ষোলো
– ক্রস-এক্সামিন করুন স্যার, দেখুন আমি শত্রুদলের না বন্ধু দলের?
বাসু পাইপটা ধরাতে ধরাতে বললেন, সেটা ভেরিফাই করার পর প্লেনের টিকিট কেটেছি, হেনা। এখন বল, উনি কোথায়?
– দোতলার সাতনম্বর ঘরে। ওঁকে জানাইনি যে, আপনি আসছেন।
– ভালই করেছ। উনি কীভাবে এখানে এলেন? এখন কেমন আছেন? শারীরিক ও মানসিক?
– শারীরিক দুর্বল। মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, কদিনে প্রভৃত উন্নতি হয়েছে ওঁর। আর কীভাবে এলেন? শেষের কবিতার ভাষায় সেটা ‘আগমন নয়, আবির্ভাব’!
– কী রকম?
কথা হচ্ছিল হোটেল কুণ্ডুজ-এ। ‘রিসেপশন হল’-এ নয়। মালকিন শ্রীমতী মণ্ডলের সুইটের ড্রইংরুম। বুদ্ধদ্বার কক্ষে। কফি পান করতে করতে। হেনা বর্ণনা দিল সত্যানন্দের প্রথম আবির্ভাবের।
যেদিন বিলাস সিং খুন হয় তার পরদিন বিকাল নাগাদ একটি ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায় দার্জিলিঙে, হোটেল কুণ্ডুজ-এর সামনে। ট্যাক্সি-ড্রাইভার বলে, তার বৃদ্ধ যাত্রীটি সকালের ফ্লাইটে বাগডোগরায় নেমেছেন। কোথা থেকে এসেছেন তা সে জানে না। স্রেফ খালি হাত। ট্যাক্সি-ড্রাইভার এয়ারপোর্ট-এ এসেছিল যাত্রীর খোঁজে। বৃদ্ধ ঘটনাচক্রে ওর ট্যাক্সিতেই উঠে বসে বলেন, চলো দার্জিলিঙ। হোটেল কুণ্ডুজ।
ড্রাইভার জানতে চায়: আপ্া সামান?
– না, মালপত্র কিচ্ছু নেই। চলো।
ড্রাইভার সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ে। বলে, ট্যাক্সি ভাড়া আপ্া পাস্হ্যয় – না?
বৃদ্ধ পকেট থেকে একশ’ টাকার দুখানা নোট বার করে ওর হাতে ধরিয়ে দেন। ড্রাইভার তার ভাষায় বলে, পাঙ্খাবাড়ি পার হলে আপনার শীত করবে না? গরম জামাকাপড় তো কিছু আনেননি? অথচ দার্জিলিঙ যাচ্ছেন?
বৃদ্ধ বিহ্বল হয়ে পড়েন। ট্যাক্সিওয়ালার করুণা হয়। জানতে চায়, বৃদ্ধের সংসারে কে-কে আছেন, কেন তিনি দার্জিলিঙ যেতে চান। তাতে বৃদ্ধ বলেন, তাঁর অনেক টাকা আছে। আত্মীয়-স্বজনেরা সে-টাকা কেড়ে নিতে চায়, তাই উনি পালিয়ে এসেছেন। এরপর ট্যাক্সি-ড্রাইভার শিলিগুড়ির বাজার থেকে বৃদ্ধের জন্য একটা পুরোহাতা সোয়েটার আর টুপি কিনে দেয়। বৃদ্ধই টাকা দেন। বিকালে যখন সে ওঁকে হোটেল কুণ্ডুজ-এ পৌঁছে দেয়, তখন তিনি পিছনের সীটে অঘোরে ঘুমাচ্ছেন।
হেনা ওঁকে চিনতে পারে। বছর-কয়েক আগে ওঁর ভাইঝিটিকে নিয়ে এই হোটেলে উঠেছিলেন। দিন-দশেক ছিলেন। তাছাড়া পূর্বদিন সন্ধ্যায় এঁকে টি. ভি.তে নিরুদ্দিষ্ট হিসাবে দেখেছে বলেও ওর মনে পড়ল। টি. ভি.-তে বলা হয়েছিল তিনি বিকৃতমস্তিষ্কের।
