যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ৬

ছয়

রানু জানতে চাইলেন, কী হল হল বল তো? মেয়েটা মদ খেয়ে মাতলামি করছিল না?

বাসু তাঁর হাতের কালো যন্ত্রটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। যেন ঐ যন্ত্রের ভিতরে তিনি বিষযন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মরতে দেখতে পাচ্ছিলেন একটি অজানা মেয়েকে। সেদিকেই তাকিয়ে উনি বলেন, না রানু, মেয়েটা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষছিল– আর তাতেই ওর কণ্ঠস্বর অমন জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল। কাকলি বলেছিল, এই মেয়েটিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। সে কী-যেন একটা কথা জানে। তার মানে ঐ মেয়েটি ছিল কাকলির তরফে জোরদার সাক্ষী। হয়তো সে-জন্যই মেয়েটির মুখ ওরা বন্ধ করে দিল।

– ‘ওরা’ মানে?

– আমি কেমন করে জানব, রানু? এটুকু বলতে পারি তারা কাকলির প্রতিপক্ষ। আন্দাজে বলতে পারি তারা অপরাধজীবী। সচরাচর রাজনীতি-ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় তারা অবাধে অপরাধ সংঘটন করে চলে। তাদের পক্ষে কাকলির মতো অল্পবয়সী মেয়ের সর্বনাশের চেষ্টা করা এমন কোনও নতুন কথা নয়। আর সেজন্য নবনীতার মতো মেয়েকে বিষ দিতে ওদের হাত কাঁপে না। অবশ্য সবই আন্দাজে বলা। ‘কেস’টা কী, তাই তো জানি না। তবে ‘কেস’ যাই হোক, নবনীতাকে বাঁচানোর চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। কিন্তু ওর ঠিকানাটা যোগাড় করি কী করে? কাকলি কি তার ঠিকানার সঙ্গে কোন টেলিফোন নাম্বার দিয়েছিল?

– হ্যাঁ ওর দোকানে ফোন আছে। তার একটা এক্সটেনশন ওর ঘরেও আছে। ও নাকি ঐ দোকানঘরের উপরতলাতেই থাকে।

– তাহলে সেখানে রিং করে দেখ তো।

রানু নির্দেশ মতো টেলিফোন ডায়াল করলেন। দীর্ঘ সময় রিঙিং-টোন বেজেই গেল। বোঝা গেল, কাকলি দোকানেও নেই, বাড়িতেও নেই। দোকান নিশ্চয় বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়িতে কি আর কেউ থাকে না?

বাসু জানতে চান, কৌশিক আর সুজাতা কোথায়?

– ওরা তো বাড়িতে নেই। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ থিয়েটার দেখতে গেছে। মনোজ মিত্রের কী একটা নতুন নাটক।

– আঃ! কাজের সময় এ রকম না বলে বেরিয়ে যায় কেন?

রানুও ধমকে ওঠেন, বাঃ! না বলে কেন যাবে? তোমাকে বলেই তো গেল।

বাসু নীরবে পাইপ ধরাতে থাকেন।

– আর তাছাড়া তোমার ক্লায়েন্ট-এর সাক্ষীকে যে কেউ বিষ খাওয়াবে তা কি ওরা আগেভাগে জানত?

বাসুর পাইপে আগুনটা নিভে গেল। উনি বিরক্ত হয়ে বলেন, অহেতুক তর্ক কর কেন বলত?

– আয়াম সরি। আমার খেয়াল হয়নি যে, এটা একটা ট্রান্সফার্ড-এপিথেট।

– ‘ট্রান্সফার্ড এপিথেট’! তার মনে?

