসা করতে পারবে না। কিন্তু সুজাতা বা কৌশিক তোমার কাউন্সেল নয়। ফলে, তুমি যদি চাও তাহলে ওদের চলে যেতে বলি।
– ওঁদের চলে যাবার কোন প্রয়েজন নেই।
– তোমার নেই। আমার আছে। তোমরা দুজন গাড়িতে গিয়ে বস।
বিনা বাক্যব্যয়ে ওরা দুজন ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল। বাসু দরজাটা বন্ধ করে ওর দিকে ফিরে বললেন, তোমার জেঠুর মৃত্যুর ব্যাপারে তোমার কোনও হাত আছে?
– কী বলছেন আপনি?
– আজেবাজে কথা বল না। ‘ইয়েস’ অর ‘নো’?
– নিশ্চয় নেই। তাঁকে আমি বাবার মতো দেখতাম। তাঁর সেবা করতে আমি তো কোনদিন কার্পণ্য করিনি। ওরাই তো আমাকে জোর করে বিলেত পাঠিয়েছিল।
– তা ঠিক। কিন্তু কেসটা ক্রমে ক্রমে অনিবার্য ভাবে তোমার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। তোমার অজ্ঞাতসারেই। প্রথম কথা, তোমাদের রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। উনি উইল করে – সুস্থ মস্তিষ্কে উইল করে – তোমাকে কিছু না দিয়ে গেলে তুমি এক কানাকড়িও পেতে পার না। তোমার জেঠুর বৈমাত্রেয় ভাই আদালতে আবেদন করেছে যে, তুমি ছলে-বলেকৌশলে সম্পত্তিটা গ্রাস করতে চাও। সওয়া লক্ষ টাকার চেকটা তারা প্রমাণ হিসাবে দাখিল করেছে। এই অবস্থায় আদালত একজন কনজারভেটর নিযুক্ত করল। তোমার জেঠুকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। আর তুমি সেখান থেকে তাঁকে অপহরণ করে এনে তুললে একটা মোটেলে। পরদিন দেখা গেল তোমার কাছে একটা উইল, তাতে সত্যানন্দ সেন তোমাকে সর্বস্ব দিয়ে যাচ্ছেন এবং তারপর চব্বিশ ঘণ্টা না কাটতেই তিনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেলেন। কী বলবে এবার?
স্মরণিকা কিছু বলতে গেল। পারল না। তার ঠোঁট দুটি থরথর করে কেঁপে উঠল। দাঁতে দাঁত দিয়ে সে নির্বাক বসেই রইল।
– তুমি কাল তাঁকে চাইনীজ-ফুড এনে দিয়েছিলে?
জবাবটা জানা ছিল। দেখতে চাইলেন, ও স্বীকার করে কিনা। তাই করল।
– তোমার কাছে কোনও ওষুধ ছিল?
একটু দেরি হল জবাবটা দিতে। তারপর স্বীকার করল। বিলেত যাবার আগে স্মরণিকা সত্যই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। জেঠুর জনডিস-এ সেবা করতে করতে। ওর ঘুম হত না। তখন ডাক্তার ওকে ঘুমের ওষুধ দেন। রোজ রাত্রে খেতে বসার আগে সে একটা করে বড়ি খেত। ওর ভ্যানিটি ব্যাগেই ছিল তেমন ওষুধের একটা পাতা। কাল জেঠুকে খাবারটা দিয়ে ও যখন যদু কলোনিতে ফিরে যেতে চাইল তখন সত্যানন্দ বলেছিলেন, ঘুমের বড়ি ছাড়া তাঁর ঘুম আসে না। টুকু তাই ঐ এক পাতা ঘুমের ওষুধ ওঁকে দেয়। বলে, একটা বা দুটোর বেশি যেন তিনি না খান।
– কী ওষুধ? – জানতে চান বাসু।
– কাম্পোজ।
ঠিক তখনি দরজায় কে যেন সন্তর্পণে টোকা দিল। বাসু উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন। সুজাতা আর কৌশিক প্রবেশ করল ঘরে। কৌশিক বললে, মামু, একটা কথা বলতে এলাম। ঐ কাগজখানার কথা গোনাগুনতি ঠিক পাঁচজনে জানতে পেরেছে। একজন মারা গেছেন। বাকি চারজনের মধ্যে আপনারা দুজনে যদি সে-কথা ভুলে যেতে রাজি থাকেন এবং এখনি কাগজটা পুড়িয়ে ফেলেন তবে আমরাও তা ভুলে যাব। আমরা দুজন।
– ঐ উইলটা।
– আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার মক্কেলের বিরুদ্ধে ঐটেই সবচেয়ে মারাত্মক এভিডেন্স। হত্যার মোটিভ!