তারপর থেকে উনি এই হোটেলে আছেন। লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন না। সকাল-বিকাল সামনের রাস্তায় কিছুটা পায়চারি করেন। চড়াই-উৎড়াই ভাঙতে কষ্ট হয়। তাই প্রায় সর্বক্ষণ হোটেলেই থাকেন। টি. ভি. দেখেন। বই পড়েন। হেনার সঙ্গে কিন্তু অনেক কথা বলেন। হেনা কায়দা করে ওঁর বর্তমান সমস্যার কথা একদম ওঠায়নি। কারণ সংবাদপত্র পাঠে সে জানে যে, সত্যানন্দ সেনকে অপ্রকৃতিস্থ প্রমাণ করতে ওঁর একদল রিস্তেদার বদ্ধপরিকর। পরে কাগজে যখন দেখল যে, ওঁর ভাইঝি কী একটা খুনের মামলায় আটক পড়েছে আর পি. কে. বাসু তার উকিল, তখন বৃদ্ধকে না জানিয়ে সে বাসু-সাহেবের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে।
একটু পরে ওঁদের দুজনকে নিয়ে হেনা মণ্ডল দ্বিতলের সাত নম্বর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। কল-বেল বাজালো। বৃদ্ধ টুক-টুক করে এগিয়ে এলেন। দরজাটা খুলে বললেন, হেনা নাকি? এস।
হেনা বললে, আমার সঙ্গে আরও দুজন গেস্ট আছেন। তাদের মধ্যে একজনকে আপনি চেনেন। কী? চিনতে পারছেন?
বাসু হাত দুটি জোড় করে নমস্কার করলেন। বললেন, আমি কলকাতায় নিউ আলিপুরে থাকি। ক্রিমিনাল ল-ইয়ার। আমার নাম পি. কে. বাসু।
– আপনি…আপনিই ব্যারিস্টার পি. কে. বাসু।
– আজ্ঞে হ্যাঁ!
– আপনি কেমন করে জানলেন যে, ..যাক ও-কথা। আসুন ভিতরে আসুন।
বাসু ঘরের ভিতর ঢুকলেন। হেনা কিন্তু ঢুকল না। বাইরে করিডোরে বার হয়ে এল। পিছন-পিছন কৌশিকও। নিঃশব্দে সে দরজাটা টেনে দিল। ওর মনে হল, হয়তো বাসু ওঁকে এমন কোন প্রশ্ন করবেন যার জবাব দিতে বৃদ্ধ ইতস্তত করবেন তৃতীয় ব্যক্তির সামনে।
বাসু একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। সত্যানন্দ খাটে উঠে বসলেন। কম্বলটা টেনে নিলেন পায়ের উপর। বাসু বললেন, আপনাকে অনেক-অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। আমি জানি। টুকু সব কথা আমাকে বলেছে।
বৃদ্ধ বললেন, ওর হাতে একটা উইল পাঠিয়েছি। সেটা কি আপনি পেয়েছেন? আমার যথাসর্বস্ব আমি টুকুকে দিয়ে যেতে চাই…
বাসু বলেন, পেয়েছি। কিন্তু সেটা কার্যকরী করায় একটু অসুবিধা আছে।
– অসুবিধা? কী জাতের অসুবিধা? অলরাইট! এখন সেটা নাকচ করে আমরা একটা নতুন উইল করতে পারি। হেনা তার উইটনেস্ থাকবে। আপনি দার্জিলিঙের সবচেয়ে নামকরা ডাক্তারকে কল দিন। আপনিই উইলের ড্রাফট তৈরি করুন।
– না, মিস্টার সেন। সেজন্য নয়। টুকুর বড় বিপদ যাচ্ছে এখন।
বৃদ্ধ সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, টুকুর বিপদ? অসুখ-বিসুখ?
– আজ্ঞে না। শরীর তার সুস্থই আছে।
– তবে কী জাতের বিপদ?
– টুকু বর্তমানে জেল-হাজতে আটক আছে। জামিন পায়নি।
বৃদ্ধ পুরো এক মিনিট ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, কী হয়েছে খুলে বলুন। কিসের চার্জ?