– ‘উয়্যারি-ওয়ে’, ‘স্লীপলেস পিলো’র মতো! মানে, তুমি নবনীতার ঠিকানাটা আবিষ্কারের কোন পথ খুঁজে পাচ্ছ না। রাগ হচ্ছে নিজের দুর্ভাগ্যের উপর। আর ঝাল ঝাড়ছ সুজাতা-কৌশিকের উপর।

বাসুর পাইপটা ধরেছে। কিন্তু তিনি তাতে টান না দিয়েই বলেন, আচ্ছা তুমি এই মারাত্মক সময়ে রসিকতা করতে পারছ? একটা মেয়ে বিষ খেয়ে মরছে

রানু বলেন, মোটেই নয়! মেয়েটা অতিরিক্ত মদ খেয়েছে। মদের ঝোঁকে তোমাকে কী সব আবোল-তাবোল বকেছে–

বাসু আগুনঝরা দৃষ্টিতে ধর্মপত্নীর দিকে এক নজর দেখে নিয়ে বললেন, লোকাল পুলিস-স্টেশনের নম্বরটা কত?

রানুকে টেলিফোন দেখতে হল না। পর পর ছয়টা নম্বর ডায়াল করলেন। রিঙিং-টোন শুনেই বিনা কথায় যন্ত্রটা বাসু-সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।

বাসু ও-প্রান্তে সাড়া পেয়েই বললেন, আমি পি. কে. বাসু বলছি। ও.সি.আছেন?

– না, স্যার, আমি খালেদ বলছি। সেকেন্ড অফিসার। ও. সি. সাহেব একটু বেরিয়েছেন। কিছু খবর আছে?

– তা আছে। সাত মিনিট আগে আমার বাড়িতে একট টেলিফোন এসেছিল। নবনীতা রায়। বয়স অ্যারাউন্ড ত্রিশ। আজ রাত সাড়ে নয়টার সময় তার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল আমার সঙ্গে। সে টেলিফোনে বললে যে, সে বাড়ি থেকে টেলিফোন করছে। আনফরচুনেটলি তার বাড়ির ঠিকানা অথবা টেলিফোন নম্বর আমি জানি না। একটা ‘কেস’-এ নবনীতা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হত। কেসটা ঠিক কী তাও আমি জানাতে পারছি না। ….এবার মন দিয়ে শোন: টেলিফোনে নবনীতা বললে তাকে কেউ এক প্যাকেট ক্যান্ডি পাঠিয়েছে। সেগুলো বিষ মেশানো ছিল। ও তা খেয়েছে। ওর কণ্ঠস্বর ছিল জড়ানো – যেন সে ঘুমে ঢলে পড়ছে। আমি ওর ঠিকানা জানতে চাইলাম। ও বলল থার্টিন বাই ওয়ান বি– কিন্তু রাস্তার নামটা বলার আগেই ওর কণ্ঠস্বর থেমে গেল। মনে হল, ওর হাত থেকে টেলিফোন যন্ত্রটা গড়িয়ে পড়ে গেল।

– আপনি কোনও ঠিকানা দিতে পারছেন না?

– না। ওই ‘থার্টিন-বাই-ওয়ান-বি’-টুকু বাদে!

– ওটা একটা ঠিকানা হল, স্যার? রাস্তার নাম বাদে?

– না, হল না। হলে, তোমাকে টেলিফোন করতাম না। নিজেই আমি চলে যেতাম সেখানে।

– তা তো বটেই। তবে কী জানেন, স্যার? ওইটুকু সম্বল করে অ্যাত্ত বড় কলকাতা শহরে কোনও মানুষকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা। তা ছাড়া হয়তো ঘটনা আমাদের থানার জুরিসডিকশনের ভিতরেই নয়।

– তাহলে তোমার আর কোন দায়িত্ব থাকে না। তাই না, খালেদ?

– আজ্ঞে?

– ও. সি. ফিরে এলে আমাকে রিং করতে বলো। তোমার দ্বারা হবে না।

যন্ত্রটা নামিয়ে বাসু এপাশ ফিরলেন। দেখলেন, রানু টেলিফোন ডাইরেক্টরি ঘাঁটছেন।

– কী খুঁজছ তুমি?