বাসু ধীরে ধীরে দুদিকে মাথাটা নাড়লেন।
– কেন নয়? আর তো কেউ জানে না?
– তা জানে না। কিন্তু তাতে আমি রাজি হতে পারি না। দুটি কারণে। দুটি নয়, তিনটি কারণে। এক নম্বর, প্রফেশনাল এথিক্সে আমি সজ্ঞানে কোন এভিডেন্স নষ্ট করতে পারি না।দু নম্বর, তুমি একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিটেকটিভ। তোমাকেও প্রফেশনাল কারণে এ-কাজে বাধা দেওয়া আমার উচিত। আর সবচেয়ে বড় হেতু– আমি চিরকাল দেখেছি কৌশিক, ‘সত্য’– নিছক ‘সত্য’ হচ্ছে আইনজীবীর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আমরা, উকিলেরা – এটা বিশ্বাস করি না। তাই অর্ধসত্য নিয়ে লড়তে যাই, আর হারি। দোষ দিই অদৃষ্টকে!
ঠিক তখনই বাইরে থেকে কে যেন কড়া হাতে কড়া নাড়ল।
কৌশিক দরজার ছিটকিনিটা সরিয়ে দিল।
ঘরে প্রবেশ করল ইন্সপেক্টর বরাট আর তার সহকারী রবি বসু।
খোলা দরজার মাঝখানে পাথরের মূর্তির মতো ইন্সপেক্টার বরাট দাঁড়িয়ে রইল কয়েকটা মুহূর্ত। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর গলাটা সাফা করে বলল, এখানেও আপনি?
রবি পরিচয় করিয়ে দিতে যায়, উনি, মানে ব্যারিস্টার পি. কে. বাসু–
বরাট ধমকে ওঠে, থাম তুমি! মাসির কাছে মেসোর কিস্সা! আধঘণ্টা আগেই ওঁর সঙ্গে মুলাকাৎ হয়েছে।
তারপর বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে প্রশ্ন করে, একই প্রশ্ন আবার করছি ব্যারিস্টার সাহেব, সাতসকালে এখানে কী মনে করে?
– একই জবাব, মক্কেলদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
বরাট ঘরের বাকি তিনজনকে একনজর দেখে নিয়ে বলল, আপনার মক্কেলদের নাম যদি এই ঠিকানার স্মরণিকা দত্ত ওরফে স্মরণিকা সেন হয়, তাহলে তাঁর সত্যিই একজন সলিসিটরের প্রয়োজন। ইনিই কি স্মরণিকা দেবী?
– হ্যাঁ, তাই। কেন?
– তাহলে আমি দুঃখিত, ওঁকে অ্যারেস্ট করতে হবে আমাকে।
– অ্যারেস্ট! কেন? কীসের চার্জ-এ?