– খুনের। বিলাসসিং যাদবের হত্যাপরাধে।
– বিলাসসিং? লোকটা মরে গেছে?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– ঈশ্বর তাহলে আছেন? ন্যায়-বিচার এখনো হয়? কিন্তু ওটা কী বললেন? ‘হত্যাপরাধ’? পাষণ্ডটা কি খুন হয়েছে?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– কে খুন করেছে আন্দাজ করা যাচ্ছে না?
– পুলিসের বিশ্বাস টুকু করেছে!
– টুকু করতেই পারে না। কী-ভাবে খুনটা হয়েছে? গুলিবিদ্ধ হয়ে, না ছোরায়?
– দুটোর একটাও নয়।
সত্যানন্দ একটু ইতস্তত করলেন। তারপর প্রশ্ন করেন, কোথায় খুনটা হয়েছে?
– জি. জি. সি. এল-এর মোটেলে। তিন-নম্বর ইউনিটে।
সত্যানন্দ দীর্ঘসময় নীরব রইলেন। তারপর গা থেকে কম্বলটা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। স্পষ্টভাষে বললেন, ওয়েল, আই গেস্ আই উড বেটার ফেস্দ্য মিউজিক!
– তার মানে? – বাসুও উঠে দাঁড়িয়েছেন।
– তার মানে, বিলাসসিং যাদবের মৃতদেহ যদি ঐ তিন-নম্বর ইউনিটে আবিষ্কৃত হয়ে থাকে, তবে আমিই খুন করেছি!
– কী ভাবে?
– তার খাবারে এক মুঠো ঘুমের ওষুধ ‘মিশিয়ে দিয়ে।
– আপনি আদ্যোপান্ত খুলে বললে আমার সুবিধা হয়, মিস্টার সেন।
– বিস্তারিত বলার বিশেষ কিছু নেই। সাত-সাতটা দিন আমি নরক-যন্ত্রণা ভোগ করেছি ঐ অশান্তিধামে…
– আমি কিছু কিছু আন্দাজ করেছি।
– আজ্ঞে না। করেন নি। করা যায় না! যার জুতোয় কাঁটাটা উঠেছে একমাত্র সেই শুধু টের পায়। লুক হিয়ার, স্যার: আমি বৃদ্ধ। কখনো কখনো সব এলোমোলো হয়ে যায়, চিন্তার পারম্পর্য থাকে না। অবস্থা এতটা খারাপ হত না…ঐ ওরা ক্রমাগত ওষুধ আর ইন্জকশন দিয়ে…আবার ভাববেন না যে, আমি একটা ‘সেনাইল ওল্ড ফুল্’! নিজের কারবার আমি আজও নিজে চালাতে পারি। বিজনেস লেটার ডিকটেট্ করি…। ভাবতে পারেন? আমার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দশ লক্ষের উপর, অথচ ওরা আমার পকেটে একটা পাঁচ-নয়া পর্যন্ত রাখল না। শান্তি স্বর্গে গেছে, বেঁচেছে…কিন্তু আর সবাইকে ওরা তাড়াল। প্রথমে টুকুকে। তারপর নবীন, বিশ্বনাথ, মতির-মা, ঠাকুর সিং প্রত্যেককে। আমাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে গেল একটা জেলখানায়। সেখানে খাটের সঙ্গে ওরা চামড়ার স্ট্র্য্যাপ দিয়ে আমাকে বেঁধে রাখত…
বাসু ওঁর হাত ধরে তাঁকে আবার বসিয়ে দিলেন। বললেন, এসব কথা আমি জানি, মিস্টার সেন। টুকু আপনাকে সেই নরক থেকে উদ্ধার করল। একটা মোটেল নিয়ে এল। তারপর কী হল বলুন?