– রায় পদবীতে কারও বাড়ির নম্বর ‘থার্টিন-বাই-ওয়ান বি’আছেকিনা।কিন্তু মুশকিল হচ্ছে বিভিন্ন ইংরেজী বানানে রায় উপাধি বিশ-পঁচিশ পাতা।

– আরে কী পাগল তুমি? বিশ-পঁচিশ পাতার গভীর অরণ্যে একটা ‘মদো-মাতাল’ মেয়ের সন্ধান করার কোন মানে হয়? শুনলে না, মেয়েটা মদের ঝোঁকে আবোল-তাবোল বকছিল?

রানু স্বামীর দিকে বেদনার্ত দুটি চোখ তুলে বলেন, আয়াম সরি। পরে ভেবে দেখেছি তুমিই ঠিক বলছ – মেয়েটি হয়তো মাতাল নয়, মৃত্যু-যন্ত্রণায় মাতাল। যদিও ওর কণ্ঠস্বর শুনে তা আমার মনে হয়নি, কিন্তু পরে যদি দেখা যায় যে, আমার অনুমানটা ভুল, তোমার আশঙ্কাই সত্যি, তাহলে অনুশোচনার আর শেষ থাকবে না।

বাসু স্ত্রীর পিঠে একখানা হাত রাখলেন। বললেন, কারেক্ট।আমাদের ধরে নিতেই হবে মেয়েটি সত্যিই মৃত্যু-যন্ত্রণায় অমনভাবে জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছিল। সেটা ভুল প্রমাণিত হলে হয়তো পণ্ডশ্রমের জন্য কিছুটা অনুশোচনা জাগবে। কিন্তু তোমার অনুমানটা ভুল প্রমাণ হলে সারাজীবন অনুশোচনার কাঁটায় বিদ্ধ হতে থাকব।

– সেজন্য তো ‘রায়’ উপাধি ধরে খুঁজছি, কারও বাড়ি নম্বর–

বাসু বললেন, ‘ওয়াইল্ড গুজ চেজ’! হয়তো মেয়েটি বিবাহিত আর টেলিফোন তার বাবার নামে–

– অথবা মামার কিংবা দাদামশাইয়ের! তাই নয়?

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যায় বাসু-সাহেবের। আপন মনেই বলে ওঠেন ‘গট ইট’।

– কী?

– কাকলি তখন বলেছিল যে, নবনীতা ‘সোনালি স্বপন’-এ কাজ করে। দ্যাটস অ্যা লীড। দেখতো, ওই নামে কোনও ফোন আছে কিনা।

রানু একটু খোঁজাখুঁজি করে বললেন, আছে, ডায়াল করব?

– না। তুমি লালবাজারে হোমিসাইড সেকশনে ইনস্পেক্টর নিখিল দাশকে পাও কি না দেখ। ছোকরা আমার গুণগ্রাহী। পুলিসের সাহায্য ছাড়া হয়তো ‘সোনালি স্বপন’-এর মাধ্যমে খবর পাব না। ওরা হয়তো আমাকে পাত্তাই দেবে না। নামটাই কেমন যেন সন্দেহ জাগাচ্ছে।

রানু একটু পরে লালবাজারে ইনস্পেক্টর নিখিল দাশকে ধরতে পারলেন। বাসু তাকে ব্যাপারটা সংক্ষেপে জানিয়ে বললেন, লোকাল পুলিস স্টেশনে জানিয়ে রেখেছি, কিন্তু ঘটনাটা হয়তো এ থানার এলাকার বাইরে। তাই তোমার সাহায্য চাইছি। আমাকে হয়তো ওরা পাত্তা দেবে না। তুমি এই নম্বরে ডায়াল করে জানতে চাও নবনীতা রায় ওদের এমপ্লয়ী কিনা এবং তার বাড়ির ঠিকানা কী।

– ঠিক আছে স্যার, আপনি লাইনটা ধরে থাকুন। আমি অন্য লাইনে ‘সোনালি স্বপনে’ ফোন করে জেনে নিয়ে জানাচ্ছি।

বাসু ধর্মপত্নীর দিকে ফিরে বললেন, ধর।

– ধরব? কী ধরব?