– সত্যানন্দ সেন-এর হত্যাপরাধে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল কেন সাতসকালে জি. জি. সি. এল. ক্যাম্পাসে ব্যারিস্টার পি. কে. বাসুর শুভাগমন ঘটেছিল।
বাসু টুকুর দিকে ফিরে বললেন, সে-ক্ষেত্রে তুমি থানায় গিয়ে কোন প্রশ্নের জবাব দেবে না, টুকু। আমার অনুপস্থিতিতে। এমন কি আজকে কী বার, এখন কটা বেজেছে তাও নয়! বুঝলে? ভারতীয় সংবিধান…
– জাস্ট এ মিনিট, জাস্ট এ মিনিট ব্যারিস্টার-সাহেব। আমি এখনি আপনার মক্কেলকে অ্যারেস্ট করছি না। ওঁর কাছ থেকে কিছু প্রশ্ন জেনে নেবার আছে। আপনার আপত্তি নেই তো?
– আছে এবং নেই। আপনি যখন ইতিপূর্বেই জানিয়েছেন যে স্মরণিকাকে ঐ হত্যাপরাধে অ্যারেস্ট করতে পারেন তখন আমার মক্কেল হয়তো সব প্রশ্নের জবাব দেবে না। অন্তত যে প্রশ্নের জবাব দিতে আমি নিষেধ করব সে প্রশ্নের জবাব ও দেবে না। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন…
বরাট গুছিয়ে বসল। ইন্সপেক্টার রবি বোস বয়সে এবং সিনিয়ারিটিতে বরাটের জুনিয়ার। তাছাড়া বাসু-সাহেবকে সে শ্রদ্ধা করে (হেতুটা ‘ঘড়ির-কাঁটা’য় প্রাপ্তব্য); তাই বাসু-সাহেব যখন দাঁড়িয়ে আছেন, তখন সেও সোফায় বসল না।
বরাট স্মরণিকাকে প্রশ্ন করে, গতকাল সকালে আপনি জি. জি. সি. এল. কমপ্লেক্সের মোটেলে তিন-নম্বর ঘরটা নিজ নামে বুক করেন?
স্মরণিকা বাসু-সাহেবের দিকে তাকিয়ে, আপত্তির কোন লক্ষণ না দেখে বলে, করি।
– তার মানে ওদের রেজিস্টারে ‘স্মরণিকা সেন’এর স্বাক্ষর আপনার?
– হ্যাঁ, তাই।
– সঙ্গে যিনি ছিলেন তিনি আপনার…আই মীন, তাঁকে আপনি ছেলেবেলা থেকে জেঠু নামে ডেকে এসেছেন? তিনি সত্যানন্দ সেন?
টুকু নজর করে দেখল বাসু-সাহেবের মুণ্ডুটা গ্র্যান্ড-ফাদার-ক্লকের পেন্ডুলামে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। মাথাটা দুদিকে দুলছে।
বললে, জবাব দেব না।
– কাল রাত্রে আপনি আপনার জেঠুকে কিছু চাইনীজ ফুড কিনে এনে দিয়েছিলেন, ঐ সংলগ্ন রেস্তোরাঁ থেকে?
টুকু বাসু-সাহেবের দিকে দেখে নিয়ে বলল, জবাব দের না।
বরাট বলল, এ-সবকথা অস্বীকার করে কী লাভ স্মরণিকা দেবী? জেঠুর জন্য দোকান থেকে খাবার কিনে আনা তো কোনও অপরাধ নয়। তাছাড়া চীনে-দোকানের সেল্স-াউন্টারে মেয়েটি তো আপনাকে সনাক্ত করবেই। মাত্র কাল রাত্রের ঘটনা। ফলে এসব সত্য-কথা চেপে যাওয়ায় আপনার অপরাধ-প্রবণ মনের প্রতিচ্ছবিই ফুটে উঠছে না কি?
টুকু তার উকিলের দিকে একনজর দেখে নিয়ে নীরব রইল।
বরাট উঠে দাঁড়াল। বাসুর দিকে ফিরে বলল, আপনি কি আপনার মক্কেলকে নিয়ে অনুগ্রহ করে অকুস্থলে একবার আসতে পারেন?