– টুকু সন্ধ্যারাত্রে প্যাকেটে করে চাইনীজ-ফুড নিয়ে এল। আমি বললাম, আয়, দুজনে ভাগ করে খাই। ও রাজি হল না। আধখানা খাবার রেখে আর বাকি আধখানা একটা প্যাকেটে বেঁধে নিয়ে ও চলে গেল। ঠিকই করেছে সে। অত রাত্রে ডায়মন্ড-হারবার রোড দিয়ে ওর বয়সী একা মেয়ের ড্রাইভ করা ঠিক নয়। সে যাই হোক, টুকু চলে যাওয়ার পাঁচ-মিনিটের মধ্যেই কেউ দরজায় নক্ করল। আমার মনে হল, কোন কারণে টুকুই ফিরে এসেছে। ছিটকানি খুলে উঁকি দিয়ে দেখতে গেলাম-বিলাস জোর করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। একগাল হেসে কী বলল জানেন? বলল, হমাকে খুন করতে হিঞ্ছা জাগছে তো সেন-সা’ব, লেকিন খুন তো করা যাবে না, মেহমানকে খিলানাই তো ধরম হ্যয়। নিকালিয়ে বহ্ চাইনিজ ফুড!
বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন একে-একে। টুকু দু-প্যাকেটে খাবার এনেছিল। একটায় চাও-মিঙ, একটায় চিলি-চিকেন। দুটো মিশিয়ে ফেলে আর তারপর দুপাত্রে ভাগ করে। এসব ঘরের মধ্যে করে না। পাছে ঘরটা নোংরা হয়। বাথরুমে একটা গ্লাসটপ টেব্ল আছে। তার উপরেই ভাগাভাগি করে একটা প্যাকেট নিয়ে যায়, একটা বাথরুমের ঐ টেবিলেই রাখা ছিল।
তাই ঘরে ঢুকেই সেটা নজরে পড়েনি ক্ষুধার্ত বিলাস সিং-এর। সে প্রস্তাব দেয়: দুই লক্ষ টাকা নগদে পেলে সে ধানবাদে ফিরে যাবে। বলে, তার কাছে ধনঞ্জয় চৌবের মৃত্যুবাণ আছে। সে যদি ধনঞ্জয়কে শাসিয়ে যায় তাহলে ধনঞ্জয় পালাবার পথ পাবে না। সে-ক্ষেত্রে সত্যানন্দ আবার স্বরাষ্ট্রের সম্রাট হয়ে বসবেন এবং ওঁর সঞ্চিত সম্পত্তি– ‘মাইনাস দু লাখ টাকা’ – ভোগ করতে পারবেন, টুকুকে দান করতেও পারবেন। আর যদি তিনি স্বীকৃত না হন, তাহলে বিলাস পুলিশে খবর দেবে। সত্যানন্দকে আবার পাঠিয়ে দেওয়া হবে সেই নরকে।
বিপদে পড়লে মানুষের বুদ্ধি খুলে যায়।সত্যামন্দ ভাব দেখান যে, তিনি রাজি। কিন্তু বলেন, নগদ দু-লক্ষ টাকা তিনি যোগাড় করবেন কোখেকে? ঐ সময় বিলাস পুনরায় তাগাদা দেয়: চাইনীজ খাবার কোথায় আছে?
সত্যানন্দ তখন বাথরুমের দিকে যান। বিলাস আপত্তি করে না। উনি বাথরুমে ঢুকেই দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দেন। বিলাস দরজার ওপাশ থেকে নানান কটুকাটব্য করতে থাকে। বলে, ঠিক আছে, তুমি বাথরুমেই বন্দী থাক। কাল সকালে স্মরণিকা এলে তাকেই আমি ধরিয়ে দেব। সেও জেল খাটবে – হাসপাতাল থেকে রুগীকে অপহরণ করার অপরাধে।
ইতিমধ্যে বুদ্ধদ্বার বাথরুমের ভিতর সত্যানন্দ কাম্পোজ ট্যাবলেটগুলো মিহি করে গুঁড়ো করেছেন। মিহি করে খাবারে মিশিয়ে দিয়েছেন। বিলাস যখন ভয় দেখালো যে, টুকুকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে তখন উনি দরজা খুলে দিলেন।
সত্যানন্দ এই সময় বলে ওঠেন, বিলিভ মি, ব্যারিস্টার-সাহেব! আমি ঐ খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিলাম বটে, কিন্তু খাবারটা ওকে নিজে হাতে তুলে দিইনি। ওই বরং সেটা কেড়ে নিয়ে খেতে শুরু করল। বেশ বোঝা যায় যে, সে সারাদিন অভুক্ত ছিল।
– তখন রাত কত হবে?
– আমি জানি না। আমি ঘড়ি দেখিনি।
– তারপর?