– লক্ষ্মণের ফল! যতক্ষণ না সরব হচ্ছে ধরে থাক। উপায় কী? আদরের ভাগ্নে-ভাগ্নেবৌকে থ্যাটার দেখতে পাঠিয়েছ যে।

রানু টেলিফোনটা কানে লাগিয়ে বসে রইলেন। বাসু পাইপ-পাউচ বের করে পুনরায় তামাক সেবনের আয়োজন করতে থাকেন। মিনিট পাঁচেক পরে– বাসু তিন-চারবার টান দিতে না দিতে – মিসেস বাসু সরব হলেন, ইয়েস? হ্যাঁ, ধরুন, দিচ্ছি।

বাসু বাঁ-কানে টেলিফোনের শ্রবণাঙ্গটা চেপে ধরেন, বল?

– সামথিং ফিশি, স্যার। ‘সোনালি স্বপন’ একটা বার-কাম-রেস্তোরাঁ। ওরা স্বীকার করছে যে, নবনীতা রায় ওদের পরিচিত। সন্ধ্যাবেলায় ছিল। সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি চলে যায়। কিন্তু ওর বাড়ির ঠিকানা কেউ জানে না। আমি সরেজমিনে ‘সোনালি স্বপনে’ তদন্ত করতে যাচ্ছি। আপনি কি আসবেন?

– নিশ্চয়ই।

– আপনাকে বাড়ি থেকে পিক-আপ করে নেব?

– না। লালবাজার থেকে সেটা উল্টোমুখো হবে। আমি বরং একটা ট্যাক্সি নিয়ে লালবাজার চলে যাচ্ছি। তুমি ‘মেইন গেট’-এ গাড়ি নিয়ে রেডি থেক। ট্র্যাফিক জ্যামে না পড়লে মিনিট কুড়ির ভিতর পৌঁছাব।

– ও কাণ্ড করবেন না স্যার। এখনো অফিস ছুটির ভিড় আছে। ট্র্যাফিক জ্যাম অনিবার্য। আমি বরং সাইরেন বাজাতে বাজাতে অনেক আগে আপনাকে তুলে নিয়ে অকুস্থলে পৌঁছাতে পারব। আপনি দশ মিনিট পরে আপনার গেটের সামনে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন।

নিখিল দাশের জীপটা যখন ‘সোনালি স্বপন’-এর সামনে এসে দাঁড়াল রাত তখন নটা। ইউনিফর্মধারী পুলিস দেখে দ্বারপাল এগিয়ে পথ রুখল।

– ক্যা চাহিয়ে আপলোগোঁ কো?

নিখিল ওই দশাসই দ্বারপালকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিল। তারপর বাঁ হাতে ওকে ঠেলে সবিয়ে দিয়ে প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে গেল। দারোয়ান বাধা দিল না। বরং সে সরে এল বাইরের পাচিলের একটা বিশেষ অংশে। সেখানে দেওয়ালে একটা স্যানিটারি পাইপের ট্র্যাপ-ডোর। আঙুল দিয়ে সেই দরজাটা সরিয়ে চার ইঞ্চি ব্যাস গর্তমুখে তার হুইসিলটা বারতিনেক বাজিয়ে দিল। ছোট ছোট বিরতি দিয়ে: বিপ্ বিপ্ বিপ্।

না নিখিল দাশ, না বাসু-সাহেব কেউই ভূক্ষেপ করলেন না। তবে ঘটনাটা দুজনেরই নজরে পড়েছে।

নিখিল গটগট্ করে এগিয়ে এল কাউন্টারে। সেই বর্ষীয়সী অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলাটি এখনো বসে আছেন। তিনি মুখ তুলে চাইলেন, ইয়েস?