বাসু বললেন, পুলিসের সঙ্গে সহযোগিতা করতে আমরা সর্বদাই প্রস্তুত।কিন্তু আপনার যদি উদ্দেশ্য হয়, সেই চীনা-দোকানের সেল্স-কাউন্টারের মেয়েটিকে দিয়ে ওকে সনাক্তকরণের চেষ্টা, তাতে আমার ঘোরতর আপত্তি। ওভাবে পুলিস-কেস-এ আইডেন্টিফিকেশন হয় না, তা আপনিও জানেন, আমিও জানি।
রবি বোস এবার কথা বলে ওঠে, না স্যার। মিস সেনকে দিয়ে আমরা ডেড বডিটা সনাক্ত করাতে চাই? তাতেও কি আপনার আপত্তি?
বাসু সিনিয়ার অফিসার বরাটের দিকে ফিরে বললেন, তার আগে আমরা জানতে চাই মৃতদেহটা কখন আবিষ্কৃত হয়েছে, আর মৃতের নাম যে সত্যানন্দ সেন তো কেমন করে জানা গেছে।
বরাট আপত্তি করল না। রবি বসুর দিকে ফিরে বলল, তুমিই বল, বাসু।
শোনা গেল, মৃতদেহটা আবিষ্কৃত হয়েছে গতকাল রাত পৌনে এগারোটার সময়। মোটেলের দুই-নম্বর ইউনিটের আবাসিক প্রবীর ঘোষাল নৈশাহারের সন্ধানে সংলগ্ন রেস্তোরাঁয় গেছিলেন। তিনি শ্রীরামপুরের বাসিন্দা। জি. জি. সি. এল.-এরসাপ্লায়ার। গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। রাতটা এখানে কাটিয়ে যেতে চাইলেন। নৈশাহার সেরে ফিরে এসে তাঁর মনে হল পাশের ঘর থেকে গ্যাস-লীকের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি মোটেলের ম্যানেজারকে খবর দেন। ডুপ্লিকেট চাবির সাহায্যে ঘর খুলে ওঁরা দেখেন, তিন-নম্বর ঘরের আবাসিক জুতো-জামা পরে খাটে শ্বাসবন্ধ হয়ে পড়ে আছেন। দরজা-জানলা খুলে দেওয়া হয়। একটা টেবিল ফ্যান এনে ঘরের দূষিত বাতাস বিতাড়নের চেষ্টা হয়। ডাক্তার আসেন। তিনি ঐ তিন-নম্বর ঘরের আবাসিককে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পুলিশ আসে রাত বারোটায়। দেখা যায়, তিন-নম্বর ঘরটি তাঁর ‘আঙ্কেল’এর জন্য বুক করেছেন মিস স্মরণিকা সেন, গতকাল সকাল ছয়টায়। গাড়ির নম্বর W B F 9852। অ্যাম্বাসাডার। মোটেল-ম্যানেজারের বিবৃতি অনুসারে ঝক্ককে রঙ করা। গাড়িটা গ্যারেজে ছিল না। পুলিশ অত রাত্রে কিছুই করতে পারে না। ঘরটা সীল করে দিয়ে চলে যায়, একজন পাহারাদারকে বসিয়ে। পরদিন, অর্থাৎ আজ ভোর বেলা, পুলিশ আবার আসে। পুলিশ-ফটোগ্রাফার ফটো নেয়। স্মরণিকা সেন-এর সন্ধান পাওয়া যায় না, গাড়িখানাও না-পাত্তা। তবে তল্লাসী করে দেখা যায়, মৃতের ব্রীফকেস-এ একটা লেটারহেড প্যাড আছে। তা থেকেই জানা যায়, মৃতের নাম সত্যানন্দ সেন। তিনি নিউ আলিপুরের বাসিন্দা। লেটার-হেডে তাঁর বাড়ির ফোন-নাম্বারও ছিল। বরাট ফোন করে। ফোন ধরেন এক ভদ্রমহিলা। তিনি নাকি ঐ সত্যানন্দ সেনের ভাইয়ের স্ত্রী। ভাই বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু অসুস্থ। শয্যাশায়ী। তাই ঐ মহিলাই সব কথা বললেন। জানালেন যে, সত্যানন্দ মানসিকভাবে অসুস্থ। একটা মেন্টাল-হোমে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। পুলিশে ডায়েরি করা হয়েছে। টি. ভি.