– তারপর আমরা দুজনেই শোবার ঘরে চলে আসি। বিলাস নানান উদ্ভট পরিকল্পনা করতে থাকে।
– যেমন?
– ও আমার চেক বইটা চুরি করে নিয়ে আসবে। আমি তাকে একটা ব্যাকডেটেড চেক দেব, অর্থাৎ কোর্ট আমাকে ইনকম্পিটেন্ট ঘোষণা করার আগেকার তারিখের। গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কে নয়। অন্য কোনও ব্যাঙ্কে। আমি কালক্ষেপ করবার জন্য একটা আষাড়ে গল্প ফাঁদি। বলি যে, আমার একটা গোপন অ্যাকাউন্ট আছে। সেখানে প্রায় পৌনে দুইলাখ টাকা আছে। ও যদি পৌনে দুই লাখে রাজি হয়…এই সময় ও আমার পকেট হাতড়ায়। টুকুর দেওয়া টাকা কেড়ে নেয়। বলে, ঠিক আছে তাতেই ও রাজি। বেশ বুঝতে পারি, ইতিমধ্যে ঘুমের ওষুধ কাজ করতে শুরু করেছে। বিলাস খাটে উঠে বসে। ওর কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। আমি বালিশটা ওর দিকে ঠেলে দিলাম। ও বলল, ‘কাল সুবে ফয়শালা হোগা’।…মোটকথা ও ঘুমিয়ে পড়লে ওর পকেট থেকে আমার টাকা আর ওর গাড়ি আর গ্যারেজের চাবিটা তুলে নিয়ে আমি বেরিয়ে আসি।
– দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে?
– তা আমার মনে নেই। মোটকথা ঘুমের ওষুধের ওভার-ডোজে যদি বিলাসসিং মারা গিয়ে থাকে, তবে সেজন্য আমিই দায়ী, যদিও খাবারটা আমি তাকে হাতে তুলে দিইনি। সে কেড়ে নিয়েছিল আমার কাছ থেকে…
বাসু বললেন, মিস্টার সেন, ঘুমের ট্যাবলেট বেশি পরিমাণে খেয়ে বিলাসসিং মারা যায়নি। সে যখন ঐ ঘরে ঘুমন্ত, তখন অন্য কেউ একটা গ্যাস পাইপের কানেকশন খুলে দেয়। তাতেই শ্বাসবুদ্ধ হয়ে…
– গ্যাস-পাইপ! ওখানে গ্যাস-পাইপ কোথা থেকে আসবে? গ্যাস-স্টোভ তো ওর ধারে কাছে ছিল না।
– না, তা ছিল না। কিন্তু সে-সব কথা আপনাকে পরে বুঝিয়ে বলব। আপাতত আমার কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দিন দেখি। কিছু কিছু জটিলতা আছেযা আপনিই শুধু পরিষ্কার করে দিতে পারেন। প্রথম প্রশ্ন, টুকু বলেছে যে, সে আপনাকে বারণ করে গেছিল ঘরের বাইরে আসতে। আপনি কি মনে করতে পারেন টুকু সকালে বেরিয়ে যাবার পর আপনি মোটেল ছেড়ে বাইরে গেছিলেন কিনা?
বৃদ্ধ একটু ভেবে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। টুকু সকালে বেরিয়ে যাবার পর আমি জানলার ধারে বসে বসে একটা ডিটেকটিভ বই পড়ছিলাম। টুকুই দিয়ে গেছিল। হঠাৎ জানলা দিয়ে নজরে পড়ল বাইরে একটা লোক ঘোরা ফেরা করছে। হুবহু বিলাসসিং যাদবের মতো দেখতে। লোকটা পাশ ফিরে ছিল। তাই মুখটা ঠিক দেখতে পাইনি। কিন্তু আমার মনে হল: ও বিলাসসিং! আমার প্রচণ্ড ভয় হল। আতঙ্কের তুঙ্গশীর্ষে উঠে আমি যেন দিশেহারা হয়ে গেলাম। আমার মনে হল, পালাতে না পারলে এখনি বিলাস আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। ঐ জেলখানার খাটে আবার স্ট্র্য্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখবে। তাই….তাই…
– হ্যাঁ, বলুন। তাই আপনি কী করলেন? মোটেল ছেড়ে পালিয়ে গেলেন?