নিখিল ইংরেজিতে প্রশ্ন করে, নবনীতা রায় তোমাদের স্টাফ?

– নো!

– নবনীতা রায় তোমার পরিচিত?

– ইয়েস।

– আজ সন্ধ্যাবেলা সে এখানে ছিল?

– হ্যাঁ, দেখেছি তাকে। কেন?

– তার বাড়ির ঠিকানা কী?

– কেন? সে কী করেছে?

– লুক হিয়ার, ম্যাডাম। পুলিস প্রশ্ন করে, কৈফিয়ৎ দেয় না। এটুকু বলতে পারি যে, নবনীতাকে কোন অপরাধের দায়ে খুঁজছি না আমরা।

– থ্যাঙ্কু। না, মানে, একটু আগে লালবাজার থেকে–

– হ্যাঁ, আমিই ফোন করেছিলাম। কিন্তু আমার প্রশ্নটা এতক্ষণে তামাদি হয়ে যেতে বসেছে। নবনীতার ঠিকানা কী?

– সরি। আমরা কেউ জানি না। আপনি লালবাজার থেকে ফোন করার পর আমি জনে জনে প্রশ্ন করে দেখেছি।

– এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? নবনীতা রোজ সন্ধ্যাবেলা এখানে আসে, অথচ কেউ তার বাড়ির ঠিকানা জানে না।

– না, রোজ আসে না।

– সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন আসে? তিন দিন?

– হ্যাঁ, কোনও সপ্তাহে তিনদিন, কোনো সপ্তাহে চার দিন।

– সে কি কমিশন বেসিসে বার-মেইড?

– সেটা আমি ঠিক বলতে পারব না।

– কে পারবে?

– মালিকদের মধ্যে কেউ থাকলে বলতে পারতেন। আমি ঠিক–

– অল রাইট। ‘মালিক’ শব্দটা আপনি বহুবচনে ব্যবহার করলেন। এ দোকানের ক’জন মালিক? কী নাম তাঁদের?

পানাহারকারীদের মধ্যে দু’একজন বাসু-সাহেবকে চিনে ফেলেছে। আর তাঁর সঙ্গীর পরিচয় তো বেশভূষাতেই। গুড়ের গন্ধে মাছির মতো তাই কেউ কেউ গেলাস-হাতে কাউন্টারের দিকে ঘনিয়ে আসতে শুরু করেছেন। ভদ্রমহিলা বুদ্ধিমতী। তৎক্ষণাৎ বলেন, আপনারা দুজন যদি কাইন্ডলি এই পাশের ঘরে এসে বসেন তাহলে খোলাখুলি কথাবার্তা বলতে সুবিধা হয়।

নিখিল দাশ এককথায় রাজি।

পাশের ঘরে ওঁরা তিনজনে এসে বসতেই ভদ্রমহিলা দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বলেন, এটা একটা পার্টনারশিপ বিজনেস্, স্যার। দোকানের সব দেখাশোনা করা, হিসাব রাখা, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দেখেন মিস্টার জীবন হালদার। তিনি আজ আসবেন না জানিয়েছেন। দ্বিতীয় মালিক-তিনি বস্তুত স্লীপিং পার্টনার-তাঁর নাম রাকেশ বাজোরিয়া। তিনি বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দোকানে আসেন না। তবে আজ আসবেন।

– কেন? আজ বিশেষ প্রয়োজনটা কী হল?

– স্যার, আমরা পুলিসের সঙ্গে সহযোগিতা করতে সর্বদাই প্রস্তুত। তাই লালবাজার থেকে টেলিফোনটা পেয়েই আমি রাকেশজীকে টেলিফোন করেছি। উনি বলেছেন যে, উনি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এসে যাবেন।

– অল রাইট। তিনি এলেই যেন লালবাজারে হোমিসাইড সেকশনে একটা ফোন করেন। সার্জেন্ট অমিয় সেনকে খোঁজেন–

– হোমিসাইড, স্যার? নবনীতা কি–

– প্লীজ ম্যাডাম। নবনীতা খুন হয়নি, তাকে কোন খুনের চার্জেও আমরা খুঁজছি না। কিন্তু তার ঠিকানাটা আমার এখনি চাই। এটা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, এখানে কেউ তার ঠিকানা জানে না?