-তে নিরুদ্দেশ সম্বন্ধে প্রচারও হয়েছে। ঐ ভদ্রমহিলাই যদু কলোনির এই ঠিকানাটা সরবরাহ করেন এবং জানান যে, এই ঠিকানায় শ্রীস্মরণিকা সেন ওরফে দত্ত থাকেন – যাঁর বিরুদ্ধে সত্যানন্দের সম্পত্তি গ্রাসের বিষয়ে মামলা নাকি আদালতে ঝুলছে। তিনি সত্যানন্দ সেনকে চেনেন। দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে রবি বলে, মৃতদেহটি মর্গে অপসারণের জন্য ওখানেই পড়ে আছে। অ্যাম্বুলেন্সও এসেছে। কিন্তু মৃতদেহ রিম্যুভ করার আগে কেউ ‘আইডেন্টিফাই’ করলে ভাল হয়। এ তো বেওয়ারিশ মড়া নয়। আপনি কি মিস্ সেনকে নিয়ে….
বাধা দিয়ে বাসু বলেন, সত্যানন্দের ঐ বৈমাত্রেয় ভাই বা তার স্ত্রী এসে কেন মৃতদেহ সনাক্ত করছেন না? নিকটতম আত্মীয় বলে সম্পত্তিটা তো ওরাই দখল করতে চায়?
বরাট বলে, অত বিস্তারিত আমি জানি না, ব্যারিস্টার সাহেব। অন্তত এই স্টেজে। ঐ ভদ্রমহিলা টেলিফোনে বললেন যে, তাঁর স্বামী– মানে মৃতের বৈমাত্রেয় ভাই, অসুস্থ – অ্যাকুট ডায়েরিয়া – আর উনি নিজে নার্স, শুশ্রুষা করছেন। তাই ওঁরা আসতে পারছেন না…
– ও বাড়িতে আরও একজন তো আছে বিলাসসিং যাদব। সে মিস্টার সেনকে বিলক্ষণ চেনে। তাহলে সে কেন আসছে না?
বরাট বললে, মিস্টার বাসু, বিলাসসিং যাদবের নাম আমি জীবনে প্রথম শুনলাম। সে ও-বাড়িতে আছে কিনা, থাকলে সে আসতে পারবে কিনা, তা আমার জানা নেই। কিন্তু আপনার মক্কেল কেন মৃতদেহটা সনাক্ত করতে পারবেন না সেটা জানতে পারি কি?
– অল রাইট! লেট্স গো!
আবার ডায়মন্ড-হারবার রোডে গাড়ির প্রসেশান। এবার তিনখানা। সবার আগে পাইলট-কার: পুলিশের জীপ। তার পিছনে বাসু-সাহেবের গাড়ি। তার পিছনের সীটে সুজাতা আর স্মরণিকা। সবার পিছনে কৌশিকের গাড়ি। মোটেলের সামনে সার দিয়ে গাড়িগুলো দাঁড়ালো। কৌতূহলী জনতার ভিড় পাতলা হয়ে গেছে। দুজন কন্সটেবল আর কারখানার সিকিউরিটি-ম্যান দাঁড়িয়ে আছে। মোটেলের পিছনদিকে দাঁড়িয়ে আছে একটা অ্যাম্বুলেন্স।
ওঁরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে আসতেই মোটেল থেকে এগিয়ে এল ম্যানেজার আর অদূরের রেস্তোরাঁ থেকেও কেউ কেউ। তাদের ভিতর একটি মেয়ে– চীনা-রক্ত থাকতে পারে ধমনীতে, চ্যাপটা মুখ, হনুজোড়া অ্যাম্বিশাস – স্মরণিকার দিকে তর্জনী তুলে স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে বলে ওঠে, শী ইজ দ্য ওমান! বরাট তাকে ধমক দেয়, ডোন্ট টক্ ননসেন্স! দিস্ ইজ নট য়োর টাইম!