– হ্যাঁ। লোকটা দৃষ্টির আড়ালে সরে যেতেই আমি উঠে পড়ি। টেবিলে কিছু খুচরো নোট আর পয়সা ছিল। সকালে টুকু যে খাবার আনিয়েছিল তারই ভাঙানি টাকা। আমি না গুণেই সে টাকা মুঠো করে পকেটে পুরে বেরিয়ে গেলাম।
– কোথায় যেতে চেয়েছিলেন?
– এখানেই আসব ভেবেছিলাম। এই হেনার হোটেলে। দার্জিলিঙে।
– তারপর?
– বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলাম। এক ভদ্রলোক লিফ্ট দিলেন। নামিয়ে দিলেন তারাতলার মোড়ে। তখন আমার খেয়াল হল, আমার কাছে যে টাকা আছে তাতে দার্জিলিঙে আসা যায়না। তারাতলার মোড়ে মনে হল, আমি অহেতুক ভয় পেয়েছি। ঐ লোকটা বিলাসসিং নয়। ওরা যে ওষুধ ইন্কশন দিয়েছিল তার প্রভাব কাটেনি বলেই এসব ‘হ্যালুসিনেশান’ দেখছি। তাই ওখান থেকে উল্টোদিকে বাস ধরে আবার মোটেলে ফিরে আসি।
– সন্ধ্যাবেলা টুকু যখন মোটেলে ফিরে এল তখন তাকে এসব কথা বলেননি?
– না। কী লাভ? ওটা তো হ্যালুসিনেশন– আতঙ্কে দিবাস্বপ্ন দেখা!
– এবার বলুন, স্মরণিকা কি সত্যিই আপনার ভাইঝি নয়?
– না।
– সে আপনার বাড়ির গভর্নেস শান্তি দত্তের মেয়ে?
– হ্যাঁ, তাই।
– ঐ সুহাস দত্ত কোনদিন ফিরে আসেননি?
বৃদ্ধ মুখ তুলে প্রশ্ন করলেন, কে সে? ঐ সুহাস দত্ত কার নাম?
– আপনার অফিসের কর্মচারী? টুকুর বাবা?
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সুহাস দত্ত নামে আমার কোনও কর্মচারী কোনদিন ছিল না। মনে পড়ছে, ঐ নামটা আমি কল্পনা করেছিলাম – শান্তির স্বামী ছিল একটা মদ্যপ, রেসুড়ে, পাষণ্ড। শান্তিকে সে ব্রথেলে বেচে দিতে চেয়েছিল। আমি তাকে উদ্ধার করি। কাশী থেকে কলকাতায় নিয়ে আসি। পাষণ্ডটা আর কোনদিন শান্তিকে খুঁজে পায়নি।
– তার নাম কি? স্মরণিকার বাবার?
– তার নামটার কোন প্রয়োজন নেই, বাসু-সাহেব। টুকুর বাবার নাম সত্যানন্দ সেন।
– কী বলছেন, মিস্টার সেন!
– আজ্ঞে, হ্যাঁ। শান্তিকে আমি ভালবাসতাম। সে আমার বাড়ির হাউস-কীপার ছিল, কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদায়। যে আমলের কথা, তখনো হিন্দু কোড বিল পাস হয়নি। শান্তিকে বিবাহ করার পথ আমি খুঁজে পাইনি। ঘটনাচক্রে ঐসময় একটা দুর্ঘটনায় আমার ভাই আর ভাইবউ মারা যাওয়ায় আমি টুকুকে আমার ভাইঝি সাজাই। কিন্তু ধনঞ্জয়ের কাছ থেকে কথাটা গোপন করার উপায় ছিল না। সে জানত, আমার ছোটভাই সত্যপ্রিয়র কোন সন্তানাদি ছিল না। তাই ধনঞ্জয়কে মিথ্যে করে সুহাস দত্তের আষাঢ়ে কাহিনীটা জানাই!
বাসু বললেন, বুঝলাম। আপনি তৈরী হয়ে নিন। আমার সঙ্গে কাল কলকাতা ফিরবেন।