– ভেবে দেখুন, স্যার, কোনও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ‘বার-মেইড’ তার বাড়ির ঠিকানা মদের দোকানে রেখে যায় না। যদি না সে স্টাফ হয়। দু-জন মালিকই সম্ভবত ওর ঠিকানা জানেন। তবে ইতিমধ্যেই আমি অনুসন্ধান করে একটি সূত্র আবিষ্কার করেছি। আপনারা অনুমতি দিলে সেটাই নিবেদন করি–

– করুন।

জানা গেল, মাস কয়েক আগে একদিন কী একটা কারণে সন্ধ্যারাতেই ট্রাম-বাস বন্ধ হয়ে যায়। শহরে দাঙ্গাবাজি শুরু হয়ে গিয়েছিল। নীতা ট্যাক্সি করে ফিরতে চায়, কিন্তু একা যেতে সাহস পায় না। রাত তখন প্রায় দশটা। রেস্তোরাঁর একজন বিশ্বস্ত ‘বয়’ ট্যাক্সি করে তাকে পৌঁছে দিয়ে আসে। সে নবনীতার বাড়িটা নিশ্চয় চেনে। তার নাম গিরিধারী রাউত। দুর্ভাগ্যবশত, আটটায় তার ছুটি হয়ে গেছে। তবে সে পার্মানেন্ট স্টাফ। তার পাকা-ঠিকানা খাতায় লেখা আছে – ভবানীপুর উড়িয়াপাড়ায়।

নিখিল দাশ নাম-ঠিকানা লিখে নিয়ে রওনা হল।

গেটের বাইরে দারোয়ান এবার নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো ওদের দেখতে পেয়ে। ওঁরা দুজনে ওকে অতিক্রম করে জীপের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর ইনস্পেক্টার নিখিল দাশ হঠাৎ কী মনে করে পিছন ফিরল। অ্যাটেনশনে দাঁড়ানো বিশালকায় দ্বারপালের ঠিক মুখোমুখি হয়ে বললে, তোমাকে তিনটি কথা বলব।

লোকটা কোনও জবাব দিল না। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তার বুকে দক্ষিণ হস্তের তর্জনীর খোঁচা মেরে নিখিল দাশ বললে, এক নম্বর, তোমার স্বাস্থ্য ভাল। লম্বায় আর চওড়ায়। কিন্তু ইদানীং তোমার ভুঁড়ি হয়ে যাচ্ছে, রোজ ওঠ-বোস দেওয়াটা ছেড়ে দিলে কেন? দু’নম্বর, দ্বিতীয়বার তোমাদের দোকানে পুলিস রেইড হলে স্পিকিং টিউবে এমনভাবে হুইসিল বাজাবে যাতে পুলিস নিজেই না সতর্ক হয়ে যায়। তুমি ওই ভাবে হুইসিল বাজানোর জন্যেই আমি বুঝতে পেরেছি, ভিতরে কিছু বেআইনী কাজ হয়। এটা আমার জানা ছিল না। তুমিই জানালে। কথাটা তোমার মালিককে বলবে। কারণ তুমি না বললে, আমি নিজেই তাকে বলব। তিন নম্বর, এরপর যখন তোমাদের দোকান রেইড করতে আসব তখন আমাকে দেখতে পেলে অ্যাটেনশনে স্যালিউট দেবে। বুঝলে? মনে থাকবে? স্ট্যান্ড অ্যাট ইজ।

নিজে অ্যাবাউট টার্ন করে জীপের দিকে এগিয়ে চলল নিখিল দাশ।

পিছন পিছন বাসু-সাহেব।