মেয়েটি থমকে যায়। বাসু-সাহেব রবির দিকে ফিরে বললেন, দেখলে তো? এই জন্যেই আমার আপত্তি ছিল। তোমার সিনিয়ার পার্টনার কায়দা করে ঐ চীনা মেয়েটিকে আর একবার দেখিয়ে দিল, যাতে আইডেন্টিফিকেশনের সময় সে এই মেয়েটিকেই সনাক্ত করে!
রবি বোস কী বলবে ভেবে পায় না। বরাট এ মন্তব্য শুনতে না পাওয়ার ভান করল। সে পথ দেখিয়ে ওঁদের এগিয়ে নিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্সটার দিকে। তার ওপারে, জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে একটি স্ট্রেচার মাটিতে নামানো। তার উপরে একটি মৃতদেহ। আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা। বরাট অতিরিক্ত বিনয় দেখিয়ে বললে, আসুন স্যার, এই যে এইদিকে…
সুজাতা টুকুর কানে কানে বলেল, মনকে শক্ত কর টুকু। ভেঙে পড়লে চলবে না। জেঠুকে সনাক্ত করেই পেছিয়ে আসবে। কোন বাড়তি কথা বলবে না। ভয় নেই, আমি ধরে থাকব তোমাকে।
ওঁরা মৃতদেহের কাছে এগিয়ে গেলেন। বরাট স্ট্রেচারের ও-পারে চলে গেল। স্মরণিকা সবার আগে, তার বাহুমূল দৃঢ়ভাবে ধরে পাশেই দাঁড়িয়েছে সুজাতা। ঠিক পিছনেই বাসু-সাহেব, কৌশিক আর রবি। ম্যাজিশিয়ান যে কায়দায় কাপড়ের ঢাকা সরায় তেমনি ক্ষিপ্রহাতে বরাট মৃতদেহের সাদা চাদরটা সরিয়ে নিল।
টুকু একটা চাপা আর্তনাদ করে উঠল। তারপরেই সে বলে উঠল: এ কে?’ এ কে?
– ‘এ কে’ মানে? তোমার জেঠু সত্যানন্দ সেন নন? জানতে চাইল বরাট। বাসু ঝুঁকে পড়লেন। পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ নিশ্চয় নয়, মৃতের বয়স ষাটের কম।
টুকু বলে ওঠে, না-না-না। এ তো বিলাসসিং যাদব।
বাসু স্বগতোক্তি করে ওঠেন: গুড্ গড্!
বরাট ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে: বিলাসসিং যাদব? সে কে? নামটা কোথায় শুনেছি!
– চৌবে কাকুর বন্ধু।– কোনক্রমে বলল টুকু।
– তিনিই বা কে। ঐ চৌবে-কাকু?
টুকু এ-পাশে ফিরল। সুজাতাকে বললে, এখান থেকে সরে চলুন। আমার কেমন যেন গা-গুলাচ্ছে।
রবি ওদের পথ করে দিল। বাসু বললেন, লুক হিয়ার, মিস্টার বরাট! যে মারা গেছে তার নাম বিলাস সিং যাদব। আমার মক্কেল তাকে আইডিন্টিফাই করেছে। বলেছে, সে তার চৌবে-কাকুর বন্ধু। চৌবে হচ্ছেন সেই ভদ্রলোক, যাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আপনি টেলিফোনে কথা বলেছেন।
– ঐ বিলাস সিং এখানে, এই তিন-নম্বরে এল কেমন করে?
– আপনি কাকে ঐ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করছেন মিস্টার বরাট? আমাকে, না আমার মক্কেলকে – নাকি নিজেকেই?
বরাট বোধহয় শুনতে পেল না। আপন মনে বললে, আর তাহলে সত্যানন্দ সেন কোথায়?
বাসু এবার সে-কথার জবাব দিলেন না। বললেন, আমরা ফিরে যাচ্ছি যে-যার বাড়িতে। আশা করি আমাদের কাজ শেষ হয়েছে!
বরাটের হঠাৎ কী খেয়াল হয়েছে, সে হন্তদন্ত হয়ে মোটেলের দিকে এগিয়ে গেল। রবি বোস তখন স্মরণিকাকে বললে, ঠিক আছে, আপনি বাড়ি যেতে পারেন। তবে দু-তিন দিন কলকাতার বাইরে যাবেন না! আপনাকে যেন খোঁজ করলে পাই।
স্মরণিকা বলে, তার মানে? কী বলতে চাইছেন? কেন?
রবি সপ্রতিভাবে বললে, আপনার জেঠু, সত্যানন্দ সেন কোথায় ‘আছেন তা জানেন?
– না।
– আপনি মোটেলে চেক-ইন করেছিলেন, অফিশিয়ালি চেক-আউট করেননি কিন্তু। ওদের রেজিস্টারে সই দিয়ে যাবেন।
স্মরণিকা বললে, সই দিইনি, কিন্তু ঘরটা ভেকেন্ট করে দিয়েছি।
– কারেক্ট! গ্যারেজটাও! জেঠু কোথায় তা তো জানেন না, কিন্তু জেঠুর গাড়িটা? W. B. F. 9852? যেটা ড্রাইভ করে আপনি চেক-ইন করেন।
টুকু বাসু-সাহেবের দিকে তাকায়। বাসু বললেন, তোমার যদি জানা থাকে তবে পুলিসকে বলে দাও। ওদের সঙ্গে সব সময়েই সহযোগিতা করতে হবে।
স্মরণিকা বললে, যদু কলোনির কাছে ডায়মন্ড-হারবার রোডের উপর নিহাল সিং-এর রিপেয়ার গ্যারেজে। গীতার বাড়িতে গ্যারেজ নেই বলে আমি সিংজীর সঙ্গে ব্যবস্থা করেছি। রাতে গাড়িটা ওখানে থাকে।
– ও. কে.! চাবিটা?
– সেটাও সিংজীর কাছে।
– ঠিক আছে। গাড়িটা আমরা ‘সীজ’ করছি।
এবার বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললে, আপনারা যেতে পারেন, স্যার। আপনার মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা নেই, কিন্তু তিনি কখন কোথায় থাকছেন তা যেন আপনাকে জানিয়ে রাখেন। প্রয়োজনে যেন তাঁকে পাওয়া যায়।
কেন বল তো বাপু? তোমরা কি ওকেই সন্দেহ করছ?
রবি হাসল। বলল, আপনাকে আর আমি কী বোঝাব, স্যার? আপনি নিজেই জানেন যে, আপনার মক্কেল সন্দেহের অতীত নন। আইনের চোখে ঐ অ্যাম্বাসাডার গাড়িখানা চোরাই মাল, আইনের চোখে সত্যানন্দ বে-আইনি চোরা-পথে হাসপাতাল থেকে অপহৃত হয়েছেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমি দেখতে পাচ্ছি এবং আপনি নিশ্চয় তা আরও ভালভাবে পাচ্ছেন: সত্যানন্দ সেন নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় আপনার মক্কেল এবারেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হচ্ছেন না। আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই বলেছি, “এবারেও।” ঠিক গতবারের মতো! নয় কি? গোটা কেসটা যে আমার জানা, স্যার!
